পেটের দায়
চমককে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। কালরাতেও গেট বন্ধ করেছে। সকাল আটটা বেজে গেলেও গেট খোলেনি দেখে একে একে সকলে নেমে এসে খোঁজ করে চমকের। হঠাত করে নেই হয়ে গেল জলজ্যান্ত একটি ছেলে। চিন্তার জট পাকানো স্বাভাবিক।
লুকিয়ে লুকিয়ে টাকা গুনছিল চমক। আজ তার বেতন হয়েছে । বয়েস কত আর হবে বড় জোর উনিশ। দাঁড়িগোফ গজায়নি ভালো করে। তাই দেখলে বয়সের তুলনায় ছোটই দেখায়। সংসারের দায়িত্ব কাঁধে পড়লে অভিজ্ঞতা বয়স থেকে বড় করে তুলে। চমক স্কুলের ছাত্র ছিল যখন ওর দাদা বলীন কৃষ্ণ এপার্টমেন্টের সিকিউরিটি পদে যোগ দেয়। একেবারে শুরুতে দাদা বলীন বাড়িতে গেলে চমক এসে দাদার ডিউটি করে দিত। শহরে টাকা ধরতে জানতে হয় । বলীন মশার কয়েল কোম্পানিতে যোগ দেওয়ায় চমক চলে এল সিকিউরিটি হিসেবে।
যে অর্থে সিকিউরিটি বোঝা যায় তেমনটা নয় এখানে। জলের সুইচ দিয়ে খেয়াল রাখতে হয় যাতে ওভারফ্লো না হয়, দুটো গাড়ি অফিসটাইমে বেরোয় বিকেলে ফিরে আসে, তখন গেট খুলে দেয় সে আর একদিন পরপর সকালে সিঁড়ি ঝাঁট দিতে বলা হয়েছে।রেসিডেন্সিয়াল এরিয়ার কৃষ্ণ এপার্টমেন্টের বারঘর আবাসিকদের সকলের আপনজন চমক। সন্তান স্নেহে সিক্ত সে। ম্যাগি, চিপস্, একপিস পিৎজা ছাড়াও বাটি করে মাছের ঝোল বা মাংস ইত্যাদি প্রায় প্রতিদিন চলে আসে কারও না কারও বাড়ি থেকে ।
ভীষণ ঘুমকাতুরে ছেলে চমক। আটটা অব্দি নিরলস ঘুমিয়ে থাকে । বলে কয়ে লাভ হয়নি। হকার পেপার নিয়ে গেটে দুমদাম শব্দ করে, কাজের মাসিরা গজগজ করতে থাকে। চমকের সেসব পৌঁছয় না। গেটের বিপরীতে থাকা মুদি দোকানীরা চেয়ে থাকে। অগত্যা আবাসিকদের মধ্যে ম্যাডাম দিদি দায়িত্ব নিয়েছেন সকালবেলা গেট খোলার। এক এক করে সিঁড়ির ও পার্কিংয়ের লাইটগুলো অফ করে গেটের তালা খুলে দেন তিনি ।
প্রান্তিক গ্রামে ছেলেটির বড় হয়ে ওঠার করুণাসিক্ত কাহিনি আবাসিকরা সকলেই জানে। চার-পাঁচটা গ্রামের জন্য একটিই স্কুল বরাদ্দ। শিক্ষকরা শহর থেকে গিয়ে পাঠদান করেন। রাস্তাঘাট ভালো ছিল না,। সারাদিনে দু-তিনটি বাস ও ম্যাটাডর দেখা যেত। শিক্ষকদের উপস্থিতির উপর নির্ভর করত ক্লাসের সংখ্যা। শিক্ষকদেরকে ফিরে যেতে হবে বলে সময়ের আগে ছুটি হয়ে যেত কখনো কখনো। এহেন স্কুল থেকে ম্যাট্রিক পাস করে কলেজে পড়ার কোন ইচ্ছে বা তাগাদে কোনটাই নেই চমকের। তিনভাই একবোনের সংসারে চমক মেজ। অভাব অনটন নিত্যসঙ্গী। বাবার একফালি জমি রয়েছে কিন্তু পুরো পরিবারের ভরণপোষণের পক্ষে যথেষ্ট নয়। তাই মাঝেমাঝেই হাজিরা কাজ করতে বাধ্য। বলীন আর চমক পেটের দায়ে বাড়ি ছাড়া।
বলীন মশামারা কয়েলের কারখানায় কাজ করে। মাসকাবারি বেতন ভালো দেয়। সিফটিং ডিউটিতে রাত্তিরেও ডিউটি পড়ে। সেরকম সময় ভাই চমককে দেখতে এসে বলীন সারাদিন ঘুমোয়। অনেক দায়িত্ব বলীনের। বাবার শরীর ভালো থাকে না। মা ও বোন ঘর-কন্নার কাজ সামলে নেয়। বিকেলে বাড়ির সামনে পান-তামুল-গুটখা-চিপস-গুটখা-চিপস টেবিলে নিয়ে দোকান সাজায় বলীনের মা। আজকাল নারী সবলীকরনে সরকার যথেষ্ট তৎপর। বলীন আলোচনা করে সেসব জেনে নিয়ে সরকারি সুযোগ সুবিধা করে দিয়েছে মাকে। প্রতি মাসে নিয়ম করে বলীন গ্রামে যায়। যেতে হয়। মরমী, ওর ভালোবাসা, প্রতিজ্ঞা করিয়েছে। মাসে একদিনের জন্য হলেও আসতে হবে বলীনকে। কথা রাখে বলীন।
