Oct 31, 2023

সোনালী মন্ডল

স্বাধীনতার সাধ

ইতিহাস ঘেঁটে দেখছি বসে বইয়ের পাতায় লেখা,
বিদেশী দের দেশ শাসনে দুর্বিসহ  ভারতীয়রা।
কতো মায়ের কোল হারিয়েছে জন্ম ভূমির জন্য,
পথের ধুলো লাল হয়েছে,দুর্ভিক্ষে খুঁজেছে অন্ন।
ক্লান্ত পায়ে হার মানেনি প্রতিবাদের ভাষায় ছন্দ,
লড়াই শেষে জয়ী হয়ে পেল স্বাধীনতার আনন্দ।
স্বাধীনতার দিবস পালন পার করেছে কয়েক দশক,
তার স্মৃতিতে মেতে ওঠা শিল্পীর সৃষ্টিতে দর্শক।
বর্তমানের জীবন দর্শনে মনে লাগে ভীষণ খটকা,
দেশটা যেন আমার নয়,পালা বদলে শাসকের ছক্কা।
জন দরদী বহুরূপীরা বিদেশীদের থেকে আলাদা,
থাকছে দেশে খাচ্ছে পাতে নর মাংস কষা।
উপরে তারা গিরগিটির রূপ,ভিতরে বন্য পশু,
মানুষ নাকি ভিন্ন গ্রহের?কিছুতে হয়না কাবু।
পেটে তাদের সাগর সমান গভীর উদর থাকে,
যতই খায় ততই যেন অভুক্ত ভাবে নির্বোধ লোকে।
স্বাধীন দেশের পথে থাকে সাজানো বইয়ের সারি,
নৈরাজ্যে ভরা সর্বত্র জানি,অশ্লীল জ্ঞানে নারী।
মূর্খরা করে দেশ শাসন,বুলি জ্ঞানের ভাষণ,
একটি প্রজন্মকে ধ্বংসের চক্রান্তে শিক্ষা ব্যবস্থা গঠন।
সবুজে ভরা দেশের মাটি মুক্ত বায়ুর খোঁজে,
ঘরে ঘরে নিরীহ মানব পকৃত খলতা বোঝে।
পরাধীনতার ষড়যন্ত্র চাইনা স্বাধীনতার অর্থে,
ফিরে কবে আসবে আবার মনুষ্যত্বের বিবেক কর্মে?

পাপিয়া দাস

বিসর্জন

বিসর্জন মানেই বিষাদের সুর
আমরা ভয়ঙ্কর  একটা বাস্তবতার শিখরে,
বিশাল একটা আনন্দের পর
দুঃখ প্রশমিত।

দেবীর আগমনে আমরা
প্রস্তুতি  নেই দু' তিন মাস ধরে 
রকমারি পোষাক, সাজসজ্জা
আর  রকমারি খাবারে নিমজ্জিত।

আলোকসজ্জা, প্রতিমা লক্ষ লক্ষ টাকার বিনিময়ে
আনন্দের বিরাট সমাহার,
কিন্তু সেই দশমীতে মায়ের বিদায়
চোখ জ্বলজ্বল করে পিতামাতার।

যেন এতোদিন অন্নপূর্ণা পাশে ছিল
ঘরে অভাব ছিলো নাতো
আলোময়ী মা আলো বিচ্ছুরণ করছিলো
ঘরের ভিতরে বাইরে প্রতিনিয়ত।

চার দিনের সেই আনন্দ শেষে
বিষাদের সুর কানে বাজে প্রতি ক্ষণে ক্ষণে।
যেখানে উল্লাসের বলিদান মাকে দিতে হল
জলে বিসর্জিত হয়ে।

সুচরিতা পাটারী

সহজ সমাধান

শিয়র এর পাশেই একটা গাছ রোপণ করেছিলাম। এরপর কয়েক বসন্ত কেটে গেলো। বসন্ত এলেই সমস্ত পাতা ঝরে যায় কিন্তু একটি পাতা ঠায় দাঁড়িয়ে থাকে। জন্মলগ্ন থেকে সে পাতার আর স্থানচ্যুত  হয়নি কখনো। সে পাতায় বহুকাল ধরে সালোকসংশ্লেষ প্রায় হয়না বললেই চলে। ধীরে ধীরে হলুদ বর্ণ ধরে যাচ্ছে বছর তিনেক ধরেই। হঠাৎ তাকে একদিন বিবর্ণতায় বেঁচে থাকার কারণ জিজ্ঞেস করতেই সে জানালো এমন উত্তর দেওয়ার মতো শব্দ এ পৃথিবী আবিষ্কার করতে পারেনি।

বুঝলাম কোনো এ প্রশ্নের উত্তর তার জানা নেই। শুধু হলুদ বিবর্ণতার মাঝে মাঝে ক্ষাণিকটা সবুজের ছিঁটেফোঁটা ঘিরে প্রতি বসন্ত শেষে আবার বাঁচার স্বপ্ন দেখে সে।

 জীবনের কঠিন উত্থান পতন উপেক্ষা করে কেবল মায়ায় জড়িয়ে বসন্তের পর বসন্ত দিব্যি  কাটিয়ে দিচ্ছে। পরিশেষে আবার জানতে চাইলাম এ জীবনের শেষ কোথায়? অমলিন ভাবে হেসে জানালো শেষ শুরু ভেবে কখনো কোনো কাজ করা যায় না।  শরীরে যে কিছুটা সবুজের ছিঁটেফোঁটা আছে হয় সেগুলো প্রাধান্য পেয়ে আবার পুরো সবুজে ভরে উঠবে নয়তো হলুদ এর প্রাধান্যে বৃক্ষ ত্যাগ করবে। শুনে খুবই সহজ সমাধান মনে হলেও জীবনের এমন সহজ সমাধানে আসতে যে কাঁটা পথগুলো পেরিয়ে আসতে হয় সেগুলোর অভিজ্ঞতা বাস্তবে কারোর উপভোগ্য না হলে প্রায় বিবর্ণময় পাতার গল্প আমাদের চেতনায় সেই সরলতার ছাপ ফেলতে পারবে না কখনোই।।

