Aug 15, 2022

পঙ্কজ কান্তি মালাকার

ভাই-ভাই (ছোটগল্প)

(স্থান কাল পাত্রের সাথে কোন মিল থাকলে তা সম্পূর্ণরূপে কাল্পনিক।সবার আবেগ ও সবাইকে সন্মান রেখে সম্প্রীতিকে উদ্দেশ্যে রেখে রচিত।)

▪️স্বাধীনতার অমৃত মহোৎসব উপলক্ষে স্থানীয় বিধায়ক একটি কনসার্ট আয়োজন করেছেন। ব্রহ্মপুত্র নদের পারে এক বিশাল মাঠে জাঁকজমকপূর্ণ আয়োজন। স্থানীয় গায়ক ব্যান্ডের পাশাপাশি অনুষ্ঠানের এক আকর্ষণ বলিউড-টলিউড খ্যাত গায়ক রূপম।রূপম আসামের পাশের শিলিগুড়ির ছেলে, ভালো অসমিয়া জানেন, কয়েকটি অসমিয়া সিনেমায় কন্ঠ দিয়েছেন। আসামে বেশ জনপ্রিয়  রূপম পাল।

মুম্বাই থেকে ফ্লাইটে যোরহাট এসেছেন সন্ধ্যের পর। ততক্ষণে স্থানীয় ব্যান্ডেরা অনুষ্ঠান শুরু করেছেন। বিশ্রাম নিয়েছেন অনুষ্ঠান স্থলী থেকে অনতিদূরে এক বিশ্রামাগারে, ব্রহ্মপুত্রের জলছোঁয়া স্নিগ্ধ বাতাসের সাথে ভেসে আসছে অসমিয়া ভাষার মাধুর্য।মন একেবারে স্নিগ্ধ হয়ে উঠলো,স্টেজে উঠেই প্রথম গাইলেন 'বন্দেমাতরম -সুজলাং সুফলাং মলয়জশীতলাম', গাইলেন 'লুইতর দুপারে', গাইলেন- 'আমি ভারতর,ভারতর ওপজা মাটি এই/মিলি যাম মাটিতেই/এই মাটিয়েই স্বর্গ'।তারপর গাইলেন একটি হিন্দি গান 'মা তুঝে সেলাম,আম্মা তুঝে সেলাম'।জানেন শিবসাগরে প্রচুর বাঙালি থাকেন,তাই একটি রবীন্দ্র সংগীত ধরলেন 'ও আমার দেশের মাটি  তোমার ঠেকাই মাথা' -এক কলি গেয়ে উঠতে পারলেন না ভিড় থেকে একদল আওয়াজ উঠে এল 'ইয়াতে বঙ্গালি গান নচলিব, অসমিয়া গাওক অসমিয়া গাওক', থমকে গেলেন। স্টেজের পাশে চেয়ার থেকে বিধায়ক বাবু সাহস জুগিয়ে বললেন 'গাওক গাওক,এটা বঙ্গালি গাওক,ইয়তের মাত শুনিব নালাগে।' আবার ধরলেন 'ও আমার দেশের মাটি তোমার পরে' ছুটে এল একটা জুতো তার দিকে। থামিয়ে দিলেন গান। নড়েচড়ে বসল আয়োজকরা,ভিড়ের মধ্য থেকে উৎপাতকারীদের চিহ্নিত করা হলো, অনুষ্ঠান স্থলীতে শুরু হলো একটা উৎপাত ।

বিধায়ক বাবু এসে রূপমের কাছে ক্ষমা চাইতে লাগলেন, তখনই হাতে মাইক নিয়ে শুদ্ধ অসমিয়ায় রূপম বলল," যারা জুতো ছুঁড়েছে তাদের তাড়িয়ে দিওনা, আমি কিছু বলতে চাই,তারা শুনুক।

কোথা থেকে বাংলা শুনবেন না? অনুষ্ঠানের শেষেই যে জাতীয় সঙ্গীত গাওয়া হবে সেটা বাংলা ভাষায়। আপনি যে অসমিয়া বলছেন তা বাংলারই মেয়ে। হাতে একটা নোট নিয়ে দেখুন প্রথমে অসমিয়া তার নীচেই বাংলা, একশ' টকা আর একশো টাকায় শুধু একটা স্বরবর্ণের তফাৎ।এটা স্বাধীনোত্তর ভারত,দেশ সংবিধানে চলে,এটা বহুভাষাভাষী মানুষের ভারত। ভারতের কোথাও কোন ভারতীয় ভাষা ব্যবহারের বাধা নেই। আমাদের এক পরিচয় আমরা ভারতীয়।তারপর আমাদের ভাষিক পরিচয়, আসাম বহুভাষিক রাজ্য এখানে এক তৃতীয়াংশ বাংলাভাষী বাস করেন। সবাইকে সঙ্গে নিয়ে সম্প্রীতি সহ বাস করতে হবে।

