বর্ষা রাতের অতিথি
বর্ষাকালের সন্ধে। সারাদিন অবিশ্রান্ত বৃষ্টির পর মেঘ কেটে আকাশে উঁকি দিয়েছে এক ফালি চাঁদ । শেষ সন্ধের ভেজা বাতাস ভারী হয়ে আছে কামিনীফুলের গন্ধে । দূরে একটি লাল রঙের জীর্ণ মলীন দালান বাড়িতে সন্ধ্যা প্রদীপ জ্বলে উঠল। ওই রংচটা জরাজীর্ণ বাড়িটির একমাত্র বাসিন্দা বিমলা দেবী তুলসী তলায় বাতি জ্বালিয়ে কাঁসর ঘন্টা বাজিয়ে ধীরে ধীরে ঝুলন্ত ব্যালকনিতে এসে ইজিচেয়ারে বসে পড়লেন। রুটিন মাফিক বিমলা দেবীর সর্বক্ষনের সঙ্গী মালা একটু বাদেই খানিক কুচো নিমকি সহ এককাপ চা নিয়ে এলো। মালাকে দেখেই তিনি বললেন, ' শরীরটা বড় ম্যাজম্যাজ করছে আজ, চা পানের একদম ইচ্ছে নেই রে মালা'! মালা উদ্বিগ্ন হয়ে উঠল মধুমেহ রুগী বিমলা দেবীর জন্য। ও দু'পা এগিয়ে এসে ওনার কপালে হাত রেখে বললো, ' কী হয়েছে জ্যাঠাইমা? তোমার শরীর খারাপ করেছে? কই দুপুরে তো তুমি কিচ্ছুটি বললেনা? দাদাবাবুকে ফোন করব?
— না রে কিচ্ছু হয়নি আমার। এমনি ঝড় বাদলার দিনগুলো আমায় বড্ড উদাস করে দেয়। উৎকন্ঠিত মালা স্বগোক্তির মতো গজগজ করতে করতে বললো, " কী জানি বাপু, দাদাবাবুকে ফোন করব বললেই জ্যাঠাইমা সুস্থ হয়ে ওঠেন। এদিকে দাদাবাবু বলে গেছেন, শরীর খারাপ হলেই যেন তাকে খবর দেওয়া হয়। বিমলা দেবী বললেন,
—শরীর নিয়ে এত ভাবিস না তো মালা! তুই যাবার সময় বাইরের লাইটটি বন্ধ করে দিস, আলোটা বড্ড চোখে লাগছে। মালা বললো, তবে আমি এখনি রাতের রান্না চড়িয়ে দিচ্ছি। রান্না হয়ে গেলে তুমি আজ তাড়াতাড়ি খেয়ে শুয়ে পড়বে। এই বলে দিলুম।
নিকষ আঁধারে বসে আছেন বিমলা দেবী। তিনি জীবনস্রোতে ভাসতে ভাসতে অনেকটা পথ পাড়ি দিয়ে এখানে এসে পৌঁছেছেন। এখন তাঁর অফুরন্ত অবকাশ। বসে বসে দেখছেন সময়ের সাথে সাথে বাড়িটিকেও বার্ধক্য এসে গ্রাস করেছে। ওনার নিজের মতই বাড়াটিও আজ রঙহীন জরাজীর্ণ অশীতিপর হয়ে আছে। পলেস্তারা খসে পড়ছে নানা স্থানে। হবে নাই বা কেনো! এ বাড়ির বয়স তো কম নয়! অনিকেতের জন্মের পূর্বেই গড়া হয়েছিল বাড়িটি। একসময় ঘরগুলো গমগম করত লোকজনের আনাগোনায়। আর আজ...! ভেবেই তিনি একটি দীর্ঘশ্বাস ছাড়লেন। ধীরে ধীরে মন ডুব দিল স্মৃতির অতলে।
সব তো ঠিকঠাকই চলছিল। বিয়ের পর বিমানবাবুর মধ্যে অস্বাভাবিকতা কিছুই ছিল না। পরিবারের প্রতি ছিলেন দায়িত্বশীল। দুহাতে রোজগার করেছেন আর খরচ করেছেন তারও বেশি। তখনই এই বাড়িটি বানিয়ে ছিলেন বিমানবাবু। বাড়ি ভর্তি লোকজন। শশুড় শাশুড়িকে নিয়ে ছিল ওনাদের ভরা সংসার। এরপর অনিকেত এলো। বছর পাঁচেক বাদে শুরু হলো নকশাল আন্দোলন, আর বিমলা দেবীর সংসারের সবকিছু এলোমেলো হয়ে গেলো।
