ঈশানীর বাঁকে মহাতীর্থ অট্টহাসের কথা.
ভাবিনি কখনো সম্ভব হবে বলে, কিন্তু মায়ের অশেষ কৃপায় গতকাল পৌঁছে গেলাম সতীপীঠ অট্টহাস। ছেলেবেলায় যখন জানার আগ্রহে নানা পত্রপত্রিকা পড়তে শুরু করেছিলাম, তখন থেকেই জেনে এসেছি এই মহাতীর্থ শক্তিপীঠের নাম। মায়ের ডাকে গতকাল শত যোজন দূর থেকেও ছুটে গিয়ে দেখে এলাম ঘন বন জঙ্গলে ঘেরা, নিরিবিলি এক আশ্রমিক পরিবেশে মায়ের ভুবনমোহিনী রূপ। পূণ্যভূমি কামাখ্যা মায়ের চরণে বসবাসরত আমরা মায়ের একান্নটি সতীপীঠের পৌরাণিক গল্প বড়দের মুখে ও নানা ভাবেই জেনে এসেছি বরাবর। পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন জেলায় আরও অনেক সতীপীঠ আছে যদিও, তারমধ্যে পূর্ব বর্ধমান জেলার দক্ষিণডিহি গ্রামের এই সিদ্ধপীঠ মহাতীর্থ অট্রহাস অন্যতম। এখানে মায়ের নিম্ন অধর পতিত হওয়ার জন্যই জায়গাটির নাম হয় অট্টহাস। লোকালয় থেকে দূরে নিরিবিলি নির্জন পরিবেশে মা অট্টেশ্বরী বিরাজিতা। মন্দিরের পাশে দিয়ে বয়ে চলেছে পুতঃপবিত্র ইশানীর ধারা। এখানে পঞ্চমুণ্ডির আসন আছে আর এই আসনে বসে বহু সাধক ও সাধু-সন্তগন কঠিন সাধনায় সিদ্ধি লাভ করেছেন। নানা অলৌকিক গল্পগাথা ও ঘটনার সাক্ষীও এই জাগ্রত সতীপীঠ। শোনা যায়,অতি প্রাচীনকালে এখানে নরবলিও হতো।
পৌরাণিক কথা অনুসারে আমরা সকলেই জানি,তখন উন্মত্ত মহেশ্বর,কম্পিতা ধরিত্রী। চঞ্চল নারায়ণ। দক্ষযজ্ঞস্থলে শিবনিন্দা সইতে না পেরে প্রাণ ত্যাগ করেছেন শিবজায়া সতী। সতীর দেহ কাঁধে নিয়ে তাণ্ডব নৃত্য শুরু করলেন মহাদেব। থরথর করে কেঁপে উঠল ত্রিভুবন। " জাগো সতী জাগো " ধ্বনি তুলে ছুটে চলেছেন মহাদেব। মহেশ্বরের পদক্ষেপে স্বর্গ-মর্ত পাতাল আন্দোলিত। চঞ্চল বিষ্ণু নিক্ষেপ করলেন সুদর্শন চক্র। আদেশ দিলেন সতীদেহ খণ্ড খণ্ড করে ধরিত্রীর বুকে ছড়িয়ে দিতে। বিষ্ণু আজ্ঞায় সুদর্শন চক্র সতীদেহ একান্ন খণ্ডে খণ্ডিত করে ছুটন্ত মহেশ্বরের কাঁধ থেকে ধরিত্রীর বুকে বিভিন্ন স্থানে পতিত করলেন। একসময় মহাশূন্যে শূন্য হাতে থমকে দাঁড়ালেন ব্যোমভোলা। সামনে এসে দাঁড়ালেন শ্রীহরি। মহেশ্বরকে শান্ত করতে সতী দেহের একান্নটি খণ্ড একান্নটি পীঠ হিসাবে ঘোষণা করলেন বিষ্ণু। সঙ্গে প্রতিপীঠের যোজন মধ্যে ভৈরবের বেশে স্থান হলো শিবলিঙ্গ রূপে মহেশ্বরের। সেদিনের সেই একান্নপীঠের একটি পীঠ হলো এই অট্টহাস। যেখানে দেবীর অধঃওষ্ঠ পড়েছিল। এখানে দেবীর নাম অট্টেশ্বরী। ভৈরব হলেন বিশ্বেশ। এরপর আবার এল নটরাজের চরণে পুনঃ গতির ছন্দ। সেই ছন্দে প্রবাহিত হয়ে চলেছে কাল। কালের বুকে ঘটে যাওয়া ঘটনা একদিন ইতিহাস হয়ে যায়। সতীর দেহত্যাগের ঘটনাও আজ ইতিহাস। কিন্তু ইতিহাসের হাত ধরে সভ্য যুগের মানুষ এক এক করে আবিষ্কার করে সেই একান্নটি পীঠস্থান। তৈরি করে দুর্গমতা কাটিয়ে রাস্তা ঘাট। মহাতীর্থ অট্টহাস সতীপীঠে যাওয়াও আগে দুর্গম ছিল। কিন্তু এখন ঝোঁপ-ঝাড়,বন- জঙ্গল কেটে এই মহাপীঠের ভেতরে পৌঁছে গেছে কংক্রিটের পাকা রাস্তা। ছুটে চলেছে বাস,গাড়ি সহ নানা যানবাহন।
এবার এখানে যদিও পৌষের কোলে শীত ঘুমিয়ে আছে তবু আলতো শীতের আমেজ গায়ে মেখে আমরা কেতু গ্রাম পেরিয়ে, ক্ষীরাগ্রাম পেরিয়ে, পথের দুপাশে সারি বেঁধে সেজে ওঠা প্রকাণ্ড সব তরুশাখে ছাওয়া নির্জন ছায়াপথ মাড়িয়ে, দিগন্ত রেখায় মিশে যাওয়া তেপান্তরের মাঠ পেরিয়ে,ইশানীর সেতু পেরিয়ে, কৃষিজীবী গাঁ-এর নিকানো দাওয়ার পাশের পথ দিয়ে নিরোল গ্রামের অনতিদূরে পৌঁছে গেলাম দক্ষিণডিহি গ্রামের সতীপীঠের প্রবেশদ্বারে। যেখানে আকাশ ছুঁয়া উচ্চতার মহাদেব সতীদেহ কাঁধে নিয়ে ছুটে চলেছেন ত্রিভুবন কাঁপিয়ে। প্রাণ ভরে দর্শন করলাম মায়ের মূল মন্দির, ভোলা বাবার সমাধি,পঞ্চমুণ্ডির আসন,রটন্তী কালী মন্দির ( পূর্বে নাম ছিল ডাকাত কালীর মন্দির), সতী ঝিল সহ সতী ঝিলের দক্ষিণ পারের যজ্ঞ কুন্ডের ঢিপি। মন্দিরের দাওয়ায় বসে দেখলাম অক্ষয় বটবৃক্ষ ও মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে নয়ন জুড়িয়ে দর্শন করলাম দেবীর ভৈরব বিশ্বেশের নয়নলোভন রূপ। এরপর মায়ের ভোগ হয়ে গেলে ভোগের অন্নপ্রসাদে পরম তৃপ্তিতে দুপুরের আহার সেরে পড়ন্ত বেলায় ছুটে চললাম দিদিদের আবাসনের দিকে...জয় মা অট্টেশ্বরী