Jan 18, 2024

শ্বেতা ব্যানার্জী

তের্জরিমা ভুলেছ তুমি

ভুলেছ  তুমি,  আমি ভোলার অনেকই  আগে,
এখন সেইসব স্মৃতির থেকে যাইনি বেশী দূরে, 
 না ফোটার কবিতার বাণী ভিজেছে  অনুরাগে।

এখনো তুমি  আগের মতন  স্মৃতির অলিন্দ জুড়ে..
শুধু তুমি গেছো   হাজার যোজন  দূরে সরে,
তবুও আনছি তুলে স্মৃতি  অনুতাপের কবর খুঁড়ে।

দিনরাত নয়, একলা দুপুর বিলিয়েছি অকাতরে, 
আজ আকাশের বুকে সন্ধ্যা নামে সূর্য অস্তাচলে,
ভিন-দেশী তারারা আজ ভাবনা ফেরি ক'রে।

ঘুম  হারানো   ঘুমের ঘরে দুঃস্বপ্ন  কথা বলে, 
চোখ বলে কোথায় আলো, অতল অন্ধকার, 
মন আজ সংক্রমিত  বিষাদের  অশ্রুজলে।

ভালোবাসা ছিলনা তোমার, ছিল চিত্তের বিকার,
 ভালোবাসার  তলোয়ার, আহা্; বড়ই চমৎকার।

সপ্তমিতা নাথ

শীত শেষে অপেক্ষার বসন্ত

বলিরেখা পড়া খসখসে প্রকৃতির,
আর কী রংয়ের প্রত্যাশা চৈত্র  থেকে ,
ব্যর্থতার, পাঞ্জাবি পকেটে ভাজ করা,
শতবর্ষের শীতকাল ।
 
মাতাল দক্ষিণা হাওয়ার আপ্রাণ চেষ্টা,
খানিক আর্দ্রতা দেওয়ার।
কিন্তু মুখমণ্ডলে যে জমে আছে ,
দিগন্ত মেরুর অনন্ত বরফ 
সেই তাপমান কেবলই বিয়োগে।

ধার করা জ্যোৎস্না তো
সৌরভ ও গোলাপের জন্য হাহাকার করবেই।
বসন্তের গুন গুন করার চৈত্রসন্ধ্যাও 
মধুর দুপুর ডাকছে ,
কিন্তু কঠিন শীত কি পেরোতে পারবে 
হামাগুড়ি দিয়ে ।
মন সাড়া দে হাত বাড়াতে ,
তবুও ভীত শীত সন্ধ্যা যদি
হয় চিরঅস্তমিত।

হয়তো বা বসন্তের সকালে সদ্য ফোটা 
রজনীগন্ধা ও গন্ধরাজের গন্ধে 
পুনঃ জাগবে ঝিমিয়ে পড়া রাত ।
বরফের সব আস্তরণ বিগলিত
করবে বসন্তের মধুর কোকিল ডাকে
কী জানি কোন খোলা চিঠি নিয়ে 
আসছে বসন্ত ,
এখন আসার দীপ নিয়ে দুয়ারে বসে আছি
তোমার অপেক্ষায় বসন্ত।

পূজা নাথ

পৃথিবী

পৃথিবীটা আগে ছিল খুব সুন্দর,
পৃথিবীর মানুষেরা ছিল ঈশ্বরের ই বর ।
সে সময় মানুষের মন ছিল নিষ্পাপ,
কিন্তু দিন দিন বাড়ছে মানুষের চাপ ।
পৃথিবীটা দিন দিন হচ্ছে দূষিত , 
মানুষজন শুধু গাছপালা ধ্বংসের কাজে বিরাজিত ।
বিভিন্ন দূষণের পৃথিবীতে হচ্ছে বৃষ্টি ,
এই দূষণ থেকে নানা রকম রোগের হয়েছে সৃষ্টি।
মানুষ নিজের কাজের ফলে নিজেরাই ভুগছে অসুখে,
সেজন্য এই সুন্দর পৃথিবী আজ ধ্বংসের মুখে।
মানুষ বোঝে না যে একটি গাছ একটি প্রাণ ,
গাছ লাগিয়ে তো মানুষেরই প্রাণ বাঁচান।
নানা রকম বর্জ্য জলকে দূষিত করছে,
জলবাহিত রোগে অনেক মানুষও মরছে ।
তারপরও মানুষ থাকে না সচেতন,
সচেতন না থাকলে সব প্রাণীরই হবে একদিন মরণ।
তাই মানুষকে পৃথিবীর যত্ন করতে হবে ,
কিন্তু সেটা আর হলো কবে?

আদিমা মজুমদার

সকালমনি (অনুগল্প)

আজ কলি- ফোটা প্রভাতে পেশকারের জঙ্গাল দিয়ে হাঁটি। হাঁটি আমি  রোজই। প্রচন্ড গরম পড়েছে। দিন দিন গরমটা  সহ্যের সীমা অতিক্রম করে যাচ্ছে, যেভাবে অরণ্য ধ্বংস করে বড় বড় বিল্ডিং তৈরি করছে সরকার, তার পরিণতি আর বেশি দূরে নয়, অল্পদিনের মধ্যেই অক্সিজেনের হাহাকার পড়বে।

 হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ আমার চোখ আটকে যায় রাস্তার পাশে একটি জায়গায়। যেখানে এ অঞ্চলের  দোকানের সব বর্জ্য পদার্থ এনে ফেলা হয়। দেখি ছায়ার মত একটি বালক ওই বর্জ্যগুলোকে নিরন্তর ঘেঁটে চলেছে। ঘাঁটতে  ঘাঁটতে  তার অভীপ্সার দ্রব্যগুলো তুলে নিয়ে রেখে দিচ্ছে তার আকাঙখার থলেতে।মাঝেমধ্যে খাবার জাতীয় কিছু পেলে মুখেও পুরে দিচ্ছে।

