শ্রদ্ধাঞ্জলী
একটা সেমিনার শেষে কলকাতা থেকে আগরতলা ফিরছিলাম। ফ্লাইট লেইট ছিল,তাই লাউঞ্জে ঘন্টা দু-এক বসে আছি। একটা গল্প বইয়ের পাতায় চোখ রেখেছিলাম। হঠাৎ কানে ভেসে পরিচিত স্বর!যথারীতি একটু এদিক ওদিক তাকিয়ে বুঝে নিলাম। কথার উতসস্থল আমার সামনের রো ছেড়ে তার পরের রো।এখান থেকে যেটুকু চোখে পড়লো এক জোড়া বৃদ্ধ-বৃদ্ধা।
একজনের চকচকে টাকের চারপাশে সাদা- পাকা চুলের মাঝে কয়েকটা কালো চুল।কিছুটা যেন বলছে স্মৃতিটুকু থাক।খুব নিচু স্বরে উত্তপ্ত কিছু আলোচনা হচ্ছিল বুঝতে পারছিলাম।
(২)
এ ভাবে উঁকি-ঝুঁকি মারাটা অশোভন।তাই নিজেকে সংযত করে গল্পের বইয়ের পাতায় মন দিতে চেষ্টা করলাম। কিন্তু টুকরো টুকরো কয়েকটি শব্দ ভেসে এসে আমার কানে ঢুকছিল।তার মধ্যে আমার জন্মস্থানের নাম টা দু'বার কানে আসায় কৌতুহল বেড়েই চলল!......
কিছুহ্মন বাদে টয়লেট থেকে ফেরার সময় ভাল করে লহ্ম্য করলাম, ফ্লাইট আরও আধঘন্টা সময় চেয়ে নিল।
লাউঞ্জে বসে বসে হয়রান।তবে মন্দ নয়,শীততাপনিয়ন্ত্রিত!
হঠাৎ লাউঞ্জে একজনকে দেখে মনে হল বহু বছর পর আমার স্কুলের হ্যাড স্যার, শ্রী সৈকত বোস!স্যার কে দেখে চিনতে কয়েক সেকেন্ড সময় লেগেছিল!.....
উনার পাশের সিটটা।খালি দেখে,পাশে গিয়ে বসলাম।
লাউঞ্জে ফ্লাইটের অপেক্ষায়।
আমি পা ছুঁয়ে প্রণাম করে বললাম,----"স্যার,আমি শুভম ঘোষাল। ৯৩ 'র মাধ্যমিকের ব্যাচ,স্যার মনে পরছে?"
হাই পাওয়ার লেন্সের ভেতর থেকে দুটো ঘোলাটে চোখ আমার দিকে ফিরে তাকাল।আস্তে আস্তে চোখের দৃষ্টি উজ্জ্বল হয়ে উঠে, সারা মুখে সেই সুন্দর হাসি ছড়িয়ে পড়ল।
বললেন,----"শুভম"....ঘোষাল বাবুর ছেলে?শুনেছিলাম বড় ডাক্তার হয়েছিস!খুব নাম-ডাক হয়েছে তোর!....
শেষ কথাটায় কেমন একটা শ্লেষের সুর বেজে উঠল!....
পাশে বসা মাসিমা কে প্রণাম করে বললাম, সুজয়দার কাছে এসেছিলেন?
সুজয়দা হেড স্যারের একমাত্র ছেলে। আমার থেকে দু'বছরের সিনিয়র ছিল।বড় ইঞ্জিনিয়ার, পিটসবাগে' থাকে জানতাম। মাসিমা, হ্যাঁ বলে,মাথা নিচু করে বসেছিলেন। স্যারও গম্ভীর হয়ে গেলেন।
বললাম,----"কতদিন ছিলেন সেখানে? কোথায় কোথায় ঘুরলেন স্যার?"
