Apr 29, 2024

জয়িতা ভট্টাচার্য

ছায়াবৃত্ত 

জড়ির কিংখাব জড়ানো আলো ঘরে এসে ঈসৎ থমকালো।রাজকন্যা মৃত।তৎসহ জীর্ণ নদীটির মতো তিরতির করে বয়ে যাওয়া রক্তের নদীটি এখন শুকিয়ে এসেছে।চড়ায় বিচিত্র মাছি আর পিঁপড়ের চলাচল শুরু হয়েছে।জড়ির চিরখানি এইখানে এসে আনত দৃষ্টিতে দেখল রাজকন্যার পতন।নিচের দিকে চেয়ে আছে আলো।যেন কত গভীর অতল।রাজকন্যার মাথায় গভীর খত।বুকের ওপর থেকে সরে গেছে মাছ ধরার আরণ।গোলাপি ওড়না লাল।ছিন্ন বস্ত্র খণ্ড মানচিত্রের মতো ঢেকে আছে উদ্বাস্তু জমি।ছোট মালভূমির ওপর দুটি বালিয়াড়ি থেঁতলে গেছে।নিম্নাঙ্গের ললিত বসন উপড়ে বেরিয়ে পড়েছে ভষ্মিভূত সাভানা,ক্লিষ্ট খণ্ডিত উর্বর কৃষ্ণ গহ্বর।রাজকন্যার চোখ দুটি খোলা আকাশ ওখানে লেখা আছে সমগ্র বৃত্তান্ত।শুধু পড়ে নিতে হবে।শীতল সিমেন্ট মেঝেতে কাঁচের চুড়ি ভেঙে বিদ্ধ রক্তাক্ত দুটি হাতে কালচে দাগ।হাত দুটি দুপাশে ছড়ানো।আলোর ওই কিংখাব ছায়া ফেলল এখানে এসে।থমকে আছে ঘড়ির কাঁটা।অনেকদিন ব্যাটারি কেনা হয়নি।স্বাভাবিক মৃতের মতোই অনাবৃত বুকে গেঁথে আছে ইস্পাতের ফলা।

রাজকন্যা ধর্ষিত হইয়াছেন।খুন হইয়াছেন।প্রশ্ন উড়ছে নিঃশব্দে খুনের পরে ধর্ষণ নাকি আগে!

এই অবধি মনে মনে লিখে অন্যমনস্ক হয়ে গেলেন ইন্সপেক্টর বক্সী।মনে মনে সারাদিন লিখে রাখেন কাহিনী।এখন বিধানপল্লীর সুখসায়র বস্তির তেরো নম্বর ঘরে দাঁড়িয়ে  দাঁড়ি চিহ্ন দিলেন অমলেন্দু বক্সী।এই নিয়ে চারটি খুন।যেন সুজিত মুখার্জির থ্রিলার চলচিত্র।ওসি অমল বক্সী বসে নেই।পশ্চিমবঙ্গে মাসে আশি পঁচাশিটা খুন আর একডজন ছেলেধরার গল্প রেকর্ডেড ই হয়।বাকি আরো কত অন্ধকার খাঁজে খোঁজে ঘাপ্টি মেরে থাকে কে আর সন্ধান করে!

কে যেন বলেছিল আলো জীবনের মেটাফর।আর অন্ধকার মানেই মৃত্যু।মার্টিন হাইডেগার বোধহয়।বক্সী আর সৌম্যশেখর তর্ক চলে অহোরাত্রি এভাবে।বাঁ দিকের দুটো গলি ছেড়ে ডানদিক বেঁকে চতুর্থ বাড়ি। তবে রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে তফাত এইখানে।অন্ধকারেই আলোর উৎস।গর্ভের অন্ধকার থেকে প্রাণের সূচনা।লেখক সৌম্যশেখরকে চুপ করতে বলে বক্সী একরোখা কিংখাবে পা রাখলেন।দরজা খোলা।বক্সীর লম্বা ছায়া পতিত রাজকন্যার উন্মুক্ত প্রাঙ্গনে।

