Sep 28, 2022

স্বরূপা দত্ত

নিরাপদ আশ্রয় 

যে পথ দিয়ে তুমি চলে গেলে
সেই পথ কোনো অসীম জাদুবলে মুছে গেছে 
 ঝাপসা হতে হতে  অদৃশ‍্য হয়ে গেছে তোমার ছায়া।
আমার সামনে এখন গভীর খাদ
 চুম্বকের মত অবিরত টানছে আমায় ।
রাত্রির কপট রেখা পেরিয়ে মৃত্যুর অট্টহাসি
আমার হাড়-মাস হিম করে। 
অপঘাতে মৃত্যু অনিবার্য জেনে
হন‍্যে হয়ে সেই রাস্তা খুঁজছি,
যে রাস্তা ধরে গেলে পাবো তোমায়,
পাবো আমার নিরাপদ আশ্রয়।
আমায় সেই পথ দেখিয়ে দেবেনা, বাবা?

মিঠু মল্লিক বৈদ‍্য

সুপারহিরো

(গল্প )

সেদিন সকাল থেকেই  হালকা বৃষ্টি। অনিমেষ বেরিয়ে পড়ল অফিসের উদ্দেশ্যে। প্রতিদিন তাকে প্রায় ৪০ কিলোমিটার চলে অফিস করতে হয়। যত বেলা বাড়ছিল তত বৃষ্টিও বাড়ছিল। বৃষ্টি বাড়ার সাথে সাথে পূর্ণিতার ভাবনাও বাড়ছিল। কিন্তু সকল ভাবনা আড়াল করে অলীক ও অনীককে নিয়ে সব দিনের মতই দিনটা কাটিয়ে দিলেও সন্ধ‍্যা ঘনাতেই পূর্ণিতা খুব চিন্তিত হয়ে উঠলো অনিমেষের ঘরে ফেরা নিয়ে।

অলীক ও অনিক  পূর্ণিতা -অনিমেষের দুই ছেলে। মায়ের মুখ দেখে ও বৃষ্টির অবস্থা দেখে বুঝতে বাকি রইলো না মায়ের চিন্তার কারণ।এবার বাবার ঘরে ফেরা নিয়ে ওরাও চিন্তিত হয়ে পড়ল।

বারবার প্রশ্ন ভেসে যেতে লাগল  "মা বাবা কি করে আসবে এই বৃষ্টি ও বাতাসের মধ‍্যে?" পূর্ণিতা তার সকল ভাবনা চাপা দিয়ে মিষ্টি হেসে বলল "চলে আসবে, চিন্তা নেই তোমাদের।" ঠিক তখনই মোবাইলে রিং বেজে উঠল। পূর্ণিতা কল রিসিভ করার সাথে সাথে ওপার থেকে আস্তে কথা  এলো  "পূর্ণি!আজকে তো বাড়ি ফেরা হবে না। যারা পাঁচটায় বেরিয়েছে তারা এখনো এক দেড় কিলোমিটারও গিয়ে পৌঁছায়নি "  তখন সন্ধ্যা প্রায় ছয়টা । পূর্ণিতা মৃদু কন্ঠে বলে উঠল " ঠিক আছে এসো না। তবে থাকবে কোথায়? " ওপার থেকে বলল " গেস্ট হাউসে। "দুই ছেলেকে নিয়ে পূর্ণিতা একা একা ঘরে কিভাবে রাত কাটাবে এই বৃষ্টির দিনে ভাবতে ভাবতে হঠাৎ অনীক প্রশ্ন করল "মা, বাবা কি বললো? আজ আসবেনা? তাহলে আমরা থাকবো কি করে?  ভয় লাগবে না আমার? " পূর্ণিতা বলে উঠলো "মা তো  আছি, কিসের ভয়?" মাত্র ছয় বছরের অনীক। বাবা এক রাত বাড়ি ফিরবে না শুনেই চোখে জল এসে পড়ল। কিন্তু মুখে কিছুই বলল না। সে জানত রাস্তায় জল জমেছে, ঝড়োহাওয়া বইছে। বাইরের পরিস্থিতি ভীষণ খারাপ। তাই হয়তো বাবা আসতে পারবে না। কিন্তু বাবাকে এক রাতও ছেড়ে থাকতে যে সে পারবে না সেই কষ্টটাই চোখের জল হয়ে বেরিয়ে আসলো। অথচ মুখে বাবাকে না আসার  সায় দিয়েছিল। 

