Jul 31, 2023

সুপ্রতিম ভৌমিক

ভিখারী মধুর দুর্দশা

আজ খুব বৃষ্টি দুপুর থেকে । মধু এক নিত্য ভিখারী । সকালে বের হয় ঘর থেকে দু' মুঠো অন্নের সন্ধানে, অন্ন সংগ্রহ করে ঘরে ফিরতে হয় প্রতিদিন সন্ধ্যা । পরিবারের বাকী সকলে তার ভিক্ষার অন্নের আশায় বসে থাকে ক্ষুধা নিবারণ হেতু । কিন্তু আজ ঝড় বৃষ্টিতে মধুর আর ঘরে ফেরা হলো না । তাই ঘরের সকলে জঠর জ্বালা নিয়ে তার জন্য খুবই চিন্তামগ্ন, চোখে ঘুম নেই । কে জানে সে কোথায় আছে, কিভাবে রাত কাটাচ্ছে ?

অলকা গোস্বামী

বিদায়ের স্পর্শ

সেদিন ওর চোখে কি দেখেছিলাম,জানিনা। ওর হাতে ধরা আমার হাত টা ছাড়িয়ে আনতে পারিনি।একসময় নিজেই খুব আস্তে করে আমার হাত টা ছেড়ে দিল, মনে হলো আমার আঙ্গুলের শেষ স্পর্শ টুকু ও ধরে রাখতে চায় নিজের বুকের ভিতরে।

আজো মনে হলে বুকের ভিতর টা কেমন কেঁপে ওঠে।

সেদিন....

আর আজ, মাঝখানে পেরিয়ে গেছে দীর্ঘ পঁচিশ বছর। কোনও দেখা সাক্ষাৎ নেই। অতনুর শেষ কথাটি এখনো কানে বাজে,

আর কোনোদিন কথা বলবে না আমার সাথে।

কথা রেখেছিলাম আমি(সায়নী)।

কদিন থেকেই বৃষ্টি ঝরছে। জানালার গরাদে হেলান দিয়ে অতীত কথা  ভাবতেই বেশী ভাল লাগে সায়নীর। সেই মুহূর্তে কেউ ডাকলে বা ফোন এলে বিরক্ত লাগে। বিভাস সকাল সাড়ে আটটার মধ্যে অফিসে বেরিয়ে যায়। তারপর টুকটাক গৃহস্থালি কাজ সেরে কখনো গান শোনা, বই পড়া নিয়েই সময় কাটে। বিভাস গম্ভীর প্রকৃতির। অফিস নিয়ে কথা বলতে বেশী ভালোবাসে। সায়নীর মনের গভীরে কথার ঢেউ আছড়ে পড়ে....। সেসব শোনার আগ্রহ বা সময় বিভাসের নেই।

যৌথ পরিবারে মানুষ সায়নী। ভাইবোনেরা ওকে চড়ুই পাখি ডাকত। সারাদিন মুখে কথা আর কথা। ও বাড়িতে না থাকলে সবাই খোঁজ নিত,

আজ চড়ুই পাখি বাড়ী নেই বুঝি!

সায়নীর দাদা সুবিমলের বন্ধু ছিল অতনু। কখনো বন্ধুদেরকে বাড়ী নিয়ে আসত সুবিমল, গল্প,আড্ডা, হৈ চৈ।

সেই অনেকের মধ্যে অতনুকে দেখলে কেমন একটা শিহরন অনুভব করতো সায়নী। মনে হতো দুটো চোখ শুধু ওকেই দেখছে। এই বাড়ীতে আসা যাওয়ার মাঝখানে কখন দুজনের চোখে চোখে ভালোবাসার বোঝাপড়া হয়ে গেছিল... সেটা এখন আর মনে পড়ে না। 

ভরা বর্ষায়.... ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি, রাস্তা মোড়া কৃষ্ণচূড়া ফুল এর গালিচা। একটি মাত্র ছাতা, দুজনে কাক ভিজে হয়ে আশ্রয় নিয়েছিল সেই চা এর দোকানে। যেখানে একদিন অতনু বলেছিল,

আমরা তোমাদের মত এত স্বচ্ছল নই সায়নী। তুমি কি আমার জন্যে অপেক্ষা করবে?

  তুমি আরো পড়াশোনা কর সায়নী। ততদিনে আমিও চাকরি পেয়ে কিছুটা সামলে নেব। 

অপেক্ষা করার প্রতিশ্রুতি রাখতে পারেনি সায়নী।

বইয়ের ফাঁকে অতনুর ছবি সায়নীর মায়ের চোখে পড়ে যায়।

নব্বইয়ের দশকে যৌথ পরিবার সায়নীর বিয়ে দেওয়ার স্বপক্ষে যুক্তি দেয়।


চা এর দোকানে বসে বৃষ্টির জল আর চোখের জলে ভেসে অতনু কে বিদায় জানিয়ে এসেছিল সায়নী। নিজের ভালবাসা, স্বপ্নের চেয়েও অনেক বড়, মা বাবা,পরিবারের সম্মান ও মর্যাদা। বিভাস  কোনো কিছুর অভাব রাখেনি। শুধু সায়নীর মন ছুঁতে পারেনি। খুড়তুত বোন রিনি একদিন বলেছিল,

জানিস, সেদিন অতনু দাকে ব্যাংকে পেয়েছিলাম। বাব্বা কত বড় চাকরি করে, গাড়ি বাড়ী বিশাল ব্যাপার।

ছোট্ট করে

ও আচ্ছা,

বলে কথা পালটেছিল সায়নী।  শুধু জানতে চাইছিল,

তুমি কি সেই আগের মতোই আছো, নাকি অনেকখানি বদলে গেছো, জানতে ইচ্ছে করে।

অঝোর বৃষ্টি ঝরছে। বিভাস কে ফোন করল সায়নী,

ছয় টা বেজে গেল, কখন আসবে?

আরে বৃষ্টি কমুক।আসছি....। তুমি ততক্ষনে আমার জন্যে একটা রোমান্টিক কবিতা লিখে ফেল।

হেসে ফোন রেখে দিল বিভাস।

সায়নীর বুক চিরে দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এলো।

প্রথম প্রেমের বাহুডোরে আমি এখনো বাঁধা পড়ে আছি,বিভাস। আমাকে ক্ষমা করে দিও। সবটুকু দিয়েও যখের ধনের মত আগলে রেখেছি সেই বিদায়ের স্পর্শ টুকু।

ছন্দা দাম

মায়া স্পর্শ

মা মাগো...উফফফ কি ব্যথা গো মা !!

কঁকিয়ে কেঁদে উঠলো উর্মি।

আষাঢ়ে মুখভার করা দুপুর , একটানা টিপটিপ বৃষ্টির জলতরঙ্গ আর তার সাথে কোরাসে রান্নাঘর থেকে মায়ের রান্নার মৃদু মধুর সুরভিত রান্নার সম্ভার দেয়া আর হাতা ছেনির শব্দ শোনা যাচ্ছে।

মা কাজ করে করেই বলছেন...দাঁড়া মাথাটা ধুইয়ে দিচ্ছি,মাথাটা বিছানার পাশে নিয়ে আয়।দেখিস ফুসমন্তরে কমে যাবে।

মা ঘটি হাতে কপালে চুলে  জল ঢালছেন ধীরে ধীরে,আর বলছেন...ভীষণ অবাধ্য মেয়ে,কথা শুনিস?বলি যে বৃষ্টিতে ভিজলেই জ্বর আসবে...কে কার কথা শোনে,

ব্রাহ্মণ মন্ত্র পড়ে আর...!!!

বুঝবে মা না থাকলে!!

আহা কি আরাম !!কি ভারী লাগছিল মাথাটা । উর্মি আওয়াজ পাচ্ছে মা এখন বাটনায় থেঁতলে আদা আর তুলসী পাতার রস আনছেন।

কপালে মায়ের মায়া স্পর্শে সব জ্বর উধাও হয়ে গেল!!

ঘুমের দেশে ডুবে যেতে যেতে মায়ের কথা কানে আসছিল... দুষ্টুমির তোর শেষ নেই,ছাতা রেখে বৃষ্টি ভেজার কষ্ট কে পাচ্ছে বল?

 ওয়েটিং শেডে দাড়িয়ে ভিজে সপসপে  উর্মি বৃষ্টির তীব্র ছাঁট অনুভব করতে করতে ভাবছিল...আজ ঘরে জ্বর শরীরে গেলে কপালে জলের ধারা আদাতুলসীর রস দেবার হাতটা যে আর কোথাও নেই!!

 চোখের উষ্ণ প্রস্রবণ কখন মিশে গেল বৃষ্টির সাথে বুঝতেই পারল না উর্মি!!

রিপন সিংহ

মধ্যবিত্তের বিচার 

নয়ন তার বাড়ির দাওয়াই বসে কি যেন ভেবে ভেবে হাওয়ায় কথা বলছিল। এমন সময় তার দাস বন্ধু এসে,

"কিরে দু-দিন পর কালীপুজো, খবর কি? বাজিপটকা কিন নাই, চল।"

কিরে নয়ন কি ভাবছো?

আরে সাগর কিছু নই, সেই সাত বছর আগের কথা।

"কি কথা শুনতে পারি কি?"

