Feb 21, 2022

বিজয়া কর

হকার (গল্প)

ঠেলাটা একপাশে রেখে ছায়ামতো জায়গায় দাঁড়ায় অশোক। রোদ দেখে মনে হয় ঘড়ির কাঁটা দুপুরের দিকে। মোবাইল টুম্পার কাছে রেখে এসেছে। বলা যায় না, জরুরি কাজে ফোন এলে না-ও ধরতে পারে। 
রাস্তায় ব্লক বসানো।
জায়গায় জায়গায় উঠে গেছে।
ভোর ভোর শীতের কামড় ছিল।
এখন গেঞ্জির ভিতরটা বেশ ঘেমে গেছে। 
জল-মানুষ সে।
গত ১১ বছর নদীর ঘাট, লঞ্চ, পাটাতন, যাত্রী পারাপার এসব নিয়ে ব্যস্ত ছিলো। কাজে যোগ দিয়েছিল লঞ্চ-ড্রাইভার হিসেবে। কিন্তু পরিস্থিতি তা মানেনি। যা যখন করতে হয়েছে, করিয়েছে তাকে দিয়ে। 
থেমে থাকা বছরটি শেষ হতে না হতেই ফকিরচাঁদ তাকে ডাকেন -- শুনো রে বা, ব্রিজোর কাজ শুরু অইছে। লঞ্চো আর বেশি মানুষোর দরকার পরতো না। সময় থাকতে অইন্য কাজ খুঁজো। পরে কইবায়, আমি ঘাট-অফিসোর বড়বাবু অইয়া তুমারে কুন্তা জানাইলাম না। 
টের পাচ্ছিলো ব্রিজ হয়ে যাবে বলে।
দুটো পিলারও বসে গেছে একপাশে।
তবু একটা অভয়বার্তা ছিলো-- এই ঘাটে না হোক, অন্য কোথাও কি এরকম কাজের মানুষ লাগবে না? ১১ বছর জড়িয়ে থাকলো যে পেশায়, হুট করে তা ছেড়েছুড়ে কোথায় গিয়ে কী করবে? সরকারেরও তো একটা দায় থাকবে না তাদের নিয়ে? 
পড়াশোনা ক্লাস নাইন অবদি।
বাবা ছোটবেলাই মারা গেলেন।
মা এর কয়েক বছর পরে।
বাড়িঘর ছিলো না। 
মাসির কাছে চলে গেল।
মেশো একদিন নিয়ে এলেন ঘাটে। 
ফটিকচাঁদের সাথে ঘনিষ্ঠতা ছিলো।
সেদিন লঞ্চের বাঁধাধরা মানুষ আসেননি।
ভর বর্ষা। 
নদী ফুলেফেঁপে উঠেছে। 
-- ডরাইলে অইতো না। লঞ্চো উঠো গিয়া। দেখো কিতা করতে পারো। 
-- পারবো। হে তো অতদিন মধুরাঘাটো ইতা কাজ করছে। 
-- তে আর কিতা চিন্তা! 
ফটিকই নিয়ে যান লঞ্চের কাছে।
সে-ই শুরু। 
ওখানেই চোখাচোখি টুম্পার সঙ্গে। 
দুবছর হলো বিয়ে করেছে। ছেলে পেয়েছে। বয়স সাড়ে ৯ মাস।
কাজের নানা ধান্ধা নিয়ে ভাবে।
তার জানাশোনা অনেকেই সবজি, ফল এসব ঠেলায় নিয়ে বেরিয়ে পড়ে সকাল সকাল। তিন/ চারজন টোটো কিনেছে। ইনস্টলমেন্টে লোন শোধ করে। বামপায়ে জোর কম তার। শৈশব থেকে একটু টেনে টেনে হাঁটে। বামহাতেও। তবে ততটা নয়। 
দোকান-কর্মচারি হবার জন্য গেছিলো কয়েকটা ঠিকানায়। টাকাকড়ি যা দেবেন বলে মালিকপক্ষ জানান, তাতে তার আড়াইজনের পরিবার চলবে না। বাধানিষেধও প্রচুর। বসার কোন সিস্টেম নেই ডিউটির সময়। শপিং মলগুলির মতো। দুপায়ে দাঁড়িয়ে সকাল নটা থেকে রাত নটা। 
আগরতলা গেছে বিলাস। 
ঠেলা সমঝে দিলো তাকে-- কয়েকদিন ব্যবসা করিয়া দেখ। আমার আইতে দেরি অইবো। আইলে পরে দিলাইছ্। কই তনে মালউল আনি সব তোরে বুঝাইয়া যাইমু। 
আজ নিয়ে এক সপ্তাহ হলো।
লাভের মুখ তেমন দেখেনি।
বড় দূর্বল লাগে শরীর। 
বামপায়ের ভিতরের জায়গায় জায়গায় জ্বলে। দুটো হাঁটু জুড়ে ব্যথা। জ্বর জ্বরও লাগছে। 
দুপুররোদে আরও ঘন্টাখানেক হাঁটতে হবে। 
মাল যা নিয়েছে, যদি বিক্রি হয়ে যায় এই আশায়।
বুক গলা শুকনো খটখটে। 
জলের বোতল হাতে দিয়েছিল টুম্পা। 
আড়তের সামনে রেখেছে। পরে নিতে ভুলে গেল। 
গলিটার দুপাশে বড় বড় ফ্ল্যাট। 
দোতালা বাড়িও রয়েছে।
তবে সংখ্যা কম। 
গাড়ি আছে প্রায় প্রত্যেকের। 
সুন্দর সুন্দর কুকুরও। 
সৌখিন অভিজাত পাড়া। 
তাকায় অশোক। 
এত এত বাড়ি! 
কিন্তু কাউকে এমন আপন মনে হচ্ছে না যে গিয়ে বলে, শরীরটা খারাপ লাগছে। একটু বসি আপনার এখানে! অল্প জল আর কিছু যদি খেতে দেন...
খাওয়ার কথা ভাবতেই পেটে মোচড় দেয়। কাল রাতে বাচ্চাটার কাশির চোটে রান্নাখাওয়া কিছুই হয়নি তাদের। সকাল থেকে এখন পর্যন্ত উপোস।