Jan 18, 2024

স্বপন দেবনাথ

ছোটগল্প

অভাগার সংগ্রাম

অগ্ৰহায়ণ মাস । শীতের স্নিগ্ধতা ছড়িয়ে আছে পল্লীর বুকে । কুয়াশাচ্ছন্ন। নতুন ফসলের উন্মাদনা  শিরা-উপশিরায় গোটা কৃষক কুলের । প্রমোদ‌ও এর থেকে পিছপা হয় নি। মুখে ধীরে ধীরে হাসি ফুটছে । কয়েক মাসের অক্লান্ত পরিশ্রমের ফল এবার হাতের মুঠোয় আসতে চলল। প্রমোদের স্ত্রী রমনী বালাও খুশিতে আত্মহারা। ঘরে নতুন ধান আসছে , পিঠে পুলি হবে , পায়েস হবে । 

      একদিন বিকেলে রমনী বালা উঠোনে রৌদ্রের আলতো ছোঁয়ায় নিজেকে একটু তাপিয়ে নিচ্ছিল । ঠিক তখন ঘর থেকে ছেলে অনুপ ছুঁটে এসে মায়ের কোল জুড়ে হাঁটু ভেঙে বসে কানে কানে ফিস ফিস করে বলে --- 

----- মা নতুন চালের পায়েস কবে রান্না করবে ? কতদিন হলো খাই না। 

----- হবে বাবা । আগে ধান আসতে দে , তারপর। 

         প্রমোদের ধান কবেই পেকে গেছে । লোক দিয়ে ধান কাটা হচ্ছে, প্রমোদ‌ও সারাদিন সেখানেই । ধানের আঁটি বেঁধে তাদের মাথায় তুলে দেয় । এইভাবেই কাটিয়ে দেয় গোটা দিন । প্রমোদ তার লাগানো চার ভাগের দুভাগ ধান মাত্র বাড়িতে আনল দু দিনে । আর দু দিন হলেই সব ধান বাড়িতে চলে আসবে । দুপুর হয়েছে প্রমোদের স্ত্রী রমনী এক হাতে চায়ের কেটলি আর অন্য হাতে চিড়ে-মুড়ি-খ‌ই এর মিশ্রণ আর ছেলে অনুপের হাতে করে জলের বোতল, এই নিয়ে অবশেষে  জমিনের আইলে এসে উপস্থিত। 

------ এই যে শুনছ...... ? চা এনেছি, তাদেরকে বল আগে চা টিফিন খেয়ে তারপর ধান তুলতে । আর তুমিও আস । চা খেয়ে নাও । কোন সকালে দুমোট ভাত খেয়েছ , আস শিগগিরি । 

------ এইতো আসছি....। 

      সেদিন তাদের জমিনে কাজ করছে চারজন । দিলীপ, জীবন , বরুণ আর সজল । তাদের বাড়ি পাশাপাশিই , এক‌ই গ্ৰামের লোক । তারা হাত মুখ ধুয়ে টিফিন খেতে আসল , সঙ্গে প্রমোদও। চা খেতে খেতে সজল প্রমোদকে বলছে ---

------ প্রমোদ দা, এই তিন চারদিন তোমার ধান তুলে দিচ্ছি কিন্তু, এরপর আমার ধানগুলোও তুলতে হবে । আমার গুলো এক দিনেই হয়ে যাবে । তুমি আমার ধানগুলো একদিন তুলে দিও । 

------ আচ্ছা আচ্ছা । ঠিক আছে । হবে হবে । 

------ বৃষ্টিটা না আসলেই হবে । মনে আছে তো প্রমোদ দা গতবছরের কথা ? 

------ আর মনে করাস নে ভাই । যা হবার হয়েছে ।  মনে পড়লেই বুকটা জ্বলে । কতগুলো ধান জলের স্রোতে ভেসে গেলো । 

------- (বরুণ) সজল দা , আর বলো না ভাই । গতবছরের মতো এমন ভয়ানক পরিস্থিতি আমার বুঝ হ‌ওয়ার পর আমি আর দেখি নি । আমার দুই গন্ডা পালং শাক , তিন গন্ডা ফুলকপি, বাঁধাকপি জলের নিচে ছিল তিনদিন । কতোটা না ক্ষতি হলো । প্রায় বিশ হাজার টাকা তিনদিনের জলের তলায় ছিল । 

-------- (প্রমোদ)  আমার কি কম ক্ষতি হয়েছিল ? সেই ক্ষতির ভার আজ‌ও ব‌ইছি।  আচ্ছা নে তাড়াতাড়ি খেয়ে চল । 

হঠাৎ করে জীবন বলে উঠে ---- 

------ এই কী রে প্রমোদ ! আকাশটা হঠাৎ করে এমন হচ্ছে কেন ? রোদ তো প্রচন্ড ছিল একটু আগে পর্যন্ত। এখন যে আকাশের রং বদলে যাচ্ছে । 

------- কী বলছ জীবন দা ! বৃষ্টি আসবে না কি ! 