কেন জানিনা এই দীপাবলি উৎসবটা আসলেই এক অবাঞ্ছিত খবর বারবার কানে আসে; হয়তো বা দীপাবলি উৎসবটা যেন আমার পরিবার ভেঙে যাওয়া মুহুর্ত, আমার জীবনের উচ্ছিট দিন। এই উৎসবটা আসলেই আমার সেই অতীতের কথা মনে পড়িয়ে দেই, যা আজও আমাদের বাড়িতে দীপাবলি নিশীথের অন্ধকার হয়ে থাকে! কেন জানিনা মনে হচ্ছে আমার জন্ম লগ্নটাই দুঃখ লগ্ন; নয়তো বা আমি জন্ম নিয়েছি সংসারের সমস্ত দুঃখ - নটখট সহ্য করার জন্য। বিধাতার এমনই পরিহাস আমার নয়ন নামই রাখা হয়েছে যাতে আমার চোখের জল মুহূর্তে মুহূর্তে ঝরতে থাকে! হা: বিধাতা এই মায়া সংসার থেকে আমায় তুলে নিলে বাঁচি, চোখের জলতো শুকাবে!

সাগর। এ কি বলছিস পাগল, মানুষের জীবনে দুঃখ না আসলে সুখের মজাটা বুঝবে কি করে।

নয়ন। নারে ভাই, আমার হাসি যেন দিনে বেলার তারা!

"আচ্ছা ঘটনাটা কি শুনি ভাই?"


দিনটা ছিল দীপাবলির একদিন আগের ঘটনা। আমার বড়দা কোলকাতায় এক বেসরকারি দপ্তরে চাকরি করে, পুজোতে কাজের ব্যস্ততায় ছুটি পাইনি বলে দীপাবলিতে আসার কথা জানিয়েছে। আমি দাদাকে জানিয়েছি আমার জন্য জিন্সের পেন্ট আর সাদা শার্ট আনতে। বাড়িতে কতই না আনন্দ; আর হবেই বা নাই কেন, বড়ো ছেলে সাত বছর পর বাড়িতে আসছে। বাবা মায়ের হাসি গাল ছড়িয়ে কান পর্যন্ত উঠে যায়। বড়ো ছেলের জন্য নাড়ু - জলপাই আচার ভিন্ন ভিন্ন পছন্দ মতো জিনিস তৈরি করে রেখেছে মা। আমি নদীর তীরে মাকে না জানিয়ে শর্বানীর সাথে একটু ঘুরতে গেলাম। নদীর তীরে শর্বানীর সাথে স্নিগ্ধ নাতিশীতোষ্ণ বাতাস গায়ে স্পর্শ করে আমার মন প্রাণ পুলকে ভরে উঠল। দু - জনে হাতে হাত ধরে অনেক গল্প করলাম, আর বললাম আমার বড়দা আসছে কোলকাতা থেকে তাই প্রতিদিন এভাবে দেখা করাটা কষ্টকর হলেও হতে পারে। শর্বানী বললো ঠিক আছে দীপাবলিতে তুমি ওই মাঠের শিব মন্দিরে এসো- হাতে হাত ধরে প্রদীপ জ্বালাবো।

"ঠিক আছে পাগলী তুমি যা বলো।"

নদীর প্রবাহে শিউলি ফুলের ভেসে যাওয়া যেন মায়ের বিসর্জনের কথা মনে পড়িয়ে দেয়। আজ বাদে কাল দীপাবলি, আমার মর্ম উত্তেজিত। ঠিক আছে পাগলী বাড়িতে যাও সন্ধা হতে চললো, তোমার সাথে থাকলে যেন মুহূর্তের মধ্যে সন্ধ্যা হয়ে যায়। 

"না আমি বাড়ি যাবো না, তোমার সাথে থাকতে আমার ভাল লাগে"!

একথা বলে সে আমার বাঁ - হাত জড়িয়ে ধরে বসে রইলো।

"আরে পাগলী স্কুল পড়ুয়া ছাত্রকে যদি এইভাবে প্রেম করতে দেখে তাহলে আমাদের দু - জনকে মেরেই  ফেলবে"!

কোন্ মতে বুঝিয়ে তার চাঁদবদনের কপালে এক চুম্বন করে আমি ফিরে এলাম। সাবধানে যাবি পাগলী।

বাড়িতে এসে দেখি ঘর - টর যেন ঝকমক করছে, কি খুশি; আমি আনন্দে আত্মহারা। সন্ধ্যায় মা'র সাথে দাওয়াই বসে কিছু গল্প - হাসি ঠাট্টা করছিলাম, বড়দা ফোন করে জানালেন সে কাজ শেষ করে দোকানে আমাদের জন্যে কাপড় কিনতে যাচ্ছে। বাড়িন্দাই বসে মা আর বাবা কি যেন খিচুড়ি - পায়েসের কথা বলছে। আমি মনে মনে ভাবলাম যদি পাগলীটা আমার সাথে থাকতো! ভাবতে না ভাবতেই পাগলীর ম্যাসেজ;

"কিরে পাগলা কি করছো।"

"তোমার কথাই ভাবছিলাম পাগলী।"

"হুঁ, এত ভীমরতি দেখিয়োনা; কুত্তা।"

"এই পাগলী যাও গিয়ে পড়তে বস্।"

 হুঁ যাচ্ছি।

ভাত খেয়ে আমরা টিভি দেখছিলাম,এমন সময় ঠিক বারোটাই মায়ের ফোন বেজে উঠল। ফোন ধরতেই মা চিৎকার করে উঠল। ওই ফোন কলটাই ছিল আমার জীবনের দুঃখের আরম্ভন! ফোন করেছে হাসপাতাল থেকে, বড়দাকে রাস্তা থেকে রক্তাক্ত অবস্থায় কেউ হাসপাতালে নিয়ে ভর্তি করিয়ে দিয়েছে! মা - বাবা যথাক্রমে অজ্ঞান আর স্তম্ভিত মূর্তি, আমি যেন এক জীবিত মৃত্যু দেহ। রাতটা কিভাবে যে কেটে গেল আমিই জানি। মা সকাল সকাল কোলকাতার জন্য রওনা দেই, মা পৌঁছে ফোন করলো বড়দা অজ্ঞান,নাক - কান রক্তে ঝরঝর করছে। মাথা ফেটে এক বিভৎস রূপ হয়ে গেছে, বাঁচার সম্ভাবনা খুবই কম! ডাক্তার জানিয়েছে ইমারজেন্সি অপারেশনের জন্য সাত লক্ষ টাকা জমা দিতে হবে, টাকার অংক শুনে যেন আমার মাথায় বাজ পড়ল; শুধু বাড়ির সীমানাটাই রেখে সমস্ত জমিন বিক্রি করে দিয়ে সঙ্গে সঙ্গে টাকা পাঠিয়ে দিল। এখন ভাই কোমাটে আছে। বাড়ির লোকজনতো আর বেঁচে ফিরবেনা বলে শ্রাদ্ধের কথা বলতে লাগল। সাত দিন পর মা ফোন করে বলল আরো সাত লক্ষ টাকা লাগবে। আমার নামে থাকা জমিনটা বিক্রি করল আর কিছুটা ধার করে সাত লক্ষ টাকা পাঠালো; জমিন - টাকা দিয়ে কি আর হবে প্রাণ বেচেঁ ফিরলেই হল! এমন বিপদের সময় নিজের  আত্মীয়ও পাশে দাঁড়ালো না, হা: স্বার্থপর মানব! এক মাস কোমাটে থাকায় জ্ঞান ফিরে ভাই সব ভুলে যায়, এমনকি নিজেকেও চিনলো না! পুলিশ তদন্ত করে বলল যে ওই দিন রাত্রে দোকান থেকে ফিরে আসার সময় তারই এক বন্ধু কোন্ এক ঝগড়ায় মাথায় ইট মেরে ফেলে চলে গিয়েছে। এক অজানা ব্যাক্তি ভাইকে তুলে হাসপাতালে ভর্তি করে যান; ওই অজানা ব্যাক্তির কাছে আমার পরিবার চির কৃতজ্ঞ।

কোমা থেকে ফিরে এসে দাদা যেন এক নাবালক শিশু। মার স্নেহ ভক্তিতেই যেন ভাইকে বাঁচিয়েছে। মা বিভিন্ন দুঃখ কষ্ট বাধা বিপত্তি অতিক্রম করে ভাই এর যত্ন করতে লাগল। এদিকে আমাদের পরিবার রসাতলে চলে গেছে, আমার লেখা - পড়াতো লাটে উঠে গেল। অর্থের এত চাপ আমি পড়া ছেড়ে দিলাম, যেন আমার পায়ের নিচের ভূমিতল ফস্কে যাচ্ছে। ঋণের টাকা শোধ করতে না পারাই, বাড়ির সর্বস্ব বিক্রি করে দিলাম। এমন কি আমার জামা কাপড়, বই - খাতা কিছুই আর রইল না; আমরা এখন সর্বস্ব কাঙ্গাল! কোনো দিন না করা কাজও বাবা করতে বাধ্য হয়েছে, রাস্তার কাজ থেকে শুরু করে প্রায় চাকর সমান। আমি প্রায় ভিক্ষুক হয়ে গিয়েছিলাম, প্রতিটা লোকের মুখে প্রায় ছি ছি আর ছি; এখন যেন এই ছি - ছি শুনাটা আমি আর কিছুই মনে করি না। আত্মহত্যা করতে চাইলেও বাবা - মা' র সেই করুন দৃশ্য চোখে ভাসে। 

