পতাকা
Aug 17, 2022
সত্যজিৎ দত্ত
তৈমুর খান
ভাঙাদেশের মানুষ
এপাশে ওপাশে কাঁটাতার
মাঝখানে আধখানা সংসার
এপাশ ডাকে, ওপাশ ডাকে
গঙ্গা-যমুনা বয়ে যায়
একুশের ভাষা, উনিশের ভাষা ওড়ে
রক্তের ভাষা বাংলা ভাষা
স্পর্ধায় শির তোলে
কেন তবে ভাঙা দেশ?
ধর্মান্ধরা ধর্ম পোড়ায় আগুন জ্বেলে!
দীপান্বিতা ভট্টাচার্য
পঁচাত্তরের আনন্দে সবাই মাতোয়ারা,
চারদিকে শুধু আনন্দ উল্লাসে ঘেরা....
ত্রিরঙ্গায় চারিদিক আলোকিত,
জয় হিন্দ শব্দে আকাশ বাতাস মুখরিত।
সবাই এক সুরে এক ই ছন্দে গাইছে বন্দেমাতরম্..
শুভেচ্ছা বার্তা সবার কাছে পৌঁছে যাচ্ছে আগাম।
কত শহীদদের রক্তের বিনিময়ে আমাদের স্বাধীনতা!
কত বীরের ত্যাগের গল্প আছে ত্রিরঙ্গায় গাঁথা।
আমরা হয়েছি স্বাধীন বিদেশীর কবল থেকে।
কিন্তু স্বাধীনতা পেলাম কই...
গভীর রাতে রাস্তায় যখন কোনো তরুণীর থাকবে না ভয়;
যেদিন দুই কন্যার মায়ের সম্মান হবে না ক্ষয়,
জন্মের আগে হবে না ভ্রুণ হত্যা;
সেদিনই পাব আমরা প্রকৃত স্বাধীনতা।
Aug 15, 2022
মীনাক্ষী চক্রবর্তী সোম
পঙ্কজ কান্তি মালাকার
ভাই-ভাই (ছোটগল্প)
(স্থান কাল পাত্রের সাথে কোন মিল থাকলে তা সম্পূর্ণরূপে কাল্পনিক।সবার আবেগ ও সবাইকে সন্মান রেখে সম্প্রীতিকে উদ্দেশ্যে রেখে রচিত।)
▪️স্বাধীনতার অমৃত মহোৎসব উপলক্ষে স্থানীয় বিধায়ক একটি কনসার্ট আয়োজন করেছেন। ব্রহ্মপুত্র নদের পারে এক বিশাল মাঠে জাঁকজমকপূর্ণ আয়োজন। স্থানীয় গায়ক ব্যান্ডের পাশাপাশি অনুষ্ঠানের এক আকর্ষণ বলিউড-টলিউড খ্যাত গায়ক রূপম।রূপম আসামের পাশের শিলিগুড়ির ছেলে, ভালো অসমিয়া জানেন, কয়েকটি অসমিয়া সিনেমায় কন্ঠ দিয়েছেন। আসামে বেশ জনপ্রিয় রূপম পাল।
মুম্বাই থেকে ফ্লাইটে যোরহাট এসেছেন সন্ধ্যের পর। ততক্ষণে স্থানীয় ব্যান্ডেরা অনুষ্ঠান শুরু করেছেন। বিশ্রাম নিয়েছেন অনুষ্ঠান স্থলী থেকে অনতিদূরে এক বিশ্রামাগারে, ব্রহ্মপুত্রের জলছোঁয়া স্নিগ্ধ বাতাসের সাথে ভেসে আসছে অসমিয়া ভাষার মাধুর্য।মন একেবারে স্নিগ্ধ হয়ে উঠলো,স্টেজে উঠেই প্রথম গাইলেন 'বন্দেমাতরম -সুজলাং সুফলাং মলয়জশীতলাম', গাইলেন 'লুইতর দুপারে', গাইলেন- 'আমি ভারতর,ভারতর ওপজা মাটি এই/মিলি যাম মাটিতেই/এই মাটিয়েই স্বর্গ'।তারপর গাইলেন একটি হিন্দি গান 'মা তুঝে সেলাম,আম্মা তুঝে সেলাম'।