Jul 31, 2023

শ্বেতা ব্যানার্জী

হাজার তারার আলো

আজ সাহায্যকারি দিদি আসেনি, স্বাভাবিকভাবেই কাজের চাপটা অনেক বেশি ছিল।

স্নান করার সময় পর্যন্ত পাইনি। খিদেতেও পেটটা একেবারে চোঁ চোঁ করছে। তিনটে  বাজে একগাদা  বাসন অগোছালোভাবে পরে। হাতটা ধুয়ে এসে খাবো সেই ফুরসত নেই।  সবে স্নানের তোড়জোড়  করেছি,  পাসের বাড়ির পিসিমার হাঁক,

বউ, ও বউ, শুনতে পাচ্ছিস....

পিসিমাকে পাড়ার সকলেই সমীহ করে, পিসিমা ও প্রত্যেকের বিপদে আপদে পাশে এসে দাঁড়ান। 

আমার  শাশুড়ীমা'র মুখে শোনা, উনি আগে যজ্ঞির

রান্না, পুজোপার্বণের রান্না এক হাতে সামলেছেন।

এমন কী পাড়ায় কেউ যদি ডাক নাও দিত তবু্ও পিসিমা  হাজির। বল কী করতে হবে।

এ-হেন পিসিমা কে আমারা সকলেই শ্রদ্ধা ও সম্মান করি।

পিসিমার ডাকে সাড়া দিয়ে দুরদার করে সিঁড়ি ভেঙে সোজা পিসিমার সামনে... 

বলুন পিসিমা,  বলছি  তোরা  কী সব মুখে মাখিস ফর্সা -টর্সা হবার জন্য, আমার নাতনীকে আজ দেখতে আসবে। জানিস তো ওর রঙচাপা বলে 

প্রত্যেকটা সম্বন্ধ ভেঙে যায়।

আমি বললাম পিসিমা,প্রথমত আমি ওসব মাখিনা,দ্বিতীয় যারা রঙ দেখে বিয়ে করে তাদের আমি মানুষ মনে করিনা। তোমরা যে এত লেখাপড়া, গান, আঁকা শেখালে তার কোন মূল্য নেই!!

কী জানি বাপু!! যারা দেখে যায় ফিরে গিয়ে জানায়

কালো রঙ ছেলের পছন্দ নয়। আর মেয়েটা চোখের জলে বুক ভাসায় একলা ঘরে। 

আমি বললাম পিসিমা তুমি ওকে আমার কাছে পাঠিয়ে দিও। 

তুই তাহলে সাজিয়ে দিবি!

দেবো,কিন্তু মনের... 

মোটামুটি শ্যামাতন্বী, তবে শিখরীদশনা না'হলেও

লাবণ্যময়ী অনুসূয়া দীপ্ত প্রতিভায় উদ্ভাসিতা..

ইকনমিক্স ডিপার্ট্মেন্টের ভিজিটিং কনসালট্যান্ট।  

দিল্লিতে পাকাপাকি চাকরি পেয়েও মা-বাবার কথা 

ভেবে যাইনি।

অনুসূয়া সামনে এসে দাঁড়িয়ে জিজ্ঞেস করে ডেকেছো কাকিমা।

আমি বললাম আয় বোস, 

তুমি কী বলবে বলে ডেকেছো!

আজ তোকে   বিকেলে  দেখতে আসার  কথা।

কথাটা শুনেই ও যেন কেমন হয়ে গেলো, আমি কারণটা  বুঝতে পারলাম।

অনুসূয়া আমার মুখের দিকে তাকিয়ে বলল, কাকিমা আর আপমান হতে  আমি চাইনা।  বাবা ও মায়ের অপমান, আমার মেয়ে জন্মের অপমান --

আমি ওর পিঠে হাত রাখি, বলি তুই দয়া ভিক্ষা 

চাইছিস!?  কখন কে এসে তোমায় উদ্ধার করবে!!

এত ট্যালেন্ট তোর, তার কোন মূল্য নেই!

ডিগ্রি তো তোকে শিক্ষিত করতে পারিনি! তুই সেই পুরনো ধ্যানধারণায় আটকে আছিস!?

কী করবো কাকিমা! 