কিছুক্ষণ পর অনিমেষ আবারও কল করলো। রিসিভ করেই পূর্ণিতা জিজ্ঞেস করল " থাকার জায়গা পেয়েছ?" বলল "হু"।বাবার কথা শুনেই অলিক ও অনীক দৌড়ে এসে বলল "বাবা তুমি আসবে না?" বলতেই অনীকের গলা ভিজে উঠলো কান্নায়। অনিমেষ ওপার থেকে আদর করে অনিককে জিজ্ঞেস করল " বাবাই একরাত মায়ের কাছে থেকে যেতে পারবে তো? " চাপা গলায় অনীক বলল " না, বাবা; পারবো না,ভয় করবে তো।" বলেই কান্না চেপে চোখ মুছতে মুছতে চলে গেল অন‍্য ঘরে।

মুহুর্তেই অনিমেষ সিদ্ধান্ত পাল্টে নিয়ে বলল -"ঠিক আছে বাবা আমি থাকবো না, বাড়িতেই আসব।তবে অনেক রাত হবে।" পূর্ণিতা বলল " না না আসার দরকার নেই, বাবাই একটু পরে ঠিক হয়ে যাবে ওকে আমি বুঝিয়ে সুজিয়ে আজ রাতটা রেখে দিতে পারবো।এই দূর্যোগের মধ‍্যে আসার কোন দরকার নেই।" অনিমেষ  কথা শুনল না। ছেলের চোখের জল সহ‍্য করা ওর  সকল দুর্যোগের চেয়েও অনেক বেশি কঠিন মনে হল। রাস্তায় রাস্তায় এতটা জল বাড়লো যে গাড়ি চালানো প্রায়ই অসম্ভব হয়ে পড়েছিল। তার উপর এত লম্বা জ‍্যাম তিন মিনিটের রাস্তা পার হতেই ত্রিশ মিনিট প্রায়। অনীকের কথাগুলি কানে বেজে উঠতেই ওর সব কষ্ট যেন কম হয়ে যায়। এদিকে অস্থির হয়ে যায় অলীক। বাবার জন‍্য সে পাগল হলেও ঐ রাতে না আসার কথা বার বার বলেছিল। ছোট ভাইকেও সে বুঝাতে চেয়েছিল দুর্যোগের কথা, বাবার কষ্টের কথা। কিন্তু,,,,। বাবার জন‍্য অপেক্ষা করতে করতে শেষে কেঁদে দিল অলিক। কারণ অনিমেষের মোবাইল ততক্ষণে অফ হয়ে গেছিল। কতবার যে সে ঘরের বাইরে করিডোরে গেছে তার ঠিক নেই। মা পূর্ণিতাকেও বেশি কিছু বলতে পারছিল না,কারণ মাও যে টেনশনে আছে।ঘরে বেশ নিস্তব্ধতা বিরাজ করছিল। যে ঘর দুই ভাইয়ের দুষ্টমিতে ভরে থাকে সেই ঘর একে বারে শান্ত হয়ে আছে। পূর্ণিতার কিচ্ছু ভালো লাগছিল না। অলিকের সঙ্গে অনীকও কাঁদতে লাগল। পূর্ণিতা নিজের ব‍্যাকুলতাকে সামলে নিয়ে দুই ছেলেকে বুকে নিয়ে বলল " টেনশনের কিচ্ছু নেই,বাবা তো তোমাদের  সুপারহিরো, ঠিক এসে পড়বে বাড়িতে। বাবা কখনো হারতেই পারেনা। ঠিক কিনা? দুই ছেলে এক সংগে বলে উঠলো "হ‍্যাঁ। বাবা সুপারহিরো।"

