Jul 31, 2023

সূত্রা সরকার সাহা

 মনে পড়ে সেই দিন

১।

আড়াইডাঙ্গা গোবরজনা কালী মন্দির।পাশ দিয়ে বয়ে চলেছে কালিন্দ্রী নদী। চারিদিকে আমবাগান।বট,পাকুড়, আরো অন্যান্য গাছ দিয়ে মায়ের মন্দির ঘেরা। 'মা ' এর মন্দিরে বসলে প্রাণ জুড়িয়ে যায়।পাশ দিয়ে কালিন্দ্রী নদী বয়ে চলেছে আপন খেয়ালে।পাখি তার কলকাকলিতে ভরিয়ে রেখেছে মন্দির প্রাঙ্গণ।নির্জন এলাকা । দিনের বেলা যেতেই গা ছমছম করে। আমরা মায়ের মন্দিরে মা বাবা আত্মীয় স্বজনের সাথে পূজো দিতে যেতাম। বাবার সাথে বিকেলে নদীর ধারে গিয়ে বসতাম। আমি তখন খুব ছোট। সন্ধ্যেবেলা সূর্যদেব অস্ত যাচ্ছেন। নদীর জলে তার লাল রঙ ছড়িয়ে দিয়েছেন। সন্ধ্যেবেলায় পাখি তার আপন কুলায় ফিরছে। চারিদিকে ধ্বনিত হচ্ছে পাখির কুজন। টিয়া,গাঙশালিক নদীর পাড়ে মাটির গর্তে একবার ঢুকছে আর একবার বেড়োচ্ছে। ছোটবেলার স্মৃতি আজও গাঁথা রয়েছে মনে। জাগ্রত মায়ের মন্দির।মাগো লেখনীছলে তোমায় প্রণাম

২। 

এখনো সেই মন্দির রয়েছে।বাবা কর্মসূত্রে সেখানে থাকতেন। আমার ছোটবেলা কেটেছে সেখানে।দেবী এখানে সারা বছর পূজিতা। কালীপুজোর দিন সারারাত মায়ের মন্দিরে পাঁঠা বলি ও পূজো হয় । প্রচুর পাঁঠা বলি,মোষ বলি অর্থাৎ পাঁরা বলি বলে সেটাও হয়। পায়রাও। শশ্মান কালী। একবার মন্দিরে আমার মায়ের সাথে বসে রয়েছি।কাকু চাকুরি পেয়েছে। তাই মানত মায়ের মন্দিরে পাঁঠা বলি দেওয়া হবে। সেই উদ্দেশ্যে আমরা সেখানে গেছি। দূরে একটি গরুর গাড়িতে পুরুষ মানুষ শুয়ে রয়েছেন নির্বিকার অবস্থায়। মন্দিরে পুরোহিত রয়েছেন মায়ের কাঠামোর সামনে। আমাদের পাশে একজন মহিলা ও বসে রয়েছেন।এই ত্রিশ বত্রিশ বয়স হবে। শীর্ণকায় শরীর। কালো কুচকুচে চুল ছাড়া। কোঁকড়ানো চুলের কিছু অংশ পিঠের উপর ছড়িয়ে পড়েছে। আমার নিজের চোখে দেখা----পুরোহিত মহাশয় মায়ের হাতের জবাফুল মহিলার হাতে দিলেন। মহিলা কোলে দুই হাত নিয়ে বসে রয়েছেন। আবার রাঙা জবা তার হাতে দেওয়া মাত্রই মহিলা শিস্ দিতে থাকলেন ঘণ্টার পর ঘণ্টা।আর মাথা নাড়াতে থাকেন। পুরোহিত মহাশয় জিজ্ঞাসা করছেন আপনি কে? বলুন। উনি শুধু মাথা নাড়িয়ে যাচ্ছেন। আমরা সকলে হতবাক। আমি ছোট। তাই কৌতুহল, পাশাপাশি ভয় দুটোই মনের মধ্যে চলছে। একটু দূরে দাদুকে গিয়ে প্রশ্ন করি--- দাদু কি হয়েছে?দাদু বলেন দেখ কি হয়? এদিকে পুরোহিত মহাশয় বলেই চলেছেন----আপনি কে? হঠাৎ মহিলা বলে ওঠেন নাকে সুরে আমি "নারা"। তোর বংশে বাতি দিতে রাখবো না। অর্থাৎ কেউ বেঁচে থাকবে না।বলছে আর শিস্ দিয়ে চলেছে। দাদুকে জিজ্ঞেস করি -দাদু নারা কে? দাদু বলেন "নরসিংহ"উনাকে ধরেছেন।এই টুকুই মনে আছে।----এরপর কি হয়েছে জানা নেই।তবে তখনই জানতে পেরেছিলাম মহিলার কেউই বেঁচে নেই। শুধু ওই স্বামী রয়েছেন। এখন উনি ও মৃত্যু শয্যায়। দুপুরবেলায় নাকি চুল ছেড়ে থাকতে নেই।ডাক্তার রা তার স্বামীর অসুখ সারাতে পারছেন না। তাই মায়ের মন্দিরে উনাকে নিয়ে আসা হয়েছে। ঘটনাটি উল্লেখ করলাম এই যে মায়ের প্রতি মানুষের অগাধ বিশ্বাস। উনি এসেছেন যদি তার স্বামীকে সুস্থ করে তুলতে পারেন এই আশায়।

