Mar 31, 2023

জয়িতা ভট্টাচার্য

পিঞ্জর

যদি ছায়া হতে পারতাম 
যদি ওই দুটি গালে চুমু 
কপালে একবার।
এক্ষুনি পাল্টে যেত সব

তারপর।সেইসব রাত নেমে এলে
দেখি আমি অন্ধকার।
চুপচাপ কিশলয় পড়ে সেই মেয়ে।
বাঁশবন চুপিচুপি বলে দেয় সব
কালো কালো পথ গড়িয়ে যায় গর্তে
টর্চের আলো।হ্যারিকেন দপ দপ করে।
আকাশ আর মাটির মাঝে সেইসব
শূন্যে ঘোরতর স্মৃতি যায় আসে।সেও আসে।
চাঁদ মাখা সে প্রবেশ করে ভোরের ভেতর।
আলো নেই।এখানে আর আলো জ্বলে না।
ক্ষমতা আর পরাক্রমের 
শুনশান ইতিহাস লেখে।আকাশ আর মাটির মাঝে। 
তোমাকে ভেবে চোখের জল
ভেসে গেল 
 রূপকথার মতো,বিষণ্ণ সন্ধ্যা এলে ভাবি
তোমাহীন কোনো 
 মুক্ত জীবনের কথা।

বৃন্দাবনী সারং

জয়িতা ভট্টাচার্য 

ছড়িয়ে দিচ্ছ বেলি ফুল, মানভঞ্জন  পালার শেষে হরির লুঠ।
প্রেমের রস গড়িয়ে যাচ্ছে ওয়াটস্যাপ  থেকে ভিডিও কলে।ব্লক।
কলির কেষ্ট অনেক।
মেলে দিচ্ছ মনোহারি পণ্য,  একটা চুমুর সঙ্গে আরেকটি বিনামূল্যে।
দূর থেকে দেখে নিচ্ছি জল উঁচু জল নিচু।ভয়ঙ্কর ঈর্ষাক্রান্ত তোমার ঠোঁটের প্রান্তে লেগে  রক্তের মতো বিস্ময়।
পোড়ে বনস্পতি...
পুড়ে ছাই হয়ে যায়!

সারা আকাশ ঘুরে
কুলায় ফেরত ক্লান্ত পাখি দেখে পার্ক স্ট্রিট শান্ত এখন।

মায়া রানী মজুমদার

স্বর্ণলতা

হেলে দুলে চলি, আমি স্বর্ণলতা, 
মম দেহে নেই স্থান কোন পাতা।
স্বর্ণের মত রঙ, যেন আমি রাণী, 
শোসকের মতো আমি রস টানি। 
বর্ধিত হই আমি  পর'গাছা হয়ে, 
কেঁপে উঠি ঐ ঝঞ্ঝাবায়ুর ভয়ে।
ধীরেই বেড়ে উঠি, বৃক্ষ রস চুষে, 
বৃক্ষ কিন্তু  মোরে  নাহি প্রত্যাশে।
অত্যাচারে করি  জর্জরিত তারে, 
নীরবে সয় কষ্ট বলিতে না পারে।
ডালা থেকে ডালায়  করি বিস্তার, 
বৃক্ষ ভাবে  মনে আর নাই নিস্তার।।
থাকি আমি দিব্যি, রস চুষে নিয়ে।
বৃক্ষ চুষে মাটি থেকে শিকড় দিয়ে।
ঝড়ের বেগে হেলে দুলে থাকি ভয়ে, 
ঝড় বিনা করি না ভয়,থাকি নির্ভয়ে।
কাঁপে বুক ঝড়ের'ই তান্ডব লীলায়, 
সদা মনে ভয়, যদি খসে পড়ে যায় ? 
পরগাছাদের দেহে নেই তেমন জোর, 
অপরের রস চুষে রাত্রি থেকে ভোর।