সন্ধ‍্যা গড়িয়ে রাত,রাত গড়িয়ে মধ‍্যরাত। রাত একটা নাগাদ কলিং বেল টা বেজে উঠতেই দৌড়ে গিয়ে দরজা খোলে অলিক, অনীক। অনিমেষ ঘরে ঢুকতেই দুই ছেলে জড়িয়ে ধরে বাবাকে। অনীক প্রশ্ন করে "বাবা খুব কষ্ট হয়েছে?"খুব জল রাস্তায়?কিন্তু বাবা তুমি না এলে যে অন্ধকারে ঘুমোতে পারতাম না, ভয় পেতাম খুব।" অনিমেষ হেসে বলল" না সোনা কষ্ট নেই, তুই ভয় পাবি ঐ টা যে আমার কষ্টের ছিল।" টুপ করে একটা চুমু কেটে বাবাকে বলল -আমাদের সুপার হিরো বাবা।"

সুচরিতা পাটারী

ভাতগাছ

প্রত্যহ ভোর হয়- চোখ মেলতেই দেখি 
জানলা বেয়ে আসা বিচ্ছুরণ মাথার উপর প্রখর উষ্ণতার জানান দেয়।
এযাবৎ বৃদ্ধাঙ্গুলি তর্জনী একত্রিত করেও,
তাঁকে একটা আশানুরূপ ভোর উপহার দিতে পারিনি।
মনের কোণে তাঁর নামে কত মেঘ পুষেছি,
চোখের কর্ণিয়ায় তরল আয়না গড়ে তুলেছি কতবার ,
রক্তের তাপীয়ফল প্রকাশ করেছি °C, ফারেনহাইট অথবা ক্যালভিনে।
অথচ কোনো হালখাতা কিংবা ক্যালকুলেটর খুলে সেই হিসাব করেন নি তিনি।।
ঘাম মুছতে মুছতে সমস্ত কিছু আখ্যায়িত করেছেন- ছেলেমানুষী আর পাগলামী'র শিরোনামে।।
চিরকাল এই ছায়াবটে মাথা গুঁজে থাকার লোভ আমার অপ্রতুল,
বাবা! তুমি স্বর্গ, তুমি তপস্যা।
তুমিই আমার সালোকসংশ্লেষীয় ভাতগাছের মূল।

Sep 27, 2022

নমিতা সরকার

হাজারো দৃশ্যে পিতা

ক্লান্ত দুপুরের বুক জুড়ে ঘাম 

ঝরে ঝরে অসাধারণ জলছবি অঙ্কিত হয় যুগের পর যুগ দিনের পর দিন...

কখনো কংক্রিটের সিঁড়ি জুড়ে ফোসকা পরা শতকোটি নগ্ন চরণ চিহ্ন এঁকে বেকে চলে তো চলে ... সকাল থেকে সন্ধ্যা।

কখনো অঙ্কিত হয় মাথার উপরে ইটের পরে ইটের ভাঁজ অার ঘাম ঝরা মলিন বদন,

কখনো হাতুড়ির শরীর জুড়ে শক্ত হাতের স্পর্শে লৌহদণ্ডে ঝনাৎ ঝনাৎ দৃশ্যে বেজে ওঠে ভাষাহীন ভালোবাসার গল্প। যে গল্পে গভীরভাবে লুকিয়ে থাকে শুধুই স্নেহমমতা জড়ানো পিতার প্রেম।

হাজারো গল্পের শুরু আদিমযুগ থেকে নানা দৃশ্যে চিত্রিত হয়ে আসছে মাঠের বুকে, হাটের বুকে, ঘাটের বুকে, নদীর বুকে, পাহাড় নদী সমুদ্রের বুকে।

মাঠের বুকে অঙ্কিত হয় লাঙল জোয়াল আর কাঁদামাটি জড়ানো তপ্ত রোদ্রে মোড়ানো শরীর আর সোনালি স্বপ্নের বীজ। 

সে স্বপ্নের বীজে শুধুই সোনার ফসল নয় অঙ্কুরিত হয় অসীম ভালোবাসায় জড়ানো পিতার স্নেহ।