----"ছিলাম প্রায় দু'মাস।ছেলে আর বৌমা খুব ব্যস্ত, তাও ঘুরিয়েছে টুকটাক।"---স্যার বললেন।
(৩)
একবার মনে হল উনারা বোধহয় কথা বলতে চাইছেন না।পাশের চেয়ার ছেড়ে অন্য কোথাও গিয়ে বসি।কিন্তু যেতে গিয়েও পারলাম না।
হেড স্যারের কাছে দীর্ঘদিন পড়েছিলাম। খুব কাছ থেকে উনাকে দেখেছিলাম। উনি ছিলেন মানুষ গড়ার কারিগর। এত সুন্দর করে সবকিছু বোঝাতেন।পড়ানো ছাড়াও অনেক কিছুই উনার কাছ থেকে শিখেছিলাম। টাকার বিনিময়ে প্রাইভেট উনি কোনদিন পড়ান নি।আমাদের চা বাগানের বস্তিগুলোতে গিয়ে সন্ধ্যাবেলায় বিনা পয়সায় অনেককে পড়াতেন।এ ছাড়া বইপত্র দিয়ে গরীব ছাত্রদের যথেষ্ট সাহায্য করতেন। কত গরীব ছাত্রের পরীক্ষার ফি দিয়ে দিতেন।
মাধ্যমিকের আগে বাবার ভীষণ শরীর খারাপ হয়েছিল। বহুদিন বাবা বিছানায় ছিল।জমানো টাকা-পয়সা সব শেষের দিকে। আমাদের এক টুকরো জমি মা বিক্রি করবে ভেবেছিল। কিন্তু স্যার, কোথা থেকে খবর পেয়ে একদিন এসে মা'কে বলে গেছেন, জমি যেন বিক্রি না করে।আমার দায়িত্ব উনি নিয়েছিলেন! কয়েক মাস উনার বাড়িতে খাওয়া -দাওয়া করে পড়াশোনা করেছিলাম। মাসিমা,নিজেদের গরুর দুধ,গাছের ফল,পুকুরের মাছ,লাউ,কুমড়ো,....শীতের সব্জি প্রায় সবই আমার হাত দিয়ে মাকে পাঠাতেন।বাবার চিকিৎসার জন্য অনেকভাবে
সাহায্য করেছিলেন।......
কোনদিন কোন ছাত্র কে বকতে বা।শাস্তি দিতে দেখিনি স্যার কে!
একবার আমার বন্ধু তরুণ কারোর টিফিন চুরি করে খেতে গিয়ে ধরা পরেছিল।
তরুণের মা চার-পাঁচ বাড়ি কাজ করে ওর পড়ার খরচ চালাতো!ও টিফিন কখনোই আনত না।স্যার, সব জানতে পেরে,তরুণকে নিজের বাড়িতে নিয়ে গিয়ে খাইয়েছিলেন।তারপর থেকে প্রায় প্রতিদিন দুপুরেই স্যারের বাড়িতে ওকে খেতে ডাকতেন মাসিমা। মাসিমার ছিল দয়ার শরীর।সব ছাত্রদের মাতৃস্নেহে ভালোবাসতেন।আমরা কখনো কোনও কাজে গেলে মাসিমার হাতে বানানো নাড়ু,সন্দেশ খেয়ে আসতাম।
সুজয়দা,পড়াশোনায় মেধাবী ছিল। পড়ানোর সময় হেড স্যার, সব'দাই বলতেন, ---দেশের সব স্কলার ছেলে মেয়েরা বাইরে চলে গেলে দেশের উন্নতি হবে কি কিরে?আজ নিজের খুব লজ্জা লাগছিল,এই কথাটা মনে হওয়ায়!
আমিও বহু বছর বাড়ির বাইরে। যদিও দেশের মাটিতে বসেই আমি চাকরি করছি।আমিও স্যারের শিক্ষায় প্রাণিত হয়ে ডাক্তারি পাশ করে প্রথম কয়েক বছর এক গ্রামীণ হাসপাতালে ছিলাম।বিনে পয়সায় চিকিৎসা করতে চেষ্টা করতাম। কিন্তু রাজনৈতিক পাটি'র দাপটে আর রুগীদের আত্মীয়দের অত্যাচারে সব নীতি বিসজ'ন দিয়ে কয়েক মাসেই পালিয়ে এসেছিলাম। তারপর বাইরে পড়তে এসে, বিদেশেই কাটিয়েছি কয়েক বছর! বাবা-মা বহু বার ফিরতে বললেও ফিরতে পারিনি!অবশেষে, বাবা মারা যাওয়ার পরই ফিরে এসেছিলাম।.....
সব মনে পরছে একে একে....!
