Oct 31, 2023

আমিনুল ইসলাম

ত্রাস

এবার বন্ধ হোক তোমাদের ত্রাস
আর কত ঝড়াবে তাজা রক্ত
কত মায়ের বুক করবে খালি
কত সন্তান কে পিতৃহারা।
লেলিহান শিখার স্বাদ নিতে ব্যাস্ত সমাজ
ভাবেনা এরাও মানুষ ,এদের ওহ আছে প্রাণ।
যুদ্ধ নয় শান্তি চাই, 
এই বিশ্বে ভালোবাসা ছড়িয়ে দিতে চাই।

মিঠুন রায়

 জন্মশতবর্ষে স্মরণ

 সমরেশ বসু: এক শিল্পী -ব্যক্তিত্ব

অপ্রতিরোধ্য কলমে বাংলা সাহিত্যে তিনি নিজের স্থান নিজেই প্রতিষ্ঠা করেছেন তিনি সমরেশ বসু । তাঁর জন্ম নাম সুরথ নাথ বসু । জীবনের প্রতি পদক্ষেপে অনিশ্চয়তা , দারিদ্র্য, তাকে বিধ্বস্ত করেছে বারবার ।কিন্তু পরাস্ত করতে পারেনি তাঁকে। বরাবরই মাথা উঁচু করে বাঁচতে  শিখেছেন । বলা যেতে পারে , জীবনের প্রতিকূলতা গুলিই তাঁকে শক্তি জুগিয়েছে।

  তিনি লিখেছেন একশোর বেশী উপন্যাস এবং তিন শতাধিক গল্প। অনেক ছোটগল্প লিখেছেন । তাঁর  রচনায় রাজনৈতিক কর্মকান্ড , শ্রমজীবী মানুষের জীবন এবং যৌনতা সহ বিভিন্ন অভিজ্ঞতার সুনিপুণ বর্ণনা ফুটে  উঠেছে।

  ১৯২৪ সালের ১১ ডিসেম্বর ঢাকা শহরের রাজনগর গ্রামে জন্ম হয় সমরেশ বসুর । বাবা মোহনীমোহন বসু ও মা শৈবলিনী দেবী । পাঁচটি সন্তানের মধ্যে সমরেশ চতুর্থ । সদ্যোজাত এই চতুর্থ সন্তানের নাম রাখা হয় তড়বড়ি ।সব অংশের মানুষের সাথে সহজেই মিশে যেতেন এই বালক । প্রতিবেশীরাও তাকে খুব স্নেহ করতেন । বরাবরই ছিল নির্জনতা প্রিয় । নির্জনতার সন্ধানে চলে যেতেন শ্মশানে । স্কুলের গতানুগতিক শিক্ষা তার ভালো লাগত না । স্কুল ফাকি দিয়ে নানা রকম দুঃসাহসিক অভিযানে বের হতেন । তবে অবসর সময়ে প্রচুর গল্পের বই পড়তেন । ছবি আঁকার প্রতি প্রবল ঝোঁক ছিল । সমালোচক সরোজ বন্দ্যোপাধ্যায়ের লেখা থেকে জানা যায় সমরেশ বসু ভাল বাশি বাজাতে এবং গান গাইতে পারতেন । বালক সুরথ নাথের নাম সমরেশ দেন তাঁর বন্ধু ও শ্যালক দেবশঙ্কর মুখোপাধ্যায় । ১৯৩৯ সালে নৈহাটীর মহেন্দ্র স্কুলে ভর্তি হন  সমরেশ বসু । পরীক্ষায় ফেল করেন । এখানেই প্রথাগত শিক্ষার ইতি টানেন । কিছুদিন ঢাকেশ্বরী কটন মিলে কাজ করেন সমরেশ বসু । পরে আবার চলে আসেন নৈহাটীতে । 

  এক সময় কঠিন রোগে আক্রান্ত হন । বন্ধুর দিদি স্বামী পরিত্যক্তা গৌরী দেবী অসুস্থ সমরেশ বসুকে সুস্থ করে তোলেন । এই নারীই ছিল তাঁর প্রথমা স্ত্রী । চরম দারিদ্র্যতার জেরে এক সময় গরিফা থেকে ব্যারাকপুর পর্যন্ত সাহেবদের কোয়ার্টারে ডিম বিক্রি করে সংসার চালাতেন তিনি । এ সময় মার্ক্সবাদী ভাবধারার সাথে তিনি যুক্ত হন । ১৯৪৩ - ১৯৪৯ সাল পর্যন্ত ইছাপুর বন্দুক কারখানায় চাকরি করেন তিনি । এই সময় পর্বে তিনি কমিউনিস্ট পার্টির কর্মকান্ডে জড়িয়ে পড়েন । একসময় কারাবরণও করেন । জেল থেকে মুক্তি পাবার পর লেখাই হয়ে উঠে তাঁর নেশা । 

  আসলে জীবনে ব্যাপক অভিজ্ঞতা তাঁর সৃষ্টির পরিমাণকে বিশাল করে তুলেছে । ১৯৪৫ সালে প্রথম উপন্যাস 'নয়নপুরের মাটি' গ্রন্হাকারে বের হয় । পরবর্তী পর্যায়ে বের হয়েছে শ্রীমতী কাফে ( ১৯৫৬ ) , অমৃত কুম্ভের সন্ধানে(১৯৫৪ ) ,গঙ্গা ( ১৯৫৬ ) , শেষ দরবার ( ১৯৬৩ ) , স্বর্ণ পিঞ্জর ( ১৯৬৫ )।

    সমরেশ বসু প্রথমে গল্পকার , পরে ঔপন্যাসিক । মহাকালের রথের ঘোড়া , মানুষ শক্তির উৎস,যুগ যুগ জীয়ে, শেকল ছেঁড়া হাতের খোঁজে, তিন পুরুষ ইত্যাদি তাঁর লেখা রাজনৈতিক উপন্যাস । জগদ্দল , গঙ্গা , বাথান  ইত্যাদি গোষ্ঠী ভিত্তিক উপন্যাস । বিবর , প্রজাপতি , পাতক - এই উপন্যাস গুলিতে উচ্চবিত্ত শ্রেণীর সঙ্কট ও যৌনতার অনাবরণ প্রকাশ পেয়েছে । 

  তিনি রাজনীতি আশ্রিত উপন্যাস গুলিতে সমকালীন সমস্যা এবং শাশ্বত মূল্যবোধের মিশ্রণ ঘটিয়েছেন । মহাকালের রথের ঘোড়া তার লেখা অন্যতম শ্রেষ্ঠ উপন্যাস । এই উপন্যাসের নায়ক রুহিতন করছি । তার বাবা পোশপত কুরমি তরাইয়ের চা বাগানে চার পুরুষের মজুর । গল্পের শুরু থানার লকআপে রুহিতনের উপর চলছে অকথ্য অত্যাচার।নকশাল আন্দোলনের পটভূমিকায় ফুটে উঠেছে থানার উপর চলছে প্রচন্ড পুলিশি অত্যাচারের , নকশাল আন্দো রচিত এই কাহিনিতে লেখকের রাজনৈতিক দ্বিধার পরিচয় ফুটে উঠেছে রুহিতন চরিত্রে । আবার তিন পুরুষ উপন্যাসে দেখা যায় , সূর্যমোহন । সৌরীন , সুদীপ- তিন পুরুষ রাজনৈতিক জীবন থেকে রাজনীতিহীন জীবনের দিকে যাত্রা করছে । এই উপন্যাসের আর একটি চরিত্র সীতানাথ চরিত্রেও বিপ্লব সাধনার সঙ্গে মিশে গেছে রোমান্টিক স্বপ্নময়তা । 

  গ্রাম জীবনের পাশাপাশি নগর জীবনকেও খুব নিকট থেকে দেখেছেন সমরেশ বসু । তবে গোষ্ঠীজীবনের কথা লিখতে গেলে গ্রামই বার বার প্রাধান্য পায় । রাজনীতি ও গোষ্ঠী জীবন ওতোপ্রোত ভাবে জড়িয়ে আছে  উত্তরঙ্গ উপন্যাসে । জগদ্দল উপন্যাসে পাওয়া গেছে অন্যতম জটিল রূপায়ণ । একজন কর্মচ্যুত বেকার শিল্প শ্রমিক গোবিন্দর স্বপ্ন আর স্বপ্নভঙ্গের কাহিনী ফুটে উঠেছে বি.টি রোডের ধারে উপন্যাসে । শিল্প শ্রমিকদের জীবনই এর মুখ্য বিষয় । টানাপোড়েন উপন্যাসে বিষ্ণুপুরের পাটরাঙাদের জীবনযাপনের ছবি পাওয়া যায় । ধনতান্ত্রিক সমাজে তাঁতী গোষ্ঠীর জীবন দৈন্যতার চিত্র অঙ্কিত হয়েছে - এই উপন্যাসে । আবার ছিন্নবাধা উপন্যাসের গ্রাম সমাজ ও শহরের শ্রমিক জীবনের চিত্র রূপায়িত করা হয়েছে । 'পদক্ষেপ' উপন্যাসে ইউনিয়ন আন্দোলনের স্বরূপ বর্ণিত হয়েছে । অনেকেই হয়তো জানেন না , যে জেলখানায় বসে সমরেশ বসু তাঁর প্রথম উপন্যাস ' উত্তরঙ্গ' রচনা করেন ।

    কালকূট শব্দের অর্থ বিষ । তিনি কালকূট ছদ্মনাম দিয়ে বেশ কিছু উপন্যাস লিখেছেন । অমৃত কুম্ভের সন্ধানে , কোথায় পাব তারে , ঐ সব উপন্যাসে তিনি কালকূট নাম ব্যবহার করেছেন । 'ভ্রমর' ছদ্মনামে লেখা তিনটি উপন্যাস – 'যুদ্ধের শেষ সেনাপতি ', 'হাতে তোমার রক্ত' , প্রেম - কাব্য রক্ত যথাক্রমে ১৩৮৯ , ১৩৯০ ও ১৩৯১ সালে প্রকাশ হয় । সমরেশ বসুর কালজয়ী জীবন কাহিনী থেকে প্রবাহ পত্রিকায় প্রকাশিত 'ভোট দর্পণ ' নামে রচনায় কালকূট নামটি ব্যবহার করেন ।

