Jul 2, 2024

জহরলাল দাস

 প্রবন্ধ 

প্রান্তিক সমাজ ভাবনায় অদ্বৈত মল্লবর্মণ

প্রান্তিক ও শ্রমজীবী জনজীবনের কথাকার অদ্বৈত মল্লবর্মণ তাঁর সাহিত্যকৃতির মাধ্যমে ফুটিয়ে তুলেছেন শ্রমজীবী মানুষের কথা, মানুষের ক্ষুধা দারিদ্র্যতার কথা।

অদ্বৈত মল্লবর্মণের জন্ম তৎকালীন ত্রিপুরার ব্রাম্মনবাড়িয়া জেলার গোকর্ন গ্রামে তিতাস নদীর পাড়ে মালোপাড়াতে।

তিনি নিজে যেমন প্রান্তিক মালো জনগোষ্ঠী থেকে উদ্ভূত তেমনি শৈশব থেকেই দেখেছেন এইসব ছিন্নমূল, প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মানুষের জীবন যাত্রা।জাল ও জলকে কেন্দ্র করেই তাদের জীবন আবর্তিত।এইসব দারিদ্র্যক্লিষ্ট মানুষের জীবন ছবি তিনি ফুটিয়ে তুলেছেন তাঁর --" তিতাস একটি নদীর নাম" উপন্যাসে।

সমাজের প্রান্তিক জনগোষ্ঠী ও শ্রমজীবী জনগণের জীবন সংগ্রামের অমর গাঁথা তাঁর এই " তিতাস একটি নদীর নাম" উপন্যাস।

এই তিতাস একটি নদীর নাম " উপন্যাসটিই হলো অদ্বৈত মল্লবর্মণের প্রান্তিক সমাজ ভাবনার একটি অন্যতম প্রামাণ্য দলিল। 

লেখক এমন একটি জনগোষ্ঠী থেকে উঠে এসেছেন এবং যে জনগোষ্ঠীর ছবি তাঁর এই উপন্যাসে বিধৃত করেছেন যারা সমাজের একেবারে প্রান্তীয় জনগোষ্ঠীর লোক।জল,জাল,জনমুজুরি যাদের বাঁচার একমাত্র অবলম্বন। দুর থেকে কোন কাল্পনিক গল্প বা উপন্যাস তিনি রচনা করেন নি কারণ বাংলা সাহিত্যে এমন নদী কেন্দ্রীক উপন্যাস আরো অনেক আছে। কিন্তু এই সমস্ত উপন্যাসের ঔপন্যাসিকরা এই জনগোষ্ঠী থেকে উদ্ভূত নয় কি‌ংবা তাঁরা ঐসব জনগোষ্ঠীর সাথে সম্পৃক্ত নয়। অথচ অদ্বৈত মল্লবর্মণ এই প্রান্তীয় জনগোষ্ঠীর এক অন্যতম প্রতিনিধি। শৈশব থেকেই দারিদ্র্যতার কষাঘাতে বড় হয়েছেন তিনি। দরিদ্র পিতামাতার ঘরে তাঁর জন্ম। স্বভাবতই তাঁর লেখক দর্পণে অনিবার্যভাবে ফুটে উঠবে প্রকৃত বাস্তবতার উজ্জ্বল প্রতিচ্ছবি এতে সন্দেহের কোন অবকাশ নেই।

তিতাসের বহমান জলধারার মতই লেখক তাঁর উপন্যাসে মালো সমাজের ছবি বিধৃত করেছেন।

তিতাস পাড়ের দারিদ্র্যক্লিষ্ট, মৎস্যজীবী সম্প্রদায় মালো সমাজের বাস।জাল ও জলকেই কেন্দ্র করে তাদের জীবন জীবিকা।

চারটি খন্ডের আটটি পর্বে বিন্যস্ত এই উপন্যাস।

খন্ডগুলির যোগসূত্র বা কেন্দ্রীয় চরিত্র বলতে ঐ তিতাস নদী যে-  "তিতাস শাহী মেজাজে চলে।তার সাপের মত বক্রতা নাই। কৃপণের মত কুটিলতা নাই। কৃষ্ণ পক্ষের ভাটায় তার খানিকটা শুষিয়া নেয়, কিন্তু কাঙাল করে না, শুক্ল পক্ষের জোয়ারের উদ্দীপনা তাকে ফোলায় কিন্তু উদ্বেল করে না।"

সমাজের প্রান্তিক জনগোষ্ঠী ও  জীবনসংগ্রামের অমর গাঁথা তাঁর এই -- "তিতাস একটি নদীর নাম " উপন্যাস। অদ্বৈত তাঁর এই উপন্যাসে দেখিয়েছেন শোষক এবং শোষিত শ্রেনীর কোন ধর্ম বা জাত নেই। উপন্যাসে তিনি তা তুলে ধরেছেন তিন বিশিষ্ট চরিত্রের মাধ্যমে। তিনি লিখেছেন --" ধনী কৃষক জোবেদ আলীর বাড়িতে কর্মরত দুই দায়বদ্ধ শ্রমিক করম আলী ও বন্দে আলী বলদ ও ষাঁড়ের মত সারাদিন জোবেদ আলীর জমি ও বাড়িতে খাটে। নিজের বাড়িতে যাওয়ার কোন অধিকার নেই। তাদের স্ত্রীরা ও অন্যের বাড়িতে কম মজুরিতে খাটে। তাদের জীবনে আনন্দ - সুখের কোন স্থান নেই। মালিকের দাস ও দাসী হয়েই তাদের জীবন কাটাতে হয়।একই অবস্থা মালো পাড়ার জেলে সম্প্রদায়ের। তিনি লিখেছেন, " বেপারী পিন্দে লেস পাইরের ধুতি,আর জাল্লার লেংটি শুকায় না।"