ওইদিকে মায়ের অবস্থাও করুন, নিজে না খেয়ে অসুস্থ ভাইয়ের বায়না মেটাতে গিয়ে মা তার সর্বস্ব সোনা - দামি কাপড় সব বিক্রি করে দিয়েছে। সুবিচারের জন্য মা আদালতে মামলা করলেও, কাঙ্গালের কথা কেই বা শুনে! আদালতে গেলেও আজ নয় সাতদিন পর, তারিখ আসে আবার তারিখ পরে; আবার তারিখ আসে তারিখ পরে। সু - বিচারের মুহুরীকে টাকা দিতে দিতে মা আজ পথের ভিখিরি। বাতাসে শুনতে পেলাম বিরোধী দল নাকি কোন্ এক অবৈধ ভাবে মামলাকে চাপানোর চেষ্টা করছে। এমনকি বিরোধী দল তারা মাকে সরাসরি হুমকি দিচ্ছে মামলা নিয়ে নেওয়ার জন্য। তারিখ পড়ল আজ আদালতে আসার জন্য কিন্তু আবার তারিখ দিল এক মাস পর। এদিকে আমাদের পরিবার দু - টুকরো হয়ে গিয়েছে; আমি সুবিচারের আশা প্রায় ছেড়েই দিয়েছি। একমাস পর মা আদালতে পেশ হলে মিষ্টার সাহেব বাবু ঘোষণা করল তোমার ছেলে পথ দুর্ঘটনায় এমন হয়েছে তাই মামলা নিয়ে নিতে। যদি আজ আমাদের অর্থের অভাব নাই বা থাকতো তাহলে অনেক পূর্বেই সুবিচার পেয়ে যেতাম; আমাদের পাশে দাঁড়ানোর মতো কেউ নেই। বাড়ির আত্মীয়রাও আমাদের ঘর ছাড়া করার জন্য ষড়যন্ত্র করেই থাকে। আমরা প্রায় পথের কুলান্দ্রি হয়ে গিয়েছিলাম।

বন্ধু এটাই হল আমার অতীতের কথা। ওই দিন থেকে আজও আমরা এই দীপাবলিতে প্রদীপ প্রদীপ্ত করিনি! এই দীপাবলি আসলেই আমার সেই সাত বছর আগের ফোন কলটা কানে বাজে। ওই ফোন কলটাই ছিল আমাদের পরিবারের অন্ধ দীপাবলি। তাই এই দীপাবলিতে চারিদিকে আনন্দে আলো ঝলমল - ফুরফুর করলেও আমি আজও অন্ধকার আবদ্ধ ঘরে একা বসে থাকি। আগেতো আমি সবার সাথে মিশতে চেষ্টা করতাম কিন্তু এখন একা সরিয়ে আসতে চেষ্টা করি। 

আজ বুঝলাম আমার নাম "নয়ন" মানেই দুঃখ ভরা জীবন। 

জানিনা আমি কে, কেনই বা জন্ম নিয়েছি!

পদ্মশ্রী মজুমদার

নবজাতক 

"আপনে আপনার উপরওয়ালার নাম লইন,আমি আমার উপরওয়ালার নাম লইয়ার"

এই বলে ডাক্তার কিছু সময় নামাজ পড়ার ভঙ্গিতে চোখ বন্ধ করে রইলেন।তারপর হাতে তুলে নিলেন সিজারের ছুরি।অর্পিতার চোখে কেউ এক টুকরো ভারি কাপড় দিল।অর্পিতাও চোখ বন্ধ করে  ইষ্টদেবকে স্মরণ করতে থাকল।কিছু সময় রুদ্ধশ্বাস।এর ফাঁকে দুই জনের প্রার্থনা ব্রহ্মান্ডের কোথাও মিলেমিশে একাকার।

নবজাতকের কান্নায় ভরে উঠল অপারেশন থিয়েটার।

শুভাশিস চৌধুরী

বিনোদ-আমন

সকাল এগারটা।অফিসের আধিকারিক সুখেন্দুবাবু কিছু বুঝে উঠার আগেই হুরমুর করে মা মেয়েকে নিয়ে চেম্বারে ঢুকে পড়ে এই অফিসেরই নিয়মিত সাফাইকর্মী বিনোদ সতনামী। শুধু ঢুকেই পড়ে নি ওরা দুজন বিনোদকে সাক্ষী রেখে কথা বলতে শুরু করে-

প্রথমে বিনোদই শুরু করে

স্যার!

কী?

এই দেখেন এইডা আমার মাইয়া মাধুরী আর বউ জিনাৎ।এরা কিছু আপনেরে কৈতে চায়।

জিনাৎ তেড়েফুঁড়ে বলে ওঠে

স্যার এই যে আমার মাইয়াডা, এইবার কলেজে সেকেন্ড ইয়ারে পড়ে।পুলাডা তো বি কম পাস কৈরা চাকরির পরীক্ষা দিব কৈয়া, কুচিং সেন্টারে ভর্তি হৈছে। এখন আমরারে একটা রাস্তা দেখান। বিনোদকে দেখিয়ে বলে, হের হাতেত্তে

আমরারে মুক্তি দেন।

মিষ্টি রোগা চেহারা, জিন্স আর টপ পড়া মেয়ে মাধুরী, একই সুরে সুর মিলিয়ে বলে,হ স্যার, একটা কিছু ব্যবস্থা কৈরা দেন।আর পারি না।অতিষ্ট লাগে।

হেরা যেমনে চায় কৈরা দ্যান স্যার, বলে অনুমতি নিয়ে ঘর থেকে বেড়িয়ে যায় বিনোদ।যেন স্যারের কাছে ওদের ঠেলে দিয়ে পালিয়ে বাঁচল।যেন বুঝাতে চাইলো দেখুন স্যার,আমি কিভাবে,কাদের নিয়ে থাকি।

মাধুরী থামল না।কী কমু স্যার বাইত থাকনের উপায় নাই।পৈত্যেক দিন রাইতে মদ খাইয়া আইয়া আমরারে ঘরেত্তে বাইর কৈরা দেয়।মাইয়েরে মারে।

কথার মাঝে জিনাৎ ঢুকে সংযোজন করে, হে বেতনের টাকা যা পায় সব হের মায়ের সংসারে দিয়া লায়।আমরা খাইলাম কি খাইলাম না,ইডার খবরঅ লয় না।আপনে হয়তো জানেন না স্যার,ঐ হরিজন কলোনিতে হের মা ভাইয়েরা বাড়ির যে একটা পরিবেশ বানাইয়া রাখছে! সারাক্ষণ খালি ঝগড়াঝাঁটি, বাজে কথা,হৈ চৈ।কেমনে যে পুলাপানের পড়াশুনা করাই, হে একমাত্র আমিই জানি। শেষ পর্যন্ত ভাড়া আইলাম ঐ দয়াময় কলোনিতে দুইডা ঘর লইয়া।ইহানেও কষ্টেমষ্টে আছিলাম। কিন্তু শান্তি নাই। হে রাইতে আইয়া আমরারে ঘর থিকা বাইর কইরা দেয়। শেষে পুলা মাইয়া লইয়া আমি আমার বাপের বাড়িত, ঐ বর্ডার কলোনিতে আইয়া পড়ছি।আজগা এক সপ্তা ঐল।অখন স্যার কিতা করতাম কন। আইন আদালত যা করন লাগব করুম।আমারারে একটা উপায় কন।

ঝরের গতিতে ওরা দুজন কথাগুলো বলে ফেলল।এতক্ষণ চুপ করেই ছিলেন সুখেন্দুবাবু। এবার মেয়েটাকে বললেন,তবে তো তোর বাবাকে পুলিশের হাতে তুলে দিতে হয়, মহিলাদের উপর অত্যাচার,এটাকে তো ডোমেস্টিক ভায়োলেন্স বলে। কলেজে পড়িস, নিশ্চয়ই বুঝতে পারছিস,এর পরিনতি।কয়েকটা দিন জেল খাটুক,চাকরিটা তো যাবেই। একশ্বাসে কথাগুলো বলে গলার স্বরে একটু পরিবর্তন আনলেন সুখেন্দুবাবু।আচ্ছা বল, তখন কি আর তোদের টাকা দিতে পারবে? 

