Apr 2, 2024

কল্যাণী ভট্টাচার্য

গল্প

সত্যিকারে বাণী বন্দনা

তিনটি রুটি আর জল খেয়ে মোহন আর তার বৌ অনিমা এবং ছেলে জগাই শুয়ে পড়ল। ওরা খুব গরীব। মোহন প্রতিদিন ভোরবেলা কাজে বেড়িয়ে যায় সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরে। যা রোজগার হয় তাতে সংসার চালাতে কষ্ট হয়। কিন্তু তাদের ছেলে জগাই সারাদিন বাঁশি বাজিয়ে মাঠে মাঠে ঘুরে। বাঁশিকেই সারাজীবনের সঙ্গী করে নিয়েছে ধ্যান জ্ঞান সব। মোহন পান্তাভাত খেয়ে রাগে গজগজ করতে করতে কাজে বেড়িয়ে গেল। সেদিন ছিল সরস্বতী পূজা। জগাই ভোরবেলা উঠে স্নান সেরে বাঁশি নিয়ে বেড়িয়ে পড়ল। মায়ের পিছু ডাক কে শুনে।

উচ্চ মাধ্যমিকের গন্ডী পেরুনোর পর জগাই এর আর কলেজে পড়া হয় নি। কিন্তু সে বাঁশি ছাড়ে নি। বহু কষ্টে সে গিরিধারী বাঁসুরিয়ার কাছে তালিম নেয়। জগাই আস্তে আস্তে সেরা বাঁসুরী হিসাবে পরিচিত হলো। মনে হতো তার গলায় স্বয়ং দেবী সরস্বতী নেমে এসেছেন। জগাই বেশি হৈচৈ পছন্দ করত না। তার পকেটে সবসময় সরস্বতী মায়ের ছবি থাকত। সেদিন তাদের পাড়া তে সরস্বতী পূজা হচ্ছিল। কিন্তু জগাই সেই পূজায় না গিয়ে তাদের গ্রামের মাঠের বাইরে একটি বটগাছ ছিল। সেখানে গিয়ে জগাই তার পকেট থেকে সরস্বতী মায়ের ছবিটা বের করে সেই বটগাছের নীচে বসিয়ে ধূপদীপ জ্বালিয়ে একাগ্রচিত্তে বাঁশি বাজিয়ে চলছে। বাঁশির অপরূপ সুরের টানে পাড়ার পূজার প্যান্ডেল ছেড়ে সব লোক এসে জগাইর সামনে দাঁড়ালো। জগাই কে ঘিরে ধরল। সে কি অপরূপ দৃশ্য। জগাই এর কোনদিকেই কোন খেয়াল নেই। তার চোখ দিয়ে জলের ধারা বইছে আর সে এক মনে বাঁশি বাজিয়ে যাচ্ছে। মনে হচ্ছে আকাশ বাতাস যেন মাতাল হয়ে উঠেছে তার সুরঝঙ্কারে।

তনুশ্রী বৈদ্য

 একটা মন

একটা মন কলির মতো, ওলির মতো, 
একটি নদের পলির মতো
পাখ-পাখালীর উধাও উধাও পরিশ্রান্ত প্রহর, 
উথাল পাথাল ধানসিঁড়ি তরঙ্গ নিটোল নহর, 
শ্যামল খামার বায়ুর ছলে সুরের বহর;
একটা মন লতিকার মতো, লজ্জাবতীর পাতার মতো
বহু কথকতার মতো। 
ঝুমুর ঝুমুর ঝাউয়ের মালা দুপুর বেলা
বহুদূর অঁচল আলোর পাড় সাগর বেলা
ঝোপঝাড় ও ঝিল জোনাক জোনাক তারার মেলা;
একটা মন ফুলের মতো,একটি নদের তীরের মতো
বট-পাকুড়ের মূলের মতো। 
রাঙামাটির স্বপন সতেজ সুখদ পাহাড়, 
মন মাতানো একটি নদের এপার ওপার, 
একটা মন ময়দানের মতো, পল্লীগায়েঁর হাতলের মতো, 
নৌকা বাঁধা ঘাটের মতো
একটা মন কলির মতো, ওলির মতো, 
একটি নদের পলির মতো।