------- তাড়াতাড়ি চলো সবাই , ধানগুলো বাড়িতে উঠাতে হবে । যদি একবার বৃষ্টি এসে পড়ে তবে আর রক্ষে নেই । জলে ভেসে যাবে আবার । 

       সঙ্গে সঙ্গে সবাই চা টিফিন ফেলে রেখে উঠে পড়ল । ক্ষণিকের মধ্যে আকাশ ছেয়ে গেছে কালো মেঘে। মনে হয় এখন‌ই নামবে হুড়মুড়িয়ে। কী ছিল আর হঠাৎ করে কি হয়ে গেলো । প্রমোদের ব‌উ রমনীও আইলে আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারল না । চোখের সামনে এই রকম পরিস্থিতিতে কেই বা গুটিশুটি মেরে দাঁড়িয়ে থাকতে পারে । পা বাড়িয়ে নেমে পড়ল জমিনে । আর তা প্রমোদের চোখে পড়তেই সজোরে চিৎকার করে বলে ওঠে ----

------ রমনী.... তোমার এদিকে আসতে হবে না । তুমি অনুপকে নিয়ে বাড়ি চলে যাও । বাড়ির ধানগুলো বড়ো পলিথিনটা দিয়ে ঢেকে দাও গিয়ে । 

------ আচ্ছা যাচ্ছি । তবে আমার মাথায় এক আঁটি ধান বেঁধে দাও নিয়ে চলে যাই । 

------ তোমার ধান নিতে হবে না । তুমি শিগগিরি বাড়ি যাও । তুমি ধান নিয়ে বাড়ি যেতে পারবে না । আইলের ঐ দিকটা ভাঙা জলে  মাটি কাঁদা হয়ে আছে । পা পিছলে পড়ে যাবে । 

------- পড়বো না । তাড়াতাড়ি দাও । চলে যাচ্ছি । 

------- আমার কথা যেহেতু শুনছো না তাহলে এই নাও । 

 রমনী এগিয়ে গেলে তার মাথায় হালকা করে একটা আঁটি বেঁধে দেয় । সে অনুপকে নিয়ে দ্রুত বেগে বাড়ির দিকে চলল । 

                        এদিকে এই ভয়ানক পরিস্থিতিতে যেন প্রমোদের মাথায়  আকাশ ভেঙে পড়লো । এতোগুলো ধান কীভাবেই বা এতো কম সময়ে বাড়ি নিয়ে যাবে ভেবেই পাচ্ছে না । যেকোনো সময়ে বৃষ্টি এসে পড়তে পারে । কালো মেঘ যেন আরো গাঢ় হচ্ছে । হালকা বাতাস । দীলিপ , জীবন সহ অন্যরা তাড়াতাড়ি করে একের পর এক ধানের আঁটি নিয়ে বাড়িতে ফেলে আসছে । 

------ (সজল) প্রমোদ দা বাতাসে যে আমার ধানগুলো শুয়ে যাচ্ছে , এই দ্যেখো .... এই দ্যেখো। 

------ কী আর বলব সজল , কপালে যা আছে তাই হবে । বৃষ্টি আসার আগে যতটুকু সম্ভব ততটুকু করে যাই , আর পরে কী হবে না হবে দেখা যাবে । 