জানেন শিবসাগরে প্রচুর বাঙালি থাকেন,তাই একটি রবীন্দ্র সংগীত ধরলেন 'ও আমার দেশের মাটি তোমার ঠেকাই মাথা' -এক কলি গেয়ে উঠতে পারলেন না ভিড় থেকে একদল আওয়াজ উঠে এল 'ইয়াতে বঙ্গালি গান নচলিব, অসমিয়া গাওক অসমিয়া গাওক', থমকে গেলেন। স্টেজের পাশে চেয়ার থেকে বিধায়ক বাবু সাহস জুগিয়ে বললেন 'গাওক গাওক,এটা বঙ্গালি গাওক,ইয়তের মাত শুনিব নালাগে।' আবার ধরলেন 'ও আমার দেশের মাটি তোমার পরে' ছুটে এল একটা জুতো তার দিকে। থামিয়ে দিলেন গান। নড়েচড়ে বসল আয়োজকরা,ভিড়ের মধ্য থেকে উৎপাতকারীদের চিহ্নিত করা হলো, অনুষ্ঠান স্থলীতে শুরু হলো একটা উৎপাত ।
বিধায়ক বাবু এসে রূপমের কাছে ক্ষমা চাইতে লাগলেন, তখনই হাতে মাইক নিয়ে শুদ্ধ অসমিয়ায় রূপম বলল," যারা জুতো ছুঁড়েছে তাদের তাড়িয়ে দিওনা, আমি কিছু বলতে চাই,তারা শুনুক।
কোথা থেকে বাংলা শুনবেন না? অনুষ্ঠানের শেষেই যে জাতীয় সঙ্গীত গাওয়া হবে সেটা বাংলা ভাষায়। আপনি যে অসমিয়া বলছেন তা বাংলারই মেয়ে। হাতে একটা নোট নিয়ে দেখুন প্রথমে অসমিয়া তার নীচেই বাংলা, একশ' টকা আর একশো টাকায় শুধু একটা স্বরবর্ণের তফাৎ।এটা স্বাধীনোত্তর ভারত,দেশ সংবিধানে চলে,এটা বহুভাষাভাষী মানুষের ভারত। ভারতের কোথাও কোন ভারতীয় ভাষা ব্যবহারের বাধা নেই। আমাদের এক পরিচয় আমরা ভারতীয়।তারপর আমাদের ভাষিক পরিচয়, আসাম বহুভাষিক রাজ্য এখানে এক তৃতীয়াংশ বাংলাভাষী বাস করেন। সবাইকে সঙ্গে নিয়ে সম্প্রীতি সহ বাস করতে হবে।
আপনারা আমাকে শিলিগুড়ির ছেলে হিসেবে জানেন,হয়তো আমাকে বঙ্গাইগাঁওয়ের ছেলে হিসেবে জানতেন,যদি আশির দশকে দাঙ্গায় আমাদের পরিবার আতঙ্কে আসাম ছেড়ে উত্তরবঙ্গে না যেত।এমনি কত হাজার হাজার ডাক্তার ইঞ্জিনিয়ার শিল্পী খেলোয়াড় ব্যবসায়ী সাইন্টিস্ট আসামের এড্রেসের বদলে অন্যত্রের এড্রেস লিখছে। আমি বাঙালি ভালবেসে অসমিয়া গাই, দুটো ভাষা পৃথক মনে হয় না।এই যে আমি অসমিয়া বলছি ,আমাকে অসমিয়া লাগছে তো?"
ভিড় থেকে উঠে এলো- হুমম।
"তাহলে কেন এই ভাষা বিদ্বেষ।জানেন আশুতোষ মুখার্জি প্রথম কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে অসমিয়ায় পাঠক্রম শুরু করেন। সুধাকন্ঠ ভূপেন হাজারিকা,পাপন,জুবিনদা'কে বাঙালিরা ভালবেসে আপন করে নিয়েছে,এই ভালোবাসাকে অটুট রাখুন,একটি সম্প্রীতির দৃষ্টান্ত আসাম গড়ে তুলুন, বাঙালি অসমিয়া ভাই-ভাই হয় কি না?"
