Dec 30, 2023

সৃশর্মিষ্ঠা

অতঃপর

চলে গেছে 
মেঘ রোদ আলো অন্ধকার জল স্থল
সবাই

ভগাঙ্কুরে ক'টি আঁচড় 
আর আমি 

বিলাপের কাছাকাছি

শ্বেতা ব্যানার্জী

ক্রান্তিকাল

"তিনটি শালিখ ঝগড়া করে রান্নাঘরের চালে"

প্রথমেই যদি শালিখদের শাসন করা যেত,ঝগড়াটা

বাড়তে না দিয়ে, তাহলে বোধহয় সংসার সমাজে,রাজ্যে,রাষ্ট্রে ব্যপক হারে এই

ঝগড়া -ঝামেলা, অশান্তি লেগেই থাকতো না।

আসলে আমরা কোনো কিছুরই  কারণ খুঁজতে গভীর মূলে প্রবেশ না করে ডালপালা ধরে ঝুলোঝুলি করে কিছু ডাল ভেঙে গাছেরই ক্ষতি করি, প্রকারন্তরে নিজেদেরই। আর চুপচাপ বলি লেগে যা লেগে যা নারদ,নারদ। লাগলেই লাভ .... 

অস্ত্র, বিমান,নৌ বিক্রির হার বাড়িয়ে কিছু মনুফা লুটে নিজেদের ভুঁড়ি আরও একটু বাড়িয়ে নেওয়া। তাছাড়া গদি বাঁচানো অথবা গদি বাগিয়ে নেওয়া। 

হয়তো ভাবছেন আদারব্যাপারি হয়ে জাহাজের খোঁজের কী দরকার , কিন্তু সাগরে সুনামীর ঢেউ আসলে জাহাজের সঙ্গে খালের ডিঙিও যে আঁতকে উঠে... 

দুলতে থাকে অজানা আশংকায়।

দিনদিন জীবন টা যেন যুদ্ধ, যুদ্ধ হয়ে উঠছে। খাদ্যাভাসের যুদ্ধ, সংসারে মেনে না-ও মানিয়ে না-ও এর যুদ্ধ, জিনিসপত্রের দাম অগ্নিমূল্য, কড়ার তেল থেকে গাড়ির তেল, কোথায় যাবো!!  তার সাথে এসো যুদ্ধ যুদ্ধ খেলি  জুজুর ভয়ে অস্থির। তারই মধ্যে  স্থবির ও আত্মকেন্দ্রিক জীবন। 

এখন আমরা এক অস্থির  সময়ের মধ্যে দিয়ে সাঁতরে চলেছি... ডাঙায় উঠতে গেলে যে সুস্থির মানসিকতার প্রয়োজন হয় সমাজের মানুষের মধ্যে সেই সুস্থিররতা প্রায় নেই বললেই চলে। 

নীতি-নৈতিকতার ভূমিকা পালন করতে যে মানবিকতার প্রয়োজন আজ তার সামগ্রিক অধঃপতন। বর্তমান সময়ের একটি আলোচিত ঘটনার ভয়াবহতায় সবাই নির্বাক। সবার মনে   একই প্রশ্ন- আমাদের মানবিক মূল্যবোধগুলো কোথায় হারিয়ে গেল? 

হ্যাঁ, এই প্রশ্ন অনেকের মনে থাকলেও, প্রশ্নকর্তা কেউ নেই, বিবেক জাগ্রত না আহত! নৈতিক অবক্ষয় নিশ্চিত জেনেও উত্তরণের পথ খুঁজিনা।

চোখে রঙিন চশমা পরিয়ে আমাদের সো কলড্ অভিভাবকরা দূরদর্শনে দূরদর্শিতার রণকৌশল 

আলোচনায়  ওই "তিনটি শালিখের মতো "

....যেখানে  অসিহষ্ণু মানসিকতার হেঁসেল থেকে 

চাপান উতোরের উগ্র ফোড়নের পোড়াগন্ধ ছাড়া

কিছুই নাক ও  মনের দরজায় এসে পৌঁছায় না, গণতন্ত্রের ফানুস সেখানে গৎবাঁধা কিছু কথার

মোহজালের বুদবুদ হয়ে উড়তে থাকে। আর বুদ্ধিজীবিরা   ফুঃ এর উপর ফুঃ....

কিন্তু সঠিক কারণ না আমাদের বোঝাতে পারেন,

না নিজেরা বোঝেন।

আজ প্রযুক্তি কে হাতের মুঠোয় নিয়ে রঙিন স্বপ্ন উড়িয়ে বিস্ময়কর গতিতে এগিয়ে চলেছি,কিন্তু মানবিকতা!!

আমাদের জীবনে বেড়েছে বেগ,হারিয়েছি আবেগ।

ভোগবিলাসের ফুয়েল  ভরে নিয়ে জেট গতিতে জীবন কে ভোগ করতে গিয়ে মানবিকতার বিশুদ্ধতা হারিয়ে আজ "সেলফিশ জায়েন্ট "

শিক্ষিত, অতি শিক্ষিত, সমাজ দমন করতে পারেনি অপরাধ প্রবণতার ধারাবাহিকতকে, যা দিন দিন বেড়েই চলছে... 

আসলে এর পিছনেও আছে মনস্তাত্ত্বিক চিন্তাধারা

যা আসলে একটি রোগ, দার্শনিক দৃষ্টিকোণ থেকে  

কোনো জ্ঞানী কখনো কোনো অনৈতিক কাজের সাথে নিজেকে যুক্ত  করতে পারেন না। 

জ্ঞান চর্চার কোনো বিকল্প নেই। জ্ঞান মানুষের মূল্যবোধকে সতেজ করে তোলে। আসুন পুঁথিগত বিদ্যা নয় প্রকৃত শিক্ষার আলো জ্বেলে ক্রান্তিকাল অতিক্রম করি...।

দীপক রঞ্জন কর

চশমা

চশমাটা যে বড়ই বেয়াদব
ধরে সবার কানে ,
বড় ছোট নারী পুরুষ
কিছুই নাহি মানে।

শিক্ষক ডাক্তার মিস্ত্রি নেতা
সকলে তা জানে ।
নাকের উপর বসে এসে
কানে ধরে টানে।

পড়তে লাগে সবার আগে সকলে তারে খোঁজে
চক্ষুর আড়াল হলে পরেই 
অভাবটা তার বুঝে।

বাবু বুড়ো জ্যাঠা খুড়োর
আদরের ধন
না পেলেই হাতের কাছে 
দিশেহারা হন।

দাদু,ঠাকুমার ভারী চশমা
হারিয়ে না যায় পাছে,
ফিতে লাগিয়ে যত্ন করে
 রাখে বুকের কাছে।

কল্যাণী ভট্টাচার্য

বিজয়ের মাস শ্রদ্ধার মাস

১৬ই ডিসেম্বর বিজয়ের দিন
বাঙালী জাতির স্মরণীয় দিন। 
দীর্ঘ নয় মাস রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ শেষে
হয়েছে জয়ী বাংলাদেশ। 
তাইতো মোরা করি স্মরণ
বিজয়ের দিন শ্রদ্ধায় ভালোবাসায়। 
প্রাণ খুলে মোরা গাই গান
মোদের বাংলা ভাষায়। 
মোরা গান গাই মুক্তিযোদ্ধার
গান গাই একাত্তরের মানবতার গান। 
ত্রিশ লক্ষ শহীদের রক্তের বিনিময়ে
করেছি বাংলা অর্জন। 
নিয়েছিল শপথ বাঙালী সেদিন
করিতে রক্ষা মোদের মাতৃভূমি। 
কত প্রাণ দিয়েছিল মা ভাই বোন
তবু মনে তে জেগেছে নতুন আশার ভোর। 
পাক হানাদার বাহিনী সেদিন করেছিল আত্মসমর্পণ
মা ভাই বোন করেছিল বাংলা জয়। 
অর্জিত হয়েছে মোদের 
লাল সবুজের পতাকা। 
তাইতো বিজয়ের মাস শ্রদ্ধার মাস
মোদের ভালোবাসার মাস।