নিমাই জানা

আদিম গণিতজ্ঞ ও ডোরাকাটা হাসপাতাল

তারপর গণিতের পৃষ্ঠায় থাকা নগ্ন সংখ্যার জন্য সবাই রাতের বেহালা বাদক হয়ে যায় , রডোডেনড্রন গাছের ভিতরে আজ ও কোন এক অশ্বারোহী মৃত মানুষের হাড় খুঁজে বেড়ায়

আমাদের আর কোন মৃত হরিণ জোনাকি রঙের অন্তর্বাস দেখিয়ে যায়নি ময়ূরাক্ষী বিছানার নিচে থাকা বর্ণহীন সংক্রমিত রক্ত কণিকাকে , হাসপাতালের করিডোর জুড়ে বাবা রঙের মানিপ্ল্যান্ট গাছটি জানালা বেয়ে ধৃতরাষ্ট্র হতে চাইছিল বারবার

দেয়াল শুধু ডোরাকাটা বাবার অভয়ারণ্য ,  শুধু ভৌত পরিবর্তনের সান্দ্রতা নিয়ে অক্ষম  সমাক্ষরেখা নির্ণয় করছে আদিম জোড় কলম দিয়ে  , 

একটা বিছানা জুড়ে আমাদের ত্রিভুজ সন্তান ও  অসংখ্য তেজস্ক্রিয় ক্যানভাসে চিরহরিৎ অভয়ারণ্যে অ্যাক্রেলিক মসগুলোকে রঙিন জলে দ্রবীভূত করে দিল কোন এক মৃত পেন্ডুলাম 

একদিন চলে এসো জলাশয় তোমার গোপন গুহা ছেড়ে , তোমাকেও ভগীরথ করে দেবো ছেঁড়া ছেঁড়া জিভের নিচে থাকা লাল-কামিজের পরিচ্ছন্ন অসুখের তিন ইন্টেস্টাইন , দুই ফুসফুস , আর চতুর্থ কর্মেন্দ্রিয় দিয়ে 

নীল পুরুষটি মধ্যরাতে ওঠেন অট্টহাসিতে ফেটে পড়েন আর আধখানা ইঁট বুকের কাছে জমিয়ে রেখছে উলঙ্গ সালোকগ্রাম ভেবে , 

বাবার মতো আর কোন পিথাগোরাস জন্মায়নি পৃথিবী জুড়ে

আসলে অভয়ারণ্যের ভেতর শালফুলের মদে ভেজা বাবাকে প্রতিদিন অ্যাসাটিভ সেন্টেনস বলেই মনে হতো আমার

মাধুরী সরকার

যোদ্ধা

এক আজন্ম যোদ্ধার নাম বাবা
যাঁর বুকের খাঁজে এক নদী অশ্রু লুকিয়ে
যাঁকে শুধু আমার জন্যই হাসতে দেখি।
আমার ইচ্ছের ভীড়েই মিশে আছে যাঁর সকল ইচ্ছে।

একটি অফুরন্ত স্নেহভান্ডারের নাম বাবা,
পাখিশিশুর মতো বুকের পাঁজরে জড়িয়ে
যে অন্তরালে ভাসিয়েছে দু-চোখ।
আমাকে সাফল্যের ঠিকানায় পৌঁছাতে 
যাঁর দুটি হাত ঢেলে গেছে অকৃপণ ভাবে,
ঘাম ঝড়িয়ে রাত-দিন ...

একটি আদর্শের মশালের নাম বাবা
যাঁর আদর্শ আমার কাছে অহংকার 
নিজের সর্বস্ব দিয়ে আলো জ্বেলে যে
আমার স্বপ্নরাশির সিন্ধুকে ভরে দিয়েছে
একপৃথিবী সুখ।

এক আরাধ্য পুরুষের নাম বাবা
আমার জীবনজুড়ে যাঁর আশীর্বাদের হাত,
সেই আরাধ্য পুরুষটাকে আমার নতশিরে প্রণাম।

