চলে গেছে
মেঘ রোদ আলো অন্ধকার জল স্থল
সবাই
ভগাঙ্কুরে ক'টি আঁচড়
আর আমি
বিলাপের কাছাকাছি
ক্রান্তিকাল
"তিনটি শালিখ ঝগড়া করে রান্নাঘরের চালে"
প্রথমেই যদি শালিখদের শাসন করা যেত,ঝগড়াটা
বাড়তে না দিয়ে, তাহলে বোধহয় সংসার সমাজে,রাজ্যে,রাষ্ট্রে ব্যপক হারে এই
ঝগড়া -ঝামেলা, অশান্তি লেগেই থাকতো না।
আসলে আমরা কোনো কিছুরই কারণ খুঁজতে গভীর মূলে প্রবেশ না করে ডালপালা ধরে ঝুলোঝুলি করে কিছু ডাল ভেঙে গাছেরই ক্ষতি করি, প্রকারন্তরে নিজেদেরই। আর চুপচাপ বলি লেগে যা লেগে যা নারদ,নারদ। লাগলেই লাভ ....
অস্ত্র, বিমান,নৌ বিক্রির হার বাড়িয়ে কিছু মনুফা লুটে নিজেদের ভুঁড়ি আরও একটু বাড়িয়ে নেওয়া। তাছাড়া গদি বাঁচানো অথবা গদি বাগিয়ে নেওয়া।
হয়তো ভাবছেন আদারব্যাপারি হয়ে জাহাজের খোঁজের কী দরকার , কিন্তু সাগরে সুনামীর ঢেউ আসলে জাহাজের সঙ্গে খালের ডিঙিও যে আঁতকে উঠে...
দুলতে থাকে অজানা আশংকায়।
দিনদিন জীবন টা যেন যুদ্ধ, যুদ্ধ হয়ে উঠছে। খাদ্যাভাসের যুদ্ধ, সংসারে মেনে না-ও মানিয়ে না-ও এর যুদ্ধ, জিনিসপত্রের দাম অগ্নিমূল্য, কড়ার তেল থেকে গাড়ির তেল, কোথায় যাবো!! তার সাথে এসো যুদ্ধ যুদ্ধ খেলি জুজুর ভয়ে অস্থির। তারই মধ্যে স্থবির ও আত্মকেন্দ্রিক জীবন।
এখন আমরা এক অস্থির সময়ের মধ্যে দিয়ে সাঁতরে চলেছি... ডাঙায় উঠতে গেলে যে সুস্থির মানসিকতার প্রয়োজন হয় সমাজের মানুষের মধ্যে সেই সুস্থিররতা প্রায় নেই বললেই চলে।
নীতি-নৈতিকতার ভূমিকা পালন করতে যে মানবিকতার প্রয়োজন আজ তার সামগ্রিক অধঃপতন। বর্তমান সময়ের একটি আলোচিত ঘটনার ভয়াবহতায় সবাই নির্বাক। সবার মনে একই প্রশ্ন- আমাদের মানবিক মূল্যবোধগুলো কোথায় হারিয়ে গেল?
হ্যাঁ, এই প্রশ্ন অনেকের মনে থাকলেও, প্রশ্নকর্তা কেউ নেই, বিবেক জাগ্রত না আহত! নৈতিক অবক্ষয় নিশ্চিত জেনেও উত্তরণের পথ খুঁজিনা।
চোখে রঙিন চশমা পরিয়ে আমাদের সো কলড্ অভিভাবকরা দূরদর্শনে দূরদর্শিতার রণকৌশল
আলোচনায় ওই "তিনটি শালিখের মতো "
....যেখানে অসিহষ্ণু মানসিকতার হেঁসেল থেকে
চাপান উতোরের উগ্র ফোড়নের পোড়াগন্ধ ছাড়া
কিছুই নাক ও মনের দরজায় এসে পৌঁছায় না, গণতন্ত্রের ফানুস সেখানে গৎবাঁধা কিছু কথার
মোহজালের বুদবুদ হয়ে উড়তে থাকে। আর বুদ্ধিজীবিরা ফুঃ এর উপর ফুঃ....
কিন্তু সঠিক কারণ না আমাদের বোঝাতে পারেন,
না নিজেরা বোঝেন।
আজ প্রযুক্তি কে হাতের মুঠোয় নিয়ে রঙিন স্বপ্ন উড়িয়ে বিস্ময়কর গতিতে এগিয়ে চলেছি,কিন্তু মানবিকতা!!