আপনারা আমাকে শিলিগুড়ির ছেলে হিসেবে জানেন,হয়তো আমাকে বঙ্গাইগাঁওয়ের ছেলে হিসেবে জানতেন,যদি আশির দশকে দাঙ্গায় আমাদের পরিবার আতঙ্কে আসাম ছেড়ে উত্তরবঙ্গে না যেত।এমনি কত হাজার হাজার ডাক্তার ইঞ্জিনিয়ার শিল্পী খেলোয়াড় ব্যবসায়ী সাইন্টিস্ট আসামের এড্রেসের বদলে অন্যত্রের এড্রেস লিখছে। আমি বাঙালি ভালবেসে অসমিয়া গাই, দুটো ভাষা পৃথক মনে হয় না।এই যে আমি অসমিয়া বলছি ,আমাকে অসমিয়া লাগছে তো?"

ভিড় থেকে উঠে এলো- হুমম।

"তাহলে কেন এই ভাষা বিদ্বেষ।জানেন আশুতোষ মুখার্জি প্রথম কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে অসমিয়ায় পাঠক্রম শুরু করেন। সুধাকন্ঠ ভূপেন হাজারিকা,পাপন,জুবিনদা'কে বাঙালিরা ভালবেসে আপন করে নিয়েছে,এই ভালোবাসাকে অটুট রাখুন,একটি সম্প্রীতির দৃষ্টান্ত আসাম গড়ে তুলুন, বাঙালি অসমিয়া ভাই-ভাই হয় কি না?"

ভিড় থেকে উঠে এলো- হয়য়য়য়।

তারপর তিনি রবীন্দ্রসঙ্গীতটি শুরু করলেন,আরো দুয়েকটি অসমিয়া গেয়ে আরেকটি দ্বিজেন্দ্রগীতি গাইলেন 'ধনধান্যে পুষ্পে ভরা আমাদের এই বসুন্ধরা' সবাই তাল মেলালো কোথাও কোন আপত্তি উঠলো না।

রূপমের ভিড়কে এই ম্যানেজমেন্ট দেখে বিধায়কজন আপ্লুত হয়ে রূপমকে বাহবা দিলেন,"আমরা রাজনৈতিক ভাষণে এভাবে সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠার ভাষণ দিয়ে কতটুকু বোঝাতে পারি জানিনা, তুমি খুব সুন্দর করে বোঝালে।"

ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট গ্রুপ যত্ন সহকারে তাকে দেখাশোনা করলো। পরদিন সকালে এগারোটায় ফ্লাইট।

গতরাতের তার বার্তা ছড়িয়ে পড়লো নিউজ মিডিয়ায়, সোশ্যাল মিডিয়ায়। সকাল হতে হতেই আসতে শুরু করলো বিভিন্ন প্রতিক্রিয়া।যত সমর্থন এসেছে তার থেকে বেশি বিরোধিতাও এসেছে। বিভিন্ন প্রাদেশিকতাবাদী সংগঠন মন্তব্যে খিলঞ্জিয়া অসুরক্ষিত,জাতি মাটি ভেটি অসুরক্ষিত ইত্যাদি মন্তব্য ভেসে আসছে নেট মাধ্যমে। তার মন্তব্যের বিভিন্ন অংশের কাটাছেঁড়া ক্লিপ নেট মাধ্যমে ভাইরাল হচ্ছে। কিছু অনলাইন মিডিয়া প্রচার করছে সে বাঙালি প্রভুত্ব প্রচার করেছে।

বিধায়ক ও প্রশাসনের তদারকিতে পুলিশি প্রহরায় তাকে এয়ারপোর্টে পৌঁছে দেওয়ার তড়িঘড়ি। অসমিয়া কিছু পিঠাপুলিতে ব্রেকফাস্ট সেরে গাড়িতে চাপলো রূপম।পথে যেতে যেতে কিছু ব্যাপার নজরে পড়লো,একটা বিপত্তারিণী পূজার পোস্টারে কালিমাখানো, একটা ভারত সেবাশ্রমের ব্যানারে র-য়ে কালি মাখানো, একটা বাংলা মাধ্যম স্কুলের দেওয়ালে 'ভারত আবার জগৎসভায় শ্রেষ্ঠ আসন লভে'-বাণীতে কালি মাখানো, এবার মুখ  ফিরালো, এয়ারপোর্ট অবধি আর বাইরের দিকে তাকালো না।