May 30, 2023

পঙ্কজ কান্তি মালাকার

ছোটগল্প
মাছ ও মানুষ

হেমন্তের আদ্রতা- যদিও মধ্যগগনে সূর্য তবুও তাপ ম্লান, কুয়াশা মেটানো আলো পাহাড় দেখায়, বর্ষার উজ্জ্বল সবুজ ম্লান হয়ে এল,আবছা ধূসরতায় আচ্ছন্ন তবু চিরহরিৎ বনের প্রাণ সবুজের তাগিদ ধূসর হতে দেয় না -হেমন্তে শুকিয়ে পাথর বুকে ক্ষীণাঙ্গী স্ফটিকসলিলা জাটিঙ্গা বয়ে চলেছে,তার উপরে সেতু পার হতে হতে উত্তরের দিকে দেখছি।দেখছি- পাথর কুড়োতে আসা আদিবাসী শ্রমিকেরা কোমড়ের গামছা, গায়ের শার্ট দিয়ে মাছ কুড়োতে ব্যস্ত, গেঞ্জির মুখে গিঁট বেঁধে খলুই করে এধার ওধার থেকে থেকে ছুটোছুটি করে মাছগুলোকে জমাচ্ছে। এমন তো রোজ হয়না,তারা আসে পাথর কুড়োয় - পাথর জমায় - একের পর এক - এক দুই তিন ট্রিপ ট্র্যাক্টর লোড করে। নদীর পাড়ে বসে শুটকি পুড়া বেগুন ভর্তা দিয়ে পুঁটলিবাঁধা ভাত খায় চোলাই খায়,ধুম শ্রম করে শ্রমের আনন্দে, ফুল সাউন্ড দিয়ে ধুপধুপ বেসওয়ালা ভোজপুরি গান লাগায় ট্রাক্টরের,এমন তো মাছ ধরে না। ইউটিউবে যেসব মাছ বৃষ্টির ফেক ভিডিও দেখা যায় তেমনি কোন মাছ বৃষ্টি হয়ে গেল না তো!