গীতশ্রী ভট্টাচার্য্য

শরীর

ভোর ভোর উঠে রাই। রাতে ঘুম ভাল হয়েছে। ফ্রেশ লাগছে বেশ। পাশে এখনো অর্ক অঘোরে ঘুমোচ্ছে। হাসি পায় রাইর। সারারাত যা দাপাদাপি করেছে।নতুন  ঢুকেছে ওদের অফিসে অর্ক। প্রথম থেকেই রাইয়ের প্রতি লাট্টু। রাই ওর চেয়ে অনেক সিনিয়র। বয়সে এবং পদেও। তাও, ছেলেটির প্যাশন দেখে রাই ও একটু আধটু পাত্তা দেওয়া শুরু করেছে ইদানিং। 

রাই সিঙ্গেল। ছেলে আছে পাঁচ বছরের।  মায়ের কাছে থাকে। গুল্লু পেটে থাকতেই হিরনের সাথে ছাড়াছাড়ি হয়ে গেছে। হিরণ আবার বিয়ে করে এখন একটি মেয়ের বাবা।  যাকগে, এসব নিয়ে কোনো মাথা ব্যথা নেই রাইর। নিজের জব , নিজের ছেলে এই ওর লাইফ। শনিবার মায়ের ওখানে চলে যায়, দুটি দিন ছেলের সাথে কাটিয়ে আবার সোম বার ফিরে আসা। এটাই রুটিন। 

অফিসে, অফিসের বাইরে অসংখ্য প্রেমিক ওর। রাই জানে সবগুলিই শরীরের প্রেম চায়। রাগ টাগ হয়না ওর। নিজের মত করে কাউকে ভাল লাগলে একটু ঘোরাফেরা, খাওয়া দাওয়া, নাইট পার্টি এসবে যায়। ইচ্ছে হলে শরীর দেওয়া নেওয়া। ব্যস্! এখানেই ইতি টানে ইমোশনের। 

আগে আগে বুঝতনা, সেন্টিমেন্টাল হত। প্রথম যখন ডিভোর্সের দু বছর পর অতীনের সাথে সেক্স হয়, সে ভেবেই নিয়েছিল ওকে ভালবাসে বলেই অতীন ওরকম করেছে। আর নিজেও সে অতিনকে পছন্দ করে। নইলে কী আর শরীর মিলে! মন না থাকলে শরীর হয়না। কত অবোধ ছিল তখন ভাবলেই হাসি পায় নিজের।

কিছুদিন আগে যখন মায়ের ওখানে গেল, মা কত কথা শোনাল। 

_ দেখ রাই, বিয়ে করে ওসব তোর যা খুশি কর। তুই কী ভাবিস আমি কোনো খবর পাইনা! তোর ওসব নষ্টামি কে সমাজ কী বলে, জানিস! 

ঠান্ডা গলায় জবাব দিয়েছিল রাই, 

_ জানি, বেশ্যা বলে। এটা নতুন কী! আর এতে আমার কিছু যায় আসেনা। তুমিও ভেবোনা এসব নিয়ে। 

_ ছি, ছি। গুল্লু বড় হলে ওকে কী বলবি তুই? কেমন মা রে তুই! মায়ের মুখের ওপর এসব নোংরা কথা বলতে তোর বাধলনা? 

_ যা বাবা, সত্যি বললেই দোষ। শোনো আমি গুল্লুর মা। ওকে আমি যতটা ভালবাসি কেউ বাসেনা। আশা করি বড় হলে সে নিজেও ওটা বুঝবে। মায়ের শরীর নিয়ে, চরিত্র নিয়ে ওর বলার কিছু থাকবেনা । এটা আমার ব্যক্তিগত ব্যাপার। 

অর্ক কে ঠেলে তুলে রাই। 

_ এই যে, উঠ বাড়ি যাও।আমার এখন অনেক কাজ। 

_ আরেকটু থাকি! আবদার করে অর্ক। 

- নো, রেডী হও আর ভাগো। আজ প্রজেক্ট টা যেন অবশ্যই জমা পড়ে। 

রাইর ঠান্ডা গলার কথা শুনে উঠে বসে অর্ক। ধীরে ধীরে তৈরি হয়ে বেরিয়ে যায়। 

সেদিকে তাকিয়ে রাইর মুখ থেকে বিচ্ছিরি একটি গালি বেরিয়ে আসে। 

এখন সে পুরুষদের মত সেক্স করে। যেখানে মনের কোনো কারবার নেই। ইচ্ছে হল তো যেকোনো মেয়ের সাথে ওরা ইচ্ছেমত সবকিছু করতে পারে। রাইর এখন আর আলাদা কোনো অনুভূতি হয়না। মেয়ে হয়ে জন্মেছে বলে কী ওর কোনো যৌনতার অধিকার থাকবেনা! আশ্চর্য তো! কারা ওকে বেশ্যা বলবে, হোর বলবে সেই ভয়ে নিজেকে বঞ্চিত রাখবে! আর যে পুরুষ বেশ্যা গুলো ওর কাছে আসে নিজের বউ বাচ্চাকে  ঘরে রেখে এদের কথা কে বলবে! শালা! 

এখন রাই শরীরের সাথে মন কে গুলিয়ে ফেলেনা। মনকে শক্ত করে আটকে রাখে নিজের কাছে। গুল্লুর কাছেই একমাত্র নিজেকে মেলে দেয় । বাকি সময় ওই খোলার ভেতরে যত্ন করে ভরে রাখে মন, ভালবাসা , অভিমান সবকিছু। 

নিজের ব্রেকফাস্ট তৈরি করে খেয়ে নেয় রাই। আজ অফিসে দুটো বড় মিটিং। ফিরতে দেরি হবে বুঝতে পারছে। বাইরে বেশ মিষ্টি রোদ উঠেছে। মেজাজটা বেশ ফুরফুরে লাগছে। 

ফ্ল্যাট লক করে বাইরে এসে গাড়িতে বসে রাই। চোখে সানগ্লাস তুলে দেয়। এখন গন্তব্য অফিস। 

কালো চশমার আড়ালে নিজের চোখের সমুদ্র লুকিয়ে নেয় রাই। রেডিওতে গান বাজে,

আমাদের গল্প গুলো....।

Dec 23, 2023

মিঠুন রায়

জন্মশতবর্ষে স্মরণ

 সমরেশ বসু: এক ব্যতিক্রমী কথাশিল্পী 

অপ্রতিরোধ্য কলমে বাংলা সাহিত্যে যিনি নিজের স্থান নিজেই প্রতিষ্ঠা করেছেন তিনি সমরেশ বসু । তাঁর জন্ম নাম সুরথ নাথ বসু । জীবনের প্রতি পদক্ষেপে অনিশ্চয়তা , দারিদ্র্য, তাকে বিধ্বস্ত করেছে বারবার ।কিন্তু পরাস্ত করতে পারেনি তাঁকে। বরাবরই মাথা উঁচু করে বাঁচতে  শিখেছেন । বলা যেতে পারে , জীবনের প্রতিকূলতা গুলিই তাঁকে শক্তি জুগিয়েছে।

  তিনি লিখেছেন একশোর বেশী উপন্যাস এবং তিন শতাধিক গল্প। অনেক ছোটগল্প লিখেছেন । তাঁর  রচনায় রাজনৈতিক কর্মকান্ড , শ্রমজীবী মানুষের জীবন এবং যৌনতা সহ বিভিন্ন অভিজ্ঞতার সুনিপুণ বর্ণনা ফুটে  উঠেছে।

