Jul 31, 2023

অতনু রায় চৌধুরী

মধ্যবিত্তের জীবন

প্রতিদিনের মত অফিসে অফিসে ঘুরে চাকরি না পাওয়ার ব্যর্থতা নিয়ে ভিড় বাসে বাড়ি ফিরছিলাম হঠাৎ করেই চোখে পড়লো পথের ধারে কাপড়ের দোকানে একটি সুন্দর তাঁতের শাড়ি ঝুলিয়ে রেখেছে। ভাবলাম মায়ের জন্য নিয়ে গেলে মা নিশ্চয়ই খুশি হবে। সেই কথা ভাবতে ভাবতে পকেটে হাত দিতেই দেখি গাড়ি ভাড়াটা ছাড়া আর কোনো টাকা নেই আমার কাছে। খুব খারাপ লাগলো, নিজের কাছে নিজেকেই অনেক তুচ্ছ বলে মনে হতে লাগলো। এই ২৫ বছর বয়সে শিক্ষীত হয়েও আজ আমি বেকার। অন্য দিকে পরিবারের আর্থিক অবস্থাটাও বেশি ভালো যাচ্ছে না। জমানো টাকা যা ছিল তা দিয়ে আমার মা বাবা আমার ইঞ্জিনিয়ার হবার স্বপ্নটা পূরণ করল। তাঁরা ভেবেছিল পড়াশোনা শেষে আমার একটি ভালো চাকরি হবে। তারপর দিদির বিয়েটা দিয়ে দেবে । কিন্তু সময়ের সাথে সাথে ভেবে রাখা সবকিছু কেমন যেন এলোমেলো হয়ে গেলো। আর অন্যদিকে পাএ পক্ষের যৌতুক দেওয়ায় অক্ষম হবার কারণে দিদির বিয়েটা বারবার ভেঙ্গে যাচ্ছিল। আজকাল দিদিও খুব চুপচাপ থাকে,  আমারও বাবার সাথে কথা বলতে খারাপ লাগে কারন আজ আমার কারনেই পরিবারের এমন অবস্থা হয়েছে হয়তো। বাড়িতে এখন মায়ের কাছেই সব কথা প্রকাশ করি। যদিও মায়ের মনেও ভীষণ কষ্ট তবুও মা হাসিমুখে থাকে ।


ভাবলে চোখে জল আসে আজ থেকে প্রায় পাঁচ বছর আগেও আমাদের পরিবারটা ভীষণ হাসি খুশি ছিল। রোজ ভোরে বাবা আমাকে ঘুম থেকে উঠিয়ে দিত পড়তে বসার জন্য । তারপর সকালে মা বাবা আমি দিদি আর ঠাকুরমা একসঙ্গে টিফিন খাওয়ার জন্য বসতাম। দিদিকে বেশী টিফিন দিয়েছে এই নিয়ে প্রায় দিনই দিদির সাথে আমার ঝগড়া হতো। তখন ঠাকুরমা বলতো দিদিতো শ্বশুর বাড়ি চলে যাবে তাই দিদিকে ইকটু বেশি দেওয়া হয়েছে । তখন দিদি বলত দিদি নিজে যেদিন চাকরি পাবে সেদিন দিদি বিয়ে, শ্বশুর বাড়ি এসব নিয়ে ভাববে । কিন্তু সময়ের এমন খেলা দিদির চাকরিটা হয়েও হলো না । তখন দিদির মন ভাঙ্গলেও দিদি মনে করেছিল আমি পড়াশুনা শেষ করে নিশ্চয়ই একটি চাকরি পাবো। 

আসলে দিদি আমায় খুব ভালোবাসতো আবার সময়ে সময়ে শাসন ও করত । যখন বিকেল হলে খেলার মাঠে চলে যেতাম দিদিই আমাকে সন্ধ্যে হবার আগে বাড়িতে ডেকে নিয়ে আসত এবং রোজ রাতে আমি লেখাপড়া করছি কী না সে খেয়াল দিদিই রাখত। রাতে খাওয়া শেষ হয়ে গেলে ঠাকুরমার কাছ থেকে গল্প শোনা এটা আমার আর দিদির প্রতিদিনের অভ্যাস ছিল। ঠাকুরমা চলে যাবার পর সেই অভ্যাসটা ধীরে ধীরে বদলে গেল। আমি আর দিদি গল্প শুনতাম না ঠিকই কিন্তু গল্পের বই পড়তাম রোজই। তখন ধীরে ধীরে গল্পের বই পড়াটা আমাদের অভ্যাস হয়ে গিয়েছিল ।

ঠাকুরমার ঝুলি, ব্যোমকেশ, ফেলুদা এসব নানা গল্পের বই পড়েছিলাম। গল্পের বই পড়তে পড়তে আমি আর দিদি দু'একবার ভেবেছিলাম আমরা দুজনে মিলে একটি বই লিখবো কিন্তু তা আর হয়ে উঠলো না । এইভাবে দিনগুলো কাটতে কাটতে ধীরে ধীরে যতই পারিবারিক সমস্যাগুলো বাড়তে লাগলো ততই গল্পের বইয়ের সাথে আমার দূরত্বটা বেড়ে গেল। সত্যি কথা বলতে এখন আর গল্পের বইয়ের মাঝে নিজেকে হারিয়ে দিতে পারি না । প্রতি মুহূর্তে মাথায় ঘুরে নানারকম চিন্তা । এখন মনে হয় এইভাবেই হয়তো প্রতিটি মধ্যবিত্ত পরিবারের জীবনগুলো কাটে, বুক ভরা স্বপ্ন নিয়ে হাসিমুখে শূণ্য পকেটে হাঁটে ।