ম্যাডাম দিদিকে সমীহ করে বলীন। গুগল পে করে গ্রামে টাকা পাঠাতে ম্যাডাম দিদিই ভরসা। সেদিনটিতে সুখ-দুঃখের গল্প করে বলে টাকা না পাঠালে বাড়ির সবাই কষ্ট পাবে। কথা হল বেশির ভাগ টাকা বাড়িতে পাঠিয়ে দিয়ে কম টাকায় কেমন করে চলবে বলীন। শহরে সবকিছুই মহার্ঘ। বলীন বলে যায়, এখানে সবাই ওকে খুব স্নেহ করে। একটু চাল ফুটিয়ে নিলেই হয়ে যায়। এসবই করোনা কালের কথা। তুলনায় চমক অনেকটাই বালকসুলভ। খুব মেঘলা দিনে অথবা খুব ঠাণ্ডায় ছেলেটি একা বসে থাকে দরজার সামনে। কেমন যেন বেদনা বিধুর দৃশ্য। আবাসিকরা আসা যাওয়ার সময় দেখে পার্কিঙে বসে থাকা চমককে। গল্প করার মত তেমন বিশেষ কোন কথা থাকে না। তার অনুরোধে বলীনকে বলা হল সাধ্যমত একটি স্মার্টফোন কিনে দিলে ভাইটির একাকিত্ব ঘুচবে।
করোনার প্রকোপ কমছিল, এমন এক বিকেলে চমকের চোখেমুখে খুশির ঝিলিক। হাতে একটি স্মার্ট ফোন। যাক, অবসর সময়টুকু ভালো কাটবে তার। কিন্তু হিতে বিপরীত হল। ফোন পাবার পর চমকের ঘুম ভাঙে না সকালে। রাতে গেম খেলার কথা অবলীলায় বলে। বয়েসটাও নিদারুণ ঝক্কির। আলসেমিতে ঝাড়ু হাতে নিতে অনীহা। বাড়তি কিছু দিলে সাহায্য করে দেয়। ইতিউতি মেদ জমছে শরীরে। রান্না করতে তেমন দেখা যায় না। সারাক্ষণ হাতে সবপেয়েছির দেশ আর মুখে গুটখা ভরা। একদিন দেখা গেল পাগলের মত একা একা কথা বলছে সে। পরে জানা গেল কানে ব্লু টুথ লাগিয়ে রাখে । দায়িত্বহীন দায়িত্বরক্ষী নিয়ে চলে যাচ্ছিল বেশ। সন্তানস্নেহে বেতনভুক চমক ছিল নিজের মত করে।
দারুণ রকমের সংসারী ছেলে চমক। যে বয়সে ছেলেরা আনন্দোৎসবে খরচ করে দেদার, সেরকম সময়গুলোতে সংসার চালাতে সাহায্য করে সে বাবাকে। দারিদ্র্য মানুষকে অভিজ্ঞপুষ্ট করে তোলে। বাড়তি দুটো পয়সা আয়ের উৎস সন্ধানে কাজ খোঁজে চমক। পাড়ায় ট্রাকে করে জিনিসপত্র আসে, সেমত কারো মতামত না নিয়ে কথা বলে রাখে সে । মুশকিল হল আবাসিকদের কাজে বেরনোর সময় সেটা, অগত্যা হলনা । গ্রামে পাঠানোর জন্য প্রয়োজনীয় জিনিস কিনে রাখে একটু একটু করে। বাড়ি যাবার সময় বিশালবপু ব্যাগ নিয়ে যায়।
এহেন চমক একদিন উধাও হয়ে গেল কাউকে কিছু না জানিয়ে। তখন গরমের বন্ধ চলছে। দেরি করে জানাজানি হল আবাসিকদের মধ্যে । ঘর খোলা সম্ভব হচ্ছে না কারণ চাবি নিয়ে চলে গেছে। কেউ বলল পুলিশে খবর দিতে, কেউ আবার সাবধান বাণী শোনায়। কমবয়েসী ছেলেকে সিকিউরিটি পদে রাখার দায়ে কুকথা শুনতে হবে হয়তো। জল্পনার পঙ্খীরাজ ডানা মেলে। কি হবে, যদি মন্দ কিছু ঘটায়!! বিকেলে অফিস ফেরতাদের সবার উপস্থিতিতে তালা ভাঙা হলে দেখা গেল সব জিনিস হাপিস। খুদে ছেলের চালাকির কাছে পরিণত বয়সীরা হেরে গেল! "আড়া কাটা তোতা, বুঝলে" বলে উঠলেন প্রেসিডেন্ট, "যতই আদর দাও, সে বাঁধন কেটে পালাবেই"। রাগের চোটে অনেক কথাই বেরিয়ে পড়ছে নানাজনের মুখ থেকে। এমন সময় প্রেসিডেন্টের ফোন বেজে উঠল। অপরিচিত নম্বর। ট্রু কলার দেখে তিনি বললেন হ্যালো.........।
সমস্ত আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু সেই ফোনকল। হতবাক আবাসিকরা অনুভব করে পেটের দায় বড় দায়।