শ্বেতা ব্যানার্জী

আমি ছুঁয়ে আছি বাবা

জানি অনন্ত জীবনে তুমি ই পৃথিবীর ছাদ,
যেখানে তুমিময় আমাদের সংসার। 
সমস্ত ব্যথা, বেদনা, দুঃখ ভুলে --
ভালোবাসার নদী তীরে  একবুক ইচ্ছে বসার।
লাল - লাল কষ্টগুলোয় শত বসন্তের কিশলয় 
তোমার ই ছোঁয়ায়, আমার কিশোরী বেলায়।
বিশ্ব চরাচরের দুঃখ ঠেলে একবুক নিঃশ্বাস 

জীবনের কঠিন খেলায়।
অফিস ফেরত ভিজে জামাটার গায়ে 
আঁকা,  কত নির্লিপ্ত চমৎকার!
বেদনার সুর ভুলিয়ে দিয়ে মাথায় হাত রেখে 
বলতে,খুকু তুই  আমার অহংকার। 
অনন্ত জীবনের পথ চলে রোদের কিরণ দিয়ে 
গুটিপোকাকে করেছ প্রজাপতি। 
আজ আমার উড়ে চলা শরতের কাশফুলে
আমি ছুঁয়ে ছুঁয়ে দেখি তোমার ফেলা রাখা
ইতি-----

হামিদুল ইসলাম

স্মরণে মননে বাবা 

এখন দেয়ালে বাবার ছবি টাঙানো 
সৌম‍্য মূর্তির এক সুদর্শন পুরুষ ।।

মা ধূপকাঠি জ্বালিয়ে প্রতিদিন সন্ধ‍্যায় বাবাকে প্রণাম জানাতো 
আমিও দুহাত তুলে প্রণাম জানাই 
লোকটা সেই যে চলে গেলো ------

মা'র পরণে এখন শাদা থান 
যেনো শাদা শাদা বক বসে আছে মা'র গায়ে 
আসমানে সারি সারি শাদা মেঘ 
পৃথিবী শাদা হয়ে যাচ্ছে ।।

বাড়িটা এখন ফাঁকা। শুনশান 
শরতের শিশির মাখা আমন ক্ষেত 
বাবার সুবাস 
কাশবনে বাবা। প্রতিদিন কুড়োই স্বপ্ন। কুড়োই স্মৃতি।।

বাবা নেই অথচ বাবা আছে 
বাবারা থাকে 
লোকচক্ষুর আড়ালে বেঁচে থাকে যুগ যুগ 
স্মৃতি হয়ে বেঁচে থাকে অনশ্বর কবিতার প্রতিটি পাতায় 

রাত বাড়ে। গভীর হয় 
বাবা ডাকেন আমাকে, আজ পঁচিশে বৈশাখ 
প্রভাতফেরি হবে যে ---

অলকা গোস্বামী

নেপথ্যে বাবা

দিনের শেষে ক্লান্তির ছাপ মুছে দেয়
এখনও  তোমার স্নেহের স্পর্শ।
আকাশের সবটুকু নীল শুষে নিয়ে
যেদিন তুমি চলে গেলে
সেদিন থেকে আজ অব্দি
আকাশ টা পোড়া তামাটে হয়েই আছে।

সাতরঙা শৈশব পড়ে আছে এককোনে
স্মৃতির ভাড়ারে।
কার্তিক মাসে পুটুলির মত
তোমার পাশে বসে
ভোরের কীর্তন,
আর বাইশে শ্রাবণে
মনটা যেনো পাড়ি দিত
তোমার অসীমে।

বালিশের পাশে
সাজানো থাক থাক বই,
তুমি আর আমি,
শুয়ে শুয়ে ঠিক তোমার
স্টাইলে বই পড়া....।

মায়ের মৃদু অনুযোগ,
সন্ধ্যায় বেড়াতে যাওয়া তোমার হাত ধরে।
নিশ্চিন্তের সেই দিনগুলি
সময়ের করাল গ্রাসে হারিয়ে গেলো ।