রামমোহন বাগচী

জীবনের যাদুকর

ভাবি মনে মনে এটাই কি জীবন ?
অন্তর হীন আত্মীয়ের যাদুর খেলায়
ঝড়ে আত্মার অশ্রু। 
মুক  বধির শিক্ষার রাজ প্রাসাদে  
দাপিয়ে বেড়ায় অন্তর হীন আত্মা
ছড়িয়ে রঙ্গিন স্বপ্ন। 
স্বপ্নের মাঝে আছে স্বপ্ন, এ এক অপূর্ব স্বপ্ন
ধরা ছোয়ার  বাহিরে থেকেও নির্ভয়ে
চালায় আপন খেলা, দিবানিশি। 
সরস্বতীর হংস উড়ে আকাশে
ভুলে নির্মল নীরের  সরোভর
শুভ্র চরিত্রে অভিনয়ের স্বর্ণপদক পরে গলে। 
যাদুঘরে যাদুর খেলা,যাদুকর বিনে
এমনি মন্ত্র শিখায়, মন্ত্র হীন আত্মা  
ছরিয়ে মায়ার জাল রাজার ভান্ডারে। 
বিশ্বের অর্ঘ দূত প্রেরণার উৎস
জ্ঞানের যোয়ার  ভাটার, রত্নের ভান্ডার
রাধানগরে কৃষ্ণের অবতার। 
চক্ষু হীন আত্মা ছরিয়ে মায়ার জাল    
প্রজাহিতৈষী মন্ত্রের নকল ঋষি করে
 প্রজার সর্বনাশের  মন্ত্র পাঠ।।। 
ভাবি মনে মনে এটাই কি জীবন ?

সঞ্জীব কুমার রাহা

অসহায় মহাদেব

কৈলাশে মহাদেব প্রচণ্ড রেগে গিয়েছেন।

উনি মা দুর্গাকে কিছুতেই মর্তে আসতে দেবেন না কারন ওখানে করোনা ভীষন ছোঁয়াচে ব্যাধি ।উনি মর্তে ওনার দূত নারদকে পাঠিয়ে খবর নিয়েছেন যে কেউ আক্রান্ত হতে পারে আর এর কোনো ওষুধ নেই।

কিন্তু দুর্গা নাছোড়বান্দা ওনার জেদ ,প্রত্যেক 

বছরেরতো এবছরও  মাত্র কটা দিনই সপরিবারে যেতে চান।তাই তার দাবি 

যেতে দিতে হবে।

এদিকে স্বর্গের অন্যান্য দেবতারাও নাছোড় বান্দা তারা মহাদেবকে হুমকি দিয়েছে।

--অন্তত তিন মাস মহাদেবের পরিবারকে আর স্বর্গে ঢুকতে দেবে না। অথবা সবাইকে করোনা টেস্ট করিয়ে নেগেটিভ রেজাল্ট দেখিয়ে ঢুকতে হবে।না হলে কৈলাশের ওই ঠান্ডায় এবার তাদের কাটাতে হবে।

মহাদেব দুর্গাকে হাজারো কাকুতি মিনতি করে বোঝাচ্ছে যে, দেবতারা তাদের বয়কট করার হুমকি দিয়েছেন,

এই অবস্থায় না যাওয়াই শ্রেষ্ঠ।

দুর্গা কোনো বারণ শুনতে চাইছেন না।

বড় ছেলে গণেশও মাকে বোঝাচ্ছে কিন্তু কাজ হচ্ছে না। 

এবার মহাদেব নন্দী ফিরিঙ্গি  সহ সপরিবারে মিটিং ডাকলো

সকলের মতামত চাইলো।দুর্গা বাদে সকলের মত এবার না যাওয়াই ভালো

দুর্গা তবুও রাজি না।

অগত্যা মহাদেব ব্রহ্মার সাথে দেখা করে সব বললো, উনি বললেন আমি সব জানি কিন্তু কি করবো ?

দুর্গাতো আমার কথাও শোনে না।

আমি নিজেও এখন আর ঘর থেকে বার হই না করোনার ভয়ে যদি এখানেও চলে আসে। আমি তো এবার মর্তে যাওয়ার  ঘোরতর বিরোধী। তুমি গিয়ে ওকে বলো আমি বারণ  করছি ।এবার যাওয়া যাবে না। ওখানে মহামারী আর ও গেলে মানুষ অবুঝ তাই ভিড় করবে দেখতে ,আর বেশি বেশি  করে ছড়াবে রোগ।

কাতারে কাতারে লোক মরবে।

দুর্গার জন্য এত মানুষের বিপদ মেনে নেওয়া যায় না। ওনার পরিষ্কার কথা

গেল ওকে ভুগতে হবে, স্বর্গে আর আমি ঠাঁই দেব না।তোমরা ঠান্ডায় মর।

মহাদেব কাঁদো কাঁদো হয়ে ওনার পা জড়িয়ে ধরে বল্লো --প্রভু,এতটা কড়া শাস্তি দেবেন না।

ব্রহ্মা- তোমার বউকে তুমি মানাও 

আমার কথার ন

অলকা গোস্বামী

কিছু কথা

কুয়াশা ভেজা শিউলি ভোর
স্তিমিত সব কোলাহল
পিঠে ঢাক, দূরগমন
দোরগোড়ায় অপেক্ষায় চোখ।

কিশোরী মন, ছুঁয়ে যায়
রঙিন স্বপ্ন জানালা,
শরৎ শেষে শীতের পরশ
কমলা রোদ,ভালোবাসা।

জীবন নদী বয়ে চলে ধীরে
অভিঘাত সংশয়ে,
বটের ছায়া আরো ঘন হয়
দিনের আলো শেষে।

যাপনের স্রোতে ভেসে
মশগুল মোরা
উৎসব সমারোহে,
এভাবেই চলুক, হাসি আনন্দে
যতদিন আছি বেঁচে।

রীতা রায়

সিঁদুর খেলা

বিজয়া দশমীর সন্ধ্যা। মা দুর্গাকে বিদায় জানানোর আয়োজন চলছে। পাড়ার সধবা বৌয়েরা জল মিষ্টি ধুপবাতি আর সিঁদুর কৌটো নিয়ে রেকাবি সাজিয়ে দুর্গামণ্ডপে সমবেত হয়েছে। মাকে মিষ্টিমুখ করিয়ে সিঁদুর পরিয়ে মায়ের অক্ষয় সিঁদুর আশীর্বাদ নিয়ে পরস্পরে মেতেছে সিঁদুর খেলায়। এ ওর সিঁথিতে কপালে গালে সিঁদুর লাগিয়ে লালে লাল হয়ে উঠছে পরস্পরের সংস্পর্শে।

