হাকম (গল্প)
দেখলাম নেমপ্লেটে ডঃ ভট্টাচার্য লেখা, বাঙালি ভেবেই ঝরঝরে বলে দিলাম,"রাতের বেলা হোঁচট খেয়ে পায়ের গোড়ালিতে খুব ব্যাথা।"
প্রশ্ন করলেন,"কত?"
অবাক হয়ে বললাম,"গোড়ালিতে"
অবুঝের মতো আবার প্রশ্ন করলেন,"বুঝি পোয়া নাই, কি হল?"
বুঝলাম ভুল বুঝেছি, তিনি অসমিয়া।বরাকের বাঙালি অসমিয়া অল্প বুঝি কিন্তু বলতে পারি না, অগত্যা পায়ের গোড়ালি দেখিয়ে আধাভাঙ্গা অসমিয়াতে বললাম,"এই যে ইয়াত চোট পাইছি"
-ওওও এড়ি'ত চোট পালে।
হাত দিয়ে টিপে ধরে "পেইন বেশি করে নেকি?"
দাঁতে দাঁত টিপে বললাম,"হ্যাঁ"
-মই বিকর* কারণে কিছু ঔকধ* লিখি দিলু,কালি এক্স-রে রিপোর্ট লৈ আহিবা।
-কি কলে বিষ? অল্পের জন্য আঁতকে উঠলাম।পরে মনে হলো অসমিয়াতে ব্যাথাকে বিষ বলে।
-অয় খুরা আপোনার বিক বেদনার কারণে আজির দরে এই ঔকধকিনি লিখি দিলাম, মুরব্বী মানুহ কেনেকা যে চোট পালে,হুশিয়ারে চলিবা।
কি মিষ্টি ব্যাবহার আমাকে খুরা বললো। প্রেসক্রিপশনটি নিয়ে উচকিয়ে উচকিয়ে বেড়িয়ে আসছিলাম, আমাকে এসে অসুখী কোলের ছেলেকে নিয়ে উদভ্রান্তের মতো একটি মা জিজ্ঞাসা করলো,"ডাক্তার বাবুর চেম্বার কোনবায় দি?"
-বললাম,"সোজা গিয়া হাতের ডানদিকে রুম থ্রী।"
-ডাইনবায় কিতা কৈলা বুঝলাম না ?
-তিননম্বর রুমো ডাক্তারের চেম্বার।
সেই শিশুর মা সিলেটি উপভাষায় ডাক্তারকে কিছু বুঝাতে চাইছেন কিন্তু অসমিয়া কম বয়সী ডাক্তারকে বুঝাতে পারছেন না।ছাতি ভুলে গিয়েছিলাম,আনতে গিয়ে এই অব্যবস্থা কর্ণগোচর হলো, ডাক্তার কোন এক "হন্ধ্যা সিস্টার" বলে হাঁক পাড়ছিলো।
তখনই সেই মা'টি আমাকে দেখে যেন একটা ভরসা পেলো,"ও কাকা দেখৈন না ই ভিন জাতি ডাক্তারে আমার মাত বুঝৈন না, আমি অসমিয়া কৈতে পারি না, কুনোদিন বরাক থাকি বাইরে আসামো টাসামো গেছি না,ইতা আসামি মাততাম পারিনা,হকলতা বুঝিওনা, বেটারে কৈরাম তিনদিন থাকি আমার বাইচ্চাটায় আগে না কিছু খাইতে চায় না পেট ডুল বান্ধি রৈছে।বেটায় খালি জিগায় আগে কি হল?" তখনই ডাক্তার কথা ধরে বললেন,"খুরা আগে কি হল বুঝি পুয়া নাই, হন্ধ্যা নার্স'ও হুধিলো আহা নাই, প্লিজ মোক বুঝি কওকচুন কি অকুবিধা?" তখন বুঝিয়ে বললাম ,"আগে না মানে লেট্রিন হুয়া নাই লরাটোর, তিনিদিন ধরি।"
-ওহহ, এতিয়া বুঝি পালোঁ।
তখনই একটা প্রেসক্রিপশন হাতে ডাক্তারের কাছে কিছু জিজ্ঞাসা করতে এলেন একজন নার্স। বললাম," দিদি ডাক্তারের লগে থাকৈন না কেনে? সবে তো অসমিয়া জানে না।রুগীর মাত ডাক্তারে না বুঝলে চিকিৎসা করবা কিলা।" কথা পুরো হতে না হতে একজন রোগীর পরিবারের কেউ দৌড়ে এসে বললেন ,"সন্ধ্যা'দি দৌড়িয়া আও সেলাইন শেষ হৈয়া রক্ত উঠি গেছে।"
-স্টাফ কম।তিনি শুধু এই দুটো শব্দ বলে সাথে সাথেই ছুটে গেলেন ওয়ার্ড রুমের দিকে।