আমাদের জীবনে বেড়েছে বেগ,হারিয়েছি আবেগ।
ভোগবিলাসের ফুয়েল ভরে নিয়ে জেট গতিতে জীবন কে ভোগ করতে গিয়ে মানবিকতার বিশুদ্ধতা হারিয়ে আজ "সেলফিশ জায়েন্ট "
শিক্ষিত, অতি শিক্ষিত, সমাজ দমন করতে পারেনি অপরাধ প্রবণতার ধারাবাহিকতকে, যা দিন দিন বেড়েই চলছে...
আসলে এর পিছনেও আছে মনস্তাত্ত্বিক চিন্তাধারা
যা আসলে একটি রোগ, দার্শনিক দৃষ্টিকোণ থেকে
কোনো জ্ঞানী কখনো কোনো অনৈতিক কাজের সাথে নিজেকে যুক্ত করতে পারেন না।
জ্ঞান চর্চার কোনো বিকল্প নেই। জ্ঞান মানুষের মূল্যবোধকে সতেজ করে তোলে। আসুন পুঁথিগত বিদ্যা নয় প্রকৃত শিক্ষার আলো জ্বেলে ক্রান্তিকাল অতিক্রম করি...।
শরীর
ভোর ভোর উঠে রাই। রাতে ঘুম ভাল হয়েছে। ফ্রেশ লাগছে বেশ। পাশে এখনো অর্ক অঘোরে ঘুমোচ্ছে। হাসি পায় রাইর। সারারাত যা দাপাদাপি করেছে।নতুন ঢুকেছে ওদের অফিসে অর্ক। প্রথম থেকেই রাইয়ের প্রতি লাট্টু। রাই ওর চেয়ে অনেক সিনিয়র। বয়সে এবং পদেও। তাও, ছেলেটির প্যাশন দেখে রাই ও একটু আধটু পাত্তা দেওয়া শুরু করেছে ইদানিং।
রাই সিঙ্গেল। ছেলে আছে পাঁচ বছরের। মায়ের কাছে থাকে। গুল্লু পেটে থাকতেই হিরনের সাথে ছাড়াছাড়ি হয়ে গেছে। হিরণ আবার বিয়ে করে এখন একটি মেয়ের বাবা। যাকগে, এসব নিয়ে কোনো মাথা ব্যথা নেই রাইর। নিজের জব , নিজের ছেলে এই ওর লাইফ। শনিবার মায়ের ওখানে চলে যায়, দুটি দিন ছেলের সাথে কাটিয়ে আবার সোম বার ফিরে আসা। এটাই রুটিন।
অফিসে, অফিসের বাইরে অসংখ্য প্রেমিক ওর। রাই জানে সবগুলিই শরীরের প্রেম চায়। রাগ টাগ হয়না ওর। নিজের মত করে কাউকে ভাল লাগলে একটু ঘোরাফেরা, খাওয়া দাওয়া, নাইট পার্টি এসবে যায়। ইচ্ছে হলে শরীর দেওয়া নেওয়া। ব্যস্! এখানেই ইতি টানে ইমোশনের।
আগে আগে বুঝতনা, সেন্টিমেন্টাল হত। প্রথম যখন ডিভোর্সের দু বছর পর অতীনের সাথে সেক্স হয়, সে ভেবেই নিয়েছিল ওকে ভালবাসে বলেই অতীন ওরকম করেছে। আর নিজেও সে অতিনকে পছন্দ করে। নইলে কী আর শরীর মিলে! মন না থাকলে শরীর হয়না। কত অবোধ ছিল তখন ভাবলেই হাসি পায় নিজের।
কিছুদিন আগে যখন মায়ের ওখানে গেল, মা কত কথা শোনাল।
_ দেখ রাই, বিয়ে করে ওসব তোর যা খুশি কর। তুই কী ভাবিস আমি কোনো খবর পাইনা! তোর ওসব নষ্টামি কে সমাজ কী বলে, জানিস!
