Feb 21, 2024

নৃপেশ আনন্দ দাস

উত্তাপ

ঈশ্বরের বয়স বাড়ে না ।
সুপার কম্পিউটারের মতো অসীম ।
অনাবাদী যে জমিতে আগাছা আল চেপে ধরে, সেখানে অবশ্য ঈশ্বর সাপের  শীতঘুমের মতো ।
তাই,
ঈশ্বর অভিযোজিত হন
নির্ভেজাল সেই তপ্ত মনে, যেখানে জেগে উঠে ইতিবাচক ভ্রূণ ।
তাই,
সবুজ সতেজ আঙ্গুল তোলার সময়, ঈশ্বর, আমায় ক্ষণিক অন্ধ করে দিয়ো ; 
তাপে তাপিত করো, যাতে গান গাইতে পারি ।
ঈশ্বর, এই শীতে অনেক তাপের প্রয়োজন আমার অনাবাদী অভ্যন্তরে ; তোমার বয়স বাড়ুক আমাতে, সর্বজনে ।

Feb 20, 2024

রাহুল শীল

ভাষা

যা কিছু বেদনার স্মৃতি 

কখনো বলিনি

উত্তপ্ত লোহার শব্দ নেই
শুধু উষ্ণতা তার জখমের ভাষা।

রুপন সূএধর।

একুশ জাগ্রত

ফেব্রুয়ারী গায় গান
নবযৌবনে টগবগ
ভাষা সংগ্রাম
গর্বিত জাতি
আমি বাঙালি।

একুশ জাগ্রত
একুশ ফাগুনের 
আকাশে বাতাসে 
মায়ের ভাষার
নতুন সূর্যোদয়। 

একুশ জাগ্রত
বন্দুকে  গুলি ঝরা
লাল রক্ত বন্যা
শিকল পরাতে
পারেনি আমার মায়ের ভাষা।

একুশ জাগ্রত 
নবযৌবনের পূর্বাভাস
মায়ের ভাষায়
কবিতা গানের
সুরের বাঁধন।

একুশ জাগ্রত
পাহারারত
আমার ভাইয়ের
 রক্তে রাঙানো 
লাল স্মৃতি সৌধ।

একুশ জাগ্রত 
শিশু শিক্ষায়
বাল্যশিক্ষা হাতেখড়ি
বাঙালি ভাবনার 
আগামী ভবিষ্যৎ।

সূত্রা সরকার সাহা

বাংলা ভাষা

বাংলা আমার মাতৃভাষা-
বাংলা আমার মা,
বাংলা ভাষায় আদানপ্রদান
বাংলা আমার গাঁ।

সবুজে সবুজে মেশা-
ধরায় এ কি নেশা,
মায়ের কোলে সুখ,
সে যে শান্তির ঠিকানা।

বাংলা আমার আশ্রয়,
বাংলা আমার গর্ব,
সুমধুর ভাষা আমার,
মিষ্টিভাষী তাই সর্ব।

বাঙালীর হৃদয়ের ভাষা,
সংরক্ষণ তাই জরুরী,
বাঙালী মন উচাটন,
আজ চুরি সর্বস্ব।

বাংলা ভাষার আকাশে-
কালো মেঘের ঘনঘটা,
বঞ্চিত হইও না-
বাঙালী ভাবো ব্যাপারটা।

অলকা গোস্বামী

আমার ভাষা, আমার গর্ব

মাতৃভাষা আমার স্বাধীনতা।
সমস্ত বাঁধার দেওয়াল ভেঙে
জেগে ওঠে,
রক্ত পলাশ বাংলা,
পৃথিবীর বুক জুড়ে।
ফেব্রুয়ারি একুশ শতাব্দীর দীর্ঘশ্বাস,
বৃষ্টি ঝরায় মায়ের চোখের জলে।
আজো ভেসে আসে উত্তাল
মিছিল, উদাত্ত স্লোগান,
রক্ত ঋণ শোধের দিন আজ।
মাতৃভাষা আমাদের গর্ব
আমাদের আত্মসম্মান।

গীতশ্রী ভট্টাচার্য

আমার ভাষা

রক্ত ঝরিয়ে ছিনিয়ে আনা ভাষা থেকে আজও
মধু ঝরে; প্রাণের বিনিময়ে প্রাণ নয়, মুখের ভাষা
বুকের ভাষা আগলে রেখেছি নিজের ঠোঁটে।
আজও মাধুর্যের সেরা প্রকাশ আমার ভাষা।

আমার চোখ , আমার মুখ কথা বলে বাংলায়
আমার চাপা রাগের গরগর আওয়াজ বাংলায় গর্জে উঠে; আমার শিকলের ঝনঝন প্রতিবাদ করে
তীব্র বাংলায় চোখে আগুন ঝরিয়ে। 

মায়ের পেটে থেকে শিখেছি যে ভাষা তার জন্য
আলাদা করে প্রেম জন্মাতে হয়না । 
রক্তের প্রতি শিরায় শিরায় বয়ে যায় ভালবাসা,
অভিমান , আনন্দ আর মৃত্যুর উপেক্ষা।

বাংলা ; তুমি আমার সত্ত্বা জুড়ে থেকে যেও যেমন আছ। আমার স্মৃতিভ্রংশ ও যেন কেড়ে নিতে পারেনা আমার জন্ম জন্মান্তরের ভাষা।