  ১৯৪৬ সালে পরিচয় পত্রিকায় আদাব গল্প প্রকাশ হয় । তার আগে স্বাধীনতা পত্রিকায় প্রকাশ হয় অন্যতম ছোটগল্প ' 'শের সর্দার '। এই সব গল্প তাঁকে ছোটগল্পাকার হিসেবে স্বীকৃতি দেয় । অকালবৃষ্টি , ঋতু , মনোমকুর , পাহাড়ী ঢল , সুবর্ণা , বনলতা , মানুষ , চেতনার অনুকার , ধর্ষিতা , কামনাবাসনা ইত্যাদি তাঁর লেখা অন্যতম গল্প সংকল্পন। শিশু - কিশোরদের জন্যও তিনি অনেকগুলি গল্প - উপন্যাস লিখেছেন । তাঁর রচিত ছোটগল্পগুলি আমাদের মনে দোলা দেয়।যেমন- 'ফটিচার ' গল্পে আছে কয়েকটি রিক্সার মালিক আর শ্রমিক স্বার্থের লড়াই । শিশু শ্রমিকদের দৈন্যদশা নিয়ে লিখেছেন অন্যতম গল্প' নিষিদ্ধ ছিদ্র' ও 'পেলে লেগে যা' । এসমালগার ' গল্পে তেরো বছর বয়সী এক চোরাচালানকারীর কথা উল্লেখ রয়েছে । তাঁর লিখিত গল্প সম্পর্কে সুমিতা চক্রবর্তী মন্তব্য করেছেন যে,-' সত্তরের দশকের নকশালবাড়ি আন্দোলনের বিস্ফোরণের পর সেই বাস্তবতাবোধের অভিঘাত আত্মস্থ করে নিয়ে বাংলা সাহিত্যে যে একজন তরুণ গল্পকারের আবির্ভাব হয়েছিল , তাঁদের পূর্বসূরী ছিলেন সমরেশ বসু ।' 

   অন্যভাবে বলা যায়  উচ্চবিত্ত - মধ্য ও নিম্নবিত্তদের জীবনচিত্রের সঙ্গে সঙ্গে তথাকথিত ভদ্রলোক যারা নন , স্মাগলার , ওয়াগান ব্রেকার , পকেটমার , ডোম , গুনিন এদের নিয়েও অসংখ্য গল্প লিখেছেন তিনি । যেমন : সাধ গল্পের দেশে আছে গোপীনাথ নামে এক রিক্সাওয়ালা । 'মেঘলা ভাঙা রোদ 'গল্পে বিশু নামক এক ড্রাইভারের মানবিকতার কাহিনী তুলে ধরা হয়েছে । 'খিঁচাকালা সমাচার' গল্পের কেন্দ্রবিন্দু এক পকেটমার । ওয়াগন ব্রেকার এবং সমাজবিরোধী ফটিককে নিয়ে লিখেছেন  আটাত্তর দিন পরে গল্পটি । ১৯৭৮ সালের এপ্রিল মাসে সমরেশ বসুর সাথে শান্তিনিকেতনে সাক্ষাৎ হয় ভাস্কর শিল্পী রামকিঙ্কর বেজের । তখন শিল্পী রামকিঙ্করের বয়স ৭২। তখন সমরেশ বসু জীবনী লিখবার তাগিদে তথ্যসংগ্রহ শুরু করলেও রামকিঙ্করের বৈচিত্র্যময় জীবন হয়ে ওঠে উপন্যাসের উপকরণ। লেখকের শেষ উপন্যাস দেখি নাই ফিরে । ১৯৮৭ সালের ৩ জানুয়ারি থেকে দেশ পত্রিকায় ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হতে থাকে । যদিও লেখকের আকস্মিক মৃত্যু উপন্যাসটিকে অসমাপ্ত রেখে ছিল । 

  ১৯৮৮ সালের ১২ মার্চ শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন  সমরেশ বসু । 

  পরিশেষে বলা যায় , সমাবেশ বসুর সমস্ত রচনা , সব সাহিত্যকর্ম তাঁর জীবনযাপনের অঙ্গ । তাঁকে উৎকণ্ঠিত করে তুলত ব্যক্তির বিপণ্নতা । জন্মশতবর্ষে সৃষ্টিকর্মের আবহে - আবেগে - বিতর্কে বাংলা সাহিত্যে তাকে প্রাণবন্ত করে রাখা সত্যিই ভাববার বিষয় । 

প্রতীচী ভৌমিক

দুর্গার ভিড়ে দুগ্গা

মা তুই দুর্গা হলি দুর্গতিনাশিনী
তোর মত হাজার দুগ্গা খিদায় কাতর অতি।

শৈলবালা এক দুর্গা দিনমজুর খাটে
উমা নামের আরেক দুর্গা রোজ মাটি কাটে।

গৌরী নামের দুর্গা যত চায়ের পাতা তুলে
পার্বতীরা দুঃখ ভুলে নিত্য দিনের কাজে।

শংকরীরা ভয়ংকরী হাতুড়ি পেটায় জোরে
গিরি রাজের কন্যা দুর্গা জন্মায় আকাশতলে।

ভবানীরা বিকায় কেমন- দেখো জলের দরে
সতী নামের দুর্গা যত অসতীদের দলে।

মহামায়া মহা মায়া বিস্তার করে
দুর্গা যত অভুক্ত রয় ছেলেপিলে কোলে।

কাত্যায়নী দ্রাক্ষায়নী শারদা চান্ডিকা
কত শত যোগমায়া দুর্ভিক্ষের কায়া। 

এরই মাঝে কিছু দুর্গা রাধেন বাড়েন খান
আবার এক দুগ্গা রাগ করে বাপের বাড়িও যান।

মৃন্ময়ী এই দুগ্গাই পুঁজি দশভূজা দেবী
সর্বজনীন আনন্দেতে সকল দুর্গা ভুলি।

বদন চন্দ্র মল্লিক

কলুষিত সমাজ

আমরা কি চেয়েছিলাম আর কি পাচ্ছি সুন্দর পৃথিবীটাকে আমরা কলুষিত করে তুললাম নিজ নিজ স্বার্থ চরিতার্থ করার জন্য। আধুনিক সভ্যতার চরম শিখরে এসে আমরা ফিরে গেলাম আদিম যুগের গুহাবাসী মনুষ্য সমাজের মতো। সর্বক্ষেত্রে আমরা আধুনিক সমাজে এসে পিছনের দিকে চলে যাচ্ছি, মানুষে মানুষে হানাহানি, মা, বোনদের বানিয়ে ফেলেছি চাহিদার আঁতুড় ঘর, এই ভাবে চলছে আমাদের সমাজ। বিরামহীন চাহিদার রাস্তা, যেন শেষ নেই।

কারো রাজ সিংহাসনের চাহিদাn শাসন করার চাহিদা, নিজের আধিপত্য বিস্তার করার চাহিদা, এই চাহিদা পূরণ করতে গিয়ে আমরা নিজেরাই নিজের ক্ষতি করে ফেলছি। কোথাও নিজের স্বার্থ রক্ষার জন্য মানুষকে খুন করতে চিন্তা করিনা, সাংবিধানিক পরিকাঠামো মধ্যে বাস করেও আমরা সংবিধানকে মানিনা। যখন নেতা বনে যাই তখন এক এক জন যেন এক একটি সংবিধানের রূপ ধারণ করি। কিভাবে  ক্ষমতা ধরে রাখবে তার কৌশল রচনা করি, আবার যখন ধর্মক্ষেত্রে থাকাই বিভেদের শেষ নাই। সবার কাছে সবার ধর্মগুরু মহান, তবুও এক একটি এএএধর্ম নিয়ে এক একটি জাতির ভিতরে শুরু হয় হানাহানি, আজও বুঝলাম না ধর্ম কি? সৃষ্টিকর্তার এই পৃথিবীটাকে আমরা ধীরে ধীরে বিকৃতি রূপ করে তুলেছি। একদিকে বনভূমি ধ্বংস, এবং বন্য পশুপক্ষীর বিলুপ্তি,  বনভূমি ধ্বংসের ফলে পৃথিবী তাপমাত্রা দিনে দিনে বৃদ্ধি পাচ্ছে, আমরা এগিয়ে চলেছি বিনাশের শেষ ঠিকানার দিকে। ভূমিক্ষয়ের ফলে চাষাবাদের  জমির পরিমাণ কমে যাচ্ছে, জলস্তরে নিচে নেমে যাচ্ছে ,আর চাষাবাদী জমিগুলোতে তৈরি করছি  বড় বড় অট্টালিকা ।

কোথাও তৈরি হচ্ছে অত্যাধুনিক শিল্পের কারখানা, নষ্ট হচ্ছে পরিবেশ, আর বাড়ছে নানা ধরনের মারণ ব্যাধি।

মানুষ ভূমি থেকে পাড়ি দিচ্ছে চাঁদে, মঙ্গল গ্রহে নতুন কে আবিষ্কারের ধান্দায়, কিন্তু এই পৃথিবীর বুকে সীমিত পরিমাণ ভূমি যে ধীরে ধীরে সংকুচিত হয়ে অট্টালিকায় ভরিয়ে যাচ্ছে,, তার বোধগম্য নাই।। আগামী দিনে খাদ্য ভান্ডার শূন্য হয়ে যাবে, মানুষ জলের জন্য যুদ্ধ করবে, খাদ্যর জন্য লড়াই হবে, আবার একদিকে মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করছে নানা বিধ ভাইরাসের কারণে, অতি তাপমাত্রায় বরফ গলার ফলে  ভাইরাস পৃথিবীটাকে গ্রাস করে ফেলছে, তবুও আমাদের চৈতন্য  হয়না।

 আমরা বিলাসিতা চরমে ওঠে পিছনে ফেলা দিনগুলোকে ভুলে গিয়ে আধুনিক থেকে অতি আধুনিক হয়ে পড়ছি। জানিনা এর পরিণাম কি হবে ? মনুষ্যত্ব জ্ঞান শূন্য হয়ে বিবেককে অজ্ঞানের সমুদ্রে বিসর্জন দিয়ে আমরা বিবেকহীন হয়ে পড়েছি, আধুনিক বিজ্ঞানের ছোঁয়ায় অশ্লীলতা আজ সকলের হাতের মুঠোয়। এই দৃশ্যমান, ঘটনাগুলি থেকে মানুষের মেমোরিতে ডাউনলোড হচ্ছে অমানবিক যত ঘটনা, আপন পর সম্পর্কটা এমন একটি জায়গায় এসে সীমাবদ্ধ হচ্ছে, মানুষের শরীরটাই এখন চরম চাহিদা ও ভোগ বিলাসের আসল সম্পদ হয়ে উঠেছে। যত শিক্ষিত হচ্ছি তত জ্ঞানহীন হয়ে অমানবিক কাজ করতে আমরা কুণ্ঠিত হচ্ছিনা,আগামী প্রজন্মকে আমরা সাময়িক সুখের লালসায় মহা বিপদের দিকে ঠেলে দিচ্ছি।  টাকা, বাড়ি, গাড়ি, নারীর নেশায় এবং নানা ধরনের নেশা সামগ্রী কবলে পড়ে শেষ করে দিচ্ছি যুবক সমাজটাকে। যারা আগামী দিনে দেশের হাল ধরার কথা, কিন্তু  তারা  তিলে তিলে নিজেকে ধ্বংসের দিকে নিয়ে যাচ্ছে নেশা ও অসামাজিক কাজে লিপ্ত হয়ে। সুতরাং আর নয় স্বার্থপরতা, এগিয়ে আসুন সকলে সুন্দর পৃথিবীটাকে আবার আগের মত ফিরিয়ে আনি। গাছ লাগান পরিবেশ বাঁচান, শুধু শিক্ষিত নয় জ্ঞানী হোন, বিবেকবান হোন মনুষ্যত্ব জাগ্রত করুন, মানুষে মানুষে হিংসা নয়, সকলে আমরা  মানব জাতি, ভেদাভেদ নয়, ধর্ম শিক্ষা জ্ঞান প্রসারণের একটা পথ মাত্র।

