Jan 18, 2024

অসীম পাঠক

সীমানা 

কল্লোলিনী তিলোত্তমার অভিজাত বেলভিউ নার্সিং হোমের  ইন্টেনসিভ কেয়ার ইউনিটে  শোরগোল পড়ে গেলো, ডাক্তার নার্স সবার ছুটোছুটি।  সিনিয়র ডক্টর মিঃ লাহিড়ী সব শুনে চমকে গেলেন, অস্ফুটে গলা থেকে বেরোলো তাঁর " ইটস এ রেয়ার কেস অফ মেডিক্যাল সায়েন্স "। তারপর স্টেথো টা ঝুলিয়ে রিভলভিং ছেড়ে উঠতে উঠতে বললেন , " ইমিডিয়েট বাড়ির লোকেদের খবর দিন " .....বিশ্বজিৎ মজুমদার কুড়ি বছর কোমাতে। আজ ই রেসপন্স করছেন ।সবাই যখন হাল ছেড়ে দিয়েছে ,জন্ম মৃত্যুর সীমানা থেকে তিনি তখন জেগে উঠেছেন, অবচেতনের সব জাগতিক অনুভূতি থেকে তিনি বাস্তবের আলোয়। 

তপনের মোবাইল বেজে উঠলো , সবে সে ব্যাংক যাবার জন্য তৈরী হচ্ছে, সে একটি বেসরকারি ব্যাংকের জেনারেল ম্যানেজার। আজ একটা ইমপোর্টান্ট মিটিং , নার্সিং হোমের ফোনে সে বিস্ময়ে হতবাক। সবাই আশা ছেড়ে দিয়েছিলো , মায়ের কথা রাখতে ফেলে রেখেছিলো বেলভিউতে, তপন তার স্ত্রী রূপা কে ব্যাপার টা জানালো। তাদের একমাত্র ছেলে তোতন কে তখন স্কুল ইউনিফর্ম পরাতে বিজি রূপা , সবাই হতবাক, তপন তার দিদি অরুণিমা কে ফোন করে সব জানালো। অরুণিমা একটি ইংরেজী সাহিত্যের অধ্যাপিকা, স্বামী অর্ণবও অধ্যাপক তবে রসায়ন বিদ্যার। দুজনেই কলেজ বেরুবার জন্য রেডি হচ্ছিল। অরুণিমা র আজ একটা সেমিনার এটেনন্ড করতে হবে , অর্ণবের ও একজন পাবলিশারের সাথে আ্যপয়েন্টমেন্ট ফিক্সড আছে। আধুনিক রসায়ন নিয়ে তার একটা বই বের করতে চলেজে দেজ পাবলিশিং। সবাই বিস্ময়ে বিমূঢ়। সবার দৈনন্দিন রুটিনে যেনো একটা ব্রেক ছন্দপতন , কুড়ি বছর। সময়ের স্রোতে অনেক জল বয়ে গেছে ,বিশ্বজিৎ বাবুর ছেলে মেয়ে এখন জীবনে প্রতিষ্ঠিত , ঘোর সংসারী , বাবা কে ছাড়া  তাদের কুড়ি বছর অতিক্রান্ত। বাবার শ্বাস কুড়ি বছর ধরে চললেও বাবা তাদের কাছে মৃত। তাদের মা পূরবী দেবী দু বছর আগে গত হয়েছেন। স্কুল শিক্ষিকা পূরবী দেবী যতোদিন বেঁচে ছিলেন তাঁর স্বামীর চিকিৎসার ব্যয়ভার বহন করেছেন ।আত্মীয় বন্ধু রা বারংবার বলেছেন , " এটা ঠিক হচ্ছে না , উনাকে মুক্তি দাও।  তাছাড়া এতো টাকা পয়সা জলের মতো খরচ হচ্ছে " ,পূরবী দেবী সে সব কথা ভ্রুক্ষেপ না করে বলতেন " যতোক্ষণ শ্বাস ততক্ষণ আশ , আমার সিঁথির সিঁদুর অক্ষয় হোক বলবে কোথায় , তোমরা তা মুছে ফেলতে চাইছো "। কেও আর কথা বাড়াতো না কষ্ট করে মানুষ করেছিলেন মেয়ে আর ছেলেকে।

