Feb 18, 2022

শুভ্রা সাহা

কাঁচের শিশু (গল্প)

প্রাণ এখন ঘুমোচ্ছে । গতকাল ওর এক বছরের জন্মদিনের অনুষ্ঠান হয়ে গেল। সারা বাড়ি লোকে লোকময় ছিল ।রাতে সবাই চলে গেছে। শুধু দিল্লি থেকে আসা  গাইনোকোলজিস্ট মাসি শাশুড়ি পৃথাদেবী রয়ে গেছেন।দু তিনদিনের ছুটি নিয়ে এসেছেন,প্রানকে দেখার জন্য ।  কালই   হয়তো চলে যাবেন। এই মাসি শাশুরির হাতে প্রাণের জন্ম হয়েছিল। তাই ওর প্রতি একটু আলাদা টান তিনি অনুভব করেন। এক বছরের জন্মদিন বলাতে উনি তড়িঘড়ি টিকেট কেটে চলে আসেন। কালকের জন্মদিনে পাওয়া প্রানের খেলনা গুলো সব ছড়িয়ে  ছিটিয়ে আছে।সবাই ওর জন্য নতুন নতুন সুন্দর সুন্দর গিফট নিয়ে এসেছে ।কেউ খেলনা কেউ জামা কাপড়। তৃপ্তি সেগুলির কিছু কিছু গুছিয়েছে,  কিছু এখন এক সাইডে টাল হয়ে পড়ে আছে । তৃপ্তি কোনোদিন ভাবে নি  এ সংসারে এসে কারোর মন জোগাতে পারবে, কেউ ওকে ভালবাসবে, আপন করে নেবে । 

প্রথম থেকেই ওর এই সংসারে নাজেহাল অবস্থা ছিল । কথায় কথায় শাশুড়ির কটূক্তি শুনতে হতো। মাসি শাশুড়ি থেকে অন্যান্য শ্বশুরবাড়ির আত্মীয় স্বজন কেউ আড়ালে কেউ সামনে ছোটঘরের মেয়ে , বাজা বলেই গালিগালাজ করত। শাশুড়ি তো কথায় কথায় বলতো --

আমার ছেলেটার জীবনটা নষ্ট হয়ে গেল । কোথাথেকে এক অপদেবতা এসে ওর  ঘাড়ে জুটলো। পই পই করে তখন না করেছি এই মেয়েকে তুই বিয়ে করিস না । আমরা দেখে শুনে একটা ভালো বাড়ির মেয়ের সঙ্গে তোর বিয়ে দেব। না ! আমার কথা শুনল না ছেলে। ও বিয়ে করলে  নাকিএই মেয়েকেই করবে । ওর চেয়ে যেন সুন্দরী জগতে আর নেই ।  এমন অপয়া ! আজ পর্যন্ত বাড়িতে একটা শিশুর কান্না শোনা যায় নি।  ওর মুখ দেখলেও অকল্যাণ হয় । 

    এখন সবাই সব ভুলে গিয়ে ওকে আপন করে নিয়েছে । যেন কি যাদু মন্ত্র আছে   এই. প্রাণের মধ্যে। তৃপ্তি  আবার এক নজর দেখে নেয় প্রানকে।   ওর গায়ের চাদরটা একটু তুলে দিয়ে বালিশ দিয়ে চারিদিকে চাপা দিয়ে,নিজের কাজে লেগে পড়ে । 

