Sep 29, 2022

অশোকানন্দন রায়বর্ধন

বাবা'র বিবর্তন

প্রতিটি সন্তানের কাছে তার বাবা নিরাপত্তার চাদর । নির্ভরতার আকাশ ।বাবা আছেন বলেই তার সন্তান বেঁচে থাকার সাহস পায় । আমাদের শাস্ত্রবাক‍্যেও রয়েছে 'পিতা স্বর্গ পিতা ধর্ম পিতাহি পরমং তপঃ । পিতরি প্রীতিমাপন্নে প্রিয়ন্তে সর্বদেবতাঃ । ব‍্যক্তিবিশেষের ক্ষেত্রে সবচেয়ে শ্রদ্ধার স্থান পিতা । পিতা বলতে যে শুধুমাত্র জনক বা জন্মদাতাকে বোঝায় তা নয় ।  পিতৃস্থানীয় শ্রদ্ধেয় মানবিক সম্পর্ককে পিতার আসনে বসানো হয় । শাস্ত্রমতে পাঁচ বা সাত বিশিষ্টজনকে পঞ্চপিতা বা সপ্তপিতা বলে মান‍্য করা হয় । তাঁরা হলেন :-

পঞ্চপিতা :- জন্মদাতা, অন্নদাতা,ভয়ত্রাতা, কন‍্যাদাতা ( শ্বশুর ), উপনয়নদাতা ( দীক্ষাগুরু ) ।

সপ্তপিতা :- জন্মদাতা, অন্নদাতা, ভয়ত্রাতা, কন‍্যাদাতা ( শ্বশুর ), উপনয়নদাতা ( দীক্ষাগুরু ), জ্ঞানদাতা ( শিক্ষাগুরু ), ও জ‍্যেষ্ঠভ্রাতা ।

এই পিতাকেই শ্রেষ্ঠ আসনে বসিয়ে কখনো সম্বোধন করা হয় 'পিতাঠাকুর' । আবার যেই শ্রদ্ধেয় বা সম্মাননীয়জন কোনো আদর্শজনিত কোনো বিষয়ে নেতৃত্ব দেন এবং তার ফলে কোনো বিষয় প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পায় তখন সেই বিষয়ের আদ‍্যপ্রণেতা হিসাবে সেই উদ‍্যোক্তাকে 'পিতা' সম্বোধন করা হয় । তাঁর আদর্শে কোনো জাতিগোষ্ঠী বা রাষ্ট্র স্বাধিকার অর্জনের মাধ‍্যমে স্বনামে প্রতিষ্ঠিত হয় । তাঁর অগ্রগণ‍্য অবদানের জন‍্য তাঁকে 'পিতা' উপাধিতে সম্মানিত করা হয় । যেমন :- জাতির জনক মহাত্মা গান্ধি, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ যমুজিবুর রহমান ।

আবার এই বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের নিয়ন্তা এক অতিপ্রাকৃত সত্তা । এই এক ও অদ্বিতীয় বিমূর্ত সত্তাকে তথা পরম সত্তাকেও 'পিতা' বলে আরাধনা করা হয় । যেমন :- 'বিশ্বপিতা' তুমি, জগৎপিতা, বা পরমপিতা ।

এই পিতা শব্দটি সাধারণ 'জন্মদ' অর্থে বাংলায় বাবা হয়ে উঠল তার মধ‍্যে ভাষাতাত্ত্বিক, সাংস্কৃতিক ও সামাজিক ইতিহাস রয়ে গেছে । তার উৎস খুঁজতে গেলে আমাদের অনেকগুলো বিষয়ের উপর গুরুত্ব আরোপ করতে হয় । তার মধ‍্যে প্রথমেই আমাদের অভিধানের আশ্রয় নিতেই হয় । জ্ঞানেন্দ্রমোহন দাসের অভিধানে 'বাবা' শব্দটির অর্থ ও উৎপত্তি সম্বন্ধে বেশ কয়েকটি তথ‍্য তুলে ধরা হয়েছে ।

১। বাবা [ তুর্কি শব্দ ] বাবা ( পিতা ) । আরবি আব্বা, হিন্দি বাপ, বাপ্পা, ইংরেজি– papa.

