Jul 29, 2022

প্রীতম চক্রবর্তী

নীল পাখি 

সেই শিশির ভেজা প্রভাতে,
একঝাঁক স্বপ্ন নিয়ে ভেসে আসতো 
নীল পাখিদের দল ।
তাদের ডানা ঝাপটানোর শব্দে,
আমি অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে দেখতাম ।
আকাশ তাদের আগলে রাখতো ।
সেই হিজল গাছটায় তারা
মধুর সুরে ডাকতো ।
আর আমি বসে বসে শুনতাম গাছের তলায় ।
বদ্যিদের পদ্মদীঘিতে ওরা স্নান করতো ,
আমি পদ্মপাতায় ফণির খেলা দেখতাম । 
নীল পাখিরা ছিল কৃষকের বন্ধু ,
জমির কিট, পোকা সব খেয়ে নিত ।
ভোরে ফুল দিয়ে গৃহস্থের আঙিনা ভরিয়ে দিত ।
সাঁঝের বেলায় আঁধার নামলে 
উড়ন্ত ফ্যারিস্তাদের মতো দল বেঁধে ওরা
চলে যেত সেই নীল পাহাড়ের দেশে ।
তারপর বহু বছর কেঁটে গেলো ।
হিজল গাছটা কেটে ইমারত হলো ,
পদ্মদীঘির এখন চিন্হমাত্রও নেই ।
আমি এখন দূষণের প্রদূর্ভাবে 
তিলে তিলে প্রহর গুনি,
টেলিভিশনের নীলপর্দার আড়ালে,
নীল পাখিদের গল্প শুনি ।

প্রতীক হালদার

 ব্যায়াম করো 

একটু ছুটে,একটু হেঁটে
একটু ব্যায়াম করে,
শরীরটাকে যত্ন করে 
নাও না সবাই গড়ে।
রোগ গুলো সব ঘুরছে কেবল
সবার আশেপাশে,
সাবধানেতে না থাকলে 
এগিয়ে ওরা আসে।
সাহস দেখাও রোগকে তুমি 
ভয়টা তবে পাবে,
শরীরটাকে বাসলে ভালো
পালিয়ে ওরা যাবে।
চোখটা মেলে রোজ সকালে 
একটু ব্যায়াম করো,
মুক্ত বাতাসে শ্বাসটা নিয়ে 
হৃদয়ে খুশি ভরো।
কমবে ওজন,থাকবে ভালো
চিন্তা নেবে ছুটি,
দেরি না করে নিয়ম করে
কোরো হাঁটাহাঁটি।

অম্পিকা পাল

মন্দির - মসজিদ

আমি একদিন মনানন্দে মাসির বাড়ী যাচ্ছি --
অবাক কাণ্ড! পথের মাঝেই আত্মীয়দের পাচ্ছি।
পুরো গাড়ীতে নিজেদেরই লোক,আনন্দ নয় স্বল্প ;
মহানন্দে সবাই মিলে শুরু করলাম গল্প।
দেখতে পেলাম পথের মাঝে মসজিদ একটি দাঁড়িয়ে,
চোখ মন তখন গেলো আমার সেইখানেতে হারিয়ে।
মসজিদের প্রতি ভক্তি যখন করলাম আমি নিবেদন,
এ কী রে -- তুই না হিন্দু মেয়ে! বলে উঠলেন স্বজন।
মসজিদের প্রতি ভক্তি কেনো?আমরা তো তা করিনা!
আমি তখন বলি,  তোমাদের কীসের এতো গরিমা?মসজিদ ওদের,মন্দির মোদের  এসব আবার কী?
আল্লা ওদের,ভগবান মোদের  এসব কেনো, ছিঃ!
ছোটো থেকেই পড়ে এসেছি স্রষ্টা এক ও অভিন্ন
আমার কাছে তোমাদের ধারণা সদাই লাগে ঘৃণ্য।
ভেদাভেদ নেই আমার মনে,সব ধর্মেই করি ভক্তি
জানো,আমার কাছে সরলতা নামক আছে মহা শক্তি।তোমাদের মন জটিলতায় পূর্ণ, তাইতো এতো যুদ্ধ 
তোমরা কি কোনোদিনই হবে না পবিত্র ও শুদ্ধ?
বাচ্চাদেরকে ভেদাভেদ শেখাও,এটাই তোমাদের নীতি
একটিবার গাওনা  স্বজন সংশোধনের গীতি।