 এরমধ্যেই মাসি শাশুড়ি এসে ঘরে ঢুকে বলে --- তৃপ্তি, কাল তো আমি চলে যাব আজ প্রাণ আর তোমার স্বাস্থ্যের পরীক্ষাটা একবার আমি করে নেব । এতে তৃপ্তি খুশি হয় যদিও কোন সমস্যা নেই তবুও মাসি শাশুরির কথায় একটু আস্বস্ত হয়।কারণ   উনি প্রথম থেকে ওকে দেখছেন। মাসি শাশুরি নিজের শ্বাশুরি থেকে বয়সে অনেক ছোট । দেখতে সুন্দরী । একটি ফুটফুটে তিন বছরের  মেয়ে আছে,ওর নাম সানা ।সেও এসে প্রাণের সঙ্গে খেলা করে যায় । প্রাণ ঘুমাচ্ছে বলে এখন হয়তো ও বাইরে খেলছে । মাসি শাশুড়ি ডাক্তার পৃথা জিজ্ঞেস করে--- তুমি এখন কেমন বোধ করছ ?   কোন অসুবিধা হচ্ছে না তো তোমার ? ডেলিভারির তিন মাস পরেই তৃপ্তি চলে আসে বাড়িতে । তারপর ফোনে ফোনেই সব খবরা খবর নিয়েছে এতদিন । 

 ডক্টর পৃথা প্রায় নয় মাস পর আবার ওদের সঙ্গে মিলিত হল । এর মধ্যে কোন অসুবিধা হলে পৃথার সঙ্গে যোগাযোগ করেছে ওরা । অবশ্য তেমন জটিল কোন অসুবিধা হয়নি । আজ তাই পৃথা ভালো করে ওদেরকে পর্যবেক্ষণ করেও নিল । 

    তৃপ্তি বল--- না মাসি  আমার কোন  অসুবিধা নেই।আমি ঠিক আছি। সুস্থ আছি ।  প্রানকে   একটু দেখে যাও । তবে প্রানও ভালোই আছে। এখনো বুকের দুধ  কিছু কিছু পাচ্ছে। 

এরমধ্যে ওর শাশুড়ি   দীপিকাদেবী এসে তৃপ্তির জন্য রুটি সবজি ডিম সিদ্ধ দিয়ে গেল , 

বলল  ---এগুলো তাড়াতাড়ি খেয়ে নাও বৌমা।ঠান্ডা হয়ে যাবে। সঙ্গে পৃথাকেও দিল । 

তৃপ্তি নিজের ঘর গোছানো সেরে,মাসিশাশুড়ির সঙ্গে টিফিন করতে বসে গেল ।

অনেক দিন মাসি শাশুরির কাছে  দিল্লিতে ছিল। সেখানেই ওর ডেলিভারি হয়েছে । 

বিয়ের পর সাত-আট বছর হয়ে গেলেও, তৃপ্তির গর্ভে কোন সন্তান আসেনি। নিজের শহরে অনেক ডাক্তার দেখিয়েছে। কিন্তু কোন কাজ হয়নি।দোষটা তৃপ্তিরই বলেছে। এর জন্য অনেক যন্ত্রণা সহ্য করতে হয়েছে। শাশুড়ির ইচ্ছে ছিল ওদের ডিভোর্স হয়ে যাক । ছেলেকে আবার সুলক্ষণা মেয়ে দেখে বিয়ে করাবে। 

কিন্তু তৃপ্তির স্বামী সুমন্ত পেশায় শিক্ষক, ভালোবেসে তৃপ্তিকে বিয়ে করেছে , ওকে ছাড়ার কথা ভাবতেও পারেনা। শ্বশুরবাড়িতে যেন একঘরে হয়ে গেছে ও। উঠতে-বসতে শাশুড়ির শাপ-শাপান্ত ওকে নাজেহাল করে ছেড়ে দিচ্ছিল। একসময় সুমন্ত মা-বাবার কাছ থেকে আলাদা হয়ে যায় এক বাড়িতেই থাকে । আলাদা রান্নাবান্না হয়ে ওদের । তবু যখন সুমন্ত বাড়ি থাকেনা, তখনই শুরু হয়ে যায় শাশুড়ির কটুক্তি ।   এই গ্রামের মধ্যে ওদের এত বড় বাড়ি জায়গা জমি রয়েছে সেগুলি দেখা শোনার জন্য একজন বংশধর তো চাই । 