আজ প্রতিটি দিনের সাথে
নূতন করে পরিচিত হই
যেনো এক অচেনা রাজ্যে
ভিনদেশী।

প্রতীক হালদার

সংসারের কাণ্ডারী 

নৌকার ন্যায় সংসার টার
কাণ্ডারী যে বাবা,
ঝঞ্ঝা-তুফান যতই আসুক 
শিরদাঁড়া রাখে সোজা।

সংসারেতে অর্থ নিয়ে 
যুদ্ধ যখন চলে,
ঝরে পড়া ঘামের কণা 
তোমার কথা কথা বলে।

নেই অজুহাত,নেই বিশ্রাম 
নেই তো তোমার শখ,
গাছের ছায়ার মতো তুমি 
সংসারে-ই রক্ষক।

নতুন জামা,নতুন জুতো 
খেলনা কিবা খাবার,
শুধুমাত্র তোমার পরিশ্রম 
এসব করে জোগাড়।

ভাবনা তোমার অনেক বেশি
তাই তো তুমি সেরা,
সংসারটা তাই তো বাবা
তোমার শ্রমে ঘেরা।

মীনাক্ষী চক্রবর্তী সোম

জীবনের ধারাপাত

ব‍্যস্ততার অজুহাতে কেটে গেছে 
জীবনের সুরম‍্য দিনগুলো ....
প্রিয়জনের আবেগমথিত অপেক্ষা 
সহস্র বাহানায় এড়িয়ে গেছি।
মায়াভরা অনুযোগেরা ভেসে বেড়াত
"খবর নেই যে!!"
শাণিত জিহ্বা উদ্ধত জবাব 
শোনাতে সদাপ্রস্তুত।
"সময় নেই" শব্দে কত অলীক সুখ!!
জীবনের কত মধুর সংযোগ 
হেলায় সরিয়ে দিয়ে এগিয়ে গেছি
অনিত‍্য প্রাপ্তির সন্ধানে।
ফিরে দেখা আতসকাঁচে ধরা পড়ে 
গরমিল ছিল জীবনের ধারাপাতে;
কতকাল খোঁজ করা হয় নি
বাল‍্যবন্ধু, কৈশোরের প্রেম,
যৌবনের সঙ্গী-সাথী।
বার্ধক‍্যের বারাণসী যাপনে অহরহ
ওদের জন‍্য প্রাণ আনচান
হৃদয় কাতর।
এখন আমার অখণ্ড অবসর,
সময় গুলো জট পাকিয়ে স্থবির ।
ঘড়ির কাঁটা হাঁটুর মত
এগোতে চায় না ব‍্যথার ভয়ে।।

অতনু রায় চৌধুরী

আমার বাপি

একটা মানুষ আছে, যে রাত দিন ডিউটিতে থাকে। ওভারটাইমে কাজ করে বাধ্য হয়ে। একটা মানুষ আছে যে রোদ্রের দুপুরে ওয়েল্ডিং এর তাপ সহ্য করে ঘামে ভেজা শরীরে, চোখ ঝাপসা হয়ে যায় ঠিক ভাবে ঘুম হয় না চোখের যন্রনায়। তবুও মানুষটা বুঝতে দেয় না কিছুই আমায়। 

সাংসারিক দায়িত্বের মাঝে মানুষটা নিজের শখ গুলোকে গিয়েছে ভুলে, মানুষটা কেবল সংসারটাকে ভালো রাখার চেষ্টা চালায়। অভাবের মাঝে মানুষটা ভরসা দিতে, কখনো আবার বিরক্ত হয়ে রাগারাগিও করে। মানুষটা ভীষণ ভালোবাসে আমায়।

যোগ্যতা মানুষটার ছিল ঠিকই তবে প্রাপ্য জিনিসটা পেলো না। মানুষটার আজীবন একটা দুঃখ রয়ে গেল যা মানুষটা সহজে প্রকাশ করে না। ডিগ্রী ছিল, ছিল দক্ষতা, তবুও বঞ্চিত হল মানুষটা।


এখন আমি সবই বুঝি, এখনতো আর নয় আমি সেই ছোট খোকা। আমি সেই মানুষটারই ছেলে, যোগ্য সন্তান হওয়ার করি প্রতিনিয়ত চেষ্টা।


