মধ্যবিত্তের বিচার
নয়ন তার বাড়ির দাওয়াই বসে কি যেন ভেবে ভেবে হাওয়ায় কথা বলছিল। এমন সময় তার দাস বন্ধু এসে,
"কিরে দু-দিন পর কালীপুজো, খবর কি? বাজিপটকা কিন নাই, চল।"
কিরে নয়ন কি ভাবছো?
আরে সাগর কিছু নই, সেই সাত বছর আগের কথা।
"কি কথা শুনতে পারি কি?"
কেন জানিনা এই দীপাবলি উৎসবটা আসলেই এক অবাঞ্ছিত খবর বারবার কানে আসে; হয়তো বা দীপাবলি উৎসবটা যেন আমার পরিবার ভেঙে যাওয়া মুহুর্ত, আমার জীবনের উচ্ছিট দিন। এই উৎসবটা আসলেই আমার সেই অতীতের কথা মনে পড়িয়ে দেই, যা আজও আমাদের বাড়িতে দীপাবলি নিশীথের অন্ধকার হয়ে থাকে! কেন জানিনা মনে হচ্ছে আমার জন্ম লগ্নটাই দুঃখ লগ্ন; নয়তো বা আমি জন্ম নিয়েছি সংসারের সমস্ত দুঃখ - নটখট সহ্য করার জন্য। বিধাতার এমনই পরিহাস আমার নয়ন নামই রাখা হয়েছে যাতে আমার চোখের জল মুহূর্তে মুহূর্তে ঝরতে থাকে! হা: বিধাতা এই মায়া সংসার থেকে আমায় তুলে নিলে বাঁচি, চোখের জলতো শুকাবে!
সাগর। এ কি বলছিস পাগল, মানুষের জীবনে দুঃখ না আসলে সুখের মজাটা বুঝবে কি করে।
নয়ন। নারে ভাই, আমার হাসি যেন দিনে বেলার তারা!
"আচ্ছা ঘটনাটা কি শুনি ভাই?"
দিনটা ছিল দীপাবলির একদিন আগের ঘটনা। আমার বড়দা কোলকাতায় এক বেসরকারি দপ্তরে চাকরি করে, পুজোতে কাজের ব্যস্ততায় ছুটি পাইনি বলে দীপাবলিতে আসার কথা জানিয়েছে। আমি দাদাকে জানিয়েছি আমার জন্য জিন্সের পেন্ট আর সাদা শার্ট আনতে। বাড়িতে কতই না আনন্দ; আর হবেই বা নাই কেন, বড়ো ছেলে সাত বছর পর বাড়িতে আসছে। বাবা মায়ের হাসি গাল ছড়িয়ে কান পর্যন্ত উঠে যায়। বড়ো ছেলের জন্য নাড়ু - জলপাই আচার ভিন্ন ভিন্ন পছন্দ মতো জিনিস তৈরি করে রেখেছে মা। আমি নদীর তীরে মাকে না জানিয়ে শর্বানীর সাথে একটু ঘুরতে গেলাম। নদীর তীরে শর্বানীর সাথে স্নিগ্ধ নাতিশীতোষ্ণ বাতাস গায়ে স্পর্শ করে আমার মন প্রাণ পুলকে ভরে উঠল। দু - জনে হাতে হাত ধরে অনেক গল্প করলাম, আর বললাম আমার বড়দা আসছে কোলকাতা থেকে তাই প্রতিদিন এভাবে দেখা করাটা কষ্টকর হলেও হতে পারে। শর্বানী বললো ঠিক আছে দীপাবলিতে তুমি ওই মাঠের শিব মন্দিরে এসো- হাতে হাত ধরে প্রদীপ জ্বালাবো।
"ঠিক আছে পাগলী তুমি যা বলো।"
নদীর প্রবাহে শিউলি ফুলের ভেসে যাওয়া যেন মায়ের বিসর্জনের কথা মনে পড়িয়ে দেয়। আজ বাদে কাল দীপাবলি, আমার মর্ম উত্তেজিত। ঠিক আছে পাগলী বাড়িতে যাও সন্ধা হতে চললো, তোমার সাথে থাকলে যেন মুহূর্তের মধ্যে সন্ধ্যা হয়ে যায়।
"না আমি বাড়ি যাবো না, তোমার সাথে থাকতে আমার ভাল লাগে"!