বিমলা দেবী লক্ষ্য করছেন কিছুদিন থেকে বিমান বাবু যখন ব্যবসা পত্তর গুটিয়ে বাড়ি ফিরে আসেন তখন সঙ্গে দু'তিনজন অচেনা লোকও তাঁদের বাড়ি আসেন। তারপর একটি বন্ধঘরে কিছুসময় তাঁদের গুজুর গুজুর ফুসুর ফুসুর চলে। কিছুসময় বাদে ওই অপরিচিতরা দমকা হাওয়ার মতো বেড়িয়ে উধাও হয়ে যান। বিমানবাবুকে জিজ্ঞেস করলে কোনো সদুত্তর পাননা বিমলা দেবী। কানাঘুষা শুনতে পেলেন, তিনি যেন কী সব আন্দোলনে জড়িয়ে যাচ্ছেন। ধীরে ধীরে ব্যবসাপত্তর লাটে ওঠার উপক্রম হলো। তিনি সারাদিন ভবঘুরের মত ঘুরে বেড়ান । ঘরে যতক্ষন থাকেন ততক্ষন অস্থির হয়ে পায়চারী করেন নয়তো গুম মেরে বসে থাকেন। এতে বিমলা দেবীর হয়েছে মহা বিপদ।
তখন সত্তরের দশক চলছে। নকশাল আন্দোলনে উত্তাল হয়ে উঠেছে বঙ্গভূমি। আন্দোলন যত গড়াচ্ছে ততই শহর জুড়ে বাড়ছে বোমাবাজি,খুন জখম রাহাজানি। মানুষ ঘর থেকে বেরোতে ভয় পাচ্ছে। চারিদিকে থমথমে পরিবেশ,কেমন যেন একটা আতঙ্ক গ্রাস করে আছে। এমনি এক বিপন্ন দিনে অঝোর বর্ষার বিষন্ন সন্ধ্যায় একটি লোক এসে দরজায় খুট্ খুট্ আওয়াজ করল আর বিমানবাবু সেই যে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন আর কোনদিনই ফিরলেন না...
দু'দিন থেকে অঝোর বৃষ্টি সঙ্গে দমকা হাওয়া। কাজ না থাকলে লোকজন তেমন বাইরে বেরোচ্ছে না। তার উপর সদ্য সমাপ্ত হয়েছে পঞ্চায়েত ভোট। ভোটের ডামাডোলে শহরও থমথমে হয়ে আছে। বিমলা দেবী শুনশান পথে দৃষ্টি মেলে বসে আছেন। অতীত তাঁকে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে রয়েছে। হঠাৎ লোডশেডিং হয়ে গেল। বৃষ্টির তোড়ে ল্যাম্পপোস্টের আলোগুলো এতক্ষণ কেমন ঝাপসা ফিঁকে হয়ে জ্বলছিল কিন্তু এখন একেবারে ঘুটঘুটে অন্ধকার। ক'দিন থেকে ইনভার্টারটিও খারাপ হয়ে আছে। তিনি মালাকে ডেকে বললেন, ঘরে একটি মোমবাতি জ্বালিয়ে রাখতে। এই বৃষ্টিমুখর দিনগুলোতে তিনি অতীতের হাতছানি দেখতে পান আর স্মৃতিমেদুর হয়ে ওঠেন। আজো তার অন্যথা হয়নি।
হঠাৎ খুট্ খুট্ খুট্ খুট্... সদর দরজায় কেউ যেন কড়া নাড়ছে। বিমলা দেবী কান পেতে শুনলেন। আবার অস্থির একটি খুট্ খুট্ খুট্ খুট্ শব্দ। তিনি ধীরে ধীরে উঠে দরজার দিকে এগিয়ে গেলেন। মনে মনে ভাবলেন নিশ্চয় পাশের বাড়ির কেউ হয়তো কোন প্রয়োজনে এসেছে, নাহলে এই দুর্যোগের রাতে কেউ ঘরের বাইরে... আবার যেন একটু জোরেই খূট্ খুট্। তিনি এস্ত পায়ে গিয়ে দরজাটি খুলে দিলেন আর ঝড়ের বেগে একটি ছেলে ঘরে প্রবেশ করেই আবার দোরটি দিয়ে ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে বিমলা দেবীর পায়ে লুটিয়ে পড়ে বলল, " মা আমাকে আপনি বাঁচান,ধরতে পারলে ওরা আমায় মেরে ফেলবে " বলে কাঁদতে লাগলো। অভিজ্ঞ বিমলা দেবী ছেলেটিকে ভালো করে যাচাই করে দেখলেন, ভদ্রলোকের ছেলে বলেই মনে হল। বয়স আনুমানিক পঁয়ত্রিশ থেকে চল্লিশের মধ্যে এবং মুখটি দেখে নিরীহ বলেই মনে হচ্ছে। তিনি এবার বললেন," তুমি কে বাছা! কোথা থেকেই বা এসেছো, একটু খুলে বলো দিকিনি!" ছেলেটি বললো, সম্প্রতি যে ভোট হয়েছে সেখানে ভোট গননার শেষে ওদের দল পরাজিত হয়েছে