Dec 23, 2023

মিঠুন রায়

জন্মশতবর্ষে স্মরণ

 সমরেশ বসু: এক ব্যতিক্রমী কথাশিল্পী 

অপ্রতিরোধ্য কলমে বাংলা সাহিত্যে যিনি নিজের স্থান নিজেই প্রতিষ্ঠা করেছেন তিনি সমরেশ বসু । তাঁর জন্ম নাম সুরথ নাথ বসু । জীবনের প্রতি পদক্ষেপে অনিশ্চয়তা , দারিদ্র্য, তাকে বিধ্বস্ত করেছে বারবার ।কিন্তু পরাস্ত করতে পারেনি তাঁকে। বরাবরই মাথা উঁচু করে বাঁচতে  শিখেছেন । বলা যেতে পারে , জীবনের প্রতিকূলতা গুলিই তাঁকে শক্তি জুগিয়েছে।

  তিনি লিখেছেন একশোর বেশী উপন্যাস এবং তিন শতাধিক গল্প। অনেক ছোটগল্প লিখেছেন । তাঁর  রচনায় রাজনৈতিক কর্মকান্ড , শ্রমজীবী মানুষের জীবন এবং যৌনতা সহ বিভিন্ন অভিজ্ঞতার সুনিপুণ বর্ণনা ফুটে  উঠেছে।

  ১৯২৪ সালের ১১ ডিসেম্বর ঢাকা শহরের রাজনগর গ্রামে জন্ম হয় সমরেশ বসুর । বাবা মোহনীমোহন বসু ও মা শৈবলিনী দেবী । পাঁচটি সন্তানের মধ্যে সমরেশ চতুর্থ । সদ্যোজাত এই চতুর্থ সন্তানের নাম রাখা হয় তড়বড়ি ।সব অংশের মানুষের সাথে সহজেই মিশে যেতেন এই বালক । প্রতিবেশীরাও তাকে খুব স্নেহ করতেন । বরাবরই ছিল নির্জনতা প্রিয় । নির্জনতার সন্ধানে চলে যেতেন শ্মশানে । স্কুলের গতানুগতিক শিক্ষা তার ভালো লাগত না । স্কুল ফাকি দিয়ে নানা রকম দুঃসাহসিক অভিযানে বের হতেন । তবে অবসর সময়ে প্রচুর গল্পের বই পড়তেন । ছবি আঁকার প্রতি প্রবল ঝোঁক ছিল । সমালোচক সরোজ বন্দ্যোপাধ্যায়ের লেখা থেকে জানা যায় সমরেশ বসু ভাল বাশি বাজাতে এবং গান গাইতে পারতেন । বালক সুরথ নাথের নাম সমরেশ দেন তাঁর বন্ধু ও শ্যালক দেবশঙ্কর মুখোপাধ্যায় । ১৯৩৯ সালে নৈহাটীর মহেন্দ্র স্কুলে ভর্তি হন  সমরেশ বসু । পরীক্ষায় ফেল করেন । এখানেই প্রথাগত শিক্ষার ইতি টানেন । কিছুদিন ঢাকেশ্বরী কটন মিলে কাজ করেন সমরেশ বসু । পরে আবার চলে আসেন নৈহাটীতে । 

  এক সময় কঠিন রোগে আক্রান্ত হন । বন্ধুর দিদি স্বামী পরিত্যক্তা গৌরী দেবী অসুস্থ সমরেশ বসুকে সুস্থ করে তোলেন । এই নারীই ছিল তাঁর প্রথমা স্ত্রী । চরম দারিদ্র্যতার জেরে এক সময় গরিফা থেকে ব্যারাকপুর পর্যন্ত সাহেবদের কোয়ার্টারে ডিম বিক্রি করে সংসার চালাতেন তিনি । এ সময় মার্ক্সবাদী ভাবধারার সাথে তিনি যুক্ত হন । ১৯৪৩ - ১৯৪৯ সাল পর্যন্ত ইছাপুর বন্দুক কারখানায় চাকরি করেন তিনি । এই সময় পর্বে তিনি কমিউনিস্ট পার্টির কর্মকান্ডে জড়িয়ে পড়েন । একসময় কারাবরণও করেন । জেল থেকে মুক্তি পাবার পর লেখাই হয়ে উঠে তাঁর নেশা । 

  আসলে জীবনে ব্যাপক অভিজ্ঞতা তাঁর সৃষ্টির পরিমাণকে বিশাল করে তুলেছে । ১৯৪৫ সালে প্রথম উপন্যাস 'নয়নপুরের মাটি' গ্রন্হাকারে বের হয় । পরবর্তী পর্যায়ে বের হয়েছে শ্রীমতী কাফে ( ১৯৫৬ ) , অমৃত কুম্ভের সন্ধানে(১৯৫৪ ) ,গঙ্গা ( ১৯৫৬ ) , শেষ দরবার ( ১৯৬৩ ) , স্বর্ণ পিঞ্জর ( ১৯৬৫ )।