২। বাবু [ চট্টগ্রামে বাউ ] । সংস্কৃত বপ্তা > বপ্পা > বাপা > বাপু > বাবু  ( সংস্কৃত ও হিন্দিতে পিতা, বৃদ্ধ, মান‍্য, সম্ভ

রান্ত অর্থে ) ও বাবা ( ফারসি বাবা– পিতা, বৃদ্ধ, মান‍্য, সম্ভ্রান্ত ) শব্দের মিশ্রণে সৃষ্ট ।  ফারসি বাবু ( ঈশ্বরপ্রিয়, ভগবদনুগৃহীত, প্রকৃত জ্ঞানী, যার সদগুণের সৌরভ বা যশের বিস্তার আছে ) । বা ( সহিত ) বু ( গন্ধ > সুগন্ধ ) যশসৌরভযুক্ত । মুসলমানযুগের পূর্বে বাংলায় 'বাপু' লব্দের ব‍্যবহার ছিল । ' শুন বাপু চাষার বেটা'–খনার বচন । মুসলমান যুগে 'বাবা' হতে উর্দুতে 'বাবু' প্রচলন হয়।

৩। বাপা [ সংস্কৃত বপ্র ]( যে বীজ নিষেক বা বপন করে ) > বাবা ( পিতা, জনক ) ।

এছাড়া সংস্কৃত বপ্তা থেকে হিন্দি বাপ্পা এবং প্রাচীন বৌদ্ধযুগের বাংলায় বপা ব‍্যবহার পাওয়া যায় । "সরহ ভনই বপা উজুকট ভাইলা"– চর্যাপদ ৩২/৫ ।

মধ‍্যযুগীয় বাংলায়ও 'বাপা'র ব‍্যবহার পাই – "সোনা রূপা নহে বাপা এ বেঙ্গা পিতল"–চন্ডীমঙ্গল/কবিকঙ্কন মুকুন্দরাম ।

 মধ‍্যযুগীয় বাংলায় চিঠিপত্রের ভাষায় 'বাবাজীবন' শব্দটি পাওয়া যায় । তেমনি মুসলমানি চিঠিপত্রের ভাষায় পাওয়া যায় অনুরূপভাবে 'আব্বাজান' বা 'বাপজান' । একটা জায়গায় দেখা যাচ্ছে যে, বপন শব্দ থেকে বাবা শব্দটির বিবর্তন ঘটেছে । এ থেকে বোঝা যায় যে, শব্দটির সঙ্গে কৃষিজীবনের প্রভাবও রয়ে গেছে । 'বাপ' শব্দটির দ্বারা বীজ পরিমাপের একক হিসাবেও বোঝানো হত । 'কুল‍্যবাপ' শব্দটি তারই প্রমান । সন্তানকেও অনেকসময় বাপ বা বাবা বলে ডাকা হয় । কখনো দেখা যায় ছেলেদের নাম রাখা হয় 'বাপন' । তাও এই 'বাপ' শব্দ থেকেই আগত ।  লৌকিক খেলার ছড়াতেও আওড়াতে শোনা যায় –'আপন বাপন চৌকি চাপন/এই ছেলেটি খাটিয়া চোর' ইত‍্যাদি ।


'বাবা' শব্দের উৎপত্তি ও রূপান্তরের ক্রমের মধ‍্যে এতসব বহুধাবিস্তৃত বিষয় রয়েছে তার মধ‍্যে একটা জাতির বহু বিবর্তনের কৌতুহলোদ্দীপক দিককে তুলে ধরে । সর্বোপরি এই শব্দের মধ‍্যে এক গভীর মানবিক আবেগের দিক রয়ে গেছে ।

সহায়ক গ্রন্থ :