৩। 

আমরা তিন বোন।ভাই নেই। আমার মা প্রায়ই মানত করতে আসেন এই মন্দিরে। একদিন আমি আর মা মায়ের কাঠামোযুক্ত মূর্তির সামনে বসে রয়েছি। হঠাৎ মায়ের কোলে একটি রাঙা জবা মা কালীর হাত থেকে পড়ে। পুরোহিত মহাশয় বলেন এটি রেখে দিন আপনার ভালো হবে। এরপর সত্যি সত্যিই আমরা ভাই পাই। শুধু তাই নয় যেদিন ভাইয়ের জন্ম হয়েছে বাবা স্বপ্নে মায়ের আদেশ পান--"যা তোর ছেলে হয়েছে কোলে নিবি না"! বাবা নাস্তিক ছিলেন। কিন্তু এই ঘটনা সত্যি হওয়ার ফলে বাবা এবং আমাদের কাছে এই মা কালী জাগ্রতা দেবী। যাইহোক বিশ্বাসে মিলায় বস্তু তর্কে বহুদূর। এরপর আমার আর এক বোন হয়। বর্তমানে আমরা চারবোন এক ভাই।

৪। 

এই মন্দিরে প্রতিবারের মতো সেইবার ও কালীপূজোর মেলা বসেছে। আমি তখন ক্লাস ফাইভে সম্ভবতঃ। সময়টা ঠিক মনে পড়ছে না। আমরা চার ভাইবোন মা ও ঠাকুরমা সকলে মিলে মেলা দেখতে গিয়েছিলাম। বাবা কিন্তু সঙ্গে নেই। মায়ের মন্দিরে মেলা বসেছে।গ্রাম্য মেলা। তার সৌন্দর্য ই আলাদা। মন্দির প্রাঙ্গণে আসতে গেলে গ্রাম থেকে অনেকটা পথ নদীর ধারে দিয়ে আসতে হয়।বড় বড় লোহার কড়াইয়ে পাঁপড়, জিলিপি ভাজা হচ্ছে।সন্দেশ,মণ্ডা,মিঠাই, নকুল দানা,গজা,বাতাসা কি না আছে। খেলনার রকমারি দোকান।চড়কি, নাগরদোলা কত কি। আমরা সকলে মেলায় আনন্দে ঘুরছি।মা পাঁপড় ভাজা কিনে দিচ্ছেন আমরা খাচ্ছি। ঠাকুরমার কোলে ভাই রয়েছে। একবারে ছোট। আমার ঠাকুরমা কানে শুনতে পেতেন না।যার জন্য খুব খারাপ অবস্থা। যাইহোক পূজো চলছে। একের পর এক পাঁঠা বলি, পায়রা ও পাঁড়া বলি। চারিদিকে উৎসব আনন্দে মাতোয়ারা। আমরাও আনন্দিত। মা আমাদের খেলনা কিনে দিচ্ছেন।বাঁশি বিক্রেতা বাঁশি বাজাচ্ছে।কেউ বাঁশি কিনছে,কেউ পাঁপড় বা জিলিপি খাচ্ছে,কেউ বা পূজো দিচ্ছে।সব মিলিয়ে আনন্দের ফোয়ারা বইছে। কুলফি আইসক্রিম কিছু বাদ নেই। নাগরদোলা,চরকি, তালপাতার সেপাই আহা কি মজা! আমরা আনন্দে ঘুরছি। এমনকি বটগাছের কোটরে কোথা থেকে একজন সাধুবাবা এসে রয়েছেন। মায়ের সাধনায় মগ্ন। তাকে দেখার জন্য লোকের ভিড়। উনি সেখানে একটি খুব ছোট বিচার থেকেও ছোট নৌকায় এসেছেন। মায়ের মাহাত্ম্য এর থেকে সহজেই অনুমেয়।

