Jul 31, 2023

মনচলি চক্রবর্তী

 জল ভাত 

 ( আগরতলার কথ্য ভাষায় লেখা) 

দুপর বেলা করীমের পেট  জ্বলতাছে খিদায়।ধানের জমি তিক্কা আইয়া দেখে কিচ্ছু  নাই খাইব কি? এমন কি দুইডা জল ভাত ভাতও নাই ডেগে। পেটের ক্ষুধায় তার মাথা গরম হইয়া গেছে গা।আজকে তার ইচ্ছা করতাছে মাইয়াডারে মাইরাই লাইবো।সারাদিন বাড়িত থাকে তাই দুইডা ভাত রানতো ও পারে না। 

করীমের বউ মরছে মাইয়াডার জন্মের সময়। 

বাপ আর মাইয়ার অভাবের সংসার।

মাইয়ার বয়স ৮- ৯ বছর হইছে।কোনরকম চলে খাওন  বাপ মাইয়া দুইজনের।করীম জমিত কাজ করে।সারাদিন কাজের পরে আইয়া পেটে আগুন জ্বলতাছে তার।রাগে একটা বাঁশ লইছে আজকে মাইয়ানননডারে মাইর দিবো।এমন সনয় লগের বাড়ির কাকি আইয়া কয় মারবা মাইয়া ডারে কেন? তাই ছুডো একটা মাইয়া হাত পুড়াইয়া দুইডা রান্দে।আজকে  তর ঘরো চাল আছল নি, মাইয়াডা কিতা  করবো। আমি দিতাম আইছি চাল দুইলা তাই রাখছে না। মাইয়ার কি জিদ নিছে না বাবা রাগ করবো কইয়া।কালকে মাইয়া ডা ভাত রানতো গিয়া মার গালতে হাত টা পুড়াইয়া লাইছে যে দেখচত নি তুই? মা মরা মাইয়াডারে মারবি?

 কাকির কথা শুইনা করীমের হাত তিক্কা বাঁশ টা পইরা গেছে।করীম ঘরো গিয়া মাইয়া ডার  হাতের পুড়া জায়গাডা  দেইখা চোখের জল আর রাখত পারছে না।বুকে মাইয়াডারে জড়াইয়া কাইন্দা দিসে।করীম কয় -মা মরা মাইয়াডারে  এতো কষ্ট দিতাছি  - হায় আল্লা!

বাপ মাইয়ারে কষ্টে  দেইখা কাকির চোখেও জল আইয়া পরছে।কাকি চোখ মুছতে মুছতে কয় আমি চাল আলু আনতাছি তরা ভাত খা ,বাপ মাইয়ার চোখের জলে তো আর পেট ভরত না।করীম কয় কাকী,লাগদনা আমি বাবুর কাছে টাকা পামু কাজের। টাকা দিয়া চাল আনুম আর মাছ ও কদ্দুর আনুম পারলে। মাইয়াডা হাত পুড়াইয়া রান্দে আমি বাপ হইয়া খাই।আজকে আমি নিজে রান্দুম, আর মাইয়াডারে খাওয়াইয়া দিমু নিজে।এমন বাপ আমি মাইয়াডারে ভালোভাবে খাওয়াইতে ও পারি না আদর যত্ন ও করতাম পারি না।

কাকি শুইনা কয় - করীম আবার বউ আন। তরেও খাওয়াইবো আর মাইয়াডারে ও আদর করবো।কাকীর কথা শুইনা করীম হাসতে হাসতে কয় আমরা বাপ মাইয়া ভালোই আছি কাকি।বউ আনুম সংসারে অশান্তি করবো, আর মা মরা মাইয়াডারে বকবো,মারবো, অনাদর করবো। শেষে আমার মাথা গরম হইবো আর  বউডা খুন হইবো।দরকার নাই কাকী, ভালোই আছি আমরা বাপ মাইয়া। কম খামু তবুও শান্তিতে থাকুম।মাইয়া ডারে বকি,যত্ন করিনা,ভালা খাওয়ন ও পারি না দিতাম। তাও মাইয়াডা আমার সব গো কাকি।মাইয়াডা আমার জান।

শেষবেলায় করীম বাজার তিক্কা চাল আর মাছ আনছে, রানছে নিজে।সন্ধ্যা সময়  কাকি আইয়া দেখে করীম তার মাইয়ারে ভাত খাওয়াইয়া দিতাছে। 

কাকী খুশি হইয়া কথা না কইয়া বাড়িত গেছে গা।

শম্পা ঘোষ

আসলে যেমন হয়

লোকে বলে এ অঞ্চলে অনুপম দের বাড়িটা নাকি অদ্ভুত রকমের-বাড়ির কংক্রিট থেকে দেওয়াল সবই পাথরের সামনের বিস্তৃত লন সেখান থেকে চলন রাস্তা আবার সেটাও বাঁকুড়ার লাল মাটি দিয়ে সুন্দর করে বানানো মফস্বল অঞ্চলে এতটা জায়গা জুড়ে এত বড় বাড়ি দেখা যায় না। অনুপমেরও মনে হয় বাড়িটা সত্যিই অদ্ভুত রকমের ঠান্ডা পাথরের তৈরি বাড়িটাতে সত্যিই দম বন্ধ হয়ে যায় তবে এর মধ্যে তার ওই দক্ষিণের ঘরটাকে সবচেয়ে স্বস্তির জায়গা বলে মনে হয়। ঘরটায় এখন যদিও সে বেশি সময় কাটাতে পারে না বছর খানেক আগে পর্যন্ত দাদুর ঘরটাই ছিল তার সবকিছু ।

বাবার টেটিয়াপোনা আর দিনরাত্রি টাকা-পয়সার হিসাব নিকাশ মায়ের অবুঝ শাসন দিদির আধুনিক বন্ধুদের হুজ্জুতি থেকে তো এই ঘরটাই মুক্তি র। দাদুর কাছে দেশ স্বাধীনের গল্প তিল তিল করে বাবা কাকাদের গড়ে তোলার গল্প আর সবচেয়ে ভালো লাগে ঠাকুমার কথা শুনতে। কিন্তু কি যে সব হয়ে যায় ইদানিং দাদুর শরীরটাও খারাপ। বাড়িতে এটা যেন কোন এক অবাঞ্ছিত সমস্যা, এই অনুভূতি অনুপমকে বিব্রত করে বিষন্ন করে তোলে অনুপম সবকিছু থেকে পালিয়ে বাঁচতে চায়। দিন কয়েক আগে বিএ ফাইনাল পরীক্ষা শেষ হয়েছে বন্ধুদের রোজই নতুন নতুন কোন না কোন প্রোগ্রাম ভালো লাগেনা এসব অনুপমের কদিন হলো দাদুর খুব বাড়াবাড়ি অবস্থা যাচ্ছে। কাজ ছাড়া হতে ইচ্ছেই করে না। আবার শোনা যাচ্ছে দাদুর একটু শরীর ভালো হলেই নাকি তাকে বৃদ্ধাশ্রমে পাঠাতে হবে মা নাকি এসব কি নিতে পারবে না আর। বাবাও যেন কিরকম নীল লিপ্ত টাকা পয়সা ছাড়া লোকটার কোন দিকে লক্ষ্যই থাকেনা রাগে মাথার ভেতর যন্ত্রণা আরম্ভ হয়ে যায় অনুপমের অথচ অনুভব মনে করে এই দাদু না থাকলে সে আজ এই অনুপম হতে পারত না।

উড়নচণ্ডী বদমেজাজি কিছু একটা হয়ে থেকে যেত। মাঝে মাঝে ভাবে তাই হলেই বোধহয় ভালো হতো। তাহলে তো বুঝি এত কষ্ট নিয়ে চলতে হতো না। দাদুকে বুঝতেও না। আর এসব ভাবনাচিন্তার কোন মানেই থাকতো না। এসব ভাবতে ভাবতে অনুপমের দম বন্ধ হয়ে আসে। সাইকেলটা নিয়ে বেরিয়ে পড়ে তারপর সোজা দামোদরের পার বাড়ি থেকে পালিয়ে এ জায়গায়ই তাকে নিশ্চিন্ত আরামের নিরাপত্তা দেয় দাদুকে আজ ভালো দেখেনি সে। তবুও বাড়ি থেকে বেরিয়ে পড়েছে তাহলে কি সে বাস্তবে মুখোমুখি দাঁড়াতে ভয় পাচ্ছে মনটা গুছিয়ে নেয়ার চেষ্টা করে। এখনই সাইকেলটা দাঁড় করিয়ে আজ পড়া সিগারেটটা বার করে ধরায় এরপর এ কত ছেলে খেলতে আসে নানা রকম খেলা দৌড়ঝাঁপ টানা পড়েন অনেকটা যেন জীবনেরই মতো সন্ধ্যে নেমে আসে। এ সময় আবার ভিড় হয় একদল ছেলেমেয়েদের। এরা পাশাপাশি পাড়ের বিভিন্ন জায়গা দখল করে বসে পড়ে কিছুটা সময় কাটায় অন্য জগতের হয়ে অনুপমের মনে হয় এটা স্বপ্ন কিন্তু এর স্বপ্ন গভীর ঘুমের খুব তাড়াতাড়ি ভেঙে যাবে সিগারেটটা অনেকক্ষণ শেষ হয়ে গেছে। অনুপম ঠিক করে নেয় আজ বাড়িতে সে কিছু একটা করবেই কিছুতেই দাদুকে বৃদ্ধাশ্রমে পাঠাতে দেবে না প্রয়োজন ওই বাড়িটার বিরুদ্ধে যাবে। সে এখন যথেষ্ট বড় তাই তার নিজস্ব মতামতের দাম দিতেই হবে। উঠে পড়ে সাইকেলের প্যাডেলে জোরে চাপ দেয় প্রচন্ড গতিতে সাইকেলটাকে ছোটায়। বাড়িতে সামনে এসে অদ্ভুত লাগে। লোকো কিছু জমা হয়েছে ঢুকতে গিয়ে দেখে দাদুর নিশ্চল দেবতা ততক্ষণে ঘর থেকে বাইরে সরিয়ে আনা হয়েছে বাবা মাথায় হাত দিয়ে বসে, দিদি কাঁদছে আর মা !কি জানি কোথায়? মাথা কাজ করছে না তার উদ্ভ্রান্তের মতো পালাতে ইচ্ছা করছে। সবাইকে ধরে মারতে ইচ্ছা করছে। যন্ত্রণায় সারা শরীর ছিড়ে যাচ্ছে। অনুপম সোজা এগিয়ে যায়। বাবা তার দিকে তাকিয়ে বলে 'শেষ সময়টা তোকেই খুঁজে ছে,এদিকে আয়'-অনুপম সোজা চলে যায় সেই দক্ষিণের ঘরে, জানালার রডগুলো ধরে একটু নিঃশ্বাস নিতে চাইছে। খোলা আকাশের দিকে তাকিয়ে জীবনের মানেই কি তবে এই নিশ্চুপতা? হঠাৎ শেষ হয়ে যাওয়া কিসের হাত ধরে তবে এগিয়ে যাওয়া? জড়বস্তুর সঙ্গে অনুভূতিগুলো মিশে নিথর পাথর হয়ে গেছে সবকিছু।

মিতা রায়

শ্রদ্ধাঞ্জলী

    একটা সেমিনার শেষে কলকাতা থেকে আগরতলা ফিরছিলাম। ফ্লাইট লেইট ছিল,তাই লাউঞ্জে ঘন্টা দু-এক বসে আছি। একটা গল্প বইয়ের পাতায় চোখ রেখেছিলাম। হঠাৎ কানে ভেসে পরিচিত স্বর!যথারীতি একটু এদিক ওদিক তাকিয়ে বুঝে নিলাম। কথার উতসস্থল আমার সামনের রো ছেড়ে তার পরের রো।এখান থেকে যেটুকু চোখে পড়লো এক জোড়া বৃদ্ধ-বৃদ্ধা।

   একজনের চকচকে টাকের চারপাশে সাদা- পাকা চুলের মাঝে কয়েকটা কালো চুল।কিছুটা যেন বলছে স্মৃতিটুকু থাক।খুব নিচু স্বরে  উত্তপ্ত কিছু আলোচনা হচ্ছিল বুঝতে পারছিলাম।

(২)

     এ ভাবে উঁকি-ঝুঁকি মারাটা অশোভন।তাই নিজেকে সংযত করে গল্পের বইয়ের পাতায় মন দিতে চেষ্টা করলাম। কিন্তু টুকরো টুকরো কয়েকটি শব্দ ভেসে এসে আমার কানে ঢুকছিল।তার মধ্যে আমার জন্মস্থানের নাম টা দু'বার কানে আসায় কৌতুহল বেড়েই চলল!......

কিছুহ্মন বাদে টয়লেট থেকে ফেরার সময় ভাল করে লহ্ম্য করলাম, ফ্লাইট আরও আধঘন্টা সময় চেয়ে নিল।

লাউঞ্জে বসে বসে হয়রান।তবে মন্দ নয়,শীততাপনিয়ন্ত্রিত!

হঠাৎ লাউঞ্জে একজনকে দেখে মনে হল বহু বছর পর আমার স্কুলের হ্যাড স্যার, শ্রী সৈকত বোস!স্যার কে দেখে চিনতে কয়েক সেকেন্ড সময় লেগেছিল!..... 

উনার পাশের সিটটা।খালি দেখে,পাশে গিয়ে বসলাম।

লাউঞ্জে ফ্লাইটের অপেক্ষায়।

আমি পা ছুঁয়ে প্রণাম করে বললাম,----"স্যার,আমি শুভম ঘোষাল। ৯৩ 'র মাধ্যমিকের ব্যাচ,স্যার মনে পরছে?"

হাই পাওয়ার লেন্সের ভেতর থেকে দুটো ঘোলাটে চোখ আমার দিকে ফিরে তাকাল।আস্তে আস্তে চোখের দৃষ্টি উজ্জ্বল হয়ে উঠে, সারা মুখে সেই সুন্দর হাসি ছড়িয়ে পড়ল।

বললেন,----"শুভম"....ঘোষাল বাবুর ছেলে?শুনেছিলাম  বড় ডাক্তার হয়েছিস!খুব নাম-ডাক হয়েছে তোর!....

শেষ কথাটায় কেমন একটা শ্লেষের সুর বেজে উঠল!.... 

পাশে বসা মাসিমা কে প্রণাম করে বললাম, সুজয়দার কাছে এসেছিলেন? 

সুজয়দা হেড স্যারের একমাত্র ছেলে। আমার থেকে দু'বছরের সিনিয়র ছিল।বড় ইঞ্জিনিয়ার, পিটসবাগে' থাকে জানতাম। মাসিমা, হ্যাঁ বলে,মাথা নিচু করে বসেছিলেন। স্যারও গম্ভীর হয়ে গেলেন। 

বললাম,----"কতদিন ছিলেন সেখানে? কোথায় কোথায় ঘুরলেন স্যার?"

----"ছিলাম প্রায় দু'মাস।ছেলে আর বৌমা খুব ব্যস্ত, তাও ঘুরিয়েছে টুকটাক।"---স্যার বললেন।

(৩)

একবার মনে হল উনারা বোধহয় কথা বলতে চাইছেন না।পাশের চেয়ার ছেড়ে অন্য কোথাও গিয়ে বসি।কিন্তু যেতে গিয়েও পারলাম না।

হেড স্যারের কাছে দীর্ঘদিন পড়েছিলাম। খুব কাছ থেকে উনাকে দেখেছিলাম। উনি ছিলেন মানুষ গড়ার কারিগর। এত সুন্দর করে সবকিছু বোঝাতেন।পড়ানো ছাড়াও অনেক কিছুই উনার কাছ থেকে শিখেছিলাম। টাকার বিনিময়ে প্রাইভেট উনি কোনদিন পড়ান নি।আমাদের চা বাগানের বস্তিগুলোতে গিয়ে সন্ধ্যাবেলায় বিনা পয়সায় অনেককে পড়াতেন।এ ছাড়া বইপত্র দিয়ে গরীব ছাত্রদের যথেষ্ট সাহায্য করতেন। কত গরীব ছাত্রের পরীক্ষার ফি দিয়ে দিতেন। 

   মাধ্যমিকের আগে বাবার ভীষণ শরীর খারাপ হয়েছিল। বহুদিন বাবা বিছানায় ছিল।জমানো টাকা-পয়সা সব শেষের দিকে। আমাদের এক টুকরো জমি মা বিক্রি করবে ভেবেছিল। কিন্তু স্যার, কোথা থেকে খবর পেয়ে একদিন এসে মা'কে বলে গেছেন, জমি যেন বিক্রি না করে।আমার দায়িত্ব উনি নিয়েছিলেন! কয়েক মাস উনার বাড়িতে খাওয়া -দাওয়া করে পড়াশোনা করেছিলাম। মাসিমা,নিজেদের গরুর দুধ,গাছের ফল,পুকুরের মাছ,লাউ,কুমড়ো,....শীতের সব্জি প্রায় সবই আমার হাত দিয়ে মাকে পাঠাতেন।বাবার চিকিৎসার জন্য অনেকভাবে 

সাহায্য করেছিলেন।...... 

কোনদিন কোন ছাত্র কে বকতে বা।শাস্তি দিতে দেখিনি স্যার কে!