ভিড় থেকে উঠে এলো- হয়য়য়য়।
তারপর তিনি রবীন্দ্রসঙ্গীতটি শুরু করলেন,আরো দুয়েকটি অসমিয়া গেয়ে আরেকটি দ্বিজেন্দ্রগীতি গাইলেন 'ধনধান্যে পুষ্পে ভরা আমাদের এই বসুন্ধরা' সবাই তাল মেলালো কোথাও কোন আপত্তি উঠলো না।
রূপমের ভিড়কে এই ম্যানেজমেন্ট দেখে বিধায়কজন আপ্লুত হয়ে রূপমকে বাহবা দিলেন,"আমরা রাজনৈতিক ভাষণে এভাবে সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠার ভাষণ দিয়ে কতটুকু বোঝাতে পারি জানিনা, তুমি খুব সুন্দর করে বোঝালে।"
ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট গ্রুপ যত্ন সহকারে তাকে দেখাশোনা করলো। পরদিন সকালে এগারোটায় ফ্লাইট।
গতরাতের তার বার্তা ছড়িয়ে পড়লো নিউজ মিডিয়ায়, সোশ্যাল মিডিয়ায়। সকাল হতে হতেই আসতে শুরু করলো বিভিন্ন প্রতিক্রিয়া।যত সমর্থন এসেছে তার থেকে বেশি বিরোধিতাও এসেছে। বিভিন্ন প্রাদেশিকতাবাদী সংগঠন মন্তব্যে খিলঞ্জিয়া অসুরক্ষিত,জাতি মাটি ভেটি অসুরক্ষিত ইত্যাদি মন্তব্য ভেসে আসছে নেট মাধ্যমে। তার মন্তব্যের বিভিন্ন অংশের কাটাছেঁড়া ক্লিপ নেট মাধ্যমে ভাইরাল হচ্ছে। কিছু অনলাইন মিডিয়া প্রচার করছে সে বাঙালি প্রভুত্ব প্রচার করেছে।
বিধায়ক ও প্রশাসনের তদারকিতে পুলিশি প্রহরায় তাকে এয়ারপোর্টে পৌঁছে দেওয়ার তড়িঘড়ি। অসমিয়া কিছু পিঠাপুলিতে ব্রেকফাস্ট সেরে গাড়িতে চাপলো রূপম।পথে যেতে যেতে কিছু ব্যাপার নজরে পড়লো,একটা বিপত্তারিণী পূজার পোস্টারে কালিমাখানো, একটা ভারত সেবাশ্রমের ব্যানারে র-য়ে কালি মাখানো, একটা বাংলা মাধ্যম স্কুলের দেওয়ালে 'ভারত আবার জগৎসভায় শ্রেষ্ঠ আসন লভে'-বাণীতে কালি মাখানো, এবার মুখ ফিরালো, এয়ারপোর্ট অবধি আর বাইরের দিকে তাকালো না।
সৌমিত বসু
একটা কুয়োর ভেতর কিভাবে ঢুকে যাচ্ছে
গোটা ভারতবর্ষ।
একটা কুয়োর ভেতর থেকে কিভাবে জেগে উঠছে অন্য পৃথিবী।
মাঠের ভেতর সাধারণ একটা কুয়ো,কিভাবে আজও আমাদের হাত ধরে এগিয়ে নিয়ে চলেছে অন্ধকার থেকে আলোর পথে।
আমার ছেলে যখন পাঞ্জাবে পড়তে গেল
তখন প্রথম আমার মনে পড়েছিলো তোমাকেই।
পরিবারের কেউ ভেবেছিলো স্বর্ণমন্দির কিংবা ভিন্দ্রেওয়াল,
কেউ অপারেশন ব্লু-স্টার আবার কেউ বা
ইন্দিরা গান্ধী অথবা মিলখা সিং
আবার হয়তোবা সব ছাড়িয়ে কারোর কারোর মনে পড়েছিলো সারা ভারত জুড়ে অকারণ শিখ নিধন।
আমার কিন্তু শুধু মনে হয়েছিল একঝাঁক গুলি আর জেনারেল ডায়ার।
একটা কুয়োর ভেতর যদি ঢুকে যায় একটা উপমহাদেশ
কিংবা হাজার হাজার স্বদেশীর লাশ,
একটা কুয়োর ভেতর যদি ঢুকে পড়ে গোটা পাঞ্জাব কিংবা গ্যালন গ্যালন রক্ত,
ঠিক তখনই জেগে ওঠে ফিনিক্স পাখিরা,
আশ্চর্যজনকভাবে ডানা মেলে জন্ম নেয় কাশ্মীর থেকে কন্যাকুমারী