ঠান্ডা গলায় জবাব দিয়েছিল রাই,
_ জানি, বেশ্যা বলে। এটা নতুন কী! আর এতে আমার কিছু যায় আসেনা। তুমিও ভেবোনা এসব নিয়ে।
_ ছি, ছি। গুল্লু বড় হলে ওকে কী বলবি তুই? কেমন মা রে তুই! মায়ের মুখের ওপর এসব নোংরা কথা বলতে তোর বাধলনা?
_ যা বাবা, সত্যি বললেই দোষ। শোনো আমি গুল্লুর মা। ওকে আমি যতটা ভালবাসি কেউ বাসেনা। আশা করি বড় হলে সে নিজেও ওটা বুঝবে। মায়ের শরীর নিয়ে, চরিত্র নিয়ে ওর বলার কিছু থাকবেনা । এটা আমার ব্যক্তিগত ব্যাপার।
অর্ক কে ঠেলে তুলে রাই।
_ এই যে, উঠ বাড়ি যাও।আমার এখন অনেক কাজ।
_ আরেকটু থাকি! আবদার করে অর্ক।
- নো, রেডী হও আর ভাগো। আজ প্রজেক্ট টা যেন অবশ্যই জমা পড়ে।
রাইর ঠান্ডা গলার কথা শুনে উঠে বসে অর্ক। ধীরে ধীরে তৈরি হয়ে বেরিয়ে যায়।
সেদিকে তাকিয়ে রাইর মুখ থেকে বিচ্ছিরি একটি গালি বেরিয়ে আসে।
এখন সে পুরুষদের মত সেক্স করে। যেখানে মনের কোনো কারবার নেই। ইচ্ছে হল তো যেকোনো মেয়ের সাথে ওরা ইচ্ছেমত সবকিছু করতে পারে। রাইর এখন আর আলাদা কোনো অনুভূতি হয়না। মেয়ে হয়ে জন্মেছে বলে কী ওর কোনো যৌনতার অধিকার থাকবেনা! আশ্চর্য তো! কারা ওকে বেশ্যা বলবে, হোর বলবে সেই ভয়ে নিজেকে বঞ্চিত রাখবে! আর যে পুরুষ বেশ্যা গুলো ওর কাছে আসে নিজের বউ বাচ্চাকে ঘরে রেখে এদের কথা কে বলবে! শালা!
এখন রাই শরীরের সাথে মন কে গুলিয়ে ফেলেনা। মনকে শক্ত করে আটকে রাখে নিজের কাছে। গুল্লুর কাছেই একমাত্র নিজেকে মেলে দেয় । বাকি সময় ওই খোলার ভেতরে যত্ন করে ভরে রাখে মন, ভালবাসা , অভিমান সবকিছু।
নিজের ব্রেকফাস্ট তৈরি করে খেয়ে নেয় রাই। আজ অফিসে দুটো বড় মিটিং। ফিরতে দেরি হবে বুঝতে পারছে। বাইরে বেশ মিষ্টি রোদ উঠেছে। মেজাজটা বেশ ফুরফুরে লাগছে।
ফ্ল্যাট লক করে বাইরে এসে গাড়িতে বসে রাই। চোখে সানগ্লাস তুলে দেয়। এখন গন্তব্য অফিস।
কালো চশমার আড়ালে নিজের চোখের সমুদ্র লুকিয়ে নেয় রাই। রেডিওতে গান বাজে,
আমাদের গল্প গুলো....।
জন্মশতবর্ষে স্মরণ
সমরেশ বসু: এক ব্যতিক্রমী কথাশিল্পী
অপ্রতিরোধ্য কলমে বাংলা সাহিত্যে যিনি নিজের স্থান নিজেই প্রতিষ্ঠা করেছেন তিনি সমরেশ বসু । তাঁর জন্ম নাম সুরথ নাথ বসু । জীবনের প্রতি পদক্ষেপে অনিশ্চয়তা , দারিদ্র্য, তাকে বিধ্বস্ত করেছে বারবার ।কিন্তু পরাস্ত করতে পারেনি তাঁকে। বরাবরই মাথা উঁচু করে বাঁচতে শিখেছেন । বলা যেতে পারে , জীবনের প্রতিকূলতা গুলিই তাঁকে শক্তি জুগিয়েছে।