মহাজনী শোষনের এক নির্মম চিত্র এঁকেছেন অদ্বৈত তাঁর তিতাস উপন্যাসে।

তৎকালীন সময়ে ভারতের গ্রামীণ শ্রমজীবী নারী সমাজ কিভাবে সামাজিক ও অর্থনৈতিক শোষণ ও নিপীড়নের শিকার হয়েছেন তার ও আভাস রয়েছে তাঁর রচনায়। সবচেয়ে কম খেয়ে কিংবা না খেয়ে পরের বাড়ীতে উদয়াস্ত শ্রম দিয়ে ক্লান্ত অবসন্ন অবস্থায় বাড়ি ফিরে সংসারের সমস্ত দায় তাদেরই বহন করতে হয়।

উপন্যাসে করম আলী ও বন্দে আলীর স্ত্রী-দের অবস্থা বর্ননা করতে গিয়ে অদ্বৈত মূলতঃ তৎকালীন সমাজের নারীদের দুর্দশাকেই তুলে ধরেছেন যা আজও আমাদের বর্তমান সমাজে সমান প্রাসঙ্গিক।

তিনি ছিলেন বাস্তববাদী লেখক। তাঁর লেখায় কল্পনা ও রোমান্টিকতার কোন স্থান ছিল না। কলমের কালির তুলিতে তিনি বাস্তবের ছবি আঁকতেন।যা আমরা তাঁর "তিতাস একটি নদীর নাম" উপন্যাসে দেখতে পাই।

লেখক, ঔপন্যাসিক অদ্বৈত মল্লবর্মণ তিতাস নদী ও মানুষের অন্তরাত্মার ছবি এঁকেছেন। তিতাস তাঁর কাছে একটি নদীই শুধু নয়, তিতাস যেন তাঁর কাছে এক জীবন্ত জলপরি।তার বুকে কান পেতে তিনি শুনেছেন তার বুকে বয়ে যাওয়া জলের গোপন কথা, তার বুকে বসবাসকারী জলজীবি মানুষের মনের গোপন ব্যথা বেদনার কথা।জল ও জীবনকে তিনি এক করে দেখেছেন। অধ্যাপক শান্তনু কায়সার একারনে " তিতাস একটি নদীর নাম" উপন্যাসকে নদী ও মানুষের যুগলবন্দী বলেছেন।সুস্নাত জানা বলেছেন , " জেলে জীবনের মহাকাব্য"।

তিতাস একটি নদীর নাম উপন্যাসে লেখক অদ্বৈত মল্লবর্মণ মালো সমাজের জলকেন্দ্রীক জীবন জীবিকা, সমস্যা সংকটের পাশাপাশি অত্যন্ত মুন্সিয়ানার সাথে তাদের জীবন প্রবাহের সাথে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িত লোক সংস্কার, লোক রীতিনীতি ইত্যাদি উপস্থাপন করেছেন। জীবন জীবিকা, সমস্যা সংকট, আচার আচরন, খাওয়া খাদ্য, সংস্কৃতি সবটাকে লেখক আশ্চর্য দক্ষতার সাথে তুলে ধরেছেন। তাছাড়া তাঁর বিভিন্ন প্রবন্ধে নিবন্ধে লোকসংস্কৃতির নিখুঁত বর্নাঢ্য সমাহার আমরা দেখতে পাই।যেমন -- ত্রিপুরার বারমাসী গান,পল্লীসংগীতে পালাগান,মাঘমন্ডল,বরজের গান, শেওলার পালা, ভাইফোঁটার গান, অপ্রকাশিত পল্লীগীতি, অপ্রকাশিত পুতুল বিয়ের ছড়া, অপ্রকাশিত বাউল সঙ্গীত ইত্যাদি।

তিনি ছিলেন প্রকৃত অর্থে মাটির কাছাকাছি অন্ত্যজ শ্রেনীর অবহেলিত নিষ্পেষিত অংশের শিক্ষার এক আলোকপ্রাপ্ত এক আধুনিক মনের মানুষ।

মালো সমাজের রিক্ততা,নিঃস্বতা বর্ণনা করেই তিনি ক্ষান্ত থাকেন নি।এই রিক্ততা,নিঃস্বতার মধ্যে দিয়ে জমি ও জলের শোষিত মানুষ কেমন করে ঐক্য,অভিন্নতা এবং আত্মীয়তা অনুভব করে - সেই অনন্য চিত্রটিও প্রস্ফুটিত করে তুলেন লেখক অদ্বৈত মল্লবর্মণ।

