শ্রদ্ধাঞ্জলী
স্বামী বিবেকানন্দ একবার বোম্বে থেকে জাহাজে চড়ে যাচ্ছিলেন। সামনে আরব সাগরের অতলান্ত জলরাশি।
তিনি জাহাজের টেকে দাঁড়িয়ে ছিলেন। তিনি দেখছেন একদিকে প্রাচ্য ও অন্যদিকে প্রাশ্চাত্য। একদিকে ভারতবর্ষের ঐতিহ্য অন্যদিকে প্রাশ্চাত্যের আধুনিকতা।
শিলং, পেনাং, সিঙ্গাপুর, হংকং হয়ে কেংটন দেখে তিনি নাগাছাকি যান। সেখান থেকে ওছাখা,, কোয়েটো, টোকিও হয়ে ইয়াকায়াহোমা পৌঁছান। ইয়াকায়াহোমা থেকে চললেন ভেংকোভার এন্টিকে। জাহাজ তখন নাগাছাকি থেকে শহরের পাশ দিয়ে যাচ্ছিল। স্বামিজী তখন জাহাজের রেক থেকে বলে উঠেছিলেন, " বাঃ কি সুন্দর চারপাশ"। তখন তিনি কি একবারও বুঝতে পেরেছিলেন, একদিন সভ্যতা নয়, ধর্মের বাঁধন নয়, মানুষ মেতে উঠবে ধ্বংস ধ্বংস খেলায়। তিনি যদি ভারতবর্ষের আসন্ন ভবিষ্যৎ দেখতে পেতেন তবে কেঁদে উঠতেন।
শিকাগোর বিশাল হল, যেখানে ছিলেন পৃথিবীর সমস্ত ধর্মের প্রতিনিধিরা, মধ্যখানে বসেছিলেন আমেরিকান রোমান ক্যাথলিক চার্চের প্রধান যাজক। তার ডানদিকে ও বামদিকে রাজ্যের প্রতিনিধিরা। ব্রাক্ষ্ম সমাজের প্রতিনিধি বাংলার প্রতাপ চন্দ্র মজুমদার, শ্রীলংকা থেকে গিয়েছিলেন বৌদ্ধ ধর্মের প্রতিনিধি ধর্মপাল, , জৈন ধর্মের প্রতিনিধি শ্রীগান্ধী আর তাদের সঙ্গে বসেছিলেন স্বামী বিবেকানন্দ। তার সৌম্য কান্তি চেহারা, লাবণ্য পরিপূর্ণ মুখ ও উজ্জ্বল পোশাক, সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিল। প্রথমবার তিনি এমন একটি সভায়, যে সভার দিকে তাকিয়ে , সমস্ত বিশ্ব, বিবেকানন্দের দিকে তাকিয়ে গোটা ভারতবর্ষ। স্বামীজীর বক্তৃতা দিনের শেষে শিকাগোর আকাশ তখন কোনো এক স্বপ্নের প্রতিক্ষায়। স্বামী বিবেকানন্দ উঠে দাঁড়ালেন, উঠে দাঁড়ালেন তামাম ভারতবাসী। প্রণাম করলেন মা সরস্বতীকে। স্বামিজীর মুখ তখন আগুণের মতো জ্বল জ্বল করছিল। তিনি একবার ভালো করে সামনের বিশাল জনসমুদ্র দেখে নিলেন। তিনি শান্ত, নির্বিকার, সামনে সমস্ত পৃথিবী, আর মনের মধ্যে ভারতবর্ষ। শুরু করলেন কথা বলা। কবিতা মনে হয় এতো সুন্দর হয়না। সমুদ্রের ঢেউও এতো উচ্ছ্বল হয়না।বিপ্লবও এতো উদ্যম হয়না। আকাশ তখন গোধূলি রঙে রঙে। স্বামী বিবেকানন্দ মুক্ত কণ্ঠে বলে উঠলেন," Sister & Brother of America. সামনে বসে থাকা সমস্ত শ্রোতা মুহূর্তে উদ্বেল হয়ে উঠলেন। নিজের নিজের আসন ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন সবাই। করতালিতে ভেসে গেল চারপাশ, স্বামিজী যখন বক্তৃতা দিচ্ছেন কোনো এক শেষ বিকালের আবছায়াতে ভারতবর্ষ থেকে হাজার হাজার মাইল দূরের এক শহরে। এদেশে তখন সকাল হলো সবে। স্কুলে পড়তে না পাঠানো বছর দশেকের মেয়েটি হঠাৎ করেই সেই সকালেই হাঁটা দিল স্কুলের পথে। মাত্র দশ বছর বয়সে স্বামী মারা গিয়েছিল যে মহিলার , সেদিন সকালে সেই নারী আবার প্রেমে পড়লেন। সরকারি অফিসে দিনের পর দিন উচ্চ পদস্থ এক ইংরেজ অফিসারের অপমানে যে মাঝ বয়সী বাঙালি ভয়ে ভয়ে থাকতেন, পরদিন সকালে হাতের ঝক্কি ছুঁয়ে মারলেন সেই ইংরেজ অফিসারের দিকে। যে বাবুটি প্রতিদিন বাইজি বাড়ি যেতেন , প্রথম বার তিনি স্বাধীনতার শপথ পাঠ করলেন। সমস্ত দিনের শেষে গোধূলির রাঙা রঙ মেখে, সামনে অনন্ত বিশ্ব, আর ভারতবর্ষ আকাশের বুকে। অন্তহীন অধিকার নিমেষেই ধুয়ে মুছে সাফ। স্বপ্ন দেখিয়েছেন তিনি, ট্রেনিং দিয়েছেন উত্তাল, ভাবনাতে ভাবীকাল, কল্পনাতে আগামীর ছবি। তিনি বিপ্লব, তিনি দর্শন, তিনিই পৃথিবীর কবি। জ্ঞান যোগ, কর্ম যোগ, আর জীবনের অপার আনন্দ তিনি আছেন, তিনি থাকবেন আমাদের বিবেকানন্দ।