৫। 

সন্ধ্যে হয়ে এসেছে। প্রচুর লোকের সমাগম। সবাই মেলা ঘুরে দেখছে। হঠাৎ চিৎকার। মানুষ বলি পড়েছে পাঁড়া বলি দিতে গিয়ে।তুমুল উত্তেজনা।যে যেদিকে পারে ছুটে পালাচ্ছে। একদিকে পাঁপড় ভাজার কড়াইয়ে গরম তেল, লুচি ভাজার কড়াইয়ের গরম তেল, জিলিপি ভাজার --সে কি হুলুস্থুল কাণ্ড। চারিদিকে উনুন জ্বলছে।কে কোন দিকে পালাবে ঠিক করতে পারছে না। মা আমাদের হাতে হাত ধরে রয়েছেন। সাবধানে মেলা থেকে বেরিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। কিন্তু খুব কষ্টকর অবস্থা। মেলা থেকে বের হওয়া অসম্ভব হয়ে পড়েছে। ইতিমধ্যে ঠাকুরমাকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। আমরা মেলা থেকে বের হবো কি--ঠাকুরমা ও ভাইকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না।কেউ বলছেন মানুষ বলি পড়েছে,কেউ বা পাঁড়া বলি দিতে গিয়ে খুঁত পাওয়া গেছে বলি হয় নি। বিভিন্ন ধরনের কথাবার্তা। আমাদের অবস্থা শোচনীয়। ঠাকুরমা ও ভাইকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। আমরা কাঁদতে শুরু করে দিয়েছি।মা কি করবেন বুঝতে পারছেন না। সাংঘাতিক অবস্থা। চিন্তা করে কুল কিনারা পাওয়া যাচ্ছে না। ঠাকুরমা কি ভাইকে নিয়ে নদীতে পড়ে গেল না কি হলো কিছুই বোঝা যাচ্ছে না।

৬। 

মা বলেন তুই বাড়ির দিকে যা আর আমি মেলাতে দেখি। আমি নদীর ধারে দিয়ে কাঁদতে কাঁদতে সকলকে জিজ্ঞাসা করতে করতে বাড়ির দিকে ---। মায়ের মুখ শুকিয়ে গেছে। চোখে জল। এবার কি হবে?মন খারাপ নিয়ে বাড়ির পথে ---বাবা আমাদের আস্ত রাখবে না।কী ভয়াবহ অবস্থা। সবচেয়ে চিন্তার বিষয় ঠাকুরমা কানে শুনতে পান না। আমরা কী করব? শুধু মা গোবরজনাকে ডেকে চলেছি --মা করুণাময়ী আমাদের করুণা করো। কোথায় গেল ওরা? হাঁটতে হাঁটতে চারিদিকে দেখতে দেখতে বাড়ি যাচ্ছি। পথে জিজ্ঞাসা করছি কেউ দেখতে পেয়েছেন কি না। অবশেষে বাড়ি ফিরে দেখি ঠাকুরমা ও ভাই বাড়ীতে। ইতিমধ্যে মা ও এসে পৌঁছেছেন।স্বস্তির নিশ্বাস।বাবা অফিস থেকে ফিরে এসে সব শুনে হতবাক।স্বস্তির নিঃশ্বাস। সেদিন কী দুর্যোগ গেছে তা আমি ছোট হলেও বুঝতে পেরেছিলাম।আর তা আজও মনে আছে। করুণাময়ী মা গোবরজনা আমাদের করুণা করেছিলেন। জয় মা।