  ১৯২৪ সালের ১১ ডিসেম্বর ঢাকা শহরের রাজনগর গ্রামে জন্ম হয় সমরেশ বসুর । বাবা মোহনীমোহন বসু ও মা শৈবলিনী দেবী । পাঁচটি সন্তানের মধ্যে সমরেশ চতুর্থ । সদ্যোজাত এই চতুর্থ সন্তানের নাম রাখা হয় তড়বড়ি ।সব অংশের মানুষের সাথে সহজেই মিশে যেতেন এই বালক । প্রতিবেশীরাও তাকে খুব স্নেহ করতেন । বরাবরই ছিল নির্জনতা প্রিয় । নির্জনতার সন্ধানে চলে যেতেন শ্মশানে । স্কুলের গতানুগতিক শিক্ষা তার ভালো লাগত না । স্কুল ফাকি দিয়ে নানা রকম দুঃসাহসিক অভিযানে বের হতেন । তবে অবসর সময়ে প্রচুর গল্পের বই পড়তেন । ছবি আঁকার প্রতি প্রবল ঝোঁক ছিল । সমালোচক সরোজ বন্দ্যোপাধ্যায়ের লেখা থেকে জানা যায় সমরেশ বসু ভাল বাশি বাজাতে এবং গান গাইতে পারতেন । বালক সুরথ নাথের নাম সমরেশ দেন তাঁর বন্ধু ও শ্যালক দেবশঙ্কর মুখোপাধ্যায় । ১৯৩৯ সালে নৈহাটীর মহেন্দ্র স্কুলে ভর্তি হন  সমরেশ বসু । পরীক্ষায় ফেল করেন । এখানেই প্রথাগত শিক্ষার ইতি টানেন । কিছুদিন ঢাকেশ্বরী কটন মিলে কাজ করেন সমরেশ বসু । পরে আবার চলে আসেন নৈহাটীতে । 

  এক সময় কঠিন রোগে আক্রান্ত হন । বন্ধুর দিদি স্বামী পরিত্যক্তা গৌরী দেবী অসুস্থ সমরেশ বসুকে সুস্থ করে তোলেন । এই নারীই ছিল তাঁর প্রথমা স্ত্রী । চরম দারিদ্র্যতার জেরে এক সময় গরিফা থেকে ব্যারাকপুর পর্যন্ত সাহেবদের কোয়ার্টারে ডিম বিক্রি করে সংসার চালাতেন তিনি । এ সময় মার্ক্সবাদী ভাবধারার সাথে তিনি যুক্ত হন । ১৯৪৩ - ১৯৪৯ সাল পর্যন্ত ইছাপুর বন্দুক কারখানায় চাকরি করেন তিনি । এই সময় পর্বে তিনি কমিউনিস্ট পার্টির কর্মকান্ডে জড়িয়ে পড়েন । একসময় কারাবরণও করেন । জেল থেকে মুক্তি পাবার পর লেখাই হয়ে উঠে তাঁর নেশা । 

  আসলে জীবনে ব্যাপক অভিজ্ঞতা তাঁর সৃষ্টির পরিমাণকে বিশাল করে তুলেছে । ১৯৪৫ সালে প্রথম উপন্যাস 'নয়নপুরের মাটি' গ্রন্হাকারে বের হয় । পরবর্তী পর্যায়ে বের হয়েছে শ্রীমতী কাফে ( ১৯৫৬ ) , অমৃত কুম্ভের সন্ধানে(১৯৫৪ ) ,গঙ্গা ( ১৯৫৬ ) , শেষ দরবার ( ১৯৬৩ ) , স্বর্ণ পিঞ্জর ( ১৯৬৫ )।

    সমরেশ বসু প্রথমে গল্পকার , পরে ঔপন্যাসিক । মহাকালের রথের ঘোড়া , মানুষ শক্তির উৎস,যুগ যুগ জীয়ে, শেকল ছেঁড়া হাতের খোঁজে, তিন পুরুষ ইত্যাদি তাঁর লেখা রাজনৈতিক উপন্যাস । জগদ্দল , গঙ্গা , বাথান  ইত্যাদি গোষ্ঠী ভিত্তিক উপন্যাস । বিবর , প্রজাপতি , পাতক - এই উপন্যাস গুলিতে উচ্চবিত্ত শ্রেণীর সঙ্কট ও যৌনতার অনাবরণ প্রকাশ পেয়েছে । 

  তিনি রাজনীতি আশ্রিত উপন্যাস গুলিতে সমকালীন সমস্যা এবং শাশ্বত মূল্যবোধের মিশ্রণ ঘটিয়েছেন । মহাকালের রথের ঘোড়া তার লেখা অন্যতম শ্রেষ্ঠ উপন্যাস । এই উপন্যাসের নায়ক রুহিতন করছি । তার বাবা পোশপত কুরমি তরাইয়ের চা বাগানে চার পুরুষের মজুর । গল্পের শুরু থানার লকআপে রুহিতনের উপর চলছে অকথ্য অত্যাচার।নকশাল আন্দোলনের পটভূমিকায় ফুটে উঠেছে থানার উপর চলছে প্রচন্ড পুলিশি অত্যাচারের , নকশাল আন্দো রচিত এই কাহিনিতে লেখকের রাজনৈতিক দ্বিধার পরিচয় ফুটে উঠেছে রুহিতন চরিত্রে । আবার তিন পুরুষ উপন্যাসে দেখা যায় , সূর্যমোহন । সৌরীন , সুদীপ- তিন পুরুষ রাজনৈতিক জীবন থেকে রাজনীতিহীন জীবনের দিকে যাত্রা করছে । এই উপন্যাসের আর একটি চরিত্র সীতানাথ চরিত্রেও বিপ্লব সাধনার সঙ্গে মিশে গেছে রোমান্টিক স্বপ্নময়তা । 

  গ্রাম জীবনের পাশাপাশি নগর জীবনকেও খুব নিকট থেকে দেখেছেন সমরেশ বসু । তবে গোষ্ঠীজীবনের কথা লিখতে গেলে গ্রামই বার বার প্রাধান্য পায় । রাজনীতি ও গোষ্ঠী জীবন ওতোপ্রোত ভাবে জড়িয়ে আছে  উত্তরঙ্গ উপন্যাসে । জগদ্দল উপন্যাসে পাওয়া গেছে অন্যতম জটিল রূপায়ণ । একজন কর্মচ্যুত বেকার শিল্প শ্রমিক গোবিন্দর স্বপ্ন আর স্বপ্নভঙ্গের কাহিনী ফুটে উঠেছে বি.টি রোডের ধারে উপন্যাসে । শিল্প শ্রমিকদের জীবনই এর মুখ্য বিষয় । টানাপোড়েন উপন্যাসে বিষ্ণুপুরের পাটরাঙাদের জীবনযাপনের ছবি পাওয়া যায় । ধনতান্ত্রিক সমাজে তাঁতী গোষ্ঠীর জীবন দৈন্যতার চিত্র অঙ্কিত হয়েছে - এই উপন্যাসে । আবার ছিন্নবাধা উপন্যাসের গ্রাম সমাজ ও শহরের শ্রমিক জীবনের চিত্র রূপায়িত করা হয়েছে । 'পদক্ষেপ' উপন্যাসে ইউনিয়ন আন্দোলনের স্বরূপ বর্ণিত হয়েছে । অনেকেই হয়তো জানেন না , যে জেলখানায় বসে সমরেশ বসু তাঁর প্রথম উপন্যাস ' উত্তরঙ্গ' রচনা করেন ।

    কালকূট শব্দের অর্থ বিষ । তিনি কালকূট ছদ্মনাম দিয়ে বেশ কিছু উপন্যাস লিখেছেন । অমৃত কুম্ভের সন্ধানে , কোথায় পাব তারে , ঐ সব উপন্যাসে তিনি কালকূট নাম ব্যবহার করেছেন । 'ভ্রমর' ছদ্মনামে লেখা তিনটি উপন্যাস – 'যুদ্ধের শেষ সেনাপতি ', 'হাতে তোমার রক্ত' , প্রেম - কাব্য রক্ত যথাক্রমে ১৩৮৯ , ১৩৯০ ও ১৩৯১ সালে প্রকাশ হয় । সমরেশ বসুর কালজয়ী জীবন কাহিনী থেকে প্রবাহ পত্রিকায় প্রকাশিত 'ভোট দর্পণ ' নামে রচনায় কালকূট নামটি ব্যবহার করেন ।