মানুষে মানুষে সম্পর্কেরই এক বিশেষত্ব সেখানে ফুটে ওঠে। অনন্তর মার মৃত্যু হলে বাবা মার সঙ্গে বিবাদ করে বাসন্তী অনন্তকে আগলায়। সেই অনন্তই অভিমানে তাকে ছেড়ে যায়। বনমালীর নৌকায় উদয়তারার সঙ্গে চলে যায় বনমালীর গ্রামে। নদীর বুকে নৌকা প্রতিযোগিতার সময় উদয়তারাদের কাছে মার খায় বাসন্তী, অনন্তকে ফিরে পেতে চায়।পরে তিতাসের জলে দাঁড়িয়ে তারাই আবার দুজনে মিলে অনন্তর কথা পাড়ে।কত বিচিত্র অনুপঙ্খ ই না ধরা পরে নদী পাড়ের মানুষদের ঘরে বাইরের জীবন।

তিতাসের তীর জুড়ে মানবসমাজের যে বসতি গড়ে উঠেছে, সেই প্রকৃতির কোলে বসবাসকারী মানুষের যাপিত জীবন,হাসিকান্না, মানবিক মূল্যবোধ, জীবন বোধ, সংস্কার,লোকজ বিশ্বাস, দারিদ্র্য - অশিক্ষা - অনাহারের অর্থনৈতিক জীবন, সংস্কৃতি ও শোষণের অভিঘাত ফুটিয়ে তুলেছেন অদ্বৈত মল্লবর্মণ তাঁর এই উপন্যাসে। যার প্রাসঙ্গিকতা ও গুরুত্ব আজ ও আমাদের কাছে সমান বহমান।


শ্রীঅনির্বাণ

ওরা, প্রগতি চায় না 
                  
সত্যকে সত্য বলার অধিকার ধর্মে নেই।
অবাস্তব অবিশ্বাস্য হলেও 
নির্বোধের মতো মেনে নিতে হবে তোমাকে, 
নতুবা নাস্তিকতায় লেখাতে হবে নাম।                    
ধর্মীয় গ্রন্থ বাইবেল রামায়ণ মহাভারত কোরানে
ব্যাখ্যা ছিল -সূর্য পৃথিবীর চতুর্দিকেই ঘুরে ।
বিজ্ঞানী কোপার্নিকাস প্রথম বলেছিলেন-সূর্য নয় 
পৃথিবী সূর্যের চারদিকে ঘুরে। 
ধর্মীয় ভাবাবেগের বিশ্বাসে আঘাতের 
অপরাধে ধর্মযাজকের অঙ্গুলী হেলনে 
জ্বলন্ত অগ্নিকুণ্ডের মুখোমুখি হন,
কোপার্নিকাসকে সমর্থন করার অপরাধে 
জর্দ্দানো ব্রণোকে সাত বছর জেলে পুড়ে 
অবশেষে নৃশংস হত্যা। 
সত্যকে সত্য বলার অপরাধে লিভোসিয়াকে 
খুন করা হয়েছিল গলা টিপে।
কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে গ্যালিলিও বলেছিলেন 
আমি আবারও বলছি, সূর্য স্থির 
পৃথিবী সূর্যের চারদিকেই ঘুরে ।
আমাকে শাস্তি দিয়েও
সূর্যের চারপাশে পৃথিবীর প্রদক্ষিণ
আপনারা বন্ধ করতে পারবেন না, 
পৃথিবী আগের মতই ঘুরবে। 
বিচারশালায় অট্টহাসিতে সাজা 
সারা জীবন গৃহ বন্দি,
সত্যকে সত্য বলার অপরাধে 
অত্যাচারের তীব্রতায় এঞ্জেল টিউরিঙ্গ
বাধ্য হয়েছিলেন আত্মহত্যায়।
ধর্মীয় সতীদাহ প্রথা বন্ধ করার আন্দোলনে 
পিতা রমাকান্ত রায়ের ত্যাজ্য পুত্র হলেন রামমোহন, 
গর্ভধারিনী মা সন্তানের মৃত্যু কামনায় 
প্রার্থনায় রত ইষ্ট দেবতায়। 
আসলে তথাকথিত ধর্মীয় গোঁড়ামি 
কোনদিন মানবের প্রগতি চায় না
 চায় শুধু প্রতিপত্তি ও নিজস্ব সাম্রাজ্য।

পঙ্কজ কান্তি মালাকার

আশ্রয়

যদিও রাতে আঁধারে চরাচর ঢাকে 
ওপিঠে আলো থাকে,
যদিও উপত্যকা বন্যায় জলমগ্ন
কোথাওতো ভূমি জেগে আছে -
জলপ্রলয়েও মন্দার ভেসে ছিল;
ধৈর্যেরে আরো দু'পা এগিয়ে দাও আশ্রয়।

পূর্বে ভেগেছ চিতার থাবা থেকে
এবার নাহয় উপত্যকার স্রোতের থেকে,
জীবনের আশ্রয় আসলে দৌড় খেলার জয়।

ঘাড় ঘুরিয়ে দেখো কাঁধে শ্রমণকুমারের বাঁক,
এই বোঝাই তোমার শক্তি তোমার ভক্তি
হাঁটুর ধৈর্য- দায়,
চলাই তোমার অধিকারে,আশ্রয় স্থানসন্মত।

তোমাকে যে দৃঢ়পণে এগোতেই হবে,বীর।


টিংকুরঞ্জন দাস

ছবি প্রেম 

পলকহীন তাকিয়ে থাকি ছবিটার দিকে 
তেমন কোন বিশেষত্ব না থাকলেও 
ছবিটাকে বারবার দেখতে ইচ্ছে করে। 

সব তো একই রকম 
সেই নাক, চোখ, ঠোট, বুক, স্তন 
সবকিছুই তো প্রতিটা নারীতে থাকে 
তবু কেন বারবার চোখ ফিরে যায় ছবিটার দিকে? 