তিনি লিখেছেন একশোর বেশী উপন্যাস এবং তিন শতাধিক গল্প। অনেক ছোটগল্প লিখেছেন । তাঁর রচনায় রাজনৈতিক কর্মকান্ড , শ্রমজীবী মানুষের জীবন এবং যৌনতা সহ বিভিন্ন অভিজ্ঞতার সুনিপুণ বর্ণনা ফুটে উঠেছে।
১৯২৪ সালের ১১ ডিসেম্বর ঢাকা শহরের রাজনগর গ্রামে জন্ম হয় সমরেশ বসুর । বাবা মোহনীমোহন বসু ও মা শৈবলিনী দেবী । পাঁচটি সন্তানের মধ্যে সমরেশ চতুর্থ । সদ্যোজাত এই চতুর্থ সন্তানের নাম রাখা হয় তড়বড়ি ।সব অংশের মানুষের সাথে সহজেই মিশে যেতেন এই বালক । প্রতিবেশীরাও তাকে খুব স্নেহ করতেন । বরাবরই ছিল নির্জনতা প্রিয় । নির্জনতার সন্ধানে চলে যেতেন শ্মশানে । স্কুলের গতানুগতিক শিক্ষা তার ভালো লাগত না । স্কুল ফাকি দিয়ে নানা রকম দুঃসাহসিক অভিযানে বের হতেন । তবে অবসর সময়ে প্রচুর গল্পের বই পড়তেন । ছবি আঁকার প্রতি প্রবল ঝোঁক ছিল । সমালোচক সরোজ বন্দ্যোপাধ্যায়ের লেখা থেকে জানা যায় সমরেশ বসু ভাল বাশি বাজাতে এবং গান গাইতে পারতেন । বালক সুরথ নাথের নাম সমরেশ দেন তাঁর বন্ধু ও শ্যালক দেবশঙ্কর মুখোপাধ্যায় । ১৯৩৯ সালে নৈহাটীর মহেন্দ্র স্কুলে ভর্তি হন সমরেশ বসু । পরীক্ষায় ফেল করেন । এখানেই প্রথাগত শিক্ষার ইতি টানেন । কিছুদিন ঢাকেশ্বরী কটন মিলে কাজ করেন সমরেশ বসু । পরে আবার চলে আসেন নৈহাটীতে ।
এক সময় কঠিন রোগে আক্রান্ত হন । বন্ধুর দিদি স্বামী পরিত্যক্তা গৌরী দেবী অসুস্থ সমরেশ বসুকে সুস্থ করে তোলেন । এই নারীই ছিল তাঁর প্রথমা স্ত্রী । চরম দারিদ্র্যতার জেরে এক সময় গরিফা থেকে ব্যারাকপুর পর্যন্ত সাহেবদের কোয়ার্টারে ডিম বিক্রি করে সংসার চালাতেন তিনি । এ সময় মার্ক্সবাদী ভাবধারার সাথে তিনি যুক্ত হন । ১৯৪৩ - ১৯৪৯ সাল পর্যন্ত ইছাপুর বন্দুক কারখানায় চাকরি করেন তিনি । এই সময় পর্বে তিনি কমিউনিস্ট পার্টির কর্মকান্ডে জড়িয়ে পড়েন । একসময় কারাবরণও করেন । জেল থেকে মুক্তি পাবার পর লেখাই হয়ে উঠে তাঁর নেশা ।
আসলে জীবনে ব্যাপক অভিজ্ঞতা তাঁর সৃষ্টির পরিমাণকে বিশাল করে তুলেছে । ১৯৪৫ সালে প্রথম উপন্যাস 'নয়নপুরের মাটি' গ্রন্হাকারে বের হয় । পরবর্তী পর্যায়ে বের হয়েছে শ্রীমতী কাফে ( ১৯৫৬ ) , অমৃত কুম্ভের সন্ধানে(১৯৫৪ ) ,গঙ্গা ( ১৯৫৬ ) , শেষ দরবার ( ১৯৬৩ ) , স্বর্ণ পিঞ্জর ( ১৯৬৫ )।
সমরেশ বসু প্রথমে গল্পকার , পরে ঔপন্যাসিক । মহাকালের রথের ঘোড়া , মানুষ শক্তির উৎস,যুগ যুগ জীয়ে, শেকল ছেঁড়া হাতের খোঁজে, তিন পুরুষ ইত্যাদি তাঁর লেখা রাজনৈতিক উপন্যাস । জগদ্দল , গঙ্গা , বাথান ইত্যাদি গোষ্ঠী ভিত্তিক উপন্যাস । বিবর , প্রজাপতি , পাতক - এই উপন্যাস গুলিতে উচ্চবিত্ত শ্রেণীর সঙ্কট ও যৌনতার অনাবরণ প্রকাশ পেয়েছে ।