সুব্রত ভৌমিক

 পথের সাথী
                     
আগেও দেখেছি বারকয়েক
ঐ গলির পথে।
যেখানে ধরেছে মানবিকতার পচন।

ফুটো নৌকার বিলাসে
ফুল সমাধির আলিঙ্গন।
হলুদ রঙের চাপে ভ্রান্ত চাতক।

বাঁধ ভাঙ্গা ব্যথার জ্বালায় চিঁহি।
মনে মনে মরি, হে সমব্যথী,
কপাট হীন দরজার প্রাণে।

টুকরো কাঁচে দেখা আশার ছবি,
অনাকাঙ্খিত বৃষ্টির ঝাঁকে, আবার শুরু
লুকোচুরি কুয়াশা দৃষ্টির।

চাঁদহীন মিত্রতায় শুধু আঁধার।
আমিও সেই কাকের লাশ,
অকৃত পথের সাথী।

মিঠু মল্লিক বৈদ‍্য

নতুন সখ‍্যতা

বেশ কাটছিল দিন
তৃপ্তির আনন্দে আর অতৃপ্তির অবসাদে।
কুঁড়িয়েছি কত ভালোবাসার ফুল
সফলতার মালা গলে হেঁটেছি পৃথিবীর পথে,
অবজ্ঞার স্বাদ ও নিয়েছি শতরূপে শতবার।

শূন‍্য হতে সিন্ধু,সিন্ধু হতে মহাসিন্ধু
সবটুকু দিয়েই চেয়েছি এগিয়ে যেতে।
অবজ্ঞা কিংবা শংসা; রেখেছি যতনে
আপন মনমন্দিরে, ভালোবেসেছি 
অতি সংগোপনে,হৃদয় দুয়ার খোলে।

কিন্তু দিনান্তে খসে যায় সকল পাওনা,
হিসাব কষাকষি জমে থাকে
হাসপাতালের বিছানায়,গড়ে উঠে
নতুন সখ‍্যতা,,,মৃত‍্যু দূতের সাথে
যদি থাকতে পারি আর কিছুক্ষণ কিছুটা সময়,

মায়াবী পৃথিবীর মায়ার বাঁধনে।
কত ধন,কত জন, কত সাঁজ, কত বাহার
কত অহং,কত সম্মান,কত গুণ, কত দোষ
সবটাই আজ হল ইতিহাস,একাকীত্বই সাথী
ধবধবে বিছানায় মৃত‍্যুর প্রহর গুনি
মৃত‍্যু দূতের সাথে নতুন সখ‍্যতা গড়ি।

বিক্রমজিৎ সাহা

সাপিনী

ঘন গভীর গরম শ্বাস
পড়ছে লোমশ বুকে
সাপিনীর বিষাক্ত নিঃশ্বাস।

আহাঃ সাপিনী 
সেও একাকিনী;
নিরব নিঝুম স্বজনহারা কুটির।
বিষময়ী দাঁতে ক্রূর হাসি...
আমি তোমায় ভালোবাসি।

সখা ওঝা তো সেজেছো
বীণ হয়েছে মুরলী বাঁশী ,
দাগ কেটেছে সাপিনী লাবন্য
আমি তোমাকে ভালোবাসি।

আষ্টেপৃষ্ঠে তোমায় লেজে পেঁচিয়ে
বুকে রেখেছে সাপিনী মাথা ;
বিষ আর ভালোবাসার ফুলে_
তারাহীন বিরাট নীল আকাশ

দীপু দেবনাথ

ঘুরি ও নাটাই 

ঘুরির গায়ে সুতো বাঁধা 
মনের কোণে তুমি!
ওরতে থাকো মনের সুখে 
ঘুরির সুতো আমার হাতে,
মেঘের কূলে ঘর যে তোমার 
থাকো আমার মনে!

বৃক্ষ সমান মন আমার 
যায় না কোথাও ওরে,
পবন তুমি আমার থেকো
ওরতে দিও ওকে।

আমার পিঠে নেই যে ডানা,
মনের সুখে উড়িয়া বেরাতাম।
দুজনে চলি দুটি পথে 
একই সুতোই গাঁথা 
বেলা শেষে এক হয়ে যায় 
স্বপ্ন যে আমাদের একেই।

ঘুরির সুতো কাটার ভয়ে 
ওরতে দেয় না বেশি,
কাটবে যেদিন সেই সুতো 
 ঘরে ফিরবে না আর কোনো দিন
শূন্য নাটাই রবে আমার হাতে 
পুরনো দিনের স্মৃতি সেজে।

