ভারতের নারী শিক্ষা ও ভগিনী নিবেদিতা
মার্গারেট এলিজাবেথ নোবেল ,স্বামী বিবেকানন্দের সাক্ষাতই জীবনের সর্বশ্রেষ্ঠ ঘটনা । জীবনের নতুন অধ্যায় শুরু। যার গতি ও পরিণতি অত্যন্ত অপ্রত্যাশিত ও অভাবিত ।অখন্ড ভারতের জন্য নিবেদিতপ্রাণ । আপামর ভারতবাসীর ভগিণী নিবেদিতা । অসামান্য প্রতিভার অধিকারী ।এই বিদেশী নারী সূদূর উত্তর আয়ারল্যান্ডের অধিবাসী । ভারত পথিক বিবেকানন্দ সংস্পর্শে এসে ভারতকে নিজের দেশ ও ভারতবাসী কে আপনজন রূপে গ্রহণ করেন ।পরাধীন ভারতের দৈন্যদশা তাঁকে অত্যন্ত ব্যথিত করে । তাই স্বামী বিবেকানন্দের আদেশ অনুসারে ভারতের নারী জাতি ও তাদের শিক্ষার দায়িত্বভার গ্রহণে উদ্যোগী হন ।কারণ নারী ও নিম্ন শ্রেণীর উন্নতি ছাড়া ভারতের জাতীয় জীবনের পুনরুদ্ধার সম্ভব নয়। ভগিনী নিবেদিতা মনে করেন শুধুমাত্র ইংরেজি লিখতে ও পড়তে পারাই শিক্ষা নয় । মানুষ হওয়ার শিক্ষা লাভ করতে হবে । তাই 1898 খ্রিস্টাব্দে নভেম্বর মাসে স্বামীজীর পরিকল্পনা অনুসারে বাগবাজার অঞ্চলে একটি বালিকা বিদ্যালয় স্থাপন করেন। সেখানে ছাত্রীদের লেখাপড়ার দায়িত্ব ভগিণী নিবেদিতা নিজেই নেন । তিনি মনে করতেন এমন একটি শিক্ষা ব্যবস্থা আবিষ্কার করা প্রয়োজন যা ভারতের নারী সমাজকে আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত করে তুলতে সমর্থ হবে । তিনি চাইতেন অতি সাধারণভাবে নিজে একাই মেয়েদের শিক্ষা দান করবেন । ছোট ছোট মেয়েদের যেভাবে বানান শেখানো হয় তিনিও সেইভাবেই শিক্ষা প্রণালী কে সাজিয়ে নেন । তার শিক্ষার মধ্যে একটা আধ্যাত্মিক ভাব ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির ভাব উপলব্ধ করা যায় । জাত পাতের ভেদাভেদ কুসংস্কারের বেড়াজাল থেকে মুক্ত হয়ে তিনি কয়েকজন ছাত্রী নিয়ে নিজের বিদ্যালয় এর কাজ শুরু করেন । তাঁর বিদ্যালয় এর কাজে সারদা মায়ের অফুরন্ত অবদান ও স্নেহের স্পর্শে তাকে আরো কর্মমুখী করে তোলে। বিদ্যালয় এর খরচের জন্য কাশ্মীরের মহারাজা আটহাজার ( 8000 )টাকা দান করেন ।নিবেদিতা বাড়ি বাড়ি গিয়ে অভিভাবকদের বুঝিয়ে ছোট ছোট মেয়েদের স্কুলে নিয়ে আসতেন ।
