একটি খেজুরের জন্য
আমিনা বায়না ধরেছে সে রোজা রাখবে ইফতার করবে, পাশের বাড়ির রইস বয়স ৭ সে রোজা রাখে প্রতিদিন মসজিদে যায় বাবার সাথে আর অনেক ইফতারি খায়, সে এসে আবার আমেনার সাথে গল্প করে।
গতকাল সন্ধ্যে বেলা ছোট্ট আমিনা মায়ের কাছে এসে বসলো- মা মা রোজা কি ?
-রোজা হল এবাদত, আল্লাহকে সন্তুষ্ট করার জন্য সারাদিন না খেয়ে থাকতে হয়, তারপর সন্ধায় খেজুর শরবত ,ফলসহ অনেক রকম খাবার দিয়ে ইফতার করতে হয়।
- অনেক রকম ফল!মা আমি রোজা রাখুম,
-বলিস কিরে মা তোর তো রোজা রাখার বয়সই হয়নাই।
মা তুমি না কইছো রোজা রাখলে ভালো ভালো ইফতারী খাওন যায়, তাহলে তো আমিও ভালো ভালো ইফতারি খেতে পারমু, রইস কইছে রোজা রাখলে মসজিদে নিয়া যাইবো,
-সে ঠিক আছে মা কিন্তু রোজা তো তোমার জন্য ফরজ হয় নাই,
রোজা রাখতে হলে কম করে হলেও আট বছর বয়স হতে হয় তোর তো এখন ছয় চলে মা ,এককাজ কর আগামী বছর থেকে রোজা রাখিস।
না মা আমি রোজা রাখুম,কত রঙ বেরঙের ইফতারি খামু, খেজুর খামু ,শরবত খামু আরো কত কি!
-ছি মা এসব বলতে নেই, রোজার মাস সংযমের মাস, ভালো ভালো ইফতারি খাওনের আশায় রোজা রাখলে সেই রোজা আল্লাহর দরবারে কবুল হইবোনা।
-বড্ড ভাবনায় পড়ে গেলেন রহিমা বেগম, এবার কি জবাব দিবে মেয়েকে
নুন আনতে পান্তা ফুরায় যে সংসারে, সেই োসংসারে ফল খেজুর শরবত দিয়ে ইফতারি করা তো দূর দু-মুঠো ভাত ই জোটে না ঠিকমতো, সেখানে বাহারি রঙের ইফতারি খাওয়া আকাশ কুসুম কল্পনা ছাড়া আর কিছু নয়।
কিন্তু মেয়েকে কিভাবে সান্তনা দিবে ভেবে পাচ্ছে না।
মা ও মা কি ভাবছো, রহিমা বেগমের ভাবনা দরজা টোকা দিয়ে মেয়ে আমিনা বলল।
নারে মা কিছুই ভাবছি না, ভাবছি তুই রোজা রাখবি।
হ মা আমি রোজা রাখুম।
শোন শোন তোর রোজা রাখনের কাম নাই কালকে বিকেলে সাহেব গো বাসার থেইকা তোরে আমি ইফতারি এনে খাওয়ামু মা।
না মা রোজা রাখলে ভালো ভালো খাওয়ান পাওয়া যায়, আমি রোজা রাখুম।
ঠিক আছে মা যা তুই এবার একটা ডুব দিয়ে আয় আমি তোরে ভাত দিতেছি।
মিনিট সেকেন্ড ঘন্টা পেরিয়ে অবশেষে সেহরির সময় হয়ে গেল,। মসজিদে মসজিদে মুয়াজ্জিন সবাইকে জাগিয়ে তুলছে
প্রিয় মুসল্লী ভাই ও বোনেরা সেহরি খাওয়ার সময় হয়ে গেছে সবাই ঘুম থেকে উঠুন সেহরি খেয়ে নিন ইত্যাদি।
বাবা মায়ের সাথে আমিনা মুখ হাত ধুয়ে খেতে বসেছে, আমিনা দুই টুকরো মাংস পেয়েছে,
মাংস দু টুকরা পেয়ে আমিনা খুশিতে উদ্ভেল হয়ে গেল।
সাহেব গো বাসা থেকে মা রহিমা বেগমকে খাবার দিয়েছিল, সেই খাবার না খেয়ে আমিনার জন্য নিয়ে এসেছে।
