জলপাই রঙের গোলাপ (গল্প)
সেদিন ৭ ফেব্রুয়ারি , কলেজ পড়ুয়া গোলাপীর জন্মদিন । জ্ঞান হওয়ার পর থেকেই মায়ের হাতের সুস্বাদু পায়েস আর বাবার রান্না করা পাঠার মাংস খেয়ে দিনটা উদযাপন করে । মোমবাতি নিভিয়ে কেক কাটার সংস্কৃতিটা বাবার ঠিক পছন্দ নয় । বরং ওই দিনটাতে তিনি দুটো প্রদীপ বেশি জ্বালান তুলসীমঞ্চে । একটা গোলাপীর দীর্ঘায়ু কামনা করে এবং আরেকটা তার সাফল্যকামনায় । মেয়েটি পড়াশোনায় বেশ ভালো , গায়ের যেমন রং তেমনি তার চরিত্র । সুন্দর বলতে যা বোঝায় গোলাপী ঠিক তাই । প্রেমের সপ্তাহের শুরুতেই তার জন্ম বলে বাবা আদর করে নাম রেখেছে গোলাপী । অবশ্য কলেজে অনেকসময় এই নামটা তার বিরক্তির কারণ হয়ে দাঁড়ায় । বন্ধুরা কেউ যদি তাকে ভালোবেসে গোলাপ বলে তো কেউ আবার কেমন যেন একটু কপাল কুঁচকে বলে "গোলাপে কিন্তু কাঁটা থাকে " । অবশ্য দিন যেতে যেতে গোলাপী এগুলোর সাথে অভ্যস্ত হতে থাকে । আজকাল আর এগুলো কানে নেয় না । এখন সে ভীষনভাবে নিজেকে নিয়ে ব্যস্ত । সেই উড়নচণ্ডী ছেলেমানুষ মেয়েটা কেমন যেন হঠাৎ করেই বদলে গেলো । ছোটোবেলা থেকে দেখছি বলেই হয়তো ওর এমন পরিবর্তন চোখে পড়ছে । তবে ওর একটা স্বভাবের পরিবর্তন হয়নি — সহজ চোখে জগৎ দেখা । আমিই ওকে অনেকবার বলেছি যে জটিল পৃথিবীতে এতোটাও সহজ থাকা ভালো না । উত্তরে বলতো 'দাদা সহজ হওয়া একটা আর্ট , একটু বেশি কষ্ট হয় সহজ হইলে কিন্তু দিনশেষে আনন্দই পাওয়া যায় ।' — কী জানি! এই আনন্দের লোভেই হয়তো ও আজও এতোটা সহজ ।
তিনবছর পর এবার জন্মদিনে আমি ওর সাথে দেখা করতে যাই । মুখটা দেখে কেমন যেন শীতকালের ব্রহ্মপুত্রের মতো লাগছিলো । কেমন যেন মনে হতে লাগলো 'ও তো আমার গোলাপ নয় !' অবশ্য , আমাকে দাদা বলে জড়িয়ে ধরার পর সেই ভুলটা সংশোধন হলো । এই ডাক ও স্পর্শ দুটোই যে আমার খুব চেনা । এখানে বলে রাখি সম্পর্কে আমি ওর দিদি হলেও মেয়েটি আমায় দাদা বলতে ভালোবাসে । খুব ভুল না হলে বছর পাঁচেক আগেই আমাকে বঙ্গভবনের সামনে পেয়ে ঠিক এইভাবেই জড়িয়ে ধরে বলেছিল 'দাদা আমি প্রেমে পড়েছি' । তখন আমি বিষয়টা নিয়ে এতো ভাবিনি । আসলে প্রেমের অর্থ এতোটাই বিস্তৃত যে কে , কখন, কীসের প্রেমে পড়ছে বলা যায় না । আর গোলাপ যেমন মেয়ে ভালো কোনো উপন্যাস পড়ে এসে বা নতুন কোনো নাটক দেখে এসেও চিৎকার করে বলতে পারে 'আমি প্রেমে পড়েছি' । অনেকবার ও নন্দিতা-শিবপ্রসাদের সিনেমা দেখে প্রেমের কবিতা লিখেছে । ফেসবুকে আপলোড করার সময় আবার পেছনের কাহিনিটাও শিরোনামে লিখেছে । কমেন্টে দেখছিলাম বন্ধুরা বলছিলো 'তোর দ্বারা প্রেম হবে না' , 'তোর নাম না গোলাপ' , 'কী-রে সিনেমাকে বিয়ে করবি ?' ইত্যাদি ইত্যাদি । এইসব কমেন্ট নিয়ে খুব হট্টগোল হচ্ছিলো তখন । যেহেতু গোলাপকে শৈশব থেকেই চিনি তাই বন্ধুত্ব ভাঙার গন্ধ পাচ্ছিলাম কমেন্ট বাক্সে ।