মেয়েটা তড়িৎ গতিতে বলল,না স্যার,এসব কিছুই লাগত না, আপনে শুধু বাবার বেতনের টাকাডা মার একাউন্টে দিয়া দেন।তৈলে বাবা নিজের মতো থাকুক আমরা আমরার মতন।

এবার একটু থিতু হলেন সুখেন্দুবাবু। ভালো করে দুজনকে আরবার দেখলেন।এই চোখে এতক্ষণ যে দুটো নারী চরিত্রকে দেখেছেন তার থেকে আলাদা। কেননা এবার মনে হলো এরা আসলে বাবা বা স্বামীকে চাইছে না।বাবা বা স্বামী নয়, বিনোদ এখন এ সংসারে ওনলি আর্নিং মেম্বার।এই শুধু তার পরিচয়।স্যার একবার নিজের দিকেও তাকিয়ে কোথায় যেন মিল খুঁজে পান।

জিনাতের বয়স ৪০এর বেশি নয়ই।তবে শারীরিক গঠনে তিরিশের বেশি মনেই হয় না। বিনোদের বয়স ৪৫ এর কাছাকাছি হলেও শরীর মজবুত। ব্যাকব্রাশ করে চুল আঁচড়ানো পোশাকে ফিটফাট।অফিস পরিষ্কার রাখা ওর কাজ হলেও সেই কাজ যেটুকুই করুক না কেন নিজেকে গুছিয়ে রাখে। খানিক ক্ষণের মধ্যেই মা মেয়েকে বুঝিয়ে বললেন, এখন তোমরা যাও, আমি ওর সঙ্গে কথা বলে জানাব, তোমরা অফিসকে এই বিষয়টা লিখিত আকারে জানাও,তারপর দেখছি। 

মা মেয়ে বেড়িয়ে গেল। সুখেন্দুবাবু ভাবতে থাকলেন,জিনাত,বিনোদ, মাধুরী সবইতো একসময়ের রূপালী পর্দায় ভেসে ওঠা নাম।এই বয়সে আসল সমস্যাটা কোথায়? আরও গভীরে অনুভব করলেন ছেলে মেয়ে দুটোই ১৮-২১বৎসরের মধ্যে।এরা দুজন দুজনকে সংসারে জুড়তে গিয়ে তবে কি নিজেদেরকে খুঁজে পাচ্ছে না?

অফিসের সারাদিনের নানান কাজের শেষে বিকেলে বিনোদকে ডাকলেন। বিনোদ যে বন্ধ দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে মা মেয়ে আর স্যারের কথা শুনছিল, সেটা সুখেন্দু অনুমান করতে পেরেছিলেন।তাই ডাকের সঙ্গে সঙ্গে বিনোদ এসেই যখন স্যারকে বললেন,স্যার,এরা যা কৈসে সব মিছা কথা।আমি কয় টাকা বেতন পাই কন স্যার!এর মধ্যেই পুলা মাইয়ার পড়াশুনা,বোউয়ের সাজগুজ, সংসার, সব চালাইতে গিয়া আমার ত অফিসের পরেও নানান খানে সাফাইয়ের কাজ কৈরা রুজগার করন লাগে। হের পরে বাড়িতে আইয়া আমন যদি ইট্যু শান্তি না দেয় কিতা করি কন্ । সুখেন্দু বাবু সঙ্গে সঙ্গে বললেন,আমন আবার কে? বিনোদ একটু লজ্জাই পেল,তারপর যেন চটকা ভাঙলো,স্যার হের নাম জিনাত ঐলেও ওরে আমি আমন কৈরাই ডাকি। 

সুখেন্দুবাবু বুঝতে পারলেন তার ধারনাটাই ঠিক। এবার নরমে গরমে বললেন,শোন্ এখন তুই বাবা।ক'দিন পর মেয়ের বিয়ে দিবি। তখন আরেকজন অপরিচিত ছেলেও তোকে বাবা বলবে এটা বুঝিস?কাজেই যা আর ঝগড়া না। তুই তো বাবা, সংসারের মাথা।যা, ওদেরকে দাদুর বাড়ি থেকে আজ নয় কাল ডেকে নিয়ে আয়। সামনের ছুটির দিন আমি যেন শুনতে পাই মা, মেয়েকে সঙ্গে নিয়ে নীরমহল বেড়িয়ে এসছিস।কত আর লাগবে? ছেলে তো আর যাবে না,তোরাই ঘুরে আয়।সাড়াদিনের জন্য যাবি।যাবি তো?ভাড়া লাগবে?মাথা চুলকায় বিনোদ,না স্যার । 

পরের সপ্তাহে অপেক্ষা করে সুখেন্দুবাবু ,না কোনো লিখিত অভিযোগ অফিসে জমা পড়ে নি।তবে কি!!

মিঠু মল্লিক বৈদ‍্য

বিশ হাজারের বিনিময়ে

সকাল থেকেই চেনা সুরে কোকিলটা ডেকেই যাচ্ছে। রনিতাও ওর মিষ্টি সুরে তাল মিলিয়ে সংসারের কাজ মিটিয়ে নিচ্ছিল সময়ের মধ‍্যে। স্বামী অজিত আর ছোট তিন বছরের অনুরূপাকে নিয়েই ওর সংসার। ভালোবাসার পবিত্রতা নিয়েই অজিত ও রনিতা বিয়ে করেছিল বছর পাঁচেক আগে বাবা মায়ের অমতে। বাবার বাড়ি ও শ্বশুড় বাড়ির কোথাও এই বিবাহিত দম্পতির স্থান হয়নি সেদিন। ওরা নিজেরা একটা ভাড়াবাড়িতে সংসার শুরু করে।

নুন আনতে পান্তা ফুরানো অবস্থার মধ‍্য দিয়ে ওদের সংসার এগোতে থাকে। রনিতা ও অজিত কারোরেই আর পড়াশোনা হয়নি।সংসার চালানোর তাগিদে অজিতকে যোগ দিতে হলো রাজমিস্ত্রির কাজে। আর রনিতা দুই একটা টিউশনি করে কোন রকমে দিন কাটায়।

জীবনের সব রঙ বে-রঙ্গীন হয়ে যায়। তবুও এক বৎসর কষ্টের মাঝেও আনন্দ খোঁজে ওরা কাটাচ্ছিল দিন।আস্তে আস্তে শুরু হয় ঝগড়া। এর মধ‍্যে অজিতের মা বাবা ছেলের কষ্ট সহ‍্য করতে না পেরে ওদের বাড়িতে নিয়ে গেল বটে কিন্তু রনিতার শুরু হয় নতুন লাঞ্ছনা। অজিতও তেমন একটা কেয়ার করতো না, কেমন জানি উদাসীন থাকতো। মাঝে মাঝে  সারাদিন কাজের শেষে একটু নেশা করে বাড়ি ফিরতে শুরু করলো। রনিতা কিছু বললে প্রথম প্রথম বকাবকি করতো,পরে পরে সেই মাত্রা বাড়তে থাকে। এদিকে শ্বশুর -শাশুড়ীও ভীষণ যন্ত্রণা করতো। দিনের পর দিন ওকে না খাইয়ে রাখতো।বাবার বাড়ি থেকে টাকা পয়সা চেয়ে নেওয়ার জন‍্য চাপ দিত।আর রনিতা তা অস্বীকার করলে শুরু হতো নির্যাতন।

সহ‍্য করতে করতে রনিতা মা হওয়ার সৌভাগ্য লাভ করে। কিন্তু সেটাও সহজ ছিল না। এই সময়েও ওকে নানা ভাবে অত‍্যাচার করতো ওরা।একদিন সহ‍্য করতে না পেরে রনিতা পঞ্চায়েতের দ্বারস্থ হয়। এর পর বিভিন্ন সালিস বৈঠকের মধ‍্য দিয়ে রনিতার নিরাপত্তার দায়িত্ব নেয় পঞ্চায়েত। ডরে ভয়ে শ্বশুর শ্বাশুড়ি কিছুদিন চুপ থাকলেও অজিতের অত‍্যাচার চলতেই থাকে। মা হওয়ার আশায় রনিতা দিনের পর দিন মেনে নেয় সবটুকু।  না না ওর কোন স্বাদের অনুষ্ঠানের বাড়াবাড়ি ছিল না,ছিল না প্রতিনিয়ত চিকিৎসকের পরামর্শ। সারা প্রেগনেন্সির জার্নিতে শুধু দুই থেকে তিনবার ডাক্তার ওকে দেখেছে। শত প্রতিকূলতা পেরিয়ে অবশেষে রনিতার কোন আলো করে আসে টুকটুকে একটি ছোট্ট মেয়ে। তার পর থেকে রনিতার উপর অত‍্যাচার মাত্রা ছাড়িয়ে যায়। ভাই ও বাবাকে জানানোর চেষ্টা করেও ব‍্যর্থ হয়। অসহায় রনিতা সন্তানের মুখ চেয়ে নীরবে সহ‍্য করে সবটা দীর্ঘ দুই বছর।

ধৈর্যের বাঁধ ভেঙ্গে যায় এক রাতে। অজিত নেশায় মত্ত।  মাংশ ও রান্নার নানা সরঞ্জাম সহ এক বন্ধুকে নিয়ে বাড়ি আসে। রান্নার নির্দেশ আসে রনিতার কাছে। মেয়েকে ঘুম পারিয়ে যত্ন করে রান্না করে খেতে দেয় ওদের। খাওয়া দাওয়া শেষে রনিতা যখন ঘরে যায় দেখে  বিছানায় ঘুমিয়ে আছে অজিত ও বন্ধু সবুজ। ছোট্ট মেয়েটা পাশে। রনিতা কোন কথা বলার আগে অজিত বলে সবুজকে সন্তুষ্ট করতে হবে রাতে।তাই এই বিছানায় ওকে থাকতে হবে সে চলে যাবে বাইরে। কারণ সে বিশ হাজার টাকা ধার নিয়েছে সবুজের কাছ থেকে। রনিতা স্বপ্নেও ভাবেনি এতো নীচে নেমে যাবে তার ভালোবাসার মানুষ টি। যার হাত ধরে একদিন বাবা মা ভাই বোনকে ছেড়ে  সকল সম্পর্ক ছিন্ন করে  বেরিয়ে এসেছিল সেই মানুষটি আজ বিশ হাজার টাকার বিনিময়ে বিক্রি করতে চাইছে তাকে। কান্নায় ভেঙ্গে পরে অজিতের পায়ের উপর। ওর পৃথিবীতে  বিশ্বাস,ভরসা, ভালোবাসা সব মিথ‍্যা হয়ে এক শূন‍্যতা হাহাকার স্থান করে নিল। নিজেকে শেষ করার কথা মনে আসতেই ছোট্ট মেয়েটা মা বলে কান্না করতে থাকে।