 আর স্বর্গ নরক সব এখানেই বিরাজমান, "আমি কি করছি" তার মাঝে স্বর্গ ও নরককে খুঁজে পাবেন।

প্রদীপ কুমার দাস

দিন বদলের সঙ্গে পরম্পরাও বদলে যাচ্ছে

ঢাকে কাঠি পড়ে গেছে। পুজো নিয়ে চারিদিকে সাজো সাজো রব। বনেদি বাড়ির পুজো কিংবা বারোয়ারি পুজোর কর্মকর্তাদের কর্মতৎপরতা এখন অনেক বেশি। দম ফেলার শেষ নেই। লাস্ট মিনিটে ফিনিশিং টাচ দিতে তাঁরা খুবই ব্যস্ত। তবে সময়ের পরিবর্তনে পুজো দালান বা মন্ডবের ছবিটা খুব দ্রুত বদলে যাচ্ছে। আগেকার দিনে বনেদিবাড়ির পুজোদালান বা বারোয়ারি পুজোমন্ডবে ঠাকুর গড়ার কাজ দেখতে কার না ভাল লাগতো? স্কুল চলাকালীন মনটা সব সময় আঁকুপাঁকু করতো কখন পুজোদালানে হাজির হবো। ঠাকুরদালানে কুমোরকাকা সহ সহকারীরা কাঠামো গড়া থেকে একমেটে, দোমেটে, রং করা, চোখ আঁকার কাজের ফাঁকে ফাঁকে তাঁদের চটকদারী মজার মজার কথাতে হাসির খোরাক জোগাতেন সেটা উভয় পক্ষের কাছে বেশ উপভোগ্য হয়ে উঠতো। কিন্তু দিন বদলের সঙ্গে সঙ্গে কুমোরকাকাদের জায়গাটা দখল করে নিয়েছে কুমোরপাড়া বা কুমোরটুলির মৃৎশিল্পীরা। তাঁদের তৈরী রেডিমেড মূর্তি এখন শোভা পায় মন্ডপে মন্ডপে।

আর কুমোরপাড়া বা কুমোরটুলি থেকে লরি, টেম্পো বা ট্রাকে করে প্রতিমা আনার সময়ে হৈ চৈ, নাচা-গানা, চীৎকার-চেঁচামেচি এখন পুজো বদলের অঙ্গ হয়ে দাঁড়িয়েছে। আগেকার দিনের পুজোমন্ডপে হাতের কাজের কারুকার্য শিল্পকলার পরিচায়ক হয়ে উঠতো। এখন সে জায়গায় চলে নানান থিমের পুজো। সেখানে পরিবেশ বান্ধব উপকরণের তূলনায় পরিবেশ-দূষণই মাথা ব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বনেদি বাড়ির পুছোয় আগেকার দিনে ভোজনপর্ব সবই বাড়িতে ভিয়েন বসিয়ে টাটকা-খাবার বানানো হতো ও সেগুলোর গুণগত মানও ছিল খুবই উন্নত।একালের পুজোয় সে জায়গাটা চলে গেছে ক্যাটারিং গোষ্ঠীর হাতে যাদের খাবারের গুণগত ও পরিমাণগত  মান প্রশ্নাতীত নয়। আগেকার দিনে অনেক বনেদি বাড়ির পুজোয় দুর্গাপুজো উপলক্ষ্যে বিনোদনপর্ব হিসেবে বাবু কালচারের চল ছিল, সময়ের পরিবর্তনে এখন পুজো উপলক্ষ্যে দেখা যায় অন্তক্ষরী, গানের জলসা ও কান ফাটানো আওয়াজে ডি জে'র কেরামতি। সেইসঙ্গে সারারাত ধরে চলতে থাকে উদ্যোম নৃত্য। রাতজেগে ঠাকুর দেখার জন্যে মন্ডপে মন্ডপে ঘোরা, দোকান-রেষ্টুরেন্টে খানা-পিনা করে সূর্য্যদোয়ের আগে বাড়ি ঢোকা। খাবার মেনুতেও ঘটে গেছে বিরাট পরিবর্তন। আগে যেখানে দুপুরের খাবার বলতে ভাত, ডাল, ধোঁকার ডালনা, ঝিংএ পোস্ত, কুমড়োর ঘ্যাঁট, আলুর দম পেলে চেটে-পুটে খেত, এখন সে জায়গাটা নিয়েছে ফাস্টফুডের রকমারি খাবার দাবার যেগুলো শুধুই বাড়তি ক্যালোরি দিতে পারে কিন্তু মন ভরাতে পারে না। বিজয়া দশমীতে এয়োতি মেয়েরা সিঁন্দুর খেলতো ঠিকই, এখন পাড়ায় পাড়ায় পুজোমন্ডপে আধুনিকাষললনাদের সিঁন্দুর খেলাকে কেন্দ্র করে সেলফি সহ ফটো তোলার মাতামাতি দেখা যায় কিন্তু তাতে প্রাণের আবেগ বা হৃদয়ের অনুরাগ কোথায়? বরং লোক দেখানো মেকি ভঙ্গিটাই ফুটে ওঠে। ঠাকুর বিসর্জনের পরে পরষ্পর কোলাকুলি, বড়দের পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম এখন খুব বেশি দেখা যায় না, মোবাইল, হোয়াটসআপ, ফেসবুক, ইনস্ট্রাগ্রাম ও ইমেলে বিজয়া দশভীর শুভেচ্ছা, প্রণাম সব জানিয়ে দেওয়া হচ্ছে। নিয়ম মেনে চলা হচ্ছে ঠিকই তবে পরম্পরাটা আর থাকছে না। কালের নিয়মে সব কিছু বদলের সঙ্গে সঙ্গে পুজো বদলও ঘটে যাচ্ছে দ্রুতভাবে।

চন্দ্রা বিশ্বাস

ছোটগল্প

তদস্তু  হৃদয়ং তবঃ 

আজ জয়েনিং।  উত্তেজনা মেয়ের থেকে মায়েরই বেশি। ভোর রাতে উঠে মন্দিরে পুজো দিয়ে এসেছে। মেয়ের পছন্দের রান্না, টিফিন  গুছোনোও সারা। ওর বাবা তো ইঞ্জিনিয়ারিং পাশের  খবরটা ও শুনে যেতে পারেন নি। চোখের জল মুছলো সরযু।এই মেয়ের মুখ চেয়েই  তো বেঁচে ছিলেন দুজনে। আর নিজে বেঁচে আছেন আজও। 

--নেমে আয় মা,আর দেরি করিসনা,দুটো মুখে দিবি তো?

মিতুন ওদিকে বাবার ছবিতে মালা পরিয়ে কেঁদে আকুল হচ্ছিল। প্রণাম করে বলল, 

--  আজ তোমার সব স্বপ্ন পূরণ করেছে তোমার মেয়ে, আশীর্বাদ করো বাবা। 

মিতুন নেমে আসতেই, ওর মাথায় ফুল ছুঁইয়ে প্রসাদটুকু মুখে তুলে দিয়ে বলল,

-- কাঁদিসনা মা, তোর বাবার স্নেহের হাত সবসময় তোর মাথায় আছে রে মা। 

  মাকে প্রণাম করতেই, বুকে টেনে নিয়ে আবার বলল,

  --  ঈশ্বর দয়াময়, তিনিই আবার তোর জীবনটা সাজিয়ে দেবেন, এই বিশ্বাস নিয়েই যে বেঁচে আছি রে  মা।  

 " দুগ্গা দুগ্গা " বলে, মেয়েকে

 রওনা করিয়ে, সোফায় এসে বসল সরযু। কাল সারারাত চোখের পাতা এক করতে পারেনি। স্বপ্ন পূরণ হলো যে আজ। 

             অফিসে ঢুকতেই বসের ঘরে ডাক পড়ল। 

 --- মে আই কাম ইন স্যার? 

-- ইয়েস প্লিজ। 

ঘরে ঢুকে বসকে দেখেই আঁতকে উঠল মিতুন ।বস ল্যাপটপ এ চোখ রেখেই বলল,

  --আপনার  নাম? 

  -- ম ম মৈত্রেয়ী সেন। 

  --

নামটা শুনই চোখ তুলে তাকাল বস্ সৃজন দাশগুপ্ত। তারপর তড়াক্ করে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। 

--- মৈত্রেয়ী, মিতুন তুমি? সেন?

--- ভুল করছেন স্যার, আপনি বোধহয় অন্য কারও সাথে.......আমি মৈত্রেয়ী সেন।

---- ভুল? সৃজন তোমায় চিনতে ভুল করবে? দেশে ফিরে থেকে,পাগলের মত খুঁজছি তোমাকে।

 --  স্যার প্লিজ বসুন আপনি। একটু স্টেবল্ হলে আবার আসব আমি।

--- মিতুন  প্লিজ। 

       মৈত্রেয়ী ধীর পায়ে ঘর থেকে বেরিয়ে এল। হতাশ সৃজন ধপ্ করে চেয়ারে বসে পড়ল। অনেকটাই সময় লাগল ওর ধাতস্থ হতে।বেল বাজাল, বেয়ারা ঢুকতেই বলল, 

 --অরিন্দম কো বুলাও আভি।

       হন্তদন্ত হয়ে ছুটে এল ওর জুনিয়র অরিন্দম। 

---  হোয়াটস্ রং স্যার,এনিথিং সিরিয়াস? আর ইউ ওকে স্যার? 

--- আমি বেরোচ্ছি, আজ আর ফিরব না। তুমি একটু.......