ফ্লাইট এর সময় হয়ে গেছে।তাই প্লেনে উঠে বসলাম।একজন কে রিকোয়েষ্ট করে স্যারের পাশের সিটটাতে বসলাম।
অল্পহ্মণ পরে স্যার,আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, ---"তোর ফ্যামিলি কোথায়? একা যাচ্ছিস?"
বললাম,ওরা আগরতলা বাড়িতে আছে।
মাসিমা বললেন,----"বাঃ,ভালো।তোমার মা অন্তত বৌ-নাতি-নাতনি নিয়ে আনন্দে আছেন তাহলে।"....
মাসিমা বলে চলেছিলেন, ----"আমার ছেলেটা কি করে এতো বদলে গেল জানি না!
আমাদের বোধহয় কোথাও কোন ফাঁক ছিল!"ওনার চোখ দিয়ে কয়েকফোঁটা জল গড়িয়ে পরল!
----"আঃ,কি হচ্ছে? নিজেকে সামলাও!"--------স্যার,একটা চাপা ধমক দিলেন, যেটা উনার চরিত্রের সঙ্গে বেমানান!".....
----কেন চুপ করবো? এ ভাবে ফিরে যাচ্ছি...... ওখানে গিয়ে সবাইকে,কি বলবো বল তো?জমি বাড়িটাও বিক্রি করে দিয়ে এলে তুমি!...."সে কিছু একটা ব্যবস্থা হবেই।আগে তো পৌঁছাই!".....স্যার উত্তর দিলেন!
..
(৪)
বুঝতে পেরেছিলাম, কোথাও তাল কেটে গেছে!
বললাম, ----"স্যার, আমি আপনাদের ছেলের মত।আমাকে যদি খুলে বলেন,কি হয়েছে? যদি আমি কিছু করতে পারি......।"
তুই বাড়ি ফেরার আগেই সব জেনে যাবি।স্যার, একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন!
সুজয় আর ওর বউ বহু বছর বিদেশে। অনেক বছর পর ওদের একটি ছেলে হয়।বহুদিন ওরা বাড়ি আসে না।সুজয় আমাদের পাকাপাকি ভাবে বিদেশ চলে যেতে বলেছিল। ওরা সে দেশের গ্রীন কাড' পেয়ে গেছিল।
এতদিন আসি নি।কিন্তু নাতির ফটো দেখে তোর মাসিমা কে আর রাখতে পারলাম না।সুজয় চাইছিল,আমরা পাকাপাকি ভাবে ওর কাছে চলে যাই।ও নিজে এসে সব ব্যবস্থা করে জমি,বাড়ি সব বিক্রি করে আমাদের নিয়ে গেছিল,দু'মাস আগে।আমার ইচ্ছে ছিল না।কিন্তু এই বেকার বৃদ্ধর কথায় কেউ কান দেয়নি।এখানে এসেই বুঝলাম, ওদের আসলে বাচ্চা দেখার জন্য আয়ার দরকার ছিল।ক্রেসগুলো ছ'মাসের আগে বাচ্চা নেবে না।বৌমা,বাধ্য হয়ে আমাদের আনিয়েছিল।বাচ্চাটার ছ'মাস হতেই ওকে ক্রেশে দিয়ে আমাদের ফেরার টিকিট ধরিয়ে দিল সুজয়!
----বললো,শীত আসছে আমাদের কষ্ট হবে ঠান্ডায়!
.......একটি বৃদ্ধাশ্রমে থাকার ব্যবস্থা করে দিয়েছে নেট ঘেটে!.......
---স্যার, এতটুকু বলেই চোখ বুজলেন!
বাচ্চাটা এই দু'মাসেই আমাদের ন্যাওটা হয়ে গেছিল।খুব মুখ চিনত!দেখলেই দু'হাত বাড়িয়ে কোলে উঠতে চাইত!মাসিমা,কান্না ভেজা গলায় বলেন......!