হাজার হাজার মানুষের বুকে এঁটে থাকা ঘৃণ্য বুলেট,সমস্ত গা বেয়ে গড়িয়ে পড়া গরম কুমকুম।
আজও অবাক হয়ে দেখি
একটা কুয়োর ভেতরে থেকে কিভাবে বেরিয়ে আসছে উন্মত্ত কৃপাণ,
একটা কুয়োর ভেতর থেকে কিভাবে জেগে উঠছে ভারতের স্বাধীনতা।
সন্দীপ সাহু
খোকন সাহা
শুনছি, ফুসফুসের মধ্যে দু - খানা ইটের বাকী ।
তারপরই ইঞ্জিন ঢুকবে।সব দেশ উঠানামা করবে।
যদি চুন কালি বেশি থাকে
তাহলে দশের ঘাড়ে অক্সিজেনের শুল্কঘর
আকাশ ফাঁটাবে। স্টেশনের পাশে ভুলবকা খিলকষা
নিল-ডাউন রোডে কান মলে হাত ;
আর ট্রাফিকের খা খা অঙ্গারে
ডানা ঝাপটে ওঠে তীব্র পলাশ।
এভাবে এক ছাত্রের জোরে জোরে
রচনা বসন্তকাল পড়া, আর ব্যাকরণের নিপীড়নে
নিপাতন শিক্ষক -হামাগুড়ি দেয়
ফুসফুসের যানজটে জড়িয়ে পড়া
হাজার হাজার জ্ঞানবাতির তীব্র তাড়ন হর্ণে।
উর্দ্ধ নিঃশ্বাসের নিরুদ্বেগ তলে
অনেক রক্তজলের নদী মাথা তুলতেই -----
অন্ধকারের পিঠে বজ্রবিদ্যুতের কয়েক ঘা....
হাসিমুখ ভারতবর্ষ ----
অকৃতকার্য ছাত্রের পিতারে বলেনঃ
এতো রাত্রে বাড়ী ফিরলে
কিভাবে দুরূহ পাঠের তর্জমা করবে
মাতৃবিহীন দেশের শুদ্ধাচারে।
বিশাখা অধিকারী
ভাসান (কাহিনী)
১৯৭১ সাল , গোটা গায়ে আগুন । কেউ পালাচ্ছে কেউ ছুটছে কারো ঘুমন্ত শিশু আগুনে জ্বলে মরে যাচ্ছে । কেউ আবার শিশু ভেবে পাশবালিশকে কোলে নিয়ে ছুটছে । এবারে টার্গেট বাবুর বাড়ি । কালীপুরের বাবুদের ভরপুর সংসার এক মুহূর্তে যেন ছন্নছাড়া হয়ে গেল ! পোড়ে ছাই হয়ে গেলো বহুবছরের জমানো সম্বল বিশাল জমিদারি । পালিয়ে বাঁচারও পথ নেই ! যেখানে পাবে হত্যা করবে । রাজাকাররা আসলে কোনো সম্ভ্রান্ত ব্যক্তিত্বকেই ছাড়ছিলো না । লড়াইটা তখন শুধু রাজনীতি বা ধর্মের নয় , ভাষারও! ভরসা শুধু রাতের অন্ধকার ! প্রাণে বাঁচতে চাইলে এই নতুন দেশেই যেতে হবে । আশা , নিরাশা অনেককিছু বুকে নিয়ে তিনি ডিঙি নৌকাকে সাথী করে ছুটলেন অজানার উদ্দেশ্যে। অজানা পথে নৌকা এসে ঠেকলো শিলং পাহাড়ে। সেখান থেকেই শুরু তাঁর অনন্ত ভাসান …
নবীনকিশোর রায়
যে ভাবে শীতঘুম পেয়ে বসে, অভ্যাসবসত এক সময় ভুলেযাই
ফসল ফলানো মাঠ,
বিগত বছরগুলোর ধুলোউড়া কসরত,
ভাতযুদ্ধের কর্ষণ সকাল---
এভাবে বিস্মৃত করে দেয় আমাদের অতীতের বর্গীহানা আর তেভাগার দুর্বিসহ ইতিহাস।
সহসা বর্ষা ঘুরে আসে আবার
চাঙ্গা হয়ে উঠে চড়কমেলা,
জগন্নাথের রথের দড়ির টান
মনসামঙ্গল পুথিপাঠ, স্বাধীনতা উৎসব একে একে আরোগ্যেধাম সকল ।
দুঃখ জাগানিয়া ভাসানের গানে
সওদাগরী বাণিজ্য তরী ভাসে,
আমাদের বহুশ্রমে জড়িত বোঝাই করা ফসল নিয়ে দূর অজানা দেশে ।
শ্রাবণ আকাশ ভেঙে বর্ষা পতন
জাগিয়ে রাখে চালাঘরে জলশয়ন---
ছিদ্র বেয়ে অতি সুক্ষ্মধারায় নেমে আসে নিত্য জাগরণ,শীত গ্রীষ্ম বারোমাস মাটির ঘরে পিছু ছাড়ে না!