মৌলি খানিক দূরে দাঁড়িয়ে। না, সে এখানে সিঁদুর খেলতে আসেনি, তার কপালে গালে কেউ সিঁদুর ছোঁয়ায়নি। এঁয়োতিদের সিঁদুর খেলা হয়ে গেলে তারা মণ্ডপ দখল করবে। দখল বলতে পাড়ার ছোটদের নিয়ে বিজয়া দশমীর সন্ধ্যা মাতাবে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে।

দাঁড়িয়ে থেকে তার মন টানছে এক পুরাতন দৃশ্য। মৌলি সেবার পঞ্চানন্দপুর গেছিল, উদ্দেশ্য গঙ্গাস্নান। গঙ্গানদীর ভাঙ্গনে পঞ্চানন্দপুরের অনেকখানি নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। নদীর ঘাট এখন বাসস্ট্যান্ডের প্রায় লাগোয়া। বেশির ভাগ বাড়িঘর এমনকী সুদৃশ্য গঙ্গাভবনও নদীগর্ভে। গ্রামের যে বাড়িগুলো রক্ষা পেয়েছে সেগুলো এখন নদীর তীর ছুঁয়ে আছে।

মৌলি গঙ্গাস্নান করে এদিক ওদিক লোকের ভিড় দেখে নদীর পাশেই একটি মাটির বাড়ি দেখতে পেয়ে সেখানেই ঢুকে পড়লো। বাড়িতে তখন গৃহবধূ ছাড়া আর কেউ নেই। তার অনুমতি নিয়ে ওদের ঘরে ঢুকে ভেজা কাপড় পাল্টে অন্য শাড়ি পরে খোলা চুলে বাইরে বেরিয়ে এসে দেখতে পেল উঠোনের ওপাশে ঠাকুরের একচালা। কাছে গিয়ে দেখলো মনসামূর্তি। ঝাঁপ সরিয়ে ভেতরে ঢুকে মাথা ঠেকিয়ে প্রণাম করে দাঁড়াতেই গ্রাম্যবধূটি ঠাকুরের সিঁদুর চুপড়ি হতে সিঁদুর তুলে তার সিঁথি কপাল রাঙিয়ে দিল। সদ্যস্নাত মৌলিকে সধবা ভেবে গৃহবধূটি তার খালি সিঁথি ভরে দিয়েছে। আচমকা এরকম ঘটাতে হতভম্ব মৌলি গৃহবধূটির হাত টেনে সরাতে গিয়ে পুরো সিঁদুর দুজনের মাথায় কপালে ছড়িয়ে পড়লো। কিছু সিঁদুর ছিটকে পড়লো মা মনসার মাথায়। ওরা আশ্চর্য হয়ে পরস্পরের দিকে চাইলো।

এ এক অভিনব সিঁদুর খেলা। সধবা, অধবা স্বামী পরিত্যাক্তা.. তিনজনের একান্তের সিঁদুর খেলা।

অবিবাহিত মৌলি একছুটে বাইরে বেরিয়ে নিজেকে সাফ করতে গিয়ে লালে লাল হয়ে উঠছিল। সিঁদুরে রাঙা গ্রাম্যবধূটি বুঝতে পারলো না কী এমন ঘটলো যে মেয়েটা ছুটে পালালো, শুধু অলক্ষ্যে হাসলেন মা মনসা। স্বামী পরিত্যক্তা মা মনসার মনেও তো সাধ থাকতে পারে সবার সাথে সিঁদুর খেলার!

বিধর্না মজুমদার

বিদায়

তোমার বিদায়ে
আমার আঁখি করিছে টলমল
ইহার যেন সমাপ্তি বর্ষ দূরে! 
হাজারে হাজারে ডুবিছ তুমি 
জানু জলোচ্ছ্বাসে। 
নতুনের ভীড়ে ক্ষাণিকটা ভুলিতে পারিলেও, 
বিদায় যেন অনিবার্য।।

রীতা চক্রবর্তী ( লিপি )

শহুরে ব্যাধি

ক'দিন থেকে খুব গরম পড়েছে। একেবারে ভিজে প্যাঁচপ্যাঁচে গরম। ভাদ্রের এই দাবদাহ যেন গ্রীষ্মের রদ্দুরকেও হার মানায়। প্রত্যেকদিন বর্ষা ঘুম থেকে উঠেই ব্যালকনিতে এসে আকাশ দেখে। যদি কোথাও এক খণ্ড কালো মেঘ আকাশের গায়ে লেগে থাকে তবে ওর মন অজানা ভালোলাগায় ভরে ওঠে। মনে মনে ভাবে,ও বর্ষা বলেই কি মেঘের সঙ্গে এত ভাব ওর!! মনে হয় যেন, বিগত জনম থেকেই ও মেঘের সঙ্গে এক অমোঘ ভালোবাসায়  জড়িয়ে আছে। বর্ষা আসলে বৃষ্টিবিলাসী । কিন্তু এবার তো সেভাবে বর্ষা নামেনি,তাই চাতক হয়ে আছে ওর মন। ও মনে মনে ভাবে,অভিমানী বর্ষা যেন এবার সূর্যের গায়ে হেলান দিয়ে ঘুমিয়ে পড়েছে। শত আহ্বানেও মেঘর মান ভাঙছে না। 