  ১৯৪৬ সালে পরিচয় পত্রিকায় আদাব গল্প প্রকাশ হয় । তার আগে স্বাধীনতা পত্রিকায় প্রকাশ হয় অন্যতম ছোটগল্প ' 'শের সর্দার '। এই সব গল্প তাঁকে ছোটগল্পাকার হিসেবে স্বীকৃতি দেয় । অকালবৃষ্টি , ঋতু , মনোমকুর , পাহাড়ী ঢল , সুবর্ণা , বনলতা , মানুষ , চেতনার অনুকার , ধর্ষিতা , কামনাবাসনা ইত্যাদি তাঁর লেখা অন্যতম গল্প সংকল্পন। শিশু - কিশোরদের জন্যও তিনি অনেকগুলি গল্প - উপন্যাস লিখেছেন । তাঁর রচিত ছোটগল্পগুলি আমাদের মনে দোলা দেয়।যেমন- 'ফটিচার ' গল্পে আছে কয়েকটি রিক্সার মালিক আর শ্রমিক স্বার্থের লড়াই । শিশু শ্রমিকদের দৈন্যদশা নিয়ে লিখেছেন অন্যতম গল্প' নিষিদ্ধ ছিদ্র' ও 'পেলে লেগে যা' । এসমালগার ' গল্পে তেরো বছর বয়সী এক চোরাচালানকারীর কথা উল্লেখ রয়েছে । তাঁর লিখিত গল্প সম্পর্কে সুমিতা চক্রবর্তী মন্তব্য করেছেন যে,-' সত্তরের দশকের নকশালবাড়ি আন্দোলনের বিস্ফোরণের পর সেই বাস্তবতাবোধের অভিঘাত আত্মস্থ করে নিয়ে বাংলা সাহিত্যে যে একজন তরুণ গল্পকারের আবির্ভাব হয়েছিল , তাঁদের পূর্বসূরী ছিলেন সমরেশ বসু ।' 

   অন্যভাবে বলা যায়  উচ্চবিত্ত - মধ্য ও নিম্নবিত্তদের জীবনচিত্রের সঙ্গে সঙ্গে তথাকথিত ভদ্রলোক যারা নন , স্মাগলার , ওয়াগান ব্রেকার , পকেটমার , ডোম , গুনিন এদের নিয়েও অসংখ্য গল্প লিখেছেন তিনি । যেমন : সাধ গল্পের দেশে আছে গোপীনাথ নামে এক রিক্সাওয়ালা । 'মেঘলা ভাঙা রোদ 'গল্পে বিশু নামক এক ড্রাইভারের মানবিকতার কাহিনী তুলে ধরা হয়েছে । 'খিঁচাকালা সমাচার' গল্পের কেন্দ্রবিন্দু এক পকেটমার । ওয়াগন ব্রেকার এবং সমাজবিরোধী ফটিককে নিয়ে লিখেছেন  আটাত্তর দিন পরে গল্পটি । ১৯৭৮ সালের এপ্রিল মাসে সমরেশ বসুর সাথে শান্তিনিকেতনে সাক্ষাৎ হয় ভাস্কর শিল্পী রামকিঙ্কর বেজের । তখন শিল্পী রামকিঙ্করের বয়স ৭২। তখন সমরেশ বসু জীবনী লিখবার তাগিদে তথ্যসংগ্রহ শুরু করলেও রামকিঙ্করের বৈচিত্র্যময় জীবন হয়ে ওঠে উপন্যাসের উপকরণ। লেখকের শেষ উপন্যাস দেখি নাই ফিরে । ১৯৮৭ সালের ৩ জানুয়ারি থেকে দেশ পত্রিকায় ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হতে থাকে । যদিও লেখকের আকস্মিক মৃত্যু উপন্যাসটিকে অসমাপ্ত রেখে ছিল । 

  ১৯৮৮ সালের ১২ মার্চ শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন  সমরেশ বসু । 

  পরিশেষে বলা যায় , সমাবেশ বসুর সমস্ত রচনা , সব সাহিত্যকর্ম তাঁর জীবনযাপনের অঙ্গ । তাঁকে উৎকণ্ঠিত করে তুলত ব্যক্তির বিপণ্নতা । জন্মশতবর্ষে সৃষ্টিকর্মের আবহে - আবেগে - বিতর্কে বাংলা সাহিত্যে তাকে প্রাণবন্ত করে রাখা সত্যিই ভাববার বিষয় ।

সনজিৎ বণিক

সমরেশ

স্বয়ং বিষ্ণু স্বপ্নের পৃথিবীতে পদার্পন করেই চোখের জ্যোতিতে  ধারন করেছে তোমার আমার যাবতীয় মায়াজাল চূর্ণ অহংকার ও মনের সাধ আহ্লাদ যা জগৎ কে অলংকৃত করে শোভা বাড়ায়। 

চেতনার কেন্দ্রবিন্দুতে চোখ রেখে এঁকেছে জগতের সব মায়াজাল অন্ধবিশ্বাস আর ভুল চৈতন্যবলয়,

নগ্ন করে খুলে দিয়েছে হাজার দুয়ার সেখানে বসে মানুষ মানুষকেই করে অবহেলা ও তিরস্কার।

তাঁর কল্পজগতের আকাশে যিণি কালকূট  তাঁর বিচরণ যেন মানুষের শুদ্ধিকরণ,

তাঁর কলমের ভেতর থেকে কালির নির্যাস গ্রাম পাহাড় ও শহরজুড়ে এঁকে দিচ্ছে স্বপ্নের ভুবন যেখানে জীবিত ও মৃত মানুষেরা রোজদিন প্রার্থনা করবে দেবদেবতার।

শতবর্ষেও আজ মনে হয় হাজার দুয়ার সব খুলে যাচ্ছে সমরেশ এর কলমের প্রতিটি শব্দমালায়,ঘন আবেগে লেখা এ জগৎ ও  মানুষের বাকি সময় ভবিষ্যৎ  কথামালা আরো কতো কী।

শুভ্রা দেব

হিমঘর
        
একঘেঁয়েমি গন্ধ শুঁকে
বেমালুম ইচ্ছেরা জট বাঁধে,
ফেলে আসা ভুলের ভারে
নতজানু হয় তর্জনীর শিষ!
 
হিমঘরে গলনাঙ্কের প্রহর গোণে...
বরফ জমানো অফুরন্ত স্বপ্নরাশি,
দু'ফোঁটা নোনাজল শুকিয়ে
ভাব জমায় সুদূর বাতাসে।

শর্মি দে

বাংলার সুকুমার

শুরু হলো 'আবোলতাবোল'
কত 'ছবি ও গল্প' কত গোলমেলে গোল 
'ওবাবা!' 'খিচুড়ি' খেয়ে 'কাঠবুড়ো'টা বলে
 'গেলুম গেলুম, আমায় ধরে তোল!'
এবার গেলো দেখতে ভালো
'সৎপাত্র' যে বেজায় কালো...
উনিশ বারেও করে না পাশ
গঙ্গারামের মন উদাস!
'কাতুকুতু বুড়ো' এবার 'চিমটি কাটে ঘাড়ে' 
করে তোড়জোড় 
'ভালরে ভাল' ভাবতে ভাবতে 
খেলো আবার হোঁচট, 
'পাউরুটি আর ছোলা গুড়'!
এবার ছোটে 'কুমড়ো পটাশ'
নেচে কেঁদে হেসে
আলতা গুলে লাগায় ঠোঁটে 
যাচ্ছে সে বুড়ীর বাড়ি 
থামবে না সে মোটে!
এবার পথে পায় দুটো সাপ
টগবগে জ্যান্ত
কেঁপে বলে ক্ষমা কর বাপরে বাপ
তবুও সাপ হয়না যে ক্ষান্ত!
"ও সুকুমার ও সুকুমার" ডেকে বলে হ্যাংলায়,
ভেঙে যায় ঘুম সুকুর, পড়ে আছে বাংলায়!

