Dec 30, 2023

রুদ্র মোস্তফা

মধ্যস্থতা 

দোহাই লাগে বাসন্তী, 
প্রবল প্রণয়ে আর নিজেকে ভুলো না।
যতোটা ভালোবাসায় ভালোবাসা মুছে যায় 
যতোটা ভালোবাসায় ভালোবাসা ছাড়া 
আর কিছুই  থাকে না 
সব পথঘাট ডুবে যায় অহেতুক প্রেমে 
তেমন করে ভালোবেসো না।
তার চেয়ে পারলে একটু ঈর্ষা করো,
যতোটা ঈর্ষায় প্রেম ও সম্মান পাশাপাশি বাঁচে। 
মহাসড়কে দাঁড়িয়ে পায়ে হাঁটা পথকে ঈর্ষা করো,
যতোটা আঁকাআঁকির পর সূর্য উত্তাপ ছড়ায় 
প্রবল বৃষ্টি অথবা কুয়াশার দিনে 
পারলে তেমন করে ঈর্ষাকে এঁকো।  
শুধু নিখাদ ভালোবেসো না ভালোবাসার অভ্যাসে।

চন্দন পাল

ভয়

তোর যখন ভয় লাগবে
আমার বুকে চলে আসিস ।
কিন্তু আমার যখন ! ধ্যুৎ... 
ভুলে গেছি, আমার ভয় পেতে নেই ।
তবু ভয় হয়...
আমি না থাকলে তুই কি আরেকটা বুকে... !

ওফ্! প্রেম বড় স্বার্থপর। 
প্রকৃতি আমায় শিখিয়ে দাও, কবিতাসম প্রেমহীন উদারকলা।


নবীনকিশোর রায়

ধূসর বালিচর 

আমিত্বের সকল অহংকার
সঁপে দিয়ে টিকে আছি---
অবহেলার যত সীমা পার করে
বন্ধ ঘরের ভিতর  দীর্ঘশ্বাস! 

গৃহসজ্জার ভিতর আশ্রয় 
এটুকু শৈলী জীবন নিয়ে 
কেটে যায় বেলা অবেলা... 

আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে 
নিজেকে পাই, 
স্মৃতির কপাট খোলে 
ঝুলন্ত বারান্দার
সিঁড়িতে পা রেখে নেমে যাই
বহুদূর... 

আবছা আলোয় ভেসে ওঠে
বনবীথিকার সেই প্রান্তর
তোমার পদচিহ্ন আঁকা 
ধূসর বালিচর---
এগিয়ে আসে দুটি প্রসারিত হাত, জড়িয়ে ধরে মিলিয়ে যায়! 


সনজিৎ বণিক

শীতের গল্প

গতকাল বিকেলে তোমাকে দেখেছি হন্তদন্ত হেঁটে যেতে খোলা মাঠের দিকে,
ঐদিকে সত্যিই কাউকে দেখলাম না, একেবারে সুনসান লম্বা মাঠ সেখানেও তুমি একা একা, আমি তখন দৌড়ে তোমাকে ধরতে যেতেই    দেখি উল্টোদিক থেকে বেশ কজন দৌড়ে আসছে ,
শীতের আমেজটা ওদের মধ্যে বেশ ভালো লাগলো,
আমি আর এগোই নি, মজা লাগলো।

সপ্তশ্রী কর্মকার

ব্যর্থতার অভিযোগ 

কুয়াশারা প্রতারক হতেই
ভালোবাসার দখল করে শীত

তলপেটের ব্যথা উস্কে দেয়
ব্যর্থতার অভিযোগ 

বিষন্ন মাখা মনের অসুখে
গভীর রাতের কথা কান পেতে শুনে 
একাকিত্বে ফেলি দীর্ঘশ্বাস,

এই জ্বালা আমার আত্মাকে 
কুড়ে খায়,
তখন মোম গলে পড়ে চোখের জলের মতো..

ভবানী বিশ্বাস

অতীত

রাস্তা আছে, আছে আলো
আগেও ছিল, যখন আমরা হাঁটতাম! 

সেই আলোয় ভালোকরে 
মুখ দেখা যেতো না, 
অথচ আমরা দেখতাম... 