শান্তনু ভট্টাচার্য
তিনটে রঙের পাখা মেলে উড়ছে স্বাধীনতা
যাবতীয় নিষ্ঠুরতা অপমান বেকারত্বের সঙ্গীত
সাদা রঙের মাঝখান দিয়ে অবলীলায় খেলে যাচ্ছে
হিংসা ধর্ষণ জাতপাত অস্পৃশ্যতা সাম্প্রদায়িকতার কাব্য
আর সবুজ রং বরাবর প্রতিফলিত হচ্ছে
তীব্র অনাহার দারিদ্রতা বর্বরতা মেরেলুটে খাওয়ার নাটক
তবু তিনটে রং যখন পতাকা হয়ে উড়তে থাকে
বুকে ভালোবাসা -চোখে স্বপ্ন
আর হাত দুটো খুঁজে বেড়ায়
নতুন করে গড়ার মতো কিছু মাটি...
সুমিতা বর্ধন
স্বাধীনতা ঠিক কাকে বলে ?
স্বাধীনতার সংজ্ঞা কি?
স্বাধীনতা কোথায় মেলে?
নিজের মনেই প্রশ্ন করে মেয়েটি।।
যে ছেলেটি বটতলা বাজারের গোলচক্করে
প্রতিদিনের মতো দাঁড়িয়ে থাকে
একটা কাজের আশায়,
বুট পালিশ করা ছেলেটা রোজ
অপেক্ষা করে বাবুদের জন্য ,
কাজের মেয়েটা দেরি হয়ে যায়
তাই উর্ধ্বশাসে দৌড়ায় কাজের বাড়িতে,
রাস্তায় সব্জি ওয়ালা হেঁকে যায়
আর, বাজারে ভিড় ব্যস্ততার মাঝে
কেউ কেউ নাওয়া খাওয়া ভুলে যায়।
অফিসের বড় বাবু ফাইল হাতে দৌড়ায়
এঘর থেকে ওঘর ,
আর ক্যালেন্ডারের পাতায়
চোখে থাকে মাইনে পেলে যে
বাঁচবে সংসার।
শ্রমিক ,মজুর, মেহনতি মানুষ
কাজ ,খাদ্যের জন্য
ভুলে যায় স্বাধীনতার সংজ্ঞা।
যে মেয়েটিকে জন্ম হতেই বুঝিয়ে দেওয়া হয়
একটা ঘেরা টোপের মধ্যেই তাঁর স্বাধীনতা,
যে মেয়েটি বাপের ঘর ছেড়ে
শ্বশুর ঘরে যায় তারপর ছেলের সংসারে,
মেয়েটি বোঝে না আসলে স্বাধীনতার সংজ্ঞা কি,
উচ্চশিক্ষিত ছেলেটি প্রাইভেট কোম্পানির -
কোটি কোটি টাকা মুনাফার জন্য বিসর্জন দেয় তার স্বাধীনতাকে,
ফুটপাতের ছেলেটি যখন পতাকা নিয়ে
বার বার মাথা ঠেকায়
আর উপহার পাওয়া কমলা লেবু আর চকলেটকে ভাবে
স্বাধীনতা দিবসের প্রসাদ,
তাঁর কাছে স্বাধীনতা দিবসের
কোন সংজ্ঞা নেই এর বেশী,
মেয়েটি অবাক হয় আবারো
বুঝে উঠতে পারে না কিছুই
আসলে মেয়েটি আর এখন মেয়ে নেই
অনেক বছর পেরিয়ে আজ সে
অশীতিপর বৃদ্ধা
অবাক চোখে তাকিয়ে থাকে
বুঝে উঠতে পারে না কিছুই,
বির বির করে বলে যায় এই স্বাধীনতা কি অন্য স্বাধীনতা?