মেয়ের হাসি মুখ দেখে বাবা বললেন এইতো আমার মেয়ে বড় হয়ে যাচ্ছে, কাল তোমার জন্য ইফতারি আনবো, তুমি খুশি মনে খাবে মা।
কি মজা, কি মজা কাল ইফতারি খামু।
সেহরি খেয়ে আমিনা ঘুমিয়ে পড়ল,
কিছুক্ষণ পর ফজরের আযান দিলো মা রহিমা বেগম এই ফাঁকে ফজরের নামাজটা পড়ে নিল, চারদিকে সকাল হয়ে গেল পাখি কিচির মিচির ডাকতে লাগলো, এরি মধ্যে বাবা মসজিদ থেকে নামাজ পড়ে এলেন।
কি ও আমেনার মা এখনো ঘুমিয়ে আছো।
নাগো ঘুম আসছে না, আপনি যে কইলেন মেয়েকে ইফতারি খাওয়াবেন টাকা পাবেন কই, আপনার হাতের অবস্থা তো আমি জানি তয় কেমনে কি করবেন?
ও নিয়ে তোমারে ভাবতে হবে না আমিনার মা, আমি দেখি কাজকাম করে ঠিকই মেয়ের ইফতারের ব্যবস্থা করে নিতে পারব।
আমেনার বাবা কাওরান বাজারের কুলি, এই শহরের বড় বড় সাহেবরা যখন কাওরান বাজার উনাদের মাসিক বাজার করতে আসেন তখন আমিনার বাবাদের মত অজস্র মানুষ ওনাদের পিছনে পিছনে হাটেন কপাল গুনে মোট বওয়ার কাজ পেয়ে যান, কোনদিন ১০০ ২০০ কোনদিন আমার খালি হাতে ফিরতে হয় ঘরে। এই করুনা আসার পরে মানুষের পকেটে আগের মত টাকা নাই তাই কুলি মজুরদের রোজগারও কমে গেছে।
রোজার ভেতরে সকাল সকাল এই সাহেবরাও বাজার করতে চলে আসেন,
আমেনার মা আমার ঐ পাঞ্জাবীটা দাও আর একটা ব্যাগ দাও।
এত সকাল সকাল কই যাইবেন।
-যেখানে যাই প্রতিদিন সেখানে যাব, এ রোজার মাসে সকাল সকাল সাহেব বেগম সাহেবারা বাজার করতে আসে, দেখি মোট বয়ে যদি কিছু পয়সা উপার্জন করতে পারি, মেয়েটার জন্য একটু ইফতারি তো আনতে পারবো।
আমেনার বাবা বেরিয়ে গেল
রহিমা বেগম দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললেন, হায়রে আল্লাহ আমাদের কেন গরিব বানাইলা আর গরিবে যদি বানাইবা তাহলে পেট কেন দিছিলা খিদা কেন দিছিলা , ছোট্ট মাইয়াডারে ভালো-মন্দ খাওয়াতে পারি না ইত্যাদি ইত্যাদি।
সকাল দুপুর গড়িয়ে বিকাল হয়ে গেল ধীরে ধীরে আমেনাকে রোজায় ধরছে মানে একটু দুর্বল হয়ে যাচ্ছে, মাঝে মাঝে বলছে মা গলা শুকিয়ে যাচ্ছে, ইফতারের আর এক ঘন্টা বাকি, ঘরে সবাই অপেক্ষা করছে বাবা ঘরে ফিরবে, এভাবে বেশ কিছু সময় পার হয়ে যায় ,বাবার আসেনা, মায়ের চিন্তার শেষ হচ্ছে না, যে মানুষ বিকেল চারটার ভিতর ঘরে চলে আসে এখন ছয়টা ছুঁই ছুঁই তবুও বাসায় ফিরছে না, মনটা কেমন কু ডাক ডাকছে, এদিকে ইফতারের সময়ও হয়ে আসছে, মেয়ে অধীর আগ্রহে বসে আছে বাবা ইফতারি নিয়ে ফিরবে, মেয়েকেই বা কি বলে সান্ত্বনা দিবে রহিমা বেগম।
হঠাৎ পাশের বাড়ির জলিল মিয়া এলো
-আমিনার মা ঘরে আছো?