এখন ঠিকানা জানি না, 
জানি না রোড নম্বর। 

পুরোনো জায়গায় রাস্তা নতুন, 
পুরোনো ঘ্রাণটাও নেই

তুমিও নেই, ছেড়ে গেলে
অথচ আমি এখনও সেই আলোয় বসে আছি
তোমার অপেক্ষায়...

লিটন শব্দকর

পথিক ও পাখিরা 

তোমার তছরূপের ইতিকথা শোনার বহুদিন আগে
যে পথিক বাঁশি বাজিয়েছিল মেঠো পথ থেকে শহর
সে হাঁটতে হাঁটতে চলে গেছে বহুদূর। বাঁশি ভাঙা...

পাখিদের জমা করা শুকনো নলখাগড়ার ওমে
কবেকার হলুদ হয়ে আসা মেলবন্ধনের চিঠি 
বলতে দেওয়ার অবকাশ ফুরিয়ে যাবার পরই
তার উড়ে বেড়ানোর শহর হারিয়ে ফেলে তাকে 

ঘুমের অব্যবহৃত সুড়ঙ্গে ছেলেভুলানো ক্যালিওগ্রাফি
সজীব শরীরে উড়ানের পর মাঠে নেমে আসা পালক
বিকেলের অস্তরাগ সোনাঝরা মনে হতো একদিন
নতুন দিনে পালক ছড়ানো মাঠ কাকে ডেকে দেখাই!

অলকা গোস্বামী

মাছের  ঝোল

খাবারে গরম ভাত আর  মাছের ঝোল হলে আর কিছুই চাইনা,দিলীপের। বিয়ের পর থেকেই দেখে আসছে পারুল। মাছের ঝোল এর উপর ভীষন একটা মায়া...। সেবার তরকারিতে নুন দিতে ভুলে গেছিল পারুল, দিলীপ দিব্যি খেয়ে উঠে গেলো। পারুল খেতে বসে দেখল তরকারি তে  নুন দেয়া হয়নি। খুব লজ্জা পেয়েছিল সেদিন। দিলীপ নির্বিকার, বলল

আরে মাছের ঝোল খুব ভালো রেঁধেছ।

হাসি পেয়ে গেছিল পারুলের। এরকম কেউ মাছের ঝোল ভালবাসতে পারে... সত্যি ভাবা যায় না।

উৎসব পার্বনে নানান পদ রান্না হলেও দিলীপের জন্যে মাছের ঝোলের ব্যবস্থা করে রাখে পারুল। সেবার ওদের  বিয়ের পর নিউ ইয়ার পার্টি দিয়েছিল বন্ধুদের নিয়ে। চিকেন, মাটন,বিরিয়ানি, পনীর নানান কিছু ...., এরই মধ্যে দিলীপ এসে জিজ্ঞেস করল, এই পারুল মাছের ঝোল করেছ তো?

আশ্চর্য এত্ত সব আইটেম আছে তারমধ্যে আবার মাছের ঝোল কি বলছ!


দিলীপ বলল, ওকে ঠিক আছে।

রাতে খুব হৈ চৈ মজা করে খাওয়া দাওয়া সেরে বন্ধুরা যে যার বাড়ী ফিরে গেলো। পারুল লক্ষ্য করছিল, দিলীপ ঠিকমত খায়নি, খাবার ছুঁয়ে দেখেছে শুধু। 

শোবার ঘরে ঢুকে পারুল দেখলো, জানালার বাইরে উদাস দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে দিলীপ।

এই কি হয়েছে তোমার বল তো, ভালো করে খেলেও না? পারুল জিজ্ঞেস করল। 

আরে কিছু না....

না বলতেই হবে.... তুমি আজ সবার সঙ্গে থেকেও ছিলে না, অন্য মনস্ক ছিলে, বলনা প্লিজ। 

পারুল দিলীপের হাত চেপে ধরলো... আমি তোমার  বন্ধু, তারপর স্ত্রী।আমাকে না বলতে পারা কোনো কথা তোমার থাকতে পারে না।বল... কি হয়েছে?