   একবার আমার বন্ধু তরুণ কারোর টিফিন চুরি করে খেতে গিয়ে ধরা পরেছিল।

তরুণের মা চার-পাঁচ বাড়ি কাজ করে ওর পড়ার খরচ চালাতো!ও টিফিন  কখনোই আনত না।স্যার, সব জানতে পেরে,তরুণকে নিজের বাড়িতে নিয়ে গিয়ে খাইয়েছিলেন।তারপর থেকে প্রায় প্রতিদিন দুপুরেই স্যারের বাড়িতে ওকে খেতে ডাকতেন মাসিমা। মাসিমার ছিল দয়ার শরীর।সব ছাত্রদের মাতৃস্নেহে ভালোবাসতেন।আমরা কখনো কোনও কাজে গেলে মাসিমার হাতে বানানো নাড়ু,সন্দেশ খেয়ে আসতাম।

    সুজয়দা,পড়াশোনায় মেধাবী ছিল। পড়ানোর সময় হেড স্যার, সব'দাই বলতেন, ---দেশের সব স্কলার ছেলে মেয়েরা বাইরে চলে গেলে দেশের উন্নতি হবে কি কিরে?আজ নিজের খুব লজ্জা লাগছিল,এই কথাটা মনে হওয়ায়! 

   আমিও বহু বছর বাড়ির বাইরে। যদিও দেশের মাটিতে বসেই আমি চাকরি করছি।আমিও স্যারের শিক্ষায় প্রাণিত হয়ে ডাক্তারি পাশ করে প্রথম কয়েক বছর এক গ্রামীণ হাসপাতালে ছিলাম।বিনে পয়সায় চিকিৎসা করতে চেষ্টা করতাম। কিন্তু  রাজনৈতিক পাটি'র দাপটে আর রুগীদের আত্মীয়দের অত্যাচারে সব নীতি বিসজ'ন দিয়ে কয়েক মাসেই পালিয়ে এসেছিলাম। তারপর বাইরে পড়তে এসে, বিদেশেই কাটিয়েছি কয়েক বছর! বাবা-মা বহু বার ফিরতে বললেও ফিরতে পারিনি!অবশেষে, বাবা মারা যাওয়ার পরই ফিরে এসেছিলাম।..... 

সব মনে পরছে  একে একে....!

ফ্লাইট এর সময় হয়ে গেছে।তাই প্লেনে উঠে বসলাম।একজন কে রিকোয়েষ্ট করে স্যারের পাশের সিটটাতে বসলাম।

অল্পহ্মণ পরে স্যার,আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, ---"তোর ফ্যামিলি কোথায়? একা যাচ্ছিস?"

বললাম,ওরা আগরতলা বাড়িতে আছে।

মাসিমা বললেন,----"বাঃ,ভালো।তোমার মা অন্তত বৌ-নাতি-নাতনি নিয়ে আনন্দে আছেন তাহলে।"....

মাসিমা বলে চলেছিলেন, ----"আমার ছেলেটা কি করে এতো বদলে গেল জানি না!

আমাদের বোধহয় কোথাও কোন ফাঁক ছিল!"ওনার চোখ দিয়ে কয়েকফোঁটা জল গড়িয়ে পরল!

----"আঃ,কি হচ্ছে? নিজেকে সামলাও!"--------স্যার,একটা চাপা ধমক দিলেন, যেটা উনার চরিত্রের সঙ্গে বেমানান!".....

----কেন চুপ করবো? এ ভাবে ফিরে যাচ্ছি...... ওখানে গিয়ে সবাইকে,কি বলবো বল তো?জমি বাড়িটাও বিক্রি করে দিয়ে এলে তুমি!...."সে কিছু একটা ব্যবস্থা হবেই।আগে তো পৌঁছাই!".....স্যার উত্তর দিলেন!

..


(৪)

     বুঝতে পেরেছিলাম, কোথাও তাল কেটে গেছে! 

বললাম, ----"স্যার, আমি আপনাদের ছেলের মত।আমাকে যদি খুলে বলেন,কি হয়েছে? যদি আমি কিছু করতে পারি......।"

তুই বাড়ি ফেরার আগেই সব জেনে যাবি।স্যার, একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন!

   সুজয় আর ওর বউ বহু বছর বিদেশে। অনেক বছর পর ওদের একটি ছেলে হয়।বহুদিন ওরা বাড়ি আসে না।সুজয় আমাদের পাকাপাকি ভাবে বিদেশ চলে যেতে বলেছিল। ওরা সে দেশের গ্রীন কাড' পেয়ে গেছিল। 

এতদিন আসি নি।কিন্তু নাতির ফটো দেখে তোর মাসিমা কে আর রাখতে পারলাম না।সুজয় চাইছিল,আমরা পাকাপাকি ভাবে ওর কাছে চলে যাই।ও নিজে এসে সব ব্যবস্থা করে জমি,বাড়ি সব বিক্রি করে আমাদের নিয়ে গেছিল,দু'মাস আগে।আমার ইচ্ছে ছিল না।কিন্তু এই বেকার বৃদ্ধর কথায় কেউ কান দেয়নি।এখানে এসেই বুঝলাম, ওদের আসলে বাচ্চা দেখার জন্য আয়ার দরকার ছিল।ক্রেসগুলো ছ'মাসের আগে বাচ্চা নেবে না।বৌমা,বাধ্য হয়ে আমাদের আনিয়েছিল।বাচ্চাটার ছ'মাস হতেই ওকে ক্রেশে দিয়ে আমাদের ফেরার টিকিট ধরিয়ে দিল সুজয়!

----বললো,শীত আসছে আমাদের কষ্ট হবে ঠান্ডায়!

.......একটি বৃদ্ধাশ্রমে থাকার ব্যবস্থা করে দিয়েছে নেট ঘেটে!.......

---স্যার, এতটুকু বলেই চোখ বুজলেন!

বাচ্চাটা এই দু'মাসেই আমাদের ন্যাওটা হয়ে গেছিল।খুব মুখ চিনত!দেখলেই দু'হাত বাড়িয়ে কোলে উঠতে চাইত!মাসিমা,কান্না ভেজা গলায় বলেন......!

আমার মনে পরে,সুজয়দাকে যতটুকু দেখেছিলাম, পড়াশুনা ছাড়া কিছুই জানতেন না।আজ নিজের বাবা-মা কে এভাবে অবহেলা করছে শুনে খুব খারাপ লাগছে!...আমাদের পাশের বাড়ির নগেন জ্যাঠুর ছেলে  কলকাতায় ভাল চাকরি করত।বাবা-মা কে সেভাবে দেখভাল করত না।বহু পুরনো  জরাজীর্ণ বাড়ি ভেঙে পরছিল।মেরামতের দরকার ছিল।স্যার, স্কুলের সব ছাত্র দের নিয়ে নিজেই একজন লোক সম্বল করে ওনাদের বাড়ি মেরামত করে দিয়েছিলেন! চিকিৎসার ব্যবস্থাও করে দিয়েছিলেন। 

এমনি টুকরো টুকরো বহু কথা মনে পরছিল!


(৫)

     আলম নামে একটি মুসলিম ছেলে পড়ত আমাদের সঙ্গে। ওর বাবা ডাকাতি করতে গিয়ে ধরা পরে।গুলি লেগে মারা গেছিল। ডাকাতের ছেলে বলে সবাই আলমকে একঘরে  করে দিয়েছিল।একমাত্র স্যার, আমাদের বুঝিয়ে বলেছিলেন  কেউ সখ করে ডাকাত হয় না!আর ওতে আলমের কোন দোষ নেই তাও বলেছিলেন। সস্নেহে আলমের চোখের জল মুছিয়ে ওকে বুকে টেনে নিয়েছিলেন! সেই আলম আজ একটি এন,জি,ও..চালায়।বন্ধ চা বাগানের পরিবারগুলো কে নানাভাবে সাহায্য করে।সেদিন স্যার, যদি ওর পাশে না দাঁড়াতেন,তবে আলম আজ ভেসে যেত।হয়তো বাবার থেকেও বড় ডাকাত তৈরি হত একদিন, অভাবের তাড়নায়!! 

আজ স্যারের ছেলের কৃপায় ওনার ঠিকানা হতে চলেছে "বৃদ্ধাশ্রম"!! মন টা খচ্ খচ্ করছিল!

    এয়ারপোর্টে লাগেজের জন্য দাঁড়িয়েছিলাম।নেটওয়ার্ক আসতেই কয়েকটি দরকারি মেইল,ফোন করে নিলাম।

     স্যার, আমাকে বললেন, একটা উপকার করবি?একটি বাড়ি ভাড়া ঠিক করে দিবি?

যে ক'টা টাকা পেনশন পাই,তা দিয়ে আমাদের চলে যাবে!"...... এবার আমার চোখের কোল ভিজে উঠল!

---বললাম,------" স্যার, আপাতত, আমার উপর সব ছেড়ে দিন,ব্যবস্থা করছি।

   স্যারদের নিয়ে বাইরে এসে দেখলাম, কাজল,অনীশ,রাহুল,আলম,প্রতীকদা সবাই অপেক্ষা করছে।সবাই ছুটে এসে স্যারের ট্রলিটা টেনে নিল।আমি পরিচয় করালাম স্যারের সঙ্গে, উনার সব প্রাক্তন ছাত্রদের।কারোর কথা মনে আছে,আবার কেউ বা আবছায়া! অনেক অনেক বছর বাদে,তাই!সবাই স্যার কে প্রণাম করল।আজ সবাই প্রায় সুপ্রতিষ্ঠিত। আমার ফোন পেয়ে সবাই ছুটে এসেছে স্যারের জন্য! 

   আলম,আগরতলায় একটি ফ্ল্যাট নিয়েছে।আলম জানালো,সে স্যারদের নিয়ে যেতে চায়।সবাই মিলে স্যার আর মাসিমা কে নিয়ে গেলাম।

------আলমের এন জিও টা একটা অনাথ আশ্রম খুলেছে। স্যার কে ওখানেই রাখতে চাই আমরা সবাই।

-----"এ ভাবেই "শ্রদ্ধাঞ্জলী" দিতে চাই আমাদের প্রিয় হেড স্যার কে!"......

    বিভিন্ন বয়সের বাচ্চাদের মাঝে স্যার খুব ভালো থাকবেন। স্যার আর মাসিমা রাজি হলেন। 

----"স্যার, মাসিমাকে বললেন,"কে বলে আমার সন্তান কাছে নেই?এরাও তো আমার ছেলে।।আজ সবাই কেমন ভাবে, 'আমাদের আপন করে নিল"!.......

     স্যারের চোখে আনন্দের অশ্রু!!.............. 

পঙ্কজ কান্তি মালাকার

নামে কি আসে যায়

(১)

মাধাই পাটনীর দিন কাটে বরাকের বুকে,রাত কাটে ঘুমের সুখে, অবসরবেলায় জাল বুনে, সন্ধেবেলা নাম গান গায় -এই নদী-নৌকা-জাল-মাছ আর নামগান নিয়েই মাধাইর জীবনবৃত্ত। ভোর হওয়ার আগেই যখন শুধু আলো ফুটতে শুরু করে সেই ভোরে নৌকা আর জাল নিয়ে বেরিয়ে পড়ে। সকাল সাতটার আগে পৌঁছে যায় বসাই, তাকে কম মাছ দিলে চলবে না,নইলে দুপুরে মাছ নিতে বড়দা এলে গাড়ি পাড়বে। বড়দা জগাই মা'কে ও তার সংসার নিয়ে শহরে থাকে, মাছের দোকান করে।মাধাই স্ত্রী ও ছোট বাচ্চাদের নিয়ে গ্রামে থাকে।মাধাইর ছেলে মেয়েকে পড়াশোনা তার দাদাই করায় শহরে রেখে। সে খুব সরল সিধে,বোকা যাকে বলে।যা বুঝে তাই বুঝে, বাস্তবজ্ঞানের খামতি আছে।বাল্যে মেধার অভাবে পড়াশোনাটাও হলো না,স্কুল গেল নদী এলো জীবনে। বাবার সাথে আসতো জাল থেকে মাছ কুড়োতে -সেই থেকে উত্তরাধিকারে জাল নৌকা নদী এলো তার জীবনে। নদীর বাইরে তার জীবন নেই,সে কাণায় কাণায় জানে এই নদীকে, কোথায় কি মাছ ঘাই দিচ্ছে,কোন ডরে কি মাছ আছে -এগুলো খবর রাখে মাধাই । ঘরের খবর রাখে বৌ, বাড়ির খবর রাখে জগাই।


হঠাৎ করে একদিন সাতসকালে বসাইর সাথে জগাই হাজির। মাছ নিয়ে বসাই চলে গেল। এখন ওই দোকান চালায়, ছেলে অনেক বড় হয়েছে,কলেজে পড়ছে।জগাই বলল ,"ঘরে চল, এনার্সি নিয়া কথা আছে।" নৌকা বেঁধে জাল হাতে নিয়ে মাধাই বড়দার সাথে ঘরে গেল।মাধাই বছর কয়েক আগে থেকেই শুনছে এনার্সি চলছে।জগাই সবকিছু করেছে।তাকে বসাই একটা টিভির মতো মোবাইল দিয়ে ফটো তুলে নিয়ে গিয়েছিল।


জগাই বসলো চেয়ারে,দাওয়ায় বসলো মাধাই।ছোট্ট অণিমা জেঠু ও বাবার জন্য চা নিয়ে এলো, ঘোমটা টেনে বসাইর মা দরজার আড়ালে এসে বসলেন। চা খেতে খেতে জগাই বললেন,"মাধাইরে, এনার্সিত তোর নাম, ছোট বউয়ের নাম আইছে কিন্তু বসাই ফুলন অণিমা কেউর নাম আইছে না।"

-কেনে আইছে না? প্রশ্ন করলো মাধাই।

-তোর ডকুমেন্ট ইতার মাধব দাস আর বাচ্চাইনতের ইতাত মাধাই দাস কেনে?

-আমি কিতা কইতাম? তুমি আর বসাইর মায়েঔ ইতা জান' ।

-হকলটির বার্থ সার্টিফিকেট স্কুল সার্টিফিকেট'ও মাধাই দাস লেখা, বসাইর ভোটার আইডিত'

একটু থেমে জগাই ধীরে ধীরে বললেন ,"বার্থ সার্টিফিকেটে ভুল করব হসপিটালের ক্লার্কে আর অখন আমরার ভোগান্তি।" জাল-মাছ-নদী আর নাম-গান নিয়ে মগ্ন থাকা মাধাই এতদিন ভুলেই ছিল যে কুষ্টিতে তার নাম মাধব, ডকুমেন্টে তার নাম মাধব, মাধাই তার ডাকনাম। " মাধাই হোক আর মাধব হোক মানুষ তো আমি একজনঔ।"

-এটা এনার্সিয়ে বুঝত' নায়

-এনার্সিত নাম আইলেউ কিতা আর না আইলেউ কিতা?

-হায়রে বুরবক! এনার্সিত নাম না আইলে বাংলাদেশী করি দিব। -বাক্যটি তীরের মত কর্ণবিদ্ধ করল মাধাইর।- সুবলের খবর জানসনি?

-না, তারে ত' সাপ্তাদিন থাকি দেখরাম না

-দেখবে কিলা? হেরে ত' বাংলাদেশী কইয়া ডিটেনশন কেম্প' ভরি দিছে

-মানে?

- মানে তার পূর্ণা ডকুমেন্ট কিচ্ছু দেখাইতে পারছে না, সন্দেহ কইরা বিদেশি বানাই দিছে।

- দেখাইবো কই থাইক্কা? তার ঘর ত' প্রত্যেকবারঔ নইদ্যে ধইয়া লইয়া যায় -বাসনপত্র গরু ছাগল লইয়া যায়, ডকুমেন্ট থইয়া যাইবো নি?

-অন্ধ আইনে অতা বুঝবনি ? আমার লাগা দোকান কালা মিঞার উপরে বিদেশি কেইস চলের

- বড়দা সুবলরে কিতা এখন দেশ থাকি খেদাই দিব নি? -কিতা কইতে? সরকারে জানে কিতা করব

-আইচ্ছা বড়দা যেরার নাম এনার্সিত আইত নায় হেরারে কিতা করব'? 

-কিতা করব' কেউ জানে না, বাংলাদেশী টাংলাদেশী মানাইবো, সরকারের ঘর থাকি নাম কাটি দিব ওতাঔ করবো আর কিতা।

- বড়দা যদি বাইচ্চাইনতের নাম না আয় তে বাংলাদেশী পড়ি দিব নি?