লালমিয়া মোল্লা

এসো জ্যোতির্ময় 

এসো, 
গাঢ় হিম অন্ধকার শেষে 
এসো আমার আলো--
হেমন্তের শিশিরে ভিজে 
বুলবুলির ঠোঁটে, 
আম-মুকুলের গন্ধ গায়ে মেখে 
সজনেফুল-শুভ্র আমার আলো--

এসো আমার জলচৌকির ঘরে। 

এ ঘর আমার বাপ-পিতামোর ঘর
গোবর এনে ঠাম্মা দিত লেপে, 
মায়ার ছোঁয়ার স্পর্শ অতঃপর--

চৌকি জুড়ে হিম-সন্ধ্যার বাস
শিরদাঁড়াতে অবাধ্য এক স্রোত, 
একটি কেবল সঙ্গী আমার আছে
গল্প শোনায় মধ্যরাতের পেঁচা। 

ছয় বেহারার পালকি চড়ে এসো
বন্ধু আমার দীপ্ত জ্যোতির্ময়--
ঘাস-শিশিরে ধুইয়ে দেব পা, 
আঁধার ঘরে চাঁদের অভ্যুদয়।

এসো, 
আমার সূর্য-সোনা বন্ধু এসো
এসো আমার হীরকদ্যুতি আলো। 

তুমি আসবে বলে 
ঝড় উঠেছে মাতাল বেহালায়
আর সেতারে আগুন ঝলমলালো।

গোপী নাথ ঘোষ

গঙ্গাস্নানের বদ্বীপ

পৃথিবীর মানচিত্র বদলে দেবো আমি
কোন যুদ্ধের দামামায় নয়
নয় কোন ধ্বংসের হোলিখেলায়।
মানচিত্র বদলে যাবে ভালোবাসার বসন্তে 
ঘৃনার বদলে ছেয়ে যাবে মাঠ গোলাপের সুগন্ধে।
শুধু থাকবে মানবতার গান
শিশুর কলকাকলিতে মুখরিত প্রাণ।
স্নেহের দুপুর হবে তপ্তপ্রেমের মরু
সবুজ পাতার ঝিরিঝিরি তরু। 
সুরের মূর্ছনায় ঢেকে যাবে সব বেদনার রঙ 
মানবতায় ঘেরা প্রাচীন শহর।
যে শহরের নাম ছড়িয়ে যাবে দিকবিদিক
অনাথের নাথ হবে, হবে অন্নপূর্ণা 
প্রেমময়ী গঙ্গাস্নানের বদ্বীপ। 
প্রাচীণ রোম হতে মেসোপোটেমিয়া 
সিন্ধু থেকে নীলনদ, হালের সুইস হতে প্লেটোর গ্রীস, শেকসপিয়ারের ফরেস্ট অফ আর্ডেন হবে এ বদ্বীপ।
যেখানে তুচ্ছ আচারে বিচার হবেনা
প্রেমিকার করা চোখের শাসন হবে নিশ্চিত । 
লুটেরা সব প্রেমিক হবে
গায়ক হবে রাজনীতিবিদ।
শংখচিলের মতো আকাশ আমার 
তুমি হবে গাংচিল। 
মাঘের শেষে ফাগুনের মতো
এ ধরাকে হতেই হবে এমন একদিন।