ছবিটার প্রতি একটা মোহ জন্মে গেছে 
দৃষ্টিহীন হয়ে গেলেও শুধু গন্ধ শুঁকে 
বলে দিতে পারব ছবিটা কার 
আমি যে প্রেমে পড়ে গেছি সেই ছবিটার।

এই ছবির মালিকানা সম্পূর্ণভাবে আমার না হলেও 
নির্দ্বিধায় বলে দিতে পারি সে একমাত্র আমার 
যেদিন কেউ এসে তুলে নিয়ে যাবে 
সেদিন তার স্থলে আমার নিথর দেহটা পড়ে থাকবে।

রাহুল সিনহা

একটি ফেসবুক পোস্ট

আমি কভার ফটোগ্রাফে কমরেড লেনিনের ছবি লাগিয়ে লিখলাম 'লাল সালাম!'  আর সঙ্গে সঙ্গে ছুটে এলো জাতীয়তাবাদী ট্রোল সেনা,শুরু হলো হুমকি,  মাওবাদী বলে কাঁচা খিস্তি আর 'চীনের দালাল' বলে

চৌদ্দ পুরুষের আদ্যশ্রাদ্ধের প্রক্রিয়া। 

আমি আমার 'বায়ো'তে লিখলাম,

'এই মৃত্যু উপত্যকা আমার দেশ নয়'।

আর ঠিক তিন মিনিট পরই সতেরোটা রিপোর্ট,মেসেঞ্জারে 'ভক্ত'দের হুঙ্কার, সরকারি খরচে চীন বা কিউবায় পাঠিয়ে দেবার ঘোষণা। 

নিখরচায় বিদেশ ভ্রমণ করার আশায় যখন খুশি হয়ে উঠছি, তখনই দেখি, দরজায়

কড়া নাড়ছে একুশ শতকের ভারতীয় গেস্টাপো বাহিনী। 

একটা 'না কবিতা' এই অবধি লেখার পর আমি সিগারেটের অনুপান হিসেবে এক কাপ তেতো কফির তৃষ্ণায় রাস্তায় নেমেছি, আর  ফিরে এসে দেখি, আমার ছবি সহ ভাইরাল ফেসবুক পোস্ট, 'সর্বহারার দলের কর্মীর 

আজকাল আর চায়ে হচ্ছে না, এখন কফিও চাই'।

মধুমিতা ভট্টাচার্য

না ফেরা 

বাসি রাতের ভেতর তারাদের জৌলুশ খুঁজে
পুঁজ জমা গদগদে ক্ষত শুকোবে না
কতবার চোখ নামিয়েছি পায়ের বুড়ো আঙুলে 
মাটিতে মিশে যাবো বলে
পারি কই 
ছেঁড়া পালকের রক্তদাগ লেগে আছে আয়নায় 
নীরবতার বুক ভাঙা শব্দ বিদ্যুৎ চমকানো রাতের
পুঁজি 
সামনে দাঁড়িয়ে নির্লজ্জ আঘাত
পলিথিনের মতো মাটিতে মিশে যাবার ভান করে 
পাখির আত্মহত্যার কারণ
জাটিঙ্গার বাতাস কি জানে ?

যে যায় তাকে আর ফেরানো যায় কই !

মঞ্জু দাস

 বন্দি

যুবক যুবতীরা ভীড় করে 
ভাষনের ময়দানে 
থিক থিক ভীড়ের পদভারে 
পাতাল কাঁপে।

এ ময়দান থেকে ও ময়দানে
যুবক যুবতীদের স্বপ্ন সাঁতার 
কেউ কেউ ডুবে যেতে যেতে
স্বপ্ন আঁকড়ে থাকে 
কেউ কেউ  ভাবে ডাহা মিথ্যে
সবাই একসঙ্গে জ্বলে। 

স্বপ্নরা সব ভোটের বাক্সে বন্দি
ডাহা-ডাহা মিথ্যেরাও।।

মীনাক্ষী চক্রবর্তী সোম

একবুক বৃষ্টিকথা দূরত্ব

গভীর মন্দ্রিত আষাঢ়ের ঘনঘটায়
অবিরাম ঝরছে মেঘের শোকবারি
রিমঝিম একতান তুলে বৃষ্টিরা কথা বলে  
স্মৃতির আঁচলে কুড়োন সময় 
বৃষ্টির সাথে ঝেঁপে আসে।
ভিড় জমে প্রকোষ্ঠের গভীরে
ঋজু মেঘ প্রেমবার্তা ঢালে সকুশলে
খরাযাপিত প্রকৃতির অতৃপ্ত বুকে 
উর্বরা হবার আশায় প্রতীক্ষার প্রহর বেয়ে
নেমে আসে জলভার।
ধারণের অশরীরী আবেদন একগোছা ফুলের মত
ঝরে পড়ে হারিয়ে যাওয়া ধুলোর ওপর।
কবেকার মনোময় সময়ের হিসেব 
রাখেনি কেউ, তবু বৃষ্টি আসে।  
ভাবনাকে প্লাবিত করে বৃষ্টি পড়ে অঝোরে 
শুষে নেয় প্রকৃতির ঘনায়িত উত্তাপ
তারপর ফিরে যায় সাদাকালো মেঘের পাহাড় 
রেখে যায় দায়ভার একবুক তৃষিত যাপনকথার 
তখন তোমার আমার মাঝে বাস করে
একবুক বৃষ্টিকথা দূরত্ব।।