           অবসর সময়ে এভাবে সাতপাঁচ ভাবতে ভাবতে বর্ষা একদিন দেখল,কবে যেন শরৎ এসে বর্ষার চৌকাঠ ডিঙিয়ে প্রকৃতির আঙিনায় পা রেখেছে। ওর ভাবনায় শরৎ মানেই আগমনির সুরে সুরে মুখর বাতাসের গুনগুন গান। আজ ছুটির দিন। তায় আবার স্তিমিত সূর্য আজ মেঘের আঁচলে মুখ ঢেকেছে। কালো কালো ধোঁয়ার মত কুন্ডলি পাকিয়ে মেঘের দল ছুটে আসছে। দেখে বর্ষার  আনন্দ আর ধরেনা। মনে মনে ভাবে,অফিস বাড়ি ছাড়া বহুদিন ওর কোথাও বেরোনো হয়নি ,আজ যদি একটু বন্ধু মোহনার সঙ্গে ফুরফুরে মেজাজে আড্ডা দিয়ে আসে তবে একঘেয়েমি কেটে যাবে। আবহাওয়া যখন অনুকূলে, তারপর না হয় দুজনে কিছু টুকিটাকি পুজোর শপিং করে ফেলবে! কিন্তু... শরীরটাও যেন আজ বড্ড ম্যাজম্যাজ করছে ওর। বেরোবে কি বেরোবে না ভাবতে ভাবতে কাজের মেয়ে বকুলকে ডেকে এককাপ চা দিতে বলে অলস ভঙ্গিমায় ব্যালকনির চেয়ারটায় গা এলিয়ে দিল। চা পান করতে করতে লক্ষ্য করল,দূরের নারকেল, সুপুরি, ইউক্যালিপটাস গাছগুলো যেন আজ মেঘলা দিনের আঁচল গায়ে জড়িয়ে চনমনে হয়ে শাখা দুলিয়ে দুলিয়ে শরতকে স্বাগত জানাচ্ছে। মায়ের আগমনী বার্তা নিয়ে শরৎ আসে বলে এই ঋতুটি বরাবরই বর্ষার কাছে এক আলাদা মূল্য রাখে। এই সময়টাতে ওর  যেমনি অপরিসীম সুখ অনুভব হয় তেমনি অপরিসীম দুঃখও ওকে উন্মনা করে তুলে। এমনি সব এলোমেলো ভাবনায় তলিয়ে যেতে যেতে আনমনা বর্ষার হঠাৎ চোখ পড়ল ফ্ল্যাটবাড়ির নিচে দেওয়ালের লাগোয়া একটি ইউক্যালিপটাস গাছের নিচে দাঁড়িয়ে থাকা দুটো ক্ষীণকায় কিশোর ছেলের দিকে। অহেতুক কৌতুহলে বর্ষা একটু গলা বাড়িয়ে দেখার চেষ্টা করল ছেলে দুটোকে। জীর্ণ মলীন কাপড় পরা দুটি কিশোর ছেলে। দুজনের শরীরী অবয়ব দেখে মনে হচ্ছে যেন কিছু একটা নিয়ে বিবাদ করছে। ব্যাপারটা বুঝার জন্য ও উঠে সিঁড়ির দিকে এগিয়ে গেল। পায়ে পায়ে ফটকের কাছে এসে ছেলেদুটোকে দেখেই বিস্ময়ে চমকে উঠল। আরে ...!! এই দুটো ছেলেকে তো ও চেনে! একজন অন্ধ এবং  আর একজন বোবা,কথা বলতে পারে না। বর্ষার গাড়িটি যখন অফিস যাবার সময় ট্রাফিকে আটকে থাকে তখন ছেলে দুটো হাতে হাত ধরে এসে ওর গাড়ির জানালার কাঁচে হাত পাতে। প্রতিদিন বর্ষা ওদের  জন্য দু-চার টাকা খুচরো রেখে দেয় ব্যাগে। কিশোর বয়সের ছেলে দুটোর প্রতি নিয়তির এমন নিঠুর বিধান দেখে ওর মন ব্যথায় ভরে ওঠে। একদিন ওদের জিজ্ঞেস করে জেনে ছিল ওরা দুইভাই। নাম যদু ও মধু। ছোটভাইটি জন্ম থেকেই কথা বলতে পারে না আর ওর চোখদুটো নষ্ট হয়ে গেছে গুটি বসন্তয়। মা লোকের বাড়িতে বাসন মাজে। বাবা ওদের ফেলে অন্যখানে গিয়ে সংসার পেতেছে। ছেলে দুটোর এমন দুর্ভাগ্যজনক গল্প শোনে বর্ষার সংবেদনশীল মন বেদনায় কাতর হয়ে ওঠেছিল। কিন্তু আজ একি দেখছে ও!! লক্ষ্য করে দেখল,একটির হাতে একটি নেশাজাতীয় দ্রব্যের টিউব  নিয়ে টানাহেঁচড়া চলছে। আড়ালে দাঁড়িয়ে শুনল,একজন অপরজনকে বলছে, ' আবে ওই হলুদ শার্ট তোর হাতে কুরি টাকা দিয়েছিল,সে ভাগ তুই আমাকে দিসনি। আর এখন নীল শাড়ি কাকিমার দেওয়া খুচরো কতকগুলিও তুই হাপিস করবি'? এমনি বাকবিতণ্ডার মাঝে হঠাৎ হাত থেকে টিউবটি পড়ে যেতেই দিব্যি অন্ধ ছেলেটি নিচু হয়ে টিউবটি তুলে ফেলল। তবে তো ছেলেটি অন্ধ নয় ! বোবাটিও সমানে তর্কবিতর্ক চালিয়ে যাচ্ছে। বর্ষার প্রতিবাদী মন  আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না।পা টিপে টিপে এগিয়ে গিয়েই খপ করে দুহাতে দুটি ছেলের হাত চেপে ধরল। ওরাও বর্ষাকে দেখেই ভয়ে চমকে ওঠে হাত ছাড়িয়ে পালাবার চেষ্টা শুরু করল। বর্ষা ধমকে ওদের বলল,পালিয়ে যাবার চেষ্টা করলেই এবার ও পুলিশের হাতে তুলে দেবে ওদের এবং ওসব বাজে নেশা করার জন্য ওদের পুলিশ হেফাজতেই পচে মরতে হবে। এদিকে বর্ষার উত্তেজিত কথাবার্তা শুনে আবাসনের চৌকিদার পায়ে পায়ে সেখানে এসে ভীড়ে গেল। পথচারী দু'একজনও সেখানে এসে দাঁড়িয়ে পড়লেন। ওনারা বর্ষার কাছে ছেলে দুটোকে আটকে রাখার কারণ জানতে চাইলে,ও মুখ খুলতে না খুলতেই ছেলে দুটো ভ্যাঁ করে কেঁদে দিল। এরপর হাউমাউ করে যা বললো,সেটা খুবই বেদনাদায়ক । ওরা আদতে দুই ভাই নয়। দুজনেই ষ্টেশনের পাশের ঝুপড়িগুলোতে থাকে। স্কুলের দোরগোড়ায় যায়নি কোনোদিন। একদিন ওরা ঝুপড়ি থেকে বেরিয়ে পথে প্লাস্টিক কুড়াচ্ছিল, তখন দু'জন দাদা এসে বলল , ওরা যদি এই দাদাদের দলে যোগ দেয় তবে আর ওদের কোন কষ্ট করতে হবেনা। আরো বলেছিল, ওরা যদি বোবা ও কালার বেশ ধরে ঘুরে ঘুরে ট্র্যাফিকের ভীড়ে  লোকের কাছে ভিক্ষা করে তবে দয়াপরবশ হয়ে অনেকেই হয়তো ওদের বেশি বেশি পয়সা দেবেন। এতে ওদের কষ্ট করে স্কুলও যেতে হবেনা আর বিনাকষ্টে পেট ভরে খেতেও পাবে। কিন্তু এখন দিনশেষে দাদারাই ওদের সারাদিনের সব পয়সা কেড়ে নেয়। ওদের হাতে যা দেয়,তা খুবই সামান্য। কাজ ছাড়বে বললেও  খুব মারে। ওদের মত আরো ক'জন ধারেকাছে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। শুরুতে এই বাজে নেশা করাও দাদারাই শিখিয়েছিল। এখন আর ওরা না খেয়ে থাকতে পারে না।  এরপর ধুপ করে বর্ষার পায়ের কাছে বসে হাউমাউ করে কাঁদতে কাঁদতে বলল, 'এবার আমাদের ছেড়ে দিন দিদিমনি। আমরা দুজন ওই ঝুপড়ি থেকে পালিয়ে যাব। আর ওই দাদাদের কথায় ওমন মিথ্যে অভিনয় করে লোক ঠকাব না'। কিশোর দুটোর কথা শুনে বর্ষা ভয় আতঙ্ক হতাশায় একেবারে কুকড়ে গেল। লোকমুখে শুনেছে ও, সমাজবিরোধীদের কাজ এসব । বেছে বেছে পথশিশুদের ধরে ওরা নানা অসামাজিক কাজ চালিয়ে যায়। এগুলো আসলে শহরের দুরারোগ্য ব্যাধি। এর থেকে নিস্তার পাওয়া বড়ই কঠিন। বেশিরভাগ বড় শহরেই একটি বড় গ্যাং থাকে,যারা এসব অসামাজিক কার্যকলাপ চালিয়ে যায়। কিন্তু ছেলেদুটোকে নিয়ে এবার কি করবে ও!! এভাবে তো ছেড়ে দেওয়া যায়না! পথচারী অনেকেই বললেন পুলিশের হাতে তুলে দিতে। বর্ষার মন মানছে না। সদ্য ফুটা দুটো কিশোর ছেলে, পুলিশের ওমন লাঠির ঘাঁ সইতে পারবে তো!! তারচেয়ে যদি নেশা ছাড়িয়ে ওদের শুধরে দেওয়া যায়! তবেই ওদের ভাগ্যলিখন বদলে যাবে। এই ভেবে বর্ষা ফোনের বাটন টিপতে লাগল,গাড়ি ডেকে ছেলেদুটোকে নিয়ে Rehabilitation Centre যাবে বলে। আজ অধরাই রইল বর্ষার টুকিটাকি পুজোর বাজার.......