মুহূর্তে দিলীপের চোখ জানালার বাইরে জোনাকির আলো আঁধারিতে ছলছল করে উঠলো....।

জানতো পারুল, আমি তখন খুব ছোট। এরকমই একদিন জানিনা মনে নেই ঠিক নিউ ইয়ারস এর দিন ছিল কিনা... চার পাশের বাড়ি গুলোতে খুব উৎসব আনন্দ দেখছিলাম।

আর আমরা চার ভাই বোন, মা সারা দিন অভুক্ত। বাবা জমি জমার কাজে ওপার বাংলায় গিয়েছিলেন। সেখানে কি এক মিথ্যে মামলায় বাবাকে অ্যারেস্ট করে নেয়, পুলিশ। সে এক দিন গেছে আমাদের।

 চারদিন এর জন্যে যাচ্ছি বলে গেছিলেন বাবা সেখানে মাস গড়াতে থাকে। আমি আর আমার বড় দাদা, কত আর বয়স তখন, আমার দশ দাদার তের  হবে হয়ত। আত্মীয় স্বজনরা তখন খুব একটা সাহায্য করে নি। মা অনেক কষ্টে খাবার জোগাড় করতেন। বাবা যা টাকা দিয়ে গেছিলেন সেটা অল্প দিনেই শেষ হয়ে যায়।অল্প ধানের জমি ছিল, তিনবেলা না হলেও দিনে একবার ভাতের  যোগাড় কোনমতে হয়ে যেত। মা ঢেঁকি পাড় দিয়ে চাল নিয়ে আসতেন। দাদা স্কুল থেকে ফিরে পুকুরে বড়শি পেতে রাখত। রাতে আমরা কুপি জ্বালিয়ে পড়তে বসতাম। আর যেই গরম  ভাতের গন্ধ নাকে আসত....তখন দুই ভাই উনুনের ধারে বসে থাকা মায়ের পিছনে গিয়ে দাঁড়াতাম।....মা আমাদের লুকিয়ে চোখের জল মুছে ভাত বেড়ে দিতেন। কখনও আলু ভাতে, কোনোদিন পাতলা মাড় ভাত। এসবই বেশি। দাদা পুকুরে যে বড়শি পেতে রাখত, তাতে তখন কখনও শিঙ্গি মাছ, কখনও মৃগেল, রুই এর পোনা এসব উঠত। সেই রাতে যখন মা গরম ভাতের সঙ্গে মাছের ঝোল বেড়ে দিত.... সেই শীতের রাতে,ঠান্ডায় ধুঁয়া ওঠা ভাতের থালা.... ছোট্ট এক টুকরো মাছ পাতলা ঝোল। কী যে অমৃত লাগত খেতে কী বলব...! সেই বিনে মসলার তরকারির স্বাদ জিভে এখনো লেগে আছে। সেই দিনগুলো জীবনে অনেককিছু শিখিয়েছে। আজকের সফল দিলীপ বড়ুয়ার পিছনে সেই অভাবের দিনগুলোর অনেক অবদান পারুল। আর তখন থেকেই জানো তো মাছের ঝোল এর প্রতি আমার এই অবসেশান। কৃতজ্ঞতা ও বলতে পারো। যত রকমারি খাবার থাকুক না কেন মাছের ঝোল ভাত আমার কাছে সবসময় প্রথম ও প্রধান হয়েই থাকবে।

হ্যাঁ, দিলীপ তাই থাকবে। আমি কথা দিলাম। চল শোবে চলো। আগামীকাল আরেকটি নূতন দিন , নূতন সূর্য অপেক্ষা করছে।

অয়ন পাল

 যুদ্ধ

আপন মাঝে চলছে আমার বিশ্বযুদ্ধ আর একবার
সকলের মধ্যে টিকে থাকার চেষ্টা করি যে কতবার ৷
স্বপ্ন যে আমার, স্বপ্নই  রয়ে গেলো
এই যুদ্ধে আবার কতজন যে নাম লেখালো ।।
সবার সাথে পা মিলিয়ে চলার লড়াই আর একবার
স্বপ্ন ভুলে বেঁচে থাকার চেষ্টা যে কতবার।
দিনের শেষে আসে রাত, রাতের শেষে ঊষা
সবার মাঝে দাঁড়িয়ে থাকার পাই না যে কোনো দিশা ৷৷
প্রতিদিন যে কতজন আসলো আর গেলো!
এই যুদ্ধে আবার কতজন যে নাম লেখালো ?
ডানা মেলে উড়ে বেড়ার চেষ্টা যে কতবার
আপন মাঝে চলছে আমার বিশ্বযুদ্ধ আর একবার ।

