Jul 31, 2023

প্রীতম চক্রবর্তী

 বৃহন্নলা

" কিগো দাদা - বৌদি - মাসি - মেসোরা কোই সবাই ..........?"

"বেড়িয়ে এসো , বেড়িয়ে এসো ।"

এসব বলে একদল পুরুষ কণ্ঠধারী নারী অদ্ভুত কায়দায় করতালি দিতে দিতে বাড়িতে ঢুকে পড়লো । আজ নিথীশবাবুর ছোটমেয়ে রুদ্রাক্ষীর বিয়ে। বাড়িতে বেশ আড়ম্বর আয়োজন । এরই মধ্যে হঠাৎ কিছু লোক এসে বাড়ির পরিবেশটাই যেনো পাল্টে দিলো ।

" আরে সব চেয়ে চেয়ে কি দেখছো ? " 

" মেয়ে কোই ? "

" এই বাবলী , চম্পা - রুপমতী গান ধর দেখি ..........."

তারপর ওরা ঢোলক বাজিয়ে কয়েকজন গান ধরলেন - 

"বন্ধু বিনে প্রাণ বাঁচে না ........"

আর বাকি কয়েকজন শুরু করলেন নৃত্য । ততক্ষনে কন্যার মা - বাবা দুজনেই ঘরের ভেতর লুকিয়ে পড়লেন । এরই মধ্যে বেশকিছু দর্শক বিয়ে বাড়িতে এসে জড়ো হলেন এবং তাদের মধ্যে গুঞ্জন শুরু হলো -

" হিজড়া আইসে, হিজড়া আইসে । " 

কয়েকজন আবার বাড়ির বাচ্চাদের আড়াল করে লুকিয়ে রাখলেন । মনে হলো কোনো ভিনগ্রহী যেন বাড়িতে ঢুকেছে । আধুনিক সভ্যতা যেন মানতে নারাজ যে এরাও আমাদের মতো মানুষ । 

যাই হোক বেশ কিছুক্ষন নাচ - গানে পরিবেশটাকে মাতিয়ে অবশেষে তারা হাঁক দিলেন -

" কোই গো মেয়ের বাপ ......... বাইরে এসো ......... "

"এবার আমাদের বিদেয় করো ।"

এদের দলের সর্দার জেসমিন ঘরে যাবার জন্য এগোবার উপক্রম করলেই একজন ভদ্রলোক এসে উনার হাতে দুশো টাকার একটি নোট দিতে চাইলেন ।

জেসমিন উনার দিকে তাকিয়ে - 

" কিরে হিরো ভিক্ষে দিচ্ছিস ......."

" হিজড়েরা কারো বাড়িতে ভিক্ষে করতে যায় না বুঝলি"

"হিজড়েরা দান নেয়, আর এর বদলে অনেক আশীর্বাদ দিয়ে যায় ।"

" যা যা কেটে পর ..... মেয়ের বাপকে ডাক । "

" বলে দে পাঁচ হাজার টাকা নিয়ে আসতে ।" 


    ঘরে বসে নিথীশবাবু সবটাই শুনছিলেন । তথাপি খিটখিটে মেজাজের লোক নিথীশবাবু বেরিয়ে আসার কোনো আগ্রহ প্রকাশ করলেন না । 

কিছুক্ষন বাদে দলের সর্দার জেসমিন উনার দল নিয়ে সোজা ঘরের দরজার সামনে গিয়ে ডাক দিলেন । 

" কী হলো মেয়ের বাপ পয়সা দেবার ভয়ে বাইরে বেরোচ্ছেন না ?"

" লাগবেনা পয়সা আসুন আসুন বাইরে আসুন ।"


নিথীশবাবু খানিকটা বিরক্ত হয়েই দরজার কপাট খুলে বেরিয়ে এলেন। এসেই মুখে একটা অস্পষ্ট হাসি দিয়ে বললেন-

 " বলুন কত টাকা চাইছেন আপনারা ?"

জেসমিন উচ্চস্বরে উত্তর দিল -

"এতক্ষণ ঘরে লুকিয়ে থেকে এখন টাকার কথা বলছেন......." 