প্রতীক হালদার

শান্তি খুঁজি 

ক্লান্তি বলে শান্তি খুঁজি 
চল না ছুটি চাই,
ঘুমের দেশে একটু ঘুরে 
সুখের হদিশ পাই।

কড়া নিয়ম প্রতিদিনই 
পাল্টে ফেলি চল,
নতুন রঙে স্বপ্ন এঁকে 
মনের কথা বল।

নদীর ঢেউয়ে রাস্তা মেপে 
একটু ঘুরে আসি,
মেঘলা বেলার  পাহাড়টাকে 
বড্ড ভালোবাসি।

চল না ছুটি দুজন মিলে 
ওই পাহাড়ের গায়,
পাহাড় ঘেঁষা সূর্যটাকে 
একটু কাছে চাই।

চল না উড়ি ঘুড়ির সাথে 
মুক্ত হয়ে আজ,
আবার হবে সময় করে
জমানো সব কাজ।

প্রদীপ কুমার মাইতি

কৃষক সর্বহারা

ঘরে ঘরে সবার অন্ন
যোগায় কৃষক ভাই,
মাটির বুকে ফসল ফলায় 
মাটি জীবন তাই।

সারাজীবন কাটে তাদের 
অশ্রুসিক্ত জলে,
তাদের ব্যথা কেউ বোঝেনি 
চাষাভুষা বলে। 

রাজ গৃহ চায়নি তারা
বিলাসব্যসন ও নয়, 
চায়নি তারা কোরমা পলাও
ভাত দুমুঠো চায়।

ধরায় যত বৃক্ষ লতা 
তুলছে মাথা তারা,
কৃষক ভাইয়ের জন্য মোদের
সবুজ বসুন্ধরা। 

ঋনের বোঝা মাথায় নিয়ে
কৃষক সর্বহারা,
শত আঘাত বুকে ঢেকে 
ফসল ফলায় তারা। 

গর্জে ওঠো কবির কলম
প্রতিবাদের ভাষা,
শৃঙ্খল ছিড়ে অধিকারে তারা
দেখুক নতুন দিশা।

রীতা চক্রবর্তী ( লিপি )

ঋতুরাজ বসন্ত

শহরের ব্যস্ত জীবন থেকে
উত্তুরে হাওয়ার ছুটি হয়ে গেছে অবশেষে,
দীর্ঘ শীত ঘুম শেষে শহর জেগেছে
ঋতুরাজ বসন্ত এসেছে চিরায়ত অভ্যাসের বশে।
দখিনা বাতাস চামর দোলায় 
কৃষ্ণচূড়ার ডালে 
পলাশ শিমুল রাঙা শাড়ি পরে
শুধু প্রেম পিরিতির কথা বলে।
ঝরা পাতা উড়ে এসে গায় বিরহের গান 
কানেকানে কত কথা বিচ্ছেদে মৃয়মান।
হঠাৎ একটি পাতা ঝরেই বলে,
আম্র শাখে ডাকছে বসে  
কোকিল নাকি সই?
ডাক না তাকে এই আসরে 
মনের কথা কই!!

মীনাক্ষী চক্রবর্তী সোম

পিছুটান

সেদিন তোমাকে দেখেছি নতুন করে
নীল পাহাড়ের দেশে, পথিকের বেশে।
কিছুক্ষণ কেটে গেছে অপলক 
কেমন আছি --- জানতে চাইলে কৌতূহলবশত
থরথর কেঁপে উঠেছি, জবাব ছিল না কোনও
যন্ত্রহৃদয় তোমাকে আজও জানাতে পারিনি  
বুকের মধ্যে রাগ বিরক্তি জমাট বেঁধে 
চাপ চাপ কষ্টবাসা তৈরি হয়েছিল সেদিন 
উজাড় করে দিতে চেয়েও
তোমার পাথর বুকে ছিলনা ঝরনা 
তুমি চেয়েছিলে চরাচর জুড়ে শুধু অবকাশ যাপন।
সে এক সময় ছিল, 
আঁকড়ে ধরতে চেয়ে কেঁদেছিল প্রাণ
উদাসীন হৃদয় ভালোবাসায় বাঁধতে জানেনি।
আজ পর্ণমোচী বসন্ত দিনে ডেকেছ যখন 
আমায় জড়িয়ে রাখে অদৃশ্য অক্টোপাস পিছুটান ।।