অজিত রনিতাকে সবুজের দিকে ধাক্কা মেরে বাইরে বেরিয়ে সমানে থেকে দরজা বন্ধ করে দিল। রনিতা নিজের সম্মান,আত্মমর্যাদা বাঁচাতে সবুজের পায়ে পরে ভিক্ষা চাইতে থাকে।  সবুজ সেই মুহূর্তে অসুর হয়ে না উঠে রনিতাকে শান্ত করার চেষ্টা করে। রনিতার প্রতি কেমন যেন মায়া জাগে। সারারাত রনিতা সবুজের সংগে একঘরে থাকে আর ওর জীবনের অতীতটাকে বলতে থাকে সবুজের কাছে। মেয়েটাকে বুকে নিয়ে সে অবুঝের মতো কাঁদতে থাকে।সবুজ ওকে ছুঁয়ে ও দেখেনি। সকাল হতেই কোকিলটা ডেকে চলছে।এক করুণ সুর।

এর পর প্রায় রাতেই সবুজ আসতো।অজিত কোন বাঁধা দিত না। সবুজ রনিতার হাতের রান্না খেতে পছন্দ করতে লাগে, ওর সাথে কথা বলে সময় কাটিয়ে আনন্দ পেতে লাগে।  সেই রাতে সবুজের আচরণের পর থেকে রনিতা সবুজকে শ্রদ্ধা করতে থাকে। আস্তে আস্তে ওদের মধ‍্যে একটা অজানা সম্পর্ক গড়ে উঠে। অজিত হারায় তার সবটুকু অথচ তার টেরও পেলো না। বিশ হাজারের বিনিময়ে  সে আজ সম্পূর্ণ একা।রনিতার চোখে এক অদ্ভুত তৃপ্তি। সবুজ দাঁড়িয়ে সামনে।করুণ সুরে ডেকেই চলছিল কোকিলটা।

খুকুরানী দে

দাবদাহ

ধোঁয়াশা বয়ে ঘনীভূত হয়ে মেঘ জমে 
ঈশানের কোনে পড়ন্ত বেলায়,
আদ্রতা বেড়ে গুড়ি গুড়ি বৃষ্টি ঝরে
এক সময় ভোর হয়ে যায়।

অপ্রতিরোধ্য ধ্বংসের মুখ হতে 
অসম্পৃক্ত আপেক্ষিকতায় ফিরে আসা 
কালো মেঘ আমি
গোধূলির বুকে দমকা হাওয়া
চাই এক পশলা বৃষ্টি হয়ে ধুলি বয়ে যাক।
হৃদয় কে বাঁচিয়ে রাখার হয়ত মিথ্যে প্রয়াস।

আবহাওয়া মাঝে মধ্যে দমকা বাতাস  যায় বয়ে
তবে সে বাতাসও এত গরম থাকে
প্রশান্তির বদলে অস্বস্তি আসে লয়ে।
ঘাম ও বের হয় না শরীর থেকে।

বিজ্ঞান বলে দাবদাহে খাপ খেতে হলে
বেশি বেশি পানি ও করতে হবে পান
নিয়মের মতো নিয়ম করে করতে হবে স্নান 
অবহেলায় শ্বাস নিতে হবে কষ্ট,
তা থেকে মিলবে না পরিত্রাণ।।।

মায়া রানী মজুমদার

বিধাতার পরিহাস

মা বাবার আকাঙ্খিত বাসনা পূর্ণ করতে মায়ের কোল আলো করে যখন নবজাত শিশু জন্ম নেয় তখন মা গর্ভধারণ ও প্রসব যন্ত্রণা ভুলে গিয়ে শিশুকে সস্নেহে কোলে তুলে নেন। এবং অতি সোহাগে বড় করতে থাকেন। শিশু সন্তান, ছেলে হোক বা মেয়েই হোক মা বাবার নয়নমণি। সন্তানকে মা বাবা অতি সোহাগ ও আদর যত্নে বড় করে তোলেন।

মেয়ে সন্তান জন্ম নেয় পরের ঘরে বধূ সেজে গিয়ে ঐ ঘর আলোকিত করার জন্য। বধূ সেজে গিয়ে আনন্দে মাতিয়ে রাখে পুরো বাড়িটাকে। 

"মেয়েরা পরকে আপন করে
               আপনকে করে পর, 
বাহিরের বাঁশির টানে 
                      ছেড়ে যায় ঘর।" 

মা বাবার ঘরে অতি আদরে বড় হয়ে মেয়েরা স্বামীর ঘরে গিয়ে পুরো সংসারের দায়িত্ব বুঝে নেয়। স্বামীর সোহাগে প্রতিটি স্ত্রী নতুন জীবন পেয়ে, নতুন করে বাঁচার স্বপ্ন দেখে। স্ত্রীও আপন করে নেয়, স্বামী, স্বামীর মা, বাবা, ভাই, বোন,এবং আত্মীয়-স্বজনদের। 

   একটা ছোট্ট লাল টিপ, শাঁখা, সিঁদুর ও লাল পেড়ে শাড়িতে বধূকে অপরূপ লাগে। ভাগ্যের পরিহাসে  কোন কোন নারী সংসার জীবনে এই সুখ থেকে বঞ্চিত হয়ে আবার আর একটা নতুন রূপ ধারণ করে।

    স্বামীর বিয়োগান্তে স্ত্রী'রা শাঁখা, সিঁদুর ও লাল শাড়ি থেকে বঞ্চিত হয়। ইহাই সমাজের নিয়ম। সমাজের নিয়মে জীবন সঙ্গীকে হারিয়ে সাদা শাড়ি পরে একাকী বৈধব্য জীবন কাটাতে হয়। এই একাকিত্ব জীবন যে কত দুর্বিসহ, ভুক্তভোগী ছাড়া কেউ বুঝে না। কারণ, ব্যথা না পেলে কেউ ব্যথার যন্ত্রণা বুঝবে কি করে ? 

  সাদা শাড়িতে বৈধব্য-বেশে রাত্রি বেলায় হারিকেনের আলোতে যখন আরশিতে মুখ দেখে, তখন আয়নাতে ভেসে উঠে নিজের সধবা থাকাকালীন সেই ছবি।  মনের আয়নাতে এই ছবি ভেসে থাকে মৃত্যুর পূর্ব মূহুর্ত পর্যন্ত। 

  দুঃখে, মনোকষ্টে বুক ফেটে যায়, তবুও মুখ ফুটে কিছু বলতে পারে না। এই হলো নারীর জীবন। বিধাতার পরিহাস বুঝা বড় দায়। বিধির নিয়ম লঙ্ঘন করা যে দুঃসাধ্য।

অসীম পাঠক

জোছনা রাতে 

পূর্ণিমার মায়াবী চাঁদের আলোয় বাঁধ ভাঙা উচ্ছ্বাস। পুরুলিয়ার পান্ডব বর্জিত এক গ্রামের মেঠোপথ দিয়ে গ্রামের শৌখিন যাত্রার আসরে পঙ্গপালের মতো ছুটে চলেছে সব মানুষজন। গোপালপুরে যাত্রা তাও আবার ঐতিহাসিক পালা।  ঝলমলে পোশাকের মেলা আর গ্রাম্য বিনোদনের এক অফুরন্ত ভান্ডার, সাথে মেলা জুয়ার আসর, দেশী মহুয়ার চনমনে নেশা। কাঁচের গ্লাসে ফেনায়িত মদ আর ঝালঝাল চাখনা  ছোলা মটর বাদাম। আহা রে- জিভ চকচক করে হরিপদর।  বেশ রসিক মানুষ হরিপদ কর্মকার, তার রসের ভান্ডারে কতো বিচিত্র অভিজ্ঞতা র গল্প। নাম করা গুনীন, সাপের বিষ নামা থেকে শুরু করে ভূত তাড়ানো অবধি , এমন কি  মেয়েদের বন্ধ্যাত্ব দূর , সাংসারিক কলহ -- সব সমস্যার মুশকিল আসান হরিপদ।  বৌ ইন্দিরাও বেশ খাসা মেয়ে, বর্ধমানে বাপের বাড়ি, ইন্দিরা বেশ চালাক চতুর কিন্তু ; লোকে বলে মানিকজোড়। হরিপদ ইন্দিরার বিয়ের এখনো দু বছর ঘোরেনি। হরিপদ বিয়ে করবো না করবোনা করে তার  এক আত্মীয়ের মেয়ের বিয়েতে কাটোয়া গিয়ে ওখানেই ইন্দিরাকে দেখে বিয়ের সাধ জাগে তার। ইন্দিরার বাবা ইঁট ভাটায় কাজ করতো, গরীব মানুষ। হরিপদ একেবারে রথ দেখা কলাবেচার মতো পাকাদেখা বিয়ে সব সেরে বৌ নিয়ে বাড়ি ফেরে, বুড়ি মা  তো খুব খুশী- দুজনের সংসারে আর একজন বাড়তি। 

