মাছের ঝোল
খাবারে গরম ভাত আর মাছের ঝোল হলে আর কিছুই চাইনা,দিলীপের। বিয়ের পর থেকেই দেখে আসছে পারুল। মাছের ঝোল এর উপর ভীষন একটা মায়া...। সেবার তরকারিতে নুন দিতে ভুলে গেছিল পারুল, দিলীপ দিব্যি খেয়ে উঠে গেলো। পারুল খেতে বসে দেখল তরকারি তে নুন দেয়া হয়নি। খুব লজ্জা পেয়েছিল সেদিন। দিলীপ নির্বিকার, বলল
আরে মাছের ঝোল খুব ভালো রেঁধেছ।
হাসি পেয়ে গেছিল পারুলের। এরকম কেউ মাছের ঝোল ভালবাসতে পারে... সত্যি ভাবা যায় না।
উৎসব পার্বনে নানান পদ রান্না হলেও দিলীপের জন্যে মাছের ঝোলের ব্যবস্থা করে রাখে পারুল। সেবার ওদের বিয়ের পর নিউ ইয়ার পার্টি দিয়েছিল বন্ধুদের নিয়ে। চিকেন, মাটন,বিরিয়ানি, পনীর নানান কিছু ...., এরই মধ্যে দিলীপ এসে জিজ্ঞেস করল, এই পারুল মাছের ঝোল করেছ তো?
আশ্চর্য এত্ত সব আইটেম আছে তারমধ্যে আবার মাছের ঝোল কি বলছ!
দিলীপ বলল, ওকে ঠিক আছে।
রাতে খুব হৈ চৈ মজা করে খাওয়া দাওয়া সেরে বন্ধুরা যে যার বাড়ী ফিরে গেলো। পারুল লক্ষ্য করছিল, দিলীপ ঠিকমত খায়নি, খাবার ছুঁয়ে দেখেছে শুধু।
শোবার ঘরে ঢুকে পারুল দেখলো, জানালার বাইরে উদাস দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে দিলীপ।
এই কি হয়েছে তোমার বল তো, ভালো করে খেলেও না? পারুল জিজ্ঞেস করল।
আরে কিছু না....
না বলতেই হবে.... তুমি আজ সবার সঙ্গে থেকেও ছিলে না, অন্য মনস্ক ছিলে, বলনা প্লিজ।
পারুল দিলীপের হাত চেপে ধরলো... আমি তোমার বন্ধু, তারপর স্ত্রী।আমাকে না বলতে পারা কোনো কথা তোমার থাকতে পারে না।বল... কি হয়েছে?
মুহূর্তে দিলীপের চোখ জানালার বাইরে জোনাকির আলো আঁধারিতে ছলছল করে উঠলো....।
জানতো পারুল, আমি তখন খুব ছোট। এরকমই একদিন জানিনা মনে নেই ঠিক নিউ ইয়ারস এর দিন ছিল কিনা... চার পাশের বাড়ি গুলোতে খুব উৎসব আনন্দ দেখছিলাম।
আর আমরা চার ভাই বোন, মা সারা দিন অভুক্ত। বাবা জমি জমার কাজে ওপার বাংলায় গিয়েছিলেন। সেখানে কি এক মিথ্যে মামলায় বাবাকে অ্যারেস্ট করে নেয়, পুলিশ। সে এক দিন গেছে আমাদের।
চারদিন এর জন্যে যাচ্ছি বলে গেছিলেন বাবা সেখানে মাস গড়াতে থাকে। আমি আর আমার বড় দাদা, কত আর বয়স তখন, আমার দশ দাদার তের হবে হয়ত। আত্মীয় স্বজনরা তখন খুব একটা সাহায্য করে নি। মা অনেক কষ্টে খাবার জোগাড় করতেন। বাবা যা টাকা দিয়ে গেছিলেন সেটা অল্প দিনেই শেষ হয়ে যায়।অল্প ধানের জমি ছিল, তিনবেলা না হলেও দিনে একবার ভাতের যোগাড় কোনমতে হয়ে যেত। মা ঢেঁকি পাড় দিয়ে চাল নিয়ে আসতেন। দাদা স্কুল থেকে ফিরে পুকুরে বড়শি পেতে রাখত। রাতে আমরা কুপি জ্বালিয়ে পড়তে বসতাম। আর যেই গরম ভাতের গন্ধ নাকে আসত....তখন দুই ভাই উনুনের ধারে বসে থাকা মায়ের পিছনে গিয়ে দাঁড়াতাম।....মা আমাদের লুকিয়ে চোখের জল মুছে ভাত বেড়ে দিতেন। কখনও আলু ভাতে, কোনোদিন পাতলা মাড় ভাত। এসবই বেশি। দাদা পুকুরে যে বড়শি পেতে রাখত, তাতে তখন কখনও শিঙ্গি মাছ, কখনও মৃগেল, রুই এর পোনা এসব উঠত। সেই রাতে যখন মা গরম ভাতের সঙ্গে মাছের ঝোল বেড়ে দিত.... সেই শীতের রাতে,ঠান্ডায় ধুঁয়া ওঠা ভাতের থালা.... ছোট্ট এক টুকরো মাছ পাতলা ঝোল। কী যে অমৃত লাগত খেতে কী বলব...! সেই বিনে মসলার তরকারির স্বাদ জিভে এখনো লেগে আছে। সেই দিনগুলো জীবনে অনেককিছু শিখিয়েছে। আজকের সফল দিলীপ বড়ুয়ার পিছনে সেই অভাবের দিনগুলোর অনেক অবদান পারুল। আর তখন থেকেই জানো তো মাছের ঝোল এর প্রতি আমার এই অবসেশান। কৃতজ্ঞতা ও বলতে পারো। যত রকমারি খাবার থাকুক না কেন মাছের ঝোল ভাত আমার কাছে সবসময় প্রথম ও প্রধান হয়েই থাকবে।
হ্যাঁ, দিলীপ তাই থাকবে। আমি কথা দিলাম। চল শোবে চলো। আগামীকাল আরেকটি নূতন দিন , নূতন সূর্য অপেক্ষা করছে।