১। চলন্তিকা-রাজশেখর বসু । এম. সি. সরকার এন্ড প্রা. লি. কলকাতা ।

২। বঙ্গীয় শব্দকোষ- হরিচরণ বন্দ‍্যোপাধ‍্যায়, সাহিত‍্য একাডেমি ।

৩। বাঙ্গালা ভাষার অভিধান ( ২য় খন্ড)- জ্ঞানেন্দ্রমোহন দাস, সাহিত‍্য সংসদ ।

৪। ব‍্যবহারিক শব্দকোশ- কাজী আব্দুল ওদুদ, প্রেসিডেন্সি লাইব্রেরী, কলিকাতা ।

৫। সরল বাঙ্গালা অভিধান– সুবলচন্দ্র মিত্র, নিউ বেঙ্গল প্রেস ।

তৈমুর খান

বাবা বাড়ি ফিরবে

দৃশ্য বদলে যাচ্ছে 
আমরা সংকটের ঘরগেরস্থালি সাজাচ্ছি 
শূন্যতার আয়নায় মুখ দেখছি 
আমাদের উঠোন ঘিরে স্মৃতির গোলাপি হাত 
                                ভেসে উঠছে বারবার 

ঘরের চৌকাঠে প্রদীপ জ্বালিয়ে দিয়েছে মা 
মায়াপ্রদীপ এখনও নেভেনি 
বাবা বাড়ি ফিরবে, ফিরবেই 
আবহমান সমস্ত বাবা-ই বাড়ি ফিরবে একদিন 

সামঞ্জস্যবিহীন দরজায় 
আমাদের চৈতন্যের হাওয়া বয়ে যাচ্ছে 
আশাগাছে ফুল আসতে শুরু করেছে 
আর দৃশ্যের ভেতর লাল ঠোঁটওয়ালা পাখি
                            ডেকে উঠছে বারবার….

অপাংশু দেবনাথ

সমর্পণের অন্য নাম পিতা

বুঝের হয়ে কখনো তাঁকে বাজারে যেতে দেখিনি, 
জানালায় হাত রেখে চেয়েছি বাজারের পয়সা।
অতএব অফিস কামাই করেছেন বলে,
মনে পড়েনা আমার।

এতসব না না শুনেও বিশ্বাস করি মায়ের বলা কথা।
বাজার ফেরৎ পিতা
ঘুম থেকে ডেকে তুলে মাছের মাথা ভেঙে মগজ খাওয়াতেন আমাকে,
হয়তো তাই মেধাহীন এ জীবন আমার।

বঙ্কিম রবীন্দ্র বনফুল, শরৎ উপেন্দ্র সুকুমার, 
বাজার কিনতে গিয়ে এনেছেন ঘরে।
কিছু পড়েছি আমি, বাকিটা, 
রাত জেগে হ্যারিকেনে চোখ সেঁকেছে মা।

অনেক ক্ষোভে উঠেছি বেড়ে, 
সামনে দাঁড়িয়ে কখনোই বলতে পারিনি, 
পুজো কিংবা মেলায় যাননি কেন আমাদের নিয়ে ?

সাম্প্রদায়িক বিষময় হাওয়ায় তাঁকে দেখেছি,
অন্য মানুষ, মায়াবী-মুখ।
সমস্ত ভয় তুচ্ছ করেই 
গুটিকয় আরক্ষাকর্মীকে সঙ্গে নিয়ে অভূক্ত মানুষের 
মুখে তুলে দিতে কিছু, ছুটেছেন দূরে মহকুমার খাদ্যগোদামে।

পাহাড় পুড়ে যাচ্ছে সংঘাতে, 
সব সংঘাত উপেক্ষা করে একা গর্জির শুনশান পথে, 
পৌঁছে গেছেন তৈনানী বন দপ্তরের অফিস চত্তরে। 

তাঁর হৃদয় হাজার সন্তানের জন্য কেঁদে
ওঠেছিল সেইদিন সঙ্গোপনে।
এ থেকে বুঝতে পারি,
সমর্পণের অন্য নামই পিতা।

এখন প্রতিদিন একবার ফোন করেন অকারণেও,
এখন আমিই বড় ব্যস্ত,
সন্তানের সুখের জন্যই পিতার হৃদয় করে তুলেছি উচাটন।