এই কুঁড়ি সকালে সে বেরিয়ে পড়েছে খাদ্য সংগ্রহে, সারা দিনের পেটপূর্তির সন্ধানে। মলিন বসন করুন মুখোচ্ছবি। তার সামনে কিছু সময় দাঁড়ালাম। আমার দিকে চেয়ে বলে খুব ক্ষুদা লেগেছে মাসি। সারারাত ঘুমাইনি। কেন ঘুমাওনি জিজ্ঞেস করতে বলে, মামীর সাথে বিল্ডিং ঢালাইয়ের কাজে ছিলাম। দোকান-পাট খোলেনি  তখনও। বললাম যাবি আমার ঘরে? এক কথায় চলে এলো আমার সাথে। পরিবানুকে ডেকে বলি 'খুব ভালো করে নাস্তা বানাও, আমার ঘরে সকালমনি এসেছেন'। স্নান করে নাও সকাল মনি, বাথরুমে ঢুকে সে ভ্যাবাচেকা  খেয়ে যায়, বলে না না থাক, স্নান করতে হবে না। স্নান করলে খুব আরাম লাগবে, তাকে বুঝাই। আন্দাজ করলাম বাথরুমে হবে না,অভ্যেস নেই।ফুল গাছে জল দেবার কলটা দেখিয়ে, হাতে গামছা সাবান মগ দিয়ে বললাম -কেউ নেই এখানে। ভালো করে স্নানটা করে নাও। তোমার গায়ের কাপড় ওই রশিটায় রেখে দিও। 

আমার ছেলের কিছু কাপড় ঘরে থাকে। যাবার সময় সে অনেক কিছু রেখে যায়, কাউকে দেবার জন্য। একটা টিশার্ট পরতে দিলাম। শার্টের পেছনে লেখা -' তুমি এত ভালো কেন '।সকাল মনি লেখাটা পড়ে নেয়।শার্টটা তার নন্টু পর্যন্ত ঢেকে হাঁটু অব্দি চলে যায়। এই দেখলাম সকাল মনির মুখে হাসি! শব্দ করে হেসে বলে -' মাসি এটা কে লিখেছে ',বললাম প্রিন্টার। তুমি পড়তে পারলে। বলে হ্যাঁ। তুমি স্কুলে পড়ো? মাঝে মাঝে যাই, কখনো মামির সাথে কাজেও যাই। কোন ক্লাসে পড়ো। তৃতীয় শ্রেণী।

                ইতিমধ্যে পরীবানু ডাইনিং টেবিল সাজিয়ে রেখেছে। পরোটা চা অমলেট, আম আনারস ও এক সাইডে কেটে দিয়েছে। সকাল মনিকে নিয়ে নাস্তা করতে বসলাম। বলে আমি চা দিয়ে পরোটা খাব। আচ্ছা ঠিক আছে। তুমি যেরকম ভাল পাও খাও। আমার দিকে চেয়ে বলে, মাসি তুমি লাল চা দিয়ে শুকনা রুটি খাচ্ছ কেন। দুধ চা খাও না? আমার ডায়াবেটিস দুধ চা খেতে মানা করেছে ডাক্তার।

                নাস্তা করতে করতে সকালমনিকে জিজ্ঞেস করলাম, বাড়িতে কে কে আছে? মা বাবা মরে গেছে করোনায়। মামির সাথে থাকি। মামা ও মরে গেছে। মামির এক মেয়ে খুশবু আর আমি, আমার নাম মনি। দুচোখ আমার ভরে যায় জলে।

অমলেটটা  হাতে নিয়ে সে বাবানের ফটোর দিকে চেয়ে বলে অনেক দূরে থাকে বুঝি দাদা,  আসে? চোখের জল আর বাঁধ মানে না আমার, অঝরে ঝরতে থাকে। তুমি রোজ এসে নাস্তা করে যেও সকালমনি। আমি বৃষ্টি দিলে হাঁটতে পারি না। মামিকে নিয়ে এসো একদিন। 

সেদিন থেকে সকালমনির সাথে এক দৃঢ় বন্ধনে জুড়ে যাই। চাইছিলাম আমার কাছে রেখে দেব। মামিও রাজি। বাধ সাধলেন আমার জীবনসঙ্গী, বলেন -দিনকাল ভালো নয়। হিন্দু-মুসলমান দাঙ্গা লাগানোর জন্য কিছু গুন্ডা রাস্তায় ঘুরে বেড়ায়। তোমার ভালো কাজ তারা মেনে নেবে না। তাছাড়া তুমি অসুস্থ, কি দরকার খাল কেটে কুমির আনার।দেখলে না সেদিন প্রিয়াংকা দাসকে ধর্ষণ করে খুন করলো তার প্রেমিক। আর দাঙ্গাবাজরা রাংগির খাড়িতে মুসলমানদের আক্রমণ করতে এসে গেলো।ভাগ্যিস এসপি ভালো ছিল, নাহলে কিয়ামত হয়ে যেতো।

দুই জোড়া শার্ট পেন্ট, একটা শাড়ি এনে ঘরে রাখি। সকালমনিকে কয়েকদিন ধরে দেখিনা, নাস্তা খেতেও আসে না। বাবান ফোন করে সকালমনির কথা জিজ্ঞেস করে। মাঝে মাঝে মিথ্যা কথা বলি । হ্যাঁ নাস্তা খেয়ে যাচ্ছে। কি করি ঠিকানাটাও নেওয়া হয়নি।

 ঝিম ধরে পেছনের বারান্দায় গালে হাত দিয়ে বসে চড়ুইয়ের খুনসুটি দেখছি,  প্রজাপতি লেবু গাছের ফুলে ওড়াউড়ি করছে। নার্সারি থেকে আনা পেয়ারা গাছে নতুন পেয়ারা ধরেছে। কত রকমের জীবন এ জগতে! হঠাৎ আমার পেছন থেকে জীবনসঙ্গী বলেন -আর ছেলেটার জন্য অপেক্ষা করো না, ও আর আসবে না। রোজ রুটি বাসি করার কোনো মানে হয়? 

__ কি বললে? ও যে আসবে না কেমন করে জানলে? 

__আমি ওকে আসতে মানা করেছি।

__ একি কথা! তুমি আমাকে জিজ্ঞেস না করে ওকে মানা করলে কেন।

__  আমার এসব ন্যাকামি একেবারে ভালো লাগেনা। নিজের পেটের ছেলে বিদেশ আর অন্যের বাচ্চাকে নিয়ে তোমার আহ্লাদ, ঘেন্না করে।

               বোবার মত চেয়ে থাকি মানুষটার দিকে। আমি কিভাবে ভাল থাকব, সেটা সে মোটেই বুঝতে চায় না। কি কান্ডটা করলো বলুন তো। 

ডাক্তার এবার হাঁটাও মানা করে দিল। মনে মনে হাঁটি। আর সকালমনিকে খুঁজি। সকাল মনি আমাকে অনেকটা বুঝতো।

         (  দুই)

আজকাল প্রায় রাতে ঘুম ভাঙে। বিছানা ছেড়ে উঠে পড়ি।বাথরুমে ঢুকে বেসিনে মুখ ধুই।হঠাৎ মনে পড়ে রাতের ওষুধ খাওয়া হয়নি।পরিবানুকে কত বলি খাওয়াতে বসতেই একবার বলে রাখবি ওষুধের কথা।সে তার নিজের নামই ভুলে যায়।