ঝিমলি আচার্য্য

প্রতিকার 

জীবন শৈলির অন্তরালে ভাষাই 
প্রাণের স্পন্দনের ঝঙ্কার ।
সাহিত্যে অবারিত প্রতিভার ধারা 
ভাষারই টঙকার ।
ভাষায় পূর্ণতা আনে ভাষারই নিয়ম-নীতি 
শৃঙ্খলার লিপিকার ।
বাচন শৈলীর কৌশল ঘটায় মিলন ,
হিংসা ,রণহুঙ্কার ।
ভাষার অধিকার যোগায় বাঁচার তাগিদ 
জাগায় অহংকার ।
মাতৃভাষাই আমাদের সর্বোৎকৃষ্ট নিদর্শন 
ন্যায্য অলংকার ।
ধ্বনি বর্ণ শব্দ - ভাব প্রকাশে মাতৃভাষা 
অবর্ণনীয় আবিষ্কার ।
অন্য ভাষা আয়ত্তে আনা চলার পথে 
অত্যন্ত দরকার ।
রফিক সালাম আব্দুল জব্বার শফিউল 
বরকত - ওদের নিরলস সংগ্রামে 
গড়েছো সংস্কার ।
বাংলা ভাষা আন্দোলনে সমগ্র বীর 
শহীদদের প্রতি ভালোবাসা শ্রদ্ধা ও 
সম্মানে আমাদের চীর অঙ্গীকার ।
মাতৃভাষা আন্তর্জাতিক মঞ্চে স্বীকৃতি,
শহীদদের ‘মা‘ এর ত্যাগের প্রতিকার ।

মিতা রায়

একুশের কবিতা..... 

একুশ মানেই বসন্ত।
একুশ মানে রক্তের ঢেউ জমা।
একুশ মাতৃভাষা মোর।
বিরোধীদের বিদ্বেষ 
করবো না কো হ্মমা।
বাংলা ভাষার জন্য জীবন করে গেলেন দান.....
শহীদ হলেন বরকত,সালাম, জব্বার, রফিক!
কৃষন্ চূড়া লাল হল শহীদ 
ভাইয়ের রক্তে.....
একুশের ফেব্রুয়ারি আমার মাতৃভাষা দিবসের বন্যা!
জন্মেছি  বাংলায়....
বচন আমার বাংলা!

ছন্দা দাম

মা তোকে ছুঁয়ে

সাদা গরম ভাতের কণায় কণায় বাংলা,
মুগডালের ফোরনের সৌরভে মা ভালোবেসে আঁকড়ে ধরে,
গ্রাসখানা মুখে তুলে যে পরিতৃপ্তি...
মা তোর মুখের আদল উঠে আসে আমার মুখে।
এক গ্লাস জলের তৃষ্ণায় খুঁজে মরি একটা জীবন...
খা খা বুকের কথাগুলো চোখে উঠে ছলছলিয়ে।
মা তুই জিভের ডগায় ছুঁয়ে দিয়েছিলি মৃতসঞ্জিবনী...
পাখির মতো তাই নিজের ইচ্ছেকে শোনাতে পারি কিচিরমিচিরে,
গামছার লাল সাদা সুতোর রন্ধ্রে রন্ধ্রে ঘামের ঘ্রাণ...
প্রাণের খোঁজে লাঙলের ফলা তোর বুক চিরে।
মা তোর বুকের রক্তে অবগাহন করে...
ভোর থেকে রাত গভীর বিনিদ্র যায় ঝরে,
আমার আমিকে খুঁজে ফিরি সবুজ পাঁজরের খাঁজে...
আমার কথারা খোঁজে ভাষা আকাশি আঁচলের ভাঁজে।।

পূজা নাথ

পাতা 

পাতা বলে আমি সব সময় থাকি গাছে,
তোমরা কি জানো ? আমার মধ্যে যে প্রাণ আছে ।
আমার গায়ের রং হলো Green, 
বসন্তকালে বদলে যায় আমার Seen ।
এই-কালে গাছ থেকে ঝড় তে হয় আমাকে,
 উড়ে উড়ে চলতে হয় বাতাসের ফাঁকে।
 কুয়াশার দিনে আমার গায়ে পড়ে শিশির ,
পরিপূর্ণ হয়ে গেলে টিপ টিপ শব্দের শোনা যায় কিচিরমিচির ।
পাতার জন্য সুন্দর থাকে গাছ,
 অপূর্ব সুন্দরে সজ্জিত থাকে আমার সাজঁ। 
গায়ের রং ঝলমল করে, 

যখন-বৃষ্টি এসে আমার গায়ে পড়ে ,
তাই সবাই বলে আমি সেরা,
সব রকমের সৌন্দর্য থাকে আমার মধ্যে ঘেরা।

মনচলি চক্রবর্তী

বাংলাভাষা

বাংলা মোদের মা 
বাংলা মোদের মাতৃভাষা, 
বাংলা ভাষার মাঝে আছে প্রান 
এই ভাষায় জাগে  বুকে শিহরণ। 
কত দেশ কত যে ভাষা,
আমার হৃদয়ে লেখা থাকুক,
 চিরকাল অমর হয়ে, 
আমার  মাতৃভাষা,  বাংলা ভাষা। 
বাংলা ভাষায় বলবো কথা,
বাংলা ভাষায় লিখবো গাথা।
বাংলা ভাষায় গাইব গান, 
বাংলা মনে আনে ছন্দ তাল।
মায়ের ভাষায় আছে সুখ 
মাতৃভাষায় জুড়ে যায় বুক।
বাংলা মায়ের মুখ দেখে
জীবন মন দেবো সঁপে।
রক্ত জড়ানো একুশে ফুটুক,
শত শ্রদ্ধার  একরাশ গোলাপ।  

দীপান্বিতা পান্ডে দীক্ষিৎ.