- না না ইতা কিচ্ছু অইত নায় কিচ্চু একটা বন্দোবস্ত করমু, চিন্তা করিছ না।


'চিন্তা করিছ না' বললে কি চিন্তা আসে না? চিন্তার বিষয়ে চিন্তা তো আসবেই। যদি ছেলেমেয়েদের বাংলাদেশী বলে জেলে নিয়ে যায়, যদি সরকারের ঘর থেকে নাম কেটে দেয়, তবে দেশে থাকতে দেবে? এতসব ভাবছিল মাধাই। আজ দুপুরে মাছ ধরতে যায়নি, জাল নিয়েও বসেনি , স্নানেও যায়নি , সারাদিন খুঁটিতে হেলান দিয়ে দাওয়ায়ই বসেছিল। অল্প বৃষ্টিও হচ্ছিল তাই বর্ষার মা গরম খিচুড়ি আর ছোট মাছ ভাজা আলু ভাজা করেছিল। পাতে বসে অল্প খিচুড়ি মুখে দিয়ে "গলা দিয়া নামের না" বলে পাতেই হাত ধুয়ে নেয়।


(২)

সন্ধ্যেবেলা সন্ধ্যেবাতি দেওয়ার সময় বসাইর মা হাতে ধূপতি নিয়ে এসে দেখে বারান্দায় বেঞ্চে বসে রয়েছে চিন্তিত বসাইর বাপ। " ওগো অত চিন্তা কইর' না, বড়দায় কইছইন নু কিচ্ছু একটা বন্দোবস্ত করবা। তোমার হাইপ্রেসার ডাক্তারে নু কইল' বেশি চিন্তা করতায় না , যাও যাও প্রার্থনা কর গিয়া, চিন্তা দূর হইবো।" কথাগুলো কানেই নেয় নি, বড়দার কথাগুলোই তার কান ভরে রয়েছে।


"চলো বাবা শতনাম পইড়া শুনাইমু" অনিমা এসে বাবার হাত ধরে টেনে নিয়ে গেল ঠাকুর ঘরে। শত নাম পড়া শুরু করল অনিমা, মিষ্টি তার গানের গলা সুর করে গায়-

জয় জয় গোবিন্দ গোপাল গদাগর।

কৃষ্ণচন্দ্র কর কৃপা করুণাসাগর।।

জয় জয় গোবিন্দ গোপাল বনমালী।

শ্রীরাধার প্রাণধন মুকুন্দ মুরারী।।

প্রতি পদের পরেই সে ধুঁয়া গায়, ফুলন দোহার দেয়। গানে ধুঁয়ার বিরতিতে অর্থাগমের বিশেষ সুযোগ পাওয়া যায়।আজ যেন গলার সুর মেলাতে পারছিল না মাধাই।

হরিনাম বিনে রে গোবিন্দ নাম বিনে।

বিফলে মনুষ্য জন্ম যায় দিনে দিনে।।

দিন গেল মিছা কাজে রাত্রি গেল নিদ্রে।

না ভজিনু রাধা কৃষ্ণ চরণার বিন্দে।।

আজ মাধাইর তাল কেটে যাচ্ছিল , কোনোমতেই তাল ধরে রাখতে পারছিল না। মাথায় ভাবনা স্রোতের মতো আসছে। "হ্যাঁ, আমি তো মিছা কাজেই দিন গত করেছি, রাত অলস নিদ্রায়, পরিবারের কথা কখনো ভাবিনি"। আজ সে কাব্যের ব্যাচার্থ নয়, ব্যঞ্জনার্থ নয়, নিজের অবস্থার সাথে অর্থ বুঝে নিচ্ছে। অনিমা শিশু মানুষ, সে বাবার দিকে খেয়াল না করে আনন্দে গেয়েই চলেছে।

কৃষ্ণ ভজিবার তরে সংসারে আইনু।

 মিছে মায়ায় বদ্ধ হয়ে বৃক্ষসম হইনু।।

 ফল রূপে পুত্র কন্যা ডাল ভাঙ্গি পরে।

 কাল রূপে সংসারেতে পক্ষ বাসা করে ।।

কেন সংসার করলাম সব কিছু ভুলে জাল আর মাছের মায়ায় অন্ধ হয়ে নিজেরই কাল নিজেই তৈরি করলাম। এলো রে কাল এনার্সি, পুত্রকন্যার ডাল বুঝি এই ঝড়ে ভাঙ্গে ?

বসুদেব রাখি আইলো নন্দের মন্দিরে।

 নন্দের আলোয় কৃষ্ণ দিনে দিনে বাড়ে।।

কেন বাপ রেখে গেলি এই সংকট দেশে? এই দেশে পদে পদে বিপদ, নাম নিয়ে বিপদ....

নন্দ রাখিল নাম নন্দের নন্দন।

যশোদা রাখিল নাম যদু বাচাধন।।

 উপানন্দ নাম রাখে সুন্দর গোপাল।

 ব্রজবালক নাম রাখে ঠাকুর রাখাল।।

 সুবল রাখিল নাম ঠাকুর কানাই।

 শ্রীদাম রাখিল নাম রাখালরাজা ভাই।।

 ননী চোরা নাম রাখে যতেক গোপিনী।

 কালসোনা নাম রাখে রাধা বিনোদিনী ।।

কানাইয়ের মত শত নয়, হাজার নয়, মা-বাপ গ্রামবাসী আদর করে এক নাম ডাকে মাধাই।যে কৃষ্ণ সে কানাই,যে  মাধব সেই মাধাই এতটুকু কি বুঝে না নিষ্প্রাণ এনআরসি? 'আমি মাধব আমিই মাধাই' নিজের এই অন্তর ব্যথা উদগীরণ না হয়ে তার'ই অন্তর দেশে লাভার মত মাথা কূটছে। -বাচ্চারা গান গেয়েই চলছিল, সে কোথাও যেন থেমে গিয়েছিল । গান তার কানে বাজছিল না, সে তার দুশ্চিন্তাস্রোতে মগ্ন।


শতনামের নাম অংশের পর মহাত্মাংশে বাচ্চারা গলা খুলে কীর্তন জুড়ে দিল।মাধাইর ঘোর ভাঙলো-

 অনন্ত কৃষ্ণের নাম অনন্ত মহিমা।

 নারদাদি দেবে যারে দিতে নারে সীমা।।

নাম ভজ নাম চিন্ত নাম কর সার।

অনন্ত কৃষ্ণের নাম মহিমা অপার।।

শত ভরি সুবর্ণ গো কোটি কন্যা দান।

 তথাপি না হয় কৃষ্ণ নামের সমান।।

- হয় না, হয় না, কিছুই নামের সমান হয় না।-

 যেই নাম সেই শ্রীকৃষ্ণ ভজ নিষ্ঠা করি।

নামের সহিত আছেন আপনি শ্রী হরি।।

এনার্সিতে নাম এলে তবেই ভারতীয়, ছেলেমেয়ে ভারতীয়। বিপদভঞ্জনকে ভক্তি করে চিন্তামনির ঘাড়ে চিন্তা ছেড়েও দুশ্চিন্তা যে নামে না। আজ সে গান গায়নি। বিছানায় উঠেছে, ঘুম আসে না।

(৩)

চোখ খোলাই রইল, চোখে সে দেখে অন্ধকার,মোরগ কুরুক্কু কুরুক্কু করে উঠল, ঝটকা লাগলো মাধাইর। রোজ ভোরের মতো বাচ্চাদের গায়ে কম্বল টেনে দিয়ে জাল আর বৈটা নিয়ে বেরিয়ে পড়ল। অন্যদিন ঘুম থেকে উঠে প্রভাতী গায়, গান শুনে,বসাইর মার ঘুম ভাঙ্গে, লাল চা করে দেয়।সেদিন বসাইর মার ঘুম ভাঙতে দেরি হল উঠে দেখে বসাইর বাপ চলে গেছে জালে।

হাজার দুশ্চিন্তা হোক পেটের চিন্তা তো করতে হবে। সাতটার সময় বসাই এলো," আজ এত কম মাছ বাবা?" মাধাই কোন উত্তর করল না। মাছের চাঙাড়ি নামিয়ে দিয়ে নৌকা ঘুরিয়ে চলল মাছ দরিয়ায়।

সকাল দশটা নাগাদ বসাইর মা'এর মোবাইল রিং করে উঠলো, ডিসপ্লেতে নাম 'বড়দা'।

-হ্যালো বড়দা

-ছোট বউ মাধাই আইছে নি?

- না , আইজ তাইন অখনও আইছইন না।

-তারে আইলে কইও উকিলের লগে আলাপ করছি একটা এফিডেভিট করতে লাগবো, নামের এফিডেভিট দিয়া অন্য ডকুমেন্ট বার করতে লাগবো বা ডকুমেন্ট ইতাত নাম সংশোধন করলে অইবো।

-বড়দা আমি তো জানতাম কিচ্ছু না কিচ্ছু পথ বার হইব, বসাইর বাপে কাইল সারাদিন চিন্তা করছইন।

- তারে কইও চিন্তা করত না। কাইল আমরা শিলচর যাইমু ,সকালে রেডি হইয়া আইতো কইও। 

বসাইর মা সুখবরটা পেলেও বসাইর বাপে তো পায়নি। মাথার উপর সূর্য তেজে উঠছে, চিন্তারও পারদ চড়ছে। যদি নাম না আসে তবে কি সুবলের মত জেলে নেবে ছেলেমেয়েদের? এই বিপদ তাদের ঘাড়ে না এসে কেন আমাদের ঘাড়ে এলো না , এদের তো পুরো জীবনটা বাকি  -প্রেসার চূড়ান্ত, সহযোগ চড়া রোদ । নৌকার গলুই থেকে মাথা ঘুরে বরাকের ছেলে বরাকের কোলে পড়ল, হাত হাতড়েও নৌকার বাট ধরতে পারেনি।

(৪)

সুবল পাটনির কিশোর ছেলে সুবলের নৌকা চালাচ্ছিল, সুবলের পরিবারটাকে অন্নজল জুটাতে তো হবে। সে দেখেছিল নৌকা থেকে মাধাইকাকা অনিচ্ছায় পড়তে। সে তাড়াতাড়ি নৌকা নিয়ে এসে মাধাইকে তুলতে তুলতে মাধাই জল খেয়ে প্রাণ হারায়। এসব মানতেই চায় না বসাইর মা। "নদী নায়, নদী নায়, রাক্ষসী এনার্সিয়ে খাইছে বসাইর বাপরে।" -বলে গলা ফাটিয়ে কাঁদে, আকাশ ফাটিয়ে বাতাসে তরঙ্গ ছড়ায়।


অতনু রায় চৌধুরী

মধ্যবিত্তের জীবন

প্রতিদিনের মত অফিসে অফিসে ঘুরে চাকরি না পাওয়ার ব্যর্থতা নিয়ে ভিড় বাসে বাড়ি ফিরছিলাম হঠাৎ করেই চোখে পড়লো পথের ধারে কাপড়ের দোকানে একটি সুন্দর তাঁতের শাড়ি ঝুলিয়ে রেখেছে। ভাবলাম মায়ের জন্য নিয়ে গেলে মা নিশ্চয়ই খুশি হবে। সেই কথা ভাবতে ভাবতে পকেটে হাত দিতেই দেখি গাড়ি ভাড়াটা ছাড়া আর কোনো টাকা নেই আমার কাছে। খুব খারাপ লাগলো, নিজের কাছে নিজেকেই অনেক তুচ্ছ বলে মনে হতে লাগলো। এই ২৫ বছর বয়সে শিক্ষীত হয়েও আজ আমি বেকার। অন্য দিকে পরিবারের আর্থিক অবস্থাটাও বেশি ভালো যাচ্ছে না। জমানো টাকা যা ছিল তা দিয়ে আমার মা বাবা আমার ইঞ্জিনিয়ার হবার স্বপ্নটা পূরণ করল। তাঁরা ভেবেছিল পড়াশোনা শেষে আমার একটি ভালো চাকরি হবে। তারপর দিদির বিয়েটা দিয়ে দেবে । কিন্তু সময়ের সাথে সাথে ভেবে রাখা সবকিছু কেমন যেন এলোমেলো হয়ে গেলো। আর অন্যদিকে পাএ পক্ষের যৌতুক দেওয়ায় অক্ষম হবার কারণে দিদির বিয়েটা বারবার ভেঙ্গে যাচ্ছিল। আজকাল দিদিও খুব চুপচাপ থাকে,  আমারও বাবার সাথে কথা বলতে খারাপ লাগে কারন আজ আমার কারনেই পরিবারের এমন অবস্থা হয়েছে হয়তো। বাড়িতে এখন মায়ের কাছেই সব কথা প্রকাশ করি। যদিও মায়ের মনেও ভীষণ কষ্ট তবুও মা হাসিমুখে থাকে ।


ভাবলে চোখে জল আসে আজ থেকে প্রায় পাঁচ বছর আগেও আমাদের পরিবারটা ভীষণ হাসি খুশি ছিল। রোজ ভোরে বাবা আমাকে ঘুম থেকে উঠিয়ে দিত পড়তে বসার জন্য । তারপর সকালে মা বাবা আমি দিদি আর ঠাকুরমা একসঙ্গে টিফিন খাওয়ার জন্য বসতাম। দিদিকে বেশী টিফিন দিয়েছে এই নিয়ে প্রায় দিনই দিদির সাথে আমার ঝগড়া হতো। তখন ঠাকুরমা বলতো দিদিতো শ্বশুর বাড়ি চলে যাবে তাই দিদিকে ইকটু বেশি দেওয়া হয়েছে । তখন দিদি বলত দিদি নিজে যেদিন চাকরি পাবে সেদিন দিদি বিয়ে, শ্বশুর বাড়ি এসব নিয়ে ভাববে । কিন্তু সময়ের এমন খেলা দিদির চাকরিটা হয়েও হলো না । তখন দিদির মন ভাঙ্গলেও দিদি মনে করেছিল আমি পড়াশুনা শেষ করে নিশ্চয়ই একটি চাকরি পাবো। 

আসলে দিদি আমায় খুব ভালোবাসতো আবার সময়ে সময়ে শাসন ও করত । যখন বিকেল হলে খেলার মাঠে চলে যেতাম দিদিই আমাকে সন্ধ্যে হবার আগে বাড়িতে ডেকে নিয়ে আসত এবং রোজ রাতে আমি লেখাপড়া করছি কী না সে খেয়াল দিদিই রাখত। রাতে খাওয়া শেষ হয়ে গেলে ঠাকুরমার কাছ থেকে গল্প শোনা এটা আমার আর দিদির প্রতিদিনের অভ্যাস ছিল। ঠাকুরমা চলে যাবার পর সেই অভ্যাসটা ধীরে ধীরে বদলে গেল। আমি আর দিদি গল্প শুনতাম না ঠিকই কিন্তু গল্পের বই পড়তাম রোজই। তখন ধীরে ধীরে গল্পের বই পড়াটা আমাদের অভ্যাস হয়ে গিয়েছিল ।

ঠাকুরমার ঝুলি, ব্যোমকেশ, ফেলুদা এসব নানা গল্পের বই পড়েছিলাম। গল্পের বই পড়তে পড়তে আমি আর দিদি দু'একবার ভেবেছিলাম আমরা দুজনে মিলে একটি বই লিখবো কিন্তু তা আর হয়ে উঠলো না । এইভাবে দিনগুলো কাটতে কাটতে ধীরে ধীরে যতই পারিবারিক সমস্যাগুলো বাড়তে লাগলো ততই গল্পের বইয়ের সাথে আমার দূরত্বটা বেড়ে গেল। সত্যি কথা বলতে এখন আর গল্পের বইয়ের মাঝে নিজেকে হারিয়ে দিতে পারি না । প্রতি মুহূর্তে মাথায় ঘুরে নানারকম চিন্তা । এখন মনে হয় এইভাবেই হয়তো প্রতিটি মধ্যবিত্ত পরিবারের জীবনগুলো কাটে, বুক ভরা স্বপ্ন নিয়ে হাসিমুখে শূণ্য পকেটে হাঁটে ।

দীপা সরকার

শ্যামবর্ণা

দেখো সোহম দেখো, এভাবেই  প্রতিটা মেয়ে দেখিয়ে দেবে তারা যোগ্য, ভীষণরকম ভাবে যোগ্য।

শুধু তোমাদের মত কিছু লোক সৌন্দর্যের সংজ্ঞা জানো না বলেই আজকে আমার মত মেয়েগুলো অত্যাচারিত, লাঞ্চিত হয়।

তবে দিন ফিরছে এমন ভাবেই দিন ফিরছে...

শুচরিতা সান্যাল, আজকের ইভেন্টের বিজয়ী। সানন্দা ২০২৩...

সৌন্দর্যের প্রতিযোগিতায় আজকে এই শ্যামবর্ণা মেয়েটাই এগিয়ে। যাকে হয়তো ছোটবেলায় আমার মতোই হাজার কথা শুনতে হয়েছে তার এই গায়ের রং নিয়ে।

সমাজ আমাদের মত কালো মেয়েদের বারবার টেনে হিঁচড়ে পেছন টেনে ধরে রাখে। এগুতে চাইলেই মনে করিয়ে দেয়, কালো ত্বকে আবার সৌন্দর্য কি?

যেমন তুমি আমার চোখে মুখে কোনোকালেই সৌন্দর্য খুঁজে পাওনি ঠিক তেমন।

বিয়ের পর থেকে এ বাড়ির প্রত্যেকটা লোক আমার যোগ্যতা বিচার করেছে আমার গায়ের রঙে।

তুলনা থেকে তাচ্ছিল্য কোনোটাই বাদ যায়নি যা ধেয়ে আসেনি আমার উপর।

তোমাদের বারবার বোঝাতে চেয়েছি মানুষের সৌন্দর্য কখনোই তার চামড়ায় নয়, সৌন্দর্য থাকে দেখার চোখে।

যা তোমাদের মত মানুষের চোখে নেই।

যদি থাকতো আমার মত মেয়েরাও তোমাদের চোখে সুন্দরী হয়ে ওঠতো।

তবে শুচরিতা সান্যালের আজকের এই জয়, কিছু মানুষের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিলো, শ্যামবর্ণারাও সুন্দর।

এই জয় শুধু একা শুচরিতা সান্যালের নয়, এই জয় প্রতিটা শ্যামবর্ণা মেয়ের।

এভাবেই দেখার নজরটা বদলে গেলে ঠিক এমন ভাবেই জিতে আসবে প্রতিটা শ্যামবর্ণা তাদের যোগ্যতায়, তাদের কাজে।

তাদের কেউ আর অযোগ্য তকমা দিয়ে পিছিয়ে রাখতে পারবে না, কোনোভাবেই না।

রীতা চক্রবর্তী ( লিপি )

বর্ষা রাতের অতিথি

বর্ষাকালের সন্ধে। সারাদিন অবিশ্রান্ত বৃষ্টির পর মেঘ কেটে আকাশে উঁকি দিয়েছে এক ফালি চাঁদ । শেষ সন্ধের ভেজা বাতাস ভারী হয়ে আছে কামিনীফুলের গন্ধে । দূরে একটি লাল রঙের জীর্ণ মলীন দালান বাড়িতে সন্ধ্যা প্রদীপ জ্বলে উঠল। ওই রংচটা জরাজীর্ণ বাড়িটির একমাত্র বাসিন্দা বিমলা দেবী তুলসী তলায় বাতি জ্বালিয়ে কাঁসর ঘন্টা বাজিয়ে ধীরে ধীরে ঝুলন্ত ব্যালকনিতে এসে ইজিচেয়ারে বসে পড়লেন। রুটিন মাফিক বিমলা দেবীর সর্বক্ষনের সঙ্গী মালা একটু বাদেই খানিক কুচো নিমকি সহ এককাপ চা নিয়ে এলো। মালাকে দেখেই তিনি বললেন, ' শরীরটা বড় ম্যাজম্যাজ করছে আজ, চা পানের একদম ইচ্ছে নেই রে মালা'! মালা উদ্বিগ্ন হয়ে উঠল মধুমেহ রুগী বিমলা দেবীর জন্য। ও দু'পা এগিয়ে এসে ওনার কপালে হাত রেখে বললো, ' কী হয়েছে জ্যাঠাইমা? তোমার শরীর খারাপ করেছে? কই দুপুরে তো তুমি কিচ্ছুটি বললেনা?  দাদাবাবুকে ফোন করব? 

