Jul 31, 2023

সুজন দেবনাথ

হয় খরচ নে, না হয় দশ টাকা দে

রতন এই প্রথম ত্রিপুরার বাইরে বেরোলো। তাই বাইরের পরিবেশ পরিস্থিতি তার কাছে সম্পূর্ণ অপরিচিত। আগরতলা থেকে ট্রেনেই তার যাত্রা কোলকাতার উদ্দেশ্যে। অল্প টাকায় স্লিপারেই টিকিট কাটলো সে। ভাবলো বাহারি মানুষের ভিড়ে তার দীর্ঘ সময় জার্নির বোরিংন্যাস টা কাটিয়ে অনায়াসে সে গন্তব্যে পৌঁছে যাবে। কিন্তু ব্যাপারটা যে আসলে এতো সহজ নয় সেটা তার বোধের অগম্য। 

পথে যেতে যেতে সে দেখলো হাজার মানুষের ট্রেনে উঠানামার ভীড়। স্থানে স্থানে উঠছে কতো ফেরিওয়ালা, ওরা ফেরি করছে আবার নেমে পড়ছে। কতো বাউল গান শুনিয়ে ভিক্ষে করছে, কতো গরীব দুঃখী নিঃসংকোচে ধনীর কাছে হাত পাতছে। কেউ কানাকড়িতে সন্তুষ্ট করছে, আবার কেউবা নেই বলে খালিহাতেও ফিরিয়ে দিচ্ছে। রাস্তার অসহায়দের সাহায্য করা রতনের দীর্ঘদিনের সাধ। তাই সে বাড়ি থেকে বেরোনোর সময় কিছু খুচরা পয়সা সঙ্গে নিয়েছিলো এবং যথাসাধ্য চেষ্টা করলো কাউকে খালি হাতে না ফিরাতে। কিন্তু সবাই যে ভিখারী ঠিক তা নয়। নানান অঙ্গ ভঙ্গিতে হাত পাতাও কিছু মানুষের পেশা। আর ট্রেনে বসেই রতনের চোখে এক এক করে ফুটে উঠল বহুরূপী মানুষের বহু চিত্র। চোখের সামনে কতো মিথ্যেরা সত্যি হয়ে যায় তা এই যাত্রাতেই রতনের দারুণ অভিজ্ঞতা।

মাঝপথে একটা স্টেশন থেকে হঠাৎ একদল হিজড়ে ট্রেনে উঠেই মানুষকে দে দে বলে জোর করতে লাগলো। রতন ওদের খুব ভয় পায়। ওরা নাকি কথায় কথায় অভিশাপ দেয় এবং তা নাকি ফলেও। একজন ক্রমশ চাঁদা তুলতে তুলতে রতনের দিকে এগুচ্ছে। কিন্তু উনার চাঁদা তোলার ধরন টা অন্যরকম। যখনই কেউ চাঁদা না দেয় অমনি নির্লজ্জের মতো পড়নের কাপড় টা উপুড় করে বয়স ভেদে সকলকে দেখাচ্ছে! এই নোংরামী টা রতনের মোটেই ভালো লাগেনি। লোকটি ধীরে ধীরে রতনের সামনে এসে দে বলে হাত বাড়িয়ে দিলো। রতন পরিস্কার জানিয়ে দিলো দেবোনা। 'তবে দ্যাখ আমি কি' বলে যেইমাত্র নির্লজ্জের মতো পুনঃ একই আচরণ করতে যাবে, অমনি রতন বলে উঠলো দাঁড়াও! বহুক্ষণ ধরে দেখছি তুমি একই আচরণ করছো, এটাই কি তোমার ব্যবসার কায়দা? তুমি অন্য কোনো কাজ করতে পারোনা? উনি বললেন কি করবো বল, আমায় যে কেউ কাজ দেয়না, তাই বাধ্য হই! তুই বল আমাদের কি পেট নেই? আমরা না খেয়ে বাঁচি?

রতনের নরম মনটা মুহূর্তে কেঁদে উঠলো। সে লোকটাকে বললো, আমি তোমায় একটা কাজ দেবো, তুমি করবে? সে বললো নিশ্চয়ই। সঙ্গে সঙ্গে ছেলেটা লোকটার হাত ধরে যাত্রীদের কাছে নম্র ভদ্র ভাবে চাঁদা তুলতে শুরু করলো এবং একহাজার টাকা তুলে উনার হাতে তুলে দিয়ে বললো এই টাকা দিয়ে কিছু বুট বাদাম আর চকোলেট কিনে তুমি ট্রেনেই বেঁচাকেনা করো। উনি বললো 'আমি একজন হিজড়া' কেউ আমার থেকে খরচ করবে না। তখন রতন ওকে বললো, তাহলে ব্যবসার কায়দা তো তোমার জানাই আছে, হয় খরচ নে, না হয় দশ টাকা দে……।