রূপালী রায়

মানুষ 

আমি মানুষের ভিরে 
মানুষ হারিয়েছি কত 
খোঁজে পাই না আর ।
আমি আর খোঁজে পাই না । 
এলো চুলে ঢাকা দখিন মেরুর হাওয়া 
আমার অনেক কিছুই
উড়িয়ে নিয়ে গেছে 
আমি আর কেন খোঁজে তা পাই না । 
ভুল স্টেশনে দাঁড়িয়ে আছি 
ফিরতে ফিরতে অনেক রাত ।
যে কালো রঙ ঠিকানা হারায় 
তারে কি গো আর খোঁজে পাওয়া যায় ?
আমি মানুষের ভিরে 
মানুষ  হারিয়েছি কত 
খোঁজে পাই না আর 
খোঁজে পাই না । 
সকাল পেরিয়ে দুপুরে গরিয়ে যেতে চলেছে 
মানুষের সন্ধান আর পেলাম না । 
কেন হারাতে থাকে মানুষ 
মানুষের মাঝে থেকে 
কেন খোঁজে পাই না 
সেই মানুষ ।

ছন্দা দাম

ছুঁয়ে যেও 

ধোঁয়া উঠা এক পেয়ালা চা,স্মৃতির মুগ্ধতার ঝাপি,
নাই বা বললে...তোমায় ছুঁয়ে আমি...গহীন মনে ভালোবাসা মাপি।
তবলা বোলে কাহারবা,পর্দাঠেলে নরমআদুরে রৌদ্র
পলকে ঐ আকাশনীল ব্যথার পাহাড়,নাইবা বললে
চোখ যদি হয় আদ্র।।
ঢেউ তোলে সার্টের বোতাম ছুঁয়ে, তোমার বুকের  চুপকথাদের ক্যারাভ্যান,
মন বেদুইন দিশেহারা সারাবেলা,নাইবা বললে ঐ বুক আনচান।
উষ্ণ যখন কপাল ঘিরে মায়ার জ্বর, তোমার ছোঁয়া প্যারাসিটামল যেন,
নাইবা বললে দূরেই আছো তবু... জড়িয়ে আছো 
বলতেই হবে কেন!
হরপল কেমন বিষণ্ণতা,অনুভবে নকসীকাঁথার ওম,
নাইবা বললে,এই যে থমকে থাকা,ব্যথাদের সঠিক উপশম।
কতো কথার মিছিল চলে রোজ, স্মৃতির দ্বারে দেয়
বিনিদ্র টোকা,
নোটবুকে স্মৃতিদের গন্ধ,হাতেগড়া সেই কাগজ নৌকা।।
নাইবা বললে নিমজ্জিত কথাগুলো,ডুব সাঁতারে ঠিক নেব তুলে,
তোমার তুমি আমার কাছে বড্ড প্রিয়,থাকনা বুকে
কি হবে সব বলে?
তোমতে এই যাপিতজীবন,হারালে পাল ছেড়া নাও,
ছুঁয়ে যেও কোন অছিলায়,যদি কখনো মুহুর্ত সময় পাও।।  

নীতা কবি মুখার্জী

আমাদের প্রিয় মহানায়ক (উত্তমকুমার স্মরণে)

উত্তম পুরুষ, উত্তম আত্মা, উত্তমকুমার তুমি
আমরা বাঙালি গর্ব করি, আমাদের প্রাণপ্রিয় তুমি।
হে মহানায়ক! বাঙালির তুমি অন্তরতম ধন
অন্তরে আমরা রেখেছি তোমায়, সঁপেছি যে প্রাণমন।
তোমার গরবে গরবী আমরা, নায়কের মহানায়ক
যুগে যুগে তোমার জয়ধ্বনি দেবো, যুগান্তকারীর জয় হোক।
সম্ভ্রান্ত এক বাঙালি বলতে তোমাকেই মনে পড়ে
ভুবনমোহিনী হাসি দিয়ে তুমি রাজা হলে চলচ্চিত্র-গড়ে।
চলচ্চিত্র-শিল্পকলা ভুলবে না কখনো তোমায়
তোমার আসন শিরোপরে আজ, তোমায় প্রণতি জানাই।
নিরহঙ্কারী, সদা হাস্যময়, দুখীর দরদী তুমি
নিজ অধ্যাবসায়ে জয় করলে, বাংলার পুণ্যভূমি।
আজকে তোমায় স্মরণ করি, প্রণমি চরণতলে
শ্রদ্ধা এবং বিজয়ীর মালা পরাই তোমার গলে।