ঝিমলি আচার্য

ঠিকানা 

পেয়েছি সন্ধান পৃথিবীতে আসার 
পেয়েছি আলোর ঠিকানা ----
পেয়েছি জীবন পেয়েছি দিশা 
পেয়েছি কর্ম চেতনা।
স্নেহ মমতার আচল পেয়েছি 
জন্ম নেওয়ার তরে।
ম-বাবা পেয়েছি পুন্য করে 
মানব কুলে এসে।
আরও পেয়েছি ভূমি মাতা 
হাঁটা শিখবো বলে।
প্রকৃতি মা আহার যোগায় 
বাঁচানোর ছলে।
জল পেয়েছি জীবন ছন্দে
প্রাণ রক্ষার খাতিরে।
মানব জন্ম পেয়েছি বলে
উপভোগ করি পৃথিবীকে।
সকল মা এর একই ভূমিকা
সন্তানের মুখ চেয়ে।
তবুও আমরা ব্যর্থ সন্তান
মা এর সম্মান রক্ষার্তে।

সূত্রা সরকার সাহা

ভালোবেসে

এক আকাশ ভালোবাসা তোমার জন্য,
কাজল কালো চোখে মুগ্ধতার চাওয়া তোমার জন্য।

এক গোলাপ ভালোবাসা তোমার জন্য,
রাগোসা, বারবোন, বসরা, ডাচ,গ্যালিসিয়া, তোমার জন্য।

এক পরশ ভালোবাসা তোমার জন্য,
প্রেম মদিরায় অমৃত সুধা পান তোমার জন্য।

এক হৃদয় ভালোবাসা তোমার জন্য,
প্রাণ পরশের ওঠা নামা ঐ তোমার জন্য।

এক বুক ভালোবাসা তোমার জন্য,
শান্তির প্রলেপে শান্তি সুধা পান তোমার জন্য।

এক রাশ মুগ্ধতা তোমার জন্য,
অবাক বিস্ময়ে দৃষ্টি নন্দন চাওয়া তোমার জন্য।

এক পুলক ভালোবাসা তোমার জন্য,
অনুভবে রাশি রাশি আনন্দ লহরী তোমার জন্য।

এক অরুণ অঞ্জলি তোমার জন্য,
রক্তিম রাগে ভৈরবী সুরের তান তোমার জন্য।

এক অঞ্চল আঁধার মেঘ তোমার জন্য,
বিদ্যুৎ বৃষ্টির অনুরাগের মিষ্টি ছোঁওয়া তোমার জন্য

সুজন দেবনাথ

হাইকু

১)পথশিশু

শীত কি মিত?
নয় কিভাবে ওরা
রাত কাটায়?

২) অসহায়

কোমল কুঁড়ি,
ফুল ফোটাবে তাই
পথেই ঠাঁই।

রীতা চক্রবর্তী ( লিপি )

ঘোর

ভালোবাসার ঘোরে আবার
দেখেছি তোমায় --
দেখেছি আমি দারুচিনি দ্বীপের বাঁকে
উচ্ছল সমুদ্রের ফেনিল উচ্ছাসে,
নির্জন সমুদ্র সৈকতে
পাড় ভাঙা ঢেউ-এর তরঙ্গে,
শুকনো বালিয়াড়িতে
একাকী ইতস্ততঃ দাঁড়ায়ে,
তবু আমি কাছে যেতে পারিনি তোমার।
কখনো পথ আগলে দাঁড়িয়েছ
আমার দৃষ্টির সম্মুখে,
নিশীথ রাতের গভীর আঁধারে
আমার নির্ঘুম রাত যাপনে,
কখনো তন্দ্রা জড়ানো মধুর স্বপনে
তবু আমি কাছে পাইনি তোমায়।
আজো আবার দেখলাম তোমায়
শহরের রাজপথে
যানজটে থমকে থাকা ভীড়ের কোলাহলে
ছুটে গেছি আমি ছুঁয়ে দিতে দুটো হাত
তবু আমি ছুঁতে পারিনি তোমায়।
হঠাৎ ফিনিক্স পাখির মতোই 
হাওয়ায় হারিয়ে গেলে,
হাতড়ে বেড়াই জনারণ্যে
দু'চোখে নেমে এলো অসীম শূন্যতা
না পাওয়ার খেদ, বিরহের বিবশতা।
তাই সাধ হলেও
ফিরে আমি আজও পাইনি তোমায়।।