সপ্তমিতা নাথ

 শিশুকবি সুকুমার 

উপেন্দ্র পুত্র "ও সুকুমার" ,
রেখে গেছো কত সাহিত্যের সমাহার।
জন্মেছ তুমি স্বর্ণযুগে,
বাঙালির নবজাগরণে ।
পরিবেশ ছিল সাহিত্য অনুরাগী,
পরিবার ছিল নামকরা চৌধুরী।
শিশু সাহিত্যিক-ছড়াকার , প্রাবন্ধিক-নাট্যকার --
সবেতেই তুমি সেরা তুমি বিজয়ী।
প্রভাবিত তুমি পিতা সহ রবীন্দ্রনাথ দ্বারা --
 বেষ্টিত ছিলে প্রফুল্ল চন্দ্র রায় ও জগদীশচন্দ্র ,সবাই বিদুষী।
 কলম তোমার ধারালো অস্ত্র  আজও শ্রেষ্ঠ,
 তাই 'ননসেন্স' বিশ্বে  আজকেও বেষ্ট সেন্স।
 সাহিত্যই নয় দর্শনেও চরাচর, তুমিও ব্রাহ্মসমাজের সংস্কারপন্থী,
মত দর্শাতে হিন্দুত্বের, রচনা 'অতীতের কথা' হে বিশ্বাসী একেশ্বরবাদী।
 সাইত্রিশ বছরের স্বল্প আয়ু, যুগান্তরের বিশদ সৃষ্টি ,
বিশ্বপরিচিত শিশু সাহিত্যিক, চিরঅম্লান তোমার সৃষ্ট সংস্কৃতি ও বৃষ্টি।

কল্যাণী ভট্টাচার্য

শ্রদ্ধায় স্মরণে

শৈবলীনি দেবী মাতা পিতা মোহিনী মোহন। 
গরীব ঘরে জন্ম তোমার তুমিই তো সমরেশ। 
বাবা মায়ের অষ্টম সন্তান তুমি প্রখ্যাত বাঙালি লেখক। 
পড়াশোনা ছিল না তেমন কলম ছিল ক্ষুরধার। 
জন্ম তোমার ঢাকা জেলার মুন্সিগঞ্জের রাধানগর। 
১১ই ডিসেম্বর (১৯২৪) শুভ জন্মদিন। 
জন্মলগ্নে নাম তোমার সুরথ নাথ বসু। 
পরম শ্রদ্ধায় জানাই তোমায় শতকোটি প্রণাম। 
বিদ্যা বুদ্ধিতে প্রখর তুমি ক্ষিপ্রতা কাজে। 
ধন্য তোমার পিতামাতা ধন্য মোদের ভারত। 
কঠোর জীবন সংগ্রামে তোমার
হয়েছে সাহিত্য সৃষ্টি। 
ব্যাতিক্রমী লেখক তুমি ব্যাতিক্রমী চরিত্র। 
বামপন্থী ছিলে বলে হয়েছিল কারাবাস। 
জীবন টানা পোড়েনের মাঝে ব্যাতিক্রমী কালজয়ী উপন্যাস। 
জাগতিক প্রেম এসেছে তোমার জীবনে বহুবার। 
দ্বিধাহীন চিত্তে করেছ গ্রহণ ভাবনি একবার। 
ফিরে এসো দেখব তোমায় এ ধরায় একবার। 
আজও তোমায় রেখেছে মনে ভারতবাসী সবাই।

সুমিতা চৌধুরী

চির সমর বিজয়ী যোদ্ধা

জীবনের তীব্র হলাহল পান করে হয়েছিলে কালকুট,
তবু থামাওনি অমৃত কুম্ভের সন্ধানে তোমার অভিযান। 
সমাজের অলিগলির যতো  বিবর, তাকে সর্বসমক্ষে এনেছিলে বাস্তবিক নগ্নতায়,
তাই বিতর্ক তোমার পিছু ছাড়েনি আজীবন। 

তবু, এতোসবের মধ্যেও যত্নে লালন করতে এক চিরসবুজ মন,
তাই তোমার গোগোল আজও শিশু-কিশোরের দোসর। 
তোমার এক ভ্রমণপিপাসু মন বেদুইন হতো পথের ফেরারী ডাকে,
চোখ-মনের সে আয়নার প্রতিফলন ঘটতো তোমার সোনার কলমে।

কর্মজীবনের প্রথমেই সর্বসাধারণের অধিকারের দাবীতে হয়েছিলে সোচ্চার, 
বরেছিলে কারাবাস নির্দ্বিধায়। 
ফিরেছিলে কলমকে হাতিয়ার করে এক নতুন জীবন যুদ্ধে,
আপন নামকে স্বার্থক করে হয়েছিলে সকল সমর বিজয়ী সমরেশ।

 জীবনের পথে ভ্রমর হয়ে প্রেম রসেরও করেছিলে বুঝি রসস্বাদন,
উপন্যাসের পাতায় ফুটে উঠেছিল তারই নির্যাস।
আবার কোথাও তোমার নিজস্ব মর্মান্তিক অভিজ্ঞতা ফুটে উঠেছিল লেখনীর ছত্রে-ছত্রে,
দেশভাগ, দাঙ্গা, উদ্বাস্তু জীবনের বিভীষিকাময় অধ্যায়  প্রোথিত করেছিলে আপামর বাঙালির মন ভাবনায়।

আজীবনের নিরলস সংগ্রাম চালিয়েছিলে দৃঢ় আত্মবিশ্বাসে, 
দাঁতে দাঁত চেপে।
তবু মনোবল কখনো টলেনি এতোটুকু,
তাই তো তুমি সব সমর বিজয়ী এক নির্ভিক সৈনিক।

তোমার শাণিত কলমে তুমি আজও অপরাজেয়, এক ধ্রুবতারা। 
যে আজও পথ দেখায়, ভাবায়, আগামী প্রজন্মকেও আপন চিন্তাধারার পরিসরে।
তাই তো তুমি প্রণম্য, আপামর বাঙালি সভ্য সমাজের, 
আজও শতবর্ষ পরেও ভীষণ প্রাসঙ্গিক, সজীব, আপন উন্নত চেতনা ধারার আঙ্গিকে।।

পাপিয়া দাস

মাপকাঠি 

তোমার  আমার  ভালোবাসা 
যেন বহুদিনের।
তোমার  আমার  মনের মিল 
যেন যুগ যুগান্তরের।
আমার  জীবনে তোমায় পেয়ে
আমি হয়েছি ধন‍্য।
তুমি আমার  প্রাণের পুরুষ 
আমার  প্রিয় বলে গন‍্য।
সংসারেতে যতো আসুক বাধা
দুজনে  মিলে ঘুচাব, আছে নিশ্চয়তা।
 আমাদের  ভালোবাসার মাঝে
আছে  বিশ্বাস আর সরলতা।
তোমার  ভালোবাসায় বেঁচে আছি
জীবন হয়েছে রঙীন।
এভাবে বিশ্বাসে জড়িয়ে তুমি
চিরকালের ভালোবাসার হও সঙ্গীন।

মীনাক্ষী চক্রবর্তী সোম

অসমাপ্ত রয়ে গেল

দুর্দান্ত সময় ঘিরে বিবর আর প্রজাপতির হাতছানি
প্রাপ্তবয়স্ক হওনি বলে অহরহ বড়দের শাঁসানি,
ওদিকে অকুতোভয় ভ্রমর তখন কালকূটের দোসর।
শ্লীল-অশ্লীলকে তুড়ি মেরে ধূলিসাৎ করার 
মনন বোধ আর বেপরোয়া কলম যাঁর,
সতের বছরের আইনি যুদ্ধ শেষে 
অদম‍্য সেই আখরচাষীরই জয়জয়কার।
নির্যাতিত নিরন্নের মুখের ভাষায়
নেতি নেতি দুর্বিষহ জীবন থেকে নিংড়ে নির্যাস  
অমৃতকুম্ভের সন্ধানে অক্লান্ত এক যাত্রা
মন্থন শেষে লিখে রাখা অবিরত অন্বেষণ।
খ‍্যাপা হয়ে তাঁরেই খোঁজে বাউলমন
উত্তরঙ্গ থেকে নয়নপুরের মাটি ছুঁয়ে 
অসমাপ্ত রয়ে গেল 'দেখি নাই ফিরে'।।