সোনালী মণ্ডল

মনে পড়ে

গত পূর্ণিমাতেও চাঁদ দেখে ছিলাম পাশাপাশি বসে,
আমাদের কয়েক দশকের খুনসুটিতে ভরা
সোনালী দিনের গল্প হয়ে ছিলো গভীর রাতের তারা দেখতে দেখতে।
খোলা আকাশের নিচে মাদুর পেতে,
বেশ জমে উঠে ছিলো গ্রীষ্মের  ক্লান্ত শরীরে
প্রকৃতির ঠান্ডা শীতল বায়ুর স্পর্শে,
ছাদের নির্জনতা ছিলো আমাদের দুই বুড়োবুড়ির
একান্তের পরম শান্তির স্থান।
কর্ম ব্যস্ততার কারণে আমরা দুজনেই,
বহুবার দুজনকে প্রশ্নের মুখে ফেলেছি
সময় না দেওয়ার অপরাধে,
যখন তর্ক যুদ্ধের লড়াইয়ে আমি
কোমর বেঁধে খুন্তি হাতে,ঠিক তখনই তুমি,
একটু আলতো চুম্বনে হারিয়ে দিয়েছো আমাকে।
শত ব্যস্ততা থাকা সত্ত্বেও কখনো তুমি
রান্নার স্বাদ অন্য হাতের থেকে  প্রত্যাশা করনি।
দিনের শেষে বাড়ি ফিরে খুঁজেছো একটা 
নরম হাতের ছোঁয়া।
পিতৃত্বের স্বাদ আস্বাদনের তৃপ্তি বঞ্চিত করেছো
আমার বন্ধ্যাত্বের কারণে,মাতৃত্বের শূন্যতা 
ভুলিয়েছো তোমার অকৃপণ ভালোবাসার জাদুতে।
যেদিন তোমার ছুটি থাকতো ,সেদিন
আমার অপেক্ষায় বারবার পায়চারি করতে
দরজা খোলার ব্যস্ততায়।
কখনো এসে দেখেছি অনভ্যস্ত হাতে,
কিছু নতুনত্বের রান্নার চেষ্টায় হয়ে উঠেছো গবেষক।
কর্ম জীবনে অবসর গ্রহন করায় দুই বুড়োবুড়ি
অফুরন্ত সময় কে ব্যয় করেছি অজানার উদ্দেশে 
পাড়ি দিয়ে অথবা দৈনন্দিন কাজে ভাগাভাগির 
অংশীদার হয়ে।
আজ তেমনি এক তারায় ভরা পূর্ণিমা,
চারিদিকে জোৎস্না রাতের আলোতে আলোকিত
 হলেও আমার পৃথিবী অন্ধকারের গভীরে।
প্রতিশ্রুতির হাতটি ছেড়ে পালিয়ে গেলে আমায়
ফেলে কোন অজানায়,এমনতো হওয়ার কথা ছিলোনা।
আজ আমিও তোমার অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে আছি,
জানলার শিক ধরে পথের দিকে তাকিয়ে,
দরজা খোলার ব্যস্ততায় অভ্যাসের টানে।
কে দেবে সাড়া কলিং বেলের শব্দ শুনে?
কে দেবে কাপড়ের আঁচল দিয়ে ঘাম মুছিয়ে?
কে দেবে মুখ ঝামটি শাসনের সুরে অবাধ্য বলে?
কে দেবে দৌড়ে এসে ঠান্ডা জলের গ্লাস এনে?
বড্ড ইচ্ছে করে অভিমানে মুখ ঘুরিয়ে রাখতে,
আর একটি বার তোমায় ছুঁয়ে দেখতে,
তোমার বুকে মাথা রেখে শান্তিতে ঘুমাতে।
জানি আর কখনোই হবেনা তর্কের বড়াই ভালোবাসার লড়াই।
আর কখনোই শুনতে পারবোনা আমার নামটি
ধরে ডাক তোমার মুখে।
কেউ ইচ্ছে করে বেধে দেবে না চুলের বেনী
তোমার মতো করে।
ভিজে কাপড়ের জল পট্টি দেবেনা কপালে
বারে বারে রাত জেগে জ্বরের কারণে।
কখনো আর সাজবনা তোমার  নামের শাখা সিঁদুরে,
বড্ড একা হয়ে গেলাম জীবন পথের পথে,
বড্ড শূন্যতা কুড়ে কুড়ে খায় একাকীত্বের ভিতরে,
বড্ড মনে পড়ে তোমার বাড়ির  প্রতিটি কোণে কোণে।
তোমার ছোঁয়া প্রতিটি জিনিস থেকে,তোমার গন্ধ ভেসে আসে,
বড্ড দম বন্ধ হয়ে আসে নব বধূর বেশে
আসা,তোমার শয়ন কক্ষে থাকতে।
তাই তোমাকে ভেবে একাকীত্বের লড়াইয়ে
হেরে গিয়ে,আজ আশ্রয় নিয়েছি বৃদ্ধাশ্রমে।
মনের ওলিগলি তে শুধু তোমার
পথচেয়ে,বারে বারে ভ্রম জাগে,জানলার শিখ ধরে দাঁড়িয়ে,
নীরবে নির্জন গভীর রাতের
পূর্ণিমার চাঁদ দেখা নিঃসঙ্গ তাকে নিয়ে।।