তিনি রাজনীতি আশ্রিত উপন্যাস গুলিতে সমকালীন সমস্যা এবং শাশ্বত মূল্যবোধের মিশ্রণ ঘটিয়েছেন । মহাকালের রথের ঘোড়া তার লেখা অন্যতম শ্রেষ্ঠ উপন্যাস । এই উপন্যাসের নায়ক রুহিতন করছি । তার বাবা পোশপত কুরমি তরাইয়ের চা বাগানে চার পুরুষের মজুর । গল্পের শুরু থানার লকআপে রুহিতনের উপর চলছে অকথ্য অত্যাচার।নকশাল আন্দোলনের পটভূমিকায় ফুটে উঠেছে থানার উপর চলছে প্রচন্ড পুলিশি অত্যাচারের , নকশাল আন্দো রচিত এই কাহিনিতে লেখকের রাজনৈতিক দ্বিধার পরিচয় ফুটে উঠেছে রুহিতন চরিত্রে । আবার তিন পুরুষ উপন্যাসে দেখা যায় , সূর্যমোহন । সৌরীন , সুদীপ- তিন পুরুষ রাজনৈতিক জীবন থেকে রাজনীতিহীন জীবনের দিকে যাত্রা করছে । এই উপন্যাসের আর একটি চরিত্র সীতানাথ চরিত্রেও বিপ্লব সাধনার সঙ্গে মিশে গেছে রোমান্টিক স্বপ্নময়তা ।
গ্রাম জীবনের পাশাপাশি নগর জীবনকেও খুব নিকট থেকে দেখেছেন সমরেশ বসু । তবে গোষ্ঠীজীবনের কথা লিখতে গেলে গ্রামই বার বার প্রাধান্য পায় । রাজনীতি ও গোষ্ঠী জীবন ওতোপ্রোত ভাবে জড়িয়ে আছে উত্তরঙ্গ উপন্যাসে । জগদ্দল উপন্যাসে পাওয়া গেছে অন্যতম জটিল রূপায়ণ । একজন কর্মচ্যুত বেকার শিল্প শ্রমিক গোবিন্দর স্বপ্ন আর স্বপ্নভঙ্গের কাহিনী ফুটে উঠেছে বি.টি রোডের ধারে উপন্যাসে । শিল্প শ্রমিকদের জীবনই এর মুখ্য বিষয় । টানাপোড়েন উপন্যাসে বিষ্ণুপুরের পাটরাঙাদের জীবনযাপনের ছবি পাওয়া যায় । ধনতান্ত্রিক সমাজে তাঁতী গোষ্ঠীর জীবন দৈন্যতার চিত্র অঙ্কিত হয়েছে - এই উপন্যাসে । আবার ছিন্নবাধা উপন্যাসের গ্রাম সমাজ ও শহরের শ্রমিক জীবনের চিত্র রূপায়িত করা হয়েছে । 'পদক্ষেপ' উপন্যাসে ইউনিয়ন আন্দোলনের স্বরূপ বর্ণিত হয়েছে । অনেকেই হয়তো জানেন না , যে জেলখানায় বসে সমরেশ বসু তাঁর প্রথম উপন্যাস ' উত্তরঙ্গ' রচনা করেন ।
কালকূট শব্দের অর্থ বিষ । তিনি কালকূট ছদ্মনাম দিয়ে বেশ কিছু উপন্যাস লিখেছেন । অমৃত কুম্ভের সন্ধানে , কোথায় পাব তারে , ঐ সব উপন্যাসে তিনি কালকূট নাম ব্যবহার করেছেন । 'ভ্রমর' ছদ্মনামে লেখা তিনটি উপন্যাস – 'যুদ্ধের শেষ সেনাপতি ', 'হাতে তোমার রক্ত' , প্রেম - কাব্য রক্ত যথাক্রমে ১৩৮৯ , ১৩৯০ ও ১৩৯১ সালে প্রকাশ হয় । সমরেশ বসুর কালজয়ী জীবন কাহিনী থেকে প্রবাহ পত্রিকায় প্রকাশিত 'ভোট দর্পণ ' নামে রচনায় কালকূট নামটি ব্যবহার করেন ।