ছেলের বউ হাইপ্রেসারের ওষুধটা ঠিকমতো সময়ে খেতে হয় বলে এলার্ম দিয়ে রেখেছে, এবার আসলে বলবো সব ওষুধের এলার্ম দিয়ে রাখতে। 

স্বপ্নে দেখি সকালমনিকে।এক সাথে নাস্তা করছি,সে বলছে ' জানি দাদার জন্য তোমার মন খারাপ। ' সকালমনি আমার মনের কথা বুঝে।যার সাথে ৩৪ বছর ঘর সংসার করলাম সে আমার কী বুঝলো।মাইনের টাকা ছাড়া আর কিছুই বুঝে না।ছোট ভাইকে এনে উপর তলায় রাখলো, সে এখন ঘর ছাড়ে না।ভাইয়ের বউয়ের সাথে দহরম মহরম চলে।বাজারে নিয়ে গিয়ে ভালো শাড়ি চুড়িদার কিনে দেয়। বউকে কোনোদিন নিয়ে যায়নি বাজারে। লজ্জা! বউয়ের রঙ ময়লা।টাকা ময়লা নয়।মনে হয় তাপ্পড় দিয়ে দাঁতগুলো ফেলে দিই।মাটিতে ফেলে লাথালাথি করি, তবে গা জুড়ায়। শুধু সহ্য করি।

আজ মেয়ে নিয়ে গেলো তার রিসার্চ সেন্টারে, বাইরে এতো সুন্দর ফুলের বাগান, হাঁটাহাঁটি করছি, হঠাৎ দেখি সকালমনির মতো একটি ছেলে, বাগানে কাজ করছে, পাশে গিয়ে জিজ্ঞেস করলাম 'তোমার বাড়ি কোথায়, 'সে আমার দিকে চেয়ে চোখ ফিরিয়ে নিল। 

মেয়েকে ফোন দিলাম, বলে 'মা আমি এখন ব্যস্ত আছি' ঘরে গিয়ে বুঝিয়ে বলবো।হ্যাঁ মা,সেই তোমার সকালমনি।

আনন্দে চিতকার দিয়ে বলি, আমার সকালমনিকে পেয়ে গেছি।হাত ধরতেই হাউ হাউ করে কেঁদে ফেলে। সকালমনির মুখ থেকে যা শুনলাম হতবাক হয়ে যাই।মেয়েকে বকতাম, একটা ভালো গুণ পেলি না।সেই মেয়ে সকালমনিকে তাদের ইনস্টিটিউটে চাকরি দিয়েছে। মেয়ের এহেন বিচার-বুদ্ধির গল্প শুনে আমি হেরে গেছি সেদিন।

রূপালী মান্না

ভিতরঘরে  (অনুগল্প)

-"তুমি সব বোঝো, অনেক পাকা মাথা তোমার। আমাকে শুধু শুধু জিজ্ঞাসা করছো কেন?"
-"ও আচ্ছা!"
-"তুমি জানো না আমি এসব পছন্দ করিনা? তাছাড়াও তোমাদের ব্যাপারে পরামর্শ দেওয়ার আমি কে?"
-"তোমার সব কথা, ভালো-মন্দ ব্যাপার আমায় শেয়ার করো অথচ আমি কিছু পরামর্শ চাইলে,কিছু গুরুত্বপূর্ণ কথা শেয়ার করলে তুমি বিরক্ত হচ্ছো? "
-"স্বাভাবিক ব্যাপার! আমার ওতো টাইম নেই।"
-"এই কী হয়েছে বলো তো তোমার? সামান্য কারণে এতো রিয়েক্ট করছো কেন?"
-"জানি না, ভালো লাগছে না। যাও তো..."
-"মন খারাপ?"
-"জানিনা।"
-"এতো ম্যাচুয়র তুমি, সব বোঝো, আর মন বোঝোনা?"
-"ম্যাচুয়র তো হতে হয় শুধু তোমার জন্য।
আমি ম্যাচুয়র না হলে তোমাকে সামলে রাখবে কে? অথচ আমি তো চিরকাল আদুরে, নরম, অভিমানিনী হতে চেয়েছি।"

জগন্নাথ বনিক

মানুষ 

আজও আমি বুঝতে পারিনি,
পৃথিবীতে বেঁচে থাকা মানুষের মন।
ব‍্যস্ত মানুষ ছুটছে আবার,
পথে পান্থরে সারাক্ষণ।।
কখনো হাসে কখনো কাঁদে,
কখনো কর্মে ব‍্যস্ত, এই মানুষ।
সবার শরীরে একই রক্ত,
অথচ - মানুষের মুখগুলো যেন এক একটা মুখোশ।।
দ্বন্দ্ব যেমন মানুষে মানুষে,
চলছে কতো লড়াই।
কত যে প্রভেদ এই মানুষের,
আবার - মানুষ করে, মানুষের বড়াই।।

রমা চন্দ্র

ভাঙা তরী

শীত উৎসব 'মেলা'-
ফুল মেলা ব‌ই মেলা
পিঠে পুলি মিষ্টান্ন মেলা...
মেলা দেখতে লঞ্চ চড়া
উত্তরাবায়ের শাসন কড়া!
মিঠারোদের আদর ঘড়া ঘড়া...
শীতের দুপুর লঞ্চ ডেক ভীড়ে উপচে পড়া,
নদীবুকে আনন্দ স্রোতে ভাসতে থাকা...
পলকে দেখা নদীপাড়ে 'ভাঙা নৌকাখানা'
ভরিয়ে তোলে দীর্ঘশ্বাসে 
হৃদয়খানা এক নিমেষে 
মন চলে যায় ভাঙা তরী পাশে
ভাসিয়ে নিয়ে এক অজানা আবেশে...!
এলোমেলো ভাবনা যত জড়ায় নাগপাশে
হিসহিসিয়ে ফিসফিসিয়ে বলতে থাকে 
মনের কানে কানে 
'জীর্ণ জীবনতরী' ও অপাঙক্তেয় 
আমাদের 'গৃহকোণে'!
মধ্যদুপুর দেখাতে থাকে
আলো ছায়ার খেলা...
জীবনের সারা বেলা-
ঊষা হতে সাঁঝ
সাঁঝ হতে-
মধ্যরাতের ঘন আঁধার মাঝ...!

সঞ্জয় দত্ত

 ছবি

অশ্রু ঢেলে পাথর বানাবো বুক,
তারপর গোলাপের পাপড়ি দিয়ে কুটির সাজাবো।
আয়নায় হৃদয় দিয়ে ছবি এঁকে,
মুছে ফেলবো সুখস্মৃতি,যেখানে বাঁধা ছিল একটা সেতু!

