বৃহন্নলা
" কিগো দাদা - বৌদি - মাসি - মেসোরা কোই সবাই ..........?"
"বেড়িয়ে এসো , বেড়িয়ে এসো ।"
এসব বলে একদল পুরুষ কণ্ঠধারী নারী অদ্ভুত কায়দায় করতালি দিতে দিতে বাড়িতে ঢুকে পড়লো । আজ নিথীশবাবুর ছোটমেয়ে রুদ্রাক্ষীর বিয়ে। বাড়িতে বেশ আড়ম্বর আয়োজন । এরই মধ্যে হঠাৎ কিছু লোক এসে বাড়ির পরিবেশটাই যেনো পাল্টে দিলো ।
" আরে সব চেয়ে চেয়ে কি দেখছো ? "
" মেয়ে কোই ? "
" এই বাবলী , চম্পা - রুপমতী গান ধর দেখি ..........."
তারপর ওরা ঢোলক বাজিয়ে কয়েকজন গান ধরলেন -
"বন্ধু বিনে প্রাণ বাঁচে না ........"
আর বাকি কয়েকজন শুরু করলেন নৃত্য । ততক্ষনে কন্যার মা - বাবা দুজনেই ঘরের ভেতর লুকিয়ে পড়লেন । এরই মধ্যে বেশকিছু দর্শক বিয়ে বাড়িতে এসে জড়ো হলেন এবং তাদের মধ্যে গুঞ্জন শুরু হলো -
" হিজড়া আইসে, হিজড়া আইসে । "
কয়েকজন আবার বাড়ির বাচ্চাদের আড়াল করে লুকিয়ে রাখলেন । মনে হলো কোনো ভিনগ্রহী যেন বাড়িতে ঢুকেছে । আধুনিক সভ্যতা যেন মানতে নারাজ যে এরাও আমাদের মতো মানুষ ।
যাই হোক বেশ কিছুক্ষন নাচ - গানে পরিবেশটাকে মাতিয়ে অবশেষে তারা হাঁক দিলেন -
" কোই গো মেয়ের বাপ ......... বাইরে এসো ......... "
"এবার আমাদের বিদেয় করো ।"
এদের দলের সর্দার জেসমিন ঘরে যাবার জন্য এগোবার উপক্রম করলেই একজন ভদ্রলোক এসে উনার হাতে দুশো টাকার একটি নোট দিতে চাইলেন ।
জেসমিন উনার দিকে তাকিয়ে -
" কিরে হিরো ভিক্ষে দিচ্ছিস ......."
" হিজড়েরা কারো বাড়িতে ভিক্ষে করতে যায় না বুঝলি"
"হিজড়েরা দান নেয়, আর এর বদলে অনেক আশীর্বাদ দিয়ে যায় ।"
" যা যা কেটে পর ..... মেয়ের বাপকে ডাক । "
" বলে দে পাঁচ হাজার টাকা নিয়ে আসতে ।"
ঘরে বসে নিথীশবাবু সবটাই শুনছিলেন । তথাপি খিটখিটে মেজাজের লোক নিথীশবাবু বেরিয়ে আসার কোনো আগ্রহ প্রকাশ করলেন না ।
কিছুক্ষন বাদে দলের সর্দার জেসমিন উনার দল নিয়ে সোজা ঘরের দরজার সামনে গিয়ে ডাক দিলেন ।
" কী হলো মেয়ের বাপ পয়সা দেবার ভয়ে বাইরে বেরোচ্ছেন না ?"
" লাগবেনা পয়সা আসুন আসুন বাইরে আসুন ।"
নিথীশবাবু খানিকটা বিরক্ত হয়েই দরজার কপাট খুলে বেরিয়ে এলেন। এসেই মুখে একটা অস্পষ্ট হাসি দিয়ে বললেন-
" বলুন কত টাকা চাইছেন আপনারা ?"
জেসমিন উচ্চস্বরে উত্তর দিল -
"এতক্ষণ ঘরে লুকিয়ে থেকে এখন টাকার কথা বলছেন......."