— না রে কিচ্ছু হয়নি আমার। এমনি ঝড় বাদলার দিনগুলো আমায় বড্ড উদাস করে দেয়। উৎকন্ঠিত মালা স্বগোক্তির মতো গজগজ করতে করতে বললো, " কী জানি বাপু, দাদাবাবুকে ফোন করব বললেই জ্যাঠাইমা সুস্থ হয়ে ওঠেন। এদিকে দাদাবাবু বলে গেছেন, শরীর খারাপ হলেই যেন তাকে খবর দেওয়া হয়। বিমলা দেবী বললেন, 

—শরীর নিয়ে এত ভাবিস না তো মালা! তুই যাবার সময় বাইরের লাইটটি বন্ধ করে দিস, আলোটা বড্ড চোখে লাগছে। মালা বললো, তবে আমি এখনি রাতের রান্না চড়িয়ে দিচ্ছি। রান্না হয়ে গেলে তুমি আজ তাড়াতাড়ি খেয়ে শুয়ে পড়বে। এই বলে দিলুম। 


         নিকষ  আঁধারে বসে আছেন বিমলা দেবী। তিনি জীবনস্রোতে ভাসতে ভাসতে অনেকটা পথ পাড়ি দিয়ে এখানে এসে পৌঁছেছেন। এখন তাঁর অফুরন্ত অবকাশ। বসে বসে দেখছেন সময়ের সাথে সাথে বাড়িটিকেও বার্ধক্য এসে গ্রাস করেছে।  ওনার নিজের মতই বাড়াটিও আজ রঙহীন জরাজীর্ণ অশীতিপর হয়ে আছে। পলেস্তারা খসে পড়ছে নানা স্থানে। হবে নাই বা কেনো! এ বাড়ির বয়স তো কম নয়! অনিকেতের জন্মের পূর্বেই গড়া হয়েছিল বাড়িটি। একসময় ঘরগুলো গমগম করত লোকজনের আনাগোনায়। আর আজ...! ভেবেই তিনি একটি দীর্ঘশ্বাস ছাড়লেন। ধীরে ধীরে মন ডুব দিল স্মৃতির অতলে।

         সব তো ঠিকঠাকই চলছিল। বিয়ের পর বিমানবাবুর মধ্যে অস্বাভাবিকতা কিছুই ছিল না। পরিবারের প্রতি ছিলেন দায়িত্বশীল। দুহাতে রোজগার করেছেন আর খরচ করেছেন তারও বেশি। তখনই এই বাড়িটি বানিয়ে ছিলেন বিমানবাবু। বাড়ি ভর্তি লোকজন। শশুড় শাশুড়িকে নিয়ে ছিল ওনাদের ভরা সংসার। এরপর অনিকেত এলো। বছর পাঁচেক বাদে শুরু হলো নকশাল আন্দোলন, আর বিমলা দেবীর সংসারের সবকিছু এলোমেলো হয়ে গেলো।

         

               বিমলা দেবী লক্ষ্য করছেন কিছুদিন থেকে বিমান বাবু যখন ব্যবসা পত্তর গুটিয়ে বাড়ি ফিরে আসেন তখন সঙ্গে দু'তিনজন অচেনা লোকও তাঁদের বাড়ি আসেন। তারপর একটি বন্ধঘরে কিছুসময় তাঁদের গুজুর গুজুর ফুসুর ফুসুর চলে। কিছুসময় বাদে ওই অপরিচিতরা দমকা হাওয়ার মতো বেড়িয়ে উধাও হয়ে যান। বিমানবাবুকে জিজ্ঞেস করলে কোনো সদুত্তর পাননা বিমলা দেবী। কানাঘুষা শুনতে পেলেন, তিনি যেন কী সব আন্দোলনে জড়িয়ে যাচ্ছেন। ধীরে ধীরে ব্যবসাপত্তর লাটে ওঠার উপক্রম হলো। তিনি সারাদিন ভবঘুরের মত ঘুরে বেড়ান । ঘরে যতক্ষন থাকেন ততক্ষন অস্থির হয়ে পায়চারী করেন নয়তো গুম মেরে বসে থাকেন। এতে বিমলা দেবীর হয়েছে মহা বিপদ। 

        তখন সত্তরের দশক চলছে।  নকশাল আন্দোলনে উত্তাল হয়ে উঠেছে বঙ্গভূমি। আন্দোলন যত গড়াচ্ছে ততই শহর জুড়ে বাড়ছে বোমাবাজি,খুন জখম রাহাজানি। মানুষ ঘর থেকে বেরোতে ভয় পাচ্ছে। চারিদিকে থমথমে পরিবেশ,কেমন যেন একটা আতঙ্ক গ্রাস করে আছে। এমনি এক বিপন্ন দিনে অঝোর বর্ষার বিষন্ন সন্ধ্যায় একটি লোক এসে দরজায় খুট্ খুট্ আওয়াজ করল আর বিমানবাবু সেই যে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন আর কোনদিনই ফিরলেন না...


                     দু'দিন থেকে অঝোর বৃষ্টি সঙ্গে দমকা হাওয়া। কাজ না থাকলে লোকজন তেমন বাইরে বেরোচ্ছে না। তার উপর সদ্য সমাপ্ত হয়েছে পঞ্চায়েত ভোট। ভোটের ডামাডোলে শহরও থমথমে হয়ে আছে। বিমলা দেবী শুনশান পথে দৃষ্টি মেলে বসে আছেন। অতীত তাঁকে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে রয়েছে।  হঠাৎ লোডশেডিং হয়ে গেল। বৃষ্টির তোড়ে ল্যাম্পপোস্টের আলোগুলো এতক্ষণ কেমন ঝাপসা ফিঁকে হয়ে জ্বলছিল কিন্তু এখন একেবারে ঘুটঘুটে অন্ধকার।   ক'দিন থেকে ইনভার্টারটিও খারাপ হয়ে আছে। তিনি মালাকে ডেকে বললেন, ঘরে একটি মোমবাতি জ্বালিয়ে রাখতে। এই বৃষ্টিমুখর দিনগুলোতে তিনি অতীতের হাতছানি দেখতে পান আর স্মৃতিমেদুর হয়ে ওঠেন। আজো তার অন্যথা হয়নি।

                     হঠাৎ খুট্ খুট্ খুট্ খুট্... সদর দরজায় কেউ যেন কড়া নাড়ছে। বিমলা দেবী কান পেতে শুনলেন। আবার অস্থির একটি খুট্ খুট্ খুট্ খুট্ শব্দ। তিনি   ধীরে ধীরে উঠে দরজার দিকে এগিয়ে গেলেন। মনে মনে ভাবলেন নিশ্চয় পাশের বাড়ির কেউ হয়তো কোন প্রয়োজনে এসেছে, নাহলে এই দুর্যোগের রাতে কেউ ঘরের বাইরে... আবার যেন একটু জোরেই খূট্ খুট্। তিনি এস্ত পায়ে গিয়ে দরজাটি খুলে দিলেন আর ঝড়ের বেগে একটি ছেলে ঘরে প্রবেশ করেই আবার দোরটি  দিয়ে ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে বিমলা দেবীর পায়ে লুটিয়ে পড়ে বলল, " মা আমাকে আপনি বাঁচান,ধরতে পারলে ওরা আমায় মেরে ফেলবে " বলে কাঁদতে লাগলো। অভিজ্ঞ বিমলা দেবী ছেলেটিকে ভালো করে যাচাই করে দেখলেন, ভদ্রলোকের ছেলে বলেই মনে হল। বয়স আনুমানিক পঁয়ত্রিশ থেকে চল্লিশের মধ্যে এবং মুখটি দেখে নিরীহ বলেই মনে হচ্ছে। তিনি এবার বললেন," তুমি কে বাছা! কোথা থেকেই বা এসেছো, একটু খুলে বলো দিকিনি!" ছেলেটি বললো, সম্প্রতি যে ভোট হয়েছে সেখানে ভোট গননার শেষে ওদের দল পরাজিত হয়েছে আর বিজয়ী দলের ছেলেরা আনন্দে উল্লাস করতে করতে ওকে একা পেয়ে হাতে লাঠি ছুঁড়ি নিয়ে ওর পিছু নিয়েছে। ধরতে পারলে ওকে  একেবারে প্রাণেই মেরে ফেলবে।   উনি যদি দয়া করে ছেলেটিকে একটু আশ্রয় দেন তাহলে সে এবারে হয়তো প্রাণে বেঁচে যাবে। তখনি বিমলা দেবী বাইরের গেইটে কিছু লোকের হৈ হট্টগোল শুনতে পেলেন  এবং মনে মনে কিছু চিন্তা করে তাঁর মুখটি করুন হয়ে ঊঠল। আবার অতীত এসে তাঁকে জাপটে ধরল। মনে হলো , ঠিক এমনি করেই হয়তো বিমান বাবু কারো দ্বারে গিয়ে একদিন আশ্রয় ভিক্ষা চেয়েছিলেন এবং আবেদন নামঞ্জুর হওয়াতে  হয়তো বেঘোরে তাঁর প্রাণটাই দিতে হয়েছে! তিনি ভেবে ফেললেন,না যে করেই হোক ছেলেটিকে বাঁচাতেই হবে। ততক্ষণে হৈ হট্টগোল এসে দরজায় হামলে পড়েছে এবং চিৎকার করে বলছে, 'মাসীমা দরজা খুলুন, আমরা আপনার ঘর সার্চ করব'। তিনি তড়িঘড়ি ছেলেটিকে ভেতরের ঘরে নিয়ে একটি বড় ওয়াড্রোবের দরজা খুলে দিয়ে ছেলেটিকে সেখানে ঢুকিয়ে আবার বাইরে থেকে তালা বন্ধ করে দিলেন। এরপর সদর দরজা খুলে বজ্র কঠিন কন্ঠে জিজ্ঞেস করলেন, আপনারা কে? কী চাই আপনাদের"? দলের ভেতর থেকে সমস্বরে চিৎকার উঠলো,আমরা আপনার বাড়ি সার্চ করব'। আরো বললো, ওরা দেখেছে,শত্রু দলের একজন এই বাড়িতে এসে লুকিয়ে পড়েছে। বিমলা দেবী বললেন যে তিনি এখানে কাউকে প্রবেশ করতে দেখেননি কিন্তু ছেলেগুলো লাঠিসোটা নিয়ে গোটা বাড়িটাই টর্চ জ্বালিয়ে খুঁজতে খুঁজতে না পেয়ে দু' তিনজন ঘরে প্রবেশ করে গোটা ঘরে তল্লাসি শুরু করল। বিমলা দেবী মনে মনে  দুগ্গা দুগ্গা জপতে লাগলেন। তিনি আরচোখে বখাটে গুলোর গতিবিধি জরিপ করছেন, দেখলেন একটি ছেলে ঘরের কোণের আলমারির হাতল ধরেও টানাটানি করলো,বন্ধ দেখে আর বিশেষ কিছু না বলে অন্য ঘরে চলে গেল। এভাবে কিছুক্ষণ খোঁজাখুঁজির পর ওরা শীকার খুঁজে না পেয়ে আবার রাস্তায় নেমে পড়ল। ধীরে ধীরে ওদের হট্টগোল দূরে মিলিয়ে যেতেই তিনি ছেলেটিকে বাইরে বের করে আনলেন এবং এককাপ গরম দুধ খাইয়ে ওর সঙ্গে গল্প জুড়ে জানতে পারলেন, ও মাস্টার্স করেছে কিন্তু শত চেষ্টা করেও একটা চাকরি জুটাতে পারেনি আজো। এদিকে বাড়িতে মা ও একটি ছোটবোন ও একটি ছোটভাই ওর ওপরই নির্ভরশীল। তাই পয়সা রোজগারের আশায় সে বিপক্ষ দলের হয়ে কিছু কাজ করছিল। কিন্তু সেই দল হেরে যাওয়াতে শাসক দলের আস্ফালনে সত্যিই এবার সে আতঙ্কিত হয়ে পড়েছে। সব শুনে বিষন্ন বিমলা দেবী ছেলেটিকে বললেন, আঁধারে না বেরিয়ে আজ রাতটি ওখানেই থেকে যেতে। তিনি মালাকেও ডেকে বললেন এক কৌটো চাল যেন বেশি রান্না হয় আজ।

                     পরদিন ভোরের আলো ফুটতেই ছেলেটি তার জীবনদায়ী মাকে প্রণাম করে আশীর্বাদ চেয়ে নিয়ে তার জন্মদাত্রী মায়ের কাছে যাবার জন্য ব্যাকুল হয়ে উঠল। তিনি ছেলেটির মঙ্গল কামনায় দু'হাত কপালে ঠেকিয়ে বললেন দুগ্গা দূগ্গা...ছেলেটি রওয়ানা হয়ে গেল তার গন্তব্য পথে।

সংগীত শীল

শ্রাবণের এক দুপুর

ভরদুপুর। খেয়ে শুয়েছিলাম। আজকাল শুয়ে বসে দিন কাটছে। এইসবে একেবারেই অভস্ত্য নই, তবুও নিরুপায়। 

ঠাম্মা ভাত মেখে দেয়। সাহিতা স্নানের জল তুলে রাখে। সকলে দেখেশোনে রাখছে।

কিছুক্ষণ পর পর দাদু এসে জিজ্ঞাসা করে— “সঙ্কা(ডাকনাম) শরিল ভালা লাগের না?”(আঞ্চলিক ভাষায় জিজ্ঞেস করছিল শরীর ভাল আছে কি-না।)

অন্যদিকে মুখ করে বলি— “আমি ঠিক আছি।”

দাদু আর কিছু বলেন না। চেয়ে থাকেন। এভাবে চেয়ে থাকেন বলেই আমার কষ্ট হয়। মনের মধ্যে জমাট বাঁধে পাহাড়। নির্জনতার সাথে সন্ধি আর একঘেয়েমি ভাব।

উদ্ভট সব ভাবনাচিন্তার মাঝে শোনা যাচ্ছে হইহুল্লা। ছেলেরা মাঠে খেলতে এসেছে। আমার ছোটবেলাও কেটেছে সেই মাঠে।

এরকম দুপুরে মা দরজা দিয়ে রাখতেন। আমি খেলতে চলে যেতাম বলে। খেলতাম না; খেলা দেখতাম। বল আসলে ছুটতাম বলের পেছনে।

গতিশীল জীবনে আমরা এগিয়ে গেছি। জড়িয়ে আছে শুধু মোহনীয় মুহুর্ত।

টিনের ছাদে সজোরে শব্দ হল। গেটের বাইরে দুয়েকজনের ফিসফাস কথা শুনা যাচ্ছিল। বাইরে গিয়ে দেখলাম একটি বল উঠোনে গড়াগড়ি খাচ্ছে। মনে হল আমার দিকে তাকিয়ে হাসছে, পুচ্ছ তুলে নাচছে!