আমার বাপি আমার দেখা শ্রেষ্ঠ মানুষ, যার কাছে আমার সব আবদার অভিযোগ থাকে জমা ।

অনির্বাণ মিশ্র

সংসার যন্ত্র


বাবাকে দেখি যেন কলুর বলদের মত চোখ দুটো বাঁধা।ছোট ছোট ইচ্ছে গুলোর দিকে তাকানোর সময় কোথায় তার?টানতে থাকে সে সংসারের ঘানি।ক্লান্তি এলেও তাঁর যে বসার জো নেই।সে বসে পড়লে সংসারও যে বসে পড়বে।

ঘানি টানতে থাকে,সংসার যন্ত্র চলতে থাকে.........

রূপালী মান্না

বাবা

রাতের আকাশ গুমোট হয়ে উঠলে
বুকচাপা কান্নারা বৃষ্টি হয়ে ঝ'রে বালিশ
ভাসিয়ে দেয় নদীতে।
কেউ দেখতে পায়না বোবা মনের ব্যথা ,
ভাষায় প্রকাশ করা যায় না সবটা
আবার সবাই কাছের মানুষ হয় না
যারা কাছের মানুষ হয় তারা আবার দুর্বল জায়গাতেই ছুঁড়ি বসানোর পরিকল্পনা করে হয়তো
ঠিক গোদের ওপর বিষফোঁড়ার মতো। 
ঘুমের ঘোরে ছোট্টো মেয়ে ভয় পেয়ে কেঁদে উঠলে
বাবা মা পিঠ চাবড়ে ঘুম পাড়িয়ে দেয় । 
মেয়ে বড়ো হয়ে গেলে
বাবাদের সে সুযোগ থাকেনা মাঝরাতে মেয়ের ঘরে
কান্না মোছাতে যাওয়ার
তাই হয়তো অনেক বাবাই দেখতে পায়না 
মেয়ের নীরব কান্না
এভাবে হারতে হারতে হারিয়ে যায় কত শত মেয়ে।
বয়সের সাথে বদলে যায় কান্নার ধরণ ,
ন্যাপি চেঞ্জ বা ভয়ে আঁতকে ওঠা থেকে
শিশু- বালিকা- যুবতীর হৃদয়ে কখন যে বাসা বাঁধে জটিল আর্তনাদ
তা যদি বাবারা টের না পায় তাহলে বাবা হয়ে উঠলে কই বন্ধু হয়ে উঠলে কই ?
বাবা,
বড়ো হওয়া মেয়েটিরও তোমাকে বড্ড প্রয়োজন।

শর্মিষ্ঠা ঘোষ

পিতৃপুষ্প

দুয়ার, পুকুরঘাট, গোয়াল, দালান, রান্নাঘর 
পেরিয়ে, মা
বাবার ছবিটি নিয়ে বসেন
চোখের ছায়ারা ক্রমশ ভিজে, ঘন
মেঘ
মেঘের ভিড়
ধীরে ধীরে ঘর...সমুদ্র 
মা মিলিয়ে যায় সাগরমেলায়
স্থলজ বলতে একটুকরো 
আমি
টানের নাড়ি
মায়ের 
কোন আকাশ ছিল না, সমুদ্রও...
কেবল
একটি ছাদ ছিল 
সখের একটি গোলাপ গাছ 
রোজ একটি ফুল ফুটতো 
মায়ের কপালে
এখন প্রতিদিনের শেষে
কড়কড়ে বাজ পড়ে...