মৃদুলা ভট্টাচার্য

আকণ্ঠ

সারারাত জুড়ে আকাশের বুক ঝরে,
বৃষ্টি নামে পৃথিবীর কোলে
পাহাড় বেয়ে জল নামে 
ভাসিয়ে নিয়ে চলে সবকিছু 
নদীর স্রোতে প্রবাহিত কোল জুড়ে।
মানুষের হাহাকার বাড়ে 
ভেসে যায় একের পর এক!
কাঁদে শিশুরা, কাঁদে মহিলারা বাচ্চা কোলে, পুরুষেরা হাঁটে
কোমর জলে, _
মানুষেরা  যা পারে নিয়ে চলে মাথায় করে স্থলের সন্ধানে 
হিংস্র জলস্রোতে ভেসে যায় 
বাঁশ খুঁটি কংক্রিটের দেয়াল
গৃহস্থের আজন্ম সঞ্চয় সম্পদ
একটুকু খাবার সন্ধানে মানুষ করে হাহাকার খুঁজে আশ্রয়
আকণ্ঠ জলে বট গাছ আঁকড়ে পাখিরা করে চিৎকার
মানুষ মানুষ বলে তবু ধারে কাছে নেই মানুষ...!!

লিটন শব্দকর

অরণ্যদর্পণ

রোজকার অদেখায় নির্মেদ রোদ দলকলস ফুলে ঠোঁট ডুবিয়ে
চাঁপালিশের জ্যামিতিতে ঘুমোয়; বেড়োয় আবার রাত কাটিয়ে। 

চোখ মেলে জানালায় ভোর হতেই প্রতিবিম্বিত কীপ্যাড সার্থক,
বোস্তামি তরুণাস্থি কাছিমের জায়গা বদলানোর মতো সমার্থক।

বন নিজের মতো যখন, পশমি উদ- গায়ে ভেজা ঠাণ্ডা শ্যাওলা;
আন্দোলিত জলের রেণু মাখা সাদা চাঁদ হিমসুখ নাকের ডগায়,
প্রতিদিন আয়নারা এভাবেই সদ্যোজাত বয়স ফিরে ফিরে পায়।

ফানুসের চোরা ছিদ্র,বাদাম পাখির পালকের ছবি ক্যামেরাশূন্য!
লাল বাঁশ সাপের লেজের অংশ স্ক্রিনশটে থেকে যায় কিছুদিন, 
ততদিন মনে থাকে খুব বন যুথিয়াল গিরগিটির ঘাড় ঘোরানো।

অনেকেই জানে নতুন কেনা কাচের সর্বসমক্ষে ঘোলাটে হওয়া;
কুয়াশা ভেবেই ভুল ডরমার চামচিকের পুরনো আস্তানা পাওয়া-
আর একটুকরো কাচমঞ্চে রেসাস বানরের সম্বিৎ খুঁড়তে যেতে,
দুইদাগী বাশী ব্যাঙ শীতঘুমে হারায় অনর্থক চেনা বোঝার রাতে।

বৃষ্টি দাস

 একাকী

মনের জমকালো শহরটা আজ নিস্তব্ধ
কলমটাও যেনো আর চাইনা লিখতে,
তোমার পাঠানো পুরনো চিঠিগুলো
আমি বিভোর হয়ে যায় দেখতে দেখতে।

কিছুকাল আগে এ শহর ছিল ভীষণই চঞ্চল,
পাইন গাছটাও যেনো আমাদের প্রেমে মুখরিত হতো।
মাঘী পূর্ণিমার চাঁদের আলো যখন তোমায় স্পর্শ করতো
তোমাকে লাগতো ঠিক রাজপুত্রের মতোই।

আজ সেসব কোথায় যেন গেছে হারিয়ে
সঙ্গী হয়েছে কেবলই চোখের জল,
ভীষন ভালোলাগে আজ একাকী থাকতে
পুরনো তুমি টাকে ইচ্ছে হয় না আর দেখতে।