দাদু গেট খুলে দিল। ওরা বলটি নিয়ে চলে গেল।

মনে হল যেন ছোট্ট আমিটা তাদের মাঝেই আছি।

দীপান্বিতা পান্ডে দীক্ষিৎ

একটি ছেলের আত্মকথা

তখন আমি বছর তিনেক মায়ের আঁচল ছেড়ে পা রাখলাম নূতন অধ্যায়ে ৷ ২০০৯ এর এপ্রিল প্রথম স্কুলে পদার্পন | আমি আর মা অজানা  এক রাজ্যে প্রবেশ করলাম মনে কি রকম হচ্ছিল কিছুই বুঝতে পারছিলাম না ৷ প্রথম পাড়ি অদেখা কত দৃশ্য দেখতে দেখতে পৌঁছে গেলাম স্কুলের সামনে ৷ গেটের সামনে মেলার মতো মনে হল কি হচ্ছে কিহবে ৷ কেউ কাঁদছে কেউ মায়ের কোলে কেউ বাবার হাত ধরে নানা রকমের উৎকণ্ঠা মায়েদের মুখে ৷

সাহসী ছেলের মতো ঢুকে গেলাম স্কুলের মধ্যে তারপর সকলকে দেখে আস্তে আস্তে ভালো লাগতে লাগলো ৷ মা গাছের তলায় বসে থাকলো ছুটির পর আমাকে নিয়ে বাড়ি আসবে ৷

এরপর শুরু হল নিত্যদিনের অভ্যাস ।

রাজেশ কাকুর গাড়িতে প্রথম কিছু দিন যেতে লাগলাম মা বসে থাকতো৷ তারপর আস্তে আস্তে ভয়টা কাটতে লাগলো ৷ এমনি করে আমি একটু একটু করে বড় হতে লাগলাম ৷ লেখাপড়া শুরু হল ম্যাডাম স্যারদের সাথে কখনএকটা সুইট রিলেশন গড়ে উঠেছিল বুঝতে পারিনি ৷ একটা দিন স্কুল ছুটি থাকলে বন্ধুদের জন্য মন কেমন করতো৷ এই ভাবে একটার পর একটা জীবনেব সিঁড়িতে উঠতে লাগলাম ৷ ভালমন্দ অনেক সুখ স্মৃতি নিয়ে বড় হতে লাগলাম যতবড় ততচাপ তত নিজেকে বুঝতে শেখা ৷

বুঝতে বুঝতে এখন অনেকটায় আগালাম  এখন শুধু সামনের দিকে তাকানো, পিছন ফিরে দেখার নেই অবসর ৷ রেজাল্ট বেরোনোর পর প্রাইজ গুলো যখন হাতে পেতাম মনটা আনন্দে ভরে যেত ৷ অ্যানুয়াল প্রাইজ ডিস্ট্রিবিউশন সেরিমনির দিনটার আনন্দ ই আলাদা স্বাদের ৷ সারা বছর চেয়ে থাকতাম ঐ দিনটার জন্য ৷ এভাবেই ওয়ান টু থ্রি ফোর এর দরজার দিকে এগোতে লাগলাম ৷

একদিন স্কুল থেকে কৃষ্ণ সাজলাম মা বাবা দিদি দাদা বড়রা সাজিয়ে দিলেন খুব মজা পাচ্ছিলাম ৷ স্কুল সব কম্পিটিশনে নাম নিয়ে নিত ৷ সব গুলোতে পার্টিসিপেট করতে পেতমনা সময়ের অভাবে ৷ তবে ডিভোশনাল ব্যাপারটা মনে খুব নাড়া দিত ৷ স্পিরিচুয়াল পরীক্ষযায় প্রথম স্থান পাওয়াই মা বাবা স্যারদের সাথে প্রাইজ আনতে নরেন্দ্রপুরে গিয়েছিলাম ৷ ২০১৭ সেদিনের আনন্দ টা ছিল একেবারেই অন্য রকমের ৷ মনটা উদার আদর্শ জ্ঞানে ভরপুর হয়ে গিয়েছিল ৷

তারপর নিয়মিত চলতো নানা রকমের পরীক্ষা কম্পিটিশন, অংশগ্রহণ করে বেশ ভালো লাগতো ৷ এভাবে কখন যে এতগুলো বছর পার হয়েগেল কিছুই বুঝতে পারলাম না ৷ আর মাত্র কয়েকটা মাস তারপর স্কুল লাইফের শেষ অধ্যায় একটা নস্টালজিক এ্যালবাম হয়ে স্মৃতির পাতায় উজ্বল হয়ে রয়ে যাবে ৷ এতগুলো বছর  বন্ধুদের সাথে উঠাবসা দুঃখ সুখের মুহুর্তগুলো কাটানো ৷ ম্যাডাম স্যারদের নিয়ম শাসন ভালবাসা সব মনের আকাশে বন্দী হয়ে ধ্রুবতারার মতো জ্বলজ্বল করে থেকে যাবে সারা জীবন ৷ যখন খুশি এগুলোর স্বাদ আর ফিরে পাবনা কোনোদিন ৷ ছোটো ভাই বোনদের প্রতিদিনের দেখা আর দেখাতে পাওয়া যাবেনা ৷ স্কুলের অ্যাঙ্কেল অ্যান্টিদের ও খুব মিস করবো , বিশেষ করে স্কুলের ঘন্টা কে খুব মিস করবো ৷ ছুটির পর স্কুলের গেটের সামনে আলুকাটা ফুচকা আইসক্রিম চটপটি মামার চাটনি এগুলোর স্বাদ তাড়িয়ে নিয়ে বেড়াবে অনুক্ষণ ৷ আর বাসের আঙ্কেলদের খুব মিস করবো ৷ প্রীন্সিপাল স্যার কে সেই রূপে তো আর দেখতে পাবোনা ৷ দেখতে পাবোনা নানা রঙের স্কুলটাকে খুব মিস করবো মিস করবো সবকিছুকে ৷ বাথরুম যাওয়ার আছিলায় বন্ধুদের সাথে গল্পের বাহানা ও আর পাবোনা ৷ এখন মনে হচ্ছে বড় তাড়া তাড়ি বড় হয়ে গেল ৷ যদি ছোটো হয়ে থেকে যেতাম তাহলে খুব ভালো হতো৷ এখন আমি এমন জায়গায় দাঁডিয়ে আছি যার সামনে খোলা হাজার দুয়ার কোনটা দিয়ে বেরোনো যায় সেটার অপেক্ষায় ৷

সুপ্রতিম ভৌমিক

ভিখারী মধুর দুর্দশা

আজ খুব বৃষ্টি দুপুর থেকে । মধু এক নিত্য ভিখারী । সকালে বের হয় ঘর থেকে দু' মুঠো অন্নের সন্ধানে, অন্ন সংগ্রহ করে ঘরে ফিরতে হয় প্রতিদিন সন্ধ্যা । পরিবারের বাকী সকলে তার ভিক্ষার অন্নের আশায় বসে থাকে ক্ষুধা নিবারণ হেতু । কিন্তু আজ ঝড় বৃষ্টিতে মধুর আর ঘরে ফেরা হলো না । তাই ঘরের সকলে জঠর জ্বালা নিয়ে তার জন্য খুবই চিন্তামগ্ন, চোখে ঘুম নেই । কে জানে সে কোথায় আছে, কিভাবে রাত কাটাচ্ছে ?

অলকা গোস্বামী

বিদায়ের স্পর্শ

সেদিন ওর চোখে কি দেখেছিলাম,জানিনা। ওর হাতে ধরা আমার হাত টা ছাড়িয়ে আনতে পারিনি।একসময় নিজেই খুব আস্তে করে আমার হাত টা ছেড়ে দিল, মনে হলো আমার আঙ্গুলের শেষ স্পর্শ টুকু ও ধরে রাখতে চায় নিজের বুকের ভিতরে।

আজো মনে হলে বুকের ভিতর টা কেমন কেঁপে ওঠে।

সেদিন....

আর আজ, মাঝখানে পেরিয়ে গেছে দীর্ঘ পঁচিশ বছর। কোনও দেখা সাক্ষাৎ নেই। অতনুর শেষ কথাটি এখনো কানে বাজে,

আর কোনোদিন কথা বলবে না আমার সাথে।

কথা রেখেছিলাম আমি(সায়নী)।

কদিন থেকেই বৃষ্টি ঝরছে। জানালার গরাদে হেলান দিয়ে অতীত কথা  ভাবতেই বেশী ভাল লাগে সায়নীর। সেই মুহূর্তে কেউ ডাকলে বা ফোন এলে বিরক্ত লাগে। বিভাস সকাল সাড়ে আটটার মধ্যে অফিসে বেরিয়ে যায়। তারপর টুকটাক গৃহস্থালি কাজ সেরে কখনো গান শোনা, বই পড়া নিয়েই সময় কাটে। বিভাস গম্ভীর প্রকৃতির। অফিস নিয়ে কথা বলতে বেশী ভালোবাসে। সায়নীর মনের গভীরে কথার ঢেউ আছড়ে পড়ে....। সেসব শোনার আগ্রহ বা সময় বিভাসের নেই।

যৌথ পরিবারে মানুষ সায়নী। ভাইবোনেরা ওকে চড়ুই পাখি ডাকত। সারাদিন মুখে কথা আর কথা। ও বাড়িতে না থাকলে সবাই খোঁজ নিত,

আজ চড়ুই পাখি বাড়ী নেই বুঝি!

সায়নীর দাদা সুবিমলের বন্ধু ছিল অতনু। কখনো বন্ধুদেরকে বাড়ী নিয়ে আসত সুবিমল, গল্প,আড্ডা, হৈ চৈ।

সেই অনেকের মধ্যে অতনুকে দেখলে কেমন একটা শিহরন অনুভব করতো সায়নী। মনে হতো দুটো চোখ শুধু ওকেই দেখছে। এই বাড়ীতে আসা যাওয়ার মাঝখানে কখন দুজনের চোখে চোখে ভালোবাসার বোঝাপড়া হয়ে গেছিল... সেটা এখন আর মনে পড়ে না। 

ভরা বর্ষায়.... ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি, রাস্তা মোড়া কৃষ্ণচূড়া ফুল এর গালিচা। একটি মাত্র ছাতা, দুজনে কাক ভিজে হয়ে আশ্রয় নিয়েছিল সেই চা এর দোকানে। যেখানে একদিন অতনু বলেছিল,

আমরা তোমাদের মত এত স্বচ্ছল নই সায়নী। তুমি কি আমার জন্যে অপেক্ষা করবে?

  তুমি আরো পড়াশোনা কর সায়নী। ততদিনে আমিও চাকরি পেয়ে কিছুটা সামলে নেব। 

অপেক্ষা করার প্রতিশ্রুতি রাখতে পারেনি সায়নী।

বইয়ের ফাঁকে অতনুর ছবি সায়নীর মায়ের চোখে পড়ে যায়।

নব্বইয়ের দশকে যৌথ পরিবার সায়নীর বিয়ে দেওয়ার স্বপক্ষে যুক্তি দেয়।


চা এর দোকানে বসে বৃষ্টির জল আর চোখের জলে ভেসে অতনু কে বিদায় জানিয়ে এসেছিল সায়নী। নিজের ভালবাসা, স্বপ্নের চেয়েও অনেক বড়, মা বাবা,পরিবারের সম্মান ও মর্যাদা। বিভাস  কোনো কিছুর অভাব রাখেনি। শুধু সায়নীর মন ছুঁতে পারেনি। খুড়তুত বোন রিনি একদিন বলেছিল,

জানিস, সেদিন অতনু দাকে ব্যাংকে পেয়েছিলাম। বাব্বা কত বড় চাকরি করে, গাড়ি বাড়ী বিশাল ব্যাপার।

ছোট্ট করে

ও আচ্ছা,

বলে কথা পালটেছিল সায়নী।  শুধু জানতে চাইছিল,

তুমি কি সেই আগের মতোই আছো, নাকি অনেকখানি বদলে গেছো, জানতে ইচ্ছে করে।

অঝোর বৃষ্টি ঝরছে। বিভাস কে ফোন করল সায়নী,

ছয় টা বেজে গেল, কখন আসবে?

আরে বৃষ্টি কমুক।আসছি....। তুমি ততক্ষনে আমার জন্যে একটা রোমান্টিক কবিতা লিখে ফেল।

হেসে ফোন রেখে দিল বিভাস।

সায়নীর বুক চিরে দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এলো।

প্রথম প্রেমের বাহুডোরে আমি এখনো বাঁধা পড়ে আছি,বিভাস। আমাকে ক্ষমা করে দিও। সবটুকু দিয়েও যখের ধনের মত আগলে রেখেছি সেই বিদায়ের স্পর্শ টুকু।

ছন্দা দাম

মায়া স্পর্শ

মা মাগো...উফফফ কি ব্যথা গো মা !!

কঁকিয়ে কেঁদে উঠলো উর্মি।

আষাঢ়ে মুখভার করা দুপুর , একটানা টিপটিপ বৃষ্টির জলতরঙ্গ আর তার সাথে কোরাসে রান্নাঘর থেকে মায়ের রান্নার মৃদু মধুর সুরভিত রান্নার সম্ভার দেয়া আর হাতা ছেনির শব্দ শোনা যাচ্ছে।

মা কাজ করে করেই বলছেন...দাঁড়া মাথাটা ধুইয়ে দিচ্ছি,মাথাটা বিছানার পাশে নিয়ে আয়।দেখিস ফুসমন্তরে কমে যাবে।

মা ঘটি হাতে কপালে চুলে  জল ঢালছেন ধীরে ধীরে,আর বলছেন...ভীষণ অবাধ্য মেয়ে,কথা শুনিস?বলি যে বৃষ্টিতে ভিজলেই জ্বর আসবে...কে কার কথা শোনে,

ব্রাহ্মণ মন্ত্র পড়ে আর...!!!

বুঝবে মা না থাকলে!!

আহা কি আরাম !!কি ভারী লাগছিল মাথাটা । উর্মি আওয়াজ পাচ্ছে মা এখন বাটনায় থেঁতলে আদা আর তুলসী পাতার রস আনছেন।

কপালে মায়ের মায়া স্পর্শে সব জ্বর উধাও হয়ে গেল!!

ঘুমের দেশে ডুবে যেতে যেতে মায়ের কথা কানে আসছিল... দুষ্টুমির তোর শেষ নেই,ছাতা রেখে বৃষ্টি ভেজার কষ্ট কে পাচ্ছে বল?

 ওয়েটিং শেডে দাড়িয়ে ভিজে সপসপে  উর্মি বৃষ্টির তীব্র ছাঁট অনুভব করতে করতে ভাবছিল...আজ ঘরে জ্বর শরীরে গেলে কপালে জলের ধারা আদাতুলসীর রস দেবার হাতটা যে আর কোথাও নেই!!

 চোখের উষ্ণ প্রস্রবণ কখন মিশে গেল বৃষ্টির সাথে বুঝতেই পারল না উর্মি!!

রিপন সিংহ

মধ্যবিত্তের বিচার 

নয়ন তার বাড়ির দাওয়াই বসে কি যেন ভেবে ভেবে হাওয়ায় কথা বলছিল। এমন সময় তার দাস বন্ধু এসে,

"কিরে দু-দিন পর কালীপুজো, খবর কি? বাজিপটকা কিন নাই, চল।"

কিরে নয়ন কি ভাবছো?

আরে সাগর কিছু নই, সেই সাত বছর আগের কথা।

"কি কথা শুনতে পারি কি?"

কেন জানিনা এই দীপাবলি উৎসবটা আসলেই এক অবাঞ্ছিত খবর বারবার কানে আসে; হয়তো বা দীপাবলি উৎসবটা যেন আমার পরিবার ভেঙে যাওয়া মুহুর্ত, আমার জীবনের উচ্ছিট দিন। এই উৎসবটা আসলেই আমার সেই অতীতের কথা মনে পড়িয়ে দেই, যা আজও আমাদের বাড়িতে দীপাবলি নিশীথের অন্ধকার হয়ে থাকে! কেন জানিনা মনে হচ্ছে আমার জন্ম লগ্নটাই দুঃখ লগ্ন; নয়তো বা আমি জন্ম নিয়েছি সংসারের সমস্ত দুঃখ - নটখট সহ্য করার জন্য। বিধাতার এমনই পরিহাস আমার নয়ন নামই রাখা হয়েছে যাতে আমার চোখের জল মুহূর্তে মুহূর্তে ঝরতে থাকে! হা: বিধাতা এই মায়া সংসার থেকে আমায় তুলে নিলে বাঁচি, চোখের জলতো শুকাবে!

সাগর। এ কি বলছিস পাগল, মানুষের জীবনে দুঃখ না আসলে সুখের মজাটা বুঝবে কি করে।

নয়ন। নারে ভাই, আমার হাসি যেন দিনে বেলার তারা!

"আচ্ছা ঘটনাটা কি শুনি ভাই?"


দিনটা ছিল দীপাবলির একদিন আগের ঘটনা। আমার বড়দা কোলকাতায় এক বেসরকারি দপ্তরে চাকরি করে, পুজোতে কাজের ব্যস্ততায় ছুটি পাইনি বলে দীপাবলিতে আসার কথা জানিয়েছে। আমি দাদাকে জানিয়েছি আমার জন্য জিন্সের পেন্ট আর সাদা শার্ট আনতে। বাড়িতে কতই না আনন্দ; আর হবেই বা নাই কেন, বড়ো ছেলে সাত বছর পর বাড়িতে আসছে। বাবা মায়ের হাসি গাল ছড়িয়ে কান পর্যন্ত উঠে যায়। বড়ো ছেলের জন্য নাড়ু - জলপাই আচার ভিন্ন ভিন্ন পছন্দ মতো জিনিস তৈরি করে রেখেছে মা। আমি নদীর তীরে মাকে না জানিয়ে শর্বানীর সাথে একটু ঘুরতে গেলাম। নদীর তীরে শর্বানীর সাথে স্নিগ্ধ নাতিশীতোষ্ণ বাতাস গায়ে স্পর্শ করে আমার মন প্রাণ পুলকে ভরে উঠল। দু - জনে হাতে হাত ধরে অনেক গল্প করলাম, আর বললাম আমার বড়দা আসছে কোলকাতা থেকে তাই প্রতিদিন এভাবে দেখা করাটা কষ্টকর হলেও হতে পারে। শর্বানী বললো ঠিক আছে দীপাবলিতে তুমি ওই মাঠের শিব মন্দিরে এসো- হাতে হাত ধরে প্রদীপ জ্বালাবো।

"ঠিক আছে পাগলী তুমি যা বলো।"

নদীর প্রবাহে শিউলি ফুলের ভেসে যাওয়া যেন মায়ের বিসর্জনের কথা মনে পড়িয়ে দেয়। আজ বাদে কাল দীপাবলি, আমার মর্ম উত্তেজিত। ঠিক আছে পাগলী বাড়িতে যাও সন্ধা হতে চললো, তোমার সাথে থাকলে যেন মুহূর্তের মধ্যে সন্ধ্যা হয়ে যায়। 

"না আমি বাড়ি যাবো না, তোমার সাথে থাকতে আমার ভাল লাগে"!

একথা বলে সে আমার বাঁ - হাত জড়িয়ে ধরে বসে রইলো।

"আরে পাগলী স্কুল পড়ুয়া ছাত্রকে যদি এইভাবে প্রেম করতে দেখে তাহলে আমাদের দু - জনকে মেরেই  ফেলবে"!