--- নো প্রবলেম  স্যার। কিন্তু আপনি ঠিক আছেন তো ?

----  ডোন্ট ওয়ারি, আই এম ফাইন। 

বলে কোটটা কাঁধে চাপিয়ে ঝটপট বেরিয়ে গেল। মনের মধ্যে যেন তাণ্ডব চলছে।বাড়ি ফিরে জুতো খুলে বিছানায় গা এলিয়ে দিল। কপালে হাতটা রেখে ভাবনার ডানা মেলে উড়িয়ে দিল , অতীতের সীমাহীন শূণ্যতায়। 

           তখন বারো ক্লাশ। অঙ্ক স্যারের কোচিন ক্লাশে সৃজন আর মৈত্রেয়ী।  স্যারের নজর এড়াতে পারেনি ওদের সম্পর্কের রসায়ন। স্যার  বলতেন, 

  ভাল নাম্বার পেলেই আমি খুশি, তোমাদের এই কেমিস্ট্রির দায় বা দায়িত্ব কোনটাই আমার নয়। 

  স্যারকে হতাশ করেনি ওরা। দুটো প্রেমিক মন স্বপ্ন আর উচ্চাশার শপথে, হাতে হাত রেখে সফলতার ম্যারাথনে ছুটেছিল।


মধ্য কলকাতার পৈতৃক বাড়িটায়  আভিজাত্য ও বনেদিয়ানার তখনও রমরমা। বাবা মারা যাবার পরে, তিন ভাই মিলে ঠাকুর্দার হাতে গড়া ব্যবসাটায় লাভের অঙ্কটা  বাড়িয়েই চলেছিল। ফলে অহঙ্কারটা আর প্রচ্ছন্ন থাকতনা। বাড়ির সুসজ্জিত দেবালয়ে নিত্য  গোবিন্দ সেবা নিষ্ঠা সহকারে সম্পন্ন হতো।সৃজনের বাবা বড় ।কাকাদের বিয়ে হয়নি। তাই কূলতিলক সৃজন ছিল নয়নের মণি। কি স্কুলে, কি প্রতিবেশীদের, কি আত্মীয় পরিজনদের কাছে, সৃজন ছিল সেরার সেরা। শুধুমাত্র লেখাপড়া নয়, খেলাধুলাতে ও ছিল তুখোড়। মিতুনের বাবা ছিল না। দাদা একটু-আধটু দেখিয়ে দিত। টেস্টের রেজাল্ট খুব ভাল হলে, দাদা  তিন মাসের জন্য কোচিং ক্লাশের ব্যবস্থা করল। সেই কোচিং ক্লাশেই সৃজনের সাথে প্রথম  দেখা। ওখান  কাছাকাছি এক বাড়িতে ভাড়া থাকত মিতুনরা। খুব ভাল রেজাল্ট করল ওরা দুজনেই।

আর এই উত্তেজনার মধ্যেই ওদের সম্পর্কের কথাটা জানাজানি হয়ে গেল দুই বাড়িতেই । প্রখ্যাত বনেদী বাড়ির  সুদর্শন  মেধাবী ছেলে আর বাপ-মা মরা ভাড়াটে বাড়ির মেয়ে? বাপ-কাকাদের মান-সম্মানের আর কিছু বাকি  থাকবে? তাই পরামর্শ করে ওরা সৃজনকে বিদেশে পাঠিয়ে দিল

উচ্চ শিক্ষার জন্য। সৃজন শুধু নয় সকলেই বুঝলো সবটাই। যাবার আগে সৃজন চুপিচুপি মিতুনের সঙ্গে দেখা করে বলেছিল, 

   --আমার জন্য অপেক্ষা করো মিতুন। 

    মিতুনের দাদা বিয়ে করল। দাদা-বৌদির বন্ধু-বান্ধবরা আসত  মাঝেমধ্যেই। মিতুনের রেজাল্ট সবে বেরিয়েছে। দাদা ও খুব খুশি। একদিন দাদার  বন্ধুরা সব এসেছে। খাবার সার্ভ করছিল মিতুন বৌদির সাথে। কফির ট্রে হাতে মিতুনকে দেখে মুগ্ধ হলো অনীক সেন ,দাদার কলীগ   জুনিয়র। দাদা তো প্রস্তাবে  দারুণ খুশি। বিয়েটা আর আটকানোর কোনো সুযোগই  পেলনা মিতুন। মিতুনের মতামত তো কেউ জানতে ও চায়নি।  সৃজনকে মন থেকে মুছে দিতে চাইল মিতুন। অনীকের ভালবাসা আর নতুন জীবনকে বরণ করে নিল।

দুটো প্রেমিক মনের সব স্বপ্ন, সব উচ্চাশার ডানাগুলো একই সাথে ছেঁটে ফেলল দুই বাড়ির অভিভাবকরা। সৃজন তো অপেক্ষা করতে বলেছিল। মিতুনের কিছু করার ছিল?


সাতসাতটা বছর।  দেশে ফিরেই মৈত্রেয়ীকে পাগলের মত খুঁজে বেরিয়েছে সৃজন। স্কুল- কলেজ এমন কি সেই ভাড়া বাড়িতে  গিয়ে ও কড়া নেড়েছে। কোন খবর মেলেনি। ঈশ্বর আছেন  তাই এভাবেই দেখা হল।আজ এতদিন পরে মিতুনকে দেখে আর মাথা ঠিক রাখতে পারেনি ও। কিন্তু মিতুন? ও কেন এত রূঢ় ব্যবহার করল? কেন এভাবে এড়িয়ে গেল ওকে? বিছানায় শুয়ে অতীত, বর্তমান একাকার করে ও যখন দিশাহারা, ঠিক তখনই মাথায় এলো প্ল্যানটা ।তাড়াতাড়ি উঠে ফ্রেশ হয়ে আবার ছুটল অফিসে। অরিন্দম অবাক। 

--- স্যার  আপনি? 

---  হ্যাঁ, একটা জরুরী কাজ আছে।

অফিস রেজিস্টার ঘেঁটে বর্তমান ঠিকানা হদিশ তো মিলল ।তারপর পৌঁছে গেল নির্দিষ্ট ঠিকানায়।  বেলা সবে তিনটে। বেল দিল। দরজা খুলল একজন বয়স্কা মহিলা। 

--- কে আপনি?কাকে চাই? 

--- এই বাড়িতে কি মৈত্রেয়ী থাকে?

---- কেন? কোনও বিপদ হলো না কি মেয়েটার? 

---না না, মাসীমা  শান্ত হোন প্লিজ। বিপদ নয়। 

--- তবে?

--- আপনি  মৈত্রেয়ীর কে?

---- আমি ওর মা।

--' মা? কি ভাবে? আমি তো ওর মা কে জানি। উনি আজ আর নেই। য

---- তোমার ওকে কি দরকার? একটু খুলে বলবে?

--- এই দরজায়  দাঁড়িয়ে? 

---- এসো ভেতরে এসো। 

    এক গ্লাস জল এনে রাখলেন টেবিলে।ওকে বসতে বলে নিজেও বসলেন। ভয়ে আতঙ্কে মুখ শুকিয়ে গেছে সরযুর। সৃজন তা লক্ষ্য করে বলে উঠল,

--- ভয়ের কিছু নাই মাসীমা। কিছু বলতে ও চাই, কিছু শুনতে ও চাই। 

--- ভয়? ভয় পাবনা? এতদিনের ভয়, চিন্তা, উদ্বেগ, হতাশা সবটুকু মুছে, আজই সবে আশার প্রদীপটা  জ্বেলেছি আমরা মা-মেয়েতে মিলে। আর নতুন কোনো আঘাত নেবার মত ক্ষমতা আমার নাই। মিতুন বাঢ়ি নাই। 

---- জানি, তাই তো এলাম। আপনি ওর অভিভাবক।  আপনার চাইতে বেশি ভাল আর কেউ নিশ্চয় চাইবেনা। 

        সৃজন ধীরে ধীরে সমস্ত অতীতটা গুছিয়ে বলল।আজ অফিসে যা হয়েছে তাও। সবটাই  ঠাণ্ডা মাথায় শুনলো  মিতুনের  মা। তারপর ধীর স্বরে, খানিক  স্বগতোক্তির মত বলল, 

মিতুন আমার মেয়ে নয়, পুত্রবধূ। 

বিয়ের সাতদিনের মাথায়, আমার একমাত্র সন্তান অনীক, এক ভয়ঙ্কর দুর্ঘটনায় আমাদের ছেড়ে চলে যায়। ওর দাদা-বৌদি, পাড়া-প্রতিবেশী অপয়া বদনাম দিয়ে ওকে তাড়িয়ে দেয়।  সন্তান শোক ভুলতে ওকে আমরা বুকে টেনে নিয়ে বেঁচে আছি  এতকাল। ওর শ্বশুর ওকে পিতৃস্নেহে আগলে লেখাপড়ায় উৎসাহিত করেন। জীবন সম্বন্ধে একরাশ বিতৃষ্ণা নিয়ে, যে মেয়ে ঘরের কোণে মুখ লুকিয়েছিল, আজ এই জায়গায় তাকে আনতে ততটা সহজ ও ছিল না। আজই আমি সফলতার মুখ দেখেছি বাবা।

      কথায় কথায় কখন সন্ধ্যা নেমেছে। বেল বাজলো।  দরজা খুলতেই,  সোফায় সৃজনকে বসে থাকতে দেখে,মিতুন 

রেগে বলল,

--- আপনি? কেন এখানে?