পায়েল সূত্রধর

কেউ কথা রাখেনি 

কেউ কথা রাখেনি,
আজ এক বছর কেটে গেল,
তার সঙ্গে কোন যোগাযোগ নেই ।

কেউ কথা রাখেনি,
মনের মধ্যে জমা দুঃখ,
হাসির আড়ালে লুকিয়ে রাখি।

কেউ কথা রাখেনি,
রাতের  আঁধারে পুরানো স্মৃতি মনে করে,
গুমরে গুমরে  মরি।

কেউ কথা রাখেনি,
জীবনের প্রথম ভালো বাসার মানুষটিকে,
চোখের সামনে অন্যের হতে দেখেছি ।

কেউ কথা রাখেনি,
পকেটে টাকার অভাবে অনেক,
আপন মানুষকে পর হতে দেখেছি ।

কেউ কথা রাখেনি,
নিজের সবচেয়ে প্রিয় বন্ধুকে,
সময়ের সাথে বদলে যেতে দেখেছি ।

কেউ কথা রাখেনি।

অঙ্কুর সাহা

কথাটা আর বলা হল না

আজকাল যেন 
সারাদিন আমি কোনো এক স্বপ্নে
বিভোর হয়ে থাকি ,
সে এক স্বপ্ন ,
যেখানে শুধু মোর মনের বাস
আর তোমাকে পাওয়ার আশ
জান তুমি ,
সকালে রোজই ঘুম থেকে উঠার আগে 
চোখ দুটি শুধু তোমার স্বপ্ন দেখায়
তোমার ভাবনায় রাত্রে চোখ বোজা
ও তোমার স্বপ্নে চোখ খোলা 
আমার যেন এখন নিত্য অভ্যাস
জান তুমি , দিবসে ও মাঝে মাঝে 
আমার চোখ তো তোমাকেই দেখে 
কিন্তু সমস্যা একটাই ,
তুমি যখন সামনে আমার আসো
আমি তোমাকে সেই পছন্দের কথা টুকু বলতে পারি না ,
জান তুমি , স্বপ্নে ও বলতে পারিনা
তাই ভাবলুম ,
কথায় যেদিন আমি ঠাই পাব তোমার কাছে ,
ঠিক সেদিনটাতে ,
ঠিক সেদিনটাতেই আমি বলবো সে কথাটা .....
জানো , রোজ রোজ কত শত চেষ্টা করি কথা বলার
কিন্তু , তুমি যখন সামনে আসো ...
আমি কেমন জানি নিশ্চুপ হয়ে যাই
মন চাই তখন 
অনেক কথা বলতে 
কিন্তু কণ্ঠ যেন সেই সাথটুকুই দেয় না 
যখন তুমি আশেপাশে থাকো না ,
আমি শুধু তোমার গন্ধে গন্ধে
তোমার মিষ্ট মিষ্ট বুলিতে আচ্ছন্ন থাকি
তুমি যখন কথায় মত্ত হয়ে 
একটিবার মাত্র 
আমার হাতটিতে স্পর্শ কর 
তখন যেন , কেমন 
ঠিক কেমন জানি 
মন আতুল হয়ে উঠে 
এই আতুলতায় ,
শেষে আসল কথাটাই বলতে পারি না ,
তবে একদিন ঠিকই 
মনকে মানিয়ে ,
বলবো কথাটা আর
বাকিটা হবে শুরু.....

স্বপন মজুমদার

আধুনিক গান

পায়ে পায়ে বৃষ্টি নিয়ে 
কে আসে মোর আঙ্গিনায়,
ক্লান্ত বিকেলে মেঘের আড়ালে লুকিয়ে উঁকি
দিয়ে রংধনু কি যেন বলতে চায়।

বর্ষার ভরা বুকে 
সে ছবি এঁকে,
নদী বয়ে যায় মোহনায়
মনের আবেগ বাঁধন হারা, পৌঁছে দেয় তার ঠিকানায়।

কি দেখছ আকাশ পানে
তাকিয়ে, কিছু কি আছে
চোখের সীমানায়,
কল্পনায় এঁকে আল্পনা ডুবে থাকি বিভোর ভাবনায়।

ভেবেই শুধু যাই, কিছু না পাই,ফিরে যাই হতাশায়।

কল্যানী ভট্টাচার্য্য

চাঁদনী রাতে

চাঁদনী রাতে বঁধূ হে তুমি
বসে আছ বাতায়ন খুলে। 
উদাসী মনে বসে আছ ঐ
আকাশের দিকে চেয়ে। 