অভিজিৎ দত্ত

লেখক সমরেশ বসু 

গল্প,উপন্যাস লিখে 
যিনি হয়েছিলেন বিখ্যাত 
তার আসল নাম সুরথনাথ বসু হলেও 
সমরেশ বসু নামেই তিনি ছিলেন 
সবার কাছে পরিচিত। 
জন্মেছিলেন অবিভক্ত বাংলার 
ঢাকার বিক্রমপুরে 
পরবর্তী তে তিনি চলে আসেন 
পশ্চিমবঙ্গের কোলকাতার নৈহাটিতে
দাদার কাছেতে।
লেখক সমরেশ বসুর জীবন 
 ছিল অনেক সংগ্রামে ভরা 
কমিউনিস্ট পার্টি করার অপরাধে 
যেতে হয়েছিল জেলখানা। 
তার প্রথম উপন্যাস, উত্তরবঙ্গ 
সেখানেই করেছিলেন রচনা।
গল্প, উপন্যাস লেখায় 
তিনি ছিলেন সিদ্ধহস্ত 
কালকূট, ভ্রমর ছদ্মনামে তিনি 
লিখেছিলেন অনেক উপন্যাস 
নিজের মনের মত।
গোয়েন্দা গোগোলকে নিয়ে 
লিখেছিলেন বহু ছোটগল্প 
যা তাকে শিশুসাহিত্যে 
করেছিল বিশেষভাবে  জনপ্রিয়।
১৯৪২ এ বামপন্থী রাজনীতির
 সঙ্গে হন তিনি পরিচিত 
এর সংস্পর্শে এসে তিনি হন 
স্বশিক্ষিত ও উন্নত। 
ছোটবেলা থেকেই তার জীবন 
ছিল সংগ্রামে ভরা 
করতে হয়েছে বিভিন্ন কাজ 
মাথায় সবজি ও ডিম নিয়ে ফেরি করা।
শাম্ব উপন্যাস সৃষ্টির জন্য 
সাহিত্য আকাদেমী পুরস্কারে 
তিনি হন সম্মানিত। 
এছাড়াও নানা পুরস্কার পেয়ে 
তিনি হন বিখ্যাত। 
শতাধিক উপন্যাস ও ছোটগল্পের রচয়িতা 
কী অসাধারণ ছিল তার জনপ্রিয়তা
১৯৮৮ সালের মার্চ মাসে 
মহাপ্রয়াণ ঘটেছিল তার এই পৃথিবী থেকে।
এ বছর তার শততম জন্মদিবসে 
তাকে শ্রদ্ধা জানাই অন্তর থেকে।

পূজা মজুমদার

প্রিয় সমরেশ  

তুমি  ছিলে  বলে  জানতে  পারলাম
প্রজাপতি উপন্যাস,
তুমি  ছিলে বলে  জানতে পারলাম মহাকালের  রথের  ঘোড়া, 
তুমি  ছিলে বলে জানতে পারলাম  গঙ্গা, 
তুমি ছিলে বলে জানতে পারলাম  সওদাগর, 
তুমি  ছিলে বলে জানতে পারলাম  'বিবর'
তুমি ছিলে বলে জানতে পারলাম নয়নপুরের  মাটি, 
তুমি  ছিলে বলে জানতে পারলাম মুক্তবেণীর  উজানে।

বৈশালী নাগ

কবি সমরেশ বসু

বিক্রমপুরে জন্ম এই প্রখ্যাত ভারতীয় লেখকের নামটি তার সমরেশ বসু,
ছোটবেলা কাটে তার অসীম দারিদ্রতায় ডিম ফেরি করে,
কালকুট, ভ্রমর নামেই তার লোকো পরিচিতি;;
ছোটগল্পের সংখ্যা তার অনেক, শ্রমজীবীদের নিয়ে ছিলো তার অভূতপূর্ব লেখনশৈলী,
সাহিত্য একাডেমিতে পুরস্কারপান উনি,
১৯৮৮ সালের ১২ মার্চ নক্ষতের হয় পতন,
শতকোটি প্রণাম জানাই আজ এই সাহিত্যের চরণে।