বীমা কোম্পানির উচ্চ পদস্থ অফিসার  বিশ্বজিৎ বাবু র ছিলো সুখী স্বচ্ছল পরিবার । হঠাৎই একদিন দুর্ঘটনা। এক বৃষ্টি স্নাত গভীর রাতে বর্ধমান হাইওয়ে ধরে কোলকাতা ফিরছিলেন একটা সেমিনার সেরে , বিশ্বজিৎ বাবু গাড়ি ড্রাইভ নিজে করতেন ।সেদিন ছিলো তাদের বিবাহবার্ষিকী। বেরুণোর ইচ্ছে ছিলো না , কিন্তু বিধি বুঝি বাম। স্ত্রী পূরবী দেবীর জন্য লাল গোলাপ আর হীরের আংটি কিনে রেখেছিলেন। জীবনের অনেক ঘাত প্রতিঘাত , চড়াই উৎরাই পেরিয়ে তাঁরা একে অপরের পরিপূরক হয়ে উঠেছিলেন।  সাত পাঁচ ভাবতে ভাবতেই এক মালবাহী লরির ধাক্কায় দুর্ঘটনা। জীবন বীমার আধিকারিকের নিজের জীবন গভীর সংকটে। পুলিশই বিশ্বজিৎবাবুকে হাসপাতালে ভর্তি করে তাঁর গাড়ির কাগজপত্র দেখে বাড়িতে খবর দিয়েছিলেন।  তখন বিশ্বজিৎ বাবু র বয়স চুয়াল্লিশ  ,ডক্টর বলেছিলেন আশা কম , ইন্টারনাল হেমারেজ এতো বেশী , নিউরো সার্জন ডক্টর লাহিড়ী বলেছিলেন , " আমি  অপারেশন করবো তবে যতোক্ষণ না জ্ঞান ফেরে বলা যাবে না , ঈশ্বর কে ডাকুন "। সেই থেকে ঈশ্বর ই যেনো রক্ষা কর্তা পূরবী দেবীর। মেয়ে পনেরো  ছেলে বারো, কি করবেন পূরবী দেবী .... তপন তো বাবার ভালোবাসা সান্নিধ্য কিছুই বোঝেনি , মেয়ে অরুণিমা বাবার এই দুর্ঘটনা কিছদিন ভূলতে পারেণি। পূরবী দেবীর ছিলো একটা কঠিন লড়াই। ইস্পাত কঠিন মানসিকতা নিয়ে তিনি ডুবন্ত তরী কে রক্ষা করেছিলেন , বছর দুই আগেও এরকমই এক গ্রীষ্মের সকালে স্বামীর সুস্থতা কামনায় দেবী কালীর আরাধনা করে প্রসাদী জবা ফুল স্বামীর মাথায় ঠেকিয়ে বাড়ি ফিরতে ফিরতেই স্ট্রোক এ মারা যান। আজ পূরবী দেবী বেঁচে থাকলে তাঁর অনন্ত প্রতীক্ষা , তাঁর কষ্টের ফসল ,সাধনার ধন কে দেখে যেতে পারতেন, সময় বড়ো নিষ্ঠুর।

