Jul 31, 2023

জগন্নাথ বনিক

পাইনি আমি বাবার আদর 

দুঃখ আমার নিত্য দিনের,
কান্না করি প্রতিদিন।
সবাই আমায় বলে দুঃখি,
সুখ ছিলো না কোনো দিন।
বাবা কে আমি চোখে দেখিনি,
পাইনি বাবার আদর।
দুঃখ যাদের জীবন গড়া,
আপন মানুষ ও হয় পর।।
এই ভাবেই চলে প্রতিদিন,
 আমি দুঃখির জীবন।।

দুঃখির বাবার নাম ছিল ধনঞ্জয়, মায়ের নামছিল মিনু, দুঃখির বাবার শরীরটা ভালো ছিল না । সবসময় রোগ নিয়ে কষ্ট করত। দুঃখির দাদু চিত্তরঞ্জন রায়, দুঃখির বাবাকে  অনেক ডাক্তার দেখিয়েছে। যতদিন ঔষধ সেবন করে  ততদিন শরীরটা ভালো থাকে। আর  ঔষধ বন্ধ করলেই, ব‍্যথা, যন্ত্রণায় ছটফট করে । বেশী দূর পড়াশোনা করেননি দুঃখির বাবা। দুঃখির দাদু চিত্তরঞ্জন রায়ের কাপড়ের দোকান ছিল, ভালোই চলে কাপড়ের দোকান। দুঃখির বাবা ধনঞ্জয় সেই কাপড়ের দোকানে টেইলারিং করত।  একদিন দুঃখির দাদুর বন্ধু নীবারণ  কাপড়ের দোকানে এসে গল্প করছিল।  গল্পের প্রসঙ্গ শেষ না হতেই, দুঃখির দাদু চিত্তরঞ্জন - বন্ধু নীবারণ কে বলে  - বন্ধু  একটি মেয়ে দেখে দেয় - ছেলে ধনঞ্জয় কে বিয়ে করাব - বয়স তো আর কম হচ্ছে না । বন্ধু নীবারণ বলে  যে  আমার  শ্বশুরবাড়ির কাছে একটি মেয়ে আছে  - নাম - মিনু -- মেয়েটির বাবা নেই , ভীষণ গরিব - যদি বলিস আলাপ করে দেখতে পারি। কিন্তু  কোনো যৌতুক পাবি না ।   আমার যৌতুক লাখবে না  বন্ধু, মেয়েটা ভালো হলেই চলবে।  যাক - মাস খানেকর মধ্যেই মেয়ে দেখা  এবং  দুঃখির বাবা  ধনঞ্জেয় বিয়ে হলো, মিনুর সাথে - বিয়ের - আট (৮) মাসের মধ্যেই দুঃখির মা - মিনু  গর্ভবতী হলো। পরিবারে সকলের মনে  একটা খুশির আনন্দ। বহুদিন পর বাড়িতে নতুন অথিতি আসবে । সবাই যখন  আনন্দে আত্মহারা, ঠিক সেই সময়েই দুঃখির বাবা -- ধনঞ্জয়ের সেই পুরোনো রোগটা দেখা দিল। নাক দিয়ে  ঝরঝর করে  রক্ত পরা শুরু করল। তড়িঘড়ি করে  ডাক্তার দেখিয়ে - হাসপাতালে ভর্তি করানো হলো। কিন্তু শেষ রক্ষা হলো না  - দুঃখির - মা তখন তিন (৩) মাসের গর্ভবতী। ঠিক সেই সময়েই দুঃখির বাবা  ধনঞ্জয় এই পৃথিবীর থেকে বিদায় নিলো। এই দিকে  - দুঃখির মা - মিনুর সব স্বপ্ন চুরমার হয়ে গেল। দুঃখির - দাদু, চিত্রঞ্জন এবং  দুঃখির ঠাকুর  মা  পাগল প্রায় - তাদের একমাত্র ছেলে ধনঞ্জয় কে  হারিয়ে। একদিকে ছেলে হারানোর শোক - আরেক দিকে  ঘরে গর্ভবতী পুত্রবধূ।  দুঃখির বাবা  ধনঞ্জয়ের শ্রাদ্ধ অনুষ্ঠান শেষ হওয়ার পরে  - দুঃখির মামার বাড়ির লোক এবং দুঃখির বাবার বাড়ির লোকেরা বসে একটা সমাধানের পথ খুঁজতে লাগল - দুঃখির মায়ের জন্য। দুঃখির  মা  মিনুর বয়স তখন  আঠারো ( ১৮ ) বছর। এই দিকে   মিনু স্বামী হারা  আবার গর্ভবতী। মিনুর জীবন তখন  অন্ধকার। দুঃখির মামার বাড়ির লোকেরা, দুঃখির মা মিনু কে, দুঃখির মামার বাড়িতে নিয়ে যেতে চাইছিল। কিন্তু  দুঃখির মা মিনু বাপের বাড়ি যেতে রাজি হয়নি। দুঃখির - দাদু চিত্তরঞ্জন এবং  ঠাকুরমার চিন্তা করে  দুঃখির বাবার বাড়িতেই থেকে গেল। অবশেষে দুঃখির বাবা ধনঞ্জয়ের মৃত্যুর সাত (৭) মাস পরে  দুঃখির জন্ম হলো।  দুঃখির জন্মের পর  - দুঃখির দাদু , ঠাকুর মা সবাই খুশী হয়ে ছিল। দুঃখির মুখের দিকে তাকিয়ে স্বামী হারানোর দুঃখ ভুলে গিয়ে দুঃখির দাদু, ঠাকুরমাকে সঙ্গে নিয়ে আজও দুঃখির বাবার বাড়িতেই আছেন দুঃখির মা - মিনু।  আস্তে আস্তে দুঃখি বড়ো হতে লাগল। দুঃখির বয়স যখন  আট (৮) বছর তখন দুঃখির মাকে বলে  - মা, দিয়া, রিয়াদের  বাবা আছে , তাদের কত আদর  করে । আমার বাবা কোথায়--  মা,। দুঃখির কথা গুলো শুনে দুঃখির মা - মিনু - চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পরে। আর ঘরের ভিতরে ফুলের মালা দেওয়া ছবিটা দেখিয়ে বলে , এই যে ছবির লোকটা তোর বাবা , আকাশের তারা হয়ে গেছে - মা - আর  কোনো দিন ফিরে আসবেনা।  তাই বাড়িতে থাকে না । দুঃখি তখন বুঝতে পারে  বাবার আদর, আর কোনো দিন পাবে না ।    ঘরে টাঙানো ধনঞ্জয়ের ছবির দিকে তাকিয়ে থাকে  আর দুঃখির চোখের জল গড়িয়ে পরে।