সুচরিতা পাটারী

১. নীরবতা

কোলাহলে নীরবতা যেমন করে আসে,
তোমার কঠিন অসুখ হলে,
আমার সুখ যায় রসাতলে, 
তেমন করেই নীরবতা তখন আমায় গ্রাসে।।

২. প্রেম-ভ্রম

যে জখম কিনেছিলাম সামান্য কিছু দামে,
কখনো গুজব হতে,
নয়তো তীব্র অপেক্ষাতে,
সেসব আজ মিলিয়ে গেলো তোমার প্রেম-ভ্রমে।।

রীতা চক্রবর্তী (লিপি)

ভ্রমণ ডাইরি  

আলেপ্পি

সত্যি জীবনতো নয় যেন এক যুদ্ধ। হুঁচোট খেতে খেতে এগিয়ে চলা বই আর কিছু নয়!জীবন পথে চলতে চলতে যুঝতে যুঝতে হঠাৎ নানা ধরনের ঝড়ের আবির্ভাব হয় আর সেই ঝড় যখন শান্ত হয় তখন দেখি নিজেই কবে নিজের সব স্বকীয়তা নিজস্বতা ভালোলাগা সব হারিয়ে ফেলেছি। আজ কলম হাতে বসে এমন অনুভূতি আবার নূতন করে উপলদ্ধি করলাম। কিন্তু লিখা যে আমার নেশা!!আর আমি আমার কিছু বন্ধুদেরকে কথা দিয়েছিলাম কেরালা নিয়ে  "ভ্রমণ ডাইরি" লিখব তাই আজ বন্ধুদের জন্য অগোছাল এলোমেলো কিছু কথা লিখে দিলাম ধূলো জমে পলি পড়ে থাকা স্মৃতির ভান্ডার  হাতড়ে হাতড়ে।

       বহু বছর আগে পুজোসংখ্যা নবকল্লোলে একটি উপন্যাস পড়েছিলাম,নাম ছিল "কায়েলের জলে"।কার লেখা আজ আর মনে নেই (প্রফুল্ল রায় নয়ত সর্বাণী মুখোপাধ্যায়)।উপন্যাসটির পটভূমিকা ছিল সুন্দরী আলেপ্পির কালোজল ব্যাকওয়াটার ঘিরে। হাউজবোটে একদিন একরাতের গল্প। পড়ে মুগ্ধ ও আপ্লুত হয়েছিলাম। জীবনে একবার কায়েলের কালো জলে ঘুরে বেড়ানোর ছোট্ট একটি ইচ্ছা মনে মনে পোষন করতাম সবসময়। আমার এ ইচ্ছাটি বাড়ির সবাই জানতেন। তিনি বলেছিলেন নিয়ে যাবেন আমায়। আমরা যখন ২০১০ সালে সমগ্র দক্ষিণ ভারত ভ্রমণ করেছিলাম তখন কোভালম বিচে একরাত বেশী থাকার দরুন আলেপ্পি যাবার আর সময় হয়ে উঠেনি,তাই এবারে যখন ছেলে টিকিট কেটে এসে বলল মা তোমাকে তোমার প্রিয় উপন্যাসের শহরে নিয়ে যাব এবার,তখন কিন্তু আমি মুখে কিছু না বললেও মনে মনে খুশিতে আনন্দে হাততালি দিয়ে উঠেছিলাম একান্তে।

                   অগত্যা সেইদিন এলো। আমরা বেঙ্গালুরুকে ট্রেনজিট কেম্প বানিয়ে সেখান থেকে সব রকম সুযোগ সুবিধা থাকা অত্যাধুনিক রাতের বাসে চড়লাম রূপসী আলেপ্পির উদ্দেশ্যে। রাস্তা খুব ভালো।  বাস ছুটে চলল হু হু করে। কিন্তু তবু সারারাত একটুও ঘুম হলো না উত্তেজনা ও আনন্দে।  সেদিন আবার দেখলাম আঁধারের বুক চিড়ে এক নূতন সূর্যোদয়,এক নূতন দিনের শুভারম্ভ। এক নতুন সকালের আত্মপ্রকাশ। ভোরের স্নিগ্ধ বাতাসে সবেমাত্র একটু তন্দ্রাচ্ছন্ন হয়েছি অমনি চোখ মেলে দেখি আলেপ্পি পৌঁছে গেছি আমরা।