    সমরেশ বসু প্রথমে গল্পকার , পরে ঔপন্যাসিক । মহাকালের রথের ঘোড়া , মানুষ শক্তির উৎস,যুগ যুগ জীয়ে, শেকল ছেঁড়া হাতের খোঁজে, তিন পুরুষ ইত্যাদি তাঁর লেখা রাজনৈতিক উপন্যাস । জগদ্দল , গঙ্গা , বাথান  ইত্যাদি গোষ্ঠী ভিত্তিক উপন্যাস । বিবর , প্রজাপতি , পাতক - এই উপন্যাস গুলিতে উচ্চবিত্ত শ্রেণীর সঙ্কট ও যৌনতার অনাবরণ প্রকাশ পেয়েছে । 

  তিনি রাজনীতি আশ্রিত উপন্যাস গুলিতে সমকালীন সমস্যা এবং শাশ্বত মূল্যবোধের মিশ্রণ ঘটিয়েছেন । মহাকালের রথের ঘোড়া তার লেখা অন্যতম শ্রেষ্ঠ উপন্যাস । এই উপন্যাসের নায়ক রুহিতন করছি । তার বাবা পোশপত কুরমি তরাইয়ের চা বাগানে চার পুরুষের মজুর । গল্পের শুরু থানার লকআপে রুহিতনের উপর চলছে অকথ্য অত্যাচার।নকশাল আন্দোলনের পটভূমিকায় ফুটে উঠেছে থানার উপর চলছে প্রচন্ড পুলিশি অত্যাচারের , নকশাল আন্দো রচিত এই কাহিনিতে লেখকের রাজনৈতিক দ্বিধার পরিচয় ফুটে উঠেছে রুহিতন চরিত্রে । আবার তিন পুরুষ উপন্যাসে দেখা যায় , সূর্যমোহন । সৌরীন , সুদীপ- তিন পুরুষ রাজনৈতিক জীবন থেকে রাজনীতিহীন জীবনের দিকে যাত্রা করছে । এই উপন্যাসের আর একটি চরিত্র সীতানাথ চরিত্রেও বিপ্লব সাধনার সঙ্গে মিশে গেছে রোমান্টিক স্বপ্নময়তা । 

  গ্রাম জীবনের পাশাপাশি নগর জীবনকেও খুব নিকট থেকে দেখেছেন সমরেশ বসু । তবে গোষ্ঠীজীবনের কথা লিখতে গেলে গ্রামই বার বার প্রাধান্য পায় । রাজনীতি ও গোষ্ঠী জীবন ওতোপ্রোত ভাবে জড়িয়ে আছে  উত্তরঙ্গ উপন্যাসে । জগদ্দল উপন্যাসে পাওয়া গেছে অন্যতম জটিল রূপায়ণ । একজন কর্মচ্যুত বেকার শিল্প শ্রমিক গোবিন্দর স্বপ্ন আর স্বপ্নভঙ্গের কাহিনী ফুটে উঠেছে বি.টি রোডের ধারে উপন্যাসে । শিল্প শ্রমিকদের জীবনই এর মুখ্য বিষয় । টানাপোড়েন উপন্যাসে বিষ্ণুপুরের পাটরাঙাদের জীবনযাপনের ছবি পাওয়া যায় । ধনতান্ত্রিক সমাজে তাঁতী গোষ্ঠীর জীবন দৈন্যতার চিত্র অঙ্কিত হয়েছে - এই উপন্যাসে । আবার ছিন্নবাধা উপন্যাসের গ্রাম সমাজ ও শহরের শ্রমিক জীবনের চিত্র রূপায়িত করা হয়েছে । 'পদক্ষেপ' উপন্যাসে ইউনিয়ন আন্দোলনের স্বরূপ বর্ণিত হয়েছে । অনেকেই হয়তো জানেন না , যে জেলখানায় বসে সমরেশ বসু তাঁর প্রথম উপন্যাস ' উত্তরঙ্গ' রচনা করেন ।

    কালকূট শব্দের অর্থ বিষ । তিনি কালকূট ছদ্মনাম দিয়ে বেশ কিছু উপন্যাস লিখেছেন । অমৃত কুম্ভের সন্ধানে , কোথায় পাব তারে , ঐ সব উপন্যাসে তিনি কালকূট নাম ব্যবহার করেছেন । 'ভ্রমর' ছদ্মনামে লেখা তিনটি উপন্যাস – 'যুদ্ধের শেষ সেনাপতি ', 'হাতে তোমার রক্ত' , প্রেম - কাব্য রক্ত যথাক্রমে ১৩৮৯ , ১৩৯০ ও ১৩৯১ সালে প্রকাশ হয় । সমরেশ বসুর কালজয়ী জীবন কাহিনী থেকে প্রবাহ পত্রিকায় প্রকাশিত 'ভোট দর্পণ ' নামে রচনায় কালকূট নামটি ব্যবহার করেন ।