তাপস দত্ত

বিশ্বাস 
 
বিশ্বাসের তকমা হারিয়ে গেছে,
শুধু আছে ঝাপসা্ এক মায়া।
ঘরে ফেরার বৃথা চেষ্টায়
হাসি মুখে দুঃখ ফেরী করে,
নীরবে সয় যন্ত্রনা পলকহীন দৃষ্টিতে।

ঘণীভূত দীর্ঘশ্বাস স্থায়ীত্ব কতটুকু?
জানে না, আজ ও বোঝা হয় নি।
অপেক্ষার পান্ডুলিপিতে লেখা হয়েছে কত কবিতা,
শুধু পেছনে ফিরে দেখা হয় নি।

স্মৃতির পাতা ভেসে বেড়ায় অশ্রু ঘেরা জলে,
দৃঢ বিশ্বাস ফিরে যাবে তো নিশ্চয়,
শান্তির খোঁজে!মায়ের কোলে।

অনুপ দেবনাথ

অকাল বোধন

আমার শ্রাবন সন্ধ্যাবেলায়
পুকুর ঘাটে,উঠোনে,চৌকাঠ- বারান্দায় 
হয়না আর কোলাহল! 
বুঝে গেছি সন্ধ্যা ঘনিয়ে অন্ধকার রাত।
এখন শুধু স্মৃতির ঘড়িতে বাজে ঘন্টা ধ্বনি। 
মাঝেমাঝে, ডাইরিতে কান পাতলেই শোনতে পাই-
কত গুঞ্জন, মধুর আলাপন।
ভাবছি, আমাকে আমিই করবো অকালবোধন!
চারিদিকে প্রদীপ,বাদ্য,বাজনা ।
জানাবো তোমাদের আমন্ত্রণ।

স্বরূপা দত্ত

১) সুদিন

তোমরা যারা অসহিষ্ণু, পশ্চিমে এসে বসো
পশ্চিম আকাশ অপেক্ষা করতে শেখায়। 
সে জানে অপেক্ষার ফল মধুর হয়। 
এখন আলোর কিরণ তির্যক,
 ভূমন্ডলে তীব্র তাপ প্রতিফলিত হচ্ছে। 
সবেতে ঘাম নিঃসৃত যুদ্ধ যুদ্ধ খেলা। 
একটু বসো, কিছুক্ষণ অপেক্ষা কর, 
দেখবে অস্তরাগের গান গেয়ে
পাখিরা উড়ে যাবে দিগন্তের দিকে। 
আকাশ তখন হেসে বলবে, "শুভ সন্ধ্যা"।

২) অভিমানী মেঘ

বাইরে এখন গ্রীষ্মকালীন রাগ ঝরছে 
একটু পরে অভিমানী মেঘেরা অঝোরে কাঁদবে। 
ঘরের এক কোণে দুঃখ জ্বেলে রাখা মেয়েটা হয়তো জানেনা,
জল থই থই ঘরে উরু ডুবে গেলে 
বুকের আগুন ঠিক নিভে যাবে, 
ভেসে যাবে অতীতের সব জমানো স্মৃতি। 
মেয়েটা তখন বুঝতে পারবে 
যাকে ধরে রাখা যায় না 
তাকে একদিন ভেসে যেতে হয়।

সুধীর দাস

আত্মোপলব্ধি

নিষ্প্রাণ দেহ পড়ে আছে বালি  ঘাসের ওপর,
একদল লোক পাশে গান জুড়ে হরিবোলা বোল হরি,
আর একদল আধুনিকতার ছোঁয়ায় নেশায় আসক্ত ।
তাদের নাকি এটাই ধর্ম বিশ্বাস।
দুয়েকজন নিয়ে আসে কাঠকুড়ো আর কেরোসিন তেল।
পুরোহিত মশায় বলে যাচ্ছেন তার সংস্কৃত পাঠ,
কেউ শোকাহত , কেউ শির্নত , কেউ নেশাগ্রস্ত।
দাউ দাউ করে জ্বলে আগুন ধুয়ে মুছে হবে সব ছাই।
কোথায় আত্মগরিমা? কোথায় জয় করা রাজ্যের বিজয়কেতন?
কোথায় সারাজীবন লুটে খাওয়া  ধনসম্পদ?
কোথায় আত্মীয়পরিজন?
সবকিছুই বৃথা এ জগত সংসারে।
থেকে যায় শুধু কর্মের নাউ আর বদনামের ঘানি।