একথা বলে সে আমার বাঁ - হাত জড়িয়ে ধরে বসে রইলো।
"আরে পাগলী স্কুল পড়ুয়া ছাত্রকে যদি এইভাবে প্রেম করতে দেখে তাহলে আমাদের দু - জনকে মেরেই ফেলবে"!
কোন্ মতে বুঝিয়ে তার চাঁদবদনের কপালে এক চুম্বন করে আমি ফিরে এলাম। সাবধানে যাবি পাগলী।
বাড়িতে এসে দেখি ঘর - টর যেন ঝকমক করছে, কি খুশি; আমি আনন্দে আত্মহারা। সন্ধ্যায় মা'র সাথে দাওয়াই বসে কিছু গল্প - হাসি ঠাট্টা করছিলাম, বড়দা ফোন করে জানালেন সে কাজ শেষ করে দোকানে আমাদের জন্যে কাপড় কিনতে যাচ্ছে। বাড়িন্দাই বসে মা আর বাবা কি যেন খিচুড়ি - পায়েসের কথা বলছে। আমি মনে মনে ভাবলাম যদি পাগলীটা আমার সাথে থাকতো! ভাবতে না ভাবতেই পাগলীর ম্যাসেজ;
"কিরে পাগলা কি করছো।"
"তোমার কথাই ভাবছিলাম পাগলী।"
"হুঁ, এত ভীমরতি দেখিয়োনা; কুত্তা।"
"এই পাগলী যাও গিয়ে পড়তে বস্।"
হুঁ যাচ্ছি।
ভাত খেয়ে আমরা টিভি দেখছিলাম,এমন সময় ঠিক বারোটাই মায়ের ফোন বেজে উঠল। ফোন ধরতেই মা চিৎকার করে উঠল। ওই ফোন কলটাই ছিল আমার জীবনের দুঃখের আরম্ভন! ফোন করেছে হাসপাতাল থেকে, বড়দাকে রাস্তা থেকে রক্তাক্ত অবস্থায় কেউ হাসপাতালে নিয়ে ভর্তি করিয়ে দিয়েছে! মা - বাবা যথাক্রমে অজ্ঞান আর স্তম্ভিত মূর্তি, আমি যেন এক জীবিত মৃত্যু দেহ। রাতটা কিভাবে যে কেটে গেল আমিই জানি। মা সকাল সকাল কোলকাতার জন্য রওনা দেই, মা পৌঁছে ফোন করলো বড়দা অজ্ঞান,নাক - কান রক্তে ঝরঝর করছে। মাথা ফেটে এক বিভৎস রূপ হয়ে গেছে, বাঁচার সম্ভাবনা খুবই কম! ডাক্তার জানিয়েছে ইমারজেন্সি অপারেশনের জন্য সাত লক্ষ টাকা জমা দিতে হবে, টাকার অংক শুনে যেন আমার মাথায় বাজ পড়ল; শুধু বাড়ির সীমানাটাই রেখে সমস্ত জমিন বিক্রি করে দিয়ে সঙ্গে সঙ্গে টাকা পাঠিয়ে দিল। এখন ভাই কোমাটে আছে। বাড়ির লোকজনতো আর বেঁচে ফিরবেনা বলে শ্রাদ্ধের কথা বলতে লাগল। সাত দিন পর মা ফোন করে বলল আরো সাত লক্ষ টাকা লাগবে। আমার নামে থাকা জমিনটা বিক্রি করল আর কিছুটা ধার করে সাত লক্ষ টাকা পাঠালো; জমিন - টাকা দিয়ে কি আর হবে প্রাণ বেচেঁ ফিরলেই হল! এমন বিপদের সময় নিজের আত্মীয়ও পাশে দাঁড়ালো না, হা: স্বার্থপর মানব! এক মাস কোমাটে থাকায় জ্ঞান ফিরে ভাই সব ভুলে যায়, এমনকি নিজেকেও চিনলো না! পুলিশ তদন্ত করে বলল যে ওই দিন রাত্রে দোকান থেকে ফিরে আসার সময় তারই এক বন্ধু কোন্ এক ঝগড়ায় মাথায় ইট মেরে ফেলে চলে গিয়েছে। এক অজানা ব্যাক্তি ভাইকে তুলে হাসপাতালে ভর্তি করে যান; ওই অজানা ব্যাক্তির কাছে আমার পরিবার চির কৃতজ্ঞ।