            জানতাম স্বর্গের মত সুন্দর কেরালাকে ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক ট্র্যাভেলার বিশ্বের দশটি স্বর্গ রাজ্যের একটি হিসাবে ঘোষনা করেছে।সত্যিই প্রকৃতিদেবী ওখানে তাঁর রূপের মাধুরী দুই হাত উজার করে অকাতরে ঢেলে দিয়েছেন। পাহাড় সমুদ্রের সমাহারে মনে প্রকৃতি প্রেমের নেশার ঘোর লেগে যায়। ভ্রমণ পিপাসু মনে পরম তৃপ্তি অনুভব হয়।

             সমুদ্র নদী লেক আর অজস্র খাল আলেপ্পি শহরটিকে ঘিরে রেখেছে। রূপসী আলেপ্পিকে প্রাচ্যের ভেনিস বলা হয়। শহরটির একপাশে আরব সাগর অপরপাশে ভেম্বানাদ লেক ও মাঝে ৬৫টি খাল ১২টি গ্রামের বুক চিড়ে মোহনায় গিয়ে মিশেছে। ঈশ্বরের নিজের দেশ বুঝি কেরালা, যারজন্য প্রকৃতিদেবী তার রূপের পসরা থরে বিথরে সাজিয়ে রেখেছেন।

              বাসের টিকিটের অসুবিধার জন্য ছেলের বন্ধু রাজা একঘন্টা আগেই আলেপ্পি পৌঁছে একটি হাউজবোট সারাদিনের জন্য ভাড়া করে নিয়েছিল। বাস থেকে নেমে একটি অটো নিয়ে আমরাও সেথায় পৌঁছে গেলাম আর অমনি আমার খুব মন খারাপ হয়ে গেল। কারণ হাউজবোট যেথায় নোঙর করা আছে সে জায়গাটা আমাদের এখানকার ভরলুর নালার থেকে বেশী কিছু নয়। কচুরিপানায় ভরা নোংরা শ্যাওলা পড়া কালো জল থেকে দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছিল। তবু এসেছি যখন দেখেতো যাবই। মন খারাপ নিয়েই হাউজবোটে উঠে বসলাম। বোট একটু চলার পরই নোংরা খাল থেকে বেড়িয়ে অগাধ জলরাশিতে পাড়ি দিল আর আমার মুখ থেকে বেরিয়ে এলো আহা কী অপূর্ব!! সেথায় জলের রং গাঢ় সবুজ,দুইপাশে অসংখ্য নারকেলবিথি মালার মত জলের উপড় নুয়ে পড়ে আদরে সুহাগে লেকের জলকে জড়িয়ে আছে। গাছের ছায়ায় দূর থেকে লেকের জল একেবারে কুচকুচে কালো লাগছিল। কি অপূর্ব নয়নাভিরাম দৃশ্য সেথায় তার বর্ণনা দেবার শক্তি আমার কলমের নেই! কিন্তু আমিতো জাতিস্মর নই! তবে কেন আমার মনে হচ্ছে এমন অপরূপ প্রকৃতির রূপ আমি আগেও কোথাও দেখেছি! অমনি ছেলে বলল, মা আমাদের বাড়িতে যে ১২ পাতার একটি ক্যালেন্ডার আছে সেগুলো তারমানে সবই আলেপ্পির ছবি আর আমিও মনে মনে আশ্বস্ত হলাম। যাক তবে আমি জাতিস্মর নই।😁

      বোট ভেসে চলল দিগন্ত বিস্তৃত অপার জলরাশিতে।  যতদূর চোখ যায় শুধু জল আর জল। উজ্জ্বল সূর্য রশ্মিতে জলে নীল রঙের বিচ্ছুরন হচ্ছে। জলের নীল দিগন্তে পাড়ি দিয়ে আকাশের নীলে গিয়ে মিশে গেছে। লেকের দুপাশে সহজ সরল শান্ত গ্রাম্য জীবন বয়ে চলেছে। বেশীর ভাগ লোকেরই জীবন ও জীবিকা এই লেককে ঘিরে। আমরা দুপুরের খাবার ও বিকেলের  চায়ের পর্ব সেরে পাঁচটার পর আবার ডাঙায় উঠে এলাম।