ভালবাসার ভাষা

ভাষা দিবসের বিশেষ দিনে মনে করি আমরা সবাই 
বাংলা ভাষা প্রাণের ভাষা বাঁচিয়ে রাখা আমাদেরই দায় |
তাই বাংলা ভাষায় কথা বলি  নয় অন্য ভাষায় 
স্বদেশে বিদেশে বাঙালীর বেশে বাংলাকেই ভালোবাসি সবাই।
সবাই বলে মাতৃভাষায় আমরা বলি তাই
আমাদের কাছে আমাদের বুলি বাংলা ভাষাটাই ।
মোদের গরব মোদের আশা কথা  বলি বাংলা ভাষায় ৷
ভাষা শহিদের উদযাপন যেন উৎসবে না হয় পরিণত ৷ 
যারা প্রাণ দিয়েছিলো এই বাংলা ভাষার জন্য ৷
 তারা এই বাংলার বুকে হয়ে আছে অনন্য।
তবুও তাদের নিঃস্পেষণ কত লাঞ্ছনা বারবার ,
রফিক সালাম জাব্বর বরকত সব আর।
 আজকের দিনে ভাষার জন্য বারাক উপত্যাকায়  দিয়েছেন যারা প্রাণ
 সেই এগারো শহিদের নাম ভুলবেনা কোনো দিন এই বাংলার সন্তান ,
 কুমুদ রঞ্জন সতেন্দ্র বিরেন্দ্র সুকোমল শচীন্দ্র তরনী চন্ডী চরণ সুনীল হিতেশ কানাইলাল কমলা এদের জানাই সেলাম,
 এই বাংলা ভাষা তাদের ই সব অমুল্য দান আমরা জানাই তাকে অন্তরের সম্মান ৷ 
এরা আর ফিরবেনা কোনো দিন তবুও এই দুটি দিনে বাঙালির মনে এদের আসন পাতা থাকবে চিরদিন বাঙালি থাকবে যতদিন ৷

শুভাঞ্জন চট্টোপাধ্যায়

ছোট গল্প

ছাতা লজেন্স 

বাসু কাকুর একটা ছোট দোকান ছিল। সামনে দোকান। পেছনে কাকুদের ছোটো একতলা বাড়ি। পুরোনো রঙচটা দেওয়াল৷ পুরোনো দরজা জানলা। একবারই গিয়েছিলাম ঐ বাড়িতে। মামার সঙ্গে। আমার হাতে দুটো বিস্কুট দিয়েছিলেন কাকু। বড় লম্বা, আর বেশ মুচমুচে। যেটুকু মনে পড়ে কাকুর দোকানের বিস্কুটের স্বাদ সেই আমার প্রথম পাওয়া। তারপর থেকে আমি মামাবাড়িতে এলেই মামা আমার জন্য ঐ বিস্কুটগুলো নিয়ে আসতেন। যার নাম হয়ে গেল ' বাসু কাকুর দোকানের বিস্কুট। ' এমন দিন এলো যখন আর মামাকে যেতে হতো না। আমি নিজেই পা বাড়াতে শিখলাম দোকানটাতে।  সে দোকান এখনো আছে। তবে আগের মতো টালির ছাদের নীচে সেই প্লাস্টার বিহীন কাঁচা ইটের ঘরখানা আর নেই। 

আমার মামাবাড়ির ঠিক পেছন দিকটায় বাসু কাকুদের বাড়ি। মাঝখানে একটা ছোট ন্যাড়া মাঠ। মাঠটা টপকালেই বাসু কাকুর দোকান। দোকানের সাথে বাড়ি। বাসু কাকুর বুড়ি মা সীমানা ঘেঁষা ভাঙা পাঁচিলের গায়ে ঘুঁটে লেপতো। মাঠের পাশ দিয়ে সরু  কাঁচা মাটির রাস্তা। শুনেছি ঐ রাস্তা নাকি মন্ডলপাড়া নামে কোন একটা গ্রামের ভেতর ঢুকে গেছে। শুনেইছি। যাই নি কখনো। বাসু কাকুর দোকানের ডাইনে বাঁয়ে রাস্তার এধারে ওধারে লোকবসতি...ছোট ছোট নীচু ঝুপরি ঘর...টিনের ছাউনি, দরমার বেড়া, টালির ছাদ, নিকোনো মাটির উঠান, ধানের গোলা, হাওয়ায় উড়ে আসা পচা গন্ধ....রাস্তার কোণ ঘেঁষে একটা টিউবওয়েল...পাড়ার কল...লোকে জল নেয়, স্নান করে....জলের জন্য লাইন পড়ে যায় প্রায় সময়ে...ঝগড়াও লাগে বিস্তর। ঝগড়া লাগে বস্তি ঘরে।

বাসু কাকুর দোকান ছাড়িয়ে ঐ দিকে মাঠের পাশে একটা পানা পুকুর। বুনো জংলা, কাঁটা ঝোপঝাড়, তাল,নারকেল গাছে ঢাকা। বর্ষাকালে মাঠ, রাস্তা সব এক হয়ে যায় থৈ থৈ জলে। পুকুর উপচে পড়ে। প্যাচপ্যাচে কাদায় হাঁটা যায় না। নীচু নীচু ঘরগুলোর ভেতরে জল ঢুকে পড়ে। নোংরা হয়ে থাকে চারিপাশ। মাছ কিলবিল করে কাদাজলে। দিনমানে ব্যাঙ ডাকে কৎকৎ করে নৈশপ্রহরীর সুরে। হাঁটতে চলতে সাপের ভয়! 