ঘরে গিয়ে গামছা কাঁধে স্নানের জন্য নদীতে নামলাম, শীতের দিন রোদ থাকতে থাকতে স্নান সেরে নিলে বাঁচি।ঘাটে নেমে দেখি পাশের গ্রামের আদিবাসী শিশু-মহিলারা সদলবলে পা-পাতাজল জাটিঙ্গাকে দলে দিচ্ছে,জাটিঙ্গার বুকের হীরক-মানিক অসহায় হয়ে ভেসে রয়েছে, ছোট ছোট পুঁটি পোনা - পোনা পেরি - পাথরছাটি জীবনযুদ্ধে হেরে কাতর হয়ে পড়েছে, মহিলারা শিশুরা টপটপ করে তুলে নিচ্ছে সে রসনারত্নগুলো। কিছু আছে অজেয়বীর যারা হার মানতে চায় না, নদীতে দাঁড়িয়ে দেখছি পায়ের আশেপাশে দলে দলে কণা কণা পাথরছাটি হট্টগোল করছে, কোথায় গিয়ে বুঝি বেঁচে যায় এই নারকীয় মৃত্যু জ্বালা থেকে।এরা সবই পাথরের নিচের আশ্রয় ছেড়ে বেরিয়ে এসেছে, নতুবা এখন তো এদের দেখা মেলে কদা কৎ্চিতে, নদীতে দাঁড়িয়ে সাবান মাখাতে মাখাতে যখন পা চাটে তখন সেই কালো কালো নদর নদর কণা কণা পাথরছাটি নজর কাড়ে। কিন্তু এই সহ্যকারী বীরেরা অজেয় কিভাবে থাকে বুদ্ধিদীপ্ত মানুষের কাছ থেকে? এই যে কালো কালো কিশোরীগুলো নাকফুলে ঝিকিমিকি মুখে মিষ্টি হাসি দিয়ে কোমড়ের গামছা দিয়ে সেই কালো পাথরছাটিদের খলুইভর্তি করছে।এই তিড়িংবিড়িং করে বাঁচতে চাওয়া মাছগুলো ধরে কি সেই আনন্দ আছে,যে আনন্দ ছিল যখন শিশুকালে আমরা বন্ধুদল মিলে গামছা দিয়ে দৌড়ে পালানো দৌড়বাজদের দৌড়ে হারিয়ে খলুই ভর্তি করতাম। বাল্যকালে নদীতে মাছের প্রাচুর্য দেখেছি, ফাঁসজাল দিয়ে বিঘে মাপের পেরি ধরেছি,হাত লম্বা বাইং ধরেছি এখন সব চুনোপুটি মাপের। হেমন্তের বিকেলে নদীকে বাঁধ দিয়ে বেঁধে নদীতে চুন দিয়ে গাঁয়ের যুবকেরা দলেবলে নেমে মাছগুলোকে তুলে নিত বালতি বালতি ভরে।চুনের জ্বালা থেকে মুক্তি পেত না কোন বড়ো শিশু মাছ, যতটুকু চুনজল প্রভাবিত করত ততটুকু প্রাণহীন করে দিত, এভাবেই জাটিঙ্গায় চঞ্চলমানিক কমে গেল। পায়ের কাছে ভেসে থাকা দুটো পুঁটি একটা পোনা পেরি তুলে রাখলাম পাশের পাথরে,দেখছি আদিবাসীদের অকালে দুপুরে মাছ কুঁড়ানো। জাটিঙ্গার মাছের স্বাদটাই মনোলোভা, জিহ্বায় স্বাদ লেগে থাকে।অল্প মাছ যদি কেউ নিয়ে বাজারে উঠে তবে একপোয়া মাছের দামে এক কেজি রুই কেনা যাবে,এত চড়া দাম ধরে।কিশোরকালে প্রায় জাটিঙ্গার মাছ খেতাম, খাওয়ায় পর জিহ্বায় স্বাদ আর হাতে তেল লেগে থাকতো।


পাঁ-পাতা শাদা জলে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখছি, স্নান আর হবে কই!একটি ঘনকালো নবীনকিশোরী মাছরাঙার মতো তিড়িং বিড়িং করে দৌড়াচ্ছিল মাছ লক্ষ্য করে ঝাঁপিয়ে ধরছিল। এভাবেই সে আমার সামনে এসে লক্ষ্য করে করে ছোট ছোট পুঁটি পাথরছাটি খুঁজছিল।কিছু সামনে আসতে তাকে বললাম "এই মুন্নি এই পেরিটো লে লেও", পুঁটি থেকে একটু বড় পেরি দেখে সে লুফে নিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে একটা ধন্যবাদসূচক হাসি দিয়ে আবার মাছ কুড়োতে মন দিল। আমি তাকে জিজ্ঞেস করলাম "কোন চুনা দিয়ারে মুন্নি?" সে "মালুম নহী" বলে মাছ কুড়োতে চলে গেল। কিছুক্ষণ পরে আমার সামনে দিয়েই একপাল আদিবাসী মহিলা যুবতী মাছ ধরতে ধরতে আসলো, তাদেরকেও জিজ্ঞেস করে "নহী মালুম","মাচ্ছি মিলতা তো পকড়নে আয়া" শুনলাম। প্রতিবছর বনবিভাগ নিষেধ নির্দেশ প্রচার করে তবু কেন যে নদীতে চুন দেয়।অনেকক্ষণ ধরে দেখেছি তারপর বিনাস্নানেই ঘরে ফিরছি। ঘরে ফিরতে বুঝছি পায়ের পাতায় জ্বালা করছে। চুন জলে ভিজলে এমন করে জানি তবে আজ কিছু বেশিই করছে। ছোট থাকতে একবার স্নান করার পর খুব গা জ্বালা চোখ জ্বালা করেছিল তারপর মা ঘরে স্নান করিয়েছিলেন বাবা চোখের ড্রপ এনে দিয়েছিলেন, সেদিন হয়তো নদীর উপরভাগে এমনি চুন দিয়ে মাছ ধরেছিল।ঘরে গিয়ে ভালো জল দিয়ে পা ধুলাম।অল্প জল দিয়ে গা ধুলাম।