            আলেপ্পি বিচের উপর আগে থেকে বুক করে রাখা হোটেল বিচ রিসর্টে আমরা যখন পৌঁছলাম তখন আরেক চমক হল,লাজুক সূর্য তখন লজ্জায় রাঙা হয়ে আকাশের গায়ে লাল রঙ ছড়াতে ছড়াতে সমুদ্রের জলে টুপ করে মুখ লুকিয়ে নিল। তারপরই ঝুপ করে আঁধার নামল। দেখে মুগ্ধ হলাম। এক লহমায় সারাদিনের সব ক্লান্তি যেন দূর হয়েগেল।  অপূর্ব এক ভালোলাগার অনুভূতি নিয়ে সন্ধ্যেবেলাটা হোটেলেের ব্যালকনিতে বসে সমুদ্রের ঢেউ গুনে গুনে  কাটিয়ে দিলাম। পরদিন শিকারাতে ভ্রমণ করলাম।  শিকারা যখন লেকের জলে অসংখ্য ফোটে থাকা পদ্ম বনের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছিল, আমার মনে হচ্ছিল বুঝি স্বর্গের পারিজাত সৌন্দর্য বিছিয়ে রেখেছে লেকের জলে। শিকারাটির নাম ছিল ময়ূরপঙ্খী আর ময়ূরপঙ্খী পাল তোলাই ছিল শিকারাটিতে। ময়ূরপঙ্খী সেদিন আমাদের নানা গ্রামের ভেতর দিয়ে নিয়ে জঙ্গলের ভেতর একটি খাবার হোটেলে নামিয়ে দিল দুপুরের খাবারের জন্য। ওখানের মূল আকর্ষন ছিল একটি মস্ত বড় ঈগল, যাকে নিয়ে পর্যটকরা মনের আনন্দে ছবি তুলছিল। আমরাও কিছু ছবি তোলে নিলাম ঈগলকে সাথে নিয়ে। এরপর সেখান থেকে আলেপ্পি বিচে চলে এলাম সূর্যাস্ত দেখব বলে। সমুদ্র সৈকতে সোনালি বালুতটে তখন সামাণ্য ভীড় লেগে গেছে। আমরও  সেই ভীড়ে সামিল হলাম। বাতাসের দাপটে টলটলে নীল জলে সাদা ঢেউয়ের হুটোপাটি চলছে। উচ্ছল সমুদ্র তখন উত্তাল তরঙ্গে মেতে উঠেছে। আকাশের মত নীল সমুদ্রে দেখতে পেলাম পেঁজা তুলোর মত সাদা ঢেউ। সমুদ্রের শরীরে রামধনুর সাত রং ছড়িয়ে পড়ার দৃশ্য সোনালি বালুতটে আলেপ্পি বিচে প্রথম উপভোগ করলাম। সাতরঙে রঙিন ,'বেনীআসহকলা' রঙে রঙে হাত ধরাধরি করে যেন সমুদ্রের জলে নেমে এলো আলোর বিচ্ছুরণ ছড়িয়ে দেবে বলে। ধীরে ধীরে অস্তগামী সূর্য সমুদ্রের জলে নাইতে নেমে ডুব দিয়ে দিল। পরদিন সকালে আবার সদ্যস্নাত নতুন সূর্যের আবির্ভাব হবে। সূর্যাস্তের প্রতি মুহুর্তের ছবি রাজা কেমেরায় বন্দী করল। সমুদ্রকে বিদায় সম্ভাষন জানাতে কাছে যেতেই তড়িঘড়ি সমুদ্র এসে আলতো ছোঁয়ায় পায়ের পাতা ভিজিয়ে বিদায় জানিয়ে দিল। আমরাও পরম সুখস্মৃতি নিয়ে হোটেলে ফিরলাম ভোরের বাস ধরব বলে।

          সেদিন দক্ষিনের ভ্রমণ শেষে বিষন্ন মনে যখন বাড়ি ফিরছিলাম তখন আবার অন্তরের অন্তঃস্থলে রবি ঠাকুরকে অনুভব করলাম  আর আমি মনে মনে আউড়ে চললাম.....