Dec 1, 2023

অসীম পাঠক

সহযাত্রী

(নাটক না বলে কথোপকথন না বলে একে বলি জীবনের একটুকরো ছবি)
চরিত্র - অংশুমান ও দীপান্বিতা
 হাওড়া স্টেশনে হেমন্তের গোধূলি বেলায়  রাজধানী এক্সপ্রেসের  কম্পার্টমেন্টে দুজনের দেখা বারো বছর পর .... 
অংশু - অবশেষে রেল গাড়ির হঠাৎ দেখাটা হয়েই গেলো , ভাবিনি সম্ভব হবে কোনোদিন তা ম্যাডাম  কতদূর তোমার গন্তব্য ?
দীপা - দিল্লি , তুমি ? 
অংশু- কানপুর , একটা সেমিনার আছে।
দীপা - আর তো এগারো বছর আটমাস বারোদিন চাকরি , তাই না ? 
অংশু - বাপরে বরাবরই তোমার স্মৃতিশক্তি প্রবল , এতোটা মনে আছে ? 
দীপা- ঘোরো টো টো করে আর কটা বছর , আফটার রিটায়ার্ড মেন্ট কি করবে ? 
অংশু - ফার্ম হাউস ,গাছপালা পশুপাখি  নিয়ে থাকবো।
দীপা- বাঃ উন্নতি হয়েছে। যে অংশুবাবু কখনও একটা ফুলের চারা লাগায়নি সে কিনা ফার্ম হাউস করবে ... 
অংশু - সময়ের সাথে সব বদলায় ম্যাডাম , আচ্ছা তোমার কনুইয়ের নীচে সেই পোড়া দাগটা দেখি তো গেছে কিনা ... 
দীপা- তুমি অনেক রোগা হয়ে গেছো , তা ওজন কত শুনি ? 
অংশু -  সত্তর বাহাত্তর হবে বোধহয় মাপিনি, 
দীপা - তা কেনো মাপবে ? একটা অগোছালো মানুষ।
অংশু - যাক বাবা তাও অপদার্থ শব্দ টা বলোনি। 
দীপা - ভাবোনা ডিভোর্স হয়েছে বলে সে অধিকার নেই।  সমাজ বিজ্ঞানের অধ্যাপক হয়েও আসলে সমাজটাই শেখোনি , আর কি শিখেছো বলো, ঐ ছেলে পড়ানো , সেমিনার আর লেখালেখি। তা ধন্যবাদ তোমার রূপালী ঠৌট উপন্যাস এবছর একাডেমি পেলো , দারুণ লেখো তুমি, আগের চেয়ে অনেক ধার। 
অংশু- বাঃ তুমি পড়েছো ? 
দীপা- সব পড়েছি , তোমার রিসেন্ট উপন্যাসের নায়িকা মেঘনা টি কে ? মানে কার আড়ালে কাকে লিখেছো ? 
অংশু - এও কি বাংলা সাহিত্যের অধ্যাপিকাকে বলে দিতে হবে ? 
দীপা- বারোটা বছর সময়ের শাসনে অনেক বদলালেও আমি বোধহয় সেই বড্ড সেকেলেই রয়ে গেলাম। 
অংশু - একা একাই কাটিয়ে দিলে বারো বছর। 
দীপা- একই প্রশ্ন আমিও করতে পারি। 
অংশু - আচ্ছা দীপা আজ না হয় শেষবারের মতো বলি,  আমার মধ্যে কি ছিলো না বলোতো ? কেনো পারোনি এই বাউন্ডুলে ভবঘুরে মানুষটার সাথে চিরকালের ঘর বাঁধতে ? আমি কি ভালোবাসতে জানি না ? 
দীপা- এসব প্রশ্ন আজ অবান্তর। আমাদের মিউচুয়াল সেপারেশনের এই বারো বছরে বাউন্ডুলে অধ্যাপক ডক্টর অংশুমান সান্যাল একবারো আমার দরজার কড়া নাড়েনি। বেশতো আছো তুমি , ঘুরছো ফিরছো সুন্দরী তন্বী ষোড়শী ছাত্রীদের নিয়ে সেলফি তোলো , প্রেমের গল্প লেখো .... 
অংশূ - আর বিরহের কবিতা সে কি তোমার অজানা ?  তোমার গান শুনলাম সেদিন ফেসবুক লাইভে।  গোটা স্ক্রিন জুড়েই প্রজাপতির মেলায় তোমার উজ্জ্বল উপস্থিতি , কি সুন্দর গাইলে সেদিন , আমার পরান যাহা চায় তুমি তাই ... 
দীপা - এই একদম ফোলাবেনা।  আরে মাফলারটা জড়াও গলাতে , ঠান্ডা লাগবে। মোজা পরেছো? এই আমি জানতাম স্যান্ডেল পরে থাকবে , ওঃ কি যে করি । ঠান্ডা লাগবে , বুকে সর্দি জমবে। বয়সটাতো আর কম হলো না। 
অংশু - হ্যাঁ ওই বিকেলে ভোরের ফুল , মরার আগে দপ করে জ্বলে ওঠার মতো তোমাকে এই দুরন্ত ট্রেনে পাওয়া । সেই রবী বাবু মরেও মরে না। 
দীপা- এই আমার প্রথম প্রেমকে নিয়ে একদম কথা বলবেনা। রবিবাবু ইজ দা বেস্ট , এভারগ্রিন লাভ। 
অংশু - তা দিল্লি কি কাজে ? 
দীপা - কেনো বেড়াতে , ওখানে বয় ফ্রেন্ড আছে যদিও আমার চেয়ে সে দশ বছরের ছোট। 
অংশু - চোখের কোনে কালি আর রঙ করা চুল নিয়ে আর প্রেম করতে হবে না। বুড়ি কোথাকার। 
দীপা-  এই খবরদার , একদম বুড়ি বলবে না। 
অংশু - হ্যাঁ তো বাঘে ছুঁলে আঠারো ঘা আর তুমি ছুঁলে ছত্রিশ ঘা , তার জীবন তেজপাতা। 
দীপা -  আহা রে , তাই তো কাঁচা কার্তিকের মতো সঙ সেজে নেচে বেড়াচৃছো। 
অংশু -  এসো না পাশাপাশি বসি , কম্পার্টমেন্ট তো ফাঁকাই। 
দীপা - না বাবা , মুখোমুখি বেশ আছি। অসহায় প্রহরে অসহ্য লোকটার সাথে কয়েক ঘন্টা , কি কুক্ষনেই যে দেখা হলো ... 
অংশু - প্রহর শেষের আলোয় রাঙা সেদিন চৈত্র মাস, তোমার চোখে দেখেছিলেম আমার সর্বনাশ। সেদিন ও ছিলো চৈত্র সন্ধ্যা। এরকম সূর্যাস্তের মায়াবী আলোয় শিলাবতীর তীরে তোমাকে দেখেছিলাম। 
দীপা - তারপরেই প্রবল সুনামি , ভালোবাসার কালো মেঘ ঘিরে ধরলো আমাকে। সব হিসাব ওলোটপালোট হয়ে গেলো। তুমি আর ভালোবাসার লোক পেলে না ? 
অংশু - তুমি ই তো আমাকে চেনালে জীবনকে নতুন করে। তুমি পরশ পাথর। তাইতো ছেড়ে দেবার এক যুগ পরেও অভিশপ্ত জীবনের সব কটা অধ্যায় জুড়ে তোমার ভালোবাসা নিয়ে আমার বেঁচে থাকা। 
দীপা -  কি ভাবো আমি কি এতোই বোকা। এটুকু বুঝি তুমি আমাকে কখনও ভোলোনি। তাইতো তোমার লেখায় নিজেকে খুঁজে পাই। তরুনী দীপার আলোমাখা স্বপ্ন কে নতুন করে আবিষ্কার করি।  আমার বিরহে তোমার লেখা যেনো জেগে উঠে , ইতিহাসের পাতায় সোনালী অক্ষর জুড়ে ডক্টর অংশুমান সান্যাল বেঁচে থাকবে ভালোবাসার নতুন সমীকরন নিয়ে। 
অংশু -  চলো না আবার শুরু করি এই পড়ন্ত বেলায় নতুনের আবাহনে নতুন করে সানাই বাজুক। আমি ক্লান্ত বিধ্বস্ত বিপর্যস্ত। আমি হেরে গেছি দীপা আমার নিজের কাছে। 
দীপা - তা আর হয়না স্যার , এই দূরেই ভালো। তোমাকে যে আরও নতুন করে লিখতে হবে চেনা জীবনের অচেনা গল্প। আমাদের বারো বছর এক ছাদের নীচে কাটানোর পরের বারো বছর একাকীত্বের মধ্যে নির্জনতায় মোড়া শান্তি খুঁজেছি আমরা , তুমি কি পেমেছো জানি না , তবে আমি পেয়েছি তোমাকে , হ্যাঁ তোমাকে নতুন করে। 
অংশু - সত্যিকারের প্রেম মেয়েদের কাছে এক পরম আবিষ্কার। তা সেই দুর্লভ আবিষ্কার যখন হয়ে গেছে তখন আর দেরি কেনো , এসো আমার জীবন মরুভূমির বুকে মরুদ্যান হয়ে। 
দীপা-  পারিনি অংশু , কিছুই তো পারিনি, তোমার জীবনে এসে তোমার স্বপ্ন গুলোই যখন পূরন করতে পারিনি সহধর্মিণী হয়ে তখন আমার থাকা আর না থাকাতে কি এসে যায় । 
অংশু - বুঝতে পারছি তোমার উপর অবিচার হয়েছে , কিন্তু আমি কি একবারও আঙ্গুল তুলেছি , বলেছি যে তোমাকে নিতে পারছি না আর। আমার উজাড় করা ভালোবাসা দেবার পরেও অভিমান নিয়ে চলে গেলে ? একবারও ভাবলে না তো কি করবো আমি , একটা অসহায় মানুষ .... 
দীপা - যাক বাবা এসে তো ভালোই হয়েছে, কিছুটা স্বাবলম্বী তো হয়েছো । আর ... না থাক। চলো কিছু খেয়ে নাও , খাবার আছে আমার সাথে , ট্রেনের খাবার তো শরীর খারাপ করবে তোমার। 
অংশু - কয়েক ঘন্টার জন্য আর অভ্যাস বদলে কি লাভ .... জানো পুরো কম্পার্টমেন্ট জুড়েই তোমার টিফিন বক্সে রাখা বিরিয়ানির সেই গন্ধটা পাচ্ছি।  রন্ধন পটীয়সী আমার বউ এর নাম্বার ওয়ান রান্না কেও একবার খেলে ভুলে না। 
দীপা- প্রাক্তন বউ বলো। 
অংশু- সব প্রাক্তন হয়না। 
দীপা - হুম 
অংশু- নিজেকে বারবার কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে জানিনা কি পাও বাংলা সাহিত্যের অধ্যাপিকা ডক্টর দীপান্বিতা সান্যাল। 
দীপা- আবারও ভুল , দীপান্বিতা মুখার্জি বলো। 
অংশু - যদি জোর করে বুকে মিশিয়ে নিতে চাই। 
দীপা - কে আপত্তি করেছে আপনাকে? তা এই যে বীর পুরুষ বারো বছরে অনেক বীরত্ব দেখালেন , এখন এটুকু না হলেও নাটক জমবে। 
অংশু - দীপা আমাদের সন্তান না হওয়া বলো, আমার পরিবারের মানসিক নির্যাতন বলো , আমার উপেক্ষিত ভালোবাসা বলো , যাই বলো, তোমার না থাকা এই বারো বছরে আমি তোমাকে প্রতি মুহূর্তে আমার অনুভবে পাই। কলেজ থেকে ফেরার সময় , সেমিনারে , লেখার টেবিলে এমনকি পুরষ্কার নেবার মুহূর্তে তোমাকে ই পাই , তাই তো সাংবাদিক সম্মেলনে বলেছি.... 
দীপা - হ্যাঁ শুনেছি তোমার সব প্রেরনা তোমার আলো। তোমার দেওয়া ওই নামটা আমার মনের গভীরে বাজে । কতদিন কেও ডাকেনি আলো বলে। 
অংশু - সে কি ডাকি তো , প্রতি মুহূর্তে আমি। তুমি শুনতে পাওনা তোমার দোষ। 
দীপা - সব দোষ তো আমার। (সহসা গেয়ে ওঠে)
' গগনতল গিয়েছে মেঘে ভরি, বাদলজল পড়িছে ঝরি ঝরি। এ ঘোর রাতে কিসের লাগি পরান মম সহসা জাগি এমন কেন করিছে"  ...
অংশু- আজো মুগ্ধ বিস্ময়ে তোমার গান শুনি। কি দরদ দিয়ে গাও তুমি।  দূরে যাবে তুমি নামতে হবে আমাকে পরের স্টেশনেই , 
দীপা - মুখোমুখি একখানা কবিতা শুনিয়ে যেও। এটুকুই আঁজলা ভরে তুলে রাখি না হয় বাকি দিন মাস বছরের জন্য। 
অ‌ংশু - সমাজ বিজ্ঞানের এই জংলী অধ্যাপককে তুমি পরিপূর্ণ মানুষ করেছো , সফল লেখক করেছো তোমার নীরব ভালোবাসা আহুতি দিয়ে ।
আমি নিশি – নিশি কত রচিব শয়ন
আকুলনয়ন রে !
কত নিতি – নিতি বনে করিব যতনে
কুসুমচয়ন রে !
কত শারদ যামিনী হইবে বিফল ,
বসন্ত যাবে চলিয়া !
কত উদিবে তপন আশার স্বপন ,
প্রভাতে যাইবে ছলিয়া !
এই যৌবন কত রাখিব বাঁধিয়া ,
মরিব কাঁদিয়া রে !
দীপা-  "বড়ো বেদনার মতো বেজেছ তুমি হে আমার প্রাণে, মন যে কেমন করে মনে মনে তাহা মনই জানে  তোমারে হৃদয়ে ক'রে  আছি নিশিদিন ধ'রে,  চেয়ে থাকি আঁখি ভ'রে মুখের পানে॥"
অংশু - প্রবল ভালোবেসে , ভালোবাসার অভিকর্ষজ আকর্ষণ তোমাকে বিকর্ষন করলো দীপা। সব যন্ত্রণা সব কষ্ট একা নিয়ে নীলকন্ঠ হয়ে পাড়ি দিলে দ্বীপান্তরে । আর আমি তোমার চুলের গন্ধমাখা বালিশ আঁকড়ে বারো বছর ধরে খুঁজে চলেছি তোমার ভালোবাসার ফল্গুধারা। 
দীপা - সেই যে বার আমরা হিমাচল প্রদেশ গিয়েছিলাম তোমার মনে আছে , ওখানে পাহাড়ের ওপরে রাজা রানীর পোশাকে যে ছবিটা তুলেছিলাম সেটা আজো আমার ড্রইং রুমে সযত্নে সাজানো। 
অংশু - কতবার তোমার ফ্ল্যাট যেতে চেয়েও যাইনি। চাইনি তোমার তপস্যা ভাঙাতে। আজ যখন সহযাত্রীর লিস্টে তোমাকে পেয়েছি , দেখো তুমি চলে যাবার তিনমাস আগে বলেছিলে , পরের পৌষ মেলায় একটা বাঁশি এনো। বারোবছর পর এই নির্জন কামরায় নিস্তব্ধ আকাশ সাক্ষী রেখে দিলাম সেই বাঁশি। 
দীপা - তোমার চোখের জল মোছো তো আগে। কি যে করি এই ইমোশনাল টাকে নিয়ে। কা ভাবো তুমি একাই সহযাত্রীর লিস্ট দেখো , আমি বুঝি দেখিনা , এই নাও , আট বছর আগে কাশ্মীর গিয়েছিলাম।  কথা ছিলো কখনো একসাথে যাবো । হলো না , একাই গেলাম শপিং করলাম তোমাকে ছাড়াই। কি আশ্চর্য একবারো মনে হয়নি তুমি নেই। কালো বড়ো ডায়ালের ঘড়িটা তোমার ভেঙে ফেলেছিলাম আমিই । ওরকম একটা পেয়ে গেলাম। আমার ঋন শোধ , কি বলেন অধ্যাপক সাহেব। 
অংশু - তোমার ঋনশোধ কি কখনো হয় বলো ? 
  (দীর্ঘ নিরবতা ছেয়ে যায় গোটা কামরা জুড়ে)
দীপা - এই যে মহাদেবের ধ্যান ভাঙলে খেয়ে নেবেন আর নিজের খেয়াল রাখবেন। 
অংশু - এসো না এই একটা ঝড় গতির রাতের বাকি টা আমরা চোখ চোখ রেখে একটা গেম খেলি, যার চোখের পাতা আগে বন্ধ হবে সে হারবে , আর যে জিতবে সে যা চাইবে দিতে হবে। 
দীপা - যাকে সঁপেছি প্রান মন তাকে আর কি দেবো এই অবেলায় । 
অংশু - তবু তোমাকে ভালোবেসে
মুহূর্তের মধ্যে ফিরে এসে
বুঝেছি অকূলে জেগে রয়
ঘড়ির সময়ে আর মহাকালে যেখানেই রাখি এ হৃদয় ।
দীপা - হেঁয়ালি রেখো না কিছু মনে;
হৃদয় রয়েছে ব'লে চাতকের মতন আবেগ
হৃদয়ের সত্য উজ্জ্বল কথা নয়,-
যদিও জেগেছে তাতে জলভারানত কোনো মেঘ;
হে প্রেমিক, আত্মরতিমদির কি তুমি?
মেঘ;মেঘ, হৃদয়ঃ হৃদয়, আর মরুভূমি শুধু মরুভূমি..