"ঠিক আছে দিন পাঁচ হাজার টাকা । "


নিথীশবাবু হতভম্ব হয়ে -

" আরে এসব কি বলছেন । বহু কষ্টে মেয়েটাকে বিয়ে দিচ্ছি ঋণ - ধার করে । অতো টাকা দেবার সাধ্য আমার নেই ।" 

তখন বাকিরা কিছু বলতে চাইলেও জেসমিন ওদেরকে থামিয়ে -" ঠিক আছে দিন দুহাজার টাকা , কিন্তু এর থেকে এক পয়সাও কম মানবো না । "


কিন্তু ততক্ষণে নিথীশবাবুর স্ত্রী বিমলা দেবীর মনে কোথাও যেন একটা খটকা লাগছিল । জেসমিনকে সে যেন কোথাও দেখেছে । উনার অন্তরটা যেন কেঁপে কেঁপে জানান দিচ্ছে জেসমিন উনার আপন কেউ ।

যাই হোক তারপর নিথীশবাবু ওদের হাতে দুহাজার টাকা ধরিয়ে দিলেন । 

টাকা নিয়ে ওরা বললো - 

" আপনার মেয়েকে ডাকুন আমরা আশীর্বাদ করবো । "

নিথীশবাবু রুদ্রাক্ষীকে ডেকে আনলেন। 

জেসমিন উচ্চস্বরে - 

" এই চম্পা - বাবলী উলু দে উলু দে ......"

রুদ্রাক্ষীর মাথায় হাত রেখে জেসমিন - 

" তুই স্বামীর ঘরে খুব সুখী হবি বোন। আমি জীবনে যেসব সুখ পাইনি তুই সেই সমস্ত সুখ পাবি । বছর ঘুরতেই সন্তানের মুখ দেখবি । অতুল সম্পদ হবে তোর স্বামীর । "


তখন নিজের অজান্তেই বিমলাদেবীর চোখ বেয়ে জল নেমে এলো । 

বিলম্ব না করে বিমলা দেবী জেসমিন কে জিজ্ঞেস করেই ফেললেন -

 " তোমার বাড়ি কোথায় মা ?"

 

জেসমিন হেসে উত্তর দিলো-

" বাড়ি ! হা হা হা .... আপনাদের মতো ভদ্রলোকেরা আমাদেরকে সমাজে থাকতে দেয় নাকি ?"

" আপনারা হচ্ছেন ভদ্রলোকের জাত, আপনারা সন্তান পয়দা করেন নিজেদের স্বার্থের জন্য আর সন্তান পছন্দ না হলে পথের আস্তাকুঁড়ে ছুঁড়ে ফেলতেও আপনাদের বিন্দুমাত্র দ্বিধাবোধ হয় না । "

নিথীশবাবু এতক্ষণ চুপচাপ সব শুনছিলেন। কিন্তু একথা শুনে তিনি হঠাৎ চেঁচিয়ে উঠলেন ।


" কি সব বলছেন আপনি?"

জেসমিন এবার বিজ্ঞের ভাব ধরে -

" বাবু.... যখন আমি এক বছরের শিশু তখন মা - বাবা আমায় রেলস্টেশনে ফেলে রেখে যায় , শুধুমাত্র হিজড়ে হয়ে জন্ম নিয়েছিলাম বলে ।" 

" আচ্ছা বলুন না হিজড়ে হাওয়াটা কি আমার অপরাধ ছিল ?" 

"কিন্তু জীবনভর এই শাস্তিটা আমিই ভোগ করছি । "

" একদল লোক রেলস্টেশন থেকে উঠিয়ে নিয়ে আমাকে হোমে রেখেছিল , ওরা আমাকে নবজাতক থেকে বড়ো করেছিল ঠিকই কিন্তু আমার বয়স যখন পাঁচ বছর তখন হোম কতৃপক্ষও আমাকে আর রাখতে চায় নি, আমি হিজড়ে বলে ।"


বিমলাদেবীর দুচোখ বেয়ে অশ্রুধারা পড়ছিল । 

জেসমিন আবারো বললো -

" পথে পথে ঘুরেছি, পেটে ক্ষিদের জ্বালায় চিৎকার করে কেঁদেছি , কিন্তু কেউ একবিন্দুও সহানুভূতি প্রকাশ করেনি। " 

 " তারপর যখন পেটের ক্ষুধা ভয়ানক রূপ ধারণ করতো তখন পথের আস্তাকুঁড়ের পচা - গলা খাবার খেতাম । মাঝে মাঝে কেউ দয়া করে কিছু খাবার দিতো। এভাবেই ক্ষূন্নিবৃত্তি হতো আমার।"

 

বিমলাদেবী বললেন - " তারপর এই দলে কিভাবে এলে ?"