             " যাবার দিনে একথাটি বলে যেন যাই
             যা দেখেছি যা পেয়েছি তুলনা তার নাই।"

অলকা গোস্বামী

শালবনের বাঁশি

গভীর অভ্যাস বিস্তৃত জীবন,
নিজেকে শীতল পাটির মত গুটিয়ে নেয়
যাবার বেলা। কখনো বা 
শেষ কথাটুকুও বলা হয় না।
অগোছালো পংক্তিমালা ডায়েরি থেকে ছড়িয়ে পড়ে
সারা ঘরময়।
শুকনো পাতা ঝরিয়ে 
দেয়াল ঘেঁষে দাঁড়িয়ে ছিল যে গাছটি....
দেখলাম তার সমস্ত শরীর জুড়ে সবুজ পাতার ছয়লাপ।
 চৈত্রের উষ্ণ বাতাসে  
আকাশের কোনে মেঘ জমে
ঝরে বৃষ্টি ....
জীবন ক'টি আর! দূরে শালবনে বাঁশি বেজে যায় আজো....।

দীপক রঞ্জন কর

বাঁশের সাঁকো

দুই গাঁয়ের যোগ সাধনে
নিয়ত তুমি থাকো
দুই টিলার মাঝে ছড়ায়
বাঁশের তৈরি সাঁকো ।

গ্রীষ্ম বর্ষায় শরৎ শীতে 
সদা দাঁড়িয়ে থাকো
দুই গাঁয়ের লোকের মাঝে
মিলন বজায় রাখো।

বর্ষাকালের জলে ভরাট 
ছড়ার দুটি পাড়
গাঁয়ের লোকের চলাচলে 
বাহারি দৃশ্য তার ।

বাঁশের খুঁটি বাঁশেই চটি
বাঁশ বিছানো খাসা
বৃদ্ধ শিশু গবাদি পশুর 
নিত্য যাওয়া আসা ।

আজ আর যায়না দেখা
বাঁশের তৈরি সাঁকো 
লোক পারাপারে নিত্য তুমি 
স্মৃতিতে বেঁচে থাকো‌ ।

অপর্ণা পোদ্দার সাহা

সাম্য

চেয়েছি একটু যত্ন
তুমি দিলে সুগন্ধি আতর
চাই নি প্রাসাদসম নিলয়
চেয়েছি শুধু অনন্ত সাম্য।

তবুও
দিকে দিকে আবিরের ছয়লাপ 
জানান দেয় বসন্ত যে এসে গেছে
কপোত কপোতী বাঁধে ঘর
উষ্ণতায় রাখে আদিম সুখ।

মাতোয়ারা আম্রমুকুলের ঘ্রাণ
অশোক পলাশ শিমুল রং 
তখনও তলদেশে হেঁটে যায় কঙ্কালসার পথশিশু---
বসন্ত নয় চৈত্রের দাবদাহ
অসাম্যের গান গায়।

