বিদায়ের স্পর্শ
সেদিন ওর চোখে কি দেখেছিলাম,জানিনা। ওর হাতে ধরা আমার হাত টা ছাড়িয়ে আনতে পারিনি।একসময় নিজেই খুব আস্তে করে আমার হাত টা ছেড়ে দিল, মনে হলো আমার আঙ্গুলের শেষ স্পর্শ টুকু ও ধরে রাখতে চায় নিজের বুকের ভিতরে।
আজো মনে হলে বুকের ভিতর টা কেমন কেঁপে ওঠে।
সেদিন....
আর আজ, মাঝখানে পেরিয়ে গেছে দীর্ঘ পঁচিশ বছর। কোনও দেখা সাক্ষাৎ নেই। অতনুর শেষ কথাটি এখনো কানে বাজে,
আর কোনোদিন কথা বলবে না আমার সাথে।
কথা রেখেছিলাম আমি(সায়নী)।
কদিন থেকেই বৃষ্টি ঝরছে। জানালার গরাদে হেলান দিয়ে অতীত কথা ভাবতেই বেশী ভাল লাগে সায়নীর। সেই মুহূর্তে কেউ ডাকলে বা ফোন এলে বিরক্ত লাগে। বিভাস সকাল সাড়ে আটটার মধ্যে অফিসে বেরিয়ে যায়। তারপর টুকটাক গৃহস্থালি কাজ সেরে কখনো গান শোনা, বই পড়া নিয়েই সময় কাটে। বিভাস গম্ভীর প্রকৃতির। অফিস নিয়ে কথা বলতে বেশী ভালোবাসে। সায়নীর মনের গভীরে কথার ঢেউ আছড়ে পড়ে....। সেসব শোনার আগ্রহ বা সময় বিভাসের নেই।
যৌথ পরিবারে মানুষ সায়নী। ভাইবোনেরা ওকে চড়ুই পাখি ডাকত। সারাদিন মুখে কথা আর কথা। ও বাড়িতে না থাকলে সবাই খোঁজ নিত,
আজ চড়ুই পাখি বাড়ী নেই বুঝি!
সায়নীর দাদা সুবিমলের বন্ধু ছিল অতনু। কখনো বন্ধুদেরকে বাড়ী নিয়ে আসত সুবিমল, গল্প,আড্ডা, হৈ চৈ।
সেই অনেকের মধ্যে অতনুকে দেখলে কেমন একটা শিহরন অনুভব করতো সায়নী। মনে হতো দুটো চোখ শুধু ওকেই দেখছে। এই বাড়ীতে আসা যাওয়ার মাঝখানে কখন দুজনের চোখে চোখে ভালোবাসার বোঝাপড়া হয়ে গেছিল... সেটা এখন আর মনে পড়ে না।
ভরা বর্ষায়.... ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি, রাস্তা মোড়া কৃষ্ণচূড়া ফুল এর গালিচা। একটি মাত্র ছাতা, দুজনে কাক ভিজে হয়ে আশ্রয় নিয়েছিল সেই চা এর দোকানে। যেখানে একদিন অতনু বলেছিল,
আমরা তোমাদের মত এত স্বচ্ছল নই সায়নী। তুমি কি আমার জন্যে অপেক্ষা করবে?
তুমি আরো পড়াশোনা কর সায়নী। ততদিনে আমিও চাকরি পেয়ে কিছুটা সামলে নেব।
অপেক্ষা করার প্রতিশ্রুতি রাখতে পারেনি সায়নী।
বইয়ের ফাঁকে অতনুর ছবি সায়নীর মায়ের চোখে পড়ে যায়।
নব্বইয়ের দশকে যৌথ পরিবার সায়নীর বিয়ে দেওয়ার স্বপক্ষে যুক্তি দেয়।
চা এর দোকানে বসে বৃষ্টির জল আর চোখের জলে ভেসে অতনু কে বিদায় জানিয়ে এসেছিল সায়নী। নিজের ভালবাসা, স্বপ্নের চেয়েও অনেক বড়, মা বাবা,পরিবারের সম্মান ও মর্যাদা। বিভাস কোনো কিছুর অভাব রাখেনি। শুধু সায়নীর মন ছুঁতে পারেনি। খুড়তুত বোন রিনি একদিন বলেছিল,
জানিস, সেদিন অতনু দাকে ব্যাংকে পেয়েছিলাম। বাব্বা কত বড় চাকরি করে, গাড়ি বাড়ী বিশাল ব্যাপার।
ছোট্ট করে
ও আচ্ছা,
বলে কথা পালটেছিল সায়নী। শুধু জানতে চাইছিল,
তুমি কি সেই আগের মতোই আছো, নাকি অনেকখানি বদলে গেছো, জানতে ইচ্ছে করে।
অঝোর বৃষ্টি ঝরছে। বিভাস কে ফোন করল সায়নী,
ছয় টা বেজে গেল, কখন আসবে?
আরে বৃষ্টি কমুক।আসছি....। তুমি ততক্ষনে আমার জন্যে একটা রোমান্টিক কবিতা লিখে ফেল।
হেসে ফোন রেখে দিল বিভাস।
সায়নীর বুক চিরে দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এলো।
প্রথম প্রেমের বাহুডোরে আমি এখনো বাঁধা পড়ে আছি,বিভাস। আমাকে ক্ষমা করে দিও। সবটুকু দিয়েও যখের ধনের মত আগলে রেখেছি সেই বিদায়ের স্পর্শ টুকু।