জেসমিন বললো - 

" তারপর একদিন আমি এক বৃহন্নলা দলের নজরে আসি । তারা আমাকে নিয়ে যায় তাদের সর্দার সোনালীর কাছে ।" 

" ইনি আমাকে গ্রহণ করেন । আমাকে স্নেহ - ভালোবাসা দিয়ে বড়ো করে তুললেন। তিনিই আমাকে নাম দিলেন জেসমিন । "


জেসমিনের চোখে একটু জল দেখা দিল - 

" আজ হয়তো সোনালী মা নেই । কিন্তু যাবার আগে তিনি আমাকে গুরুদায়িত্ব  সপে গিয়েছিলেন যে, এই পাষাণ সমাজ থেকে বিতাড়িত কোনো হিজড়ে শিশু যেন পথে - ঘাটে পড়ে কষ্ট না পায় ।"

" আপনাদের থেকে যে অর্থ নেই মা , সেগুলা দিয়েই ভদ্রলোকের সমাজ থেকে বিতাড়িত হিজড়ে শিশুরা খাবার পায় , পড়াশুনা করে । "


        লজ্জায় - ঘৃণায় অপমানিত নিথীশবাবু এতক্ষণ সবকিছু শুনবার পর, উনার পাথরের হৃদয়টা যেন ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে চোখ বেয়ে জল নামছিল ।

        

বিমলাদেবী কাঁদতে কাঁদতে হাত জোড় করে বললেন - 

" আমরাও অপরাধী রে মা । আজ থেকে ত্রিশ বছর আগে আমার গর্ভের প্রথম সন্তান হিজড়ে হয়ে জন্ম নিয়েছিল । এতে আমি মনে কষ্ট পেয়েছিলাম বটে কিন্তু সন্তানকে পরিত্যাগ করার অভিপ্রায় ছিল না ।"

" তবে সমাজ ও পরিবারের চাপে একবছর পর আমার স্বামী বাচ্চাটিকে রেলস্টেশনে রেখে এসেছিল । আমিও নির্দয়া পাষাণী মা হয়ে সবটাই মেনে নিয়েছিলাম । কিন্তু তারপর আর আমার সন্তানটির কোনো খোঁজ পাইনি । "


জেসমিন এবার হাসতে হাসতে উত্তর দিল -

" সেই সন্তান আর কেউ না, আমিই ছিলাম মা ।"

" সোনালী মা অনেক আগেই আমার পিতৃপরিচয়  আমাকে বলেছিল ।" 


নিথীশবাবু আর বিমলাদেবী বিস্মিত হয়ে কাঁদতে লাগলেন । 

নিথীশবাবু গদ গদ কণ্ঠে - 

" জানি মা আমি বাবা হবার যোগ্য নই, আমি পাষাণ , আমি ভীতু । আর তোর কাছে তো আমার ক্ষমা চাওয়ারও মুখ নেই । তবে আশীর্বাদ করিস মা তোর বোনটা যেন সুখে থাকে ।"

বিমলাদেবী কাতরস্বরে - " মারে আজ এতগুলো বছর পর তোকে দেখতে পেয়ে মনে অনেকটা শান্তি পাচ্ছি । তবে জানিস, আমি মা হবার যোগ্য নই । ঈশ্বর আমাকে ক্ষমা করবে না ।" 


এবার জেসমিন ওদের দুজনকে ধরে বললো - 

" না মা - বাবা তোমাদের আর দোষ দিয়ে কি হবে । তোমরা আমাকে পৃথিবীর আলো দেখিয়েছো এটাই অনেক । সবটাই আমার ভাগ্যের পরিহাস।"

" আর তোমরা যদি সেদিন আমাকে পথে না ফেলে আসতে তাহলে আমার মতো বাকী অভাগীদের পাশে কে দাঁড়াতো বলো ।"


এবার রুদ্রাক্ষীর গালে আদর করে জেসমিন-

" বোন তুই অনেক সুখী হবি । আমার জীবনের সমস্ত সুখ আমি তোকে দিলাম।  "

" আজকে তোকে দেখার জন্যেই আমি এই বাড়িতে এসেছিলাম । সুখী থাক বোন । নে এই গয়নাটা তোকে দিলাম । " 

বলেই জেসমিন ওর গলা থেকে একটি চেইন খুলে রুদ্রাক্ষীকে দিল । 


তারপর - "চললাম মা , তোমরা ভেবে নিও যে তোমাদের প্রথম সন্তান আর নেই । "

বিমলাদেবী এবার কেঁদে চিৎকার করে -

" থেকে যা না মা , অন্তত আজকের দিনটা ।"

জেসমিন হেসে - 

" না মা আমার জীবন এই জগতের সুখের জন্য নয় । তাছাড়া আমি এখানে থাকলে তোমাদের ভদ্রসমাজের লোক এখানে আসবে না । আমি তো হিজড়ে তাই ।"

" তাছাড়া আমার বোনের পরিচয়টাও আমি আমার সঙ্গে রাখতে চাই না ।"

" আমি চললাম মা "

" এই চল রে বাবলী - চম্পা । " 

বলেই সদর দরজা দিয়ে বেরিয়ে গেলো জেসমিন ও তার দলের সদস্যরা । 

তখনও বিমলাদেবী এবং নিথীশবাবু কাঁদছিলেন ।