কোন্ মতে বুঝিয়ে তার চাঁদবদনের কপালে এক চুম্বন করে আমি ফিরে এলাম। সাবধানে যাবি পাগলী।

বাড়িতে এসে দেখি ঘর - টর যেন ঝকমক করছে, কি খুশি; আমি আনন্দে আত্মহারা। সন্ধ্যায় মা'র সাথে দাওয়াই বসে কিছু গল্প - হাসি ঠাট্টা করছিলাম, বড়দা ফোন করে জানালেন সে কাজ শেষ করে দোকানে আমাদের জন্যে কাপড় কিনতে যাচ্ছে। বাড়িন্দাই বসে মা আর বাবা কি যেন খিচুড়ি - পায়েসের কথা বলছে। আমি মনে মনে ভাবলাম যদি পাগলীটা আমার সাথে থাকতো! ভাবতে না ভাবতেই পাগলীর ম্যাসেজ;

"কিরে পাগলা কি করছো।"

"তোমার কথাই ভাবছিলাম পাগলী।"

"হুঁ, এত ভীমরতি দেখিয়োনা; কুত্তা।"

"এই পাগলী যাও গিয়ে পড়তে বস্।"

 হুঁ যাচ্ছি।

ভাত খেয়ে আমরা টিভি দেখছিলাম,এমন সময় ঠিক বারোটাই মায়ের ফোন বেজে উঠল। ফোন ধরতেই মা চিৎকার করে উঠল। ওই ফোন কলটাই ছিল আমার জীবনের দুঃখের আরম্ভন! ফোন করেছে হাসপাতাল থেকে, বড়দাকে রাস্তা থেকে রক্তাক্ত অবস্থায় কেউ হাসপাতালে নিয়ে ভর্তি করিয়ে দিয়েছে! মা - বাবা যথাক্রমে অজ্ঞান আর স্তম্ভিত মূর্তি, আমি যেন এক জীবিত মৃত্যু দেহ। রাতটা কিভাবে যে কেটে গেল আমিই জানি। মা সকাল সকাল কোলকাতার জন্য রওনা দেই, মা পৌঁছে ফোন করলো বড়দা অজ্ঞান,নাক - কান রক্তে ঝরঝর করছে। মাথা ফেটে এক বিভৎস রূপ হয়ে গেছে, বাঁচার সম্ভাবনা খুবই কম! ডাক্তার জানিয়েছে ইমারজেন্সি অপারেশনের জন্য সাত লক্ষ টাকা জমা দিতে হবে, টাকার অংক শুনে যেন আমার মাথায় বাজ পড়ল; শুধু বাড়ির সীমানাটাই রেখে সমস্ত জমিন বিক্রি করে দিয়ে সঙ্গে সঙ্গে টাকা পাঠিয়ে দিল। এখন ভাই কোমাটে আছে। বাড়ির লোকজনতো আর বেঁচে ফিরবেনা বলে শ্রাদ্ধের কথা বলতে লাগল। সাত দিন পর মা ফোন করে বলল আরো সাত লক্ষ টাকা লাগবে। আমার নামে থাকা জমিনটা বিক্রি করল আর কিছুটা ধার করে সাত লক্ষ টাকা পাঠালো; জমিন - টাকা দিয়ে কি আর হবে প্রাণ বেচেঁ ফিরলেই হল! এমন বিপদের সময় নিজের  আত্মীয়ও পাশে দাঁড়ালো না, হা: স্বার্থপর মানব! এক মাস কোমাটে থাকায় জ্ঞান ফিরে ভাই সব ভুলে যায়, এমনকি নিজেকেও চিনলো না! পুলিশ তদন্ত করে বলল যে ওই দিন রাত্রে দোকান থেকে ফিরে আসার সময় তারই এক বন্ধু কোন্ এক ঝগড়ায় মাথায় ইট মেরে ফেলে চলে গিয়েছে। এক অজানা ব্যাক্তি ভাইকে তুলে হাসপাতালে ভর্তি করে যান; ওই অজানা ব্যাক্তির কাছে আমার পরিবার চির কৃতজ্ঞ।

কোমা থেকে ফিরে এসে দাদা যেন এক নাবালক শিশু। মার স্নেহ ভক্তিতেই যেন ভাইকে বাঁচিয়েছে। মা বিভিন্ন দুঃখ কষ্ট বাধা বিপত্তি অতিক্রম করে ভাই এর যত্ন করতে লাগল। এদিকে আমাদের পরিবার রসাতলে চলে গেছে, আমার লেখা - পড়াতো লাটে উঠে গেল। অর্থের এত চাপ আমি পড়া ছেড়ে দিলাম, যেন আমার পায়ের নিচের ভূমিতল ফস্কে যাচ্ছে। ঋণের টাকা শোধ করতে না পারাই, বাড়ির সর্বস্ব বিক্রি করে দিলাম। এমন কি আমার জামা কাপড়, বই - খাতা কিছুই আর রইল না; আমরা এখন সর্বস্ব কাঙ্গাল! কোনো দিন না করা কাজও বাবা করতে বাধ্য হয়েছে, রাস্তার কাজ থেকে শুরু করে প্রায় চাকর সমান। আমি প্রায় ভিক্ষুক হয়ে গিয়েছিলাম, প্রতিটা লোকের মুখে প্রায় ছি ছি আর ছি; এখন যেন এই ছি - ছি শুনাটা আমি আর কিছুই মনে করি না। আত্মহত্যা করতে চাইলেও বাবা - মা' র সেই করুন দৃশ্য চোখে ভাসে। 

ওইদিকে মায়ের অবস্থাও করুন, নিজে না খেয়ে অসুস্থ ভাইয়ের বায়না মেটাতে গিয়ে মা তার সর্বস্ব সোনা - দামি কাপড় সব বিক্রি করে দিয়েছে। সুবিচারের জন্য মা আদালতে মামলা করলেও, কাঙ্গালের কথা কেই বা শুনে! আদালতে গেলেও আজ নয় সাতদিন পর, তারিখ আসে আবার তারিখ পরে; আবার তারিখ আসে তারিখ পরে। সু - বিচারের মুহুরীকে টাকা দিতে দিতে মা আজ পথের ভিখিরি। বাতাসে শুনতে পেলাম বিরোধী দল নাকি কোন্ এক অবৈধ ভাবে মামলাকে চাপানোর চেষ্টা করছে। এমনকি বিরোধী দল তারা মাকে সরাসরি হুমকি দিচ্ছে মামলা নিয়ে নেওয়ার জন্য। তারিখ পড়ল আজ আদালতে আসার জন্য কিন্তু আবার তারিখ দিল এক মাস পর। এদিকে আমাদের পরিবার দু - টুকরো হয়ে গিয়েছে; আমি সুবিচারের আশা প্রায় ছেড়েই দিয়েছি। একমাস পর মা আদালতে পেশ হলে মিষ্টার সাহেব বাবু ঘোষণা করল তোমার ছেলে পথ দুর্ঘটনায় এমন হয়েছে তাই মামলা নিয়ে নিতে। যদি আজ আমাদের অর্থের অভাব নাই বা থাকতো তাহলে অনেক পূর্বেই সুবিচার পেয়ে যেতাম; আমাদের পাশে দাঁড়ানোর মতো কেউ নেই। বাড়ির আত্মীয়রাও আমাদের ঘর ছাড়া করার জন্য ষড়যন্ত্র করেই থাকে। আমরা প্রায় পথের কুলান্দ্রি হয়ে গিয়েছিলাম।

বন্ধু এটাই হল আমার অতীতের কথা। ওই দিন থেকে আজও আমরা এই দীপাবলিতে প্রদীপ প্রদীপ্ত করিনি! এই দীপাবলি আসলেই আমার সেই সাত বছর আগের ফোন কলটা কানে বাজে। ওই ফোন কলটাই ছিল আমাদের পরিবারের অন্ধ দীপাবলি। তাই এই দীপাবলিতে চারিদিকে আনন্দে আলো ঝলমল - ফুরফুর করলেও আমি আজও অন্ধকার আবদ্ধ ঘরে একা বসে থাকি। আগেতো আমি সবার সাথে মিশতে চেষ্টা করতাম কিন্তু এখন একা সরিয়ে আসতে চেষ্টা করি। 

আজ বুঝলাম আমার নাম "নয়ন" মানেই দুঃখ ভরা জীবন। 

জানিনা আমি কে, কেনই বা জন্ম নিয়েছি!

পদ্মশ্রী মজুমদার

নবজাতক 

"আপনে আপনার উপরওয়ালার নাম লইন,আমি আমার উপরওয়ালার নাম লইয়ার"

এই বলে ডাক্তার কিছু সময় নামাজ পড়ার ভঙ্গিতে চোখ বন্ধ করে রইলেন।তারপর হাতে তুলে নিলেন সিজারের ছুরি।অর্পিতার চোখে কেউ এক টুকরো ভারি কাপড় দিল।অর্পিতাও চোখ বন্ধ করে  ইষ্টদেবকে স্মরণ করতে থাকল।কিছু সময় রুদ্ধশ্বাস।এর ফাঁকে দুই জনের প্রার্থনা ব্রহ্মান্ডের কোথাও মিলেমিশে একাকার।

নবজাতকের কান্নায় ভরে উঠল অপারেশন থিয়েটার।

শুভাশিস চৌধুরী

বিনোদ-আমন

সকাল এগারটা।অফিসের আধিকারিক সুখেন্দুবাবু কিছু বুঝে উঠার আগেই হুরমুর করে মা মেয়েকে নিয়ে চেম্বারে ঢুকে পড়ে এই অফিসেরই নিয়মিত সাফাইকর্মী বিনোদ সতনামী। শুধু ঢুকেই পড়ে নি ওরা দুজন বিনোদকে সাক্ষী রেখে কথা বলতে শুরু করে-

প্রথমে বিনোদই শুরু করে

স্যার!

কী?

এই দেখেন এইডা আমার মাইয়া মাধুরী আর বউ জিনাৎ।এরা কিছু আপনেরে কৈতে চায়।

জিনাৎ তেড়েফুঁড়ে বলে ওঠে

স্যার এই যে আমার মাইয়াডা, এইবার কলেজে সেকেন্ড ইয়ারে পড়ে।পুলাডা তো বি কম পাস কৈরা চাকরির পরীক্ষা দিব কৈয়া, কুচিং সেন্টারে ভর্তি হৈছে। এখন আমরারে একটা রাস্তা দেখান। বিনোদকে দেখিয়ে বলে, হের হাতেত্তে

আমরারে মুক্তি দেন।

মিষ্টি রোগা চেহারা, জিন্স আর টপ পড়া মেয়ে মাধুরী, একই সুরে সুর মিলিয়ে বলে,হ স্যার, একটা কিছু ব্যবস্থা কৈরা দেন।আর পারি না।অতিষ্ট লাগে।

হেরা যেমনে চায় কৈরা দ্যান স্যার, বলে অনুমতি নিয়ে ঘর থেকে বেড়িয়ে যায় বিনোদ।যেন স্যারের কাছে ওদের ঠেলে দিয়ে পালিয়ে বাঁচল।যেন বুঝাতে চাইলো দেখুন স্যার,আমি কিভাবে,কাদের নিয়ে থাকি।

মাধুরী থামল না।কী কমু স্যার বাইত থাকনের উপায় নাই।পৈত্যেক দিন রাইতে মদ খাইয়া আইয়া আমরারে ঘরেত্তে বাইর কৈরা দেয়।মাইয়েরে মারে।

কথার মাঝে জিনাৎ ঢুকে সংযোজন করে, হে বেতনের টাকা যা পায় সব হের মায়ের সংসারে দিয়া লায়।আমরা খাইলাম কি খাইলাম না,ইডার খবরঅ লয় না।আপনে হয়তো জানেন না স্যার,ঐ হরিজন কলোনিতে হের মা ভাইয়েরা বাড়ির যে একটা পরিবেশ বানাইয়া রাখছে! সারাক্ষণ খালি ঝগড়াঝাঁটি, বাজে কথা,হৈ চৈ।কেমনে যে পুলাপানের পড়াশুনা করাই, হে একমাত্র আমিই জানি। শেষ পর্যন্ত ভাড়া আইলাম ঐ দয়াময় কলোনিতে দুইডা ঘর লইয়া।ইহানেও কষ্টেমষ্টে আছিলাম। কিন্তু শান্তি নাই। হে রাইতে আইয়া আমরারে ঘর থিকা বাইর কইরা দেয়। শেষে পুলা মাইয়া লইয়া আমি আমার বাপের বাড়িত, ঐ বর্ডার কলোনিতে আইয়া পড়ছি।আজগা এক সপ্তা ঐল।অখন স্যার কিতা করতাম কন। আইন আদালত যা করন লাগব করুম।আমারারে একটা উপায় কন।

ঝরের গতিতে ওরা দুজন কথাগুলো বলে ফেলল।এতক্ষণ চুপ করেই ছিলেন সুখেন্দুবাবু। এবার মেয়েটাকে বললেন,তবে তো তোর বাবাকে পুলিশের হাতে তুলে দিতে হয়, মহিলাদের উপর অত্যাচার,এটাকে তো ডোমেস্টিক ভায়োলেন্স বলে। কলেজে পড়িস, নিশ্চয়ই বুঝতে পারছিস,এর পরিনতি।কয়েকটা দিন জেল খাটুক,চাকরিটা তো যাবেই। একশ্বাসে কথাগুলো বলে গলার স্বরে একটু পরিবর্তন আনলেন সুখেন্দুবাবু।আচ্ছা বল, তখন কি আর তোদের টাকা দিতে পারবে? 

মেয়েটা তড়িৎ গতিতে বলল,না স্যার,এসব কিছুই লাগত না, আপনে শুধু বাবার বেতনের টাকাডা মার একাউন্টে দিয়া দেন।তৈলে বাবা নিজের মতো থাকুক আমরা আমরার মতন।

এবার একটু থিতু হলেন সুখেন্দুবাবু। ভালো করে দুজনকে আরবার দেখলেন।এই চোখে এতক্ষণ যে দুটো নারী চরিত্রকে দেখেছেন তার থেকে আলাদা। কেননা এবার মনে হলো এরা আসলে বাবা বা স্বামীকে চাইছে না।বাবা বা স্বামী নয়, বিনোদ এখন এ সংসারে ওনলি আর্নিং মেম্বার।এই শুধু তার পরিচয়।স্যার একবার নিজের দিকেও তাকিয়ে কোথায় যেন মিল খুঁজে পান।

জিনাতের বয়স ৪০এর বেশি নয়ই।তবে শারীরিক গঠনে তিরিশের বেশি মনেই হয় না। বিনোদের বয়স ৪৫ এর কাছাকাছি হলেও শরীর মজবুত। ব্যাকব্রাশ করে চুল আঁচড়ানো পোশাকে ফিটফাট।অফিস পরিষ্কার রাখা ওর কাজ হলেও সেই কাজ যেটুকুই করুক না কেন নিজেকে গুছিয়ে রাখে। খানিক ক্ষণের মধ্যেই মা মেয়েকে বুঝিয়ে বললেন, এখন তোমরা যাও, আমি ওর সঙ্গে কথা বলে জানাব, তোমরা অফিসকে এই বিষয়টা লিখিত আকারে জানাও,তারপর দেখছি। 

মা মেয়ে বেড়িয়ে গেল। সুখেন্দুবাবু ভাবতে থাকলেন,জিনাত,বিনোদ, মাধুরী সবইতো একসময়ের রূপালী পর্দায় ভেসে ওঠা নাম।এই বয়সে আসল সমস্যাটা কোথায়? আরও গভীরে অনুভব করলেন ছেলে মেয়ে দুটোই ১৮-২১বৎসরের মধ্যে।এরা দুজন দুজনকে সংসারে জুড়তে গিয়ে তবে কি নিজেদেরকে খুঁজে পাচ্ছে না?

অফিসের সারাদিনের নানান কাজের শেষে বিকেলে বিনোদকে ডাকলেন। বিনোদ যে বন্ধ দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে মা মেয়ে আর স্যারের কথা শুনছিল, সেটা সুখেন্দু অনুমান করতে পেরেছিলেন।তাই ডাকের সঙ্গে সঙ্গে বিনোদ এসেই যখন স্যারকে বললেন,স্যার,এরা যা কৈসে সব মিছা কথা।আমি কয় টাকা বেতন পাই কন স্যার!এর মধ্যেই পুলা মাইয়ার পড়াশুনা,বোউয়ের সাজগুজ, সংসার, সব চালাইতে গিয়া আমার ত অফিসের পরেও নানান খানে সাফাইয়ের কাজ কৈরা রুজগার করন লাগে। হের পরে বাড়িতে আইয়া আমন যদি ইট্যু শান্তি না দেয় কিতা করি কন্ । সুখেন্দু বাবু সঙ্গে সঙ্গে বললেন,আমন আবার কে? বিনোদ একটু লজ্জাই পেল,তারপর যেন চটকা ভাঙলো,স্যার হের নাম জিনাত ঐলেও ওরে আমি আমন কৈরাই ডাকি। 

সুখেন্দুবাবু বুঝতে পারলেন তার ধারনাটাই ঠিক। এবার নরমে গরমে বললেন,শোন্ এখন তুই বাবা।ক'দিন পর মেয়ের বিয়ে দিবি। তখন আরেকজন অপরিচিত ছেলেও তোকে বাবা বলবে এটা বুঝিস?কাজেই যা আর ঝগড়া না। তুই তো বাবা, সংসারের মাথা।যা, ওদেরকে দাদুর বাড়ি থেকে আজ নয় কাল ডেকে নিয়ে আয়। সামনের ছুটির দিন আমি যেন শুনতে পাই মা, মেয়েকে সঙ্গে নিয়ে নীরমহল বেড়িয়ে এসছিস।কত আর লাগবে? ছেলে তো আর যাবে না,তোরাই ঘুরে আয়।সাড়াদিনের জন্য যাবি।যাবি তো?ভাড়া লাগবে?মাথা চুলকায় বিনোদ,না স্যার । 

পরের সপ্তাহে অপেক্ষা করে সুখেন্দুবাবু ,না কোনো লিখিত অভিযোগ অফিসে জমা পড়ে নি।তবে কি!!