  ১৯৪৬ সালে পরিচয় পত্রিকায় আদাব গল্প প্রকাশ হয় । তার আগে স্বাধীনতা পত্রিকায় প্রকাশ হয় অন্যতম ছোটগল্প ' 'শের সর্দার '। এই সব গল্প তাঁকে ছোটগল্পাকার হিসেবে স্বীকৃতি দেয় । অকালবৃষ্টি , ঋতু , মনোমকুর , পাহাড়ী ঢল , সুবর্ণা , বনলতা , মানুষ , চেতনার অনুকার , ধর্ষিতা , কামনাবাসনা ইত্যাদি তাঁর লেখা অন্যতম গল্প সংকল্পন। শিশু - কিশোরদের জন্যও তিনি অনেকগুলি গল্প - উপন্যাস লিখেছেন । তাঁর রচিত ছোটগল্পগুলি আমাদের মনে দোলা দেয়।যেমন- 'ফটিচার ' গল্পে আছে কয়েকটি রিক্সার মালিক আর শ্রমিক স্বার্থের লড়াই । শিশু শ্রমিকদের দৈন্যদশা নিয়ে লিখেছেন অন্যতম গল্প' নিষিদ্ধ ছিদ্র' ও 'পেলে লেগে যা' । এসমালগার ' গল্পে তেরো বছর বয়সী এক চোরাচালানকারীর কথা উল্লেখ রয়েছে । তাঁর লিখিত গল্প সম্পর্কে সুমিতা চক্রবর্তী মন্তব্য করেছেন যে,-' সত্তরের দশকের নকশালবাড়ি আন্দোলনের বিস্ফোরণের পর সেই বাস্তবতাবোধের অভিঘাত আত্মস্থ করে নিয়ে বাংলা সাহিত্যে যে একজন তরুণ গল্পকারের আবির্ভাব হয়েছিল , তাঁদের পূর্বসূরী ছিলেন সমরেশ বসু ।' 

   অন্যভাবে বলা যায়  উচ্চবিত্ত - মধ্য ও নিম্নবিত্তদের জীবনচিত্রের সঙ্গে সঙ্গে তথাকথিত ভদ্রলোক যারা নন , স্মাগলার , ওয়াগান ব্রেকার , পকেটমার , ডোম , গুনিন এদের নিয়েও অসংখ্য গল্প লিখেছেন তিনি । যেমন : সাধ গল্পের দেশে আছে গোপীনাথ নামে এক রিক্সাওয়ালা । 'মেঘলা ভাঙা রোদ 'গল্পে বিশু নামক এক ড্রাইভারের মানবিকতার কাহিনী তুলে ধরা হয়েছে । 'খিঁচাকালা সমাচার' গল্পের কেন্দ্রবিন্দু এক পকেটমার । ওয়াগন ব্রেকার এবং সমাজবিরোধী ফটিককে নিয়ে লিখেছেন  আটাত্তর দিন পরে গল্পটি । ১৯৭৮ সালের এপ্রিল মাসে সমরেশ বসুর সাথে শান্তিনিকেতনে সাক্ষাৎ হয় ভাস্কর শিল্পী রামকিঙ্কর বেজের । তখন শিল্পী রামকিঙ্করের বয়স ৭২। তখন সমরেশ বসু জীবনী লিখবার তাগিদে তথ্যসংগ্রহ শুরু করলেও রামকিঙ্করের বৈচিত্র্যময় জীবন হয়ে ওঠে উপন্যাসের উপকরণ। লেখকের শেষ উপন্যাস দেখি নাই ফিরে । ১৯৮৭ সালের ৩ জানুয়ারি থেকে দেশ পত্রিকায় ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হতে থাকে । যদিও লেখকের আকস্মিক মৃত্যু উপন্যাসটিকে অসমাপ্ত রেখে ছিল । 

  ১৯৮৮ সালের ১২ মার্চ শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন  সমরেশ বসু । 

  পরিশেষে বলা যায় , সমাবেশ বসুর সমস্ত রচনা , সব সাহিত্যকর্ম তাঁর জীবনযাপনের অঙ্গ । তাঁকে উৎকণ্ঠিত করে তুলত ব্যক্তির বিপণ্নতা । জন্মশতবর্ষে সৃষ্টিকর্মের আবহে - আবেগে - বিতর্কে বাংলা সাহিত্যে তাকে প্রাণবন্ত করে রাখা সত্যিই ভাববার বিষয় ।