শতাব্দীর প্রথম সূর্যোদয়
জিয়া!!
নামটার সাথে চরিত্রের কোনো মিল নেই। শান্ত নির্ঝরিনি পাহাড়িয়া জিয়ার আয়ত চোখদুটি যেনো এক বিহ্বলতার বার্তা দেয়! মাতৃহারা মেয়েটি মিতভাষী। বাবার চোখের মণি। জিয়ার চোখের দিকে তাকালেই ওর বাবা কোথায় যেনো হারিয়ে যায়...
জিয়া যতক্ষণ বাবার কাছে থাকে, ততক্ষণ তার পৃথিবী স্নিগ্ধ শান্ত রূপময়। স্কুলের বান্ধবীদের সাথে কথা বলতে ওর একদম ভালো লাগে না। ওরা সবসময় ওদের মায়ের কথা বলে। আর জিয়ার মন পুড়তে থাকে। বাড়ি ফিরে সে এক দৌড়ে চলে যায় বাড়ির পাশের ঝর্নার কাছে, ওর মা যে ওখানেই আছে!
জিয়ার বাবা ইয়ান নিতান্তই শান্ত প্রকৃতির। গ্রামের সবাই ওকে সম্মান করে। ওদের গ্রামের নাম ডং । এখানেই শতাব্দীর সবচেয়ে প্রথম সূর্যরশ্মি এসে পড়ে ভারতের মাটিতে। এখানের জনসংখ্যা মাত্র ৩৫ জন। একটাই ডাকবাংলো বাংলোটি দেখাশোনা করে ইয়ান। কখনো কখনো ও অসুস্থ হলে জিয়ার মা সুয়িনের উপর দায়িত্ব পড়ে। পাহাড়ি এলাকা, প্রথম সূর্যোদয়ের সৌন্দর্য উপভোগ করতে সবসময় ট্যুরিস্টরা আসতেই থাকে। তাই ইয়ানের সংসারে অভাব নেই কোনো কিছুরই। জিয়া ওদের ভালোবাসায় প্রাকৃতিক সৌন্দর্য নিয়ে একটু একটু করে বড় হচ্ছিল।
জিয়ার মা সুয়িন অপরূপা। পাহাড়িয়া সবুজ যেন ওর সর্বাঙ্গে ছড়িয়ে আছে। সবসময় হাসিখুশি। আর মনটা একটু খারাপ হলেই ঐ ঝর্ণার পাশে চলে যায়। জিয়াও তাই করে। সব কষ্টের উপশম যেন ঐ ঝর্ণার কলকল শব্দে! আর ইয়ানের এটাতেই ভয়, মায়ের মত মেয়েকেও না হারিয়ে ফেলে! এই ঝর্নাই তো ওর মাকে--!
নাঃ, আর ভাবতে পারে না ইয়ান। তার বুক হুঁ হুঁ করে কেঁদে উঠে! সেই দিনটির কথা ইয়ান ভুলতেই পারে না!
অরুণাচল প্রদেশের ডংগ্রামটিকে প্রকৃতি যেন নিজের হাতে অফুরান সৌন্দর্যের ভাণ্ডার দিয়ে সাজিয়ে রেখেছে! পাহাড়িয়া মেঘের লুকোচুরি যেন পাহাড়ের খাঁজে খাঁজে রূপের ডালি সাজিয়ে রূপকথার রাজ্যে পরিণত করেছে। কখনো মেঘ কখনো কুয়াশার আস্তরণ, সবুজ গালিচা বিছানো টিলার পর টিলা গাছগাছালি এক নয়নাভিরাম দৃশ্যের সৃষ্টি করেছে। যেন ছবির মতো সাজানো গ্রাম। অপরূপা এই গ্রামের ভোরের সূর্যোদয় যেন নতুন জীবনের সূচনা করে, নতুন করে বাঁচতে শেখায়। তাই ট্যুরিস্টরা এখানে এলে কয়েকদিন কাটিয়ে যান। সেবার ট্যুরিস্টরা খুব বেশি করে আসতে থাকেন। শীতটাও বেশ ঝাঁকালো ভাবেই পড়েছিলো। অত্যধিক পরিশ্রমে ইয়ান অসুস্থ হয়ে পড়ে। অগত্যা সুয়িনকেই ট্যুরিস্টদের দেখাশোনা করতে হয়। ইয়ান সুস্থ হয়ে উঠলেও বিছানা ছেড়ে উঠতেই পারছিল না দুর্বলতার কারণে। একদিন সুয়িন বাড়ির কাজ মিটিয়ে বাংলোতে যেতে একটু দেরি হয়ে যায়। তাই কাজ শেষ করতে বেলাও শেষ হয়ে আসে। বাংলোতে ছিলো কয়েকটি ছেলে ট্যুরিস্ট। তারা ভোর তিনটেয় বেড়িয়ে যায় সূর্যোদয় দেখার জন্য তাই সুয়িনের সাথে তাদের দেখা হয় না। তারা ফিরে আসার আগেই সুয়িন বাড়ি ফিরে আসে। কিন্তু সেদিন সুয়িনকে তারা দেখে ফেলে। সুয়িনের সৌন্দর্য দেখে ওদের হুঁশ উড়ে যায়। ওদের মনে পাশবিক নেশা চেপে যায়। ওরা সুয়িনকে নানা অজুহাতে আটকে রাখে। বার বার চা কফি টিফিন বানাতে বলে, আর নিজেরা মদ্যপান করতে থাকে। সুয়িনের সরলতায় ভরা মন। ওদের কুমতলবটা বুঝতে পারে নি। যেমনি চা আর টিফিন নিয়ে ওদের রুমে ঢুকে, ওরা দরজায় ছিটকিনি লাগিয়ে দেয় আর অট্টহাসিতে ফেটে পড়ে। সুয়িনকে টানা হ্যাচড়া করতে থাকে। সুয়িন কাঁদতে কাঁদতে ওদেরকে বারণ করে, ওরা তখন পশুর মতো ওর উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে ওর কাপড় চোপড় ছিঁড়ে ফেলে। সুয়িন চিৎকার করতে থাকে। ওরা তখন পৈশাচিক শক্তি নিয়ে একের পর এক ধর্ষণ করতে থাকে। খুবলে খুবলে ওর কোমল নরম দেহটাকে .... সহ্য করতে পারে নি সুয়িন! নিষ্ঠুর পশুদের ছোবল থেকে নিজেকে রক্ষা করতে পারেনি সে...জ্ঞান হারিয়ে ফেলে। যতক্ষণ চেতনা ছিল ততক্ষণ তার আর্তচিৎকার পাহাড়ের গায়ে প্রতিধ্বনিত হতে থাকে, কিন্তু ভালোবাসার মানুষটির কানে পৌঁছাতে পারেনি।
সে বছর বর্ষাতে ঐ ঝর্না ফুলে ফেঁপে দানবীর আকার ধারণ করে। আর জিয়ার মার গর্ভে বড় হতে থাকে অসুরের বীজ! একদিন সেই ঝর্ণাধারার সাথে জিয়ার হতভাগী মাও ভেসে যায় অকূল দরিয়ায়... ইয়ান জানতেও পারেনি সুয়িনের অব্যক্ত যন্ত্রণার কথা, কী অসহনীয় বেদনা নিয়ে অভাগী এই পৃথিবী ছেড়ে গেছে...জানতো শুধু এই ঝর্ণা ,তাইতো জিয়া এলেই ওকে মায়ের আদরে বুকে টেনে নেয়!