ভ্রমণ ডাইরি
আলেপ্পি
সত্যি জীবনতো নয় যেন এক যুদ্ধ। হুঁচোট খেতে খেতে এগিয়ে চলা বই আর কিছু নয়!জীবন পথে চলতে চলতে যুঝতে যুঝতে হঠাৎ নানা ধরনের ঝড়ের আবির্ভাব হয় আর সেই ঝড় যখন শান্ত হয় তখন দেখি নিজেই কবে নিজের সব স্বকীয়তা নিজস্বতা ভালোলাগা সব হারিয়ে ফেলেছি। আজ কলম হাতে বসে এমন অনুভূতি আবার নূতন করে উপলদ্ধি করলাম। কিন্তু লিখা যে আমার নেশা!!আর আমি আমার কিছু বন্ধুদেরকে কথা দিয়েছিলাম কেরালা নিয়ে "ভ্রমণ ডাইরি" লিখব তাই আজ বন্ধুদের জন্য অগোছাল এলোমেলো কিছু কথা লিখে দিলাম ধূলো জমে পলি পড়ে থাকা স্মৃতির ভান্ডার হাতড়ে হাতড়ে।
বহু বছর আগে পুজোসংখ্যা নবকল্লোলে একটি উপন্যাস পড়েছিলাম,নাম ছিল "কায়েলের জলে"।কার লেখা আজ আর মনে নেই (প্রফুল্ল রায় নয়ত সর্বাণী মুখোপাধ্যায়)।উপন্যাসটির পটভূমিকা ছিল সুন্দরী আলেপ্পির কালোজল ব্যাকওয়াটার ঘিরে। হাউজবোটে একদিন একরাতের গল্প। পড়ে মুগ্ধ ও আপ্লুত হয়েছিলাম। জীবনে একবার কায়েলের কালো জলে ঘুরে বেড়ানোর ছোট্ট একটি ইচ্ছা মনে মনে পোষন করতাম সবসময়। আমার এ ইচ্ছাটি বাড়ির সবাই জানতেন। তিনি বলেছিলেন নিয়ে যাবেন আমায়। আমরা যখন ২০১০ সালে সমগ্র দক্ষিণ ভারত ভ্রমণ করেছিলাম তখন কোভালম বিচে একরাত বেশী থাকার দরুন আলেপ্পি যাবার আর সময় হয়ে উঠেনি,তাই এবারে যখন ছেলে টিকিট কেটে এসে বলল মা তোমাকে তোমার প্রিয় উপন্যাসের শহরে নিয়ে যাব এবার,তখন কিন্তু আমি মুখে কিছু না বললেও মনে মনে খুশিতে আনন্দে হাততালি দিয়ে উঠেছিলাম একান্তে।
অগত্যা সেইদিন এলো। আমরা বেঙ্গালুরুকে ট্রেনজিট কেম্প বানিয়ে সেখান থেকে সব রকম সুযোগ সুবিধা থাকা অত্যাধুনিক রাতের বাসে চড়লাম রূপসী আলেপ্পির উদ্দেশ্যে। রাস্তা খুব ভালো। বাস ছুটে চলল হু হু করে। কিন্তু তবু সারারাত একটুও ঘুম হলো না উত্তেজনা ও আনন্দে। সেদিন আবার দেখলাম আঁধারের বুক চিড়ে এক নূতন সূর্যোদয়,এক নূতন দিনের শুভারম্ভ। এক নতুন সকালের আত্মপ্রকাশ। ভোরের স্নিগ্ধ বাতাসে সবেমাত্র একটু তন্দ্রাচ্ছন্ন হয়েছি অমনি চোখ মেলে দেখি আলেপ্পি পৌঁছে গেছি আমরা।
জানতাম স্বর্গের মত সুন্দর কেরালাকে ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক ট্র্যাভেলার বিশ্বের দশটি স্বর্গ রাজ্যের একটি হিসাবে ঘোষনা করেছে।সত্যিই প্রকৃতিদেবী ওখানে তাঁর রূপের মাধুরী দুই হাত উজার করে অকাতরে ঢেলে দিয়েছেন। পাহাড় সমুদ্রের সমাহারে মনে প্রকৃতি প্রেমের নেশার ঘোর লেগে যায়। ভ্রমণ পিপাসু মনে পরম তৃপ্তি অনুভব হয়।