   এসব কথা শুনতে  শুনতে তৃপ্তিও  একসময় অধৈর্য হয়ে পরে।।ভাবে কেন আমি সুমন্তের জীবনটা নষ্ট করছি। ওদের আত্মীয়-স্বজনরা কেউই তো আমাকে চায়না। ওর জীবনে থেকে আর কি হবে। আমি ওর থেকে সরে গেলেই বোধহয় ভালো হবে।

সেই সময় তৃপ্তির  এক বন্ধু তৃপ্তিকে বলে, আই ভিএফ পদ্ধতিতে সন্তান ধারণের কথা।   ইনভিট্রো ফার্টিলাইজেশন এর সাহায্যে বাইরে টেস্টটিউবে পাম সংগ্রহ করে তারপরে তা গর্ভে স্থাপন করা হয় । তখনো তৃপ্তি জানতো না যে ওর মাসি শাশুড়ি ডক্টর পৃথা এই আইভিএফ পদ্ধতিতে স্পেশালিস্ট । দিল্লিতে ওনার আর ওনার স্বামীর নিজস্ব. যে হসপিটাল আছে সেখানে তিনি এই পদ্ধতিতে অনেক শিশুদের জন্ম দিয়েছেেন। সুমন্ত সেটা জানে কিন্তু তৃপ্তি সেখানে যাওয়াটা একদম পছন্দ করলো না কারণ শাশুড়ির পক্ষ নিয়ে ডক্টর পৃথা ওকে কম নাজেহাল করে নি।      তাই তৃপ্তি বলে --তোমাদের আত্মীয় স্বজনরা কেউ আমাকে পছন্দ করে না ,হয়তো সেখানে আমি মরেই যাবো । তুমি অন্য ডাক্তারের কাছে এ ব্যাপারে সাহায্য চাও । তখন  সুমন্ত. নিজের যথাসাধ্য টাকা-পয়সা নিয়ে কলকাতা শহরে চলে যায় সেখানে বিষেশজ্ঞ    ডাক্তারের সঙ্গে আলাপ করে এবং এই আইভিএফ পদ্ধতিতে সন্তান ধারণের সিদ্ধান্ত নেয়। এতে ওর অনেক টাকা পয়সা  খরচ হয়ে যায়  ।   একসময় এমন অবস্থা হয়,   চিকিৎসা করার. ক্ষমতা আর থাকে না। এমনকি খাওয়া-দাওয়া   ঠিক মত চলে না। ঔষধের খরচ চালানো  তো দুরন্ত।।ঘরে কান্নাকাটি পড়ে যায় ।   সন্তান বাঁচানো দায় হয়ে পড়ে।   তৃপ্তির শ্বশুরমশাই এতদিন কোনো কথা বলেননি ।এবার তিনি ও মুখ খুললেন।।শাশুড়িকে বললেন ওদেরকে সহায়তা করার জন্য । দীপিকাদবীও আর চুপ করে থাকতে পারলেন না ।।ছেলের এই দুঃসময়ে পাশে এসে দাঁড়ালেন ।।নিজের বোনের সঙ্গে কথা বলে নিলেন । ওদের দিল্লিতে  যাবার  সব ব্যবস্থা করে দিলেন । সুমন্ত  যেতে রাজি হয়ে গেল । তৃপ্তিও অগত্যা রাজি হলো । তারা দিল্লিতে চলে গেল। ডক্টর  পৃথা ভুলে গেল একসময় তৃপ্তি  যে বলেছিল ---উনি কিসের ডাক্তার!  যে আমার সংসার ভাঙতে চায়,সে আর যা হোক,কখনো ডাক্তার হতে পারেনা । 

সে কথা ভুলে  ড: পৃথা তৃপ্তি কে  আপন করে নিলেন। ওর  সমস্ত  চিকিৎসা নিজের হাতে তুলে নিলেন।

যখন সন্তান কোলে নিয়ে ও ঘরে প্রবেশ করল তখন সারা গ্রামের লোক ভেঙ্গে পড়লো কাঁচের শিশুকে দেখার জন্য। সবাই এই কাঁচের শিশুকে ভগবানের দূতই মনে করছে।