এ দেহ ক্ষণিকের সময় পায়নি করতে আত্মোপলব্ধি।

দিব্যেন্দু নাথ

পুটকিবায় ভরি দে

- এখন আর কিতা করাইতে? 
- হিনান।
- করতাম নায় আমি।
- কেনে?
- ঠাণ্ডা চায় না বে শরীলে।
- কইলে অইল-নি! দুই দিন ধরি ছানপানি নাই। 
- যে-তা মনে অর, অ-তা কর-রে। লম্বাটানে বিরক্ত প্রকাশ করে লবণি নাথ বললেন।
- ভালা হওয়া লাগত নায় নি তোমার?
- কিগ্গিয়ে কইছে বে, আশি বছরর মানু ভালা অইন আবার।
- না অইলে নাই; ছান করা লাগব আইজ। 
- বাদ-দিলা রে বা, কাইল করমু!
- না। আমার এক মাত!
- তোর কথা মতোঔ তোৎ হক্কলতা অর। 
- অইতো নানি! আমি কিতা হরু নি অখন? 
- অয় অয়, বেটা বনিগেছচ।
- তুমি কইলে, বনছি আ-রি।
- অতার-লাগি বাপোর লগে বেটাগিরি দেখাইতে?
- ইতা রে বেটাগিরি কইন নি?
- তে কিতা কইন! বে-মা-রি শরীল পাইছচ তো...!!
- হরুকালো আমি একদিন ছান না করলে, কিতা করতায়, পাউরি লাইছো নি? 
 
সঙ্গে সঙ্গে প্রসঙ্গ পাল্টে দেন বৃদ্ধ লবণি। কড়মড় করা হাড়ের যন্ত্রণায় শরীর কাতর। তবুও অভিমানভরা স্বরে বললেন, - টেকার হরাদ কররে।
- করমু তো।
- কিতার-লাগি?
- লবণি নাথোর অটাল সম্পত্তি, ইতা খাইবো কেগ্গুয়ে?
- তোমরার বাঁচা লাগত না-য়নি?
- বাঁচমু এমনেও।
- পাঠাইলে তো ভেলোর, চেন্নাই। আর কোনোবায়...! বাদ দে রে-বা।
- ইতা অইত নায়। 
- তে কিতা অইত?
- আবার পাঠাইমু।
-  কুবাই?
- হায়দ্রাবাদ।
- হিনোর ডাক্তার ইগু ভগবান নি বে?
- অইলে অউক, নাঅইলে নাই, যাওয়া লাগব তোমার। বলেই হাউমাউ করে কেঁদে উঠল লোচন। 
- কাঁন্দচ কেনে? 
- কৈতাম পারতাম নায়। 
- বুঝিয়ার, বাপোর মায়া। কাঁন্দিচ না। তোর মা আর বইন-অগুর খিয়াল রাখিচ। বলতে বলতে শায়িত লবণি নাথের অশ্রুসিক্ত নয়ন দুইটির কোণা বেয়ে পড়তে লাগল জল।
- আমি ইতা পারতাম নায় রেবো?
- কিতা পারতে নায় রে বাবা, লোচন? বলে, হাতে আনা গরম গ্লাসের দুধে চামচ নাড়াতে নাড়তে ঘরে প্রবেশ করলেন লবঙ্গলতিকা দেবী। 
- হুনো! বাবার মাত?
- কিতা মাতরায় তার লগে?
- কোনতা-নায়।
- আইচ্ছা কইয়ো না; আমার হুনা লাগতনায়, আছে-এউ বাপ বেটার দরবার। অখন হা করো, দুধ এক চামুষ দেই? 
- আধা চামুষো খাইতাম নায়? 
- খাইলাও রেবা? আনতস্বরে লোচন বলল। 

অসুস্থ লবণি বুড়া রাগছেন। মুখে বহুদিন ধরে রুচি নেই। খাবারের কথা বললেই তিক্ততায় ভরে যায় মগজ। আনকোরা স্বরে বললেন, - আমার পুটকিবায় ভরি দে। 
- ইতা কিতা কউ পুয়ারে? পাশ কাটিয়ে বললেন লবঙ্গলতিকা। 
- তে কইতাম কিতা? গলা-বায় যে কিচ্ছু গেলে, খালি পুরপুরাইয়া জ্বলে। ই কথা ইখান তোমরারে আর কয় দিন কইতাম? অঃ মর ফাটা কপাল! কই বেটা ঠাকুর? দেখরায় নানি আমারে! আর কয়দিন রাখতায় ইলা...।

নীলিম রায়

রঙের বসন্ত 

বসন্ত সর্বদা আবিরের উৎসব হয়ে আসেন,
জীবনের রঙ হয়েও আসে।
তাকে দেখা যায় বহুরূপে বহু ভাবে --
বসন্ত রজনীগন্ধার হাট 
কখনো  বা রোদে পোড়া মাঠ।

বসন্ত উপোস করা তারিখ 
আবার কখনো পূর্ণিমার চাঁদ,

বসন্ত কখনো রঙিন ডালপালা
অথবা কবিদের হৃদয়ের মন্বন্তর।

বসন্ত সর্বদা ফুলের আগুন নয়,
 বসন্ত কখনো দুর্ভিক্ষের অব্যক্ত আর্তি।

বসন্ত সর্বদা রঙের উৎসব হয়েও আসেনা,
ঋতু পরিবর্তনের চিরন্তন সত্য হয়েও আসে।

ড. পূর্বিতা গুপ্ত

কবিতার জন্ম

কবিতা, তুমি ধ‍্যানপ্রিয় সত্ত্বা
তোমার অন্ত:গুহার 
ডুবুরি তুমি নিজেই
ভিতরে প্রবল ঝড় 
শব্দেরা জোটবদ্ধ 
তাই সৃষ্টির আয়ুধকে
শাণিত করছো তুমি
করছো নিয়ত
নীরবে-গোপনে
ঠিক তখনই 
তোমার ধ‍্যানস্হ হৃদয় 
ডাক শোনে
অবয়বজুড়ে চোখ রাখে
বাহুডোরে মিলন দুজনার
অন্ত:প্রকাশ ও বহিঃপ্রকাশের 
সুক্ষ্ণ সমীকরণ শেষে
মধুর হাওয়া আবেশে
চেতনার জন্ম হয় 
বোধ জাগ্রত হয় 
কবিতা, তুমি ধ‍্যানপ্রিয় সত্ত্বা