শুকনো দিনে মাঠ আবার ন্যাড়া হয়ে যায়। ঝুপরি ঘরের মোহন কাকু ভরদুপুরে খালি গায়ে লুঙ্গি পরে ভ্যান ঠেলতে ঠেলতে বাড়ি ফেরে। গরু চরে ঠা ঠা রোদে। 

মামাবাড়ির পেছনপ্রান্তের এই জায়গাটা দিয়ে লোকজন তেমন একটা যাতায়াত করতে আমি দেখি না। কি জানি কেন দেখি না। সবাই সামনের রাস্তা ধরেই চলাচল করে। ওখানেই যত দোকানপাট, লোকজন, সবুজ ঘাসে ঢাকা মাঠ...খেলাধূলা হয়, দুর্গাপুজো হয়...উৎসব, আনন্দ সব যেন ঐখানেই। এসব কিছুর মাঝে মামাবাড়ির পূর্ব দিকের জানলার সোজাসুজি বিচ্ছিন্ন দ্বীপের মতো পেছন প্রান্তে পড়ে থাকা বাসু কাকুর ঐ দোকানটাকে ক্যানভাস জুড়ে আঁকা একটা উজ্জ্বল ছবি ছাড়া আর কিছু ভাবতে পারতাম না।   

মনে আছে ছোটোবেলায় যখন যেতাম বাসুকাকুর বাবা কটু চক্রবর্তী  প্রায় সময়েই দোকানঘরের ভেতর বসে বসে ঝিমুতেন। তখন মনে হতো এই অালসে বুড়োটার নাকে সন্তর্পণে পাকানো কাগজ ঢুকিয়ে দিই। তবে ঐ চিড়ধরা, ধূলোমাখা বোয়োমের মুচমুচে টোস্ট বিস্কুটগুলো, যার স্বাদ একবার খেলে মুখে লেগে থাকতো...সেগুলো আরো বেশি ভালো লাগতো চায়ে ডুবিয়ে খেতে...সে সব বিস্কুট সত্যিই আর কোথাও খুঁজে পাই নি।  

শুধু বিস্কুটই বা কেন, নানা আকারের রঙবেরঙের লজেন্স, বুড়ির চুল, আরো এক ধরনের বিস্কুট..যার নাম বদল বিস্কুট, গজা...সব নাম মনেও নেই...মামাবাড়ি বেড়াতে গেলে দাদুর ( বাসু কাকুর বাবা) দোকানের ঐ প্রোডাক্ট গুলো ছিল আমার কাছে স্পেশাল আকর্ষণ। খাবার জিনিস ছাড়াও ব্ল্যাকে কেরোসিন তেল বিক্রি হতো বাসু কাকু দের দোকানে। জারে করে টুকটাক তেল কিনে নিয়ে যেত পাড়ার লোকে। নিঃশ্বাসের সাথে তখন যে গন্ধটা নাকে আসতো, মনে হতো নাকটাকে আরো একটু কাছে নিয়ে এসে নির্যাস টুকু ভালো করে আহরণ করি। ঐ গন্ধ যে আমার বরাবরের প্রিয়! কি জানি, দোকানের জিনিস পত্রগুলোর মধ্যে এমন কিছু ছিল, যা  অচিরেই গোটা দোকানঘরটাকেই যেন প্রিয় করে তুলেছিল আমার কাছে। 

সকালবেলা ঘুম থেকে উঠে মামার কাছে আবদার করার আগেই আমার হাতে নয়া পয়সা গুঁজে দিয়ে মামা বলতেন, ' যাতো বুবাই, বাসুর দোকান থেকে কয়েকটা পাফা বিস্কুট নিয়ে আয় দেখি ( ঐ লম্বা লম্বা চেহারার শক্ত টোস্ট বিস্কুট গুলোর আর এক নাম যে পাফা বিস্কুট সেটা মামাবাড়ি এসে তদ্দিনে আমিও জেনে গেছি)...আর যা পয়সা বাঁচে তাই দিয়ে লজেন্স কিনে খাস...রঙবেরঙের কত কি লজেন্স এসেছে ওর দোকানে...তবে ভুলেও আর ঐ সাতবাসি গজাগুলো আনিস নি যেন..পেট খারাপের একশেষ হবে..'

একবার বাসু কাকুর দোকানের ঐ গজা খেয়ে পেট খারাপ করেছিল আমার! যদিও সেটা ঐ কারণেই কিনা জানি না,  তবে খেয়ে মনে হয়েছিল গজার ভেতর কে যেন বাসুকাকুদের দোকানের কোণে টিনের ড্রামে রাখা খানিক কেরোসিন তেলের গন্ধ ছড়িয়ে দিয়েছে। 

আমার সে অসুস্থতার খবর কটু চক্রবর্তীর কান অবধি কি করে পৌঁছে গিয়েছিল জানি না। কজন লোকই বা ঐ দোকানে যায় যে গিয়ে বলবে। অবিশ্যি বাসু কাকুর সঙ্গে রাস্তাঘাটে হামেশাই দেখাসাক্ষাৎ হয় মামার। বয়সে তিনি মামার চেয়ে বেশ খানিকটা বড় হলেও বড় রাস্তার পাশে স্কুল মাঠে সন্ধ্যা হলে ওরা সবাই ব্যাডমিন্টন খেলে। বন্ধুর মতো মেশে। হয়তো তখনি শুনে থাকবে আমার পেট খারাপের খবর। অতশত খোঁজ নিই নি। শুধু কোনো একদিন মামা দোকানে গেলে কটু চক্রবর্তীর মুখ থেকে বেরিয়ে আসা সেই কথাটা আজও রসিকতার ছলে আলোচনা হয় মামা বাড়িতে... ' কইলো আমার ভাইগ্নার বলে প্যাটে অসুখ?'

এটা ঠিক, ততদিনে আমি বাসু কাকুর দোকানের বেশ পরিচিত খরিদ্দার হয়ে উঠেছি...যেহেতু মামাবাড়ি এলে থাকতামও বেশ অনেকদিন করে...আর থাকলেই দিনে একবার না একবার হানা দিতাম দোকানে। 

এরই ফাঁকে কেটে গেছে আরো কয়েক বছর।  সে গজার স্মৃতি আমার মন থেকে ততদিনে উধাও। মামার দেওয়া পয়সা নিয়ে ধাঁ করে উড়ে যাই বাসু কাকুর দোকানে। বোয়োমে সাজানো কত রঙিন সব লজেন্স...কোনোটা মাছের মতো, কোনোটা পাখির মতো দেখতে...কোনোটা আবার লিলিপুট লজেন্স...