বিয়ের পরে এই প্রথমবার হরিপদ ইন্দিরা কে নিয়ে যাত্রার আসরে এসেছে। অন্যান্য মেলা পার্বনে হরিপদ নিজে চট পেতে জড়িবুটি নিয়ে বসে। সন্ধ্যার পরে এক পাত্তর দেশী গিলে বাড়ি ফেরে হরিপদ, পয়সা কড়ি মন্দ করেনা। গুনীনের বৌ বলে ইন্দিরার বেশ খাতির মেয়ে মহলে।  বুড়ি মা বেরুবার সময় বলেছিলো , পোয়াতি মেয়েমানুষ নিয়ে রাতের বেলা যাস না, হরিপদ বলে  মা তোর বেটা কে ভূত পেরেত সব যমের পারা ডরায়।  

হাতে হাত ধরে যাত্রা আসরে ঢোকে দুজনে, তখন সবার সাজপোশাক চলছে। পালার নাম  তাজমহল। হরিপদ বলে  , এ বৌ কি লিবি বল - তোর বরতো তাজমহল দিতে লারবেক কিন্তু  কাঁচের চুড়ি  ইমিটেশনের মালা  হাতে মেহেদি আর পেটভরে জিলাপি ফুচকা খাওয়াবেক। ইন্দিরা বলে আর একটা ভেনিটি ব্যাগ লিবো , একটা পুতুল কিনে রাখবো, ঘরেল লাইগে একটা আঁশ বটিন লাইগবেক, চিনামাটির কাপ লাইগবেক। আর তুমার লাইগে একটা গোল টুপি কিনবো  মাথায় পরলে বেশ সাহেব পারা লাইগবেক। রোদে জলে বড ঘুরো , মাথা ঠান্ডা থাইকবেক। আর একটা ছোট পারা মতন লুহার কড়াই। বেশ সব কেনাকাটা হয়। কদিন ধরে ঊখানে হরিনাম সংকীর্তনের আসর বসেছিলো, আজ ধূলাট। শেষ দিনে যাত্রা। মাঠের পাশেই অড়কষা নদী, জল কম পাথর বেশী।  বৌ এর হত মেলা ঘুরে  থলি ভরর্তি করে সব কেনে  ইন্দিরা যা যা বলে  ... সব । হরিপদ জানে বৌ খুশী থাকলে সব ঠিক।  ওই যে সেই মহান কথা ... সংসার সুখের হয় রমনীর গুনে। 


 হরিপদর চোলাইয়ের আসরে বসতে ইচ্ছে করে। বেশ ঝাল ঝাল চাখনা আর তাজা মহুয়া। যাত্রার আসরে একটা শিরীষ গাছের নীচে আরও অনেক মহিলার সাথে ইন্দিরা কে বসিয়ে  সে মাল খেতে যায়, মনটা আজ বেশ ফুরফুরে। পেট পুরে মদ গিলে হরিপদ। পাঁচ খানা গাঁয়ের নামকরা ওঝা বলে কথা।  বিষধর সাপকে এক হাতে কাবু করে ফেলে। ইন্দিরাকে বলে , এসব  কিছুই না , খালি চোখে চোখ রাইখে উয়ার গতিবিধি টা বুঝতে হবেক। 

মদ খেয়ে ঝান্ডির আসরে যায়, চিড়িতন রুপিতন আর ইস্কাপনের খেলা। মোটা দাঁও মারে হরিপদ। আহা কি মজা , বৌয়ের চাঁদ বদন দেখেই তো তার ঘুম ভেঙেছিলো। বৌটা তার কপাল খুলে দিয়েছে। 

মনে মনে হরিপদ ইন্দিরার মুখ খানা ভেবে নিয়ে  অদৃশ্যে হাত বাড়ায় , যেনো পারলে একটু আদর করে। অনেক নিম্নচাপের রাত  ইন্দিরার পুরুষ্টু শরীর হরিপদ আদরে আদরে তোলপাড় করে তোলে। ইন্দিরার যৌবনের অনন্ত ক্ষুধা যেনো হরিপদ ঠিক মেটাতে পারেনা। 


এদিকে যাত্রার আসরে  ইন্দিরার পেছনে কে যেনো শিস দেয় , এতো চেনা শিস।  শিস তো নয় সংকেত। যৌবন বন্যায় উদ্বেলিত ইন্দিরার কামনার খেলাঘরে যার অবাধ অনুপ্রবেশ  বলাই ......    বলাই মাঝি। চওড়া ছাতি , মাথা  ভরতি বাবরিছাঁট চুল। সরু গোঁফে বেশ বলশালী চেহারা। বিয়ে করেছে হরিপদ  আর নেপোয় মারে দই এর মতো ইন্দিরাকে গোপনে ভোগ করে বলাই। বলাই মাথার ঘাম পায়ে ফেলে সব্জী চাষ করে। হরিপদর মতো লোক ঠকানো ব্যাবসা নয়। লোকের বৌ এর বন্ধ্যাত্ব দূর করতে গিয়ে নিজের টাই পেরে ওঠে না।  ইন্দিরার গর্ভে তাইতো বলাইয়ের সন্তান। 

ইন্দিরাকে একটা রাতেও সুখ দিতে পারেনি ভূত তাড়ানো গুনীন। তাইতো বলাইকে ইশারায় ডেকেছিলো ইন্দিরা। যৌবন বন্যায় উদ্বেলিত ইন্দিরা নিজেকে  উজাড় করেছিলো বলাইয়ের কাছে প্রথমবার ঘোষেদের বাঁশ বাগানে। তিনমাস আগে স্থানীয় হেল্থ সেন্টারে ইউরিন টেস্ট করে আয়রন ক্যালসিয়ামের বড়ি দিয়ে ডাক্তার দিদিমনি বলেছে  সে মা হতে চলেছে। অথচ বলাইয়ের সাথে সহবাসের আগে অবধি কোন লক্ষনই ছিলো না, মাঝে মাঝে ভাবে ইন্দিরা যদি বাচ্চার চেহারাখান বলাইয়ের মতো হয়ে যায় ....    

যাত্রা আসরে বলাইকে দেখে ভয় পেয়ে যায় ইন্দিরা , আর যাই হোক হরিপদ তাকে বড্ড ভালোবাসে, বলাই তো তার কামনার পুরুষ। ভালোবাসা হরিপদর সাথেই। বলাইয়ের কাছে এসে ফিসফিসিয়ে বলে , এই নাগর তোরে কচুকাটা করবে আমার বর জানতে পারলে , এখানে কি করতে এসেছিস। বলাই বলে দেখতি এলাম রে , হাজার হোক আমার পোলার মা হবি তুই। ইন্দিরা বলে আ মরণ ভাগ এখন, বলাই হাসতে হাসতে চলে যায়। 


যাত্রা শেষ হতে বেশ দেরী হয়।

তবে খুব সুন্দর অভিনয় সবার। হরিপদ ইন্দিরার হাত ধরে টর্চের আলো ফেলে বাড়ির পথে চলতে শুরু করে। বেশ ফুরফুরে হাওয়া দিচ্ছে, গ্রীষ্মের রাত বড়োই মনোরম।

গলা ছেড়ে গান ধরে হরিপদ, 

"ও পীরিত তোর জ্বালা তবে ঘুচাতে পারি , তেজে সুখ সাধ  লোক পরিবাদ , যদি পরের মরণে আপনি না মরি "। 

মাঠ ছেড়ে ধান জমিতে এসে পড়েছে তারা, রাস্তা টা এখন শুনসান। এখানে অনেক পুরানো দুটো বট আর নিম গাছ রয়েছে, জায়গা টা খুব একটা ভালো নয়। কেমন একটা গা ছমছমে পরিবেশ।  হঠাৎ কোথা থেকে কালো মিশমিশে চেহারার চারটে ছায়ামূর্তি রাস্তা রোধ করে দাঁড়ায়।  জলদ গম্ভীর স্বরে বলে ওঠে ,  এই গুনীন ছোঁড়া ছাড়ো  - ই ফুলের পারা ফুলমতীকে হামদের হাতে ছোড় দে। একটু দলাই মলাই করে দেখি, মালটার ঝাঁঝ কতটা। ভূত তাড়ানো হরিপদ  মুশ্কিল আসান হরিপদ একি ঝামেলায় পড়লো রে বাবা । হরিপদর মুখ শুকিয়ে যায়। ছায়ামূর্তি গুলো ইন্দিরার দিকে এগুতেই  এমন সময় বাঘের মতো হুংকার দিয়ে সামনে এসে দাঁড়ায়  বলাই। বলে ওঠে  কোন বেটার এতো সাহস রে , মরদ হলে ছুয়ে দেখ , সব কটারে লাশ বানাই দিবো। হাহাহাহা করে হেসে ওঠে ছায়ামূর্তি গুলো , তাদের একজন বলে  হামি কালু ডোম আছে , এখানের মিনিষ্টারের খাস লোক, হামার শিকার আটকাবে কোন বেটা-  থানা পুলিশ সব ভি হামারা জেব মে, তু কোন হ্যায় রে বেটা।  বলাই মেলায় আঁচ করেছিলো বলেই  চোখে চোখে রেখেছিলো ইন্দিরা কে। এবং একটা খেলনা পিস্তলও কিনেছিলো। রাতের বেলা এটাতেই অপরাধীদের ঘুম উড়ে যাবে, তাছাড়া দু চারটা পাতি মস্তানকে ডান্ডা মেরে  ঠান্ডা করতে সে ওস্তাদ। 