সরযু দেবী  মুচকি হেসে দুহাত কপালে ঠেকালেন। 

      --------------------------------

                   চন্দ্রা  বিশ্বাস

জয়িতা ভট্টাচার্য

ছোটগল্প

ফেরা

অস্পষ্ট অস্বস্তি ভেঙে অনীতা প্রথমেই অনুভব করল এক দুরন্ত গতি।শরীর জুড়ে ক্লান্তি।ট্রেনের জানলায় ছায়াছবির মতো নিমেষে সরে যাচ্ছে দৃশ্য থেকে দৃশ্যান্তর। সবুজ চাদর ,গাঢ়তর সবুজ, মাটিরবাড়ি,দূরে হাইওয়ে, সব সরে যাচ্ছে অতীতে। যেমন করে সরে যাচ্ছে অন্ধ গলিটা,খোলা ড্রেন,ভাঙা বাড়ির  উঠোনে দড়িতে মেলে দেওয়া লাল ব্রা, শায়া,শাড়ি।মুখের সারি,মিতা,রাবেয়া,অঞ্জনা,মামনি.... কোঁচকানো বিছানার চাদর সব সরে যাচ্ছে। দু ফোঁটা জল গড়িয়ে পড়ে গাল বেয়ে।শোকের না মুক্তির আনন্দে কে জানে।প্রাতঃকৃত্য সেরে ব্যাগ গুছিয়ে রেডি হয় অনীতা।

অচেনা স্টেশনে রোদের আলো, ভাঁড়ের চা।

কুড়ি কুড়ি বছর,কেটে গেছে।মনে পড়ে পড়ে সেই রাত।স্বামী সাবিরের হাত ধরে বাড়ি ছেড়েছিলো অভাবের দায়।মদ আর জুয়া,বেকার স্বামীর মার,।আম্মা আর শাশুড়ি মায়ের বিলাপ।সাবির বলেছিলো কলকাতায় অনেক কাজ। দুজনে থাকবে।তারপর হিসেব মেলেনি। সাবির মামনির কাছে রেখে সেই রাতে চলে গেছিলো।

সোনাগাছির পুরোনো বাড়ির জায়গায় এখন ফ্ল্যাট। মামনি মানুষটা অবশ্য খারাপ নয়।

একসময় কান্নার শেষ।একসময় কাজ হয়ে গেছে গা সহা।ক্রমে নিজেকে গুছিয়ে নিয়েছিল সে। ক্রমে নিজের কিছু ব্যাংক ব্যালান্স। সবই মামনির পরামর্শে।উঠে দাঁড়াল সে একসময়।একসময় মন থেকে নিজেকে আর ঘৃণা নয় এই তার মতো মানুষগুলোর জন্য সংগঠন।নানা মানুষ এগিয়ে এলেন।একসময়

আট বছর আগে খবর পেয়েছিল ইন্তেকাল হয়েছে সাবিরের।তার কাছে তো সাবির সেই রাতেই মৃত,যেদিন তাকে বিক্রি করে পালিয়ে গেছিল সে।তার প্রথম কাস্টমার সেই 

কাঁচা পাকা চুল অচেনা মানুষটাকে ভোলেনি বরং সে।একমাস মামনির তত্বাবধানে থাকার পরে ক্রমশ শান্ত,দৃঢ় হয়েছিল সে।মানুষটা 

  তাকে ইচ্ছে মতো ঘেঁটেছিল। খুব খারাপ লাগেনি একথা সে স্বীকার করেছিল মনে মনে।

যাবার সময় আলাদা করে মোটা টাকার সঙ্গে  খুচরো উপহার।সেই মানুষটা আর কারো কাছে আসতো না টানা পাঁচ বছর পর মারা গেছিল গাড়ি চাপা পড়ে।

তারপর একে একে এসেছে অনেকে।এখানে রহমত চাচা তাদের সুরক্ষায়। থানা তাদের পাশে।

অন্তত সোনাগাছিতে প্রবঞ্চক স্বামী  নেই।অন্তত দুবেলা খাওয়া। সুরক্ষা।সততা।

ট্রেনে তুলে দিতে এসেছিল রহমান চাচা আর লাল্লু যাদব।তিন অনাত্মীয়। চোখে জল।" মুন্নি মোবাইল মে নং সেভ হ্যায় চিন্তা মত্ কর।আল্লাহ্ কে দোয়া সে তু খুশি রহেগি অগর  গরবড় হুয়া তো লৌট আনা" রহমান চাচা বলেছে।

সেই ফাল্গুন মাসে কাজ বন্ধ হয়ে গেলো।লকডাডাউন, ভাইরাস,মৃত্যু মিছিল।পেশা বন্ধ। ছ মাস পড়েও শোনা গেল এ পেশা অনিশ্চিত।শরীর বেচা মেয়েদের  দানের টাকা হজম  হয় না।ধীরে ধীরে খালি হচ্ছিল সোনাগাছি। সাবিরকে মনে পড়ে না।মনে পড়েছিল ছায়াঘেরা গ্রামটা।এখনো ফিরে গেলে কিছুদিন চলে যাবে।চিঠি করে দিয়েছে মামনি কোনো এক নেতার যাতে না তাড়িয়ে দেয় তাকে।

লাল সুরকি বিছানো স্টেশন। কুড়ি বছরে অনেক বদল।রংচঙে চায়ের দোকান খাবার স্টল।জিও, এয়ারটেলের ফ্লেক্স।

বুড়ো বটগাছটি আছে এখনও স্টেশনের বাইরে।সাক্ষী তার যাওয়ার আর আজ এই ফেরার।

অনীতা কলরব ছেড়ে পা দেয় বাড়ির পথে।নীলের ওপর হলুদ ফুলছাপ শাড়ি, বুক অবধি ঘোমটা আর গোলাপি চাদরে মোড়া দুর্গা খাতুন বাসে চড়ে।তারপর টোটো,তারপরে ভ্যান।পথ এক, বদল অনেক।শেষটুকু পায়ে হাঁটা পথ।

ওই যে কামারপাড়া ছাড়িয়ে মাঠ তারপর পাঁচপোতা।পুকুর,গাছ,ঘন জঙলা পথ।

অতিমারী তাকে আবার ফিরে আসার সুযোগ করে দিয়েছে। 

ওই যে দূরে ভাঙাচোরা মাটির ঘর টালির চাল।উঠোনে দুটো ছাগল। ওখানে রাখা আছে তিন হাত জমিন। ন্যুব্জ এক বুড়ি বেড়িয়ে আসছেন। হাতে লাঠি। শুভ্রকেশ।সাদা শাড়ি।একাকী এক মা।    

দুর্গা খাতুন ওরফে অনীতা কঞ্চির আগল খুলে প্রবেশ করে আবার দ্বিতীয় জীবনে।

               

বিশ্বজিৎ মানিক

ভালোবাসার ব্যাকুলতা
             
ভালোবাসার অনেক জ্বালা,অনেক ঝঞ্জাট ।
যাদের আমি ভালোবাসি
তারা হাসলে আমারও হাসতে ইচ্ছে করে,
দুঃখ পেলে নিজের মনটাও পীড়িত হয় ।
ব্যাধির মতো ছড়িয়ে পড়ে ভালোবাসা
এর থেকে নিস্তার নেই,নেই মুক্তি ।
যাদের আমি ভালোবেসে,পেয়েছি ভালোবাসা
পরিতৃপ্ত হয়েছিল আমার মনপ্রাণ
সময়ে অসময়ে অনেকে গেল চলে,দূরে বহু দূরে ।
তারপর ভালোবাসা হারা ভালো থাকতে হয়,
দিনগুলো কেটে যায় বেশ।
বিবাদ-বচসা,মারামারি,দলাদলি,অর্থের কাড়াকাড়ি
কিছু শুনি কিছু দেখি কিছু বলে লোকে ।
আমন্ত্রণ নিমন্ত্রণ বইপড়া, লেখালেখিতে
সকাল দুপুর সন্ধ্যা,রাত্রিও কেটে যায় বেশ;
সব মিলিয়ে ভালো আছি,সুখেই আছি বলতে হয় ।
তবুও ভালোবাসা হারা হয়ে ওদের কথাই ভাবি,
ভাবতে ইচ্ছে করে,ভালো লাগে ।
ওদের দেখতে ইচ্ছে করে,স্বপ্নে দেখি ।
কথা বলতে ইচ্ছে করে,মনে মনে কথা বলি ।
ভালোবাসার ব্যাকুলতা যে বড়ো অসংযত,
অনেক সময় বড়ো দুঃসাধ্য,কষ্টকরও বটে ।

দীপা সরকার

বোধন... 

অবশেষে কি না তোর মতো একটা ব্রাইট ছেলে এরকম একটা কাজ করলি? তোর থেকে এমন কাজ কোনোদিনই আশা করিনি। তোকে আমি অনেক ভরসা করতাম, বিশ্বাস করতাম আর তুই কিনা আমাদের না জানিয়ে এই মেয়েকে বিয়ে করে আনলি অনুপ, আমি তোকে কিচ্ছু বলতাম না যদি না এই মেয়ের সাথে... 

তুমি কি ভাবলে, আমি কিছু না জেনেই ওকে বিয়ে করেছি না মা আমি ওর সবটা জেনেই ওকে গ্রহন করেছি।

ওর কি দোষ বলো মা ওর ফিউচার ও তো আমাদের মতোই ব্রাইট ছিলো, তবে এখন কেন ওকে অন্ধকার জীবন নিয়ে গোটা জীবনটা কাটাতে হবে? কেন মা বলো কেন? সেদিন রাতে তো পল্লবীর কোনো দোষ ছিল না! সেদিন সন্ধ্যায় নাচের শো টা শেষ করেই আমাকে ফোন করেছিল...

হ্যাঁ বলো পল্লবী, এই যে এই মাত্র আমার শো শেষ হলো, তোমাকে কত করে বললাম আসতে এলে না...

কি করবো বলো অফিসে কাজ পরে গেছে, পরের বার যখন শো হবে আমি নিশ্চয়ই আসবো, তো এখন বাড়ি ফিরবে কি করে?

এই তো মাত্র সাতটা বাজে, অটো করে ঠিক বাড়ি পৌঁছে যাবো তুমি চিন্তা করো না এখন রাখি ফোনটা...

সেদিন যদি আমি ওর ফোনটা রিসিভ করতাম, হয়তো কোনো ভাবে সেদিন ওকে নরপিশাচ গুলির হাত থেকে বাঁচতে পারতাম, আর যখন কল ব্যাক করি ততক্ষণে যে ওর অনেক ক্ষতি হয়ে গেছে... কেন ঐ নরপিশাচ গুলির শিকার হতে হলো ওকে?

 আর এখন কেন ই বা ও এই অন্ধকার জীবনটা কাটাবে?

যদি অন্ধকার জীবন কেউ কাটায় তাহলে কাটাবে ওই পাপী গুলো পল্লবী নয়, ও আগে আমার কাছে যতটা পবিত্র ছিলো এখনও তাই আছে।

ও নিজেকে কেন বিনা দোষে শুভ অনুষ্ঠান আনন্দ থেকে দুরে রাখবে? আমি আমার সিঁদুরে নতুন করে সম্মানের সঙ্গে বাঁচতে শেখাবো, তোমার চিন্তা তো আমায় নিয়ে তাই না? আমি ওর সাথে ভালো থাকবো মা, আজ তো বিজয়া, আমি চাইনা ওর আনন্দ, উল্লাস, ভালো থাকার অধিকার মায়ের সাথে বিসর্জন হয়ে যাক, যদি বিসর্জন হবার ই হয় তাহলে মানুষ রূপী পিশাচ গুলির বিসর্জন হবে, তুমি ওকে মেনে নাও মা।

 আমার ভালোবাসাকে আমি বিনা অন্যায়ে বিসর্জন হতে দেবো না, আমার সিঁদুরে রাঙ্গা করে আমি এভাবেই বোধন করবো আমার ভালোবাসার। যাতে আমার সিঁদুরের শক্তি একে অশুর বিনাশে শক্তি দেয়...