দীপান্বিতা পান্ডে দীক্ষিৎ

আকাশের বুকে

নূতন কিছু না সৃষ্টি হলে দিনটা কেমন যেন লাগে ,
যা কিছু হোক ভাল মন্দ সমান সমান নূতন অক্ষরেখায় ৷
নিজের সৃষ্টি ধুমকেতু উপহার কালক্ষেপের ইতিহাস,
একদিন সব কিছু মানে খুঁজে পাবে তার আবিস্কারের ৷
নিয়মেরই বেড়াজালে এধার ওধার চারপাশে
অর্থ দিয়ে অনর্থের পরিমাপ৷
দুরে সরে থাকা বারেবার 
মনের  আকাশ থেকে '
সেই আকাশে চাঁদ সূর্য তারারা বাঁচে নিজের সরল রেখায়৷
অনেকেই অনেক অণু পরমাণু মন খোঁজে নক্ষত্রের আলোকে,
তাদের নামের ঠিকানা কেউ পায় কেউ হারায় কেউ শুধু খুঁজে মরে ক্রমাগত অনিশ্চিত ঠিকানা,
একটু বাঁচার আশায় ৷
 কেউ বেঁচে থাকে উজ্বল তারকায় ,
আর কেউ সুদুর আকাশের বুকে শুধু ভেসে বেড়ায় বৃষ্টি ঝরাবে বলে ৷

ছন্দা দাম

ফিরে যাই

বেদনার কাছাকাছি সেই গভীর হৃদয় পুকুর ধারে...
একটানা বিষণ্ণতার ঝিঁঝিঁ ডাকা দুপুরে
একা আমি আর আমার হারিয়ে যাওয়া মন...
টুপটাপ পাথরের মত যেন স্মৃতির তারা খসে পড়ে।

অজান্তে হারিয়ে যাবে... বুকের বাঁদিকের জমিনে
স্বপ্ন সোঁদা মাটিতে নিকানো ঘরটার অস্তিত্ব,
আমি শুধু হাসি অজ্ঞতার হাসি,সবই অনিত্য জানি তবু ইচ্ছে তুলিতে রাঙাই দিন অনাগত।

ব্যথাদের আদরে সযত্নে আগলে রাখা পাঁজরে...
ছোট্ট মায়াময় একটা দেরাজে চিরকুট রাখা,
অভিমানি আমিটা সেইখানে লুকানো অন্তরালে...
খুলে দেখা হয়নি কখনোই.. কি এতে লেখা!!

দুর্বোধ্য কথার যানজটে ফেঁসে পৌছানো হয়নি...
নির্জনতায় ঘেরা সেই জানালার ধারে,
আলপিন পড়া নিস্তব্দতায়...ডেকে ফেরে...রোজ
সহজিয়া আমিটাকে এমন করে...ইচ্ছে হয় যাই ফিরে।

রিপন সিংহ

বিহগ উড়ে

হে প্রিয় তুমি এলে কিভাবে
পাঠাল কে 
কোন হেতুতে পাঠাল
কেন এসেছো!

কোন গোত্রে মিশবে
কতটুকু ফিরবে
কে তোকে পথ দেখাবে
জান কে তুমি?

মানব জীবন, বিহগের ভোগ সন্ধান
মানব জীবন কেনাবেচায় আসা।

পামেল উর্বীরূপে আঁধার কাটে
প্রাচ্যের আলোতে দিশা হারিয়ে উড়ে
কোন্ এক অজানা দেশে।

যেয়ো না নভশ্চর 
তুমি গেলে আর আসবে না
হা মনের বিহগ কার সাধ্যি তোকে কয়েদি করে
তুমি গেলে কে থাকবে এই ঘরে!

যমুনার তীরে বাঁশিতে রাধা রাধা
এই ডাক ভুলে যেয়ো না তুমি
যেয়ো না ভুলে।

পাপিয়া দাস

কি লিখব বসন্ত বিকেলে?