মনে হতো কে যেন আমার চোখের সামনে রামধনুর সবকটা রঙ একসাথে সাজিয়ে রেখেছে...এক একটা রঙ মানে এক এক গড়ণের লজেন্স...আলাদা আলাদা চমৎকারীত্ব...কোনটা ছেড়ে কোনটা নিই আমি...তখন মনে হতো পুরো দোকানটাকেই সঙ্গে করে আমাদের বাড়িতে নিয়ে যাই...সাথে দাদু আর বাসু দাকেও নিয়ে যাই...ওরা ছাড়া কে ই বা আমায় এনে দেবে এসব!

কাঁপা কাঁপা হাতে কুপিতে কেরোসিন তেল ঢালতে ঢালতে আমায় উদ্দেশ্য করে একগাল হেসে দাদু বলেন, ' কাইল আসিস...একখান ভালো জিনিস খাওয়ামু...'

' কি জিনিস দাদু?'

কৌতুহলী হয়ে জিজ্ঞেস করি। 

' আসিস না। দোকানের নতুন জিনিস। আগে কোনোদিন খাইয়া দ্যাখছোস কিনা জানি না...'

ভেতর ভেতর রোমাঞ্চিত হতে গিয়েও হতে পারলাম না। বিমর্ষ চিত্তে বলি, ' কাল যে বাড়ি চলে যাবো দাদু। আর আসা হবে না তোমার দোকানে। আচ্ছা যদি সকাল সকাল আসি তাহলে পাবো?'

কিছুসময় আমার দিকে তাকিয়ে কি যেন ভাবেন দাদু।  তারপর বলেন, ' তা কইতে পারি না...ছেলেটা মাল নিয়া কহন আয় ঠিক নাই...আচ্ছা আইস ।'

' কি জিনিস দাদু বলো না একবার?'

' ছাতা লজেন। খাইছোস কোনোদিন? '

খাওয়া তো দূরের কথা, এমন জিনিসের নাম যেমন কখনো শুনি নি, এমন দোকানও আমাদের বাড়ির ধারেকাছে কোথাও নেই। আছে সেই অনেক দূর। বাজারের মোড়ে। তা আমার নাগালের বাইরে। যাবো বললেই যাওয়া যায় না। বড়দের হাত ধরে যেতে হয়। সেসব সাজানো দোকান। অনেক কিছু আছে। নেই শুধু রামধনুর অবাক করা রঙ আর একরাশ চমৎকারীত্ব...যার নবতম সংযোজন হলো ছাতা লজেন্স। 

এমন সব মজাদার, মুখরোচক, নাম না জানা জিনিস না চাইতেই হাতের কাছে পেয়ে যাওয়া কিংবা যখন তখন লাফিয়ে লাফিয়ে ছুটে যাওয়া বাসু কাকুর দোকান সেই কারণে ছোটোবেলায় মামাবাড়ি যাওয়ার মতোই আর একটা ভিন্ন আবেগের জায়গা ছিল আমার কাছে..তা সে দোকানের গজা যতই পড়ে থাকা সাতবাসি হোক। 

ছাতা লজেন্সের সাথে মিশে থাকা সেরকমই কোনো এক অপ্রাপ্তির আবেগটুকুকে মনে নিয়ে সে যাত্রায় মামাবাড়ি ছাড়লাম। লজেন্স আর খাওয়া হল না। 


দিন দুই পর মামা এলেন আমাদের বাড়িতে। খবরটা তাঁরই মুখে শুনলাম..

' কটু চক্রবর্তী গতকাল মারা গেছে। হেঁপো রুগী। শ্বাসটান উঠেছিল হঠাৎ করে। তোরা যেদিন চলে গেলি, সেদিন বেলার দিকে বাসু দার সঙ্গে রাস্তায় দেখা হলো। বললো, " বাবা কইছে ছাতা লজেন আর পাওয়া যায় নাই...পাইলে রাইখা দেবে নে..ভাইগ্নারে কইস...."

তখনও কিছু শুনিনি। কাল সন্ধ্যায় হঠাৎ শুনি এই খবর..বয়সও তো কম হয় নি!'


অনেকগুলো বছর কেটে গেছে। বাসু চক্রবর্তীর দোকানের সে দিন আর নেই। নিজের সাজানো ঘরে সে এখন কেরোসিন তেলের লাইসেন্স প্রাপ্ত ডিস্ট্রিবিউটার। বছর কয়েক আগেও যেমন কলতলায় লাইন পড়ে যেত জলের জন্য...এখন বাসুর দোকানে লোকে লাইন দিতে আসে তেল কেনার জন্য। দোকানের সামনে জারিকেন হাতে লোকের ভীড় আজ চোখে পড়ার মতো।

মামা বলেন, ' টোস্ট, লজেন্সের দোকানে বসে বসে একসময় মাছি মারতো কটু চক্রবর্তী..গুনে গুনে লোক যেত...তাও বোধহয়...বাসু দা চতুর লোক... পারমিট টা তো বাগিয়ে নিল, আর কি...নইলে ঐ টালির ছাদের তলায় বাপের মতো ঝিমিয়ে ঝিমিয়েই জীবন কাটাতে হত...আর এখন দ্যাখো একবার...জায়গার ভোল বদলে দিয়েছে..! '