শুভ শক্তির জোরে বারবার যেন অশুভ শক্তি বিনাশ হয়।

সায়ন পাল

ছোটগল্প 

অভাগী

সবুজ বনানী ঘেরা, তটিনী নদীর তীরে পুতুলপুর গাঁও। সেখানে নিত্যানন্দ দাস ও ভগবতী দেবী ছোট্ট সংসার নিয়ে কুরে ঘরে  জীবন কাটাচ্ছে। অভাব নিত্য সঙ্গী। সন্তান-সন্ততির আশায় নিত্যানন্দ দাশ গাঁয়ের ছোট্ট মন্দিরটি তে রোজ আনাগোনা। ভগবানের আশীষে একটি ফুটফুটে সুন্দর কন্যার জন্ম দিল মাতা ভগবতী। মেয়েটির জন্মের ৩ দিনের মাথায় মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়লো মা ভগবতী। গাঁয়ের লোক নাম দিয়েছে অভাগী। পিতা বহু কষ্টে মেয়েটিকে তিলে তিলে মানুষ করে তুলল। এভাবেই সময়ের চাকা ঘুরতে লাগল।

            মেয়ের বয়স হয়েছে। পাড়া গাঁয়ের লোক নিত্যানন্দ দাশ কে মেয়ের বিবাহ প্রসঙ্গে অবগত করালো। এদিকে আর্থিক অনটনে জর্জরিত নিত্যানন্দ দাস চিন্তায় উদ্বিগ্ন। একদিন সকালে বিনয় বাবু এক শহুরে ছেলের আলাপ নিয়ে এসেছে। জমিদার বাড়ির ছেলে। শ্যামনগরের জমিদার রুদ্রকান্ত বাবু 

"মানুষ হিসেবে মাটির মানুষ"।

কেন জানি না! প্রথম দেখাতেই অভাগীকে মনঃপুত মনে হলো। 

না, তেমন একটা দাবি দাওয়া নেই  । আগামী বৈশাখে অভাগীর বিবাহ স্থির হল। এদিকে পিতা নিত্যানন্দ তার একমাত্র পৈত্রিক ভিটার অর্ধাংশ বিক্রয় করি যথা সামর্থ্য মেয়েকে উজাড় করে দিল। দিনক্ষণে অভাগীর বিবাহ হয়ে গেল। পিতা নিত্যানন্দের কন্যাদান সম্পন্ন করল। বর অভাগী কে খুব ভালোবেসে দিন কাটাতে লাগলো।

         ভাগ্যের নির্মম পরিহাস! কিছুদিনের মধ্যেই বরের হৃদয়ে 'ফুটো' ধরা পরল। বহু যন্ত্রণা আর্তনাদ করে বর শহুরে হাসপাতালে প্রাণ রাখলো। এদিকে শ্বশুরবাড়ির লোকেরা 

"অভাগীকে অলক্ষী বলে মন্তব্য করলো"। 

শ্বশুর বাড়ির লোকেরা অভাগীকে শত দোষে দোষী করে নতুন প্রভাত এর আগে জমিদার বাড়ি ত্যাগ করার আদেশ দিল। চিরকালের সুখ হীন, আনন্দহীন 

"অভাগী অভাগী হয়েই থেকে গেল"।

         কত বসন্তে কোকিলের মিলনের সুর, বর্ষায় ব্যাঙের ডাক, ময়ূরের মিলনের তরে নাচন, বসন্তে প্রকৃতির সমীরন, নব যুবতীর আলতা রাঙানো পা, অভাগীকে টুকরো টুকরো দুঃখ দিয়ে যায়। 

"অশ্রুজল শুকিয়ে গেছে আর কান্না আসে না"।

কত উৎসব রাতিতে নববধূর সাজ, কত আনন্দে রমনীদের নাচন, ফুলের শোভা আর গাছে ধরে না যখন, কত প্রমত্ত ভ্রমর নাচন ভঙ্গিমায় ব্যস্ত, তখন নিত্যানন্দ দাশের কুঁড়েঘরে অভাগী চোখের জল ফেলে!বলে-

এ কেমন বিচার?

     সেদিন বসন্তের শেষ বেলা। প্রতিদিনের ন্যায় আজও ওই রাঙা ফুলগুলির দিকে নজর রেখে অভাগীর চেয়ে রইল , আজও সেই ভাসমান মেঘ, প্রকৃতির নিঠুর খেলা দেখতে লাগলো, এমনি সময়, কোন আগন্তুক যেন হাতে হাত রাখলো। এক মুহূর্তে যেন এক বিশ্বাসের পৃথিবীতে নিয়ে গেল অভাগীর বহুদিন পরে  কোন বিশ্বাসের ভিত্তি তৈরি হলো অভাগীর মন মন্দিরে। কত প্রতিজ্ঞা, তার অভাগীর চোখের জল মুছে দেওয়া, এগুলো যেন নতুন সম্পর্কের ইশারা দিচ্ছে। অভাগী নতুন করে বাঁচতে দ্বিধা জড়িত। আধো আধো কণ্ঠে পিতা নিত্যানন্দ দাস কে জানালো এক মুহূর্তের সুখ দায়ক আগন্তুক পুরুষের কথা। দু ফোটা চোখের জল যেন গড়িয়ে পরল নিত্যানন্দ দাশের চোখের নিচে। নতুন সম্পর্কে যেন সম্পূর্ণ রুচিবোধ হারিয়ে ফেলেছেন পিতা নিত্যানন্দ। সেই অচেনা পুরুষ অভাগীর কুঁড়েঘরে এসে পিতা নিত্যানন্দ দাস কে সান্তনা জোগাতে লাগলো। বহু প্রতিজ্ঞা, ও জানালার ডিপিতে রাখা ভগবানের প্রতিকৃতির সম্মুখে জ্বলন্ত তৈল প্রদীপ সাক্ষী থাকলো 

"সেই নতুন বন্ধনের"।

ছেলেটি ওই সাদা শাড়ি পরা বিধবা অভাগীর সম্মুখে আলতা ,লালচুরি, শাঁখা পলা, লাল বেনারসি ,সিঁদুরের কোটা রাখলো। অভাগীর চিন্তন জগতের তীব্র আলোড়ন ঘটতে ঘটতে এক সময় যেন "অভাগীর মুখ থেকে এক টুকরো শব্দ বের হলো হ্যাঁ।"

সাহসী অভাগী যেন বলে উঠলো আমি প্রস্তুত।

    চিরকালের সুখহীন, বেদনা যুক্ত, অশ্রুজল সমন্বিত, কষ্ট সহিষ্ণু, অভাগীকে এক টুকরো সুখ প্রদান করতে এসেছে ছেলেটি। 

আবারো একবার সাত পাকে বাঁধা পড়ল অভাগী আর আগন্তুক ছেলেটি।বিবাহের পর জানা গেল ছেলেটি অর্থাৎ মোহন শহুরে বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যক্ষ। পিতা নিত্যানন্দ দাশে যেন আনন্দে আপ্লুত ‌। ভগবানের নিকট হাজারো প্রণামের ঝড় উঠলো। জানা গেল নতুন বর কাজের সুবাদে ছোট্ট পাড়ার গাঁয়ের " Life experience" এর জন্যই এসেছিল।


"ভগবান যেন তাহাকে দেবদূত করে পাঠালো"। এখন বর চিরকালের অভাগীকে নিয়ে শহরে চলে গেল ।

অনিমেষ দাস

বনফুল

বনফুল ফোটে বনে, আপনমনে
কেউ রূপসী সুন্দরী,কেউ গুনবতী বড়।
মৌমাছি আসে প্রয়োজন মেটাতে ফোটায় হুল,
কভু রাজার বাগানে যায়নাকো বনফুল,
সেখানে তো মানুষ আপন লীলায় মশগুল।
ছিঁড়ে নিয়ে গুঁজে দেয় প্রেয়সীর চুলে
ফুলেদের কাছে এসব অর্থহীন যায় ভুলে।
বাতাসে ছড়ায় ফুলের মৃত্যুর বেদনা
হাহাকার ওঠে,ফুলেরা করে না মৃত্যুর কামনা।
মধুপ ছাড়া আর কেউ প্রিয়জন নয় তার,
মানুষরা তো রাজারই চাটুকার।
রাজা সেতো নিজেও মানুষ
তাই মসনদে বসে ওড়ায় রঙিন ফানুস।
প্রতিবাদী বনফুল যায়নাকো রাজার বাগানে,
ডাকে নাকো রাজা তাকে মধু সম্ভাষনে।
আশীর্বাদ নিতে অথবা ওষুধের প্রয়োজনে,
রাজা নিজেই যান মসনদ থেকে বনে,
বনফুলের স্তুতি করেন মধুর আলাপনে।