আজকাল বিয়ের জন্য মেয়ের গুন  কেউ দেখেনা, দেখে শুধু গায়ের ফর্সা চামড়াটা। যেটা আমার নেই।

যেটা নেই তা'কে আরোপ করার দরকার নেই। 

তুই  যেমন, তেমন ভাবে যদি কেউ গ্রহণ করে 

তাকেই তুই বিয়ে করবি।

পূর্ব অভিজ্ঞতা থেকে বলছি কাকিমা, জীবনটা গল্প বা উপন্যাস নয়, একটা কালো মেয়েকে দেখে  পছন্দ হয়ে গেল তারপর তারা সুখে শান্তিতে সংসার করতে লাগলো। এটা বাস্তব জীবন। আর এই বাস্তব জীবনে একটা কালো মেয়েকে প্রতিটা পদে পদে অপমানিত হতে হয়।

এই কিছুদিন আগে অফিসের মিটিং সেরে ফিরতে একটু রাত হয়ে গিয়েছিল, পাশের বাড়ির কাকিমা 

বারান্দায় দাঁড়িয়ে ছিলেন আমাকে দেখে আহ্লাদে আটখানা হয়ে বললেন.... 

ভগবান তোকে কালোরঙ দিয়ে একদিক থেকে মঙ্গল করেছেন,  ধর্ষিতা হবার ভয় যেমন নেই, তেমন তোর সঙ্গে ডেট করার জন্যও কেউ এগিয়ে আসবেনা। নিশ্চিন্তেই তুই রাত করে ফিরতে পারিস।

তাই কী না বল!! বলেই এমন হো হো করে হেসে উঠলো...

আমি নিজের উপর নিজে একরাশ  ঘৃণা নিয়ে বাড়ি ফিরলাম। 

কেন এত হীনমন্যতায় ভুগিস!! তোর যা কোয়ালিফিকেশন    সেইসব নিয়ে ভাব, দেখবি

জীবনের উৎকর্ষ খুঁজে পাবি।


আজ বাপন বাড়ি ফিরছে.. প্রায় তিনবছর বাদ

ম্যাঞ্চেষ্টারে ছিল একটা ফেলোশিপ প্রোগ্রাম নিয়ে গিয়েছিল। 

সিঁড়ি থেকে মা মা ডাকে বাড়ি উত্তাল করে ছেলে 

আমার ঘরে ঢুকলো, বাবা কোথায় জেনে নিয়ে 

শুরু হ'লো সেই ছেলেমানুষী যা ওর বাবা এবং আমার সঙ্গে করতো। 

আজ বিকেলে ছাদ বাগানে ঘুরতে ঘুরতে পাড়ার সবার খোঁজ নিল,কথায় কথায় আমি অনুসূয়ার কথা তুললাম,  ও চুপ করে শুনলো, কিছু বললো না।

আমি বললাম চুপ কেন!!

ও বললো ভাবচ্ছি,

 কী ভাবচ্ছিস!!  মা আমি যদি অনুসূয়াকে বিয়ে করি

তোমার আপত্তি আছে? 

আমি আনন্দে বাক্যহারা... 

দুচোখে আনন্দের ঝর্ণা, ছেলে বুকে জড়িয়ে বলি

সার্থক আমার মা জন্ম, সার্থক তোর মনুষ্যত্ব। 

তোরা জীবনে সুখী হ' দাম্পত্য জীবন দীর্ঘায়িত হো'ক তোদের---

মা মা, আমি এখনো বিয়ে করিনি। শুধু কথা দিলাম তোমাকে,  তুমি ওনাদের সঙ্গে কথা বলো।

আমি অনুসূয়ার হাতটা ধরে বললাম আমি তোর শাশুড়ী  হতে চাই। অনুসূয়া  আমার মুখের দিকে তাকিয়ে মুখ নিচু করে নিল,   কিন্তু তার আগেই তার  বড় বড় চোখের ভাষা আমি পড়ে নিয়ে ছিলাম, যেখান নোনাজল  চিকচিক করছিল।

অনুসূয়া আমায় প্রণাম করতে মাথা নোয়াতে যেতেই আমি বুকে জড়িয়ে নিয়ে বললাম ---

দূর বোকা, তোর জায়গা তো এখানে...।