গীতশ্রী ভট্টাচার্য্য

রোদের চুম্বন

শীতের রোদ পায়ে খেলা করে পোষা বেড়ালের মত
রচনা হয় কত আঁকিবুঁকি , জাফরি জাফরি আলপনা।
আমার শীত কাটে প্রেমহীন, তাপহীন; তবু উষ্ণ কিছু
ছুঁয়ে যায় অশরীরী আত্মার মত আলোর জালে জালে।

কেউ বলেছিল, পায়ের ঠান্ডা নিয়ে নেবে তার বুকে
চরণ চুম্বনে শুষে নেবে শরীরের সমস্ত হিম হিম দুঃখ।
কথারা হারিয়ে যায় কুয়াশার চাদরে , ধোঁয়ায় ধোঁয়ায়। 
তবু আমার পায়ের শীতলতা পায়েই থেকে যায়।

এমন শীতে আগুনের পাশাপাশি গলে যেতে ইচ্ছে হয়
রোদের উম উম বুকে নিজেকে সঁপে দিয়ে ঈশ্বরী হতে
বড্ড সাধ হয়! সখা হয়ে কেউ আসেনা পৌষ সন্ধায় 
কাঁধের উপর একটি পশমিনা শাল জড়িয়ে দিতে।
আমার শীত কমেনা, রোদে শুধু পা পুড়ে যায়।


দিপ্সি দে

রিদ্ধির নাভিশ্বাস এবং রাত্রি

দূরতম কোনো সভ্যতায় হলেও তুমি এসো রিদ্ধি,তোমার জন্য দরজা খুলে রাখব। তোমাকেই আবিষ্কার করেছি ছায়াময় শরীরে হেঁটে গেছো বহুবার বুকের ভেতরে।

কবিতা আমাকে যতটা পুড়িয়েছে তার দাগ মুছে দিতে তুমি এসো তোমার জন্য অভিসারের রাতেও আমি মাখতে পারি আতর খুলে রাখতে পারি জং ধরা ব্লাউজের হুক ।

অন্ধকার রাত হলেও তুমিও এসো,সমস্ত দাগ মুছে আমি তোমার কাছে চলে যাব সুগন্ধি রুমাল রেখে কথা দিচ্ছি ,

তুমি এলে সব দরজা বন্ধ করে জেনে নেব মাথুর বালকের নাভিশ্বাস আর ইমন রাগের জন্ম কথা,আমি জানি তোমার ভেতরে সুর জেগে উঠে ,চোখের জল বেয়ে নেমে যায় তমশা।

তবুও তোমার বুক হোক আমার আরাধ্য দেবতা।

অনসূয়া পাঠক

ভোরের শুকতারা 

বাস ছাড়তে তখনো কিছুটা সময় বাকি ছিলো, আমি মা বাবার সাথে বাসের ভেতরে জানালার দিকের সিটটায় বসে আছি। এমন সময় দেখি  আমাদের পাশের সিটে  বসে একজন রবীন্দ্রনাথের সঞ্জয়িতা পড়ছেন, বইটাকে দেখে আমার চোখের সামনে একটা সোনালী ফ্রেমের চশমা পরা মুখ ভেসে উঠলো,  চন্দন স্যারের মুখ। 

বছর পাঁচেক আগের কথা, আমার বাবা তখন জঙ্গলমহল মেদিনীপুরের আমলাশুলির পোষ্টমাষ্টার। দু কিমি দূরেই আমার পিসীমার বাড়ি।  ওখানেই আমার হাইস্কুলে পড়াশোনা শুরু। আর যে স্যার আমার মননে সদা জাগরুক , বাংলা সাহিত্যের বটবৃক্ষ বলা যায় যাকে ,  আমার গল্প যাঁকে নিয়ে সেই চন্দন স্যারকে ওখানেই পাওয়া। 

ফর্সা গায়ের রঙ, মাথায় ক়াঁচা পাকা চুল , সরু গোঁফ চোখে সোনালী ফ্রেমের চশমা , এক কথায় সুদর্লন সত্যবাদী সরল সেই মানুষটিকে দেখলেই শ্রদ্ধায় মাথা নীচু হয়ে আসতো। সবসময় স্যারের হাতে থাকতো পুরানো দিনের একটা হাতঘড়ি , নিয়মানুবর্তিতা শব্দটা যেনো উনার চারপাশে লক্ষ্মনরেখার মতো আটকে। স্যার শীত ছাড়া বাকি সব সময় সাদা হাফ শার্ট ও কালো প্যান্ট পরে স্কুলে আসতেন। স্যারকে দেখে আমাদের মনে হতো বাংলা ভাষাতে এমন কোন গল্প কবিতা নেই যা তিনি জানেন না। সবকিছুই তিনি এতো সুন্দর সাবলীল বর্নময় করে তুলতেন তাঁর পড়ানোর সময় যে আমরা অভিভূত হয়ে যেতাম। অন্য স্যারদের ক্লাশে ঘড়ির কাঁটা যেনো আটকে থাকতো , অথচ বাংলা ক্লাশ কি ভীষণ দ্রুত শেষ হমে যেতো।  ভাবতাম কেনো যে সব ক্লাশগুলোই চন্দন স্যারের হয়না ?  স্যার নিজের বাড়িতে অবৈতনিক একটি কোচিং সেন্টার চালাতেন। যেখানে সবার প্রবেশ ছিল অবাধ। সেখানে যে সমস্ত দুঃস্থ ছাত্র ছাত্রীরা পড়তে যেতো , স্যার তাদেরকে নিজের বেতনের টাকা খরচ করে একবেলা খাওয়াতেন ও বই খাতা কলম কিনে দিতেন। স্যারের ছোট্ট সংসারে তাঁর স্ত্রী এক ছেলে এক মেয়ে নিয়ে খুব সাধারণ জীবন যাপন করতেন। এবং বেতনের বেশীরভাগই খরচ করতেন হত দরিদ্রদের পেছনে। 