বসন্ত মাহাত

 এ সময়ে দেখা শোক

জীবনের বেশ খানিকটা সময় করেছি পার
বাঁচা হয়ে গেল দুই তিন যুগের মধ্যবর্তী। 
তার মধ্যেই অভিজ্ঞতার ঝোলাটা পুরোপুরি 
না হলেও খানিকটা তো হয়েছেই ভর্তি।

মৃত্যু, শোক, আনন্দ, বিলাসিতা কম দেখিনি
অস্বীকার করার যায়গা নেই, সবই নিমিত্ত।
লোক দেখানো মায়া শোক দেখিয়ে দিয়ে
খুব তাড়াতাড়ি পাল্টে ফেলে নিজের চিত্ত। 

দেখেছি স্বামীর মৃত্যুর যন্ত্রনায় স্ত্রী'র শোক
কি করুণ আর্তনাদ! নিঃসঙ্গতার চিৎকার।
কিছু দিন যেতে না যেতেই আবার তিনিই 
বিধবা পেনশনের জন্য করে তোলপাড়।

দেখেছি উত্তাল বিলাপের সঙ্গে মায়া কান্না
প্রবল কান্নায় রাজ্য-শুদ্ধ লোককে বোঝাতে। 
জানান দিতে প্রিয় মানুষটিকে হারানোর ব্যথা 
ঠিক এক মাস পর ব্যস্ত সে আখের গোছাতে। 

আবার এমন মানুষও দেখেছি মৃত্যু যন্ত্রনায়
কাতর হয়ে একটি শব্দও খরচ না করে,
দেওয়ালে হেলান দিয়ে চোখ বুজে ফেলে 
দীর্ঘশ্বাস, অঝোরে চোখের অশ্রু ঝরে। 

দেখেছি কেউ অন্ধকারকে আচ্ছাদন বানিয়ে
রাত্রে হাউমাউ করে কেঁদে বালিশ ভিজায়। 
কিছু লোকের মুখে কষ্টের কথা কম শুনলেও
আচরনেই ভালোবাসার গভীরতা প্রকাশ পায়। 

কেউবা সোশ্যাল মিডিয়ায় করে না বিক্রি 
ওঠায় না ভগ্ন-হৃদয়ের অনুভূতির জোয়ার। 
বরং ব্যথিত হৃদয় সঙ্গে নিয়ে কাজ করে যায়
নীরবে নিজের কাজ করে যায় সার্থকতার।

কৃষ্ণকুসুম পাল

এখন যেমন

সকলে দিনকানা,রাতে ভালো দেখে,
ধারাবাগ-হাওয়া বুঝে কথা ঠোকে।
কান ভারী,কান পাতলা দুটোই চালু,
আপেল,আঙুর নয়,বেশী চলে আলু।
দশচক্রে ভূত দলে দলে ভগবান হয়,
ছয়কে নয়,একের লাঠি দশের মাথা ভাঙে,
শহরে রোদন নিষ্ফল,কেঁচো নরকে, ঢেঁকি স্বর্গে।
পান্থা খেয়ে নুন ফুরালে গরম ভাত আসে,
সাগর কুসুম দু'নৌকায় উল্লাসে ভাসে।
কলা খেয়ে,রথ বেচেও তপস্বী বিড়াল নয়।

চন্দ্রা বিশ্বাস

মানপত্র 

জীবন এখন হেলতে দুলতে পার হয়ে যায় রাজপথ,
গাড়িঘোড়া সব মরজি-মাফিক সফরে। 
বিবেকের সাথে মন কষাকষি তুমুলে ,
ট্রাফিক পুলিশ পিষছে খৈনি মৌতাঁতে। 
চোখ বুঁজে থাকো দয়া করে হে ঈশ্বর,
জেব্রা ক্রশিং রং ধুয়ে মুছে ফরসা।
অগুনতি বার আছাড় খাওয়াটা সামলেও,
কোন ঈশারায় খাদের কিনারে পা রাখা?
চরণ যুগল বশে নেই বাপু জানি তা,
খাড়া মই এ উঠে ব্যালান্স মাপাটা জরুরী।
আকাশ ছোঁয়ার বাসনা মনের গভীরে,
তারা গুণে গুণে সময়ের দাম নিলামে।
যে ক'টা দিন আরও টিঁকে থাকা যায় হে জীবন,
এগিয়ে চলার এডভ্যান্স গোঁজা পকেটে।
পেণ্ডুলামের দোলা তাই থামা চলবেনা,
মানপত্রেই স্বীকৃতি চাই ফোকটে। 

