Jul 31, 2023

মো: ইউসুফ আলম

 ঝরা পাতা

“ আজ ঝরা পাতা ভালো লাগে, ভালো লাগে শরৎ
চাইছি আমার মনের ঘায়ে, একটু তোমার পরশ”
কেমন আছো ?
ভালো ?
নাকি শুকিয়ে গেছো আরো ?… তোমার ডায়েট প্ল্যান টা আমি কোনদিনই বুঝে উঠতে পারিনি। আজকাল তোমাকে দেখার জন্য প্রায়ই মনটা ব্যাকুল হয়ে উঠে।
এই শীতকাল এলেই তোমার শরীর খারাপ হয়ে যায়, নিশ্বাসে সমস্যা হয়।
তুমি জানো ?
আমাকে ছেড়ে যখন চলে গেছিলে তখন ভেবেছিলাম খুব, কাঁদলে তো তোমার খুব অ্যালার্জি হয়। মনে মনে চেয়েছিলাম যাতে না কাঁদো।
আচ্ছা বলোনা, কেমন আছো ?
ভালো ?
মনে পড়ে আমাকে ?
সেই অভিমান, রাগ, আদর, চুমু, রাত জেগে কথা বলার সেই দিনগুলি ?
আমার গলায় গান না শুনে ঘুমাতেই না, কি পাগলামি না করতে। একটা ছোটো বাচ্চার মত আবদার করতে সবসময়।
মনে তো পড়েই, হয়তো কাওকে বুঝতে দাওনা। আমার থেকে কঠিন তুমি, সেই ছবি তো বজায় রাখতে হবে।
তুমি জানো ?
তুমি চলে যাওয়ার পর আমি খুব অসুস্থ হয়ে পড়েছিলাম। ঘাড় থেকে মাথা হয়ে কপাল অব্দি খুব ব্যাথা করতো। বাড়িতেও কিছু বলিনি। নিজেই ডাক্তার এর কাছে গেছিলাম, ডাক্তার বললো নিজেকে আর অত্যাচার না করতে। নাহলে নাকি নার্ভ এর ঔষধ খেতে হবে। কি করবো বলো… অনেক রাত ঘুমাতে পারিনি। চোখের নিচে কালো ছোপ পড়ে গেছে।
শরীরটা কেমন জানি তামাটে হয়ে গেছে। খাবার না খেতে খেতে শরীর অনেক দুর্বল হয়ে গেছে।
তুমি জানো ?
তুমি ছেড়ে চলে যাবার পর নিজেকে একরকম বন্দী করে রেখেছিলাম একলা ঘরে। কোনোকিছুই ভালো লাগতোনা। ফোন নম্বর টাও পাল্টে নিয়েছিলাম তোমার কথা মত।
তুমিই তো চেয়েছিলে, তুমি চাইলেও যেনো আমাকে ফোন করতে না পারো, তাই জন্য আমি যেনো নম্বর টা পাল্টে ফেলি.. মনে আছে ?
ফোন কি করেছিলে আমার খবর জানার জন্য ?
হয়তো করেছিলে…।
তুমি জানো ?
রোজ রাতে কোনো না কোনোভাবে আমার স্বপ্নে চলে আসো তুমি। কথা হয়, রোজ গভীর রাতে স্বপ্ন ভেঙে উঠে বসে থাকি। কাঁদি মাঝে মাঝে। আবার নিজেকে সামলাই।
চোখের জল এখন বাগ মানে, শিখেছি কান্না ভিতরে আটকাতে। কিন্তু গলার ভাঙা আওয়াজটা সামলাতে পারিনা, এখনো কান্না পেলে চুপ করে থাকি যেনো কেও না বুঝে। কথা বললেই তো সবাই বুঝে যাবে যে।
তুমি জানো ?
তোমার সেই সবুজ রঙ এর ছোট ক্লিপ’টা আর তোমার খাওয়া আইস ক্রীম এর সেই চামচ দুটো এখনো যত্ন করে রাখা আছে। এগুলাই আমার কাছে খুব দামি। তুমি বলেছিলে আমি নাকি ফিল্মি। এসব জমিয়ে রাখি বলে। আজ দেখো, এগুলা ছাড়া আর কিছুই নেই আমার কাছে তোমার স্মৃতি হিসেবে। তোমার কথা রাখতে গিয়েই তোমার সব ফটো আমি ডিলিট করে দিয়েছিলাম।
তুমি জানো ?
খুব মনে পড়ে তোমার মুখ, তোমার রাগ, তোমার হাসি, তোমার আদর, তোমার স্পর্শ, তোমার একঘেয়েমি। এই দেখো, আবার চোখ ভিজে গেছে।
আজ সকাল থেকেই কেনো জানি ঘোলাটে লাগছে সবকিছু।
তুমি জানো ?
খুব ইচ্ছে করে একবার দেখি, একবার জিজ্ঞেস করি… কেমন আছো ?
জানি সম্ভব না আর।
তুমি জানো ?
তুমি আসার আগে যতটা একা ছিলাম, চলে যাওয়ার পর আরো অনেক বেশি একা হয়ে গেছি। অনেকের সাথেই যোগাযোগ বন্ধ।
খুব চেয়েছিলাম, বলেও ছিলাম… যেও না।
কেঁদে বলেছিলাম তোমার হাত ধরে, প্লিজ যেওনা, আমি ভেঙে যাবো। কিছু ঠিক হবেনা। তোমাকে ছাড়া কিছুই ভাবতে পারিনা।
চেয়েছিলাম তুমি থাকো আমার এই কঠিন সময়ের সাক্ষী হয়ে। জীবনের প্রতিটা মুহূর্তে, প্রতিটা পদক্ষেপে আমি তোমাকে পাশে চেয়েছিলাম।