প্রতিমা দেববর্মা :

 মহিষাসুরমর্দিনীর আগমন

 শরতের নীল আকাশে ভাসছে মেঘের ভেলা
 ভোরের ঘাসে দুলছে শিশির কাশফুলের মেলা।
 শিউলি ফুলের গন্ধে হচ্ছে আকাশ ভরপুর
 প্রাণে জাগায় হিল্লোল আগমনীর সুর।
 ধরায় নেমে আসলে গো মা সঙ্গে ছেলে মেয়ে
 পূ জিত হবেন সবার ঘরে মৃন্ময়ী মা চিন্ময়ী হয়ে।
 সপ্তমীতে সবাই তোমার আরাধনায় মেতে উঠে
 অষ্টমীতে তোমার অঞ্জলি নবমীতে মহাভোগ জুটে।
 দশমীতে বড়দের জানাই প্রণাম, সিঁদুর খেলার পর  আসে বিদায় বেলা
সঙ্গে ছোটদের আশীর্বাদ ও
অফুরন্ত ভালোবাসার মেলা।
হৃদয়ে হৃদয়ে ছড়িয়ে পড়ুক প্রেম প্রীতি ভালবাসা
বিদায় বেলায় জলভরা চোখে এটাই শুধু প্রত্যাশা।
যৎসামান্য ছিল আয়োজন মাগো তোমার জন্য
দুর্গা মায়ের আশীর্বাদ পেয়ে আজকে হলাম ধন্য।
মৃত্যু থেকে অমৃতের দিকে অশুভ থেকে শুভর জগতে
আধার থেকে আলোর পথে নিয়ে চলো মাগো জয়রথে ।

সুখ চন্দ্র মুড়াসিং

বুলবুলি

  শরীফ এবং আয়েশার নিকার দেড় বছরের মাথায় সুস্থ স্বাভাবিক ভাবে ফুটফুটে কন্যা সন্তানের জন্ম হয়।জেলা হাসপাতালে তিনদিনের হ্যাপা সামলে আজ বাড়িতে আনা হয়েছে , দু'জনেই উৎফুল্ল খুশি তাদের ভিন্ন ধর্মীয় আশ্রয় দাতা।  বেবি সিটে মোড়ানো বাচ্চা কোলে নিয়ে সেবিকা হাকডাক করছে আয়েশার  - কে আছে বাচ্চাটি নাও ! শরীফ তাদের আশ্রয় দাতাকে দেখিয়ে বললো উনি বাচ্চাটির দাদু উনার কোলে দিন । বাচ্চা কোলে নিয়ে লোকটি নাম রাখলেন "বুলবুলি" । সুসংবাদ শুনেও তাদের কোন পক্ষের কেউই দেখতে আসা তো দূর খোঁজ খবর পর্যন্ত কেউ নেয়নি । না নেবার ই কথা তাদের সম্পর্ক কোন পক্ষই মেনে না নেওয়ায় বাধ্য হয়ে রাতের আঁধারে এক বস্ত্রে দূর সম্পর্কের এক আত্মীয় বাড়ীতে আশ্রয় নিয়েছিল ।