           এক ফোঁটা দু ফোঁটা করে বৃষ্টি পড়ছে । আর তা নিমিষেই বেড়ে গেলো । বাড়িতে যতটুকু ধান তুলেছে সেগুলো রমনী অনেক কষ্টে ঢেকে দিল । ভালো করেই ঢেকেছে কিন্তু ভারী ঝড় তুফান হলে আর রক্ষে নেই । উড়িয়ে নিয়ে যাবে পলিথিন । দেখতে দেখতে বৃষ্টি বেড়েই যাচ্ছে। সঙ্গে সজোরে হাওয়া। আর তা তুফানের আকার ধারন করল । বাড়ির পেছনের দিকে মরাৎ করে একটা সজনে গাছ ভেঙে রান্না ঘরের চালায় এসে পড়ল । রাস্তার দিকেও আর একটা গাছের ডাল ভেঙে গাছে ঝুলছে । মাঝে মাঝে বিদুৎ চমকাচ্ছে । অনুপ ভয়ে মা ........ বলে চিৎকার করে রমনীকে জড়িয়ে ধরে ভয়ে থরথর করে কাঁপছে । বারান্দা থেকে  ছুঁটে ঘরে চলে গেলো দুজন। বাইরে অঝোরে বৃষ্টি, আর বিদুৎ চমক। দক্ষিণা জানালা দিয়ে দেখছে ঝড় তুফানের রাসলীলা। আর মনে চলছে বৃষ্টির উপর ক্রোধের বন্যা। কী ছিল আর মুহূর্তে কী হয়ে গেলো, ভাবতেই পারছে না । না কি গত বছরের মতো অবস্থা হবে ! তবে যে এবার‌ও নুন আনতে পান্তা ফুরোবে । দীনতা বেড়ে বুক সমান হবে। সঙ্গে প্রমোদের জন্য চিন্তা । এই ঝড় তুফানকে উপেক্ষা করেও জমিনে পড়ে আছে সে। 

          মাথায় ঝড় বৃষ্টি নিয়ে অবশেষে প্রমোদ বাড়িতে আসে । তবে কিছু ধান বাড়িতে উঠাতে পারল আর বাকি সব জমিনেই পরে আছে । শুধু প্রমোদের নয় অনেকের‌ ধান জলের নিচে ডুবে গেছে । আবার কারোর ধান এই একটু একটু মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছে । প্রমোদ বাড়িতে এসে দেখে রান্না ঘরের চালায় মস্ত বড় এক সজনের ডাল ভেঙ্গে পড়ে আছে । রমনী ঘরে , প্রচন্ড বাতাস বাইরে । পা চালিয়ে প্রমোদ বারান্দায় এসে উঠোনের ধান গুলোর দিকে চেয়ে আছে আর চোখ দিয়ে অনবরত জল । আর মনে মনে ভাবছে ..... তবে কি অভাব রক্তে মিশে গেছে !....... হঠাৎ করে বাতাসে ধান ঢেকে রাখা  পলিথিনটা ছিঁড়ে আর্ধেক চলে গেলো । 

------- এই দেখো , এই দেখো পলিথিন ছিড়ে গেলো । বাতাসে নিয়ে যাচ্ছে তো । ধরো ধরো ...... । রমনী চেঁচামেচি করতে লাগলো।

------- চুপ করো রমনী । যা হচ্ছে ভালোই হচ্ছে । শুধু দেখে যাও।  ভিজে যাক ধান , চলে যাক জলের স্রোতে । আর কিছু করতে পারব না । যতটুকু আমার সম্ভব ততটুকুই করেছি । আর পারব না । এবার না খেয়ে মরব আমরা সবাই । 

-------  এটা কী বলছ তুমি! 

------- আর কী বলব আমি । আমার আর বলার কিছু নেই । 

       এই বলে প্রমোদ কাঁদতে লাগলো। এভাবেই চলে গেলো গোটা দুটো দিন  ছটফটা শরীর নিয়ে । বৃষ্টি থামার কোনো লক্ষনই দেখা যাচ্ছে না । এই অসহ্যকর পরিস্থিতির মুখোমুখি হ‌ওয়াটা যে কতটা কষ্টকর তা কৃষক কুলের অভাগাদের থেকে বেশি কেউ জানবে না । বৃষ্টি হলেই রোমান্টিকতা বেরে যায় অনেকেরই , কিন্তু কৃষক কুলের দিবারাতি রোমান্টিকতায় কাটে না , সেখানে থাকে একরাশ বিরক্তি, দুঃখ-কষ্ট আর নাকে লাগে ফসলের পচা গন্ধ । শুধু তাই নয় থাকে বছর ব্যাপী অভাব অনটনের সংগ্ৰাম । আর সেই সংগ্ৰামকে পাথেয় করেই চলতে হয় গোটা জীবনপথ ।