বসন্ত সংখ‍্যায় ত্রিধারা পত্রিকায় 
লিখতে বসেছি বসন্ত বিকেলে-
কি লিখব ভাবতে ভাবতে
চলে গেলাম স্বপ্নদ্বারে---
আজ লিখব আমার ত্রিধারাকে নিয়ে
অনেক লেখা তোমায় নিয়ে
বসন্ত বিকাল বয়ে যাবে তবুও শেষ হবে না লেখা।
যাকে কাছে পেয়ে আমি ফুটতে শিখেছি
যার কারনে লোকে আমায়
একবার হলেও  কবি বলে আখ‍্যা দেয়
যদিও  এখনো আমি কবি হতে পারিনি
কিন্তু যে বসন্তের কারনে আমার  চারপাশে 
এদিক ওদিক জুড়ে ফুলের   সুবাস
যার ডালে বসে আমি উড়তে শিখেছি
পেয়েছি অনাবিল  আনন্দ 
পেয়েছি যার প্রতিটি নিঃশ্বাসে বিশ্বাসের গন্ধ
আজ বসন্ত বিকালে মনে পরছে
ত্রিধারার পরিচয়,প্রকাশিত বই
আর বইমেলার সব ইতিহাস।
রক্তিম পলাশের মতো 
ফাগুনের দিনে তুমি নতুন নতুন সাজে
সেজে ওঠো  রঙীন সাহিত‍্য জগত হয়ে
সেই রঙে সাজিয়ে দাও দেশ বিদেশের সাহিত‍্য 
নাম যশ ছড়িয়ে  পড়ুক
পূর্ব -পশ্চিম -উওর আর দখিনের  হাওয়ায়।

গীতশ্রী ভট্টাচার্য্য

খোল

খোলের আওয়াজে এখনো বুকের ভেতর থরথর করে কাঁপে অর্জুনের। তবে এখন সামলে নেয়। অচেতন হয়ে পড়েনা। 

খাঁটি বৈষ্ণব বাড়ির ছেলে অর্জুন। বাড়িতে রাধা গোবিন্দের নিত্য সেবা, ভোগ রাগ, আরতি কীর্তন। বিশেষ তিথি গুলিতে প্রহর ভিত্তিক কীর্তনের ব্যবস্থা। সব মিলিয়ে মধুর দিনযাপন। 

পাশেই রাই দের বাড়ি। একসাথে পড়ে ওরা, একই স্কুল, এক ক্লাস। দুটো বাড়ির মধ্যে দারুণ ভাব। আসা যাওয়া লেগেই থাকে। রাই দিনে চার পাঁচবার ওদের বাড়ি ছুটে ছুটে আসে। অর্জুনের ও ওদের ঘরে অবাধ যাতায়াত। 

রাই শান্ত, অর্জুন উচ্ছল। দুজনের মধ্যে গাঢ় বন্ধুত্ব। 

সেদিন দোল পূর্ণিমা। অর্জুন দের বাড়ি মন্দিরে পূজো, কীর্তন চলছে। সকাল থেকেই ব্যস্ততা। ভোগ রান্নার সুগন্ধে ম ম করছে গোটা পাড়া।

রাইকে আবির দিতে ছুটে যায় অর্জুন।  বাধা পায় , এই প্রথম। আশ্চর্য অর্জুনের চোখের সামনে ভেতরে চলে যায় রাই ।

কাকিমা এসে বলেন, এই নে মিষ্টি মুখে দে। রাইর বিয়ে ঠিক হয়ে গেছে রে। ওরা বিয়ের পর ওকে পড়াবে কথা দিয়েছে। খুব ভাল চাকরি করে ছেলে।

অর্জুনের কানে কী আদৌ কোনো কথা ঢুকেছে! বিয়ে হবে রাই র, এরচেয়ে মিথ্যে কথা যেন আর কিছু হতেই পারেনা।

একদৌড়ে বাড়ির নাট মন্দিরে ঢোকে। তখন মহা সমারোহে কীর্তন চলছে। খোলের মহানাদ। অচেতন হয়ে পড়ে অর্জুন। 

তারপর অনেক কথা, অসুস্থ অর্জুনকে ডাক্তার দেখাতে নিয়ে যাওয়া হয় শহরে। মনোবিদের পরামর্শে, ওষুধে ধীরে ধীরে সেরে উঠে। কিন্তু , ওই খোল , মৃদঙ্গের আওয়াজে বেসামাল হয়ে পড়ে আজও।