২০১৯ সালে পুলওয়ামা কাণ্ডের পর জানতে পারলাম গোলাপ সত্যিই কোনো মানুষের প্রেমে পড়েছিলো । ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৯ সালে গোলাপ ফেসবুকে লিখেছিলো ' এজন্মের না পাওয়াগুলো তুলে রাখলাম পরের জন্মের জন্য My Dear Valentine … ভালো থেকো ভালোবাসা ... ' বেশ বুঝতে পেরেছিলাম মেয়েটার কপাল ভেঙেছে । কিন্তু তারপর ও কি করে সেটাও দেখার জন্য যেমন দারুণ আগ্রহে অপেক্ষা করছিলাম । তেমনি গোলাপের জীবনে ভ্রমর কীভাবে এলো তা-ও জানার জন্য উদগ্রীব হয়ে উঠেছিলাম । কাউকে জিজ্ঞেস করারও সাহস হচ্ছিলো না ঠিক । বছরখানেক বাদে স্থানীয় সংবাদে গোলাপের একটা গল্প ছাপালো । যদিও গল্প আর বাস্তব মেলানো যায় না তবুও একটু চেষ্টা করে দেখলে তো আপত্তি নেই । গল্পকারকে যেহেতু চেনা কাজেই বিষয়টা এতো জটিলও নয় । যাইহোক সেখান থেকেই জানতে পারলাম যে সেবার ফেব্রুয়ারি মাসে গোলাপ বাংলাদেশে যায় । উদ্দেশ্য একুশের বইমেলা । আর তার এই ভালোবাসার মেলাই লিখে দিলো জীবনের গল্পের অনন্য উপন্যাস ! ওদেশে যাওয়ার সময়েই বর্ডারের এক দেশবন্ধুর সাথে তার আলাপ হয় । আসলে গোলাপ যেখানে যায় সেখানেই আড্ডা জমিয়ে দেয় । বাড়ি ফিরে ফেসবুকে তাঁকে খোঁজে বের করে এবং দু'জনের বন্ধুত্ব হয় । ক্রমান্বয়ে বন্ধুত্ব পরিণত হয় প্রেমে । দু'বার তার সাথে কফি হাউসে যাওয়া ছাড়া আর কোনো স্মৃতিও নেই গোলাপের । প্রেমটা ফোনবন্দীই ছিলো গোলাপ-ভ্রমরের । কিছুটা একতরফাও বটে । কিশোরী মেয়েটি কোনোদিনই তো বয়সের আবদার মিটিয়ে সখাকে কাছে পায়নি । বন্ধুদের মতো সে প্রেমিকের হাত ধরে শহরের রাস্তায় ঘুরতে না পারলেও মনের বারান্দায় রোজ অভিসার হয়েছে দু'জনের । একেবারেই মনের কাছাকাছি বসে প্রচুর কবিতা লিখেছে দু'জন মিলে । এই তরতাজা স্মৃতি আর জলপাই রঙের হৃদয়ে নিজের নাম লেখার গর্ব — এই নিয়েই মূলত গোলাপের প্রেমকাহিনী । বর্ডারে যেহেতু সবসময় ফোন যায় না তাই প্রেমিকের কয়েকজন বন্ধুর ফোন নম্বর নিয়ে রাখে গোলাপ । এই বন্ধুদের থেকেই পনেরো ফেব্রুয়ারী প্রেমিকের তারার দেশে পাড়ি দেওয়ার খবরটি পায় গোলাপ । চৌদ্দই ফেব্রুয়ারী যার উপর অভিমান করেছিলো, সারাদিন ধরে যার পাঠানো পার্সেলের অপেক্ষা করছিলো , সেই মানুষটা একবার ফোন করে 'আসি' না বলেই চলে গেলো ! অভিমানটা ক্ষোভে পরিণত হলেও কার উপর গোলাপ সেটা জানেনা । এরপর থেকে প্রেমদিবসটা গোলাপ সাদা শাড়ি , হাতে বানানো সাদা ফুলের গয়না পরে ফেসবুকের পাতায় নানারঙের প্রেমের কবিতা লিখেই কাটায় । কারণ একটাই , গোলাপকে সাদা রঙে উর্বশীর মতো লাগে । এই সাজ তার প্রেমিকের খুব পছন্দ ছিলো ।
আলিঙ্গন করেই গোলাপ দৌড়ে গিয়ে নিজের ঘর থেকে আমার জন্য রবীন্দ্র নাট্য-সংগ্রহ , একটা পারফিউম ও একগাদা চকোলেট নিয়ে আসে , পারফিউমের বোতলটা ছিলো লাল রঙের । উপহারগুলো আমার হাতে দিয়ে বললো 'ভ্যালেন্টাইনস' ডে-তে দেখা হবে কিনা জানিনা তাই এই উপহারগুলো আজকেই দিয়ে দিলাম , এবারের একুশের অনুষ্ঠানে এই গন্ধটা মেখে যেও '। আমি তখন অবাক হয়ে দেখছিলাম আমার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ প্রেমিকাকে । প্রেম সত্যিই মানুষকে বদলে দেয় ! প্রেম নবজীবন দেয় ! আসার সময় আমি তাকে বলে এলাম ' যদি পারিস জীবনে কখনও ওর জন্য দুটো তারা কিনে দিস , ছেলেটা দু'দণ্ড শান্তিতে ঘুমোতে পারবে ' ।