দেবব্রত চক্রবর্তী

থাপড়াইয়া দাঁত ফালাই দিমু

আমাদের পাড়ার বিকাশ কাকু, উনি নিঃসন্দেহে গুণবান এবং শ্রদ্ধেয় ব্যক্তি। উনাকে দেখলে আমরা মাথা নত করে চলি। উনার মধ্যে একটি অভিভাবক শুলভ আচরণ লক্ষ্য করা যায়, যা আমাদেরকে মাথা নত করে দিতে বাধ্য করে। তো সেই কাকুর সম্পর্কে একটি কথা, কাকু ব্রাহ্মন,কর্মসূত্রে পৌরহিত্য করেন বা করে থাকেন। এটাই তাঁর পেশা।কাকু সাংসারিক মনোযোগী সচেতন মানুষ। এক ছেলে আর এক মেয়ে নিয়ে চারজনের সংসার, ছেলে মেয়েদের পড়াশোনা নাচ গান তবলায় খামতি নেই লালনে। পারিবারিক ও আনুসাঙ্গিক খরচায় মোটামুটি চলে যায় মাস।উদ্বৃত্ত ইনকাম বলতে কিছুই নেই এই কাকুর পরিবার।সেই সুবাদে সৌখিন জীবন যাপন করার মতো সুযোগ কখনও কাকুর জীবনে আসেনি। খুব অল্প বয়সে পিতৃ হীন হওয়ায় নিজেই নিজেকে কাঁধে নিয়ে তৈরি করেছেন ভালোবাসা নামক সংসার। নিজেকে পাথরের মত আঘাত করতে করতে চারজনের সংসার সুখী ও সুন্দর করে তুলছেন কাকু।দুর থেকে দেখলে মনে হয় যেন বাচ্চা শিশুর মত খিলখিলিয়ে হাসছে এনাদের সংসার। পারিবারিক জীবনের বাইরের কেউ বুঝতেই পারবে না, এই সংসারেও কেউ নিজেকে পুড়িয়ে সোনামুখ হাসি ফুটিয়ে তুলেছেন। এইভাবেই নিজেকে সামনে রেখে প্রতিনিধিত্ব করেছেন নিজের সংসারের‌।
   একদিন হেলায় কিংবা বলা যায় কৌতুকের ছলে কাকু কাকিমণিকে বলেছিলেন_
 'বেশি কথা কইয়ো না, থাপড়াইয়া দাঁত ফালাই দিমু।'
  জীবনের একমাত্র সহ-সঙ্গী কাকিমনির প্রতি শ্রদ্ধবনত প্রেম,হাজারো যন্ত্রণার শাক্ষী কাকিমনির দেখছেন কাকুর জীবনে আসা দৈন্যতা, দেখেছেন নুনভাতের সকাল,একপাতে মেখে ভাত খেয়ে ও সুখে থেকেছেন দু'জনে।হয়তো রাত্রী নিশীথে একে অপরে আবদার বায়না,চোখের জল মুছতে মুছতে ছেড়ে এসেছেন জীবনে।এই উপলব্দি কাকু একা করেন নি কাকিমনি ও ভাগ করে নিয়েছেন। 
তাই হয়তো কাকুর বলা কটু কথা কাকিমনির নিজের গায়ে মাখে নি।
বেখেয়ালে,হেলায় বলে যাওয়া কথাগুলো জুড়ে যায় জীবনের সাথে কেমন করে। যেন বিক্ষিপ্তভাবে ক্রমাগত আঘাত হানে আমাদের জীবনে, আসলো কাকু কাকিমণির জীবনেও। কালক্রমে বহু বছর পর কাকিমনির সামনের দাঁত দুটো পড়ে যায়, পোকার আক্রমণ। যাই হোক বিষয়টা স্বাভাবিক দাঁত পড়া এটা প্রায় সবারই হয়ে থাকে। কিন্তু, মূল ঘটনা হলো এখন কাকিমনি এই দাঁত পরা মুখ নিয়ে কোথাও যায় না,কোনো অনুষ্ঠানে ও যেতে অস্বস্তি বোধ করেন, লজ্জা বোধ করেন। তাই কাকিমনি নিজের অপরাগ আবেগের আবদারে কাকুকে বলেছেন_ "দাঁত দুটো লাগিয়ে দওনা গো্" যার মানেটা হল আর্টিফিশিয়াল বা আমরা যাকে বলি অপারেশন করে আলগা দাঁত লাগানো। এটাই বলেছিলেন কাকিমনি। যেমনি আবদার তেমনি বায়না পূরণে ব্যস্ত আমার কাকু। ডাক্তারের সাথে পরামর্শ করে বুঝা গেল যে পুরনো ক্ষয় হয়ে যাওয়া দাঁতগুলো ফেলে দিতে হবে তারপর নতুন আর্টিফিশিয়াল দাঁত লাগানো হবে। সেই মতো ছোটখাটো একটা সার্জারিও করতে হবে। শহরের নামকরা দন্ত বিশেষজ্ঞ ডক্টর 'শ্রীমান নন্দদুলাল শর্মা, উনার পরামর্শে দাঁত দুটুর জন্য অ্যাপোয়েন্টমেন্ট হয়ে গেল কিছুদিন পর। টুকটাক কিছু চেক আপ করার পর আসলো সেই শুভক্ষণ।
বহুবছর পর কাকু দেখবেন দাঁত মুখে কাকিমনির চাঁদমাখা হাসি।সেই অপেক্ষায় কাকু নতুন প্রেমিকের মতো করে আদর যত্নে কাকিমনি কে চিকিৎসা করিয়েছেন। কাকিমনির জীবনে আজ আবার নতুন দাঁত আসার সময়, নতুন দাঁত লাগানোর দিন। 
এমনই ঘন চৈত্র মাসে কালবৈশাখীর আবহে এক দ্বৈব প্রেমিক যুগল হাতে হাত রেখে, আঙুলে আঙুল চেপে বিনা আড়ম্বরে দাঁত দুটো লাগিয়ে ঘরে ফিরলো।আজ নব দম্পতির মতোই খুশি কাকু কাকিমণির পরিবারটি। যেন আর মুখে ভাত খাওয়ার দিন। বিকাশ কাকু আবেগপ্লুত ভাবে দীর্ঘশ্বাস ফেলে নিজে ঘরে গিয়ে পকেটে হাত দিয়ে দেখল সর্বমোট খরচ বাইশ হাজার টাকা। এমনই হেঁয়ালিপনায় বলে দেওয়া কথা 'থাপরাইয়া দাঁত ফালাই দিমু' এই কথাটির মূল্য গিয়ে দাঁড়াল ২২ হাজার টাকা। এইভাবে জীবনে লক্ষ লক্ষ টাকা আমরা হেলায় বল ফেলি,ভাবি না একটুকুও। ভাবা যায়? হিসাব করলে দিন শেষে আমরা গরিব হচ্ছি কাকার মত।