বিয়ের পর রাইয়ের সাথে দেখা হয়েছে কয়েকবার। ওরা দুজনে কেউ কাউকে কোনোদিন ভালবাসার কথা বলেনি, কিন্তু তাও দুজনেই জানত যেন ওরা পরস্পরের।  সেই অল্পবয়সে প্রকাশ করে উঠতে পারেনি নিজেদের ভালবাসা।

রাই বাপের বাড়ি এলে অর্জুনের কাছে ছুটে আসে। এক ঝলক দেখা, দুটো কথা আর দীর্ঘশ্বাস ফেলা ছাড়া কিছু নেই। অর্জুন নিজের স্ত্রীকে বলেছে সাবকথাই। রোহিণী বোঝে, কিন্তু কোথাও ওর মনেও একটা কাঁটা বিঁধে থাকে।

মনেহয়, স্বামীকে পুরোপুরি সে পায়নি। খন্ডে বিভক্ত ওর অর্জুন। মহাভারতের অর্জুনের মতই। তবু, মন প্রাণ দিয়ে আগলে রাখে ওকে। ভালবেসে, যত্নে, মমতায়।

রাই এখন অর্জুনকে দোষারোপ করে মেসেজে, কখনো ফোনে। এত বছর পর না পাওয়ার বেদনা যেন ওকে আগ্রাসী করে তোলে। প্রবল ভাবে সে কামনা করে তার ভালবাসার প্রথম পুরুষকে। 

অর্জুন অবসাদে ভোগে। নিজেকে সত্যিকরের  অপরাধী ভাবতে শুরু করে। মনে হয়, রাইকে সে ঠকিয়েছে। ঠকিয়েছে রোহিণীকেও।  নিজের অন্তর্দ্বন্দ্বে নিজেই ক্ষত বিক্ষত হয়। 

এখনও ফাল্গুন আসে। দোল পূর্ণিমা আসে। বাড়িতে পূজো, কীর্তনের আয়োজন চলে। 

অর্জুনের শুধু মনে হয়, বিগ্রহের বেদিতে যেন শ্যামের পাশে রাই নেই। শূন্য পড়ে আছে সেই স্থান।

উফফ, আবার খোলে চাপড় পড়ে।

শ্বেতা_ব্যানার্জী

ভাবিকাল

ভোরের লিকার চায়েও দেখি অন্ধকার 
ঠোঁট রাখতে ভয় পাই কাপে, 
পাছে অন্ধকারে মেশে আমার শরীরে.... 

হারিয়ে গেছে দোল পূর্ণিমার রঙ,
হারিয়েছে দোলনচাঁপা, পোড়া অশ্বত্থের ছায়া মেখে 
শুন্যতায় চোখ রাখে কালপ্যাঁচা।

স্ব-ইচ্ছায় হারাচ্ছে বনস্পতির বন ছায়া, 
কাকেরা হারাচ্ছে বাসা, গৃহস্থ সংসারে 
তাদের নিত্য যাওয়া আসা..। 

এখনো লিকার চা হাতে বসে আছি,
সময়ের নড়াচড়া স্তব্ধ এখন 
স্থবির আসবাবপত্রের মতন। 

প্রযুক্তির জটাজালে  সভ্যতার চিরুনি 
আঁচড়ে চলে সমকালের খেদ।
তবুও নিরুত্তর  উপগ্রহ। 

স্নায়বিক উত্তেজনা ছড়ায় ভাবিকাল
বর্তমানের কোলে বসে...।
আমারও নিরুচ্চার ঝুঁকি না নেবার ঝোঁকে...। 

আমরা অপেক্ষামান শান্তির খোঁজে 
শান্তিরা ডানাঝাপটায় বন্ধ খাঁচায় বসে
বলে গ্যাছে ভোর চুপিসারে 
আমি ফিরবো শিশুর কান্না হয়ে ------