সুবীর সরকার
মনচলি চক্রবর্তী
মুক্তির স্বাদ
ছোট আদরের মিঠু, বয়স ৭- ৮ বছর হবে। ছোট্ট গ্রামের বাড়ি তাদের, সবুজ সুন্দর পরিবেশে। গাছের ছায়ায় ফুলের বাগানে হেসে খেলে ঘুরে বেড়ায় মিঠু। বাড়িতে মা,বাবা,দাদু,ঠাকুমার সাথে আনন্দে কেটে যায় তার দিন।
বাড়িতে অনেক গাছ, কত পাখী উড়ে আসে বসে গাছে বাসা বাঁধে ।একদিন ঝড় হয়, সেই ঝড়ে বাড়ির আমগাছটা থেকে দুটো পাখীর ছানা বাসা ভেঙ্গে মাটিতে পড়ে যায়।
মিঠু তো দেখে খুব খুশী। পাখীর ছানা দুটো পুষবে বলে মনস্থ করে সে। দাদু তাকে একটি খাঁচা এনে দিলেন, তাতে পাখীর বাচ্চা দুটো রেখে শুরু হলো মিঠুর পরিচর্যা। প্রতিদিন যথাসময়ে ওদের জল, দানা দেওয়া হতে থাকলো। বেশ কিছুদিন পরে দেখা গেলো যে, বাচ্চা দুটো বড় হয়ে গেছে, ওড়ার চেষ্টায় ডানা ঝাপটাচ্ছে। মিঠুর দাদু বললেন " মিঠু বাচ্চা দুটো বড় হয়ে গেছে, বেড়াল কুকুর আর এখন ওদের কিচ্ছু করতে পারবে না, ওরা এখন আর খাঁচায় থাকার জন্য নয়, ওদেরকে উড়তে দিতে হবে।" মিঠু বলল, " না দাদু, ওরা আমার কাছেই থাকবে, ওদের আমি ছাড়বো না"।পাখী গুলো আমার সাথে থাকবে খুব ভালো লাগবে আমার।
দাদু বোঝালেন, বন্দী জীবন, সে যতই সুখে থাকুক, কিন্তু মুক্তির আনন্দ তাতে নেই। ওদের এখন আকাশে ওড়ার কথা, খাঁচায় থাকার কথা নয় ওদের। ওরা যখন অসহায় ছিল তখন তুমি তাদের আশ্রয় দিয়ে খুব ভালোকাজ করেছ ওরা এখন সাবলম্বি ওরা নিজদের মতো স্বাধীন ভাবে বাঁচোক। দাদুর কথা শুনে রুমি খুব অনুপ্রানিত হয়, একটু কষ্ট হলেও সে খাঁচা খুলে দাদুর সাহায্যে বাচ্চা দুটোকে উড়িয়ে দেয়। পাখী দুটো উড়ে গেল মুক্তির আনন্দে, মুক্তির স্বাদ যে সবাই পেতে চায়। রুমি ওদের উড়ে যাওয়ার দিকে তাকিয়ে রইলো।
মিঠু শিশু হয়েও, বন্দী জীবন বা মুক্তির স্বাদ এ ব্যাপারগুলো সম্বন্ধে ওয়াকিবহাল না থাকলেও, পাখীগুলোর উড়ে যাওয়া তার মনে মুক্তির অনির্বচনীয় আনন্দের পরশ এনে দিল।
স্বাধীনতা কি শিশু মন তা বুঝেবে না।তবে মুক্তির মাঝেই যে স্বাধীনতার আনন্দ তা হয়তো মিঠুর মনে দোলা দিয়েছিলো।
অলকা গোস্বামী
ধূসর দেখা যায় ওই স্বাধীনতার ইতিহাস,
ঝাপসা হয়ে আসছে সংগ্রামী মিছিলের স্লোগান,
তুমি আমি আমরা গর্বিত আজ,
দেশের প্রগতি নিয়ে।
কতো কলম চলছে দেখো
গৌরব বাড়িয়ে।
হতাশা তবু চোখে পড়ে,
আজো হয়নি কতকিছু,
দেশপ্রেমীদের কপালে
আজো লিখা আছে
উদ্বাস্তু।
প্রতিশ্রুতি ভাঙে গড়ে
নাটক নূতন পুরাতন,
আমরাও কেমন
সমঝোতার দলে,
নসল্ টাই পলাতক ।
ইতিহাস ধুয়ে চলবে কদিন
প্রশ্ন কঠিন বড়ো!