তিনি একজন অভিজ্ঞ শিক্ষিকা ছিলেন। বিভিন্ন পদ্ধতিতে খেলার ছলে তিনি শিক্ষাদান করতেন । বিদ্যালয়ে মেয়েদের ছবি আঁকা , মাটি দিয়ে মূর্তি গড়া , সেলাইয়ের কাজ, ঘর গেরস্থালির কাজ, বৈদিক আচার আচরণ , পূজা-অর্চনা মানব সেবা, রোগীর শুশ্রূষা ইত্যাদি বিভিন্ন কাজ শেখাতেন এবং নানাভাবে তাদেরকে উৎসাহিত করতেন । ক্লাশে নানা বিষয়ে তাদের গল্প বলতেন । গল্পের মাধ্যমে পাঠ্য বিষয়বস্তু কে আকর্ষণীয় করে তুলতেন । যাতে মেয়েরা পড়াশোনায় মনোযোগী হয়ে ওঠে বিদ্যালয়- কাজে নিবেদিতার অদম্য উৎসাহ ছিল । কিন্তু তাকে স্থায়ী ও হিতকর করে তুলবার জন্য অর্থের প্রয়োজন ছিল । ছিল কিছু নারীর । যারা বিদ্যালয় এর জন্য জীবন উৎসর্গ করতে প্রস্তুত থাকবে ।তখনকার হিন্দু সমাজে কোন কুমারী কন্যার পক্ষে এ কাজ অসম্ভব ছিল । তাই যারা বাল্যবিধবা বিশেষত পিতৃ-মাতৃহীন বালিকা গনকে যথাযথ শিক্ষা দিয়ে মহৎ উদ্দেশ্যকে সফল করার পরিকল্পনা নেন। কর্মক্ষেত্রই গৃহ এবং ধর্মই একমাত্র বন্ধন হবে । তাদের ভালোবাসা থাকবে কেবল গুরু , স্বদেশ ও জনসাধারণের প্রতি, কিন্তু তার জন্য অর্থের প্রয়োজন ছিল । তাই নিবেদিতা বিদেশে পাড়ি দেন অর্থেের জন্য। ,প্রত্যাবর্তনের পর বিদ্যালয়টিকে পুনর্গঠন এর উদ্যোগ নেন । সেই সময় স্বামীজির তিরোধানে তাঁর চিত্ত অশান্ত থাকায় ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে ছুটে বেড়ান । পরবর্তী সময়ে নিজেকে শান্ত করে , স্বামীজি নারী শিক্ষার উন্নতি কল্পে যে সকল পরিকল্পনা ছিল তা বাস্তবায়নে মনোযোগী হোন । এর জন্য শিক্ষয়িত্রী নিয়োগ করেন । 1902সালে সরস্বতী পূজা অনুষ্ঠানের পর বাগবাজার অঞ্চল এর ছাত্রীরা বিদ্যালয়ে পুনরায় আসতে শুরু করে । সেইসময় বিদ্যালয়ে পড়াশোনার জন্য নির্দিষ্ট পাঠ্যপুস্তক ছিল না ।কিন্ডারগার্ডেন প্রণালীতে মুখে মুখে শিক্ষাদানের রীতি ছিল। সেলাই ছবিআঁকা ,খেেলা ধুলাই ছিল প্রধান ।
নিবেদিতা ছিলেন একজন আদর্শ শিক্ষাবিদ । তিনি প্রত্যেক ছাত্রীদের পর্যবেক্ষণ করতেন এবং তাদের সম্বন্ধে বিভিন্ন রিপোর্ট তৈরি করতেন ।তখন বিদ্যালয়ের ছাত্রী সংখ্যা ছিল 45 জন ।তিনি ছাত্রীদের বিবরণ, পড়াশোনা , উপস্থিতি প্রভৃতি বিষয় নিয়ে রিপোর্ট লিখতেন ,এতে অতি অল্প সময়ে ছাত্রীদের সঙ্গে তার সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ হয়ে উঠতে। পড়তে আসার বাইরে ও ছাত্রীরা নিবেদিতার কাছে আসত বা রাস্তায় দেখা হলে তার কাছে ছুটে যেত। তিনিও তাদের কাছে ডেকে আদর করতেন । এই ছোট ছোট মেয়েদের কাছ থেকে তিনি বাংলা শিখে নিতেন । খুব কম ছাত্রী বিদ্যালয়ে আসতো । অভিভাবকরা তাদের লেখাপড়ার কোন খোঁজ খবর নিতেন না । এতে নিবেদিতা খুব দুঃখবোধ করতেন । আবার দেখা যেত বুদ্ধিমতী ও পাঠে মনোযোগী কোন কোন ছাত্রীর কিছুদিন পরেই বিয়ে হয়ে যাচ্ছে ।