সত্যিই তাই...দোকানের সাথে সাথে জায়গাটাও যেন কিভাবে বদলে গেল! যে রাস্তা দিয়ে একসময় বর্ষাকালে হাঁটা যেত না, সে রাস্তাকে দেখলে এখন আর চেনা যায় না! খানা খন্দে ভরা যে ন্যাড়া মাঠে দিন মানে গরু চরে বেড়াত, চিলড্রেনস পার্ক নামে পরিচিত সে জায়গাটাতে এখন মানুষ আসে যায়। মাঠের পাশে কোথায় সেই ভ্যানওলা, নেশাখোর মোহন কাকুর একচালা ঘর! শুনেছি কাকু মারা যাবার পর ওর বাড়ির লোক অন্য কোথায় চলে গিয়েছে বহুদিন হলো। ফাঁকা পড়ে থাকা সে জায়গাটুকু এখন চিলড্রেনস পার্কের দখলে। শূন্যস্থান এইভাবেই একদিন ভরাট হয়। ঝুপড়ি ভাঙা পড়ে। কিছু বা দূরে সরে আসে। সরে আসে পানা পুকুর, ঝোপঝাড়...একটু একটু করে চোখের আড়ালে। 

মামাবাড়ির পূব দিকের জানলার ধারে দাঁড়িয়ে এসবই দেখছিলাম সেদিন আর ভাবছিলাম.... 

এ রাস্তায় শেষ কবে এসেছি তা আজ আর মনে পড়ে না। যেটুকু মনে পড়ে, এবাড়িতে এসে একদিন সকালে  বাসু চক্রবর্তীর দোকানের পাফা বিস্কুট খেতে গিয়ে খানিকটা কামড়ে বাকিটা ফেলে দিয়েছিলাম.... এঃ! বড্ড বাজে! কতদিনের পড়ে থাকা তেলচিটে...আর খাবো না কখনো! 

মুখ ফিরিয়ে সেদিনই নিয়েছিলাম। জানি না বড় হয়ে গেছি কিনা...না কি সত্যিই অভক্তি এসে গিয়েছিল। 


বেলা পড়ে আসে। তেলের গাড়ি এসে দাঁড়ায় বাসুর দোকানের সামনে। খাকি হাফজামা আর হাফপ্যান্ট পরা বাসু কাকু মালপত্র তদারকিতে ব্যস্ত। ফুকফুক করে বিড়ি টানছে আর হাত নেড়ে কি যেন বলছে। দোকান বদলে যায়, চৌহদ্দি বদলে যায়, সময় বদলে যায়...বদল হয় না বাসু চক্কোত্তির পোষাকে। দেখাটা যদি বছর কয়েক আগে হতো, তাহলে হয়তো এমনটাই ভাবতাম। খাকি হাফপ্যান্টের বাইরে অন্য ধরনের পোষাকে বাসু কাকুকে শৈশব থেকে আমি খুব বেশি দেখিনি৷ দেখে থাকলেও সে ছবি মনে পড়ে না। মামাবাড়ির পুরোনো কথা উঠলে বাবা এখনো রসিকতা করে মাকে বলেন, ' তোমাদের সেই বাসু দা যেন পাড়ায় কার বিয়েতে গিয়ে খাকি হাফপ্যান্ট আর হাওয়াই চটি পরে ফুলসজ্জার তত্ত্ব নিয়ে বরযাত্রী দলে সবার আগে লিড দিয়েছিল? '

 কথাটা মনে হওয়ায় হেসে উঠতে গিয়েও পারলাম না। আজ সকালে মামাবাড়ি আসার সময় খুব কাছ থেকে কাকুকে দেখে চমকে উঠেছিলাম। হাফ প্যান্ট থেকে বেরিয়ে আসা পা দুটো রোগা হতে হতে লিকলিক করছে যেন। শিরা বের করা হাত...ভাঙা চোয়াল...খোঁচাখোঁচা পাকা দাড়ি...। চুল উঠে গিয়ে বড়সড় টাক পড়ে গিয়েছে মাথায়। 

সাইকেল নিয়ে যাচ্ছিলেন কাকু। যেতে যেতে  দাঁড়িয়ে পড়লেন৷ 

' বুবাই না? কতদিন পর দ্যাখলাম..! '

' আপনার চেহারা তো..!'

মা অবাক হয়ে বলেন। 

' আর বলিস ক্যান..ও শালা সুগার যারে ধরবে...'

বাসু কাকু দাঁড়ায় না। 


তেলের গাড়ি মাল খালাস করে মন্ডলপাড়ার রাস্তা ধরে বেরিয়ে চলে যায়। প্যান্টের ফাঁকে হাত গলিয়ে ঘ্যাঁষ ঘ্যাঁষ করে পাছা চুলকোতে চুলকোতে ঘরের দিকে হাঁটা দেয় বাসু কাকু। খকখক কাশির আওয়াজ। দূর থেকে একটা পেট ড্যাগরা রিকেটের রোগী বলে মনে হচ্ছে লোকটাকে। নাকি সময়ের আড়ালে হারিয়ে যাওয়া কোনো এক অচেনা মানুষ? যে ই হোক, সে আমার বাসু কাকু। ঐ খাকি পোষাকটা আমার চোখে এভাবে  একদিন অনভ্যস্ত , বদখত হয়ে উঠবে সত্যিই ভাবিনি।

পেছন থেকে মামার গলার আওয়াজ শুনে ফিরে তাকাই....

' এ বুবাই, তোর সেই ছাতা লজেন্স... '

নামটা যেন খট করে কানে এসে বাজলো। 

' হ্যাঁ রে...' মামা বলে চলেন..' কাল খেলার মাঠে বাসু দা  বলছিল..ওর বাড়ির কোন ঘুঁজির মধ্যে একটা তোবড়ানো টিফিন বাক্সের ভেতর রাখা ছিল ঠোঙায় মোড়া অনেক কটা লজেন্স...ঘরের আনাচকানাচে পরিষ্কার করতে গিয়ে আবিষ্কার হয়...ঠোঙার গায়ে বাঁকা বাঁকা অক্ষরে পেনসিলে লেখা.."আমার ভাইগ্না বুবাইয়ের জন্যে ছাতা লজেন..."