চন্দ্রা বিশ্বাস

কালি-কলম-মন 

মন-মানচিত্রের উপর দাঁড়িয়ে 
ঠিকানা হারিয়ে ফেলি বিশ্ব-জমানায়,
ভাবনার গতিপথ সড়কের ধুলোমাটিতে 
মায়া-মোহের স্মৃতিতে গড়াগড়ি খায়।
বনপথে পথচারীর কাঁধে হাত রেখে
মন-পথিক শিল্পীর তুলিতে ছবি আঁকে,এঁকেই যায় ,
খড়ের চালায় ঢাকা, মাটিতে নিকোনো রোয়াকে বসে 
অবোধ মন-শিশুর অবাক দৃষ্টিতে  ভেসে ওঠে ,
কৈশোরের হাডুডু, এক্কাদোক্কা আর শান্ত নদীতে বন্ধুরা মিলে একসাথে ঝাঁপাঝাঁপি।ইলেকট্রিকের তারে বসে ভাবুক
কাক খাবার খুঁটে খেতে ভুলে যায়,
ফাঁকা পথে উদাস রিকশাওয়ালার
অযথা প্যাঁক প্যাঁক শব্দ। 
ভাঙা বাড়িটার কানাচে লুকোনো মা-বিড়ালের 
সদ্য চোখ ফোটা বাচ্চাগুলোর অসহায় চাহনি ,
ঘুলঘুলিতে খড়কুটোর বাসায় প্রেমলীলায় মগ্ন চড়ুই-দম্পতী।
খেজুর গাছে বেঁধে রাখা রস- চুয়ানো মেটে কলসীটা,
স্টেশনের সিঁড়ির পাশে বসে থাকা অভাগা ভিখিরীর 
বাড়িয়ে দেওয়া হাতটা।
মনের মণিকোঠা থেকে উঁকি মারে 
এমনই কত শত বিস্মিত বিমূর্ত স্মৃতিরা,
অসহায় মন তখন স্বপ্ন ও সত্যের দোলাচলে।
           

সুচরিতা পাটারী

জিন প্রবাহ

স্বর্ণলতার বাহ্যিক রূপ আর কোমলতায় মুগ্ধ হয়ে ঠাঁই দিয়েছিলাম,
কিন্তু মূলে চির ধরতেই বুঝেছিলাম সে চোষক অস্ত্র বহন করে।
এক সমুদ্র অভিমান আর অভিযোগ নিয়ে যখন পথচারী হলাম,
পথের পাশেই দেখি খাটো মসৃণ একজাতীয় গাছ,
যার পাতাগুলো ছিলো ভেতর থেকেই মখমলে। 
আমার বয়ে চলা সমুদ্র সে সিক্ত করে নিলো নিমেষেই।
তাঁর আবার জিনগত তেজ আছে।
সম্পূর্ণ বিশুদ্ধ,কোনো খাদ নেই সেই তেজে।
দোষ কেবল, সে বড্ড অবুঝ বড্ড খামখেয়ালি তাঁর।
 জল শিথিল হতে হতে যখন ভারী মেঘ জমে গেলো,
মখমল তখন আর সেই ভার সইতে পারলো না।
ভেঙে খতিয়ে দেখলো না মেঘের জলবিন্দু।
 ঘাড় ফিরিয়ে বুঝিয়ে দিলো,
জল ধারণ তাঁর জিনে নেই।
 কিন্তু জলের স্পর্শ পেতে পেতে যে একটা সময় জিন বদলে যায়,
সেটুকু তাঁর খেয়ালে নেই হয়তো।।
 তবু মসৃন-মখমলে-সৎ কচু গাছটিকে, 
যথাসম্ভব বাঁচতে দেওয়াই আমার মনুষ্যত্বের জিন ধারা।।

শর্মি দে

 কথামৃত

থামতে শেখোনি!
এই ছিল তোমার শেষ আপ্তবাক্য।
জবাব দিতে পারিনি।
সে যে বোহেমিয়ান, থামতে শেখেনি! স্রোতে প্রতিস্রোতে বহে চলেছে সে--
সাগর পেরিয়ে দিগন্ত ছুঁতে চায়!
অথচ তুমি তাকে চিনতে পারলে না।
চিনতে পারলে না তার জীবন আকরিকের ভাস্কর্য!
এমনকি জানার চেষ্টাটুকুও করলে না তোমার অন্তর্দৃষ্টি দিয়ে!