            আশ্রয় দাতা লোকটির  কাজের লোক খুব দরকার ছিল , খোঁজ পেয়ে আলাপচারিতায় সহমত হওয়ায় কাজী ডেকে নিকা করিয়ে বাড়িতে তুলে নেন । দু' পক্ষের আমতের কারণ হল - আয়েশার মা তৃতীয় সন্তান প্রসবের সময় বাচ্চা সহ ইন্তেকাল হলে ওর বাবা নিঃসন্তান তালাক প্রাপ্ত এক মহিলাকে নিকার আয়োজন করে কিন্তু নিকার আগের রাতে তিন সন্তানের জনক শরীফের বাবা দলবল নিয়ে জোর করে ঔ মহিলাকে তুলে  বাংলাদেশে নিয়ে নিকা করে । শরীফের মা অবজ্ঞা সইতে না পেরে আত্মহত্যা করে , শরিফরা তিনভাই বোন নানার কাছে আয়েশা ও একমাত্র ভাই বোয়ার কাছে অবহেলায় বড় হতে থাকে । তখন থেকেই দুই পরিবারের মধ্যে সপে নেওলে সম্পর্ক । 

          গ্রামের দু'য়েকজন মহিলা বাচ্চা দেখতে এসে দেখতে পায় শরীফ তার ঘুমন্ত শিশুকে কোলে নিয়ে নিষ্পলক চেয়ে আছে , দুচোখে আনন্দ অশ্রু টলটল .. টলটল...।

ইমতিয়াজ কবির

অবলামানবি

সৃষ্টির ঊষা লগ্ন থেকে আজও
চর্চিত ' তুমি ' হাজারও প্রশ্নের মায়াজাল,
তোমা হতে সৃষ্ট সৃষ্টির সেরারা সন্দিহান- 
সংসার ধর্ম পালনে সপিন্ডিকরণ!
পূর্ণিমার জোছনা আলোয় হারানো ' তারা ' 
স্ফুলিঙ্গে নেমে আসা উল্কাপিন্ড।
শব্দহীন সাদা কাঁচের ওপারে ভয়ার্ত হাহাকার;
এপারে দর্শক পুরুষতান্ত্রিক দৃষ্টি ' সনাতন ' 
নারী পুরুষের নির্ধারিত ভূমিকার,
বাইরে পুরুষ, নারী সামলাবে মাতৃত্ব ঘর।
মেয়েদের ' স্বধীন অস্তিত্ব ' স্বীকৃতি বিপন্ন
অনীহা নিদারুণ কর্মক্ষেত্র পুরুষের ছায়াতল
পুরুষতান্ত্রিকতার সর্বব্যাপ্তি গার্হস্থ্য হিংসায়
দ্বন্দের মীমাংসা দূরঅস্ত লিঙ্গ বৈসাম্য অধিকার
জীবিকা সন্মান ছাঁটাইয়ের খাঁড়ায়, পেশা সুরক্ষা
সংগঠিত অসংগঠিত ক্ষেত্রের ব্যাবধান ক্রমশঃ লুপ্ত
পশ্চাদগমনে অধিকার- নায্যতার রাজনীতি দর্শন।
কুড়ম্বশ্রী ,জন্মভূমি কর্মসূচি অ্যান্টি- ইনকাম্বেন্সি
জনকল্যাণমুখী শত চেষ্টায়, মহিলা ক্ষমতায়ন!
অশিক্ষা সমুদ্রে,অজ্ঞান তিমিরে অশিক্ষার প্রলম্বিত ছায়া
বেলা শেষের রোদ- ভেজা সোনালী বৃষ্টি ' তুমি ' 
আনারকলির ছদ্মবেশে আজও বোরখায় যামিনী।
চারিদিক ঝিকমিক তবু ভয় দ্বিধা স্পর্শকাতর অসহায়ত্ব
কান্না দিয়ে ভাতমেখে খাও আজও নিত্য।
কন্যাদায় পিতার অসহায় কাতর আর্তনাদ;
নারী স্বধীনতার রুপোলি আলোকরেখা
দুমড়ে মুচড়ে অবাধ বিচরণে ' বীরপুঙ্গব ' 
মুক্তমনা নারীর ব্যাতিক্রমী ভাবনার আশ্বাস অবসান।
' অপারেশন সার্চলাইটে ' অমানুষিকতা বীরাঙ্গনার আব্রু
স্বদেশপ্রেমে শহিদরা, বীরঙ্গণার মান ধর্ষিত বারবার!
সহানুভূতিহীন আত্মীয় পরিজন
দেশত্যাগ আত্ম হননে-ই রক্ষিত সম্ভ্রম।
চেতনায় উদ্বুদ্ধ প্রতিবাদী করে বাঁচার পথ নির্মাণ।
প্রজ্বলিত সদা প্রদীপ শিখা অনির্বাণ ।


রাজীব ভট্টাচার্য

প্রিয়কবি কে 

অসুখ হবার ভয়ে ছুঁয়ে দেখনি 
অক্ষম অক্ষর প্রয়াস 
অন্ধকার ঘরে জ্বালাতে চাওনি 
কোনদিন মাটির প্রদীপ । 

মদ ও মেধা 
ফুল ও পাখি নিয়ে দূরে 
পরিবৃত পরিজন 
বাগান বাহার গুণীজন । 
উপেক্ষার চাল শিখেছ
সহজ খেলা জেতবার ! 

অসুখের বীজ কে রোপন করে
আর কে পালিয়ে বেড়ায় 
বাল্মীকি প্রতিভা থেকে দূরে ? 

আমি না হয় রোগগ্রস্থ,
আমার অসুখ । 
আপনার ভিতরে এতো সুখ 
তবে কেনো বিষ ছোবল মারে  ?

সপ্তমিতা নাথ

তোমার আমার দুর্গা 

দুর্গা দুর্গতিনাশিনী 
দুর্গার ই কেন বিপদ জুটে?
জয় দুর্গা অসুর বিনাশিনী ,
অসহায় চর্মদুর্গা অসুর মাঝে।
আসনের দুর্গা রাজসাজে সজ্জিত ,
ঘরের দুর্গা চ্ছিন্ন বস্ত্রে লজ্জিত ।
দেবী দুর্গার আয়োজনে ঘটাঘরে নিমজ্জিত ,
মানুষ দুর্গা নিত্যদিনে স্বাধীনতা থেকেও বঞ্চিত।
কল্যাণী যে সব অমঙ্গল হরণী,
শ্যামলী সে সব অমঙ্গল কারিণী।
দুর্গা সে যে ত্রিশূলধারিনী, বলপ্রদায়িনী,
মাংস দূর্গা অস্ত্র হাতে সে যে নটী বিনোদিনী ।
ত্রেতার দুর্গা ত্রিকালদর্শী, ছিল চিন্ময়ী,
আজকের দুর্গা স্তব্ধ মৃতপ্রায় ,শুধুই মৃন্ময়ী।

