May 29, 2023

লিয়া শারমিন হক

গল্পপকথা
ক্রোধ

রকিব লুকিয়ে রয়েছে।সিঁড়ির নীচে অন্ধকার যেখানে ঘন সেখানটিতে।সেই সকাল দশটা থেকে এখানে।রকিবের পরনে ধূসর পান্জাবী।হাতে, মুখে আর সেই ধূসর পান্জাবীতে চাপ চাপ রক্তের দাগ শুঁকিয়ে কালচে হয়ে গিয়েছে।চিমসে গন্ধ বের হচ্ছে।ঠকঠক করে কাঁপছে রকিব।”কি করবো এখন কোথায় যাবো? এ কি হয়ে গেলো? কেন করলাম? আমার হাতে খুন…আহ্! আর কিছুই যে ভাবতে পারছিনা! আল্লাহ্ বাঁচাও আমায়! তেমন কিছুই নয় কলেজ ঈদে বন্ধ।রমজান মাস স্যারকে টেবিলে খাবার দিয়েছি ঘড়ি ধরে শেষ রাত সাড়ে তিনটেই গরম ভাত, আলু ভাজা, ঘন মসুর ডাল,ডাবল ডিমের অমলেট। বিদ্যুৎ স্যার খাওয়া শেষ করে উঠে বেসিনে হাত ধুচ্ছিলেন। কাছে গিয়ে মিন মিন করে বলেছিলাম,”স্যার মন কেমন করছে বা…ড়ি যাবো?” ব্যস! শুনেই উনি ঘাড় ঘুরিয়ে আমার দিকে তাকালেন। তাকিয়ে, “কি বললি তুই? তোকে তো বলেছি এক বছরের ভেতর বাড়ি যাবার কথা মুখে আনবি না।” আমি ভয়ে একটু দূরে পিছিয়ে দাঁড়িয়েছিলাম।ঐ ঘরেরই পশ্চিম দিকে বইয়ের আলমারি যে দিকে তার পাশে।চিৎকার করতে করতে উনি ছুটে আমায় মারতে এলেন।হাতের কাছে যা পাচ্ছেন তাই দিয়ে আমার উপর চড়াও হলেন।গ্লাস, বাটি, প্লেট ভেঙ্গে চুরমার! এক পর্যায়ে টেবিলের উপর ছুরি ছিলো ওটা উঠালেন আমার ওপর।আমি অত মার খেয়ে ভয়ে কাঁপছিলাম।উনি আমার শিক্ষক আমি কি করে উনার উপর কথা বলতাম? শুধু তো এতটুকুনই বলেছি, স্যার ঈদে ছুটি দিন।বাড়ি যাবো।মাকে ভীষন দেখতে ইচ্ছে করছে,মাকে কাল স্বপ্নে দেখেছি এতটুকুন ও বলে উঠতে পারিনি।উনি কেন কিছুতেই ছুটি দিতে চাননা? আমার মাথায় আসেনা? রাজ্যের যত কাজ আমায় দিয়ে করান।ঘরের ফায়ফরমাশ বাইরের কাজ।কলেজের পড়াশুনার পাশাপাশি সব আমায় করতে হয়।আমার দম ফেলবারও সময় থাকেনা।মাঝে মাঝে মনে হয় এই পৃথিবীতে বেঁচে থেকে কি লাভ? বুদ্ধি হওয়া থেকে শুধুই কস্ট আর কস্ট! আমায় তো দেখবার কেউ নেই।বাবা মারা গিয়েছেন সেই আমি যখন ছোটো।বাবার চেহারা মনেও পড়ে না আমার।বাবা বেঁচে থাকলে এমন হতো না নিশ্চয়? কত কস্টে মা আমায় এত দূর পড়িয়েছেন।সে শুধু আমিই জানি।কত দিন মা আর আমি না খেয়ে থেকেছি! কেউ কোনো দিন জানবেনা সে কথা।কে খেলো কি না খেলো কার কি যায় আসে? মানুষের বাড়ি কাজ করে করে মা আমায় পড়িয়েছেন।আমি SSC তে GPA 5 পেয়েছিলাম।আমার মায়ের সে কি আনন্দ? আনন্দে কেঁদে ফেলেছিলেন আমার দুখিনী মা।উনি আমার মাথায় চুমু খেতে খেতে আশীর্বাদ করেছিলেন,”অনেক বড় মানুষ হ্ বাবা! মানুষের মতন মানুষ হ্ !” এই অনেক বড় মানুষ হওয়া আমার? এই দিন দেখবার জন্য উনি আমায় আশীর্বাদ করেছিলেন? মা মা…ও মা..! কি ভাবে তোমার সন্মুখে দাঁড়াবো আমি? বলে দাও.. মা বলে দাও…! সেই মানিকগঞ্জের বিলাসপুর গ্রাম থেকে ঢাকায় কলেজে ভর্তি হবার জন্য এসেছি। আমাদের গ্রামের বিদ্যুৎ স্যার ঢাকায় থাকেন।উনি রেজাল্ট শুনে বলেছিলেন,”ঢাকায় চলে আসিস আমি ব্যবস্থা করে দেবো।” বিদ্যুৎ স্যার আগে আমাদের গ্রামের “বিলাসপুর সরকারী উচ্চবিদ্যালয়” স্কুলে শিক্ষকতা করতেন।পরবর্তীতে উনি চাকরি ছেড়ে দেন এবং ঢাকায় স্থায়ী হন।বিদ্যুৎ স্যার বলেছিলেন,”আমার এখানে কিছুদিন থাক্ তারপর হোস্টেলে উঠে যাস্।” আমি ঢাকায় কোনোদিন আসিনি কিছুই চিনিনা। উনার কথায় আশ্বস্থ হয়েই এসেছি।উনি যে ভাবে আশ্বস্থ করেছিলেন মা ও আপত্তি করেননি।বললেন,”আচ্ছা বাবা তুই যাহ্।উনি যখন এত করে বলছেন। আর আমাদের মানুষের উপর ভরসা করা ছাড়া উপায় কি বল্? কে আছে আমাদের? ঢাকা শহরে আপন বলতে কেউ নেই। কাউকে তেমন চিনিও না।যাহ্ বাবা আল্লাহ্ র  নাম নিয়ে তুই যাহ্।” ব্যস চলে এলাম।কলেজে ভর্তি হলাম।স্যারের বাসায় উঠেছি।স্যার বলেছেন, “যত দিন হোস্টেলে সিট না পাশ্ এখানেই থাক্!”