বলাই বেশ দাপটের সাথে বলে ওঠে ,  আরে কালু ওস্তাদ  ওসব মিনিষ্টার তোর পকেটে রাখ , আমার হাতে এটা আছে , তোর কোন বাপ এটা থেকে বাঁচাতে পারে শালা ডাক তাকে ..... বলেই খেলনা  পিস্তলটা উঁচিয়ে ধরতেই চারজন পড়ি মরি করে দে দৌড়। 

হরিপদ বলাইয়ের হাতদুটো ধরে বলে ,  বড়ো বাঁচালিরে ভাই , তোর ঋণ আমি কেমনে শুধি বল। বলাই মনে মনে বলে , শালা তোর বৌটারে যদি পারমান্ট দিতিস, সে কথা মনে চেপেই হাসি মুখে বলে  খুড়া বেটা হলে ভোজ খাওয়াবে , সব শোধ। এবার তিনজনেই হাসে। দুজন পুরুষের মাঝে এগিয়ে চলে ইন্দিরা। একটা হাত হরিপদকে ধরে আর মনটা যেনো বলাইয়ের কাছে বাঁধা।  তার গর্ভে যে বড়ো হচ্ছে সেও তো বলাইয়ের মতো এমনি সাহসী আর বুদ্ধিমান  হয় যেনো। বাড়ির কাছাকাছি আসতেই ইন্দিরা বলাই কে বলে ওঠে , ইবার তোর ঘরে চাঁদের পারা বৌ আসুক। বলাই মুচকি হেসে তার টিনের চালের ঘরের দিকে এগিয়ে যায়। বলাই ইন্দিরার কেওই জানলো না যে  হরিপদ সব জানে। বাঁশবাগানে দেখেছে সে। ওঝা মানুষ , পাঁচ খানা গাঁয়ের গুনীন কি এমনি এমনি ......  সে তো জানতো যে জড়িবুটি তে সব হয় না।  ভেক ধরা এসব গুনীন যদি সব পারতো তাহলে ভগবানের আর বিজ্ঞানের কি দরকার। নিজে পারেনি বলেই তার অক্ষমতাকে সে অবলীলায় মেনে নিয়েছে। ইন্দিরা খুশী থাকলেই সে খুশী। তার মনের ভেতরে কষ্টের চারাগাছটা তাকে আজ একটু হলেও ছায়া দিয়েছে , ভরসা দিয়েছে। কবে কি হয় কে জানে, সংসারে সুখী হতে গেলে বোবা হতে হয়। বোবার যে শত্রু নেই। চাঁদের আলোয় যেনো সব দুঃখ গলে যায় , সব পাপবোধ মুছে যায়। এই জোছনারাতে  সব ভূলে ইন্দিরাকে জড়িয়ে ধরে হরিপদ ধীরে ধীরে শান্তির ঘুমে তলিয়ে যায়।।

শ্বেতা ব্যানার্জী

হাজার তারার আলো

আজ সাহায্যকারি দিদি আসেনি, স্বাভাবিকভাবেই কাজের চাপটা অনেক বেশি ছিল।

স্নান করার সময় পর্যন্ত পাইনি। খিদেতেও পেটটা একেবারে চোঁ চোঁ করছে। তিনটে  বাজে একগাদা  বাসন অগোছালোভাবে পরে। হাতটা ধুয়ে এসে খাবো সেই ফুরসত নেই।  সবে স্নানের তোড়জোড়  করেছি,  পাসের বাড়ির পিসিমার হাঁক,

বউ, ও বউ, শুনতে পাচ্ছিস....

পিসিমাকে পাড়ার সকলেই সমীহ করে, পিসিমা ও প্রত্যেকের বিপদে আপদে পাশে এসে দাঁড়ান। 

আমার  শাশুড়ীমা'র মুখে শোনা, উনি আগে যজ্ঞির

রান্না, পুজোপার্বণের রান্না এক হাতে সামলেছেন।

এমন কী পাড়ায় কেউ যদি ডাক নাও দিত তবু্ও পিসিমা  হাজির। বল কী করতে হবে।

এ-হেন পিসিমা কে আমারা সকলেই শ্রদ্ধা ও সম্মান করি।

পিসিমার ডাকে সাড়া দিয়ে দুরদার করে সিঁড়ি ভেঙে সোজা পিসিমার সামনে... 

বলুন পিসিমা,  বলছি  তোরা  কী সব মুখে মাখিস ফর্সা -টর্সা হবার জন্য, আমার নাতনীকে আজ দেখতে আসবে। জানিস তো ওর রঙচাপা বলে 

প্রত্যেকটা সম্বন্ধ ভেঙে যায়।

আমি বললাম পিসিমা,প্রথমত আমি ওসব মাখিনা,দ্বিতীয় যারা রঙ দেখে বিয়ে করে তাদের আমি মানুষ মনে করিনা। তোমরা যে এত লেখাপড়া, গান, আঁকা শেখালে তার কোন মূল্য নেই!!

কী জানি বাপু!! যারা দেখে যায় ফিরে গিয়ে জানায়

কালো রঙ ছেলের পছন্দ নয়। আর মেয়েটা চোখের জলে বুক ভাসায় একলা ঘরে। 

আমি বললাম পিসিমা তুমি ওকে আমার কাছে পাঠিয়ে দিও। 

তুই তাহলে সাজিয়ে দিবি!

দেবো,কিন্তু মনের... 

মোটামুটি শ্যামাতন্বী, তবে শিখরীদশনা না'হলেও

লাবণ্যময়ী অনুসূয়া দীপ্ত প্রতিভায় উদ্ভাসিতা..

ইকনমিক্স ডিপার্ট্মেন্টের ভিজিটিং কনসালট্যান্ট।  

দিল্লিতে পাকাপাকি চাকরি পেয়েও মা-বাবার কথা 

ভেবে যাইনি।

অনুসূয়া সামনে এসে দাঁড়িয়ে জিজ্ঞেস করে ডেকেছো কাকিমা।

আমি বললাম আয় বোস, 

তুমি কী বলবে বলে ডেকেছো!

আজ তোকে   বিকেলে  দেখতে আসার  কথা।

কথাটা শুনেই ও যেন কেমন হয়ে গেলো, আমি কারণটা  বুঝতে পারলাম।

অনুসূয়া আমার মুখের দিকে তাকিয়ে বলল, কাকিমা আর আপমান হতে  আমি চাইনা।  বাবা ও মায়ের অপমান, আমার মেয়ে জন্মের অপমান --

আমি ওর পিঠে হাত রাখি, বলি তুই দয়া ভিক্ষা 

চাইছিস!?  কখন কে এসে তোমায় উদ্ধার করবে!!

এত ট্যালেন্ট তোর, তার কোন মূল্য নেই!

ডিগ্রি তো তোকে শিক্ষিত করতে পারিনি! তুই সেই পুরনো ধ্যানধারণায় আটকে আছিস!?

কী করবো কাকিমা! 

আজকাল বিয়ের জন্য মেয়ের গুন  কেউ দেখেনা, দেখে শুধু গায়ের ফর্সা চামড়াটা। যেটা আমার নেই।

যেটা নেই তা'কে আরোপ করার দরকার নেই। 

তুই  যেমন, তেমন ভাবে যদি কেউ গ্রহণ করে 

তাকেই তুই বিয়ে করবি।

পূর্ব অভিজ্ঞতা থেকে বলছি কাকিমা, জীবনটা গল্প বা উপন্যাস নয়, একটা কালো মেয়েকে দেখে  পছন্দ হয়ে গেল তারপর তারা সুখে শান্তিতে সংসার করতে লাগলো। এটা বাস্তব জীবন। আর এই বাস্তব জীবনে একটা কালো মেয়েকে প্রতিটা পদে পদে অপমানিত হতে হয়।

এই কিছুদিন আগে অফিসের মিটিং সেরে ফিরতে একটু রাত হয়ে গিয়েছিল, পাশের বাড়ির কাকিমা 

বারান্দায় দাঁড়িয়ে ছিলেন আমাকে দেখে আহ্লাদে আটখানা হয়ে বললেন.... 

ভগবান তোকে কালোরঙ দিয়ে একদিক থেকে মঙ্গল করেছেন,  ধর্ষিতা হবার ভয় যেমন নেই, তেমন তোর সঙ্গে ডেট করার জন্যও কেউ এগিয়ে আসবেনা। নিশ্চিন্তেই তুই রাত করে ফিরতে পারিস।

তাই কী না বল!! বলেই এমন হো হো করে হেসে উঠলো...

আমি নিজের উপর নিজে একরাশ  ঘৃণা নিয়ে বাড়ি ফিরলাম। 

কেন এত হীনমন্যতায় ভুগিস!! তোর যা কোয়ালিফিকেশন    সেইসব নিয়ে ভাব, দেখবি

জীবনের উৎকর্ষ খুঁজে পাবি।


আজ বাপন বাড়ি ফিরছে.. প্রায় তিনবছর বাদ

ম্যাঞ্চেষ্টারে ছিল একটা ফেলোশিপ প্রোগ্রাম নিয়ে গিয়েছিল। 

সিঁড়ি থেকে মা মা ডাকে বাড়ি উত্তাল করে ছেলে 

আমার ঘরে ঢুকলো, বাবা কোথায় জেনে নিয়ে 

শুরু হ'লো সেই ছেলেমানুষী যা ওর বাবা এবং আমার সঙ্গে করতো। 

আজ বিকেলে ছাদ বাগানে ঘুরতে ঘুরতে পাড়ার সবার খোঁজ নিল,কথায় কথায় আমি অনুসূয়ার কথা তুললাম,  ও চুপ করে শুনলো, কিছু বললো না।

আমি বললাম চুপ কেন!!