স্নিগ্ধা ভট্টাচার্য

গোধূলির অস্তরাগ

অনেকটা পথ পেড়িয়ে এলাম।  
যা পেয়েছি সেইটুকু ঝুলি ভরা থাক।  
মান অভিমান গেছে দূরে।
অভিযোগ নেই যে আর।
দিনের শেষে ক্লান্তি যত, 
মুছিয়ে দিল   গোধূলির অস্ত রাগ।
মানাতে, মানিয়ে  বেশ আছি।
পাশাপাশি  আবেগ জড়িয়ে।
 গোধূলির অস্ত রাগে  নীরবতায় হাতে হাত।


মিনাক্ষী চক্রবর্তী সোম

গোধূলির সান্ধ‍্যআসর

গোধূলির সময়টুকু পার হয় ধীরে
তখন বোঝাপড়ার সময় 
কাজলদাগ তুলে আকাশের গায়
পাখিরা ফিরে যায় নীড়ে
দিনশেষের আলো-আঁধারি খেলায়
মেঘেরা এলিয়ে বেড়ায়
আকাশের গায় উৎসবের সাজ
তবু সন্ধ‍্যাতারা দেখা দেয়।
মায়াময় কারুকাজ গায়ে মেখে 
তুলো মেঘপরিরা সাজে সীমান্তপাড়ে 
ঘুম ঘুম আঁধারে ডোবে চারপাশ 
নেমে আসে অন‍্য এক পৃথিবী।
জাদু লেপ্টে থাকে গায়ে
বিস্তার হয় সান্ধ্যআসর।
গোধূলি সময়টকু নিবিড় মায়াময়
প্রলম্বিত রঙবাহারি আলপনা থেকে 
হৃদয় লাল রঙ চুষে নয়।
ঘনঘোর প্রেমের দাবানল জ্বলে উঠে ক্রমশ
অলস শরীরে ভর করে কথা আর কবিতা
কলমের পাশে গোধূলির আকাশ ঘুমোয়।।

সুজন দেবনাথ

যাহা সত্য

জানি একদিন থামতেই হবে
তাই আর ভয় করিনা,
লক্ষ্য আমার আকাশ ছোঁয়া
চেষ্টা এখনো ছাড়িনা।

সময় যেদিন থমকে দাঁড়াবে
মেনে নেবো পরাজয়,
ভাববো সেদিন অসম্পূর্ণ টা 
এ জীবনের জন্য নয়।

ছন্দা দাম

অসমাপ্ত গল্প

জানালা গলে আছড়ে পড়া জ্যোছনাজলের তোড়ে...
ধুয়ে যাচ্ছিল একে একে ডায়রীর সব কবিতাগুলো,
ভেজা শিউলির মাদক স্পর্শে দোলছিল কাশেরা...
পুকুরের জলে যেন ফুটে উঠছিল কার আঁখি ছলোছলো!
তুমি কি সেই মেয়েটি যে কাঁখের কলসিটা ঘাটে ভুলে...
চলে গেছিলে কোন দূরে ,না শেষ হওয়া ছোটগল্পের দেশে,
কার কবিতারা কাঁদে আজও তোমার দোটানা খুঁজে...
বলো কেন তুমি চলে গেলে সেদিন ভেজা চোখে খানিক হেসে!

আর কটা দিন... তোমার পশমি শালটা কাঁদে জানো...
প্রতিটি শীতের ওমে ছুঁতে তোমায়, জমছে গায়ে তার স্মৃতিধুলো,
তুমিই তো সেই,যে এক্কাদোক্কা খেলত উঠোনের ওদিকে
সজনে ফুলের ছায়াময় মায়া মেখে ছড়াতে আলো।

পাটিগণিতের সিঁড়ি ভাঙা অঙ্ক যার কাছে জলবৎ...
তবু জীবনের সরল অঙ্ক ভুল করলে আঙুলের হিসেব করতে,
জানালা গলে আছড়েপড়া জ্যোছনা আজও ঝরে চোখ বেয়ে...
মেয়েটি চাইলে কি তুমি পারতে না জীবনের অঙ্কটা শুদ্ধ করতে!

কাজি নিনারা বেগম

মনু নদীর পশ্চিম পার

সময়টা ছিল প্রায় ১৯৯৪ আগষ্ট মাসে আমি তখন বারো ক্লাসে পড়ি। হেমন্ত কালে প্রায় যায় শীতের নিমন্ত্রণে মরসুম  ফুলগুলো যেনো নেচে উঠেছে । দুপুর বেলা সূর্য দেব কিছুটা দোলা চলে মনটা আনচান করছে । আপন মানুষের  আদর সোহাগের জন্য  যাইহোক বুকে ভালো বাসা চেপে লোকালয় ভুলে খানিকটা সময় নিজেকে নিজের মধ্যে হারিয়ে গেলাম। আমাদের বাড়ির সামনে মনু নদী বাধ। সুন্দর চৌরাস্তা সামনে দাঁড়িয়ে আছে শ্মশান কালি মন্দির টি। পাশে সীমান্ত ঘেষা মসজিদ জোহরের আযানের  মিষ্টি সুর শোনা যাচ্ছে। মনু নদীর উপর বাঁধ খানা শহরের উপর দিয়ে চলেছে পাশাপাশি ছোট একটি পাড়া ঐপাড়াতে  শ্বশান মন্দিরের পূজা দেন  কাজলীর বাবা ঐদিন টি ঘোর অমাবস্যা ছিল ওনি রাতে পূজা দেবার জন্য ফুল বেলপাতা নদীর পাড়ে জবা ফুল তুলছেন। নদীতে জল তেমন নেই পাশের পাড়ার কয়েকটি ছেলে নদী থেকে জাল দিয়ে মাছ ধরে বাজারে বেচা কেনা করে । নদী অপর প্রান্তে একটি বি এস ক্যাম্প আছে।  ওরা প্রায় সময় বৌট দিয়ে সীমান্ত অতিক্রম করা লোকজন  যাহাতে  না যায় কড়া পাহারায় থাকে। ঐদিন ছোট ছোট বাচ্চারা মাথায়  কিছু জিনিস পত্র মানে পণ্যসামগ্রী