 প্রতি রবিবার আমিও স্যারের কাছে পড়তে যেতাম। এমনিতেই বাংলা ছিলো আমার পছন্দের সাবজেক্ট। স্যার আমাকে ভীষণ স্নেহ করতেন। পাঠ্যপুস্তক ছাড়াও আরও নানাধরনের গল্প কবিতা তিনি আলোচনা করতেন। বিশেষ করে রবীন্দ্রনাথ, তিনি যেনো স্যারের আদর্শ। সঞ্চয়িতার অনেক কবিতাই তিনি আমাদের বুঝিয়ে দিয়েছিলেন। স্যার বলতেন পড়াশোনা হচ্ছে জ্ঞান অর্জনের জন্য। মাঝে মাঝে স্যারের স্ত্রী আমাদের জন্য দারুণ দারুণ সব খাবার বানিয়ে দিতেন। স্যারের স্ত্রীর কথাই ছিলো এরাও আমাদের ছেলে মেয়ে। আমিও মাঝে মাঝে স্যারের জন্য মায়ের হাতের বানানো পিঠে ও ছানা শীতল নিয়ে যেতাম। স্যার সবাইকে দিয়ে বেশ তৃপ্তি করে খেতেন। এরকমই বেশ কাটছিল সময়। তারপর একদিন শুনলাম স্যারের মেয়ে সন্ধ্যা দিদির জন্য স্যার একটি পাত্র খুঁজেছেন। ছেলেটি নাকি দেখতে খুব সুন্দর, পাশের থানার সাব ইনসপেক্টার। আমরা শুনে সবাই মহাখুশী। সন্ধ্যা দিদির বিয়েতে বেশ হৈচৈ হবে। কিন্তু সমস্যা হলো যে পাত্র পক্ষ বরপন হিসেবে নগদ দশ লক্ষ টাকা ও একটি ফোর হুইলার চেয়ে বসলো। কিন্তু স্যারের এতো টাকা দেবার মতো সামর্থ্য ছিলো না। স্যার পাত্রপক্ষের কাছে অনেক অনুনয় বিনয় করেও নিস্ফল হয়েছিলেন। এরপর সন্ধ্যাদিদির দেখতে ভালো  হওয়া সত্ত্বেও প্রায় প্রতিটি সম্বন্ধই আর্থিক কারনের জন্য ভাঙতে শুরু করে। তবে এই সাংসারিক সমস্যা স্যারের চলার পথে বাধা তৈরী করতে পারেনি।  স্যারের হাসিমুখ কখনও ম্লান হয়নি। স্যার বলতেন ,জীবনে হতাশার কোন স্থান নেই, জানবে সব থেকে গভীর কালো অন্ধকার রাতের পরেই সোনালি সকাল আসে।

 এর কিছুদিন পর বাবার বদলি হয় বাঁকুড়া সদরে। খুব কষ্ট হয়েছিলো সেই স্কুল লালমাটির গ্রাম আর চন্দন স্যারকে ছেড়ে আসতে। বাবার বদলি হয়েছে শুনে স্যার বলেছিলেন , "দুঃখ করিসনা জানবি আমার আশীর্বাদ সবসময় তোকে আলোর পথ দেখাবে।" যেদিন আমরা সব মালপত্র গুটিয়ে চলে আসছিলাম, বাবা বলেছিলেন চল স্যারের সাথে দেখা করে আসি। কিন্তু আমি পারিনি। চোখের জল লুকিয়ে পারিনি স্যারকে বিদায় প্রনাম করে আসতে।

 আজ পাঁচ বছর পর আবার সেই গ্রামে যাচ্ছি। পিসীমার মেয়ে মালতী দিদির বিয়েতে। ভালো পাত্র। সদ্য ঢুকেছে মহকুমা হাসপাতালে। পিসাবাবু বরপন হিসেবে মেদিনীপুর টাউনে দশ কাঠা জমি হীরের আংটি ও বাড়ির সমস্ত আসবাব দিচ্ছেন। 

এইসব এলোমেলো ভাবনা মাথায় নিয়ে পৌঁছে গেলাম আমলাশুলি বাস স্ট্যান্ডে।  নেমেই দেখলাম পাঁচ বছরে খুব একটা পরিবর্তন হয়নি এলাকার। 

পিসাবাবু স্ট্যান্ডেই ছিলেন। ওখানে পৌঁছে বিশ্রাম নিয়ে মালতী দিদিকে জিজ্ঞেস করলাম চন্দন স্যারের কথা। মালতী দিদি বললো,  স্যার এখন মানসিক ভাবে অসুস্থ , কারো সাথে খুব একটা কথাও বলেননা , মাঝে মাঝে চিনতেও ভুল করেন। বেশীর ভাগ সময় একাই বই হাতে বসে থাকেন।

একটার পর একটা সম্বন্ধ ভেঙে যাওয়া , পাড়া পড়শীর নানান ধরনের কথাবার্তা, বাবার চাপা যন্ত্রণা, মায়ের কান্না সহ্য করতে না পেরে সন্ধ্যা দিদি কাওকে কিছু না বলে একদিন বাড়ি ছেড়ে চলে যায় , শুধু একটা চিঠি রেখে গিয়েছালো , তাতে লেখা ছিল ,  " বাবা , আমি ভোরের খোঁজে যাচ্ছি।" 

অনেক খোঁজাখুঁজি করেও আর সন্ধ্যা দিদিকে পাওয়া যায়নি।  চন্দন স্যারের স্ত্রী এই দুঃখ সহ্য করতে না পেরে কিছুদিনের মধ্যেই পৃথিবীর মায়া ছেড়ে পরপারে পা বাড়ান।  

সব শুনে আমার মন ভীষণ বিষন্ন হয়ে ওঠে। গোটা ঘরে কেমন যেনো অনাকাঙ্ক্ষিত নীরবতা। নিজের অজান্তেই চোখ জলে ভরে যায় আমার। এই নীরবতা ভেঙে বাবা জিজ্ঞেস করলেন, আচ্ছা স্যারের দেখাশোনা এখন কে করেন ? পিসাবাবু উত্তর দিলেন , উনার ছেলে আদিত্য স্থানীয় ব্যাঙ্কে চাকরি পেয়েছে , ওই বাবাকে দেখে। আর থাকতে পারলাম না , ছুটে বেরিয়ে গেলাম স্যারের বাড়ির উদ্দেশ্যে। পৌছে দেখলাম তার বাড়ির গেটে এখনো সাদা মার্বেল পাথরের উপরে লাল কালির সেই লেখাটা, " খুলে দাও দ্বার নীলাকাশ করো অবারিত"।  তবে লেখাটির উপর প্রবহমান সময়ের অস্থিরতার সুস্পষ্ট ছাপ বোঝা যায় ।  বারান্দায় ইজি চেয়ারে উস্কোখুস্কো চুলে একমুখ দাড়ি নিয়ে স্যার বসে , হাতে রবীন্দ্রনাথের সঞ্চয়িতা।  চুপি চুপি গিয়ে প্রনাম করলাম স্যারকে। চোখের জল তখন আর গোপন নেই।  আমার মাথায় হাত দিয়ে আমার হাতে সঞ্চয়িতা ধরিয়ে দিয়ে স্যার বললেন , "তোর জন্যই রেখেছিলাম। তারপর আকাশের দিকে তাকিয়ে ঝাপসা চোখে তিনি বললেন , জানিস রবীন্দ্রনাথকে জানলে গোটা বিশ্বকে জানা যায়।"