বিদিতা সেন

অতীত

হে অতীত ! তোমা মাঝে রয়েছে 
আমার অনেক স্বপ্ন চাঁপা।

হে অতীত !তোমা মাঝে রয়েছে 
আমার অনেক গল্প গাঁথা।

হে অতীত ! তোমা মাঝে মিশেছে
আমার অনেক মনোকথা।

হে অতীত!তোমা মাঝে রয়েছে নীরব
আমার অনেক হারানো গান।

হে অতীত! তোমা মাঝে জীবাশ্ম
আমার বাল্যের সাজানো বাগান।

হে অতীত! তোমা মাঝে আছে নীরব
আমার শৈশবের কলরব।

হে অতীত! ‌তোমা মাঝে রয়েছে
আমার ফেলে আসা জীবন।
 
         
হে অতীত!পাব কি ফিরে আবার?
আমার সেই হারানো ‌ সব ক্ষন।।

শৈলেন দাস

মিলি

মায়াময় তোমার নেত্র
যুগল প্রেমে ভরা মন
রশ্মির মতো ছড়িয়ে 
দিও আমায় সারাক্ষন 

উজ্জ্বল কোমল গাল
তোমার মৃদু মুখের হাসি
অনবরত উপহারস্বরূপ
দিও আমায় ভালোবাসি

Feb 21, 2024

মিলনকান্তি দত্ত

বাংলাবাজার

যে বাজারে মহাজন নিজেকে
বিকিয়ে খরিদ্দার কেনে

যে বাজারে খরিদ্দার নিজেকে
বিকিয়ে মহাজন কেনে

সে বাজারই আনন্দবাজার। 

ভালোবাসাই মূল্য। 

ভাব তার লাভ। 

সে বাজারে শুধু
লোকসানেরই অভাব।

সৌমিত বসু

ভাষাজ্বর

তুমি আমার শেখানো অক্ষর
তুমি আমার অন্নপূর্ণা ভাষা
বরফঠোঁটে জানিয়েছিলাম তাকে
সম্বলহীন তুচ্ছ ভালোবাসা।

তুমি আমার জন্ম প্রতিবেশী
বুকে তোমার অনন্তরাত জাগে
স্বপ্নে যারা মরতে চেয়েছিলো
শহীদ হতে ছোটে আলোর আগে।

আমি তোমার ছাত্র হয়ে শিখি
মায়ের ভাষা আগলাতে হয় কেন।

অপাংশু দেবনাথ

সীমান্তে এসো জননী

আমি সীমান্তে রান্না করি হৃদয়ের অক্ষর, 
অন্য মনস্কতার বর্ণপোড়া গন্ধে 
                           ভরে ওঠে চেতনার ঘর।

শরীর জুড়ে উপচে পড়ে ভাতের বিষণ্ন-মাড়
                                  সীমান্তে এসো জননী, 
দেখো যাও কী করে হৃদয় পোড়াই।

রুদ্র মোস্তফা

 তর্জনী অথবা বিজয় ফুলের জন্মবৃত্তান্ত 

বিভাজনের প্রাচীর টপকে ক্ষুধার মাছি কানের কাছে
 ভনভন করে স্লোগান তুলেছিলো
‘লাখো ইনসান ভুখা হ্যায়, ইয়ে আজাদি ঝুটা হ্যায়’।
আমরা তখন দেখছিলাম ঘর পোড়া আলোয় স্নানের দৃশ্য—
বদলে যাওয়া ঘরে ভিন্ন স্বরে মগ্ন হয়ে 
 ক্ষুধার রাজত্ব ঢেকে দিচ্ছিলাম রূপকথার গল্পে।

প্রথম ঘোর কাটে ভাষার ঘাটে:
‘দ্য স্টেট ল্যাঙ্গুয়েজ অব পাকিস্তান ইজ গোয়িং টু বি উর্দু 
অ্যান্ড নো আদার ল্যাঙ্গুয়েজ’। 
আমরা সমস্বরে বলেছি, নো—
 নো নো নো নো নো নো। 
বুক পেতে ঠেকিয়েছিলাম সুচালো বুলেট। 
আমরা রক্ত দিয়ে বাঁচিয়েছিলাম বর্ণমালা।

আমরা হাসতে গিয়ে টের পাই 
জখমের কালশিটে চাদর জড়িয়ে রেখেছে ঠোঁট।
আমাদের হাসি আমাদের উপর গড়িয়ে পড়ছে 
ক্রীতদাসের ক্রন্দন হয়ে... 
হাহাহা হাহাহা হাহাহাহা...
তখন হাসতে ভুলে গেলাম  
তখন বাঁচতে ভুলে গেলাম। 
হন্যে হয়ে আমরা খুঁজছিলাম শিকল ভাঙার গান 
খুঁজছিলাম অসুর নিধনে সুরের মোহময় টান। 