 করে  নিয়ে নদী পার হচ্ছিল অবৈধ ভাবে। এমন সময় নদীর অপার থেকে এক জোয়ান নদীতে উপর থেকে লাফ দিল সীমান্ত বর্তী ছোট ছোট বাচ্চাদের ধরার জন্য। তখনই হঠাৎ মনু নদীর  তলদেশে চলে গেল

নদীঅতে মাছ ধরছিল বোবা একটি ছেলে  ওর মা আদর করে নাম রেখে ছিল কানু। 

ঐ বোবা ছেলেটি তাকিয়ে আছে নদীর  জলের দিকে হতবাক ও কাউকে বুঝাতে পারে পারছেনা ওকি করল নৌকার মাঝে দাড়িয়ে একটি বাঁশ বা অন্য কিছু দিয়ে শব্দ করছে ওপার থেকে বি এস এফ এর বাকি জোয়ানরা নেমে এল দৌড়া দৌড়ি করে একে একে নেমে এল। নদীতে নেমে খোঁজাখুঁজি করতে লাগল নিমিষের মধ্যে কোথায় চলে গেল। উপস্থিত সবাই মিলে চেষ্টা করে কিছু করতে পারছেনা। আমি আগে বলে ছিলাম মনু নদীর পশ্চিম বাঁধে র কোনায় শ্মশান মন্দিরছিল জাগ্রত সবার মনস্কামনা পু্র্ন হয়। এমতাবস্থায় পাড়ার বয়োজেষ্ট একজন জেঠু এসে বলল আপনাদের মধ্যে একজন মনূ নদী স্নান সেরে  মা কালির মন্দির  পূজা দেন। হয়তো সব ঠিক হবে। তাড়াতাড়ি কোলকাতা একজন সৈনিক স্নান সেরে পূজা দিতে বসে গেলেন

যথারীতি সময়ে পুজা শেষ হলো। আর এদিকে নদীতে খুঁজা খুঁজিতে কিছুটা হয়রানি হয়ে গেল। আমরা সবাই দাড়িয়ে দেখছি। এমন সময় একজন সৈনিক চিৎকার করে উঠল মিল গায়া মিল গায়া সবাই হকচকিত সাথে সাথে ওই সৈনিক কে জল থেকে কয়েক জন  সাধারণ লোকজন  সৈনিক রা জল থেকে ধরাধরি করে উপরে উঠালেন। সৈনিক দের  মধ্যে একজন মেডিকেল অফিসার ছিলেন ওনি লাশের হাত ধরে কিছু পরিক্ষা করলেন বললেন নেই। কিছুক্ষণ পর ফায়ার সার্ভিস  আসল নিয়ে গেল হাসপাতালে ডাক্তার বললেন জল খেয়ে ছেন জল বেড়ে হল সুস্থ হয়ে যাবেন। সবাই খুব খুশি যথারীতি সৈনিক টিকে নিয়ে আসলেন ক্যম্পে। ঘটা করে আবার অমাবস্যায়  শ্মশান কালি  মন্দিরে পুজা হল পাড়ার সবাই মিলে।  আমি আবার বলছিবিশ্বাস করলে ঈশ্বর আললাহ ভগবান মানবকল্যাণে সহায়তা করেন। ঐদিন শ্বশান মন্দিরকে জাগ্রত বলে জানে।

এদিকে বিএস এফ কোম্পানি তে কয়েকজন মাইনরিটি জোয়ান জুম্মা বার ছিল দলবদ্ধ হয়ে  শ্বশান মন্দিরের খানিকটা পেছনে মনু নদীর বুকে পশ্চিম পারে একটি জামে মসজিদ আছে নামাজ আদায় করেছিল ঐ  বিএস এফ জোয়ানের জন্য অনেক দোয়া করেছিলেন সবাই আল্লাহ তায়ালার অশেষ মেহের বানিতে  ঐ যাত্রা বেঁচে গেলেন ঐ জোয়ান মায়ের কোলে ফিরে গেলেন।

তাপস শীল

পুকুরের প্রতিক্ষা

বছর কয়েক আগে গ্রামের বেশির ভাগ ছেলে মেয়েরাই পুকুরে স্নান করতো। তখন সবার বাড়িতে কল বা কুয়ো ছিলো না। পুকুরে স্নান করার সুখটা ছিল আলাদা। সকালে ঘুম থেকে ওঠে প্রাইভেট পড়তে যেতাম। ঠিক সাড়ে নয়টায় প্রাইভেট ছুটি হতো। দৌড়ে দৌড়ে বাড়িতে আসতাম কারন যত তাড়াতাড়ি আসা যাবে তত বেশি পুকুরে ডুবাতে পারবো। দশটার মধ্যেই স্নান ছেড়ে খাওয়া -দাওয়া, পোশাক পরে স্কুলের দিকে ছুটতে হতো। সবাই দিন গুনতাম রবিবার কবে আসবে তার অপেক্ষা। 

দীর্ঘ প্রতিক্ষা অবসান ঘটে রবিবার আসে। রবিবার দিন প্রাইভেট ও থাকতো না ব্যাস্; দুপুর বেলায় যে ঋতুতে যে ফল থাকতো সেই ফল ভর্তা করে খেয়েই পুকুরে ডুবানো আমাদের সবচেয়ে বড় কাজ। একে একে সাঁতার কাটা প্রতিযোগিতা, কতক্ষন জলে ডুবে থাকা,  তা এক-দুই করে গুনতাম আরো থাকতো কতো কি!  এর ফাঁকে পুকুরে মালিক এসে অনেক গালাগালি করতো, মাঝে মাঝে পাথর ও মারতো, তারপর বাড়িতে নালিশ দিয়ে আসতো। তারপর ও আমরা চুপ করে মালিককে এড়িয়ে  করে সবাই মিলে ভেজা গায়ে হাসতে হাসতে চলে যেতাম।আর সবাই মিলে বলতাম সামনে রবিবারে আবার হবে...

আধুনিক যুগে এখন আর ছেলেমেয়েরা পুকুরে স্নান করে না, সাঁতার কাটতেও জানে না।আমাদের যেমন প্রত্যাশা পুকুরের ডুবানোর প্রতি তা আজ হারিয়ে গিয়েছে মুঠোফোনের ছোঁয়ায়।কিন্তু আজও পুকুরটা দিন গুনছে আধুনিকতার মাঝে পুরাতন কে খুঁজে পাওয়ার প্রত্যাশায়।