আসলে যেমন হয়
লোকে বলে এ অঞ্চলে অনুপম দের বাড়িটা নাকি অদ্ভুত রকমের-বাড়ির কংক্রিট থেকে দেওয়াল সবই পাথরের সামনের বিস্তৃত লন সেখান থেকে চলন রাস্তা আবার সেটাও বাঁকুড়ার লাল মাটি দিয়ে সুন্দর করে বানানো মফস্বল অঞ্চলে এতটা জায়গা জুড়ে এত বড় বাড়ি দেখা যায় না। অনুপমেরও মনে হয় বাড়িটা সত্যিই অদ্ভুত রকমের ঠান্ডা পাথরের তৈরি বাড়িটাতে সত্যিই দম বন্ধ হয়ে যায় তবে এর মধ্যে তার ওই দক্ষিণের ঘরটাকে সবচেয়ে স্বস্তির জায়গা বলে মনে হয়। ঘরটায় এখন যদিও সে বেশি সময় কাটাতে পারে না বছর খানেক আগে পর্যন্ত দাদুর ঘরটাই ছিল তার সবকিছু ।
বাবার টেটিয়াপোনা আর দিনরাত্রি টাকা-পয়সার হিসাব নিকাশ মায়ের অবুঝ শাসন দিদির আধুনিক বন্ধুদের হুজ্জুতি থেকে তো এই ঘরটাই মুক্তি র। দাদুর কাছে দেশ স্বাধীনের গল্প তিল তিল করে বাবা কাকাদের গড়ে তোলার গল্প আর সবচেয়ে ভালো লাগে ঠাকুমার কথা শুনতে। কিন্তু কি যে সব হয়ে যায় ইদানিং দাদুর শরীরটাও খারাপ। বাড়িতে এটা যেন কোন এক অবাঞ্ছিত সমস্যা, এই অনুভূতি অনুপমকে বিব্রত করে বিষন্ন করে তোলে অনুপম সবকিছু থেকে পালিয়ে বাঁচতে চায়। দিন কয়েক আগে বিএ ফাইনাল পরীক্ষা শেষ হয়েছে বন্ধুদের রোজই নতুন নতুন কোন না কোন প্রোগ্রাম ভালো লাগেনা এসব অনুপমের কদিন হলো দাদুর খুব বাড়াবাড়ি অবস্থা যাচ্ছে। কাজ ছাড়া হতে ইচ্ছেই করে না। আবার শোনা যাচ্ছে দাদুর একটু শরীর ভালো হলেই নাকি তাকে বৃদ্ধাশ্রমে পাঠাতে হবে মা নাকি এসব কি নিতে পারবে না আর। বাবাও যেন কিরকম নীল লিপ্ত টাকা পয়সা ছাড়া লোকটার কোন দিকে লক্ষ্যই থাকেনা রাগে মাথার ভেতর যন্ত্রণা আরম্ভ হয়ে যায় অনুপমের অথচ অনুভব মনে করে এই দাদু না থাকলে সে আজ এই অনুপম হতে পারত না।
উড়নচণ্ডী বদমেজাজি কিছু একটা হয়ে থেকে যেত। মাঝে মাঝে ভাবে তাই হলেই বোধহয় ভালো হতো। তাহলে তো বুঝি এত কষ্ট নিয়ে চলতে হতো না। দাদুকে বুঝতেও না। আর এসব ভাবনাচিন্তার কোন মানেই থাকতো না। এসব ভাবতে ভাবতে অনুপমের দম বন্ধ হয়ে আসে। সাইকেলটা নিয়ে বেরিয়ে পড়ে তারপর সোজা দামোদরের পার বাড়ি থেকে পালিয়ে এ জায়গায়ই তাকে নিশ্চিন্ত আরামের নিরাপত্তা দেয় দাদুকে আজ ভালো দেখেনি সে। তবুও বাড়ি থেকে বেরিয়ে পড়েছে তাহলে কি সে বাস্তবে মুখোমুখি দাঁড়াতে ভয় পাচ্ছে মনটা গুছিয়ে নেয়ার চেষ্টা করে। এখনই সাইকেলটা দাঁড় করিয়ে আজ পড়া সিগারেটটা বার করে ধরায় এরপর এ কত ছেলে খেলতে আসে নানা রকম খেলা দৌড়ঝাঁপ টানা পড়েন অনেকটা যেন জীবনেরই মতো সন্ধ্যে নেমে আসে। এ সময় আবার ভিড় হয় একদল ছেলেমেয়েদের। এরা পাশাপাশি পাড়ের বিভিন্ন জায়গা দখল করে বসে পড়ে কিছুটা সময় কাটায় অন্য জগতের হয়ে অনুপমের মনে হয় এটা স্বপ্ন কিন্তু এর স্বপ্ন গভীর ঘুমের খুব তাড়াতাড়ি ভেঙে যাবে সিগারেটটা অনেকক্ষণ শেষ হয়ে গেছে। অনুপম ঠিক করে নেয় আজ বাড়িতে সে কিছু একটা করবেই কিছুতেই দাদুকে বৃদ্ধাশ্রমে পাঠাতে দেবে না প্রয়োজন ওই বাড়িটার বিরুদ্ধে যাবে। সে এখন যথেষ্ট বড় তাই তার নিজস্ব মতামতের দাম দিতেই হবে। উঠে পড়ে সাইকেলের প্যাডেলে জোরে চাপ দেয় প্রচন্ড গতিতে সাইকেলটাকে ছোটায়। বাড়িতে সামনে এসে অদ্ভুত লাগে। লোকো কিছু জমা হয়েছে ঢুকতে গিয়ে দেখে দাদুর নিশ্চল দেবতা ততক্ষণে ঘর থেকে বাইরে সরিয়ে আনা হয়েছে বাবা মাথায় হাত দিয়ে বসে, দিদি কাঁদছে আর মা !কি জানি কোথায়? মাথা কাজ করছে না তার উদ্ভ্রান্তের মতো পালাতে ইচ্ছা করছে। সবাইকে ধরে মারতে ইচ্ছা করছে। যন্ত্রণায় সারা শরীর ছিড়ে যাচ্ছে। অনুপম সোজা এগিয়ে যায়। বাবা তার দিকে তাকিয়ে বলে 'শেষ সময়টা তোকেই খুঁজে ছে,এদিকে আয়'-অনুপম সোজা চলে যায় সেই দক্ষিণের ঘরে, জানালার রডগুলো ধরে একটু নিঃশ্বাস নিতে চাইছে। খোলা আকাশের দিকে তাকিয়ে জীবনের মানেই কি তবে এই নিশ্চুপতা? হঠাৎ শেষ হয়ে যাওয়া কিসের হাত ধরে তবে এগিয়ে যাওয়া? জড়বস্তুর সঙ্গে অনুভূতিগুলো মিশে নিথর পাথর হয়ে গেছে সবকিছু।