কোমা থেকে ফিরে এসে দাদা যেন এক নাবালক শিশু। মার স্নেহ ভক্তিতেই যেন ভাইকে বাঁচিয়েছে। মা বিভিন্ন দুঃখ কষ্ট বাধা বিপত্তি অতিক্রম করে ভাই এর যত্ন করতে লাগল। এদিকে আমাদের পরিবার রসাতলে চলে গেছে, আমার লেখা - পড়াতো লাটে উঠে গেল। অর্থের এত চাপ আমি পড়া ছেড়ে দিলাম, যেন আমার পায়ের নিচের ভূমিতল ফস্কে যাচ্ছে। ঋণের টাকা শোধ করতে না পারাই, বাড়ির সর্বস্ব বিক্রি করে দিলাম। এমন কি আমার জামা কাপড়, বই - খাতা কিছুই আর রইল না; আমরা এখন সর্বস্ব কাঙ্গাল! কোনো দিন না করা কাজও বাবা করতে বাধ্য হয়েছে, রাস্তার কাজ থেকে শুরু করে প্রায় চাকর সমান। আমি প্রায় ভিক্ষুক হয়ে গিয়েছিলাম, প্রতিটা লোকের মুখে প্রায় ছি ছি আর ছি; এখন যেন এই ছি - ছি শুনাটা আমি আর কিছুই মনে করি না। আত্মহত্যা করতে চাইলেও বাবা - মা' র সেই করুন দৃশ্য চোখে ভাসে।
ওইদিকে মায়ের অবস্থাও করুন, নিজে না খেয়ে অসুস্থ ভাইয়ের বায়না মেটাতে গিয়ে মা তার সর্বস্ব সোনা - দামি কাপড় সব বিক্রি করে দিয়েছে। সুবিচারের জন্য মা আদালতে মামলা করলেও, কাঙ্গালের কথা কেই বা শুনে! আদালতে গেলেও আজ নয় সাতদিন পর, তারিখ আসে আবার তারিখ পরে; আবার তারিখ আসে তারিখ পরে। সু - বিচারের মুহুরীকে টাকা দিতে দিতে মা আজ পথের ভিখিরি। বাতাসে শুনতে পেলাম বিরোধী দল নাকি কোন্ এক অবৈধ ভাবে মামলাকে চাপানোর চেষ্টা করছে। এমনকি বিরোধী দল তারা মাকে সরাসরি হুমকি দিচ্ছে মামলা নিয়ে নেওয়ার জন্য। তারিখ পড়ল আজ আদালতে আসার জন্য কিন্তু আবার তারিখ দিল এক মাস পর। এদিকে আমাদের পরিবার দু - টুকরো হয়ে গিয়েছে; আমি সুবিচারের আশা প্রায় ছেড়েই দিয়েছি। একমাস পর মা আদালতে পেশ হলে মিষ্টার সাহেব বাবু ঘোষণা করল তোমার ছেলে পথ দুর্ঘটনায় এমন হয়েছে তাই মামলা নিয়ে নিতে। যদি আজ আমাদের অর্থের অভাব নাই বা থাকতো তাহলে অনেক পূর্বেই সুবিচার পেয়ে যেতাম; আমাদের পাশে দাঁড়ানোর মতো কেউ নেই। বাড়ির আত্মীয়রাও আমাদের ঘর ছাড়া করার জন্য ষড়যন্ত্র করেই থাকে। আমরা প্রায় পথের কুলান্দ্রি হয়ে গিয়েছিলাম।
বন্ধু এটাই হল আমার অতীতের কথা। ওই দিন থেকে আজও আমরা এই দীপাবলিতে প্রদীপ প্রদীপ্ত করিনি! এই দীপাবলি আসলেই আমার সেই সাত বছর আগের ফোন কলটা কানে বাজে। ওই ফোন কলটাই ছিল আমাদের পরিবারের অন্ধ দীপাবলি। তাই এই দীপাবলিতে চারিদিকে আনন্দে আলো ঝলমল - ফুরফুর করলেও আমি আজও অন্ধকার আবদ্ধ ঘরে একা বসে থাকি। আগেতো আমি সবার সাথে মিশতে চেষ্টা করতাম কিন্তু এখন একা সরিয়ে আসতে চেষ্টা করি।
আজ বুঝলাম আমার নাম "নয়ন" মানেই দুঃখ ভরা জীবন।
জানিনা আমি কে, কেনই বা জন্ম নিয়েছি!