বিনোদ-আমন
সকাল এগারটা।অফিসের আধিকারিক সুখেন্দুবাবু কিছু বুঝে উঠার আগেই হুরমুর করে মা মেয়েকে নিয়ে চেম্বারে ঢুকে পড়ে এই অফিসেরই নিয়মিত সাফাইকর্মী বিনোদ সতনামী। শুধু ঢুকেই পড়ে নি ওরা দুজন বিনোদকে সাক্ষী রেখে কথা বলতে শুরু করে-
প্রথমে বিনোদই শুরু করে
স্যার!
কী?
এই দেখেন এইডা আমার মাইয়া মাধুরী আর বউ জিনাৎ।এরা কিছু আপনেরে কৈতে চায়।
জিনাৎ তেড়েফুঁড়ে বলে ওঠে
স্যার এই যে আমার মাইয়াডা, এইবার কলেজে সেকেন্ড ইয়ারে পড়ে।পুলাডা তো বি কম পাস কৈরা চাকরির পরীক্ষা দিব কৈয়া, কুচিং সেন্টারে ভর্তি হৈছে। এখন আমরারে একটা রাস্তা দেখান। বিনোদকে দেখিয়ে বলে, হের হাতেত্তে
আমরারে মুক্তি দেন।
মিষ্টি রোগা চেহারা, জিন্স আর টপ পড়া মেয়ে মাধুরী, একই সুরে সুর মিলিয়ে বলে,হ স্যার, একটা কিছু ব্যবস্থা কৈরা দেন।আর পারি না।অতিষ্ট লাগে।
হেরা যেমনে চায় কৈরা দ্যান স্যার, বলে অনুমতি নিয়ে ঘর থেকে বেড়িয়ে যায় বিনোদ।যেন স্যারের কাছে ওদের ঠেলে দিয়ে পালিয়ে বাঁচল।যেন বুঝাতে চাইলো দেখুন স্যার,আমি কিভাবে,কাদের নিয়ে থাকি।
মাধুরী থামল না।কী কমু স্যার বাইত থাকনের উপায় নাই।পৈত্যেক দিন রাইতে মদ খাইয়া আইয়া আমরারে ঘরেত্তে বাইর কৈরা দেয়।মাইয়েরে মারে।
কথার মাঝে জিনাৎ ঢুকে সংযোজন করে, হে বেতনের টাকা যা পায় সব হের মায়ের সংসারে দিয়া লায়।আমরা খাইলাম কি খাইলাম না,ইডার খবরঅ লয় না।আপনে হয়তো জানেন না স্যার,ঐ হরিজন কলোনিতে হের মা ভাইয়েরা বাড়ির যে একটা পরিবেশ বানাইয়া রাখছে! সারাক্ষণ খালি ঝগড়াঝাঁটি, বাজে কথা,হৈ চৈ।কেমনে যে পুলাপানের পড়াশুনা করাই, হে একমাত্র আমিই জানি। শেষ পর্যন্ত ভাড়া আইলাম ঐ দয়াময় কলোনিতে দুইডা ঘর লইয়া।ইহানেও কষ্টেমষ্টে আছিলাম। কিন্তু শান্তি নাই। হে রাইতে আইয়া আমরারে ঘর থিকা বাইর কইরা দেয়। শেষে পুলা মাইয়া লইয়া আমি আমার বাপের বাড়িত, ঐ বর্ডার কলোনিতে আইয়া পড়ছি।আজগা এক সপ্তা ঐল।অখন স্যার কিতা করতাম কন। আইন আদালত যা করন লাগব করুম।আমারারে একটা উপায় কন।
ঝরের গতিতে ওরা দুজন কথাগুলো বলে ফেলল।এতক্ষণ চুপ করেই ছিলেন সুখেন্দুবাবু। এবার মেয়েটাকে বললেন,তবে তো তোর বাবাকে পুলিশের হাতে তুলে দিতে হয়, মহিলাদের উপর অত্যাচার,এটাকে তো ডোমেস্টিক ভায়োলেন্স বলে। কলেজে পড়িস, নিশ্চয়ই বুঝতে পারছিস,এর পরিনতি।কয়েকটা দিন জেল খাটুক,চাকরিটা তো যাবেই। একশ্বাসে কথাগুলো বলে গলার স্বরে একটু পরিবর্তন আনলেন সুখেন্দুবাবু।আচ্ছা বল, তখন কি আর তোদের টাকা দিতে পারবে?