আমার মনে পরে,সুজয়দাকে যতটুকু দেখেছিলাম, পড়াশুনা ছাড়া কিছুই জানতেন না।আজ নিজের বাবা-মা কে এভাবে অবহেলা করছে শুনে খুব খারাপ লাগছে!...আমাদের পাশের বাড়ির নগেন জ্যাঠুর ছেলে কলকাতায় ভাল চাকরি করত।বাবা-মা কে সেভাবে দেখভাল করত না।বহু পুরনো জরাজীর্ণ বাড়ি ভেঙে পরছিল।মেরামতের দরকার ছিল।স্যার, স্কুলের সব ছাত্র দের নিয়ে নিজেই একজন লোক সম্বল করে ওনাদের বাড়ি মেরামত করে দিয়েছিলেন! চিকিৎসার ব্যবস্থাও করে দিয়েছিলেন।
এমনি টুকরো টুকরো বহু কথা মনে পরছিল!
(৫)
আলম নামে একটি মুসলিম ছেলে পড়ত আমাদের সঙ্গে। ওর বাবা ডাকাতি করতে গিয়ে ধরা পরে।গুলি লেগে মারা গেছিল। ডাকাতের ছেলে বলে সবাই আলমকে একঘরে করে দিয়েছিল।একমাত্র স্যার, আমাদের বুঝিয়ে বলেছিলেন কেউ সখ করে ডাকাত হয় না!আর ওতে আলমের কোন দোষ নেই তাও বলেছিলেন। সস্নেহে আলমের চোখের জল মুছিয়ে ওকে বুকে টেনে নিয়েছিলেন! সেই আলম আজ একটি এন,জি,ও..চালায়।বন্ধ চা বাগানের পরিবারগুলো কে নানাভাবে সাহায্য করে।সেদিন স্যার, যদি ওর পাশে না দাঁড়াতেন,তবে আলম আজ ভেসে যেত।হয়তো বাবার থেকেও বড় ডাকাত তৈরি হত একদিন, অভাবের তাড়নায়!!
আজ স্যারের ছেলের কৃপায় ওনার ঠিকানা হতে চলেছে "বৃদ্ধাশ্রম"!! মন টা খচ্ খচ্ করছিল!
এয়ারপোর্টে লাগেজের জন্য দাঁড়িয়েছিলাম।নেটওয়ার্ক আসতেই কয়েকটি দরকারি মেইল,ফোন করে নিলাম।
স্যার, আমাকে বললেন, একটা উপকার করবি?একটি বাড়ি ভাড়া ঠিক করে দিবি?
যে ক'টা টাকা পেনশন পাই,তা দিয়ে আমাদের চলে যাবে!"...... এবার আমার চোখের কোল ভিজে উঠল!
---বললাম,------" স্যার, আপাতত, আমার উপর সব ছেড়ে দিন,ব্যবস্থা করছি।
স্যারদের নিয়ে বাইরে এসে দেখলাম, কাজল,অনীশ,রাহুল,আলম,প্রতীকদা সবাই অপেক্ষা করছে।সবাই ছুটে এসে স্যারের ট্রলিটা টেনে নিল।আমি পরিচয় করালাম স্যারের সঙ্গে, উনার সব প্রাক্তন ছাত্রদের।কারোর কথা মনে আছে,আবার কেউ বা আবছায়া! অনেক অনেক বছর বাদে,তাই!সবাই স্যার কে প্রণাম করল।আজ সবাই প্রায় সুপ্রতিষ্ঠিত। আমার ফোন পেয়ে সবাই ছুটে এসেছে স্যারের জন্য!
আলম,আগরতলায় একটি ফ্ল্যাট নিয়েছে।আলম জানালো,সে স্যারদের নিয়ে যেতে চায়।সবাই মিলে স্যার আর মাসিমা কে নিয়ে গেলাম।
------আলমের এন জিও টা একটা অনাথ আশ্রম খুলেছে। স্যার কে ওখানেই রাখতে চাই আমরা সবাই।
-----"এ ভাবেই "শ্রদ্ধাঞ্জলী" দিতে চাই আমাদের প্রিয় হেড স্যার কে!"......
বিভিন্ন বয়সের বাচ্চাদের মাঝে স্যার খুব ভালো থাকবেন। স্যার আর মাসিমা রাজি হলেন।
----"স্যার, মাসিমাকে বললেন,"কে বলে আমার সন্তান কাছে নেই?এরাও তো আমার ছেলে।।আজ সবাই কেমন ভাবে, 'আমাদের আপন করে নিল"!.......
স্যারের চোখে আনন্দের অশ্রু!!..............