চৈতালী ভট্টাচার্য্য

ছোটগল্প

ক্ষমাই পরম ধর্ম 

 মন্দিরের অন্দরে দন্ডায়মান ভগবান শ্রীকৃষ্ণের শ্বেতশুভ্র প্রস্তর মূর্তির সন্মুখে নিমীলিত চক্ষে পদ্মাসনে বসে গভীর আবেশে তানপুরায়  ভক্তি সংগীত পরিবেশন করে চলেছেন বীরজু প্রসাদ। 
"প্রভু মুঝে কভু ছোড় না যাইও
তুঝে মুঝে সাহারা বিলাও।
ম্যায় তুম বিনা ক্যায়সে রহু
এ অন্ধেরি জগৎমে—--"
 সংগীতের অপূর্ব সুরমাধরীতে  স্তব্দ ঊষা যেন তার  দিগন্ত প্রসারিত রক্তাভ আঁচল উন্মিলিত করতে যেন দ্বিধাগ্রস্ত। ঘুম ভাঙা পাখিরা কূজন বন্ধ করে সঙ্গীত সুধা পান করতে যেন অধিকতর ব্যগ্র। সুদাম মন্দিরের সিঁড়ির শেষ ধাপে বসে চোখ বন্ধ করে একাগ্রচিত্তে গান শুনে যাচ্ছে। যদিও সে জানে গুরুজী তাকে এই স্থানে এই অবস্থায় দেখলে খুব অসন্তুষ্ট হবেন। তাই সে সদা সতর্ক। ,কেননা এই সংগীত গুরুজীর ঈশ্বরের উদ্দেশ্যে নিবেদিত একান্ত নিজস্ব ভগবত সাধনা। কেউ এই বিষয়ে কিছু জানুক তিনি তা একেবারেই চান না। গুরুজীর আরাধনা শেষ হওয়ার আগেই তাই সে এই স্থান ত্যাগ করে গুরুজীর জন্য মধু আদার চা প্রস্তুত রাখবে।
     "গুরুজী আপনার চা প্রস্তুত। আপনি সেবন করুন। " 
"সুদাম বেটা আমি তো তোমাকে আগেই বলেছি আমার এসব কিছুই লাগবে না। তুমি এখন পড়াশোনার দিকে মন দাও। আর একটা কথা তোমাকে তো আমি আগেও অনেকবার গুরুজী বলে ডাকতে নিষেধ করেছি । তাও তুমি কেন শুনোনা। সেরকম মনে হলে তুমি আমাকে নানা বলে ডাকবে। আর যেন এই ভুল না হয়। শোনো আজ আমি শহরে যাবো একটু বিশেষ কাজে । তুমি সারাদিন শান্ত ও খুব ভালো হয়ে থাকবে। তোমাকে সেদ্ধভাত ফুটিয়ে দিচ্ছি। তুমি খেয়ে  যথাসময়ে ইস্কুল চলে যাবে। আমি বিকেলের আগেই চলে আসবো।"
   গুরুজী চলে গেলে বই নিয়ে নাড়াচাড়া করতে লাগলো সুদাম। কিন্তু কিছুতেই পড়ায় মন বসাতে পারছে না। অন্যদিন গুরুজী পড়া দেখিয়ে দেন। তারপর সে খেয়েদেয়ে ইস্কুলে যায়। সুদাম ভাবে এতো অপূর্ব গলা গুরুজীর অথচ গান শেখানোর কথা বললে গুরুজী প্রচন্ড রেগে যান। সারাদিন একেবারের জন্য তানপুরায় হাত ছোঁয়ান না। একমাত্র  প্রত্যুষে সবাই যখন গভীর ঘুমে 
আচ্ছন্ন , ঊষাদেবী যখন ওঠার প্রস্তুতি নিচ্ছেন তখন গুরুজী স্নান সেরে শুদ্ধ পট্ট বস্ত্র পরিধান করে  ইষ্টদেবতাকে সঙ্গীতের মাধ্যমে আরাধনা করেন।  অথচ এই গুরুজীর নাকি একসময় কতো গানের ছাত্র ছিল। এমনকি তার বাবাও নাকি গুরুজীর খুব প্রিয় ছাত্র ছিলেন। তারপর কি যে হলো কেজানে। পড়শীদের মুখ থেকে শুনেছে বাবা নাকি গুরুজীর কাছেই মানুষ। সাত্ত্বিক ব্রাক্ষণ পরিবারে বাবার জন্ম হয়েছিল। খুব ছোটবেলায় বাবার মা মারা যান।  সৎমার অত্যাচারে বাবা নাকি পালিয়ে এসে গুরুজীর আশ্রয় গ্রহণ করেন।  আজীবন ব্রক্ষচারী গুরুজী বাবাকে সন্তান স্নেহে পালন করে তোলেন।
"বেটা সুধাময় আমি  তোমাকে আমার স্নেহের সবটুকু দিয়ে তোমাকে মানুষ করার চেষ্টা করেছি এবং সেই সঙ্গে স়়ংগীত বিদ্যার সবটাই তোমাকে দান করেছি। দেখো এর যেন কোনো অমর্যাদা করো না। স়়ংগীত হলো স্বয়ং ঈশ্বর। তাঁকে কখনও বিক্রয় করো না। জীবনে অনেক সুযোগ আসবে , কিন্তু শ্রোতাদের মনোরঞ্জন যেন একমাত্র ধ্যানজ্ঞান না হয়ে ওঠে। তুমি মনে করবে সংগীত নয় তুমি ঈশ্বরের সাধনা করছো। তাহলে সর্বময় ঈশ্বর তোমার মঙ্গল করবেন।"
"আপনার আদেশ শিরোধার্য গুরুদেব"_বলে প্রনাম করে সুধাময়। গুরুজী মাথায় হাত রেখে আশির্বাদ করেন।
সুধাময়কে তার বন্ধুরা বললো _"কিরে শুনিসনি?  পাশের গ্রামে সিনেমার শুটিং হচ্ছে। ওরা নাকি একটা নতুন গলার সন্ধান করছে  নায়কের গলার প্লেব্যাক করার জন্য। ভালো পারিশ্রমিক দেবে। তোর এতো ভালো গলা। তুই  ঠিক চান্স পেয়ে যাবি । এখানে  শুধুমুধু পড়ে থেকে তোর প্রতিভা নষ্ট হচ্ছে।  এই বুড়োটার কাছে বেকার পড়ে আছিস। নিজেও কিছু করবে না আর কাউকে কিছু করতেও দেবে না। "
" নারে গুরুজী এসব পছন্দ করেন না। এসব করলে উনি খুব রাগ করবেন। উনি স্বপ্ন দেখেন আমি একদিন একজন সঙ্গীতের দিকপাল হবো। তারজন্য এখনও প্রচুর সাধনার দরকার।"
"আরে সাধনা করতে করতে যে বুড়ো হয়ে যাবি। জীবনে সুখভোগ করবি কবে?"
সুধাময় বললো "ওনার  মতো একজন মানুষ যার সঙ্গীতের ওপর এতো বিশাল দখল উনি তো ইচ্ছা করলেই কলকাতা বা মুম্বাই চলে গিয়ে বিশাল সুনাম করতে পারতেন। কিন্তু উনি করেননি। সঙ্গীত ওনার কাছে ঈশ্বরের সাধনা।  তাই তিনি এই বাড়ি ছেড়ে আর এই কৃষ্ণের মন্দির ছেড়ে কোথাও এক পা দিতে চান না।"
"তাহলেই বোঝ উনি নিজের জীবন তো নষ্ট করেছেন এমনকি তোর জীবনও নষ্ট করে দিতে চাইছেন।"
সুধাময় ভাবে "সত্যি তো এই গুরুজীর কাছে পড়ে থাকলে কিছুই তার জীবনে করা সম্ভব হবে না। বেরোতে হবে।  তাই সে শুটিং করতে আসা দলের সঙ্গে দেখা করে। আর প্রথম অডিশনেই সিলেক্ট হয়ে যায়।  তারা অবশ্য কলকাতার স্টুডিওতে গিয়ে ফাইনাল গানের টেক আপের কথা বলে এবং তাকে দিয়ে কনট্র্যাক্ট পেপারে সাইন করে দিয়ে বেশকিছু অ্যাডভান্স দিয়ে একটা নির্দিষ্ট ডেট বলে দেয়।
  গুরুজীকে লুকিয়ে কলকাতা যাত্রা করে সুধাময়। রঙিন জীবনের হাতছানিতে  আর টাকার মোহে গুরুদেবের সব নির্দেশ ভুলে যায়। পয়সা রোজগার তার একমাত্র ধ্যানজ্ঞান হয়ে যায়। টাকার জন্য অনেক নিম্নমানের গানে গাইবার জন্য সে সাইন করে। হাওয়াই বাজীর মতো চড়চড় করে সে ওপরে উঠতে থাকে।
 কোনো কিছুই আর গোপন থাকেনা গুরুজীর কাছে। আকন্ঠ মদ্যপান আর নারীসঙ্গ একমাত্র ধ্যানজ্ঞান হয়ে দাঁড়ায়। এরমধ্যে এক হোটেলের গায়িকা মুসলিম রমণীর সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়। কিন্তু সুখ বেশি দিন চিরস্থায়ী হয় না।  ছায়াছবিতে চটুল গানের জন্য তার যে ডিমান্ড ছিল তা ক্রমাগত কমতে থাকে। বেশ কিছু গানের রেকর্ড সুপার ফ্লপ হয়। কোনো সঙ্গীত পরিচালক আর তার সঙ্গে কাজ করতে আগ্রহ প্রকাশ করেন না।  আর্থিক চরম দুরবস্তায় পড়ে সুধাময়ের পরিবার। ইতিমধ্যে তাদের সন্তান চারবছর বয়স অতিক্রম করেছে। বউয়ের গানের রোজগারে কোনো মতে স়়ংসার চলতে থাকে। সুধাময় নিজের ভুল বুঝতে পারে। গুরুজীর স্বপ্ন ছিল তাকে বড় বড় ওস্তাদদের মাঝে পেশ করা। তার জন্য আরও অনেক সাধনার আর ধৈর্য্যের দরকার ছিল। কিন্তু তার হটকারীতার জন্য সব পন্ড হলো। এখন গুরুজীর সামনে কোন মুখ নিয়ে সে দাঁড়াবে। মানসিক দুশ্চিন্তা ও হতাশায় সে ক্রমাগত অসুস্থ হয়ে পড়তে থাকে।


  অবশেষে তারা কলকাতা থেকে গ্রামে ফেরার সিদ্ধান্ত নেয়। কিন্তু পথিমধ্যেই সুধাময় খুব অসুস্থ হয়ে পড়লে তাকে শহরের হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। তার সিরোসিস অফ লিভার ধরা পড়ে। প্রচুর টাকার দরকার। বউ সন্তানকে নিয়ে সুধাময়ের গ্রামে ফিরে আসে। কিন্তু কোথাও ঠাঁই বা কাজ জোটেনা। অবশেষে ছেলেকে নিয়ে গুরুজীর দরজায় হাজির হয়।  ছেলেকে মন্দিরের সামনে বসিয়ে দিয়ে বলে "আজ থেকে গুরুজী তোর আপনজন আমরা তোর কেউ নই। যতই গুরুজী তোকে তাড়িয়ে দিক না কেন পা আঁকড়ে এখানেই পড়ে থাকবি। তারপর ছেলেকে আদর করে রাতের অন্ধকারে কোথায় যেন হারিয়ে যায়।
ঊষাকালে মন্দিরের সিঁড়িতে কান্নাভেজা এক ঘুমন্ত শিশু সন্তানকে দেখে হকচকিয়ে যান বিরজু প্রসাদ।  তার কথায় জানতে পারেন যে সে সুধাময়ের ছেলে নাম সুদান। তার মা তাকে গুরুজীর কাছেই থাকতে বলে কোথায় যেন চলে গেছে। প্রথমে তাঁর অন্তরাত্মা গভীর বিমুখ হয়ে উঠলেও  কৃষ্ণমূর্তির দিকে তাকিয়ে তাঁর সব মনের কালিমা দূর হয়ে যায়  তিনি পরম আবেশে শিশু সন্তানটিকে বুকে টেনে নেন _
"বলে ওঠেন ঐ যে দেখতে পাচ্ছিস কৃষ্ণ,আজ থেকে ও তোর বন্ধু , আর তোর নাম দিলাম সুদাম। সুদামের যে বাবা সুধাময় সে যতো বড় অপরাধী হোক না কেন তাকে কি আর না ক্ষমা করে পারা যায়। ক্ষমাই যে পরম ধর্ম রে বেটা।"