সমুদ্র নদী লেক আর অজস্র খাল আলেপ্পি শহরটিকে ঘিরে রেখেছে। রূপসী আলেপ্পিকে প্রাচ্যের ভেনিস বলা হয়। শহরটির একপাশে আরব সাগর অপরপাশে ভেম্বানাদ লেক ও মাঝে ৬৫টি খাল ১২টি গ্রামের বুক চিড়ে মোহনায় গিয়ে মিশেছে। ঈশ্বরের নিজের দেশ বুঝি কেরালা, যারজন্য প্রকৃতিদেবী তার রূপের পসরা থরে বিথরে সাজিয়ে রেখেছেন।
বাসের টিকিটের অসুবিধার জন্য ছেলের বন্ধু রাজা একঘন্টা আগেই আলেপ্পি পৌঁছে একটি হাউজবোট সারাদিনের জন্য ভাড়া করে নিয়েছিল। বাস থেকে নেমে একটি অটো নিয়ে আমরাও সেথায় পৌঁছে গেলাম আর অমনি আমার খুব মন খারাপ হয়ে গেল। কারণ হাউজবোট যেথায় নোঙর করা আছে সে জায়গাটা আমাদের এখানকার ভরলুর নালার থেকে বেশী কিছু নয়। কচুরিপানায় ভরা নোংরা শ্যাওলা পড়া কালো জল থেকে দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছিল। তবু এসেছি যখন দেখেতো যাবই। মন খারাপ নিয়েই হাউজবোটে উঠে বসলাম। বোট একটু চলার পরই নোংরা খাল থেকে বেড়িয়ে অগাধ জলরাশিতে পাড়ি দিল আর আমার মুখ থেকে বেরিয়ে এলো আহা কী অপূর্ব!! সেথায় জলের রং গাঢ় সবুজ,দুইপাশে অসংখ্য নারকেলবিথি মালার মত জলের উপড় নুয়ে পড়ে আদরে সুহাগে লেকের জলকে জড়িয়ে আছে। গাছের ছায়ায় দূর থেকে লেকের জল একেবারে কুচকুচে কালো লাগছিল। কি অপূর্ব নয়নাভিরাম দৃশ্য সেথায় তার বর্ণনা দেবার শক্তি আমার কলমের নেই! কিন্তু আমিতো জাতিস্মর নই! তবে কেন আমার মনে হচ্ছে এমন অপরূপ প্রকৃতির রূপ আমি আগেও কোথাও দেখেছি! অমনি ছেলে বলল, মা আমাদের বাড়িতে যে ১২ পাতার একটি ক্যালেন্ডার আছে সেগুলো তারমানে সবই আলেপ্পির ছবি আর আমিও মনে মনে আশ্বস্ত হলাম। যাক তবে আমি জাতিস্মর নই।😁
বোট ভেসে চলল দিগন্ত বিস্তৃত অপার জলরাশিতে। যতদূর চোখ যায় শুধু জল আর জল। উজ্জ্বল সূর্য রশ্মিতে জলে নীল রঙের বিচ্ছুরন হচ্ছে। জলের নীল দিগন্তে পাড়ি দিয়ে আকাশের নীলে গিয়ে মিশে গেছে। লেকের দুপাশে সহজ সরল শান্ত গ্রাম্য জীবন বয়ে চলেছে। বেশীর ভাগ লোকেরই জীবন ও জীবিকা এই লেককে ঘিরে। আমরা দুপুরের খাবার ও বিকেলের চায়ের পর্ব সেরে পাঁচটার পর আবার ডাঙায় উঠে এলাম।