বাঙালির হাজার বছর রেসকোর্স ময়দানে 
সমস্ত হিসেব নিয়ে একে একে বসে 
তখন অস্তিত্বের চেয়েও উঁচু হয়ে দাঁড়ায় তর্জনী— 
তর্জনী ধোয়া বর্ণমালায় ভেসে যায় জনপদ : 
"রক্ত যখন দিয়েছি আরো রক্ত দেবো।
এ দেশের মানুষকে মুক্ত করে ছাড়বো ইনশাআল্লাহ। 
এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, 
এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।"
মুহূর্তেই আমরা শিখে যাই  
আঁধারে রঙিন ফুল ফোটানোর মন্ত্র। 
দীর্ঘ নয় মাস পর  
চরাচরে ভেসে যাওয়া রক্ত 
সবুজ বুকের ঠিক মাঝখানটায় 
 'আমার সোনার বাংলা 
আমি তোমায় ভালোবাসি' 
বলে  জেগে ওঠে। 
বাংলাদেশ নামে মৌ মৌ ঘ্রাণে
তখন বিজয় ফুল ফুটে পৃথিবীর বুক জুড়ে। 

বিপ্লব উরাং

ভাষার লালন

নিজের ছানাকে কে নাই ভালবাসে।
নিজের মায়ের ভাষাকে কে নাই ভালবাসে।

খাওয়নের অভাবে ছানা হামার
হাড় জিরজিরে দেহিটা লিয়ে
চলতে নাই পারছে।
দু মুঠা ভাত দিতে নাই পারছি
ছানা বড় হবেক কি করে।

তেমনই বেচারাম-ভাষা।
ভাষা হারায় যায় অযতনে,অনাদরে।
একদিনের ভাষা দিবসে-
ভাষা নাই বাঁচবেক।
যদি ন হামরা দিন পরতিদিন
ভাষাকে লালন না করি।

বিজন বোস

শুধু তোমারই জন্য

যার জন্য আজ বুক ভরে শ্বাস নিতে পারছি
রাত জেগে জোৎস্নায় গল্প করছি
প্রেমিকার হাতে গোলাপ তুলে দিচ্ছি ,
বেগ ভরে মাছ সবজি নিয়ে বাড়ি ফিরছি
"একুশ" সে শুধু তোমারই জন্য, শুধু তোমারই জন্য।

যার জন্য  স্কুলে যাচ্ছে ছেলে
কলেজে যাচ্ছে মেয়ে,
ক্রিকেট মাঠে ছক্কা মারছে কেউ
প্রজন্ম হাঁটছে প্রগতির পথে 
"পাঁচ ভাই" বুকে বুলেট নিয়েছে বলেই ।

যার জন্য আজ বাংলায় কথা বলি
জারি সারি ভাটিয়ালি মনের সুখে গাই ,
"আমার সোনার বাংলা" -শুনে চিত্তে জাগে সুখ
কর্মে পাই বল, মনে জাগে আশা
'বঙ্গবন্ধু' , সে শুধু তোমারই জন্য শুধু তোমারই জন্য।

উড়ছে নিশান লাল সবুজে 
গর্বিত মা মাটি মানচিত্র ,
ধুয়ে গেছে রক্ত, ভুলে গেছি ব্যাথা
ঠাসা বাংলার ইতিহাসের পাতা ,
"বাহান্ন" সে শুধু তোমারই জন্য , শুধু তোমারই জন্য।

কুশল ভৌমিক

আমি বাংলাদেশের লোক 

চেয়ে দেখো,পলাশ শিমুলের ডালে
ফুল হয়ে ঝুলে আছে-আমাদের বর্ণমালা। 

মৌরঙা ফুল খোপায় গুজে গুজে বিষণ্ণ বাসন্তী 
চেয়ে দেখো
গোটা জীবন তোমার দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে 
অভাবনীয় শব্দের আদরে ভরিয়ে দিচ্ছি 
জীবনের সবকটি সাদা পৃষ্ঠা। 

আরশিতে হেসে ওঠা আমাদের আনন্দ
বারোয়ারি জীবনের বিপন্ন বেদনা
মোহ মায়া প্রেম প্রাচুর্য 
আমাদের জল্পনা কল্পনা 
ভুল ভ্রান্তি প্রাপ্তি অপ্রাপ্তির দোদুল দোলনা
শানিত শপথ প্রাণিত প্রতিজ্ঞা
এক থেকে বহু হবার দৃপ্ত প্রেরণা 
সব -সব সুগন্ধ বুকে নিয়ে 
দেখো, ফুল হয়ে ফুটে আছে
আমাদের বর্ণমালা। 