আর বিজয়ী দলের ছেলেরা আনন্দে উল্লাস করতে করতে ওকে একা পেয়ে হাতে লাঠি ছুঁড়ি নিয়ে ওর পিছু নিয়েছে। ধরতে পারলে ওকে একেবারে প্রাণেই মেরে ফেলবে। উনি যদি দয়া করে ছেলেটিকে একটু আশ্রয় দেন তাহলে সে এবারে হয়তো প্রাণে বেঁচে যাবে। তখনি বিমলা দেবী বাইরের গেইটে কিছু লোকের হৈ হট্টগোল শুনতে পেলেন এবং মনে মনে কিছু চিন্তা করে তাঁর মুখটি করুন হয়ে ঊঠল। আবার অতীত এসে তাঁকে জাপটে ধরল। মনে হলো , ঠিক এমনি করেই হয়তো বিমান বাবু কারো দ্বারে গিয়ে একদিন আশ্রয় ভিক্ষা চেয়েছিলেন এবং আবেদন নামঞ্জুর হওয়াতে হয়তো বেঘোরে তাঁর প্রাণটাই দিতে হয়েছে! তিনি ভেবে ফেললেন,না যে করেই হোক ছেলেটিকে বাঁচাতেই হবে। ততক্ষণে হৈ হট্টগোল এসে দরজায় হামলে পড়েছে এবং চিৎকার করে বলছে, 'মাসীমা দরজা খুলুন, আমরা আপনার ঘর সার্চ করব'। তিনি তড়িঘড়ি ছেলেটিকে ভেতরের ঘরে নিয়ে একটি বড় ওয়াড্রোবের দরজা খুলে দিয়ে ছেলেটিকে সেখানে ঢুকিয়ে আবার বাইরে থেকে তালা বন্ধ করে দিলেন। এরপর সদর দরজা খুলে বজ্র কঠিন কন্ঠে জিজ্ঞেস করলেন, আপনারা কে? কী চাই আপনাদের"? দলের ভেতর থেকে সমস্বরে চিৎকার উঠলো,আমরা আপনার বাড়ি সার্চ করব'। আরো বললো, ওরা দেখেছে,শত্রু দলের একজন এই বাড়িতে এসে লুকিয়ে পড়েছে। বিমলা দেবী বললেন যে তিনি এখানে কাউকে প্রবেশ করতে দেখেননি কিন্তু ছেলেগুলো লাঠিসোটা নিয়ে গোটা বাড়িটাই টর্চ জ্বালিয়ে খুঁজতে খুঁজতে না পেয়ে দু' তিনজন ঘরে প্রবেশ করে গোটা ঘরে তল্লাসি শুরু করল। বিমলা দেবী মনে মনে দুগ্গা দুগ্গা জপতে লাগলেন। তিনি আরচোখে বখাটে গুলোর গতিবিধি জরিপ করছেন, দেখলেন একটি ছেলে ঘরের কোণের আলমারির হাতল ধরেও টানাটানি করলো,বন্ধ দেখে আর বিশেষ কিছু না বলে অন্য ঘরে চলে গেল। এভাবে কিছুক্ষণ খোঁজাখুঁজির পর ওরা শীকার খুঁজে না পেয়ে আবার রাস্তায় নেমে পড়ল। ধীরে ধীরে ওদের হট্টগোল দূরে মিলিয়ে যেতেই তিনি ছেলেটিকে বাইরে বের করে আনলেন এবং এককাপ গরম দুধ খাইয়ে ওর সঙ্গে গল্প জুড়ে জানতে পারলেন, ও মাস্টার্স করেছে কিন্তু শত চেষ্টা করেও একটা চাকরি জুটাতে পারেনি আজো। এদিকে বাড়িতে মা ও একটি ছোটবোন ও একটি ছোটভাই ওর ওপরই নির্ভরশীল। তাই পয়সা রোজগারের আশায় সে বিপক্ষ দলের হয়ে কিছু কাজ করছিল। কিন্তু সেই দল হেরে যাওয়াতে শাসক দলের আস্ফালনে সত্যিই এবার সে আতঙ্কিত হয়ে পড়েছে। সব শুনে বিষন্ন বিমলা দেবী ছেলেটিকে বললেন, আঁধারে না বেরিয়ে আজ রাতটি ওখানেই থেকে যেতে। তিনি মালাকেও ডেকে বললেন এক কৌটো চাল যেন বেশি রান্না হয় আজ।
পরদিন ভোরের আলো ফুটতেই ছেলেটি তার জীবনদায়ী মাকে প্রণাম করে আশীর্বাদ চেয়ে নিয়ে তার জন্মদাত্রী মায়ের কাছে যাবার জন্য ব্যাকুল হয়ে উঠল। তিনি ছেলেটির মঙ্গল কামনায় দু'হাত কপালে ঠেকিয়ে বললেন দুগ্গা দূগ্গা...ছেলেটি রওয়ানা হয়ে গেল তার গন্তব্য পথে।