ইচ্ছে করে জড়িয়ে নির্ভয়ে বলি, 
আরও একবার এই মেধাহীন সন্তানের মুখে তুলে দাও প্রকৃত ভাষা।

সৌমিত বসু

বাবা


বাবা ভেসে ভেসে চলে যাচ্ছে মাঝদরিয়ায়
নাকি সমুদ্র এসে মিশে যাচ্ছে ঘাটের চাতালে।
চতুর্দিকে মৃত্যুর গন্ধ। চোখের জল সম্বল করে            
বাবা দেখবে বলে যে ছেলেটি উঠে এসেছে                
বাঁধের ওপর , ঈশ্বর আজ তার সঙ্গে থাক।

চুলের ভেতর ঘন কালো।মনের ভেতর আধো অন্ধকার।কতটা পথ একা চলে আসা।কতটা পথ আরো যেতে হবে একা।ছেলেটি ভাবছে।

বাবা চলে যাচ্ছেন সীমানা ছাড়িয়ে।চুলগুলো পথ দেখিয়ে নিয়ে চলেছে অন্ধকারে।

কুশল ভৌমিক

 মানুষের গন্ধ 

প্রতিদিন বাদ-মাগরিব মোস্তফার দোকানে বসি
কড়া লিকারের জঘন্য চা'য়ে চুমুক দিই 
আর চারপাশের মানুষ দেখি।
মানুষ দেখার এই ভয়ঙ্কর নেশাটা আমি বাবার থেকে পেয়েছি,
বাবা প্রায়ই বলতেন -
'সুযোগ পেলেই মানুষ দেখবি, যীশু এবং পশুর এমন অদ্ভুত মিশ্রণ তুই আর কোথাও পাবি না।'

আমি ফার্মগেটের ওভারব্রিজে  দাঁড়িয়ে মানুষ দেখি
গুলিস্তান জিরো পয়েন্টে দাঁড়িয়ে মানুষ দেখি 
পাবলিক লাইব্রেরির তিন তলার বারান্দায় দাঁড়িয়ে মানুষ দেখি 
মানুষ দেখি পত্রিকার পাতায়,টিভি পর্দায়, সোস্যাল মিডিয়ায় 

হাত-পা নাড়িয়ে অদ্ভুত ভাবে কথা বলা মানুষ
শক্তিশালী পোশাক পরা ক্ষমতাবান মানুষ 
আর দেখি-
করতলে শূন্যতা আর চেহারায় ক্ষুধার মতো সার্বজনীন ভাষা নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা শতশত বৃক্ষ-মানুষ!

মানুষ দেখতে দেখতে আমার পৌরাণিক রাক্ষসদের মনে পড়ে--
হাউ মাউ খাউ মানুষের গন্ধ পাও...

বাবা, এই দেশে এখন আর রাক্ষস আসে না
এই দেশে মানুষের গন্ধ নেই।

পঙ্কজ কান্তি মালাকার

শ্রমণকুমার শৃঙ্খল

কে ভাবে একদিন বাবা হবে!
শুধু এই ভিড় লোকালের ঘামে গুমোট দিনে নয়
বসন্তে রঞ্জিত দিনেও নয়
সবাই ছুটে হৃদয় বসন্ত আহ্লাদিতে;
কে নিতে চায় পৃথিবীর বড় দায়িত্ব!
একটি উর্ধ্বলতার মেরুদন্ড হতে।

বসন্তের চার চোখ দেখে
পৃথিবীর পথে গ্রীষ্ম বর্ষা শরৎ হেমন্ত এসে যায়,
বর্ষার যৌবন পৃথিবীর হেমন্তে হাহাকার করে
-দৃষ্টিভঙ্গি ভাঙ্গে,
জরার ভয় জাগে
যৌবন বাঁচিয়ে রাখতে চায় জরাযুদ্ধের জন্য।

দুটি বসন্ত হৃদয়
হৃদয়ের ব্রহ্মের বোধন করে,
আনে এক নতুন মুখ পৃথিবীর আলোয়,
মুখ যায় বদলে
যুবাটি হয় বাবা।