প্রিয় যে তোমায় এসেছে নিতে
বঁধূ দেখ চাহিয়ে,
প্রেমের আবেসে ভেসে বেড়াও
ঐ নীল গগনের মাঝে। 

ডুবেছে চাঁদ হয়েছে আঁধার
তোমার প্রেমের পরশে বঁধূ
লাগিল যে বিরহের দোলা। 
প্রেমের গোলাপ রইল পড়ে
তোমার ঐ হৃদয় ব্যথার মাঝে। 

তাইতো বঁধূ হয়েছ আজ
তুমি কলঙ্কিনী রাধা।

মান্তু দেবনাথ

স্মৃতির পাতায়


মনে পড়ে সেই ছোট্টবেলার স্মৃতির পাতায় জড়িয়ে। 
রবিমামা ওঠার আগেই আঁখি মেলতাম হকচকিয়ে।।
জবা, করবী, টগর, শিউলি হরেক রকম ফুলে। 
আমোদ মেজাজে সাজিটা ভর্তি করে নিয়ে আসতাম তুলে।।
মনের আনন্দে পাঠশালাতে যেতাম হাতে নিয়ে বই। 
ছুটির ঘন্টা পরলেই বেরোতাম সকলে মিলে করে হৈচৈ।।
বাড়িতে ফিরেই শুরু করে দিতাম কত কি ধরণের খেলা। 
কখনো কাবাডি,কখনো লুকোচুরি ,গোল্লাছুট, কখনো হরবোলা।।
ছিলনা বাঁধা, ছিলনা হাঁক খুশিতে রইতাম মাতিয়া। হুকুম ছিল মায়ের মধ্যাহ্নের আগেই ঘরে ফিরতে হত ছুটিয়া।।
দন্ধ, হিংসা, দুঃখ তখনো তাদের সাথে হয়নি পরিচয়। 
প্রজাপতির ডানায় উড়িতাম আকাশে উল্লাসিত হৃদয়।।
কোথায় গেল মা সেই দিনগুলি রয়েছি অনুভবে?
মূহুর্তগুলো সব হারিয়ে ফেলেছি সংসারি হয়েছি যবে।।
x

সায়েম সাদাত (বাংলাদেশ)

মহাপ্রাণ বিদ্যাসাগর

২৯ জুলাই। ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের মহা প্রয়াণ দিবস আজ। বাংলা(ভাষা),বাঙালি আর বাঙালি হিন্দুর জন্য কত কিছুই যে করে গেছেন তিনি তা বর্ণনা অতীত। এ লেখা তাঁকে নিয়ে,অসীম মহাসমুদ্রকে সংজ্ঞায়িত করবার ব্যর্থ প্রয়াসকে স্বীকার করে...
রবীন্দ্রনাথের মতো বিদ্যাসাগরের জন্মও ব্রাহ্মণ পরিবারেই  কিন্তু দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের মতো ঠাকুরদাস বন্দ্যোপাধ্যায় বিত্তশালী ছিলেন না। তাই বিদ্যাসাগরকে বেড়ে উঠতে হয়েছে দারিদ্র্যের সাথে সংগ্রাম করে।
ছোটবেলা থেকেই তীক্ষ্ণ মেধাবী বিদ্যাসাগর। মাত্র চার বছর বয়সে গ্রামের পাঠশালায় ভর্তি করে দেওয়া হয় তাঁকে। আট বছর বয়সেই গ্রামের পাঠশালায় পড়াশোনা সম্পন্ন হয়। তাই গ্রামের পণ্ডিতমশাইয়ের পরামর্শে ঠাকুরদাস বিদ্যাসাগরকে নিয়ে যান কলকাতায়।সেখানে ভর্তি করা হয় তাঁকে। আর পিতৃদেব পড়াশোনার খরচ জোগাতে নিযুক্ত হন পাচকের কাজে।