ছন্দা দাম

শুধু আজ

প্রতিটি মুহূর্ত বাঁচি আমি,কাল নয় আজ,
আজ নয় এখন,এই মুহূর্ত,
জীবন কখন হয়ে যাবে বাতাস বিহীন বেলুন...
কতো ইচ্ছেরা হবে পাথর,পাথরেরা নিশ্চুপ প্রথাগত!!

কথাগুলো পাঁজরের খাঁজে গুঁজে রাখা...
শোরগোল তুলে সকাল সন্ধ্যা...মিহি সূর্যের আলো ছুঁয়ে,
ভাবি জাপটে ধরবো আকাশ,রুখব নদীর স্রোত...
কিছুই করা হয়ে ওঠেনা,শুধু বুকের শ্বাসটা উঠে হাঁপিয়ে।

থেকো হৃদয়ের শহরটায়, প্রেম অপ্রমের মায়া জড়িয়ে 
সাঁঝের বেলার মাটির প্রদীপ হয়ে দিও আলো,
সজনেপাতার ঝিরিঝিরি হাওয়ায় হাতছানি দেবে জীবন
তোমাকেই বলব হৃদিকথা...যদি আমায় চেয়ে পৃথিবীটা ভোলো ।

তোমার চাওয়ার স্পর্শে জাগবে পাওয়ার তৃষ্ণা...
একটা সাগর গণ্ডুশে শুষে নেবো প্রতিটি বার,
হমকো তো আজকা জিন্দেগী জীনে সে মতলব হ্যা....
কাল ক্যা হোগা সোচনে সে ক্যা মিলেগা বলো বারবার।।

মীনাক্ষী চক্রবর্তী সোম

প্রতিদ্বন্দ্বী

সময়ের আর দোষ কি বল!
দুরন্ত গতিতে রাশটানা বিষম দায়।
নির্লজ্জ লোলচর্ম বাধা মানে না
রঙ দিয়ে ঢেকে রাখার শতেক চেষ্টা ব‍্যর্থ করে
বলিরেখার ওপর প্রগাঢ় মোমের প্রলেপ গলে যায় 
স্বপ্নসুখ সন্ধানে সময় কেটে যায় অবিরাম ।
অশেষ চেষ্টায় চিরনতুনের প্রগলভতায় মেতে
দেখনদারি প্রতিযোগিতা চলে চারপাশে 
সেখানে নিজেই নিজের প্রতিদ্বন্দ্বি , 
লড়াই শুধু আমার আর আমিত্বের।।

শর্মি দে

পঁচিশ বছরের ঘুম

রাত পোহালো!

অনড় অসাড় শরীরটা নিয়ে মিতার আজ আর উঠতে ইচ্ছে করছে না। সারা রাত জ্বরে পুড়ে যাচ্ছিল শরীর।

      তা সত্ত্বেও পিয়ালের জৈবিক ক্ষুধা মেটানোর প্রতি তার কর্তব্যবোধে কোনো খামতি নেই।

      আবার ঘুমিয়ে পড়ে! হঠাৎ চিৎকারে ঘুম ভেঙে গেলো।

পিয়াল চিৎকার করছে!! "বাবাই স্কুল কামাই করবে নাকি?" নাকে তেল দিয়ে ঘুমোচ্ছেন মহারাণী! গজগজ করে মিতার মুণ্ডুপাত করতে শুরু করলো।

        কিন্তু দু দুবার দেখে গেছে পিয়াল। শরীর ছুঁয়ে দেখেছে টেম্পারেচার কমলো কিনা! মিতার একদিন অসুস্থতা মানে বিছানা না ছাড়া ওর জন্য বাজ পড়ার মতো অবস্থা। সামান্য টিফিন বানিয়ে ছেলেকে তৈরি করে স্কুলে পাঠাতে হিমশিম খেয়ে যায় পিয়াল।