শুরু হয় জীবনসংগ্রাম,
নিজের পেটের কাঁধে আরো দুটি পেট
নিয়ে ছুটে ভিড় ফুটপাতে,
শিরদাঁড়া বাঁশ হলেও
উর্ধ্বলতার লিগামেন্ট বেঁধে দেয়
নিজের লিগামেন্ট শক্ত থাকতে থাকতে।

বাগানকে সাজায় রামায়ণের ফুল দিয়ে,
স্বয়ং শ্রমণকুমার সেজে
দর্শন রাখে জীবনের,
প্রতিফলন হলেই যৌবন ঝড়ানো সার্থক হবে,
নইলে শৃঙ্খল ছিঁড়ে পৃথিবী হবে খন্ড খন্ড।

রুদ্র মোস্তফা

পিতার ছায়া 

নিজের কাছে নিজেই দাঁড়াই হাতটা বাড়াই হাতে 
একটা ছায়া আমার মতো ঘুরে আমার সাথে। 
সেই ছায়াটা সকাল বেলায় দুপুর রাতের মায়া 
স্নেহের পরে স্নেহ রাখে সূর্যমুখী কায়া। 
সেই ছায়াটা সমুদ্র হয় সেই ছায়াটা পাহাড় 
সেই ছায়াটা মুখে তুলে জীবন ভাঙা আহার। 
একটা ছায়া আমি হয়ে আমার মাঝে মিশে 
আমার ছায়া আমি ছেড়ে অন্য কোথাও ঘেঁষে।।

বাবলু সরকার

কিন্তু 

আমার বাবাকে 
কোনো দিন ঘড়ির সময় 
শুনতে দেখিনি বা শুনিনি 

অথচ তিনি কী অবলীলাক্রমে 
আমাকে ভোর চারটেয়
ডেকে তুলে দিতেন রোজ

আমার তখন মর্নিং কলেজ এবং শীত 
পাঁচটা পঞ্চান্নর ট্রেন ধরে যেতে হতো দূরে 

পনের মিনিট পায়ে হেঁটে 
আমাকে ট্রেন ধরতে হতো রোজ
অথচ একদিনও ট্রেন মিস হয়নি আমার

কিন্তু এখন হাজার ঘড়ি আমার ঘরে
তাসত্ত্বেও প্রায়শই ট্রেন মিস করি আমি
অথবা দৌড়ে ট্রেন ধরতে হয় আমার 

আর শেষ বগিতে উঠে 
শ্মশান দেখে আসি বাবার 
দেখে আসি আমারটাও

সন্দীপ সাহু

পিতাগণ বন্দি

পিতাহি পরম গুরু---শাস্ত্রবাক্য।
 'গু' থেকে 'রু'-তে নিয়ে যান যিনি।

আজ শব্দটা ঔরসসম্পর্কের নাম মাত্র।
শব্দার্থের সংকোচন ।
পিতা সংকুচিত হলে অন্ধকারই হয় অবশেষ!

অনাথ বিশ্ব, দত্যি দানোর হাত ধরে আরো আঁধারে!
গত পিতাগণ বন্দি সাদা-কালোয় সৌখিন সেক্ষে।
অথচ কথা ছিল তাঁদের রাখা হবে হৃদমাঝারে!

পাটিগণিতময় চালাকবিশ্বে হৃদয়কে 
কঠোর লকডাউনে রাখা হয় রেডজোন করে ! 
জলকে ঘোলা করে মাছ ধরতে পারলেই ফতে!

ঔরসপিতারা সেটাই শেখায় মন দিয়ে 
শেখায়, আপনি বাঁচলে বাপের নাম 
চাচা আপন প্রাণ বাঁচা!

কেউ বাঁচে না! আঁধারে চিল শকুন ঘন হয়!!

নবীনকিশোর রায়

পিতৃদেব

আজন্ম এক চাষা - - -
খরা নাই বর্ষা নাই, ধ্যানমৌন বাস্তুচাষে  নীরবে বোঝা বয়ে চলেন
একা নিঃসঙ্গ পথিক - - -
ফেলে রেখে যায় পেছনে
উত্তরসূরির কাঁধে আর এক বোজ, 
আঁধারের যাত্রী - - - বাবা!