অসীম পাঠক

সীমানা 

কল্লোলিনী তিলোত্তমার অভিজাত বেলভিউ নার্সিং হোমের  ইন্টেনসিভ কেয়ার ইউনিটে  শোরগোল পড়ে গেলো, ডাক্তার নার্স সবার ছুটোছুটি।  সিনিয়র ডক্টর মিঃ লাহিড়ী সব শুনে চমকে গেলেন, অস্ফুটে গলা থেকে বেরোলো তাঁর " ইটস এ রেয়ার কেস অফ মেডিক্যাল সায়েন্স "। তারপর স্টেথো টা ঝুলিয়ে রিভলভিং ছেড়ে উঠতে উঠতে বললেন , " ইমিডিয়েট বাড়ির লোকেদের খবর দিন " .....বিশ্বজিৎ মজুমদার কুড়ি বছর কোমাতে। আজ ই রেসপন্স করছেন ।সবাই যখন হাল ছেড়ে দিয়েছে ,জন্ম মৃত্যুর সীমানা থেকে তিনি তখন জেগে উঠেছেন, অবচেতনের সব জাগতিক অনুভূতি থেকে তিনি বাস্তবের আলোয়। 

তপনের মোবাইল বেজে উঠলো , সবে সে ব্যাংক যাবার জন্য তৈরী হচ্ছে, সে একটি বেসরকারি ব্যাংকের জেনারেল ম্যানেজার। আজ একটা ইমপোর্টান্ট মিটিং , নার্সিং হোমের ফোনে সে বিস্ময়ে হতবাক। সবাই আশা ছেড়ে দিয়েছিলো , মায়ের কথা রাখতে ফেলে রেখেছিলো বেলভিউতে, তপন তার স্ত্রী রূপা কে ব্যাপার টা জানালো। তাদের একমাত্র ছেলে তোতন কে তখন স্কুল ইউনিফর্ম পরাতে বিজি রূপা , সবাই হতবাক, তপন তার দিদি অরুণিমা কে ফোন করে সব জানালো। অরুণিমা একটি ইংরেজী সাহিত্যের অধ্যাপিকা, স্বামী অর্ণবও অধ্যাপক তবে রসায়ন বিদ্যার। দুজনেই কলেজ বেরুবার জন্য রেডি হচ্ছিল। অরুণিমা র আজ একটা সেমিনার এটেনন্ড করতে হবে , অর্ণবের ও একজন পাবলিশারের সাথে আ্যপয়েন্টমেন্ট ফিক্সড আছে। আধুনিক রসায়ন নিয়ে তার একটা বই বের করতে চলেজে দেজ পাবলিশিং। সবাই বিস্ময়ে বিমূঢ়। সবার দৈনন্দিন রুটিনে যেনো একটা ব্রেক ছন্দপতন , কুড়ি বছর। সময়ের স্রোতে অনেক জল বয়ে গেছে ,বিশ্বজিৎ বাবুর ছেলে মেয়ে এখন জীবনে প্রতিষ্ঠিত , ঘোর সংসারী , বাবা কে ছাড়া  তাদের কুড়ি বছর অতিক্রান্ত। বাবার শ্বাস কুড়ি বছর ধরে চললেও বাবা তাদের কাছে মৃত। তাদের মা পূরবী দেবী দু বছর আগে গত হয়েছেন। স্কুল শিক্ষিকা পূরবী দেবী যতোদিন বেঁচে ছিলেন তাঁর স্বামীর চিকিৎসার ব্যয়ভার বহন করেছেন ।আত্মীয় বন্ধু রা বারংবার বলেছেন , " এটা ঠিক হচ্ছে না , উনাকে মুক্তি দাও।  তাছাড়া এতো টাকা পয়সা জলের মতো খরচ হচ্ছে " ,পূরবী দেবী সে সব কথা ভ্রুক্ষেপ না করে বলতেন " যতোক্ষণ শ্বাস ততক্ষণ আশ , আমার সিঁথির সিঁদুর অক্ষয় হোক বলবে কোথায় , তোমরা তা মুছে ফেলতে চাইছো "। কেও আর কথা বাড়াতো না কষ্ট করে মানুষ করেছিলেন মেয়ে আর ছেলেকে।

বীমা কোম্পানির উচ্চ পদস্থ অফিসার  বিশ্বজিৎ বাবু র ছিলো সুখী স্বচ্ছল পরিবার । হঠাৎই একদিন দুর্ঘটনা। এক বৃষ্টি স্নাত গভীর রাতে বর্ধমান হাইওয়ে ধরে কোলকাতা ফিরছিলেন একটা সেমিনার সেরে , বিশ্বজিৎ বাবু গাড়ি ড্রাইভ নিজে করতেন ।সেদিন ছিলো তাদের বিবাহবার্ষিকী। বেরুণোর ইচ্ছে ছিলো না , কিন্তু বিধি বুঝি বাম। স্ত্রী পূরবী দেবীর জন্য লাল গোলাপ আর হীরের আংটি কিনে রেখেছিলেন। জীবনের অনেক ঘাত প্রতিঘাত , চড়াই উৎরাই পেরিয়ে তাঁরা একে অপরের পরিপূরক হয়ে উঠেছিলেন।  সাত পাঁচ ভাবতে ভাবতেই এক মালবাহী লরির ধাক্কায় দুর্ঘটনা। জীবন বীমার আধিকারিকের নিজের জীবন গভীর সংকটে। পুলিশই বিশ্বজিৎবাবুকে হাসপাতালে ভর্তি করে তাঁর গাড়ির কাগজপত্র দেখে বাড়িতে খবর দিয়েছিলেন।  তখন বিশ্বজিৎ বাবু র বয়স চুয়াল্লিশ  ,ডক্টর বলেছিলেন আশা কম , ইন্টারনাল হেমারেজ এতো বেশী , নিউরো সার্জন ডক্টর লাহিড়ী বলেছিলেন , " আমি  অপারেশন করবো তবে যতোক্ষণ না জ্ঞান ফেরে বলা যাবে না , ঈশ্বর কে ডাকুন "। সেই থেকে ঈশ্বর ই যেনো রক্ষা কর্তা পূরবী দেবীর। মেয়ে পনেরো  ছেলে বারো, কি করবেন পূরবী দেবী .... তপন তো বাবার ভালোবাসা সান্নিধ্য কিছুই বোঝেনি , মেয়ে অরুণিমা বাবার এই দুর্ঘটনা কিছদিন ভূলতে পারেণি। পূরবী দেবীর ছিলো একটা কঠিন লড়াই। ইস্পাত কঠিন মানসিকতা নিয়ে তিনি ডুবন্ত তরী কে রক্ষা করেছিলেন , বছর দুই আগেও এরকমই এক গ্রীষ্মের সকালে স্বামীর সুস্থতা কামনায় দেবী কালীর আরাধনা করে প্রসাদী জবা ফুল স্বামীর মাথায় ঠেকিয়ে বাড়ি ফিরতে ফিরতেই স্ট্রোক এ মারা যান। আজ পূরবী দেবী বেঁচে থাকলে তাঁর অনন্ত প্রতীক্ষা , তাঁর কষ্টের ফসল ,সাধনার ধন কে দেখে যেতে পারতেন, সময় বড়ো নিষ্ঠুর।