ও নাকি কটু চক্কোত্তির হাতের লেখা। বোঝো ঠ্যালা, সে লোক মরে গিয়ে জন্ম নিয়ে নিল...বাসু চক্কোত্তি পুরোনো ব্যবসা তুলে দিল...ঠোঙার কাগজ হলুদ হয়ে গেল... আর সে লজেন্স অ্যাদ্দিনেও ফুরোলো না...বাসু দা টিফিন বাক্স খুলে দ্যাখে ছাতা লজেন্সে ছাতা পড়ে একশেষ...সিকিভাগ রঙও অবশিষ্ট নেই.. রীতিমতো গল্প হয়ে যায় আর কি! তবে তোকে ভালোই বাসতো বুড়ো...দেখা হলেই.."আমার ভাইগ্না.."


শরতের অপরাহ্ন। নির্মেঘ, নীল আকাশে অবসন্ন বিকেলের রোদটুকু ক্রমশ সূর্যাস্তের কোলে ঢলে পড়ে। চিলড্রেনস পার্কের কোণ ঘেঁষে শুকনো ন্যাড়া আমগাছটার হেলে পড়া গুঁড়িটা কোনোরকম করে দাঁড়িয়ে থাকে এক অদ্ভুত ছায়াময়তার মাঝে। ছেলেবেলায় পেড়ে পেড়ে খাওয়া কাঁচা আমগুলো পেকে গেলে পরে আর মুখে দেওয়া যেত না। টকে বিষ। সে ফেলে আসা বেলা যেন আজও পড়ে রয়েছে কোথাও একটা। পার্কের ওপাশ থেকে অন্য গাছের ছায়া এসে পড়েছে গুঁড়িটার গায়ে, মাঠের কতকাংশ জুড়ে।

ভিন্ন এক স্বাদ বুকে নিয়ে মামাকে জিজ্ঞেস করি, 

' আচ্ছা মামা, তুমি কখনো ছাতা লজেন্স খেয়েছো?'

প্রশ্নটা যেন ভেতর থেকে বেরিয়ে এলো। 

' না রে দেখিইনি কোনোদিন, তো খাওয়া। কাল ঐ কাহিনী শুনে বাসু দাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম...ছাতা লজেন্স...ও  নিজেই খায়নি। ওরা কেউ খায় নি। স্বাভাবিক, যারা বিক্রি করে তারা কি আর খায়। সারাজীবনে ঐ লজেন্স নাকি ওর দোকানে দু একবারই এসেছিল...আর কোনোদিন...বিক্রি হতো না বোধহয়...তোকেই যত গছাতো.. '

' না গো। ও লজেন্স আমিও খাইনি। দেখিওনি কখনো।'

'  হবে ঐ একরকম। কত কিছুই তো বেরোয়, একসময় উঠেও যায়...আমাদের কালেও তো কত কি ছিল...সেগুলো খেয়েছি, তাই স্বাদ মনে আছে...যা দেখিনি তার স্বাদ কি করে মনে থাকবে….ওসব জিনিস কটু চক্রবর্তীর ধূলোপড়া বোয়োমেই পড়ে থাকতো...দোকান কি আর এমনি এমনি ওঠে.. '

আরো কতকাল, কতবছর কেটে গেছে। কত রাস্তা পেছনে ফেলে এসেছি...কত ধূলোকনা উড়ে এসেছে পায়ে...কত অচেনা অদেখা কৌতুহল জন্ম নিয়েছে জীবনকে ঘিরে, আবার মিলিয়েও গিয়েছে সময়ের সাথে...তবু ছাতা লজেন্স নামে কোনো এক বিশেষ অস্তিত্বের সন্ধান, এমন কি সেই অস্তিত্বের আঁচটুকু পর্যন্ত আর কোথাও কোনোদিন কারো কাছে খুঁজে পাই নি। শুধু কেন জানি না মনে হয়, বহু অতীতে ফেলে আসা পথের ধূলিকনার সূক্ষ্ণ স্তরে আজও যেন সঞ্চিত রয়েছে ঠোঙায় মোড়া আমার সে অচেনা, অদেখা ছাতা লজেন্সের স্বাদটুকু..তা সে যেমনই হোক। '

ভাবতে গিয়ে কটু চক্রবর্তীর মুখখানা ছবি হয়ে ভেসে ওঠে চোখের সামনে। কাঁপা কাঁপা হাতে কেরোসিন তেল ঢালছেন কুপিতে। তার সঙ্গে সেই আমার শেষ দেখা। 

এ রাস্তা ফুরোবার নয়।।

চন্দ্রা বিশ্বাস

উৎসের সন্ধানে

শব্দ খুঁড়ে পরাগ-রেণুর উৎস খুঁজে পাই,
ফুলদানীতে আদর করে কবিতা সাজাই। 
ছন্দে-সুরে-লয়ে কলম প্রার্থনা সঙ্গীতে,
শিল্প সাজে চোখ বুঁজেছি জীবন অঞ্জলিতে। 
বিতর্কিত মুহূর্তেরা কাটাকুটি খেলে,
ভালবাসার চোরাবালিতে সাবধানে পা ফেলে। 
জল থই থই দোয়াত উথল, কলম রাঙায় মন,
আনমনা দিন মনের ভুলে পেরোয় রাত-উঠোন। 
হঠাৎ জ্বলে উঠল আলো 
মনের কোণের কোন গহীনে,
কারা ওরা? কাঁদছে বসে অন্ধকারের রাত উঠোনে। 
জব্বর ভাই, সালাম, রফিক ,
তোমাদেরকেই স্মরণ করি ,
ভুলিনি ভাই, ভোলা কি যায়? 
আজ একুশে  ফেব্রুয়ারি।