মিঠু মল্লিক বৈদ‍্য

বিশ হাজারের বিনিময়ে

সকাল থেকেই চেনা সুরে কোকিলটা ডেকেই যাচ্ছে। রনিতাও ওর মিষ্টি সুরে তাল মিলিয়ে সংসারের কাজ মিটিয়ে নিচ্ছিল সময়ের মধ‍্যে। স্বামী অজিত আর ছোট তিন বছরের অনুরূপাকে নিয়েই ওর সংসার। ভালোবাসার পবিত্রতা নিয়েই অজিত ও রনিতা বিয়ে করেছিল বছর পাঁচেক আগে বাবা মায়ের অমতে। বাবার বাড়ি ও শ্বশুড় বাড়ির কোথাও এই বিবাহিত দম্পতির স্থান হয়নি সেদিন। ওরা নিজেরা একটা ভাড়াবাড়িতে সংসার শুরু করে।

নুন আনতে পান্তা ফুরানো অবস্থার মধ‍্য দিয়ে ওদের সংসার এগোতে থাকে। রনিতা ও অজিত কারোরেই আর পড়াশোনা হয়নি।সংসার চালানোর তাগিদে অজিতকে যোগ দিতে হলো রাজমিস্ত্রির কাজে। আর রনিতা দুই একটা টিউশনি করে কোন রকমে দিন কাটায়।

জীবনের সব রঙ বে-রঙ্গীন হয়ে যায়। তবুও এক বৎসর কষ্টের মাঝেও আনন্দ খোঁজে ওরা কাটাচ্ছিল দিন।আস্তে আস্তে শুরু হয় ঝগড়া। এর মধ‍্যে অজিতের মা বাবা ছেলের কষ্ট সহ‍্য করতে না পেরে ওদের বাড়িতে নিয়ে গেল বটে কিন্তু রনিতার শুরু হয় নতুন লাঞ্ছনা। অজিতও তেমন একটা কেয়ার করতো না, কেমন জানি উদাসীন থাকতো। মাঝে মাঝে  সারাদিন কাজের শেষে একটু নেশা করে বাড়ি ফিরতে শুরু করলো। রনিতা কিছু বললে প্রথম প্রথম বকাবকি করতো,পরে পরে সেই মাত্রা বাড়তে থাকে। এদিকে শ্বশুর -শাশুড়ীও ভীষণ যন্ত্রণা করতো। দিনের পর দিন ওকে না খাইয়ে রাখতো।বাবার বাড়ি থেকে টাকা পয়সা চেয়ে নেওয়ার জন‍্য চাপ দিত।আর রনিতা তা অস্বীকার করলে শুরু হতো নির্যাতন।

সহ‍্য করতে করতে রনিতা মা হওয়ার সৌভাগ্য লাভ করে। কিন্তু সেটাও সহজ ছিল না। এই সময়েও ওকে নানা ভাবে অত‍্যাচার করতো ওরা।একদিন সহ‍্য করতে না পেরে রনিতা পঞ্চায়েতের দ্বারস্থ হয়। এর পর বিভিন্ন সালিস বৈঠকের মধ‍্য দিয়ে রনিতার নিরাপত্তার দায়িত্ব নেয় পঞ্চায়েত। ডরে ভয়ে শ্বশুর শ্বাশুড়ি কিছুদিন চুপ থাকলেও অজিতের অত‍্যাচার চলতেই থাকে। মা হওয়ার আশায় রনিতা দিনের পর দিন মেনে নেয় সবটুকু।  না না ওর কোন স্বাদের অনুষ্ঠানের বাড়াবাড়ি ছিল না,ছিল না প্রতিনিয়ত চিকিৎসকের পরামর্শ। সারা প্রেগনেন্সির জার্নিতে শুধু দুই থেকে তিনবার ডাক্তার ওকে দেখেছে। শত প্রতিকূলতা পেরিয়ে অবশেষে রনিতার কোন আলো করে আসে টুকটুকে একটি ছোট্ট মেয়ে। তার পর থেকে রনিতার উপর অত‍্যাচার মাত্রা ছাড়িয়ে যায়। ভাই ও বাবাকে জানানোর চেষ্টা করেও ব‍্যর্থ হয়। অসহায় রনিতা সন্তানের মুখ চেয়ে নীরবে সহ‍্য করে সবটা দীর্ঘ দুই বছর।

ধৈর্যের বাঁধ ভেঙ্গে যায় এক রাতে। অজিত নেশায় মত্ত।  মাংশ ও রান্নার নানা সরঞ্জাম সহ এক বন্ধুকে নিয়ে বাড়ি আসে। রান্নার নির্দেশ আসে রনিতার কাছে। মেয়েকে ঘুম পারিয়ে যত্ন করে রান্না করে খেতে দেয় ওদের। খাওয়া দাওয়া শেষে রনিতা যখন ঘরে যায় দেখে  বিছানায় ঘুমিয়ে আছে অজিত ও বন্ধু সবুজ। ছোট্ট মেয়েটা পাশে। রনিতা কোন কথা বলার আগে অজিত বলে সবুজকে সন্তুষ্ট করতে হবে রাতে।তাই এই বিছানায় ওকে থাকতে হবে সে চলে যাবে বাইরে। কারণ সে বিশ হাজার টাকা ধার নিয়েছে সবুজের কাছ থেকে। রনিতা স্বপ্নেও ভাবেনি এতো নীচে নেমে যাবে তার ভালোবাসার মানুষ টি। যার হাত ধরে একদিন বাবা মা ভাই বোনকে ছেড়ে  সকল সম্পর্ক ছিন্ন করে  বেরিয়ে এসেছিল সেই মানুষটি আজ বিশ হাজার টাকার বিনিময়ে বিক্রি করতে চাইছে তাকে। কান্নায় ভেঙ্গে পরে অজিতের পায়ের উপর। ওর পৃথিবীতে  বিশ্বাস,ভরসা, ভালোবাসা সব মিথ‍্যা হয়ে এক শূন‍্যতা হাহাকার স্থান করে নিল। নিজেকে শেষ করার কথা মনে আসতেই ছোট্ট মেয়েটা মা বলে কান্না করতে থাকে।

অজিত রনিতাকে সবুজের দিকে ধাক্কা মেরে বাইরে বেরিয়ে সমানে থেকে দরজা বন্ধ করে দিল। রনিতা নিজের সম্মান,আত্মমর্যাদা বাঁচাতে সবুজের পায়ে পরে ভিক্ষা চাইতে থাকে।  সবুজ সেই মুহূর্তে অসুর হয়ে না উঠে রনিতাকে শান্ত করার চেষ্টা করে। রনিতার প্রতি কেমন যেন মায়া জাগে। সারারাত রনিতা সবুজের সংগে একঘরে থাকে আর ওর জীবনের অতীতটাকে বলতে থাকে সবুজের কাছে। মেয়েটাকে বুকে নিয়ে সে অবুঝের মতো কাঁদতে থাকে।সবুজ ওকে ছুঁয়ে ও দেখেনি। সকাল হতেই কোকিলটা ডেকে চলছে।এক করুণ সুর।

এর পর প্রায় রাতেই সবুজ আসতো।অজিত কোন বাঁধা দিত না। সবুজ রনিতার হাতের রান্না খেতে পছন্দ করতে লাগে, ওর সাথে কথা বলে সময় কাটিয়ে আনন্দ পেতে লাগে।  সেই রাতে সবুজের আচরণের পর থেকে রনিতা সবুজকে শ্রদ্ধা করতে থাকে। আস্তে আস্তে ওদের মধ‍্যে একটা অজানা সম্পর্ক গড়ে উঠে। অজিত হারায় তার সবটুকু অথচ তার টেরও পেলো না। বিশ হাজারের বিনিময়ে  সে আজ সম্পূর্ণ একা।রনিতার চোখে এক অদ্ভুত তৃপ্তি। সবুজ দাঁড়িয়ে সামনে।করুণ সুরে ডেকেই চলছিল কোকিলটা।

খুকুরানী দে

দাবদাহ

ধোঁয়াশা বয়ে ঘনীভূত হয়ে মেঘ জমে 
ঈশানের কোনে পড়ন্ত বেলায়,
আদ্রতা বেড়ে গুড়ি গুড়ি বৃষ্টি ঝরে
এক সময় ভোর হয়ে যায়।

অপ্রতিরোধ্য ধ্বংসের মুখ হতে 
অসম্পৃক্ত আপেক্ষিকতায় ফিরে আসা 
কালো মেঘ আমি
গোধূলির বুকে দমকা হাওয়া
চাই এক পশলা বৃষ্টি হয়ে ধুলি বয়ে যাক।
হৃদয় কে বাঁচিয়ে রাখার হয়ত মিথ্যে প্রয়াস।

আবহাওয়া মাঝে মধ্যে দমকা বাতাস  যায় বয়ে
তবে সে বাতাসও এত গরম থাকে
প্রশান্তির বদলে অস্বস্তি আসে লয়ে।
ঘাম ও বের হয় না শরীর থেকে।

বিজ্ঞান বলে দাবদাহে খাপ খেতে হলে
বেশি বেশি পানি ও করতে হবে পান
নিয়মের মতো নিয়ম করে করতে হবে স্নান 
অবহেলায় শ্বাস নিতে হবে কষ্ট,
তা থেকে মিলবে না পরিত্রাণ।।।

মায়া রানী মজুমদার

বিধাতার পরিহাস

মা বাবার আকাঙ্খিত বাসনা পূর্ণ করতে মায়ের কোল আলো করে যখন নবজাত শিশু জন্ম নেয় তখন মা গর্ভধারণ ও প্রসব যন্ত্রণা ভুলে গিয়ে শিশুকে সস্নেহে কোলে তুলে নেন। এবং অতি সোহাগে বড় করতে থাকেন। শিশু সন্তান, ছেলে হোক বা মেয়েই হোক মা বাবার নয়নমণি। সন্তানকে মা বাবা অতি সোহাগ ও আদর যত্নে বড় করে তোলেন।

মেয়ে সন্তান জন্ম নেয় পরের ঘরে বধূ সেজে গিয়ে ঐ ঘর আলোকিত করার জন্য। বধূ সেজে গিয়ে আনন্দে মাতিয়ে রাখে পুরো বাড়িটাকে। 

"মেয়েরা পরকে আপন করে
               আপনকে করে পর, 
বাহিরের বাঁশির টানে 
                      ছেড়ে যায় ঘর।" 

মা বাবার ঘরে অতি আদরে বড় হয়ে মেয়েরা স্বামীর ঘরে গিয়ে পুরো সংসারের দায়িত্ব বুঝে নেয়। স্বামীর সোহাগে প্রতিটি স্ত্রী নতুন জীবন পেয়ে, নতুন করে বাঁচার স্বপ্ন দেখে। স্ত্রীও আপন করে নেয়, স্বামী, স্বামীর মা, বাবা, ভাই, বোন,এবং আত্মীয়-স্বজনদের। 

   একটা ছোট্ট লাল টিপ, শাঁখা, সিঁদুর ও লাল পেড়ে শাড়িতে বধূকে অপরূপ লাগে। ভাগ্যের পরিহাসে  কোন কোন নারী সংসার জীবনে এই সুখ থেকে বঞ্চিত হয়ে আবার আর একটা নতুন রূপ ধারণ করে।

    স্বামীর বিয়োগান্তে স্ত্রী'রা শাঁখা, সিঁদুর ও লাল শাড়ি থেকে বঞ্চিত হয়। ইহাই সমাজের নিয়ম। সমাজের নিয়মে জীবন সঙ্গীকে হারিয়ে সাদা শাড়ি পরে একাকী বৈধব্য জীবন কাটাতে হয়। এই একাকিত্ব জীবন যে কত দুর্বিসহ, ভুক্তভোগী ছাড়া কেউ বুঝে না। কারণ, ব্যথা না পেলে কেউ ব্যথার যন্ত্রণা বুঝবে কি করে ? 

  সাদা শাড়িতে বৈধব্য-বেশে রাত্রি বেলায় হারিকেনের আলোতে যখন আরশিতে মুখ দেখে, তখন আয়নাতে ভেসে উঠে নিজের সধবা থাকাকালীন সেই ছবি।  মনের আয়নাতে এই ছবি ভেসে থাকে মৃত্যুর পূর্ব মূহুর্ত পর্যন্ত। 

  দুঃখে, মনোকষ্টে বুক ফেটে যায়, তবুও মুখ ফুটে কিছু বলতে পারে না। এই হলো নারীর জীবন। বিধাতার পরিহাস বুঝা বড় দায়। বিধির নিয়ম লঙ্ঘন করা যে দুঃসাধ্য।

অসীম পাঠক

জোছনা রাতে 

পূর্ণিমার মায়াবী চাঁদের আলোয় বাঁধ ভাঙা উচ্ছ্বাস। পুরুলিয়ার পান্ডব বর্জিত এক গ্রামের মেঠোপথ দিয়ে গ্রামের শৌখিন যাত্রার আসরে পঙ্গপালের মতো ছুটে চলেছে সব মানুষজন। গোপালপুরে যাত্রা তাও আবার ঐতিহাসিক পালা।  ঝলমলে পোশাকের মেলা আর গ্রাম্য বিনোদনের এক অফুরন্ত ভান্ডার, সাথে মেলা জুয়ার আসর, দেশী মহুয়ার চনমনে নেশা। কাঁচের গ্লাসে ফেনায়িত মদ আর ঝালঝাল চাখনা  ছোলা মটর বাদাম। আহা রে- জিভ চকচক করে হরিপদর।  বেশ রসিক মানুষ হরিপদ কর্মকার, তার রসের ভান্ডারে কতো বিচিত্র অভিজ্ঞতা র গল্প। নাম করা গুনীন, সাপের বিষ নামা থেকে শুরু করে ভূত তাড়ানো অবধি , এমন কি  মেয়েদের বন্ধ্যাত্ব দূর , সাংসারিক কলহ -- সব সমস্যার মুশকিল আসান হরিপদ।  বৌ ইন্দিরাও বেশ খাসা মেয়ে, বর্ধমানে বাপের বাড়ি, ইন্দিরা বেশ চালাক চতুর কিন্তু ; লোকে বলে মানিকজোড়। হরিপদ ইন্দিরার বিয়ের এখনো দু বছর ঘোরেনি। হরিপদ বিয়ে করবো না করবোনা করে তার  এক আত্মীয়ের মেয়ের বিয়েতে কাটোয়া গিয়ে ওখানেই ইন্দিরাকে দেখে বিয়ের সাধ জাগে তার। ইন্দিরার বাবা ইঁট ভাটায় কাজ করতো, গরীব মানুষ। হরিপদ একেবারে রথ দেখা কলাবেচার মতো পাকাদেখা বিয়ে সব সেরে বৌ নিয়ে বাড়ি ফেরে, বুড়ি মা  তো খুব খুশী- দুজনের সংসারে আর একজন বাড়তি। 

বিয়ের পরে এই প্রথমবার হরিপদ ইন্দিরা কে নিয়ে যাত্রার আসরে এসেছে। অন্যান্য মেলা পার্বনে হরিপদ নিজে চট পেতে জড়িবুটি নিয়ে বসে। সন্ধ্যার পরে এক পাত্তর দেশী গিলে বাড়ি ফেরে হরিপদ, পয়সা কড়ি মন্দ করেনা। গুনীনের বৌ বলে ইন্দিরার বেশ খাতির মেয়ে মহলে।  বুড়ি মা বেরুবার সময় বলেছিলো , পোয়াতি মেয়েমানুষ নিয়ে রাতের বেলা যাস না, হরিপদ বলে  মা তোর বেটা কে ভূত পেরেত সব যমের পারা ডরায়।  

হাতে হাত ধরে যাত্রা আসরে ঢোকে দুজনে, তখন সবার সাজপোশাক চলছে। পালার নাম  তাজমহল। হরিপদ বলে  , এ বৌ কি লিবি বল - তোর বরতো তাজমহল দিতে লারবেক কিন্তু  কাঁচের চুড়ি  ইমিটেশনের মালা  হাতে মেহেদি আর পেটভরে জিলাপি ফুচকা খাওয়াবেক। ইন্দিরা বলে আর একটা ভেনিটি ব্যাগ লিবো , একটা পুতুল কিনে রাখবো, ঘরেল লাইগে একটা আঁশ বটিন লাইগবেক, চিনামাটির কাপ লাইগবেক। আর তুমার লাইগে একটা গোল টুপি কিনবো  মাথায় পরলে বেশ সাহেব পারা লাইগবেক। রোদে জলে বড ঘুরো , মাথা ঠান্ডা থাইকবেক। আর একটা ছোট পারা মতন লুহার কড়াই। বেশ সব কেনাকাটা হয়। কদিন ধরে ঊখানে হরিনাম সংকীর্তনের আসর বসেছিলো, আজ ধূলাট। শেষ দিনে যাত্রা। মাঠের পাশেই অড়কষা নদী, জল কম পাথর বেশী।  বৌ এর হত মেলা ঘুরে  থলি ভরর্তি করে সব কেনে  ইন্দিরা যা যা বলে  ... সব । হরিপদ জানে বৌ খুশী থাকলে সব ঠিক।  ওই যে সেই মহান কথা ... সংসার সুখের হয় রমনীর গুনে। 