বিকেল পাঁচ টা ডক্টর লাহিড়ী র চ্যাম্বারে তপন অরুণিমা দুজনেই হাজির , সকালে খবর পেয়েও কারো সময় হয় নি । লাহিড়ী বলেন  " সাবধানে রাখতে হবে উনাকে যেনো কোনরকম শক না পান" ...... অরুণিমা বলে , "কি করে সম্ভব ডাক্তার বাবু , মা মারা গেছেন এটা কি করে বলবো ? উনি তো মা কে দেখতে চাইবেন।" এই সময় নার্স এসে বললো পেশেন্ট একদম নর্মাল , জুস দেওয়া হয়েছে , বাড়ির লোক দেখা করতে পারেণ।

কুড়ি বছর পর বিশ্বজিৎ বাবু জেগে উঠে দেখলেন এ জগত মিথ্যা নয় ,স্বপ্ন নয় .... এতোদিন তিনি যেনো ঘুমের মধ্যে আচ্ছন্ন ছিলেন  স্ত্রী প্রিয়তমা পূরবী তাঁর মাথার কাছে দাঁড়িয়ে নীরবে চোখের জল ফেলতেন ,তিনি সব দেখতে পেতেন , তিনি যেনো চিৎকার করে বলতে চাইতেন , কেঁদো না , এই তো আমি , জীবন মৃত্যুর সীমানা য় দাঁড়িয়ে থাকা এক সৈনিকের মতো অতন্দ্র কড়া প্রহরায় তিনি ছিলেন আবিষ্ট। মেয়ে অরুণিমা কাঁচের দরজা র ওপার থেকে বাবা কে দেখে যেতো,  বিশ্বজিৎ বাবু স্নেহের সুরে যেনো ডাকতেন , আয় মা কাছে আয়। কেও তাঁর ডাক শুনতে পেতো না , কি অসহ্য যন্ত্রণা হতো , কতো অসহায় লাগতো নিজেকে ,শ্বাস যেনো বন্ধ হয়ে আসতো ...... বিশ্বজিৎ বাবু যেনো নির্জন জনমানবহীন এক পরিত্যক্ত নিরালা দ্বীপ এ নির্বাসিত ছিলেন বহুকাল।

অরুণা তপন সহ ডক্টর লাহিড়ী বিশ্বজিৎ বাবুর কেবিনে এসে দাঁড়ায়। বিশ্বজিৎ বাবু চিনতে পারেণ না তাদের। ডক্টর লাহিড়ী পরিচয় করিয়ে দেয় , নিয়তির কি নিষ্ঠুর পরিহাস।তাঁর রক্ত যাদের মধ্যে প্রবাহিত তাদের সাথে পরিচয় করতে হচ্ছে অপরজনের মধ্যস্থতায়, হঠাৎ ই তিনি পূরবী দেবীকে ডেকে ওঠেন ,সবাই নিশ্চুপ - " পূরবী কোথায় , কেমন দেখতে হয়েছো তুমি ?" ডক্টর লাহিড়ী এগিয়ে আসেন কাছে , পালস রেট নর্মাল , অক্সিজেন ও খোলা আছে , একটা ঘুমের ইন্জেকশন রেডি করতে বলে , বিশ্বজিৎ বাবুর হাতটা নিজের হাতে তুলে নিয়ে বলেন , উত্তেজিত হবেন না , বিশ্বজিৎ বাবু উৎকণ্ঠা য় চিৎকার করে বলেন , "কি হয়েছে পূরবী র ?"  তপন আর পেরে না ওঠে বলে , মা নেই। গোটা ঘর নিস্তব্ধ, একটা আর্ত চিৎকার বিশ্বজিৎ বাবুর  " ওঃ ভগবান " তারপর ই সব চুপ ...... বিশ্বজিৎ বাবু সীমানা পেরিয়ে গেলেন , কোলাহলমুখর  সন্ধ্যায় বিশ্বজিৎ বাবু পূরবীর সন্ধ্যা শিথিল আলাপে মগ্ন যেনো , ক্ষনিকের এপার জীবনকে চেনালো - ওপারেই যেনো প্রশান্ত শান্তির ক্ষীণ রেখা ক্রমেই প্রস্ফুট ।।

মীনাক্ষী চক্রবর্তী সোম

আলোকবর্তিকা

বিষাদ প্রতিমার মত অনুভূতিহীন সকাল 
কোন প্রত‍্যাশার আলো জ্বালে না আর
অনুসরণের পথ একসময় বেঁকেই যায় 
তখন অনন্ত পথ ডেকে যায় বারবার 
আশারা দলবদ্ধভাবে সহযাত্রী হয়ে চলছিল 
এক এক করে নেমে যায় মাঝপথে ওরা
মাঝিহীন জীবনতরী টাল খেয়ে যায় অজান্তেই 
ক্লান্ত দু-চোখ খোলা থাকে কারো অপেক্ষায় 
মরুতৃষ্ণা নিয়ে পথিকের অনন্ত যাত্রাপথে মেরুপ্রভা যেমন ছড়ায় আভা
চাঁদ, সূর্য আর অসংখ্য তারারা জেগে থাকে 
সেরকম সময়ে আলোকবর্তিকা নিয়ে এগিয়ে যায় 
ভগীরথের মত কোনও এক উজ্জ্বল প্রজন্ম
ওরা ব‍্যস্ত থাকে নতুনের আবাহনে অথবা উদযাপনে।।