ও বললো ভাবচ্ছি,

 কী ভাবচ্ছিস!!  মা আমি যদি অনুসূয়াকে বিয়ে করি

তোমার আপত্তি আছে? 

আমি আনন্দে বাক্যহারা... 

দুচোখে আনন্দের ঝর্ণা, ছেলে বুকে জড়িয়ে বলি

সার্থক আমার মা জন্ম, সার্থক তোর মনুষ্যত্ব। 

তোরা জীবনে সুখী হ' দাম্পত্য জীবন দীর্ঘায়িত হো'ক তোদের---

মা মা, আমি এখনো বিয়ে করিনি। শুধু কথা দিলাম তোমাকে,  তুমি ওনাদের সঙ্গে কথা বলো।

আমি অনুসূয়ার হাতটা ধরে বললাম আমি তোর শাশুড়ী  হতে চাই। অনুসূয়া  আমার মুখের দিকে তাকিয়ে মুখ নিচু করে নিল,   কিন্তু তার আগেই তার  বড় বড় চোখের ভাষা আমি পড়ে নিয়ে ছিলাম, যেখান নোনাজল  চিকচিক করছিল।

অনুসূয়া আমায় প্রণাম করতে মাথা নোয়াতে যেতেই আমি বুকে জড়িয়ে নিয়ে বললাম ---

দূর বোকা, তোর জায়গা তো এখানে...।

Jun 29, 2023

নির্মলেন্দু গুণ

১.মা

তোমাকে আমি মান্য করি 
দুধের জন্য।
তোমাকে আমি মান্য করি
তোমার দুটি নরমকোমল 
স্তনের জন্য

তোমার স্তনের দুধ 
শুকিয়ে যাবে যেই--,
দেখবে আমি 
তোমার পাশে নেই। 

২.তুমি যখন সম্মত হও

তুমি যখন সম্মত হও- 
খুব আনন্দ লাগে!
অন্ধকারের ওপার থেকে 
সূর্য যেন জাগে।

তুমি যখন সম্মত হও-,
ভয়ে আমি কাঁপি।
আমার ওজনযন্ত্র দিয়ে
তোমার ওজন মাপি।

অশোকানন্দ রায়বর্ধন

১. সেলফি

ভালবাসবে বলে তুমি আমাকে দাঁড়িয়ে রেখে
দূরে কোথায় চলে গেছো বৃষ্টি মাথায়–
দাঁড়াতে দাঁড়াতে হাঁপিয়ে উঠে এদিক ওদিক দেখে,
তোমাকে আমিখুঁজতে বেরিয়েছি হেথায় হোথায় ।

হঠাৎ দেখি ঝোপের পাশে তোমার ছায়াটারে,
সেলফি তুলছে আপন মনে গাছকে জড়িয়ে ধরে ।

২. উল্টোরথ

আমাকে কাঁদতে বলোনা চোখে অশ্রু নেই,
হাজার মানুষ অসহায় দেখে গেছে শুধু,
আনন্দের হাট, রাজপথে হঠাৎ চিতা জ্বলছেই,
শিশু গেল, তরুণ গেল, গেল শহর সরল গৃহবধূ।

এমন দহন আমি আর কস্মিনকালে দেখিনি 
কোথায় রথ, কোথায় কলা, পাতার বাঁশির ধুন,
রশি শুধু একাকী গড়ায় স্তব্ধ বিকিকিনি,
অসহায়ের আর্তনাদে আকাশ বাতাস করুণ ।

অপাংশু দেবনাথ

১. ঐশ্বর্য


নিষেধের কত বাঁশ পুঁতে আটকাবে হৃদয়ের মাটি!
চারিদিকে জল আর পানি ঢেউয়ে ভাঙে অরূপ 

হৃদয় তো বিরাগ-বিহঙ্গ ডানা মেলে মেঘের ওপার,
যেখানে ভালোবাসা আর জীবনের যতো মণিহার। 

২. খনন

মোহ হারিয়ে গেলে জেনেছি মরে যায় পূর্ণমায়া,
মায়াহীন আবেশে দেখেছি হৃদয়ের শূন্যছায়া।
ছায়ার ভেতর মরে যায় মানুষের স্বপ্নমন,
অতপর বেঁচে থাকা শুধু নিজেকেই তো খনন!

তৈমুর খান

১. সুপ্রভাত

 দু-একটি সুপ্রভাত কখনো কখনো আসে
 বাগানে সেদিন সব রঙিন পাখি ডাকে
 ডালে ডালে কুসুমের কানাকানি
 সূর্যের হাসিতে আমরা বুঝে নিই তাকে।

২ . স্বীকার 

নিভৃতে বসন্ত আসে আমার উঠোনে 
মিলনের ভাষা পায় আবেগের পাখি 

সে উষ্ণতা ছুঁয়ে আজ 
আমিও নতুন বাল্মীকি !

সন্তোষ রায়

১. কৃষ্ণ

কৃষ্ণ নামের কেউ এসেছিলেন ঘরে। আমার ঘরের রাধা রান্না ফেলে চলে যায় গাছের তলে।

উনুনের ধোঁয়ায় ঘরে জমে মেঘ, প্রেসার কুকারের বাঁশি বাজে। বৃষ্টি এলে আমি ও ময়ূরী নাচি মেঘের ডাকে

২.ঘুম

একটি রাত জেগে আছে শুধু, আর সব ঘুমে
ঘুমিয়ে পড়েছে উপোসী চৌকিদার
চোরও ঘুমিয়েছে ভুলে।

চন্দন পাল

 কাঠকস্তুর (৩)

 রোগ

আদিত্য প্রতিহিংসারহিত ঈশ্বর, পুড়ে পুড়ে শেখায় প্রেম।  আত্মখনন হয়নি যার, তারে প্রেম? প্রশ্রয়!। অধুনা  মোমজীবন কথা, বিবর্তীয় নাট্যাংশের স্তাবক রোগ। জন্মাবধি বিবর্তনহীন সবিতা, ছড়ায়নি বিজ্ঞাপণ রোগ। 

রক্তে অনাস্থা কণিকা

অনুপ্রবেশ আর দুর্ভিক্ষ জীবন যাঁরা বেয়ে আসে, তুমি সে জীবন দেখনি। মন্বন্তরের ঘা শুকোতে না শুকোতে আবার  গ্রামছাড়া ঘা!। শতবর্ষ ধরে ঘাএ ঘাএ, রক্তে মিশেছে অবিশ্বাস। কালান্তর শাসক তুমিই সাপ,তুমিই ওঝা বিরাট ।

সমরেন্দ্র বিশ্বাস

১.বন্ধ্যা দিন 

চোখ থেকে কিছুটা দৃষ্টি খুলে মাটিতে পড়লো,
কথা ছিল কিছু কিছু দৃষ্টি গজাবে
তা হলো না, 
কারণ মাটিরা তখন রক্তাক্ত আর দৃষ্টিরা বীর্যহীন!

২. ব্যবধান খর্ব হয়ে আসে 

বিদ্বেষের পায়ের থেকে মুজো খুলে গেলে
পাহাড়ের উচ্চতারা খর্ব হয়ে আসে।
তখনই মানুষেরা পেরিয়ে যা‌য় স্ত্রোত্রপাঠ নদী, 
আজানের আকাশ থেকে নেমে আসে ইন্দ্রের বাতাস!

রুদ্র মোস্তাফা

প্রতিবেশী  

১.

নীলতরঙ্গে কত কথা ওড়ে যায় আঙুলের ক্লান্তি ভুলে
রংবেরঙের রাতগুলো ঝরে পড়ে প্রতি ভোরে 
একাকী দুজন বেলকনির রোদ ধরছি ছায়ার আঁচলে
তবু আটকে থাকে বর্ণমালা চোখের কার্নিশ ধরে। 

২.

দুই বারান্দার মাঝে শুয়ে আছে দীঘল শূন্যতা
কথা বলা মানা তাই বারান্দায় বুনেছি গোলাপ
আমরা বোবা প্রতিবেশী পেয়েছি সৌরভের পূর্ণতা
সুবাসে সুবাসে ঠিক জমেছে আমাদের আলাপ।

উমাশংকর রায়

১. ধূসর কৌলিন‍্য

বৃষ্টি চাই বৃষ্টি চাই বলে - চলে গেল সবে।
অপেক্ষার বৃষ্টি এল, সব ধুইয়ে চলেও গেল।
শুধু ধূসর কৌলিন‍্যের নিয়ম ভিজেনি, তালে তালে
উড়ছে ধুলো ভিতর-ঘরে, সংসার তার অটুট।

২. কাঁটা

গলায় কাঁটা হয়ে বিঁধে আছে অন্ধকার
উগরাতে গেলে চাই - অন্তত এক ছটাক আভাস।
আশ্চর্য! রাতজাগা পাখিও বুঝতে পারেনি -
অন্ধকার একমুখো নয়, তার দশানন, দশ মুখ!