আলেপ্পি বিচের উপর আগে থেকে বুক করে রাখা হোটেল বিচ রিসর্টে আমরা যখন পৌঁছলাম তখন আরেক চমক হল,লাজুক সূর্য তখন লজ্জায় রাঙা হয়ে আকাশের গায়ে লাল রঙ ছড়াতে ছড়াতে সমুদ্রের জলে টুপ করে মুখ লুকিয়ে নিল। তারপরই ঝুপ করে আঁধার নামল। দেখে মুগ্ধ হলাম। এক লহমায় সারাদিনের সব ক্লান্তি যেন দূর হয়েগেল। অপূর্ব এক ভালোলাগার অনুভূতি নিয়ে সন্ধ্যেবেলাটা হোটেলেের ব্যালকনিতে বসে সমুদ্রের ঢেউ গুনে গুনে কাটিয়ে দিলাম। পরদিন শিকারাতে ভ্রমণ করলাম। শিকারা যখন লেকের জলে অসংখ্য ফোটে থাকা পদ্ম বনের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছিল, আমার মনে হচ্ছিল বুঝি স্বর্গের পারিজাত সৌন্দর্য বিছিয়ে রেখেছে লেকের জলে। শিকারাটির নাম ছিল ময়ূরপঙ্খী আর ময়ূরপঙ্খী পাল তোলাই ছিল শিকারাটিতে। ময়ূরপঙ্খী সেদিন আমাদের নানা গ্রামের ভেতর দিয়ে নিয়ে জঙ্গলের ভেতর একটি খাবার হোটেলে নামিয়ে দিল দুপুরের খাবারের জন্য। ওখানের মূল আকর্ষন ছিল একটি মস্ত বড় ঈগল, যাকে নিয়ে পর্যটকরা মনের আনন্দে ছবি তুলছিল। আমরাও কিছু ছবি তোলে নিলাম ঈগলকে সাথে নিয়ে। এরপর সেখান থেকে আলেপ্পি বিচে চলে এলাম সূর্যাস্ত দেখব বলে। সমুদ্র সৈকতে সোনালি বালুতটে তখন সামাণ্য ভীড় লেগে গেছে। আমরও সেই ভীড়ে সামিল হলাম। বাতাসের দাপটে টলটলে নীল জলে সাদা ঢেউয়ের হুটোপাটি চলছে। উচ্ছল সমুদ্র তখন উত্তাল তরঙ্গে মেতে উঠেছে। আকাশের মত নীল সমুদ্রে দেখতে পেলাম পেঁজা তুলোর মত সাদা ঢেউ। সমুদ্রের শরীরে রামধনুর সাত রং ছড়িয়ে পড়ার দৃশ্য সোনালি বালুতটে আলেপ্পি বিচে প্রথম উপভোগ করলাম। সাতরঙে রঙিন ,'বেনীআসহকলা' রঙে রঙে হাত ধরাধরি করে যেন সমুদ্রের জলে নেমে এলো আলোর বিচ্ছুরণ ছড়িয়ে দেবে বলে। ধীরে ধীরে অস্তগামী সূর্য সমুদ্রের জলে নাইতে নেমে ডুব দিয়ে দিল। পরদিন সকালে আবার সদ্যস্নাত নতুন সূর্যের আবির্ভাব হবে। সূর্যাস্তের প্রতি মুহুর্তের ছবি রাজা কেমেরায় বন্দী করল। সমুদ্রকে বিদায় সম্ভাষন জানাতে কাছে যেতেই তড়িঘড়ি সমুদ্র এসে আলতো ছোঁয়ায় পায়ের পাতা ভিজিয়ে বিদায় জানিয়ে দিল। আমরাও পরম সুখস্মৃতি নিয়ে হোটেলে ফিরলাম ভোরের বাস ধরব বলে।
সেদিন দক্ষিনের ভ্রমণ শেষে বিষন্ন মনে যখন বাড়ি ফিরছিলাম তখন আবার অন্তরের অন্তঃস্থলে রবি ঠাকুরকে অনুভব করলাম আর আমি মনে মনে আউড়ে চললাম.....
যা দেখেছি যা পেয়েছি তুলনা তার নাই।"