১৯৪৬ সালে পরিচয় পত্রিকায় আদাব গল্প প্রকাশ হয় । তার আগে স্বাধীনতা পত্রিকায় প্রকাশ হয় অন্যতম ছোটগল্প ' 'শের সর্দার '। এই সব গল্প তাঁকে ছোটগল্পাকার হিসেবে স্বীকৃতি দেয় । অকালবৃষ্টি , ঋতু , মনোমকুর , পাহাড়ী ঢল , সুবর্ণা , বনলতা , মানুষ , চেতনার অনুকার , ধর্ষিতা , কামনাবাসনা ইত্যাদি তাঁর লেখা অন্যতম গল্প সংকল্পন। শিশু - কিশোরদের জন্যও তিনি অনেকগুলি গল্প - উপন্যাস লিখেছেন । তাঁর রচিত ছোটগল্পগুলি আমাদের মনে দোলা দেয়।যেমন- 'ফটিচার ' গল্পে আছে কয়েকটি রিক্সার মালিক আর শ্রমিক স্বার্থের লড়াই । শিশু শ্রমিকদের দৈন্যদশা নিয়ে লিখেছেন অন্যতম গল্প' নিষিদ্ধ ছিদ্র' ও 'পেলে লেগে যা' । এসমালগার ' গল্পে তেরো বছর বয়সী এক চোরাচালানকারীর কথা উল্লেখ রয়েছে । তাঁর লিখিত গল্প সম্পর্কে সুমিতা চক্রবর্তী মন্তব্য করেছেন যে,-' সত্তরের দশকের নকশালবাড়ি আন্দোলনের বিস্ফোরণের পর সেই বাস্তবতাবোধের অভিঘাত আত্মস্থ করে নিয়ে বাংলা সাহিত্যে যে একজন তরুণ গল্পকারের আবির্ভাব হয়েছিল , তাঁদের পূর্বসূরী ছিলেন সমরেশ বসু ।'
অন্যভাবে বলা যায় উচ্চবিত্ত - মধ্য ও নিম্নবিত্তদের জীবনচিত্রের সঙ্গে সঙ্গে তথাকথিত ভদ্রলোক যারা নন , স্মাগলার , ওয়াগান ব্রেকার , পকেটমার , ডোম , গুনিন এদের নিয়েও অসংখ্য গল্প লিখেছেন তিনি । যেমন : সাধ গল্পের দেশে আছে গোপীনাথ নামে এক রিক্সাওয়ালা । 'মেঘলা ভাঙা রোদ 'গল্পে বিশু নামক এক ড্রাইভারের মানবিকতার কাহিনী তুলে ধরা হয়েছে । 'খিঁচাকালা সমাচার' গল্পের কেন্দ্রবিন্দু এক পকেটমার । ওয়াগন ব্রেকার এবং সমাজবিরোধী ফটিককে নিয়ে লিখেছেন আটাত্তর দিন পরে গল্পটি । ১৯৭৮ সালের এপ্রিল মাসে সমরেশ বসুর সাথে শান্তিনিকেতনে সাক্ষাৎ হয় ভাস্কর শিল্পী রামকিঙ্কর বেজের । তখন শিল্পী রামকিঙ্করের বয়স ৭২। তখন সমরেশ বসু জীবনী লিখবার তাগিদে তথ্যসংগ্রহ শুরু করলেও রামকিঙ্করের বৈচিত্র্যময় জীবন হয়ে ওঠে উপন্যাসের উপকরণ। লেখকের শেষ উপন্যাস দেখি নাই ফিরে । ১৯৮৭ সালের ৩ জানুয়ারি থেকে দেশ পত্রিকায় ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হতে থাকে । যদিও লেখকের আকস্মিক মৃত্যু উপন্যাসটিকে অসমাপ্ত রেখে ছিল ।
১৯৮৮ সালের ১২ মার্চ শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন সমরেশ বসু ।