একবারের জন্যও অন্তত
বাঁচার আওয়াজ তোলো।
শর্মি দে
রক্তমাংসহীন মূল্যবোধের অবক্ষয় থেকে
জন্ম নেয় স্বাধীনতার শ্লোগান
এক্কাদোক্কা থেকে শুরু করে কলেজ চত্বরে
সর্বত্রই চলছে শ্লোগানের ওয়ার্কশপ।
তবুও আজ কেন অকারণেই থমকে দাঁড়িয়ে
বলতে হচ্ছে শ্লোগান চাই
আরো শ্লোগান চাই...
ধর্ষণ চাইনা, ভুখাপেট মরতে চাই না
চাইনা ফুটপাতঘেরা জীবন
চাইনা উলঙ্গ দুর্গা
চাই একটুকরো স্বচ্ছ আকাশ
এক ঝোলা বাতাস
চাই মুখোশহীন বিশ্বাস!
কোথায় খুঁজবো এদের?
তার জন্যও কি চাই শ্লোগান!
পঁচাত্তর বছর ধরে তোমাকে বদলাতে চেয়েছি,
পারিনি... তুমি যে চিরাচরিত স্বাধীনতা!
প্রতীক হালদার
দেশ ভাগ হয়, বাড়ি ভাগ হয়
কাঁটাতার থাকে সীমানায়!
যায় না ফেরা নতুন করে
পুরানো সেই ঠিকানায়!
শুধু মনে পড়ে,এসেছি ফেলে
আমার অতীতটাকে!
আজও পিছু ডাকে স্মৃতিগুলো
কাঁটাতারের ওপার থেকে!
নতুন আশ্রয় আজও বুকে
কাঁটা হয়ে বুকে রয়!
জীবনটা যেন হাহাকার করে
কত ব্যথা রোজ সয়!
জীবনটা যেন কাঁটাতারে বাঁধা
ক্ষত-বিক্ষত হয়ে!
যন্ত্রণা রোজ দ্বিগুণ বেড়ে
মুখ বুজে যায় সয়ে!
অভিষেক অধিকারী
ভুখা মানুষের মিছিল,
সঙ্গে একটা স্বাধীনতা,
কথা বলে চলে বেকারত্বের, মানব যন্ত্রনার।
প্রতিভাবান মানুষের ছেঁড়া চটি গল্প বলে,
আর একটা স্বাধীনতার।
ত্রিবর্ণ পতাকার সামনে পরে থাকে বাসিরুটির টুকরো।
পথের পাশে নাম পরিচয় হীন শিল্পীর মৃতদেহ।
মৃতদেহের পাশে তার শেষ কাজ,
একটা ত্রিবর্ণ রঞ্জিত পতাকা।
শহরের মধ্যে বড় বড় বিপ্লবীর পাথরের মূর্তি,
নীচে পালিত হচ্ছে স্বাধীনতা দিবস
সঙ্গে গরম চা আর গরম ভাষণ
অদূরে নীরবে হেঁটে চলেছে মেধা,
একটা কবিতার বই বের করতে চেয়েছিল সে,
পুরস্কার, প্রকাশকের গলাধাক্কা।
ব্যর্থ মেধার সামনে স্বাধীনতা দিবসের উদযাপন।
সঙ্গে বিপ্লবীদের লড়াই এর খোসগপ্প।
আর একটা স্বাধীনতা বহন করে চলেছে মেধার বহ্নুৎসব।
সঙ্গে ভুখা মানুষের হাহাকার আর প্রতিভার অপমৃত্যু।
তবুও যে আমরা স্বাধীন!
বর্তমান সমাজের আকাশচুম্বী দম্ভের গল্পবলার জন্যে।
আর একটা হিংস্র সমাজের গঠন দেখে যাওয়ার জন্যে।
পায়েল সূত্রধর
স্বাধীনতা তুমি,
রক্তে রাঙ্গানো মাতৃভূমি।
স্বাধীনতা তুমি,
শস্য- শ্যামলা ধানের ক্ষেত।
স্বাধীনতা তুমি,
নীল আকাশে উড়ন্ত মুক্ত পাখির দল।
স্বাধীনতা তুমি,
রবিঠাকুরের অবিরাম গান।
স্বাধীনতা তুমি,
মায়ের ভাষায় কথা বলা।
স্বাধীনতা তুমি,
ফাগুনের ঝরে পড়া কৃষ্ণনচূড়া ফুল।
স্বাধীনতা তুমি,
তিন বর্ণের জাতীয় পতাকা।