সমূহ আয়োজনে ভূমিপাত্র পূর্ণ করে আবহসংগীত রচনা করে চলেন অলক্ষ্যে কূলধারিণী মাতৃদেবী! 
কখনো বুঝে নেন পিতা, 
কখনো বুঝেন  না এই নীরব যাত্রা... 

Sep 28, 2022

শান্তনু ভট্টাচার্য

পদ্ম গোখরোর মণি  


লোকে যে যাই বলে বলুক -

বাগানের ধারে তোমার পুঁতে যাওয়া 
কবেকার সেই কাঁঠাল গাছের গায়ে হাত বুলোলে 
এখনো তোমার উপস্থিতি টের পাই...বাবা
 দুই একটা ঝরে যাওয়া বিষন্ন পাতা
মাথা স্পর্শ করলে মনে হয় তুমি মাথায় হাত রাখছো। 

বলেছিলে সবসময় সিড়ি ভেঙে উপরের দিকে উঠতে
তাই আমি  নিচে নামিনি কতদিন।
বলেছিলে মাথা নিচু করে হাঁটতে 
তাই আমার পথ চলায় অহংকার ফুটে ওঠে।

বলেছিলে যেদিন মানুষের মত মানুষ হবো- 
চাঁদনি রাতে  তাল পুকুরের জলের ছায়ায়  দেখবো 
আমার মাথায় জ্বলজ্বল করছে পদ্ম গোখরের মণি 

সেই থেকে চাঁদনি রাতে বারবার  নিশির মতো
ছুটে  যাই তালপুকুরের ঘাটে...

জানি, লোকে ভুতে পাওয়া পাগল বলে ---- বলুক।

শ্রীমান দাস

অবসাদ

এখনও টাক্কাতুলসীর বুকে লেগে আছে
মানুষটার ক্লান্ত পায়ের ছাপ,
এখানের বাতাস জানে
কিভাবে একটু একটু করে
মন্থর হয়েছে তাঁর গতিময়তা।

অববাহিকা ডিঙিয়ে বাজার ফেরত মানুষটা
ভীষণ হাঁপিয়ে উঠতো গন্তব্যের কিনারে এসে,
দু'হাতের বাজার ভর্তি ব্যাগের ভেতর থেকে
তখন বেরিয়ে আসতো একরাশ হতাশা।

বাজার ভর্তি ব্যাগের ওজন যখন
ঘর অভিমুখী মানুষটার পথে অন্তরায় হয়ে দাঁড়াতো,
তখন এক বুক অবসাদে মানুষটি খুঁজতো একটি ছেলেকে।
সেই ছেলেটার অপারগতা জেনে
তখন এগিয়ে আসতো কোনো এক বিকল্প ছেলে
কৃতজ্ঞতার দীর্ঘশ্বাস ফেলে মানুষটার বুকটাকে গ্রাস করে নিতো এক পৃথিবী শূণ্যতা।

অবশেষে মানুষটার জীবন সায়াহ্নে এসে
তার চরণ তলে সমস্ত অপারগতা সঁপে দিল দুর্ভাগা ছেলেটা।

তারপর মানুষটা পাড়ি দিলো না ফেরার দেশে
আর ছেলেটা সঙ্গী করে নিলো এক বুক জ্বালা।

অর্ধেন্দু ভৌমিক

ছাতা

বাবা রোজ সকালে মাঠে বেড়িয়ে পড়তেন
মাঠ থেকে ওঠে আসতো পেট ভরা পুষ্টি
বৃষ্টি রোদে নিজেকে বাঁচিয়ে রাখতেন
আমরা কখন খুঁটে খাবো! 
মা'কে নিয়ে বাবা সংসার গড়ায় মত্ত
চটিতলা কখন মাটি লেপে যেতো... 

পুরোটাই রঙিন জ্যামিতিক বহুভুজ, 
বাবা নেই, আজ ছাতাও নেই!