ভবানী বিশ্বাস

শান্ত

সূর্যাস্ত দেখলে ভাবি,
বিচ্ছেদ কত রঙিন হয়! 

কান্না পায়, কাঁদি--
রক্ত জলাকারে বেরোলে
হালকা হয় মানুষ... 

প্রেম আর বিচ্ছেদের মাঝের
মূল শব্দটিই বেঁচে থাকা-- 
প্রেমিক এভাবে বেঁচে থাকতে থাকতে
একদিন শান্ত হয়ে যায়... 

পান্থ দাস

ঘুম- একটি পর্যটন কেন্দ্র 

ঘুম ভারতের পশ্চিমবঙ্গের দার্জিলিং জেলায় অবস্থিত একটা পাহাড়। পশ্চিমবঙ্গের অন্যতম পাহাড়ি পর্যটন কেন্দ্র দার্জিলিঙের লাগোয়া ঘুম পাহাড় হল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ জমজমাট একটা হিল স্টেশন। দার্জিলিঙ যাবো আর ঘুম ভ্রমণ করবো না, এমনকী আর হয়। এর উত্তরে দার্জিলিং, দক্ষিণে কার্সিয়াং, পূর্বে তিস্তা তথা কালিম্পং এবং পশ্চিমে সুখিয়াপোখরি। 

একঝাঁক আনন্দ আর ভ্রমণ পিপাসু মন নিয়ে বেড়িয়ে পড়লাম ঘুম ভ্রমণে । ভারতের উত্তরপূর্ব সীমান্ত রেলপথের একটা শাখা শিলিগুড়ি থেকে দার্জিলিং রুটের মধ্যে পড়ে ঘুম রেলস্টেশন। এই ঘুম রেলস্টেশন হল পৃথিবীর মধ্যে সবচেয়ে উঁচু রেলস্টেশন। শুধু তাই-ই নয়, এই রেল পরিবহন ওয়ার্ল্ড হেরিটেজের অন্তর্ভুক্ত। কাছাকাছি আছে মনোরম পাহাড়ি সৌন্দর্য উপভোগ করার জায়গা 'বাতাসিয়া লুপ'। সারা পৃথিবীর পর্যটকদের কাছে ঘুম রেল স্টেশন অন্যতম আকর্ষণ।

 ঘুম রেল স্টেশন থেকে আরও ওপরে উঠলে পেয়ে যাবেন ঘুম বয়েজ হাই স্কুল। এই স্কুলের খেলার মাঠে পৌঁছালে মনে হবে পৃথিবীর ছাদে দাঁড়িয়ে আছেন! দার্জিলিং থেকে কালিম্পং, টাইগার হিল, সুখিয়াপোখরি, মিরিক, সান্দাকফু, বিজনবাড়ি যেখানেই যান-না-কেন, ঘুম পাহাড় ছুঁয়েই যেতে হবে, এই ঘুম হল একটি জংশন হিল স্টেশন। 

যাই হোক ঘুম ভ্রমণের এই সুখদ স্মৃতি মনের এক কোণে গাঁথা থাকলো ।