"ঠিক আছে দিন পাঁচ হাজার টাকা । "
নিথীশবাবু হতভম্ব হয়ে -
" আরে এসব কি বলছেন । বহু কষ্টে মেয়েটাকে বিয়ে দিচ্ছি ঋণ - ধার করে । অতো টাকা দেবার সাধ্য আমার নেই ।"
তখন বাকিরা কিছু বলতে চাইলেও জেসমিন ওদেরকে থামিয়ে -" ঠিক আছে দিন দুহাজার টাকা , কিন্তু এর থেকে এক পয়সাও কম মানবো না । "
কিন্তু ততক্ষণে নিথীশবাবুর স্ত্রী বিমলা দেবীর মনে কোথাও যেন একটা খটকা লাগছিল । জেসমিনকে সে যেন কোথাও দেখেছে । উনার অন্তরটা যেন কেঁপে কেঁপে জানান দিচ্ছে জেসমিন উনার আপন কেউ ।
যাই হোক তারপর নিথীশবাবু ওদের হাতে দুহাজার টাকা ধরিয়ে দিলেন ।
টাকা নিয়ে ওরা বললো -
" আপনার মেয়েকে ডাকুন আমরা আশীর্বাদ করবো । "
নিথীশবাবু রুদ্রাক্ষীকে ডেকে আনলেন।
জেসমিন উচ্চস্বরে -
" এই চম্পা - বাবলী উলু দে উলু দে ......"
রুদ্রাক্ষীর মাথায় হাত রেখে জেসমিন -
" তুই স্বামীর ঘরে খুব সুখী হবি বোন। আমি জীবনে যেসব সুখ পাইনি তুই সেই সমস্ত সুখ পাবি । বছর ঘুরতেই সন্তানের মুখ দেখবি । অতুল সম্পদ হবে তোর স্বামীর । "
তখন নিজের অজান্তেই বিমলাদেবীর চোখ বেয়ে জল নেমে এলো ।
বিলম্ব না করে বিমলা দেবী জেসমিন কে জিজ্ঞেস করেই ফেললেন -
" তোমার বাড়ি কোথায় মা ?"
জেসমিন হেসে উত্তর দিলো-
" বাড়ি ! হা হা হা .... আপনাদের মতো ভদ্রলোকেরা আমাদেরকে সমাজে থাকতে দেয় নাকি ?"
" আপনারা হচ্ছেন ভদ্রলোকের জাত, আপনারা সন্তান পয়দা করেন নিজেদের স্বার্থের জন্য আর সন্তান পছন্দ না হলে পথের আস্তাকুঁড়ে ছুঁড়ে ফেলতেও আপনাদের বিন্দুমাত্র দ্বিধাবোধ হয় না । "
নিথীশবাবু এতক্ষণ চুপচাপ সব শুনছিলেন। কিন্তু একথা শুনে তিনি হঠাৎ চেঁচিয়ে উঠলেন ।
" কি সব বলছেন আপনি?"
জেসমিন এবার বিজ্ঞের ভাব ধরে -
" বাবু.... যখন আমি এক বছরের শিশু তখন মা - বাবা আমায় রেলস্টেশনে ফেলে রেখে যায় , শুধুমাত্র হিজড়ে হয়ে জন্ম নিয়েছিলাম বলে ।"
" আচ্ছা বলুন না হিজড়ে হাওয়াটা কি আমার অপরাধ ছিল ?"
"কিন্তু জীবনভর এই শাস্তিটা আমিই ভোগ করছি । "
" একদল লোক রেলস্টেশন থেকে উঠিয়ে নিয়ে আমাকে হোমে রেখেছিল , ওরা আমাকে নবজাতক থেকে বড়ো করেছিল ঠিকই কিন্তু আমার বয়স যখন পাঁচ বছর তখন হোম কতৃপক্ষও আমাকে আর রাখতে চায় নি, আমি হিজড়ে বলে ।"
বিমলাদেবীর দুচোখ বেয়ে অশ্রুধারা পড়ছিল ।
জেসমিন আবারো বললো -
" পথে পথে ঘুরেছি, পেটে ক্ষিদের জ্বালায় চিৎকার করে কেঁদেছি , কিন্তু কেউ একবিন্দুও সহানুভূতি প্রকাশ করেনি। "
" তারপর যখন পেটের ক্ষুধা ভয়ানক রূপ ধারণ করতো তখন পথের আস্তাকুঁড়ের পচা - গলা খাবার খেতাম । মাঝে মাঝে কেউ দয়া করে কিছু খাবার দিতো। এভাবেই ক্ষূন্নিবৃত্তি হতো আমার।"
বিমলাদেবী বললেন - " তারপর এই দলে কিভাবে এলে ?"