সুধীর দাস

সংসারী গন্ধ

ছোটবেলায় বাবার পাশে গা ঘেঁষে  ঘুমাতাম,মা ডানে।
মধ্য প্রহরে বাবার শ্বাসনালী থেকে  আসতো নিকোটিনের গন্ধ।
চুপ থাকতে থাকতে অসহ্য লাগলে বকাবকি করতাম!
তবুও নিকোটিনের অমৃত স্বাদ ছাড়তে পারতেন না।

রাতের পর রাত এই দৃশ্যের পুনরাবৃত্তি হতো
কিন্তু নিকোটিন কিভাবে শ্বাসবায়ু কেটে নিচ্ছে বাবা তা বুঝতে চায় নি।
বুঝতো শুধু কিভাবে নিকোটিনের ধোঁয়াকে আটকে রেখে শূন্যে ছোড়া যায়।

আমি প্রথমবার সংসারের গন্ধ শুঁকতে শিখলাম,
বুঝলাম তুমি শিখেছ কিভাবে সংসার এর গন্ধ থেকে নিকোটিনের গন্ধ শুঁকতে হয়।

এভাবনায় মগ্ন সেদিন- তোমার চিতা ভষ্ম ছুঁয়েও মনে হচ্ছিল,
শেষ বেলাতে আমি যেন তোমার মধ্যে একটা সংসারী গন্ধ পাচ্ছিলাম।

রাহুল শীল

পাথুরে শিল্পী

বাবার জন্য কষ্ট লাগে গাছের মতো খাড়া হয়ে দাঁড়িয়ে আছে বলে!
ছেলের জন্য প্রথমে নদী খনন করল,
তারপর একটা পাহাড় রেখে দিল।
নদী আর পাহাড়ের কাছে মা রোজ কান্না করেন,
জানতে চাইলে নদীর উপর মেঘের অবস্থানহীনতা আর পাহাড়ে অরন্যহীনতাকে কান্নার কারণ বলেন।
অনেকদিন ধরে মাকে মানচিত্র এঁকে বুঝালাম পাহাড় আর নদীর মধ্যেকার দূরত্ব,
মা বুঝে গেছেন‌ ছেলে অরন্য শিকারী হয়ে গেছে
বাবা নিজেই একজন পাথুরে শিল্পী, 
পাথরের গায়ে কবিতা লিখতে লিখতে ভুলে গেছে‌ তার ছেলে শিকার শিখে গেছে!
একদিন কুঠার নিয়ে পাহাড়ের গভীরে প্রবেশ করে দেখি নদীর শেষ প্রান্তে বাবার অশ্রুসিক্ত চোখদুটো লেগে আছে,
সেদিন থেকে বুঝে গেছি পৃথিবীর বাবারা এক একজন কবি আর কবিপুত্রদের উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত হয় বাবাদের নিজস্ব নদী।  ।

শুভ্রা দেব

বাবা

    
বাবা,ভীষণ আদরের 
মনটা তাঁদের শক্ত পাথর,
নিজের সুখ উজাড় করে
সন্তান পালনে মত্ত।

যাঁর থাকেনা কোনো 
হরেকরকম রঙবাহারী পোশাক,
গোটা বছর যায় যে তাঁর 
একজোড়া জুতোয় কেটে 
 
সারাদিনের পরিশ্রমেও যাঁর
সদাই খেলে হাসির ঢেউ,
নিজের মুখের গ্রাসটা ও 
দিতে হয় না কভু কুন্ঠিত।

বুকের উপর পাথর চেপে 
মেয়ের বিয়েতে ঋণ করে,
নিজের ঘর খালি করে
ঘরের লক্ষী পর করে।

ষাটের উপর বয়স পেরোলে
সন্তানের  ঘাড়ে বোঝার ভারে,
চিলেকোঠার ঘরে দিব‍্যি হাসে
বৃদ্ধাশ্রম যাঁর শেষ ঠিকানা।