নন্দিতা ভট্টাচার্য্য

বাবা তুমি

প্রতিদিন অসংখ্য ছোট ছোট
আবদারগুলো 
সুদৃশ্য মোড়কে বাঁধতে গিয়ে
তুমি কতটা খন্ড খন্ড 
হয়ে যেতে 
কখনো বুঝিনি 
বোঝার চেষ্টাও ছিল না -
জীবনে যত চিন্তা, যত প্রশ্ন,         
যত ব্যথা
সব কিছুর সমাধান ছিলে
শুধু তুমি
তোমার অংশ হয়েও 
তোমার লড়াইয়েঅংশীদার 
হতে পারিনি আমরা কখনো
ঋজু দেহের প্রতিটি পদক্ষেপে
ছিল দুর্বার আত্মবিশ্বাস,
ছিল আমাদের জন্য 
এক  অভয় মন্ত্র
'আমি তো আছি '-
আজও সেই মন্ত্র 
বুকের ভিতর উচ্চারিত হয়
নানা আঘাতে রক্তাক্ত আমি 
তোমার অদৃশ্য হাত ধরে                   
এগিয়ে  চলি
অনমনীয় দৃঢ়তায় 
তোমারই মতো-

দেবাশিস মুখোপাধ্যায়

বাবা

খুব ভোরবেলা ঘুঁটে কাঠকয়লা জুট
আমার বাবার হাতের আগুন চিনত
চায়ের কাপে ভেসে বেড়াত ভাললাগা
বাসিরুটির গন্ধ 
গলে যাওয়া বিস্কুট জানত আমার লোভ
একটা ভোঁ ডাকত কারখানা 
পাঞ্চিং মেশিন পষ্ট করে দিত হাজরিবাবুর নাম 
চশমা ছাড়া পড়ে নিতেন 
একটা পুরো পরিবার
পুরনো ঘড়ির পেন্ডুলামও সুর দিত তার নিপুন হাতে

শতাব্দী দেবনাথ

বাবার ভালোবাসা

বাবা কথাটি দুটি অক্ষরে সমৃদ্ধ হলেও 
বট বৃক্ষের মতো ছায়া হয়ে দাঁড়িয়ে,  
আমার দেখা সে এক জীবন্ত কিংবদন্তী। 
শত কঠিনতার মাঝেও দায়িত্ব বোধ তার নিস্বর্থপরতা। 
তাঁর হাত ধরে  হাঁটতে শেখা,
তাঁর শিক্ষায় আমার বড়ো হওয়া,  
 সমস্যার পাহাড় ডিঙিয়ে উপরে উঠা, 
এক কথায় আমার পথ প্রদর্শক।
আত্মসন্মান বোধ আর সততার মাঝে 
তাঁর দৃপ্ত চরণ সৎ চরিত্র গঠনে।  
স্নেহ মাখা হাতদুটি আমার নিশ্চিন্তের ঠিকানা, 
হাজারো আবদারের পরিপূর্ণতার নামই তোঃ বাবা।

প্রজ্ঞা মজুমদার

বাবা

বাবা,তুমি ভালো আছো?
আজকাল মনে পড়ে আমার কথা?
নাকি অনেক আগেই ভুলে গেছো? 
 
মনে আছে তোমার? 
সেই ছোট্টবেলায় কতইনা বায়না ছিলো তোমার কাছে!
মা বকুনি দিলে সাথে সাথে তোমায় ফোন করে কেঁদে উঠতাম,
আর তুমি ফিরে এসে কোলে আগলে নিতে।
 
চশমাটা নিজের কাছে রেখেই খুঁজে বেরাতে পুরো ঘর জুড়ে,
এত ভুলোমনা হলে কি চলে বাবা?
হাসি মুখে আমার বকুনি শুনে বলতে,
তুই খুজে দিস বলেইতো  হারাই রে মা!

আচ্ছা বাবা,
তোমার ওষুধ খেতে মনে থাকে?
নাকি আগের মতো আমি খাইয়ে দেওয়ার অপেক্ষায় থাকো?
তোমার চুল গুলো এখন কে ঠিক করে দেয় বাবা?
আর 'মা' বলে কার কপালেই বা চুমু খাও এখন?

জানো বাবা,
এই সব দিনগুলি বড্ড মনে পরে!
কেনো তুমি চলে গেলে আমায় একা রেখে?

তারা হয়ে দেখছো জানি মাঝ আকাশে বসে।
কেনো তখন ফিরে দেখনা? যখন ম মারে!
এখন বুঝি কষ্ট হয়না আমার কান্না দেখে!
এত অভিমান কেনো বাবা? এসো না আবার ফিরে!