বিকেল পাঁচ টা ডক্টর লাহিড়ী র চ্যাম্বারে তপন অরুণিমা দুজনেই হাজির , সকালে খবর পেয়েও কারো সময় হয় নি । লাহিড়ী বলেন  " সাবধানে রাখতে হবে উনাকে যেনো কোনরকম শক না পান" ...... অরুণিমা বলে , "কি করে সম্ভব ডাক্তার বাবু , মা মারা গেছেন এটা কি করে বলবো ? উনি তো মা কে দেখতে চাইবেন।" এই সময় নার্স এসে বললো পেশেন্ট একদম নর্মাল , জুস দেওয়া হয়েছে , বাড়ির লোক দেখা করতে পারেণ।

কুড়ি বছর পর বিশ্বজিৎ বাবু জেগে উঠে দেখলেন এ জগত মিথ্যা নয় ,স্বপ্ন নয় .... এতোদিন তিনি যেনো ঘুমের মধ্যে আচ্ছন্ন ছিলেন  স্ত্রী প্রিয়তমা পূরবী তাঁর মাথার কাছে দাঁড়িয়ে নীরবে চোখের জল ফেলতেন ,তিনি সব দেখতে পেতেন , তিনি যেনো চিৎকার করে বলতে চাইতেন , কেঁদো না , এই তো আমি , জীবন মৃত্যুর সীমানা য় দাঁড়িয়ে থাকা এক সৈনিকের মতো অতন্দ্র কড়া প্রহরায় তিনি ছিলেন আবিষ্ট। মেয়ে অরুণিমা কাঁচের দরজা র ওপার থেকে বাবা কে দেখে যেতো,  বিশ্বজিৎ বাবু স্নেহের সুরে যেনো ডাকতেন , আয় মা কাছে আয়। কেও তাঁর ডাক শুনতে পেতো না , কি অসহ্য যন্ত্রণা হতো , কতো অসহায় লাগতো নিজেকে ,শ্বাস যেনো বন্ধ হয়ে আসতো ...... বিশ্বজিৎ বাবু যেনো নির্জন জনমানবহীন এক পরিত্যক্ত নিরালা দ্বীপ এ নির্বাসিত ছিলেন বহুকাল।

অরুণা তপন সহ ডক্টর লাহিড়ী বিশ্বজিৎ বাবুর কেবিনে এসে দাঁড়ায়। বিশ্বজিৎ বাবু চিনতে পারেণ না তাদের। ডক্টর লাহিড়ী পরিচয় করিয়ে দেয় , নিয়তির কি নিষ্ঠুর পরিহাস।তাঁর রক্ত যাদের মধ্যে প্রবাহিত তাদের সাথে পরিচয় করতে হচ্ছে অপরজনের মধ্যস্থতায়, হঠাৎ ই তিনি পূরবী দেবীকে ডেকে ওঠেন ,সবাই নিশ্চুপ - " পূরবী কোথায় , কেমন দেখতে হয়েছো তুমি ?" ডক্টর লাহিড়ী এগিয়ে আসেন কাছে , পালস রেট নর্মাল , অক্সিজেন ও খোলা আছে , একটা ঘুমের ইন্জেকশন রেডি করতে বলে , বিশ্বজিৎ বাবুর হাতটা নিজের হাতে তুলে নিয়ে বলেন , উত্তেজিত হবেন না , বিশ্বজিৎ বাবু উৎকণ্ঠা য় চিৎকার করে বলেন , "কি হয়েছে পূরবী র ?"  তপন আর পেরে না ওঠে বলে , মা নেই। গোটা ঘর নিস্তব্ধ, একটা আর্ত চিৎকার বিশ্বজিৎ বাবুর  " ওঃ ভগবান " তারপর ই সব চুপ ...... বিশ্বজিৎ বাবু সীমানা পেরিয়ে গেলেন , কোলাহলমুখর  সন্ধ্যায় বিশ্বজিৎ বাবু পূরবীর সন্ধ্যা শিথিল আলাপে মগ্ন যেনো , ক্ষনিকের এপার জীবনকে চেনালো - ওপারেই যেনো প্রশান্ত শান্তির ক্ষীণ রেখা ক্রমেই প্রস্ফুট ।।