কলকাতাতে ঠাকুরদাস আবাস ঠিক করলেন ভাগাড়ের নিকট। অন্ধকার পরিবেশ,চারদিক দুর্গন্ধময়। কক্ষে সূর্যের আলো প্রবেশ করে না। দিনের বেলাতেও সব কাজ করতে হয় প্রদীপ জ্বালিয়ে। রান্নাবান্না,কাপড় কাঁচা সব কাজ নিজ হাতে সম্পন্ন করেন। এসবের মাঝেই সকল প্রতিকূলতা ছাপিয়ে পূর্ণ মনোযোগে পড়াশোনা চালিয়ে যান বিদ্যাসাগর। কলেজের প্রথম পরীক্ষা,প্রথম হলেন পাঁচ টাকা বৃত্তি পেলেন।
আঠারো বছর বয়সে কলেজের পড়াশোনা সমাপ্ত করেন ।অতপর পণ্ডিতবৃন্দ তাঁকে বিদ্যাসাগর উপাধিতে ভূষিত করেন।
ছাত্রজীবন থেকেই সংস্কার পন্থী মন বিদ্যাসাগরের।স্কুল-কলেজে শুধু ছেলেদের বিচরণ। মেয়েরা স্কুল কলেজে যায় না। ব্যবস্থা নাই যাওয়ার।বিদ্যাসাগর মেয়েদের স্কুলে নিয়ে আসার ব্যবস্থা করলেন।
বিদ্যাসাগর চোখের সামনে দেখলেন অল্প বয়সের হিন্দু মেয়েদের বহুবিবাহিত বুড়ো পুরুষের সঙ্গে বিয়ে দেওয়া হচ্ছে। অল্পদিন পরেই বিধবা হয়ে যাচ্ছে মেয়েগুলো।সামজিক ভাবে অভিশপ্ত হয়ে যাচ্ছে বিধবাদের জীবন।বিদ্যাসাগর এখানেও সংস্কার  করলেন। বহু কষ্টে পাশ করালেন বিধবাবিবাহ আইন।
দেশে দুর্ভিক্ষ।মানুষের করুণ দশা। চারদিকে মানুষ মারা পড়ছে। বিদ্যাসাগর এগিয়ে এলেন।নিজের  এবং সরকারি খরচে শত শত লঙ্গরখানা খুলে মানুষের খাবারের ব্যবস্থা করলেন।
বিদ্যাসাগর তাঁর সারাটা জীবন মানুষের কল্যাণের জন্য ব্যয় করে গেছেন। কিন্তু শেষ জীবনে তিনি সেই মানুষের ওপর থেকে বিশ্বাস হারিয়ে ফেলেছিলেন। দুঃখ করে তিনি এক পত্রে লিখেছেন,"আমার দেশের লোক এত অসার ও অপদার্থ বলিয়া পূর্ব্বে জানিলে আমি কখনই বিধবাবিবাহ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করিতাম না।"
বিদ্যাসাগর বিধবাবিবাহ আইন পাশের জন্য অকাতরে লিখে গেছেন,মানুষের সমর্থন আদায় করেছেন,আন্দোলন করেছেন। এই কঠিন এক সংস্কার করতে গিয়ে জীবনের ঝুঁকি নিয়েছেন। বিধবাবিবাহ দিয়ে পাত্রপাত্রীর ভরণপোষণের দায়িত্ব নিয়ে প্রায় সর্বস্বান্ত হয়েছেন।
বিদ্যাসাগর বই লিখে উপার্জন করেছেনও অনেক। কিন্তু নিজের জন্য কিছুই করেননি। করেছেন মানুষের জন্য।এ জন্য তাঁকে দয়ার সাগরও বলা হতো।
শেষ জীবনে বিদ্যাসাগরকে বাঙালি মূল্যায়ন করেনি।সঙ্গীহীন হয়ে পড়েছিলেন তিনি। তখন তাঁর প্রিয় হয়ে উঠেছিলো রাজকৃষ্ণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রভাবতী নামের আড়াই বছরের ছোট্ট শিশুকন্যা। কিন্তু তাঁর বন্ধু তাঁকে ছেড়ে অসীমে পাড়ি জমালেন। বিদ্যাসাগর তাতে শোকার্ত হলেন,ভেঙে পড়লেন। তার স্মরণে লিখলেন প্রভাবতী সম্ভাষণ।
আসলে এই বাঙালি সংকর জাতি। ভালো-মন্দের মিশেলে তৈরি। ভালোর সংখ্যা নিতান্তই স্বল্প। সল্প সংখ্যক  ভালো লোকগণ নিমকহারাম বাঙালির জন্য ভালো কিছু করে যান। কিন্তু নিমকহারামরা কৃতঘ্ন।তা মনে রাখে না।
বিদ্যাসাগর আপনি ভালো থাকবেন।

রেফারেন্স পুস্তক:
১.বিদ্যাসাগর;সৈয়দ নজমুল আবদাল।
২.বাঙালি নারী সাহিত্যে ও সমাজে;আনিসুজ্জামান।
৩.লাল নীল দীপাবলি বা বাঙলা সাহিত্যের জীবনী;হুমায়ুন আজাদ।
৪.বাংলাদেশের ইতিহাস ও বিশ্বসভ্যতা(নবম-দশম শ্রেণি)
৫.উইকিপিডিয়া