এতে তিনি হতাশ হয়ে পড়তেন । তখন বাল্য বিবাহ প্রথা কে রোধ করা প্রায় অসম্ভব ছিল । তাই তিনি ঠিক করলেন এবার অন্তঃপুরিকা গণের শিক্ষার ব্যবস্থা করবেন । বক্তিৃতা দেওয়ার জন্য যেখানেই গেছেন তিনি মহিলা সভাই বেশি বক্তৃতা দিতেন এবং তাদের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপনে আগ্রহ প্রকাশ করতেন । এর প্রধান উদ্দেশ্য নারী শিক্ষা এবং ভারতের প্রাচীন ঐতিহ্যকে স্মরণ করিয়ে তাদের দায়িত্ব পালনে সচেতন করা ।তিনি তাঁর বিভিন্ন পুস্তকেও ভারতের প্রাচীন ঐতিহ্যকে তুলে ধরেন।
। তিনি নিজ গৃহে চন্ডী পাঠের আয়োজন করেন এবং বাড়ি বাড়ি গিয়ে মহিলাদের নিমন্ত্রণ করে আসেন । তাদের সান্নিধ্য নিবেদিতা কে উৎসাহিত করে তুলতো ।এই ভাবে তিনি সকলের প্রিয় হয়ে ওঠেন এবং বিভিন্ন ভাবে মহিলাদের স্বয়ংসম্পূর্ণ হওয়ার প্রেরণা যোগান ।তাদের একটা শিক্ষা ব্যবস্থার জন্য পরিকল্পনা গ্রহণকরেন । তিনি বয়স্ক মহিলাদের জন্য আলাদা বিদ্যালয় স্থাপন করেন ।
নিবেদিতার বিদ্যালয়ের ছাত্রীরা প্রাচীনপন্থী পরিবারের কন্যা , বধূ । কাজেই পর্দা প্রথা অক্ষুন্ন রেখেই বিদ্যালয়ে যাতায়াতের জন্য গাড়ির ব্যবস্থা ছিল ।এভাবে তার বিদ্যালয়ে বিধবা ও বিবাহিত মহিলারা সহজে শিক্ষার সুযোগ পান এবং অভিভাবকরা ও নিবেদিতার বিদ্যালয় এর উদ্দেশ্য যে হিন্দু সংস্কৃতি ও রীতিনীতি অনুযায়ী পরিচালিত এ ব্যাপারে নিশ্চিত হন ।
ভগিণী নিবেদিতা বিদ্যালয়টি বর্ধিত হয়ে বহু সংখ্যক শিক্ষার্থী শিক্ষাগ্রহণের সুযোগ লাভ করে । তিনি নিজে আলাদাভাবে বিদ্যালয়ে শিক্ষয়িত্রীর কিন্ডারগার্ডেন ট্রেনিং দিতেন ।বিদ্যালয় সেলাই ও অংকনের ক্লাস নিতেন ।ইতিহাস ও ইংরেজি পড়াতেন । প্রতিদিন বিদ্যালয় আরম্ভ হওয়ার পূর্বে বালিকারা ঠাকুরদালানে রামকৃষ্ণের প্রতিকৃতিতে পুষ্পাঞ্জলি প্রদান করত , প্রণাম পূর্বক সমবেত কণ্ঠে নানাবিধ স্তব পাঠ এর সহিত বন্দে মাতরম গানটি গাইত।বিদ্যালয়ের নির্দিষ্ট নাম ছিল না । স্থানীয় লোকেরা সিস্টার নিবেদিতা স্কুল বলতো । নিবেদিতা রামকৃষ্ণ গার্লস স্কুল নামে নাম দেন । কেউ কেউ বিবেকানন্দ স্কুল বলতেন ।নিবেদিতা দেহত্যাগের পর বিদ্যালয় এর নাম হয় শ্রী রামকৃষ্ণ মিশন সিস্টার নিবেদিতা গার্লস স্কুল ।