ডঃ রঞ্জিত দে

বাবার স্বপ্ন

আমার বাবার স্বপ্নের একমাত্র জমি
একদিন যাবার সুযোগও পেলাম আমি
বর্ষার গুড়ি গুড়ি বৃষ্টি সবুজ ধানের আগায়,
মন্দ মন্দ বাতাসে ধানের শীষ ঢেউ খেলে যায় 
আমি অবাক হয়ে দেখি সেই সুন্দর খেলা
ভাবি বাবার স্বপ্ন চুরি হলো বুঝি এ বেলা!
যে পথ ধরে এলাম সেটা খুব চেনা নয়,
আজ যেন চেনা হয়ে গেল গোধূলি সময়।।
এইভাবে বাবার স্বপ্ন চুরি করে কি আমার শিক্ষা? 
বাবা ওকি জানবে বলে গুরুর পেয়েছিলেন দীক্ষা 
ভাবনার বিস্তার বহন করছে সময় 
এই পিতৃঋণ বোধয় শেষ হবার নয়।
সেদিন যা দেখেছিলাম নাম তার চিকনাল ভাতুড়ি।
আজকে শিক্ষার রূপান্তরে পেয়েছি কলম হাতুড়ি 
বাবা ও ভেবে নিলেন নতুন যুগের ভোরে
 কলম ধরেছি, চলে এলাম অনেক দূরে ।।

লিটন শব্দকর

সিন্ধু উচ্চারণ 


স্নেহ,শাসন, আবদারের 
গাণিতিক সামঞ্জস্য বিধানের অধ্যায়ে
শ্রম আর ঘামের লিপিতে ফুটে থাকা চরাচরে 
প্রতিদিন হাক দেওয়া উচ্চারণ - বাবা
বটগাছের ভেতর থেকে উত্তর ফিরে আসে - বাবা

শিবানী বাগচী

মনে পড়ে

জন মানব শূন‍্য ফাঁকা রাতের  প্ল্যাটফর্মএ আমি একা;
শেষ অবেলার অতিথিকে লাস্ট ট্রেনে বিদায় জানিয়ে, 
ফিরে এলাম ক্লান্ত শরীর শ্রান্ত মনে!

টাটকা ব‍্যথার মতো সারাটা বাড়ি জুড়ে 
তোমার ছড়ানো অনুভূতিগুলো ; 
নির্বাক দর্শকের মতো তাকিয়ে আছে আমার দিকেই!

সাক্ষী হয়ে আছে খাতা বই রঙ তুলির মাঝে,
খোলা ডায়রীর পাতাটা নিয়ে যেন কাটাকুটি খেলছে!

বট গাছের মতো হাতে ধরে থাকা ছাতা হয়ে দাঁড়িয়ে ছিলে ,
অটুট দীপ্তিময় ঁবাবা আমাদের হারিয়ে যাওয়া সকালে -

যাঁর ভালবাসা আর ভরসায় আমাদের বড়ো হওয়া;
ভোরের সূর্যকে সাথী করে সে চলে গেলো ভাবনার ওপারে,
যেখানে একবার গেলে আর কেউ ফেরে না!

তবু তাঁকে বার বার ফিরে পেতে মন চায়,
আমার সব পাওয়া না পাওয়ার মাঝে!

নরেশ মল্লিক

পথ প্রদর্শক

তুমি স্বর্গের চেয়েও বড় 
তুমি হিমালয়ের থেকেও দৃঢ়
তুমি মৃত্তিকার মতো সহিষ্ণু।

বট বৃক্ষের ছায়ার মতো আগলে 
রেখেছো সারাদিন। 
আমার ক্লান্তি ভরা জীবনে তুমি 
বসন্তের শীতল বাতাস এনে দাও অনবরত। 

সংসারের যান্ত্রিক চাকা সচল রাখতে 
মাথার ঘাম পায়ে ফেলে ছুটে চলেছ 
আর ছুটে চলেছ। 

স্বর্গ দেখিনি, হিমালয়ের নাম শুনেছি, 
কিন্তু তোমায় দেখেছি কাছ থেকে। 
আমরণ ত্যাগ স্বীকার করে যাওয়া আমার 
সংসার সন্ন্যাসী তুমি। 
আমায় মসৃণ পথে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার 
একমাত্র পথ প্রদর্শক