পরিশেষে বলা যায় , সমাবেশ বসুর সমস্ত রচনা , সব সাহিত্যকর্ম তাঁর জীবনযাপনের অঙ্গ । তাঁকে উৎকণ্ঠিত করে তুলত ব্যক্তির বিপণ্নতা । জন্মশতবর্ষে সৃষ্টিকর্মের আবহে - আবেগে - বিতর্কে বাংলা সাহিত্যে তাকে প্রাণবন্ত করে রাখা সত্যিই ভাববার বিষয় ।
সমরেশ
স্বয়ং বিষ্ণু স্বপ্নের পৃথিবীতে পদার্পন করেই চোখের জ্যোতিতে ধারন করেছে তোমার আমার যাবতীয় মায়াজাল চূর্ণ অহংকার ও মনের সাধ আহ্লাদ যা জগৎ কে অলংকৃত করে শোভা বাড়ায়।
চেতনার কেন্দ্রবিন্দুতে চোখ রেখে এঁকেছে জগতের সব মায়াজাল অন্ধবিশ্বাস আর ভুল চৈতন্যবলয়,
নগ্ন করে খুলে দিয়েছে হাজার দুয়ার সেখানে বসে মানুষ মানুষকেই করে অবহেলা ও তিরস্কার।
তাঁর কল্পজগতের আকাশে যিণি কালকূট তাঁর বিচরণ যেন মানুষের শুদ্ধিকরণ,
তাঁর কলমের ভেতর থেকে কালির নির্যাস গ্রাম পাহাড় ও শহরজুড়ে এঁকে দিচ্ছে স্বপ্নের ভুবন যেখানে জীবিত ও মৃত মানুষেরা রোজদিন প্রার্থনা করবে দেবদেবতার।
শতবর্ষেও আজ মনে হয় হাজার দুয়ার সব খুলে যাচ্ছে সমরেশ এর কলমের প্রতিটি শব্দমালায়,ঘন আবেগে লেখা এ জগৎ ও মানুষের বাকি সময় ভবিষ্যৎ কথামালা আরো কতো কী।
শান্ত
ঘুম- একটি পর্যটন কেন্দ্র
ঘুম ভারতের পশ্চিমবঙ্গের দার্জিলিং জেলায় অবস্থিত একটা পাহাড়। পশ্চিমবঙ্গের অন্যতম পাহাড়ি পর্যটন কেন্দ্র দার্জিলিঙের লাগোয়া ঘুম পাহাড় হল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ জমজমাট একটা হিল স্টেশন। দার্জিলিঙ যাবো আর ঘুম ভ্রমণ করবো না, এমনকী আর হয়। এর উত্তরে দার্জিলিং, দক্ষিণে কার্সিয়াং, পূর্বে তিস্তা তথা কালিম্পং এবং পশ্চিমে সুখিয়াপোখরি।
একঝাঁক আনন্দ আর ভ্রমণ পিপাসু মন নিয়ে বেড়িয়ে পড়লাম ঘুম ভ্রমণে । ভারতের উত্তরপূর্ব সীমান্ত রেলপথের একটা শাখা শিলিগুড়ি থেকে দার্জিলিং রুটের মধ্যে পড়ে ঘুম রেলস্টেশন। এই ঘুম রেলস্টেশন হল পৃথিবীর মধ্যে সবচেয়ে উঁচু রেলস্টেশন। শুধু তাই-ই নয়, এই রেল পরিবহন ওয়ার্ল্ড হেরিটেজের অন্তর্ভুক্ত। কাছাকাছি আছে মনোরম পাহাড়ি সৌন্দর্য উপভোগ করার জায়গা 'বাতাসিয়া লুপ'। সারা পৃথিবীর পর্যটকদের কাছে ঘুম রেল স্টেশন অন্যতম আকর্ষণ।
ঘুম রেল স্টেশন থেকে আরও ওপরে উঠলে পেয়ে যাবেন ঘুম বয়েজ হাই স্কুল। এই স্কুলের খেলার মাঠে পৌঁছালে মনে হবে পৃথিবীর ছাদে দাঁড়িয়ে আছেন! দার্জিলিং থেকে কালিম্পং, টাইগার হিল, সুখিয়াপোখরি, মিরিক, সান্দাকফু, বিজনবাড়ি যেখানেই যান-না-কেন, ঘুম পাহাড় ছুঁয়েই যেতে হবে, এই ঘুম হল একটি জংশন হিল স্টেশন।
যাই হোক ঘুম ভ্রমণের এই সুখদ স্মৃতি মনের এক কোণে গাঁথা থাকলো ।