 হরিপদর চোলাইয়ের আসরে বসতে ইচ্ছে করে। বেশ ঝাল ঝাল চাখনা আর তাজা মহুয়া। যাত্রার আসরে একটা শিরীষ গাছের নীচে আরও অনেক মহিলার সাথে ইন্দিরা কে বসিয়ে  সে মাল খেতে যায়, মনটা আজ বেশ ফুরফুরে। পেট পুরে মদ গিলে হরিপদ। পাঁচ খানা গাঁয়ের নামকরা ওঝা বলে কথা।  বিষধর সাপকে এক হাতে কাবু করে ফেলে। ইন্দিরাকে বলে , এসব  কিছুই না , খালি চোখে চোখ রাইখে উয়ার গতিবিধি টা বুঝতে হবেক। 

মদ খেয়ে ঝান্ডির আসরে যায়, চিড়িতন রুপিতন আর ইস্কাপনের খেলা। মোটা দাঁও মারে হরিপদ। আহা কি মজা , বৌয়ের চাঁদ বদন দেখেই তো তার ঘুম ভেঙেছিলো। বৌটা তার কপাল খুলে দিয়েছে। 

মনে মনে হরিপদ ইন্দিরার মুখ খানা ভেবে নিয়ে  অদৃশ্যে হাত বাড়ায় , যেনো পারলে একটু আদর করে। অনেক নিম্নচাপের রাত  ইন্দিরার পুরুষ্টু শরীর হরিপদ আদরে আদরে তোলপাড় করে তোলে। ইন্দিরার যৌবনের অনন্ত ক্ষুধা যেনো হরিপদ ঠিক মেটাতে পারেনা। 


এদিকে যাত্রার আসরে  ইন্দিরার পেছনে কে যেনো শিস দেয় , এতো চেনা শিস।  শিস তো নয় সংকেত। যৌবন বন্যায় উদ্বেলিত ইন্দিরার কামনার খেলাঘরে যার অবাধ অনুপ্রবেশ  বলাই ......    বলাই মাঝি। চওড়া ছাতি , মাথা  ভরতি বাবরিছাঁট চুল। সরু গোঁফে বেশ বলশালী চেহারা। বিয়ে করেছে হরিপদ  আর নেপোয় মারে দই এর মতো ইন্দিরাকে গোপনে ভোগ করে বলাই। বলাই মাথার ঘাম পায়ে ফেলে সব্জী চাষ করে। হরিপদর মতো লোক ঠকানো ব্যাবসা নয়। লোকের বৌ এর বন্ধ্যাত্ব দূর করতে গিয়ে নিজের টাই পেরে ওঠে না।  ইন্দিরার গর্ভে তাইতো বলাইয়ের সন্তান। 

ইন্দিরাকে একটা রাতেও সুখ দিতে পারেনি ভূত তাড়ানো গুনীন। তাইতো বলাইকে ইশারায় ডেকেছিলো ইন্দিরা। যৌবন বন্যায় উদ্বেলিত ইন্দিরা নিজেকে  উজাড় করেছিলো বলাইয়ের কাছে প্রথমবার ঘোষেদের বাঁশ বাগানে। তিনমাস আগে স্থানীয় হেল্থ সেন্টারে ইউরিন টেস্ট করে আয়রন ক্যালসিয়ামের বড়ি দিয়ে ডাক্তার দিদিমনি বলেছে  সে মা হতে চলেছে। অথচ বলাইয়ের সাথে সহবাসের আগে অবধি কোন লক্ষনই ছিলো না, মাঝে মাঝে ভাবে ইন্দিরা যদি বাচ্চার চেহারাখান বলাইয়ের মতো হয়ে যায় ....    

যাত্রা আসরে বলাইকে দেখে ভয় পেয়ে যায় ইন্দিরা , আর যাই হোক হরিপদ তাকে বড্ড ভালোবাসে, বলাই তো তার কামনার পুরুষ। ভালোবাসা হরিপদর সাথেই। বলাইয়ের কাছে এসে ফিসফিসিয়ে বলে , এই নাগর তোরে কচুকাটা করবে আমার বর জানতে পারলে , এখানে কি করতে এসেছিস। বলাই বলে দেখতি এলাম রে , হাজার হোক আমার পোলার মা হবি তুই। ইন্দিরা বলে আ মরণ ভাগ এখন, বলাই হাসতে হাসতে চলে যায়। 


যাত্রা শেষ হতে বেশ দেরী হয়।

তবে খুব সুন্দর অভিনয় সবার। হরিপদ ইন্দিরার হাত ধরে টর্চের আলো ফেলে বাড়ির পথে চলতে শুরু করে। বেশ ফুরফুরে হাওয়া দিচ্ছে, গ্রীষ্মের রাত বড়োই মনোরম।

গলা ছেড়ে গান ধরে হরিপদ, 

"ও পীরিত তোর জ্বালা তবে ঘুচাতে পারি , তেজে সুখ সাধ  লোক পরিবাদ , যদি পরের মরণে আপনি না মরি "। 

মাঠ ছেড়ে ধান জমিতে এসে পড়েছে তারা, রাস্তা টা এখন শুনসান। এখানে অনেক পুরানো দুটো বট আর নিম গাছ রয়েছে, জায়গা টা খুব একটা ভালো নয়। কেমন একটা গা ছমছমে পরিবেশ।  হঠাৎ কোথা থেকে কালো মিশমিশে চেহারার চারটে ছায়ামূর্তি রাস্তা রোধ করে দাঁড়ায়।  জলদ গম্ভীর স্বরে বলে ওঠে ,  এই গুনীন ছোঁড়া ছাড়ো  - ই ফুলের পারা ফুলমতীকে হামদের হাতে ছোড় দে। একটু দলাই মলাই করে দেখি, মালটার ঝাঁঝ কতটা। ভূত তাড়ানো হরিপদ  মুশ্কিল আসান হরিপদ একি ঝামেলায় পড়লো রে বাবা । হরিপদর মুখ শুকিয়ে যায়। ছায়ামূর্তি গুলো ইন্দিরার দিকে এগুতেই  এমন সময় বাঘের মতো হুংকার দিয়ে সামনে এসে দাঁড়ায়  বলাই। বলে ওঠে  কোন বেটার এতো সাহস রে , মরদ হলে ছুয়ে দেখ , সব কটারে লাশ বানাই দিবো। হাহাহাহা করে হেসে ওঠে ছায়ামূর্তি গুলো , তাদের একজন বলে  হামি কালু ডোম আছে , এখানের মিনিষ্টারের খাস লোক, হামার শিকার আটকাবে কোন বেটা-  থানা পুলিশ সব ভি হামারা জেব মে, তু কোন হ্যায় রে বেটা।  বলাই মেলায় আঁচ করেছিলো বলেই  চোখে চোখে রেখেছিলো ইন্দিরা কে। এবং একটা খেলনা পিস্তলও কিনেছিলো। রাতের বেলা এটাতেই অপরাধীদের ঘুম উড়ে যাবে, তাছাড়া দু চারটা পাতি মস্তানকে ডান্ডা মেরে  ঠান্ডা করতে সে ওস্তাদ। 

বলাই বেশ দাপটের সাথে বলে ওঠে ,  আরে কালু ওস্তাদ  ওসব মিনিষ্টার তোর পকেটে রাখ , আমার হাতে এটা আছে , তোর কোন বাপ এটা থেকে বাঁচাতে পারে শালা ডাক তাকে ..... বলেই খেলনা  পিস্তলটা উঁচিয়ে ধরতেই চারজন পড়ি মরি করে দে দৌড়। 

হরিপদ বলাইয়ের হাতদুটো ধরে বলে ,  বড়ো বাঁচালিরে ভাই , তোর ঋণ আমি কেমনে শুধি বল। বলাই মনে মনে বলে , শালা তোর বৌটারে যদি পারমান্ট দিতিস, সে কথা মনে চেপেই হাসি মুখে বলে  খুড়া বেটা হলে ভোজ খাওয়াবে , সব শোধ। এবার তিনজনেই হাসে। দুজন পুরুষের মাঝে এগিয়ে চলে ইন্দিরা। একটা হাত হরিপদকে ধরে আর মনটা যেনো বলাইয়ের কাছে বাঁধা।  তার গর্ভে যে বড়ো হচ্ছে সেও তো বলাইয়ের মতো এমনি সাহসী আর বুদ্ধিমান  হয় যেনো। বাড়ির কাছাকাছি আসতেই ইন্দিরা বলাই কে বলে ওঠে , ইবার তোর ঘরে চাঁদের পারা বৌ আসুক। বলাই মুচকি হেসে তার টিনের চালের ঘরের দিকে এগিয়ে যায়। বলাই ইন্দিরার কেওই জানলো না যে  হরিপদ সব জানে। বাঁশবাগানে দেখেছে সে। ওঝা মানুষ , পাঁচ খানা গাঁয়ের গুনীন কি এমনি এমনি ......  সে তো জানতো যে জড়িবুটি তে সব হয় না।  ভেক ধরা এসব গুনীন যদি সব পারতো তাহলে ভগবানের আর বিজ্ঞানের কি দরকার। নিজে পারেনি বলেই তার অক্ষমতাকে সে অবলীলায় মেনে নিয়েছে। ইন্দিরা খুশী থাকলেই সে খুশী। তার মনের ভেতরে কষ্টের চারাগাছটা তাকে আজ একটু হলেও ছায়া দিয়েছে , ভরসা দিয়েছে। কবে কি হয় কে জানে, সংসারে সুখী হতে গেলে বোবা হতে হয়। বোবার যে শত্রু নেই। চাঁদের আলোয় যেনো সব দুঃখ গলে যায় , সব পাপবোধ মুছে যায়। এই জোছনারাতে  সব ভূলে ইন্দিরাকে জড়িয়ে ধরে হরিপদ ধীরে ধীরে শান্তির ঘুমে তলিয়ে যায়।।

শ্বেতা ব্যানার্জী

হাজার তারার আলো

আজ সাহায্যকারি দিদি আসেনি, স্বাভাবিকভাবেই কাজের চাপটা অনেক বেশি ছিল।

স্নান করার সময় পর্যন্ত পাইনি। খিদেতেও পেটটা একেবারে চোঁ চোঁ করছে। তিনটে  বাজে একগাদা  বাসন অগোছালোভাবে পরে। হাতটা ধুয়ে এসে খাবো সেই ফুরসত নেই।  সবে স্নানের তোড়জোড়  করেছি,  পাসের বাড়ির পিসিমার হাঁক,

বউ, ও বউ, শুনতে পাচ্ছিস....

পিসিমাকে পাড়ার সকলেই সমীহ করে, পিসিমা ও প্রত্যেকের বিপদে আপদে পাশে এসে দাঁড়ান। 

আমার  শাশুড়ীমা'র মুখে শোনা, উনি আগে যজ্ঞির

রান্না, পুজোপার্বণের রান্না এক হাতে সামলেছেন।

এমন কী পাড়ায় কেউ যদি ডাক নাও দিত তবু্ও পিসিমা  হাজির। বল কী করতে হবে।

এ-হেন পিসিমা কে আমারা সকলেই শ্রদ্ধা ও সম্মান করি।

পিসিমার ডাকে সাড়া দিয়ে দুরদার করে সিঁড়ি ভেঙে সোজা পিসিমার সামনে... 

বলুন পিসিমা,  বলছি  তোরা  কী সব মুখে মাখিস ফর্সা -টর্সা হবার জন্য, আমার নাতনীকে আজ দেখতে আসবে। জানিস তো ওর রঙচাপা বলে 

প্রত্যেকটা সম্বন্ধ ভেঙে যায়।

আমি বললাম পিসিমা,প্রথমত আমি ওসব মাখিনা,দ্বিতীয় যারা রঙ দেখে বিয়ে করে তাদের আমি মানুষ মনে করিনা। তোমরা যে এত লেখাপড়া, গান, আঁকা শেখালে তার কোন মূল্য নেই!!

কী জানি বাপু!! যারা দেখে যায় ফিরে গিয়ে জানায়

কালো রঙ ছেলের পছন্দ নয়। আর মেয়েটা চোখের জলে বুক ভাসায় একলা ঘরে। 

আমি বললাম পিসিমা তুমি ওকে আমার কাছে পাঠিয়ে দিও। 

তুই তাহলে সাজিয়ে দিবি!

দেবো,কিন্তু মনের... 

মোটামুটি শ্যামাতন্বী, তবে শিখরীদশনা না'হলেও

লাবণ্যময়ী অনুসূয়া দীপ্ত প্রতিভায় উদ্ভাসিতা..

ইকনমিক্স ডিপার্ট্মেন্টের ভিজিটিং কনসালট্যান্ট।  

দিল্লিতে পাকাপাকি চাকরি পেয়েও মা-বাবার কথা 

ভেবে যাইনি।

অনুসূয়া সামনে এসে দাঁড়িয়ে জিজ্ঞেস করে ডেকেছো কাকিমা।

আমি বললাম আয় বোস, 

তুমি কী বলবে বলে ডেকেছো!

আজ তোকে   বিকেলে  দেখতে আসার  কথা।

কথাটা শুনেই ও যেন কেমন হয়ে গেলো, আমি কারণটা  বুঝতে পারলাম।

অনুসূয়া আমার মুখের দিকে তাকিয়ে বলল, কাকিমা আর আপমান হতে  আমি চাইনা।  বাবা ও মায়ের অপমান, আমার মেয়ে জন্মের অপমান --

আমি ওর পিঠে হাত রাখি, বলি তুই দয়া ভিক্ষা 

চাইছিস!?  কখন কে এসে তোমায় উদ্ধার করবে!!

এত ট্যালেন্ট তোর, তার কোন মূল্য নেই!

ডিগ্রি তো তোকে শিক্ষিত করতে পারিনি! তুই সেই পুরনো ধ্যানধারণায় আটকে আছিস!?

কী করবো কাকিমা! 

আজকাল বিয়ের জন্য মেয়ের গুন  কেউ দেখেনা, দেখে শুধু গায়ের ফর্সা চামড়াটা। যেটা আমার নেই।

যেটা নেই তা'কে আরোপ করার দরকার নেই। 

তুই  যেমন, তেমন ভাবে যদি কেউ গ্রহণ করে 

তাকেই তুই বিয়ে করবি।

পূর্ব অভিজ্ঞতা থেকে বলছি কাকিমা, জীবনটা গল্প বা উপন্যাস নয়, একটা কালো মেয়েকে দেখে  পছন্দ হয়ে গেল তারপর তারা সুখে শান্তিতে সংসার করতে লাগলো। এটা বাস্তব জীবন। আর এই বাস্তব জীবনে একটা কালো মেয়েকে প্রতিটা পদে পদে অপমানিত হতে হয়।

এই কিছুদিন আগে অফিসের মিটিং সেরে ফিরতে একটু রাত হয়ে গিয়েছিল, পাশের বাড়ির কাকিমা 

বারান্দায় দাঁড়িয়ে ছিলেন আমাকে দেখে আহ্লাদে আটখানা হয়ে বললেন.... 

ভগবান তোকে কালোরঙ দিয়ে একদিক থেকে মঙ্গল করেছেন,  ধর্ষিতা হবার ভয় যেমন নেই, তেমন তোর সঙ্গে ডেট করার জন্যও কেউ এগিয়ে আসবেনা। নিশ্চিন্তেই তুই রাত করে ফিরতে পারিস।

তাই কী না বল!! বলেই এমন হো হো করে হেসে উঠলো...

আমি নিজের উপর নিজে একরাশ  ঘৃণা নিয়ে বাড়ি ফিরলাম। 

কেন এত হীনমন্যতায় ভুগিস!! তোর যা কোয়ালিফিকেশন    সেইসব নিয়ে ভাব, দেখবি

জীবনের উৎকর্ষ খুঁজে পাবি।


আজ বাপন বাড়ি ফিরছে.. প্রায় তিনবছর বাদ

ম্যাঞ্চেষ্টারে ছিল একটা ফেলোশিপ প্রোগ্রাম নিয়ে গিয়েছিল। 

সিঁড়ি থেকে মা মা ডাকে বাড়ি উত্তাল করে ছেলে 

আমার ঘরে ঢুকলো, বাবা কোথায় জেনে নিয়ে 

শুরু হ'লো সেই ছেলেমানুষী যা ওর বাবা এবং আমার সঙ্গে করতো। 

আজ বিকেলে ছাদ বাগানে ঘুরতে ঘুরতে পাড়ার সবার খোঁজ নিল,কথায় কথায় আমি অনুসূয়ার কথা তুললাম,  ও চুপ করে শুনলো, কিছু বললো না।

আমি বললাম চুপ কেন!!

ও বললো ভাবচ্ছি,

 কী ভাবচ্ছিস!!  মা আমি যদি অনুসূয়াকে বিয়ে করি

তোমার আপত্তি আছে? 

আমি আনন্দে বাক্যহারা... 

দুচোখে আনন্দের ঝর্ণা, ছেলে বুকে জড়িয়ে বলি

সার্থক আমার মা জন্ম, সার্থক তোর মনুষ্যত্ব। 

তোরা জীবনে সুখী হ' দাম্পত্য জীবন দীর্ঘায়িত হো'ক তোদের---

মা মা, আমি এখনো বিয়ে করিনি। শুধু কথা দিলাম তোমাকে,  তুমি ওনাদের সঙ্গে কথা বলো।

আমি অনুসূয়ার হাতটা ধরে বললাম আমি তোর শাশুড়ী  হতে চাই। অনুসূয়া  আমার মুখের দিকে তাকিয়ে মুখ নিচু করে নিল,   কিন্তু তার আগেই তার  বড় বড় চোখের ভাষা আমি পড়ে নিয়ে ছিলাম, যেখান নোনাজল  চিকচিক করছিল।

অনুসূয়া আমায় প্রণাম করতে মাথা নোয়াতে যেতেই আমি বুকে জড়িয়ে নিয়ে বললাম ---

দূর বোকা, তোর জায়গা তো এখানে...।