জয়িতা ভট্টাচার্য

ভাতের কথা

কাজের সীমান্তে মেঘ জমছে মেঘের গায়ে মেয়ে।মরা বিকেলের আলোয় রাস্তারা বদলে ফেলছে নাম।স্বপ্নে ভীড় করে আসছে মন্দির।আমাদের অন্ধকার শরীর থেকে খসে  পড়ছে ছায়া।আমাদের সত্যি কোনো উপায় ছিল না।মসজিদ ভিজে যাচ্ছে বৃষ্টিতে বৃষ্টিতে।পড়ার বই খুলে রক্ত দেখছে ছেলে।এক ফোঁটা রক্তের নাম জীবন।নদীর ধারে একলা বসে মিনুআপা।পুরোনো রুটে টোটো  চালায়,ওর ছেলে।

ফিরবে রাতে।


চাল আনলে ভাত বসাবে ওর দিদি।

তন্ময় দাস

শক্তিমান 

আগের মতো নেই কনো দাঁত 
চুল গুলো যেন ধব ধবে সাদা 
আগের মতো শক্তিশালী 
দেখায় না কেউরে !

নরম নরম খাবার খেয়ে চলতে হয়
এই সারাটা দিন,
আস্তে ধীরে চলাফেরা করে
শুয়ে বসে কি দিন যাই কাটে ।

অতীতের দিন গুলো 
যত মনে পড়ে বেশি
মন চায় যেন
আগের দিন গুলো যাই ফিরে !

বৃদ্ধ বয়সে কত না সখ 
মুখে ছিল হাসির কৌতুহল।

শ্বেতা ব্যানার্জী

আমি উত্তর রেখে গেলাম

আমার উত্তরপুরুষের জন্য কী রেখে গেলাম, 
তারা কী ঘৃণার চোখে দেখবে আমার হাঁটার পথ।
ক্রমশই ভাষার উপর জমছে শীতলতা। 
সেই যুদ্ধ জীবন ছিল, যার আজ  জ্যোতি চলে গেছে। 
সেই যুদ্ধ কী ছিল শুধুই পূর্বপুরুষের! 
কেন আজ ক্লীব হয়ে গেছি।
সময়ের সুখে ন্যুব্জ জনসাধারণ কৈফিয়ত চাইনি,
হাঁটেনি মিছিলে অথবা বুক পাতেনি বুলেটের সামনে, 
অন্ধকারময় গোপনে গোলামী করেছে আপোষ। 
কী জানি কী চোখে দেখবে আমার উত্তরপুরুষ।
সময়ের ঘড়ি থেমে গেলে সুখ কী বলবে আছি!
হ্যাঁ আছি, মাতৃদুগ্ধ পান করে,
মাতৃভাষার অধিকার প্রতিষ্ঠা করা শহীদের সন্তান হয়ে।
ক্ষত জীবনের  কাছাকাছি।

কৃষ্ণকুসুম পাল

পাখী প্রেমের জীবন

পাঠশালায় চড়ুুই প্রেম প্রাথমিক হাতে খড়ি,
কলেজে শালিক প্রেম উচ্চতর বুকে ধরি,
ময়ূূর প্রেমে ভবঘুরে, বিরহী, বেরোজগারী।
চাকরী হলো,প্রেমের টিয়ার ভাগ্য ফিরল না,
অচেনা আনাগোনা,নানা আলাপ, পাখীর গবেষণা,
বিয়ে হলো,কবুুতর প্রেমে প্রাণ এলো না।
বুঝে গেলাম,আমার সব লক্ষ্মী পেঁচার   হাতে বাঁধা,
জটিল জীবন- মিষ্টি মরণ,বাবুুই এর গোলক ধাঁধা,
মোরগ পৌরুষ অসহায়,ভয়ে খাঁচায় ময়না  কাঁদা।
শিখে গেলাম কোকিল প্রেম,নিখুঁত মাছরাঙা অভিনয়,
কাকাতুয়া ভালো আছি,ছৌ নাচা চিলের নকল বিনয়,
কাকের খিস্তি,খেউর,তবু বশ্য, কোন শব্দ নয়।
দেখি বেশী, শুনি বেশী,চাতকের কথা কম,
বুঝিনা কিছু,ভাবিনা কিছু,চাতকের কথা কম,
চলছি মৃত,মিষ্টি হাসি,যত্নে ধরি ধবল বক এর দম।

Jan 19, 2024

মিলনকান্তি দত্ত

পবিত্র লাইবেল

আমি মরে গেলে হয়তো 
আমাকে একটা সমগ্রে 
ভুল বানানে ছেপে দেওয়া হবে।
তার আগে 

অক্ষয় মনীন্দ্র গুপ্তের মালবেরিবাগানটা 
নাশকতার কীট হয়ে খাই। একদিন
কবিতার অনটনে টাকাপয়সারা খুব সস্তায় 
নিজেদের বিকিয়ে দিয়ে
একটা প্রকাশক কিনবে। টম-ডিক এন্ড হ্যারি 
যে কেউ সোল্লাসে ফেটে পড়ে বলবে, 
মিলনকান্তি নিজেই একটা পুরস্কার। বোর্ডবাঁধাই নয়

নিরীহ পেপারব্যাক, যার প্রতিটি কথাপৃষ্ঠাই
কবিতার বিরুদ্ধে পবিত্র লাইবেল!

মাহমুদ কামাল

নষ্ট চাঁদ ঘরের ভেতরে

নষ্ট চাঁদ ঘরের ভেতরে
বিকেলের ভ্রমণ শেষে
সন্ধ্যার বন্ধ্যায়
ঘরে ফেরা
একাকী জীবনে নেই
রাগ অনুরাগ
তবে, ভালোবাসা আছে
সৌন্দর্যের অপার বিস্ময়
মন জুড়ে আছে
শুধু কোলাহল নেই
একটি জীবন ঘেঁষে উঁকি দেয়
নষ্ট চাঁদ ঘরের ভেতরে।