গ্রামের দক্ষিণে খেলার মাঠ। খাওয়া দাওয়া সেরে বন্ধুকে সঙ্গে নিয়ে বিকেলে ফুটবল ম্যাচ দেখতে গেলাম। হাফেনআওয়ারে কিছু ঠান্ডা পানীয় কিনতে মাঠের বাইরে গিয়েছিলাম তখন দেখি দক্ষিনের আদিবাসী গাঁয়ের দুতিনটি জোয়ান ছেলে দুএকজন মহিলা একটি ছোট ছেলেকে কোলে নিয়ে দৌঁড়ে যাচ্ছে সম্ভবত হসপিটালের দিকে। দেখে খারাপ লাগলো। খেলা দেখতে গেলাম। আধো কালো আধো আলো বেলা,খেলা শেষ হলে যখন বেরিয়ে এলাম তখন রাস্তায় দর্শকের ভিড় চিড়ে দক্ষিনের দিক থেকে পাগলের মত অটো একটা তেড়ে আসছে আর কি হর্ন, ভিড় থেকে আওয়াজ এলো "বিমারী কা গাড়ি, রাস্তা ছোড়"। তারপর দেখি আরো একদল লোক একটা বালককে নিয়ে তেড়ে যাচ্ছে হাসপাতালের দিকে। কিছু রাস্তা এগোতে এগোতে দক্ষিণের দিক থেকে কয়েকটি বিমারী কা গাড়ি আর হাসপাতালগামী রোগী দেখে একটা হৈ হট্টগোল পড়ে গেল। খেলা দেখা ভিড় ঢুকলো হাসপাতালের অঙ্গনে। বুড়ো বাচ্চা শিশু বিশ পঁচিশজন রোগীতে বেড ভর্তি, রোগীর পরিজনে হাসপাতাল গিজগিজ। ডাক্তার নার্সেরা ব্যস্ত পরিচর্যায়। বেশিরভাগের শরীর জ্বালা চোখ জ্বালা করছে, কেউ কেউ খুব বমি করছে। এরইমধ্যে ভিড়ে রটে গেল স্নানের পর সবাই এমন করছে,কেউ নদীর জল খাওয়ার পর বমি করছে, নদীতে কেউ বিষ ঢেলেছে ইত্যাদি। যাদের অতিরিক্ত হয়ে গেছে তাদের সদর হাসপাতালে রেফার করছে, তাদের পরিবার এম্বুলেন্স গাড়ি খুঁজছে।পাথরছাটি যেমন ছটপট করে বাঁচতে চেয়েছিলে রোগীদের পরিজনেরা তেমনি রোগীদের সুস্থ করার জন্য ছটপট করছে। ইতিমধ্যে অনলাইন নিউজ পোর্টাল ছুটে এসেছে, আঞ্চলিক প্রশাসনের টনক নড়েছে, ছুটে এসেছে থানা ও ব্লকের অফিসার,সদর থেকে আসছে চিকিৎসকদল।কারা যে অতিরিক্ত লোভ করলো, নদীর বাসিন্দা মাছ ও নদীপাড়ের বাসিন্দা মানুষকে বিপদী করলো। রোগী নিয়ে আসা আমার পরিচিত একটা উত্তরের আদিবাসী ছেলে গ্রামে ফোন করে বলছে,"সবাই মাছ ফেলে দাও, কিছু বিষ খেয়ে মাছ মরেছে, এগুলো খেলে অসুখ হবে, দক্ষিণের গ্রামগুলোতে হাহাকার পড়ে গেছে।"