        অগত্যা মিতা চোখের জল মুছে বাবাইকে তৈরি করে দেয়। এই একভাবেই পঁচিশ বছর কাটিয়ে দেয় মিতা। নীরবে!! বাবাই চাকরি করছে। পিয়ালও অফিস করছে তবে একটা নতুন আকর্ষণে অফিস থেকে বাড়ি ফিরতে ইচ্ছে হয় না ওর।

       বাড়িতে বসে কি পরকীয়া সম্ভব! ফেসবুক ম্যাসেঞ্জারের দৌলতে তাই প্রতিদিনের পর্ব শেষ করে বাড়ি ফেরে। মাঝে মাঝে ভিডিও কলে রসালাপ হয় তারপরেই প্রয়োজন পড়ে মিতার দেহের। একটা এমুইজমেন্টের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। মিতা সব বুঝে! ওর আত্মমর্যাদায় আঘাত লাগে তবুও চুপ করে সব সহ্য করে। সংসারটা বাঁচিয়ে রাখতে প্রাণপন চেষ্টা করতে হবে ওকে!

       আটবছরের প্রেমের বিবাহ, বিবাহিত জীবনের অটুট বন্ধনে ছিল বাঁধা। ছোট সংসারে সাহায্যের জন্য কেউ ছিল না। একা হাতে সামলেছে সব। শারীরিক কষ্ট হলেও উফ্ করতে পারেনি বা করে নি বাংলা সাহিত্যে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি নারী মিতা। ওদের ভালোর কথা ভেবে চাকরিটাও ছেড়ে দিয়েছিল। 

      আর আজ! এতো বছর ত্যাগের দেবী হয়ে বৈবাহিক জীবন কাটানোর পর মিতা নিজেকে নিঃসহায় অবলা নারী হিসেবে দেখতে পায় যখন পিয়ালের চোখে মুখে অন্য নারীর প্রতি প্রেম ফুটে ওঠে! এখন মাঝেমাঝেই বলে "একটা চাকরি করার চেষ্টা করো মিতা"! হয়তো মিতাকে ছেড়ে চলে গেলে মিতার পরবর্তী জীবন নিয়ে ভাবে। কারুর পরকীয়ার গল্প শুনলেই বলে উঠে, "ঠিক তো একজনকে নিয়ে কতদিন থাকা যায়!"  মিতার ভিতর হুঁ হুঁ করে কেঁদে ওঠে। পঁচিশ বছর ধরে এতো প্রেম এতো ভালোবাসা কোথায় হারিয়ে গেল! মিতা জানে ঘরে ঘরে পরকীয়া বেড়ে চলেছে...আর আজ তার সোনার সংসারটাও?

    "মা ...মা" ডাক শুনতেই মিতার ঘুম ভাঙে! এই মুহূর্তে মিতার মনে হয় আর ঘুমালে চলবে না, ওকে জেগে থাকতেই হবে বাবাইর জন্য 

রিপন সিংহ

ক্লান্ত পথ

ক্লান্ত দেহ নিয়ে পৃথিবীর এই দোয়ারে,
কার্তিকের শেষ সন্ধ্যায়
গভীর অন্ধকারে ডাকে।
তারপর, অনেক দিন পর
এই পথে কোন একদিন দু'জনের মধ্যে অনেক স্বপ্ন ছিল;
তবুও কোনো স্বপ্ন দেখিনি বারেবারে;
আমি এক ঘুমন্ত প্রাণ,
মেখে আছে তার ঘ্রাণ,
তবুও এই পৃথিবী ম্লান!
শ্মশান, কিংবা কবর থেকে এসেছে কতবার
মিলনের চিঠি
আমি ডেকেছি তারে বারবার;
রূপকে নয় -- তারে ভালোবেসে;
যে পথে হয়েছিল দেখা
আজও সেই ক্লান্ত পথে বেচেঁ আছি।
----  আর নয় !
যেদিন কুয়াশার ভেতর বুনো হাঁস,
হংস হংসীর ডাকে,
একুশ বছর পর তোমার আহ্বানে;
তখন বলবে --- "একটিবার সুযোগ দাও"
তোমার হৃদয়ে,
তখন এই ক্লান্ত পথ থেকে মুছে যাবো চিরদিনে,
তারপর শিশির মাখা বাতাসে
হারিয়ে যাবো নতুন এক যাত্রীর ভিড়ে।