সৈকত মজুমদার

কুমীরাশ্রু

একদিন 
আমার অনুভূতি মরে যাবে 
আর আমি তোমাকে ভুলে যাব;

তোমার সব মিথ্যে প্রতিশ্রুতি
জাবর কাটতে কাটতে আমি
কোমায় চলে যাব!

আর আমার জীবন্ত লাশের পাশে
তোমার কুমীরাশ্রু ফেলবে...

অতনু রায় চৌধুরী

শূন্যতার ভীড়ে 

গভীর রাত নির্জনতায় ঘেরা 
ফিরছি বাড়ি একা।
জীবনের হিসাব করতে করতে 
আজ যৌবনের শেষ ছোঁয়া।
প্রশ্ন থাকে একা মনে, উওর অজানা।
ক্লান্ত শরীর বিশ্রাম খোঁজে 
তবুও হাঁটতে হচ্ছে একা।
ঘুমিয়ে আছে রাস্তার ধারে কুকুরের দল কত,
সেই রাস্তাতেই দাঁড়িয়ে আমি ভীষণ ক্ষুধার্ত।
অথচ কেউ নেই পাশে, নেই কোনো আবদার
ভরা শহরে শূন্যতার ভীড়ে এইভাবেই জীবন আটকে থাকে বারবার।

গৌরব নাথ

 সেফটিক পুঁজ 
 
চলো দেখে নেওয়া যাক একটা
একটা কী? হৃৎপিণ্ডে পালিশ লাগনো খোলা দরজা
ও তার ভেতর
কেউ যাওয়া আসা করে কিনা
কেউ থাকা খাওয়া করে কিনা
কেউ এমনি এমনি হাসতে হাসতে বলে উঠেছিল কি
এবার কাঁদতে চাই

তরল দম্পতির মেঝেতে প্রচুর বালুর ঝগড়া
আমার কানের পাশ দিয়ে যেতে চায়
যায়‌ও
কেন ছুঁয়ে যায় না অসম্ভব শীতলতার সেফটিক পুঁজ

জয়দীপ চট্টোপাধ্যায়

প্রস্তাবনা 

তোমার গোপন দুঃখগুলো আমায় দিও
আমি তোমায় দেবো আমার সূর্যসকাল
ই-মেল নয়, জেল পেনেতে চিঠি দিও 
গোলাপ হয়ে লিখবো আমি তোমার নাম।

তোমার যত চোখের জলের হিমবাহ
উষ্ণতাতে গলিয়ে দেবো এক নিমেষে 
তুমি শুধু আপন করে 'বন্ধু ' বোলো 
সবুজ চারা বুনবো আমি মরুর দেশে।

বঞ্চনা আর হাহাকারে ভরেছে দিন
দুর্নীতি আর অবাধ লুঠের মহোৎসব
শান্তিপ্রিয় সুজন মানুষ গুনছে প্রহর
লক্ষ কোটি বেকার স্বজন ছন্দহীন।

তোমার মনের অনেক খবর জানা আমার
কাছের তবু অন্তরীনে আছো দূরে 
স্বপ্ন নিয়ে আসছে দেখো নতুন দিন
সংগ্রামীমন জ্বালাও আলো বিশ্বলোকে।