চান্দ্রেয়ী দেব

অস্তরাগের রবি

অবুঝ মনে জমাটবাঁধা অভিমানের ইচ্ছে ধারা
আমায় প্রতিনিয়ত ডুবায় ও ভাসায়
নদীর কূলে অস্ত রাগের রবির স্পর্শে
তার নামের অক্ষর যেন.... 
রক্তিম বর্ণে দেখতে পাই গগনের অভ্যন্তরে
বিকেলের শেষ বেলায় আঁধার আসে ঘনিয়ে
জোনাকিরা ঘর সাজায় আপনমনে আলোকধারা দিয়ে
পূর্ণিমার জোছনামাখা রাত....... 
ছুঁতে চায় অভিনিবেশে আড়াল থাকা অভিমানের গাঁয়ে
ঝলমল করে জ্বলতে থাকা সন্ধ্যাতারা
আমার দ্বারের সম্মুখে এসে দাঁড়ায়... আর বলে
"কতদিন পথপানে চেয়ে থাকবি অভিমানের পরশ নিয়ে
এ পথ যে ভীষণ দৃঢ়
চলতে হবে একলা হয়েই... "

কাজল মৈত্র

আলো

বাতাস কামড়ে ধরে আলোর শিখা
এ যেন জোনাকির শাখা প্রশাখা
নৈশতায় কেঁপে ওঠে এক টুকরো আলো
শ্বাসরোধী তন্দ্রাহীন শূন্যতা মোড়া এক কালো
আলো মানে শিক্ষা এগিয়ে যাওয়া সভ্যতা
আলো মানে অন্যপ্রান্তে সোনালী এক বার্তা ।

সুমিতা চৌধুরী

ফিরে দেখা সময়ের বাঁকে

ফিরে দেখা সময়ের বাঁকে ফেরারী স্মৃতিরই ডাক,
কত কি পূর্ণতা-অপূর্ণতায় রয়ে গেল ভাঁড়ার জুড়ে।
একদিকে জমেছে কিছু অমূল্য পাওয়া জীবনের পরিসরে,
তেমনই হারানো কিছু দুর্লভ সম্পদ, রেখে গেল আজীবনের রিক্ততায় ভরে।

সময়ের বালি ঘড়িকে রোখা যায়নি এতোটুকু,
মুঠো গলে ঝরে পড়েছে অবিরাম, অবিচ্ছেদ্য। 
সাথে নিয়ে কিছু সুখ-দুখের পসরা,
মনের খাতায় সাক্ষর রেখে গেছে নিজ দলিলের অনবদ্য। 

মনের ক্যানভাসে কোথাও  আশমানী রঙের ছাপ,
স্বপ্ন ডানায় উড়াল দেওয়ার আহ্বানে।
কোথাও বা ধূসর প্রলেপ, কুয়াশাচ্ছন্ন দৃশ্যহীনতা,
 আগামী পথের অন্তরায় হয়ে  এক অলিখিত ফরমানে।

তারই মাঝে কিছু মন জমিতে সেঁচা চারার অঙ্কুরোদ্গম, 
যত্নে বাড়ছে পরম মমতার লালনে, 
কিছু অযাচিত আগাছা-পরগাছার ঝাড়
নাশ হয়েছে, আজন্মের মূল উৎপাটনে।

যাকিছু সময়ের গচ্ছিত ধনরাশি,
স্মৃতির ভাঁড়ারে সবই আজন্মের সঞ্চয়।
কিছু তার সুখযাপন, অম্লান অক্ষয়,
কিছু দুঃসময়, বুকে বয়ে নিয়ে আপন শিক্ষার পরিচয়।।

প্রিয়াঙ্কা দেবনাথ

তুমি আছো বলেই

আমি হেঁটে যাবো অনন্তকাল 
এই পথ ধরে ,
রক্তমাখা দুই পা নিয়ে
কাঁটায় কাঁটায় বিদ্ধ হবো,
শুধু তোমার দেখা পাওয়ার আশায়।

শত আলোকবর্ষ দূরত্ব কাটিয়ে
আসতে যেন পারি,
যতোই কঠিন হোক সে পাড়ি
আমি জানি,
হারতে দেবেনা আমায় তুমি।
তুমি আসবে , হাথ রাখবে মাথায়

যে পথে চেয়েছি হারিয়ে যেতে,
সে পথ চায়নি আমায়।
হয়তো অনেক যুদ্ধ বাকি
চলতে পথের বাঁকে।
ধরে আছি হাল , দিগন্তে চোখ
তুমি আছো সেই ভরসায়।

মনোরঞ্জন ঘোষাল

তোমাকে নিয়ে

তোমাকে নিয়ে কিছুটা সময় 
কাটাব ভেবেছিলাম,

হালকা শীতের উত্তরে হিমেল হাওয়ার
সকাল, পেরিয়ে রোদ ঝলমলে দুপুরে।

বাধা হল সময়ের নির্ঘন্ট!

এ কাজ ও কাজ সব-
এসে পড়ল পর পর,
দুপুর গড়িয়ে বিকেল হয়ে গেল, তবু
তোমার সঙ্গে দু দণ্ড বসার সময় 
আর হল না।

বুঝিনা এ সময়ের অবহেলা, নাকি
তোমার গোপন অনীহা!

লালন চাঁদ

কল্পতরু ভাবনা

কবিতার ছন্দ আঁকি
হৃদয়ে নৌকো বোঝাই নদী
তোমাকে চেয়েছিলাম। যদিও বয়েস এখন ভাটি

রাত পেরুলে বয়েস বাড়ে
মরুতৃষা মন
দিন যায়। রাত আসে
বিবস্ত্র কথার মাঝে প্রতিদিন নিজেকে করি খুন

জল ছলছল কথা
উচ্ছল হাওয়া। উড়ন্ত বসন 
কল্পনায় ভাবি তুমি আমি কফি হাউস দুজনই

কল্পনা আছে
তাই বাঁচি
তোমাকে নিয়ে ঘর গড়ি। ঘর সাজাই
কল্পনায় পাড়ি দিই তোমার বুকের ভেতর

নন্দিতা ভট্টাচার্য্য

প্রশ্নচিহ্ন

সুন্দর সাজানো বাগানে
প্রাচীন প্রাণের স্পন্দন
থেমে যায় চুপিসারে
অধিকারের দাবী
কখন যেন
সসংকোচে নিজেকে গুটিয়ে নেয় 
গুছিয়ে রাখা কবিতার পাতাগুলো
হাওয়ায় ভাসে
দীর্ঘশ্বাস হয়ে 
পুরানো গন্ধ , পুরানো কথা  ‌‌            
লুকায় বুকের ভিতর 
সযত্নে লেখা ভালোবাসার পদাবলীতে 
আজ 
অসংখ্য প্রশ্নচিহ্ন