মেয়েটা তড়িৎ গতিতে বলল,না স্যার,এসব কিছুই লাগত না, আপনে শুধু বাবার বেতনের টাকাডা মার একাউন্টে দিয়া দেন।তৈলে বাবা নিজের মতো থাকুক আমরা আমরার মতন।
এবার একটু থিতু হলেন সুখেন্দুবাবু। ভালো করে দুজনকে আরবার দেখলেন।এই চোখে এতক্ষণ যে দুটো নারী চরিত্রকে দেখেছেন তার থেকে আলাদা। কেননা এবার মনে হলো এরা আসলে বাবা বা স্বামীকে চাইছে না।বাবা বা স্বামী নয়, বিনোদ এখন এ সংসারে ওনলি আর্নিং মেম্বার।এই শুধু তার পরিচয়।স্যার একবার নিজের দিকেও তাকিয়ে কোথায় যেন মিল খুঁজে পান।
জিনাতের বয়স ৪০এর বেশি নয়ই।তবে শারীরিক গঠনে তিরিশের বেশি মনেই হয় না। বিনোদের বয়স ৪৫ এর কাছাকাছি হলেও শরীর মজবুত। ব্যাকব্রাশ করে চুল আঁচড়ানো পোশাকে ফিটফাট।অফিস পরিষ্কার রাখা ওর কাজ হলেও সেই কাজ যেটুকুই করুক না কেন নিজেকে গুছিয়ে রাখে। খানিক ক্ষণের মধ্যেই মা মেয়েকে বুঝিয়ে বললেন, এখন তোমরা যাও, আমি ওর সঙ্গে কথা বলে জানাব, তোমরা অফিসকে এই বিষয়টা লিখিত আকারে জানাও,তারপর দেখছি।
মা মেয়ে বেড়িয়ে গেল। সুখেন্দুবাবু ভাবতে থাকলেন,জিনাত,বিনোদ, মাধুরী সবইতো একসময়ের রূপালী পর্দায় ভেসে ওঠা নাম।এই বয়সে আসল সমস্যাটা কোথায়? আরও গভীরে অনুভব করলেন ছেলে মেয়ে দুটোই ১৮-২১বৎসরের মধ্যে।এরা দুজন দুজনকে সংসারে জুড়তে গিয়ে তবে কি নিজেদেরকে খুঁজে পাচ্ছে না?
অফিসের সারাদিনের নানান কাজের শেষে বিকেলে বিনোদকে ডাকলেন। বিনোদ যে বন্ধ দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে মা মেয়ে আর স্যারের কথা শুনছিল, সেটা সুখেন্দু অনুমান করতে পেরেছিলেন।তাই ডাকের সঙ্গে সঙ্গে বিনোদ এসেই যখন স্যারকে বললেন,স্যার,এরা যা কৈসে সব মিছা কথা।আমি কয় টাকা বেতন পাই কন স্যার!এর মধ্যেই পুলা মাইয়ার পড়াশুনা,বোউয়ের সাজগুজ, সংসার, সব চালাইতে গিয়া আমার ত অফিসের পরেও নানান খানে সাফাইয়ের কাজ কৈরা রুজগার করন লাগে। হের পরে বাড়িতে আইয়া আমন যদি ইট্যু শান্তি না দেয় কিতা করি কন্ । সুখেন্দু বাবু সঙ্গে সঙ্গে বললেন,আমন আবার কে? বিনোদ একটু লজ্জাই পেল,তারপর যেন চটকা ভাঙলো,স্যার হের নাম জিনাত ঐলেও ওরে আমি আমন কৈরাই ডাকি।
সুখেন্দুবাবু বুঝতে পারলেন তার ধারনাটাই ঠিক। এবার নরমে গরমে বললেন,শোন্ এখন তুই বাবা।ক'দিন পর মেয়ের বিয়ে দিবি। তখন আরেকজন অপরিচিত ছেলেও তোকে বাবা বলবে এটা বুঝিস?কাজেই যা আর ঝগড়া না। তুই তো বাবা, সংসারের মাথা।যা, ওদেরকে দাদুর বাড়ি থেকে আজ নয় কাল ডেকে নিয়ে আয়। সামনের ছুটির দিন আমি যেন শুনতে পাই মা, মেয়েকে সঙ্গে নিয়ে নীরমহল বেড়িয়ে এসছিস।কত আর লাগবে? ছেলে তো আর যাবে না,তোরাই ঘুরে আয়।সাড়াদিনের জন্য যাবি।যাবি তো?ভাড়া লাগবে?মাথা চুলকায় বিনোদ,না স্যার ।
পরের সপ্তাহে অপেক্ষা করে সুখেন্দুবাবু ,না কোনো লিখিত অভিযোগ অফিসে জমা পড়ে নি।তবে কি!!