আমাদের প্রতিটি অক্ষর পাখি 
প্রতিটি শব্দ বিমূর্ত ওঙ্কার 
চর্যার সিঁড়ি ভেঙে আমাদের বর্ণমালা পোঁছে যায়
তোমাদের উত্তরাধুনিক দরোজায় 
শুক সারি ব্যাঙমা ব্যাঙমি
ঠোঁটে ঠোঁটে বলে দেয় আমাদের প্রত্নপরিচয়-

আমার ভাষা তোমার ভাষা
ভালোবাসা হোক
আমি ভাষার জন্য জীবন দেয়া
বাংলাদেশের লোক।

বিমল সিনহা

যখন দেখি

যখন দেখি
কোনো এক কঠিন জ্বরে দিনের পর দিন তুমি বিছানায়
অনেক যন্ত্রণায় রোগা হয়ে গেছো 
তোমার শরীরে অনেক কালো দাগ তখন 

আমার আকাশে পাখিরা ঘরে ফিরেনা
প্রতিটা দুঃখই জোয়ার ভাটা হয়ে উঠে
সব খোলসের ট্র্যাফিক আইন ভেঙে ছুটে আসি তোমার কাছে
তোমাকে জলপটি দেবো বলে

আমার মন জুড়ে থাকা প্রিয়তমা, আমার মাতৃভাষা
তোমাকে ঠিক আগের মতো আদরে পেতে চাই 
যে আদরে সন্তান মায়ের কোলে জন্মের শীতঘুম পাড়ি দেয়।

কমল সরকার

মুখের ভাষা

ঠাম্মা বলতো 'বেনুন' —
দেশি মরিচের ঝাল, জিভে চোখে 
জল ঝরে যেত খুব। 
বাবা তবু চেটেপুটে খেয়ে নিত সবটুকু ভাত।

মা বলতো 'তরকারি'। 
ঝাল কিছু কম, কিছুটা চিনির মিষ্টতা। 
আমরাও পেট পুরে খেয়ে নিয়েছি
একটিও ভাতের দানা নষ্ট না করে। 

এখন আমার শহুরে যাপনে
রঙিন ক্যাপসিকামে সেজে ওঠে 
'সবজি' বা 'মিক্সড ভেজ' —
ঝালের বিকল্পে চিলি সস্ বা টম্যাটো পিউরি। 
আমার মেয়ে তৃপ্তি করে খায়। 

প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে পরিভাষা বদলে যায়,
বদলে যায় রান্নার উপাদান ও মশলাপাতি। 
তবু দেখি, আহারের পরিতৃপ্তিটুকু
এখনও শাশ্বত, অমলিন ;
যেমন আমাদের চিরকালের 
মায়ের মুখের বাংলা ভাষা।

অমিত সরকার

ভাষা ভাসা

যে যার ভাষা বলে বলুক,
মনের ভাষা,ভালো ভাষা বলুক,
অন্যের না বুঝলেও ভালোবাসা হোক।
নিজের ভাষা অন্যের উপরে আর চাপানো যেন না হয়,
এই যদি হয় প্রক্রিয়ায়  ভাষা ভাসা ভাসা হবে ।

নবীনকিশোর রায়

বাংলামায়ের আঁচল 

রাজপথের মিছিলে
রক্ত ঢেলে দেয়
ভাষামুক্তির অভিযাত্রীগণ! 

পরাধীনতার স্ফুলিঙ্গ,প্রতিটি জনপদে ছড়িয়ে পড়ে... 

বাংলার মাটি ফুঁড়ে জন্মনেয় গ্যারিলা,মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় 
স্বাধীনতার স্বপ্নে বিভোর সেনা 
ঝাঁপিয়ে পড়ে রনাঙ্গনে... 

ইজ্জত হারা চিৎকার 
পাক ব্যাঙ্কারের ভিতর 
মায়েদের আর্তনাদ! 
বীর শহিদের বলিদান, 
আকাশে বাতাসে তুফান তোলে 

রক্তিম সূর্য উঠে---
বাংলামায়ের সবুজ আঁচলে...