নিতাই শর্মা

শারদোৎসব

ভাদ্রের হাত ধরে শরতের আগমন,
বর্ষার কালো মেঘেরা করে গমন।
নীল গগনে ভাসে সাদা মেঘের ভেলা,
চারিদিকে উদ্ভাসিত আলোকের মেলা।

শিউলির সৌরভ ছড়ায় ভোরের বাতাসে,
খালে বিলে জলাশয়ে পদ্ম ফুলেরা হাসে।
নদীর তীরে সাদা কাশফুল বাতাসে দোলে,
হিমেল প্রাতে শিশির বিন্দু ঝরে পড়ে ফুলে।

বিশ্বকর্মা পূজোর সাথে ভাদ্রের সমাপন,
অষ্টমী তিথিতে  শ্রীকৃষ্ণ করেন জন্মগ্রহণ।
মহালয়া হয় আশ্বিনের অমাবষ্যা তিথিতে,
পিতৃপক্ষের সমাপন ঘটে গোটা পৃথিবীতে।

মাতৃপক্ষের শুরু মহালয়ার অন্তিম ক্ষণে,
আনন্দধারা বহে জগত সংসারে জনমনে।
শারদীয়া দুর্গোৎসবে মাতোয়ারা ভুবন,
ষষ্ঠী তিথিতে হয় দেবীমায়ের বোধন।

মা জগজ্জননী আসে তিন দিনের তরে,
দশমী তিথিতে মায়ের গমন পতির ঘরে।
অশ্রু সজল নয়নে হয় মায়ের বিদায়,
পরস্পর আলিঙ্গন করে শুভ বিজয়ায়।

দুর্গোৎসবের পর ধন লক্ষীর আগমনে,
ধনী গরীব নির্বিশেষে মত্ত লক্ষী পূজনে।
লক্ষী পূজনে হয় দেবীপক্ষের সমাপন,
আগামীর প্রত্যাশায় হয় দেবীর বিসর্জন।

রূপালী রায়

দেবীপক্ষ 

ভাবনার শূন্য এঁকেছি যত গল্প 
একে একে বন্দী সব 
চার দেওয়ালের কক্ষে ।
যে দূরত্বে সময় গেছে চলে 
আকাশটা ক্রমশ হচ্ছে ছোট
স্বপ্নের জাল থেমে গেছে বুনা 
 মানুষ থেকে বেশি 
হয়েছি নারীতে পরিণত ।
বুকে জমা সব কথা 
অপ্রকাশ্য  জটিল ব্যাথা 
চাপা পড়ে গেছে সে কবেই ।
চার পাশে চেয়ে দেখি 
দখলে গেছে সমস্ত জমি 
ইচ্ছে ছিল খুব আঁকড়ে ধরে বাঁচবার ।

রাজীব আচার্য্য

আমার কাশফুল

নীল আকাশে সাদা মেঘের ভেলা
চোরা বৃষ্টি মাঝে মধ্যেই করছে খেলা,
দিনগুলো বষর্ণমুখর নয়
তাইত ভয় হয়।
ওই দূরে চঞ্চল কাশবন
দুরন্ত বাতাসে তার সাথে দোল খায় মন।
শরৎ সেজেছে কাশফুলে থরে বিথরে বালুচরে!
সাদা মেঘের শতদল উড়ছে অপরূপা নীলাম্বরে!
ভাটির দেশে শুভ্র কাশবন কেড়ে নিয়েছে মন,
নদীর তীর কত যে নিবিড়; মন হয় উচাটন!
হাওয়ায় দোলে ফুল দল উড়ে যেতে চায় সুদূরে;
মায়া-মমতায় আটকে আছে পাশাপাশি অঙ্গাঙ্গীভাবে!
ধূসর সাদা কাশফুলে ছেয়ে গেছে বালুচর।নীলাকাশে উড়ছে সাদা মেঘ স্তরে স্তর।
ধরাধামে নেমে এলো এলোকেশী উর্বশী!কপালেতে নীল টিপ যেন পূর্ণিমা শশী।

প্রসেনজিৎ রায়

প্রেমের এক উপাখ্যান

তোমার আঙ্গুল ছুঁয়ে স্বপ্ন উড়ান শুরু,
পাথরের ইমারত ছাড়িয়ে মোহনা পেরিয়ে সীমাহীন দিগন্তরেখা বরাবর...
কোনো এক সংজ্ঞাহীন অবেলায়।
বিশ্বাসের ভরসায় সভ্যতার নখরীকুঞ্জে ভিড়ে ভিনদেশী নৌবহর,
মৃদুমন্দ হাওয়ার তোপে স্বপ্ননগরীতে ধ্বজ উড়ায় সোনালী আলখাল্লা।
ভোররাতে যখন আমি ভোরঘুমে বিভোর তোমার স্পর্শে আবেশী ফানুস তখনও উড়ে চলে,
নাম না জানা কোনো এক কল্প নদীর গভীরে লুক্কায়িত ব-দ্বীপের হৃদয় ছুঁয়ে,
কোনো এক হৈমন্তী প্রভাতে ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে আমি গড়ে উঠতে দেখি এক নিঃশব্দ প্রেমের উপাখ্যান।

কৃষ্ণকুসুম পাল।

দিন যায় কবিতা থাকে

দিন যায় - কবিতা থাকে,
রাত যায় - স্বপ্ন থাকে।
              
সময় যায় - প্রেম থাকে,
স্রোত যায় - নদী থাকে।
               
যৌবন যায় - স্মৃতি থাকে,
জীবন যায় - কীর্তি থাকে।
                 
ছায়া যায় - মায়া থাকে,
কায়া যায় - আত্মা থাকে।
                 
দিন যায় - কবিতা থাকে,
রাত যায় - স্বপ্ন থাকে।

শ্বেতা ব্যানার্জী

কোথায় হারাই!

শব্দেরা পথ ছেড়ে চলে গেছে কবেই, শুধু ইচ্ছে এখনো বেঁচে।
সে বলে, এতো সহজেই হেরে যাবে! 
তোমার কবিতা তোমারই মতো বেঁচে।
যাবে যদি চলে ; কেন বেঁধেছিলে 'অরিগ্যামি' সুখ
শব্দের যৌবনে 
কেন রাখলে  নবজাতকের  কাঁথার উপভোগে,
কেন সাজলে প্রেমিক!
ছিন্ন মূলের বেদনার ঘর কেন কেড়ে নিতে চাও!
শব্দ তো শুধু  সম্মতি দিয়েছিল, আমি তো বাড়িয়ে ছিলাম দু'হাত।
নির্দ্ধিধায় বুকে টেনে নিয়ে  চাটাই-এর যোগ্য করে 
বসতে দিয়েছিলাম তোমাকে। 
কেন সংকোচ? অস্ত্র তোমারই হাতে;
সেই যে খেলাচ্ছলে শব্দের 'এক্কা-দোক্কা' ঘর।
শব্দেরা নির্নিমেষ তাকিয়ে ছিল তোমারই
অপরিপক্ক কলমের দিকে... 
তারপর তো বয়ে গেছে ঝড়। 
এলোমেলো ভাবনারা গড়েছে সেতু,
রেচনতন্ত্রে পরিপাক। 
দোহাই তোমায় ফাল -ফাল করে স্বর্গসুখ তুমি মুছোনা,
বির্সজন দিওনা তোমার কবিতাকে। 
বৃক্ষচক্রের বিশ্লেষণ করে বুঝি তার বয়সের মাপ।
তোমার কোষে হামলা চলুক 
ভাঙুক নিরাপদ আশ্রয়। 
উপেক্ষার যৌবন যাক ঝ'রে...। 
চাদরের আড়াল থেকে বেরিয়ে আসুক পরিপুষ্ট 
প্রেমিক। 
আদরে- আবদারে শর্তহীন সখ্য গড়ে তুলুক কবিতার ঘরে।

স্বপন গায়েন

যুদ্ধ

ক্ষমতা লড়াই দম্ভ 
যুদ্ধের আর এক নাম 
রক্তে ভেসে যায় দেশের মানুষ 
তবুও যুদ্ধ থামে না।

মৃত্যুহীন প্রাণ -
মৃত্যু মিছিল অব্যাহত 
সারা পৃথিবীর জুড়ে চলছে নগ্ন নৃত্য 
চিতায় জ্বলছে সারি সারি লাশ।

পদাতিক সৈন এখন মূল্যহীন 
আকাশ পথে যুদ্ধ বিমান 
রকেট হানা, বিমান থেকে ফেলছে বোমা 
ধ্বংস স্তূপে পরিণত হচ্ছে শহর থেকে গ্রাম।

যুদ্ধের কী খুব প্রয়োজন?
নিরীহ মানুষ মরছে শ'য়ে শ'য়ে 
রক্তাক্ত পৃথিবী -
দম্ভ ক্ষমতায় অন্ধ হয়ে যুদ্ধ খেলায় মেতে উঠেছে স্বৈরতান্ত্রিক দেশ।

গীতশ্রী ভট্টাচার্য্য

প্রার্থনা

যেভাবেই নিতে চেয়েছি তোমায় নিজের গভীরে
তুমি ঠিক আড়াল করে নিতে পেরেছে তোমার সত্তা।
কত অর্ঘ্য তোমার পায়ে ঢেলেছি, সময়ে সময়ে 
তোমার পাথর বুকে চকমকি ঠুকেছি নিরন্তর ।
তুমি তবু পাথরই থেকে গেলে, এক বিন্দু জল দিলেনা।

তোমার সাজানো অজুহাত এতই দুর্বল যে ভেঙে পড়তে
পারে সমস্ত কেল্লা, মন্দিরের প্রাচীর আর বিশ্বাসের মন।
শক্তি জড়ো করে তবু কৌশল খুঁজি ভরসা বাঁচিয়ে রাখার, মন্ত্রে মন্ত্রে জলছড়া দেই দেবালয়ে,বিগ্রহে।

জাগিয়ে রাখার ব্যর্থ চেষ্টা করে যাচ্ছি দিন রাত
জানি তুমি জাগবে না আমার আর্তনাদে।
তুমি কৃপণ বড়, অনিচ্ছুক দানে এবং ধ্যানে।
তোমার সকল পূজো জুড়ে শুধু বলির রক্ত,
তোমার বেদিতে তাই আজও আমার শোণিত কান্না।