ছাড়ো, এসব বলে কি লাভ।
তুমি’ই বা কি করতে !
একটা সুখী, অনটনহীন জীবনের ভরসা তো দিতে পারছিলাম না আমি। চলে গেছো একটা সুন্দর ভবিষ্যতের জন্য, আমি মোটেও রাগ করে নেই এখন আর।
তোমার মনে আছে ?
তোমায় বলেছিলাম যে,
একদিন আমি স্বপ্নে দেখেছিলাম, কোনো এক ঈদ এর সকালে আমি নামাজ পড়ে বাড়ি ফিরেছি, আর তুমি স্নান সেরে আধো ভিজা চুল নিয়ে নীল শাড়ী পড়ে গেট খুলছো।
সে স্বপ্নকে বাস্তব করার খুব চেষ্টা করেছিলাম, হয়নি।
তুমি জানো ?
প্রতিটা রাস্তা, প্রতিটা সকাল, প্রতিটা রাত আমাকে তোমার কথা মনে করিয়ে দেয়।
গাছের নিচে বসে এই বসন্তে ঝরাপাতা গুলোর দিকে তাকিয়ে আজ নিজেকে এদের দলেরই একজন বলে মনে হয়। এদের জীবনেও সবুজ এসেছিল, প্রাণ ছিলো, আজ বেরঙ ।
তোমার মনে আছে ?
অভিমান করে যখন ঝগড়া করতে, তোমাকে হাজার বাহানা দিয়ে মানিয়ে নিয়ে আমি আদুরে গলায় ফোন এ বলতাম, তোমার পেটে একটু হাত রেখে ঘুমাই ?
হয়তো, তোমার পেটে হাত রাখতে পারিনা বলেই ঘুম আঁড়ি দিয়েছে।
আজ ১৪২ দিন।
তোমার সাথে কথা নেই, দেখা নেই। শুধু আজও মনে আছে, যেদিন শেষবার তোমাকে দেখেছিলাম, তুমি দেখোনি আমায়।
আমি দূরে লুকিয়ে তোমাকে দেখেছিলাম, কালো জিন্স, কালো একটা টপ আর উপরে বোতাম খোলা তোমার সেই প্রিয় তোমার ভাষায় Winter Check শার্ট টা।
কাঁধে প্রিয় ব্যাগ। ডান হাতে মোবাইল।
চোখ ভেজা অবস্থায় আমি ফিরছিলাম যখন, ইচ্ছে মত কেঁদেছিলাম, তুমি তো জানোও না।
সেদিন জানতাম, এক শহরে থাকলেও, দেখা আর হবেনা।
আর অপেক্ষা করতে হবেনা তোমার কলেজ যাওয়ার সময় একটু দেখবো আশা নিয়ে। তোমাকেও কোনো কিছুতে বাধা দেবোনা, আমার টলমলে চাকুরী নিয়ে তোমার ভাবনা গুলোর অন্ত হওয়া দরকার ছিলো।
তুমি জানো ?
তোমার ফেসবুক এর একটা ফটো তে যখন একটা ছেলে তোমার হাসি আর ঠোঁট নিয়ে মন্তব্য করেছিল, রাগে অভিমানে আমি সেই রাতে ধুয়ায় ডুবে গেছিলাম, কেঁদেছিলাম ।
আগে যাদের সাথে তুমি কথা পর্যন্ত বলতে না, কারণ তোমার নজরে ওরা খারাপ ছিল, কিংবা আমি ওদের পছন্দ করতাম না, আজ ওদের সাথে তোমার আড্ডা। খুব অপমানিত লাগে আমার। তাই এখন আর তোমার ফেসবুক ওয়ালও দেখিনা।
অনেকটা স্বাভাবিক আছো হয়তো, নাকি দেখানোর চেষ্টা করো… জানিনা।
আমি ভালো নেই। প্লিজ যেভাবে বাস্তবে চলে গেছো, সেভাবেই আমার ভাবনা থেকেও চলে যাও।
একটা রাত ঘুমাতে চাই। না, আর তোমার পেটে হাত রেখে না, এভাবেই ঝরা পাতা দের মতো নিশ্চিন্তে বেরঙ হয়ে ঘুমাতে চাই।
জানো টমটম ?
এই নামে আমি তোমাকে রাগানোর জন্যই ডাকতাম। কিন্তু, জীবনের এক মুহূর্তে সময় এভাবে রেগে গিয়ে আমাদের আলাদা করে দেবে ভাবিনি। খুব অসহায় লাগছে, একলা এই ঘরে আমার। জানিনা কোন রেশমী জোছনায় সুখের খুঁজে কার বুকে ডুবে আছো সব ভুলে। ভালো থেকো ভুলে গিয়ে, এখনো তোমার জন্যই দোয়া করি। ঈশ্বর যেনো তোমাকে সবকিছু দেন যা তুমি চাও, যা আমি দিতে পারিনি।
বছর কুড়ি পর দীর্ঘশ্বাসে ভর করে দেখা হয়ে গেলে কোথাও, চিনতে পারবে তো ?
আমি জানি, তুমি…..
কিগো শুনছো ? ওঠো…. এই উঠো…
আজ আবার অফিসে দেরি হয়ে যাবে। এই….
হঠাৎ ঘুম ভাঙলো, দেখি নীল শাড়ি পড়া আমার বউ স্নান সেরে ভিজা চুলে আমাকে ডাকছে 
হাসি মুখে ঘুম থেকে উঠলাম আর ওর কপালে একটা হামি খেলাম। আর ভাবতে লাগলাম স্বপ্ন টার কথা, স্মৃতির পাতায় হারিয়ে গিয়েও বেঁচে আছে।