জেসমিন বললো -
" তারপর একদিন আমি এক বৃহন্নলা দলের নজরে আসি । তারা আমাকে নিয়ে যায় তাদের সর্দার সোনালীর কাছে ।"
" ইনি আমাকে গ্রহণ করেন । আমাকে স্নেহ - ভালোবাসা দিয়ে বড়ো করে তুললেন। তিনিই আমাকে নাম দিলেন জেসমিন । "
জেসমিনের চোখে একটু জল দেখা দিল -
" আজ হয়তো সোনালী মা নেই । কিন্তু যাবার আগে তিনি আমাকে গুরুদায়িত্ব সপে গিয়েছিলেন যে, এই পাষাণ সমাজ থেকে বিতাড়িত কোনো হিজড়ে শিশু যেন পথে - ঘাটে পড়ে কষ্ট না পায় ।"
" আপনাদের থেকে যে অর্থ নেই মা , সেগুলা দিয়েই ভদ্রলোকের সমাজ থেকে বিতাড়িত হিজড়ে শিশুরা খাবার পায় , পড়াশুনা করে । "
লজ্জায় - ঘৃণায় অপমানিত নিথীশবাবু এতক্ষণ সবকিছু শুনবার পর, উনার পাথরের হৃদয়টা যেন ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে চোখ বেয়ে জল নামছিল ।
বিমলাদেবী কাঁদতে কাঁদতে হাত জোড় করে বললেন -
" আমরাও অপরাধী রে মা । আজ থেকে ত্রিশ বছর আগে আমার গর্ভের প্রথম সন্তান হিজড়ে হয়ে জন্ম নিয়েছিল । এতে আমি মনে কষ্ট পেয়েছিলাম বটে কিন্তু সন্তানকে পরিত্যাগ করার অভিপ্রায় ছিল না ।"
" তবে সমাজ ও পরিবারের চাপে একবছর পর আমার স্বামী বাচ্চাটিকে রেলস্টেশনে রেখে এসেছিল । আমিও নির্দয়া পাষাণী মা হয়ে সবটাই মেনে নিয়েছিলাম । কিন্তু তারপর আর আমার সন্তানটির কোনো খোঁজ পাইনি । "
জেসমিন এবার হাসতে হাসতে উত্তর দিল -
" সেই সন্তান আর কেউ না, আমিই ছিলাম মা ।"
" সোনালী মা অনেক আগেই আমার পিতৃপরিচয় আমাকে বলেছিল ।"
নিথীশবাবু আর বিমলাদেবী বিস্মিত হয়ে কাঁদতে লাগলেন ।
নিথীশবাবু গদ গদ কণ্ঠে -
" জানি মা আমি বাবা হবার যোগ্য নই, আমি পাষাণ , আমি ভীতু । আর তোর কাছে তো আমার ক্ষমা চাওয়ারও মুখ নেই । তবে আশীর্বাদ করিস মা তোর বোনটা যেন সুখে থাকে ।"
বিমলাদেবী কাতরস্বরে - " মারে আজ এতগুলো বছর পর তোকে দেখতে পেয়ে মনে অনেকটা শান্তি পাচ্ছি । তবে জানিস, আমি মা হবার যোগ্য নই । ঈশ্বর আমাকে ক্ষমা করবে না ।"
এবার জেসমিন ওদের দুজনকে ধরে বললো -
" না মা - বাবা তোমাদের আর দোষ দিয়ে কি হবে । তোমরা আমাকে পৃথিবীর আলো দেখিয়েছো এটাই অনেক । সবটাই আমার ভাগ্যের পরিহাস।"
" আর তোমরা যদি সেদিন আমাকে পথে না ফেলে আসতে তাহলে আমার মতো বাকী অভাগীদের পাশে কে দাঁড়াতো বলো ।"
এবার রুদ্রাক্ষীর গালে আদর করে জেসমিন-
" বোন তুই অনেক সুখী হবি । আমার জীবনের সমস্ত সুখ আমি তোকে দিলাম। "
" আজকে তোকে দেখার জন্যেই আমি এই বাড়িতে এসেছিলাম । সুখী থাক বোন । নে এই গয়নাটা তোকে দিলাম । "
বলেই জেসমিন ওর গলা থেকে একটি চেইন খুলে রুদ্রাক্ষীকে দিল ।
তারপর - "চললাম মা , তোমরা ভেবে নিও যে তোমাদের প্রথম সন্তান আর নেই । "
বিমলাদেবী এবার কেঁদে চিৎকার করে -
" থেকে যা না মা , অন্তত আজকের দিনটা ।"
জেসমিন হেসে -
" না মা আমার জীবন এই জগতের সুখের জন্য নয় । তাছাড়া আমি এখানে থাকলে তোমাদের ভদ্রসমাজের লোক এখানে আসবে না । আমি তো হিজড়ে তাই ।"
" তাছাড়া আমার বোনের পরিচয়টাও আমি আমার সঙ্গে রাখতে চাই না ।"
" আমি চললাম মা "
" এই চল রে বাবলী - চম্পা । "
বলেই সদর দরজা দিয়ে বেরিয়ে গেলো জেসমিন ও তার দলের সদস্যরা ।
তখনও বিমলাদেবী এবং নিথীশবাবু কাঁদছিলেন ।