 কলকাতার অন্ধ গলি ঘুঁজির কাহিনী তাঁর জানা।লেখা।এইসব রাজকন্যার কথাও তিনি ভালো করে জানেন।মন উদাস হলে যাতায়াত করেন।রোদ্দুর এখন নরম নেই মরা মাছের মতো শক্ত। রাজকন্যা নিখোঁজ ছিলেন কিছুদিন যাবত।এইসব রাজকন্যারা সকলেই যে বাংলার মাটি ও জল তা নয়।অনেকেই রুখা সুখা পৃথক রাজ্যের অধিবাসিনী।ঠিক বিন্ধ্যবাসিনীর মতো।বিন্ধ্যবাসিনী তাঁর বউ।জড়ির ফিতে গড়িয়ে এসেছে বিডন স্ট্রীট ঠাকুরদাস লেনে।এটা একটা অন্ধগলি।তারপর বড়ো করে আলো এসে পড়ল একটা ভাঙা বাড়িতে।একেবারে ভেতর অবধি ছড়িয়ে গেল।আর জড়ির কিংখাব নেই।অসহ্য আলো।এই বাড়িতে সাহস করে একমাত্র মরণ এসে পুড়িয়ে দিতে পারে অন্তঃপুর।ওরা এসেছিলো অনেক দূরের গ্রাম থেকে।কাঁটা তারের ওপার থেকে।মোট পনেরটি রাজকন্যার দিনযাপনে আলো পড়ে।দুজন সেচ্ছায় পালিয়ে এসেছিল।দুজনের বর তাড়িয়ে দিয়েছে।তিনজন ধর্ষিত হয়ে ছিল মোহিনী সেন কায়দা করে তুলে এনেছেন এই অট্টালিকার অন্ধকারে।আরও আছে হারিয়ে যাওয়া,নিখোঁজ,

হারিয়ে যাওয়া,বর তাড়ানো কিংবা মুক্তবাজারের অবিচ্ছেদ্য দারিদ্র্য পিড়িত বস্তি থেকে আসা রাজকন্যারা।কাঞ্চনা এবং আরও সাতজন এসেছিল পদ্মানদীর দেশ থেকে।কর্কশ আলোর ছদ্মবেশে আলো।নিকষ অন্ধকার থেকে উৎসারিত আলো।সৌম্যশেখর বলবে কিছু। সকলেই নিরাবরণ হতে কি আর পারে?

এসেছিল এখানে আলোর খোঁজে।আলো।আর এখন অন্ধকার।অন্ধকার আর মৃত্যুর কথা বলেছে দার্শনিক জ্যাক দেরিদা। বলেছিলো চৈনিক দর্শনে।রাত জেগে জেগে ভাবতো সৌম্যশেখর।"যে পথে যেতে হবে সেপথে তুমি একা...।"

 আলো যেখানে নেই সেখানে মৃত্যু।সৌম্যশেখর ওরফে অমলেন্দু বকাসী একদিন মৃত্যুর উপাসক হয়ে গেল।অন্ধকার গলি আর গলির ভেতর রাজকন্যার অন্ধকার শীৎকার থামিয়ে দেবার একটা তীব্র তাড়না।ইন্সপেক্টর বক্সী আলোর দিকে তাকিয়ে অন্যমনস্ক বিড় বিড় করছেন, "we are all going to die" মার্টিন হাইডেগার লোকটার সঙ্গে দেখা হওয়া প্রয়োজন ছিল।

লালবাতির পাড়ার উঠোন জুরে আলোময় ছেলে মেয়ে কুমির ডাঙা খেলছে।কতদিন খেলেননি।কাটা গোল্লার খেলা।সব শেষে কাটাকুটি।অন্ধকারের উৎস হতে উৎসারিল আলো...যৌনপল্লীর বেশ্যার ছেলে একথাটা তার গায়ের লেবেল হয়ে এঁটে ছিল অর্ধেক জীবন।তারপর এই পুলিশের উর্দি।একদিন সৌম্যশেখর এলো।লেখা চলতেই থাকে।অন্ধকার শেষ করতেই তো এই উর্দির বেশ। এই বিশ্ব একটা বেশ্যাপল্লী ছাড়া আর কি! সমস্ত বেশ্যা ডিলিটেড করে দেবার পবিত্র এক শপথ নিয়েছিল অমল।মার খেতে খেতে আর পাল্টা মারতে মারতে যেদিন গরপারের বটুক সামন্তকে খুন করে ফেলেছিল ভুল করে তারপর...।মাতৃনিন্দা মহাপাপ। পাপের সমাধান আরও পাপ। মন ফেরাতে 

ইন্সপেক্টর বক্সী ওরফে সৌম্যশেখর চৌকাঠে পা রাখলেন মোহিনীদেবীর আলোহীন কুটুরিতে।

রাজকন্যা এখন লাশকাটা ঘরে আবার একবার ছিন্ন হইবেন।ওখানে জড়ির কিংখাব থমকে আছে,মৃত্যুর ইনবক্সে।