তুমি বারবার বলেছিলে,
সে আত্মশ্লাঘাতে ভরপুর।
না--, তোমার বিচ্ছিন্ন ভাবনা সম্পূর্ণ ভুল!
তার অসম্পূর্ণ সত্তাটা তোমারই অববাহিকার ঘাটে পাবে কোজাগরী পূর্ণতা, 
আর সেই ঘোলাটে স্বপ্নেই ছিল সে আবেশিত!
নিবিড় নিলয় অলিন্দে বেড়ে যায় তার রক্তপ্রবাহ তোমার অতলান্তিক আনকোরা আকুলিবিকুলি স্পর্শে, বার--বার।

দীক্ষিত করেছিলে ভোরের মন্ত্রে,
বলেছিলে কবিতায় ডুবে যেতে,
যে কবিতার পরতে পরতে খোদাই আছে খাজুরাহোর কথামৃত।
তবেই প্রতিধ্বনিত হবে অনুচ্চারিত শব্দে পড়ন্ত হৃদয়ের জীবন্ত জিজ্ঞাসা!

জানো, বড্ড জানতে ইচ্ছে করে, তুমি কেমন আছো?
বই পড়ছো ?
সঞ্চয়িতার মলাট ছিঁড়ে অস্থিকঙ্কাল বেরিয়ে গেছে,
তবুও বারবার তাকেই পড়ছো!
পুরোনো ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে নতুন করে কিনে আনো
         চোরাবালির কথামৃত!

সোনালী মণ্ডল

রাঙিয়ে দিয়ে যাও

আমার নিষিদ্ধ প্রেমের হাতছানিতে,
তুমি বেলা শেষের আপেক্ষিক মোহ,
ভোরের সতেজ স্নিগ্ধ আলোয় থাকি,
কলঙ্কের চাদরে ঢেকে এক নির্লজ্জ বদনামি।
তোমার আঁচড়ের ক্ষতে তৃষ্ণার  প্রলেপে,
গুছিয়েছি সযত্নে স্মৃতির এক মহাকাব্য।
ভেসেছি অনবরত উজানের অকৃপণ টানে,
মরীচিকার মায়ায় ঘর বাঁধি চুপিসারে।
আমার অব্যক্ত ভাষায় উন্মুক্ত দ্বারে,
নির্লিপ্ত বিনিদ্র নির্ভীক প্রতীক্ষমান প্রহরী।
স্বাগত তোমায় প্রস্ফুটিত সুগন্ধ সৌরভে,
রাঙিয়ে দিয়ে যাও সম্পর্কের স্বীকৃতির রঙে।

সুপ্রতিম ভৌমিক

বসন্ত আজ জাগ্রত ধরার পরে

মধু বসন্ত আজ
ফাগুনের ডাকে
জাগ্রত ধরার পরে,
কুহুতান সদা কর্ণে বাজে,
রাঙা পলাশ, শিমুল, কৃষ্ণচূড়া,
কাননে বিরাজে,
পুষ্পোদ্যানে পুষ্প রাশি রাশি
ছড়ায় মাধুরী,
সৌরভ মনোহরন ।
উতলা পবন মাঝে মাঝে
নৃত্যে উঠে মেতে,
মৃদু মৃদু বহে 
দখিনা মৃদুল সমীরণ ।
ধরনী যে হাসে
রঙ্গিলা হোরীর আশে
কুঙ্কুম আবীর ফাগে,
বিচিত্র বর্ণা বসন্ত নির্যাসে
রাঙিয়া উঠবে কখন ?