-জি ভাইজান!
শুনলাম আমিনার বাবারে পুলিশে ধরে নিয়ে গেছে, তা সত্যি নাকি।
-বলেন কি? কথাটা শুনে রহিমা বেগম থ হয়ে গেল, ভাইজান আমি তো এর কিছুই জানিনা।
-আরে হ, গঞ্জে থেকে ফেরার পথে শুনলাম কয়েকজন বলাবলি করতে ছিল খেজুর চুরি করতে গিয়ে ধরা পড়ছে!
কথা শুনে আমেনার হাত ধরে দ্রুত ঘর থেকে বেরিয়ে গেল রহিমা বেগম, পাড়ার মানুষেরা বলাবলি করছিল যে আমিনার বাপ এমন একটা কাজ করলো শেষে কিনা খেজুর চুরি করতে গিয়ে ধরা পড়লো।
মা মেয়ে হেটে হেঁটে ক্লান্ত শরীরের থানায় পৌঁছে গেলেন, তখন অলরেডি আজান দিয়ে দিয়েছে সবাই ইফতারি করতেছে ছোট্ট আমেনার মুখের দিকে তাকানো যাচ্ছে না। তবুও -মেয়ে এখন ব্যস্ত হয়ে আছে বাবাকে এক নজর দেখার জন্য।
হাতের রশি বেঁধে বাঁধা অবস্থায় বাবাকে সামনে আনা হলো, ছোট শিশু বাবাকে জড়িয়ে ধরে বলল তোমার কি হয়েছে বাবা, কেন তোমাকে রশি দিয়ে বেঁধে রাখছে।
-তোর বাবা বাজার থেকে এক কাটুন খেজুর চুরি করেছে সেই অপরাধে তোর বাবাকে আমরা ধরে নিয়ে এসেছি একজন পুলিশ বলল।
-ও পুলিশ কাকু সব দোষ আমার,আমি বাবার কাছে খেজুর খাইতে চাইছিলাম তাই তো বাবা বাধ্য হয়ে চুরি করছে আমার বাবারে ছাইড়া দেন,
-না তোর বাবার শাস্তি হবে।
সেদিনে আমিনার বাবাকে কোর্টে চালান করে দেয়া হলো, টাকা পয়সার অভাবে উকিল ধরতে পারে নাই কি জানি কি হবে শেষ পরিণতি,হয়তো যাবজ্জীবন জেল, আমাদের সমাজে বড় বড় রাঘব বোয়ালেরা হাজার হাজার কোটি টাকা আত্মসাৎ করে, তাদের কিচ্ছু হয় না অথচ পেটের দায়ে মেয়ের চাওয়া পূরণ করতে গিয়ে সাত্তার মিয়া খেজুর চুরি করেছে ,তার হবে যাবজ্জীবন হায়রে সমাজ ব্যবস্থা।
হঠাৎ রাতে ঘুমের ঘোরে চিৎকার করে উঠলো আমেনা
বাবা আমার দামি দামি ইফতারি শরবত খেজুর কিচ্ছু চায় না বাবা শুধু তুমি ফিরে আসো, বাবা আমি তোমাকে চাই,
ফিরে এসো বাবা।
মেয়ের কান্নার সাথে সুর মিলিয়ে মা রহিমা বেগম কেঁদে উঠলো।
মধ্যরাতে পুরো এলাকায় প্রতিধ্বনিত হয়ে ফিরে আসছে শুধু একটি কথা "বাবা ফিরে" এসো।