Apr 29, 2024

সনজিৎ বণিক

গরম হাওয়া 

ইতিহাসের পাতা খোলা ই আছে 

বৃষ্টির কথাও বলা হয়েছে বারবার 

এই রৌদ্রের তেজদীপ্ত গরম পরশ বারবার চামড়ার ভেতর জ্বলে ওঠে, ঘর্মাক্ত শরীর নিয়ে মেয়েটি আজও হাঁপাতে হাঁপাতে মালিক এর বাড়িতে কাজে এলো, ঘরে ছোট ছেলে মেয়ে দুটো একাই আছে, দুজনে বসে পড়ছে 

ওদের বাবাও ভোরবেলা চলে গেছে মালিকের জমিতে।
সংসারের এই ছবির ভেতর জেগে আছে মানুষের বলিষ্ঠ সাহস ও দৃঢ়তা আর জাগরণের উজ্জ্বল বার্তা যা মানুষের বেঁচে থাকা ও পৃথিবীকে জাগিয়ে রাখার অক্সিজেন, দুনিয়ার মানুষের জন্য উজ্জ্বল এক ছবি।

লিটন শব্দকর

ডালপালা

ডালপালায় দেওয়াল সুদৃশ্য করা হলো মাত্র
অরণ্য নয়,
তারা ভেবেছে সব হলো

প্রেমিকের বুকপকেট।।
লিটন শব্দকর 

নির্জন ভোরের আঙুল কেড়ে নিয়েছে কলম

কবিদের গান ও অক্ষরের আলাপাতায়
অতিসংক্ষিপ্ত ঢেউ এসে শুকিয়ে যায়। 

ফানুসের প্রেম থেকে ফেনা 
সমাজের মতো করে চেয়েছে 
প্রেমিকের বুকপকেটে ঘুম এনে দিতে

বহুদিন থামহীন মিনারের চূড়োয় বসে 
কোকিল বসন্তের ভুল গল্পই বলে যায়
              তারপর 
প্রেমিক নিঃস্ব হলেই শহরে আসে প্রেম।

নয়ন দে

খুঁজেছি তোমায়

আজো আমি খুঁজছি তোমায় 
ব্যথা সয়ে একা থাকা যে এখন দায়।

হঠাৎ রাতে ঘুম ভেঙে মনে পড়ে অনেক কিছু 
রাত জাগা স্বপ্নগুলো নিচ্ছে আমার পিছু।

আমি না... 
আজ সত্যিই বড্ড ক্লান্ত, 
ঘুমের ঘোরে স্বপ্নের দেশে, থাকি চির অশান্ত।

এই ফাগুনে তোমায় খুঁজতে গিয়ে
এখনো বাধতে থাকি সুখের নানান বাসা।
আমার সুখের বাসা ভেঙে যায়, হঠাৎ করে!    
অজানা এক কালবৈশাখীর ঝড়ে।

ভালোবেসে হৃদয়ে জমিয়ে রেখেছি গোপন কথা, 
জড়িয়ে নিয়েছো মায়ার বাঁধনে আমার সকল সরলতা।

শুনছো বুকে ভীষণ ব্যথা সাথে জ্বলছে বুকের ডান পাশ,
এভাবে কেন চলে গেলে? রয়েছে একাকী দীর্ঘশ্বাস।

তোমার চোখের ভাষা বড়ই খাসা, মনেতে যে ভাসে
তোমাকে খুঁজছি বলেই বার বার এই ফাগুন আসে।।

বিধর্না মজুমদার

ধ্বংস

গ্ৰীষ্মের দাবদাহ বরাবরই অসহ্যকর 
তবুও আমরা বেচেঁ ছিলাম, 
আজও বাঁচার লড়াইয়ে
শুধু ধ্বংস করে যাচ্ছি। 
তাদের হাহাকার আমরা শুনতে পাইনা, 
তারা মুখফুটে কিছুই বলে না
কেবল চেয়ে থাকে। 
তাদের চাওনিতে কষ্ট ভেসে ওঠে, 
মানুষেরা তখন অন্ধ রোগী হয়ে যায়। 
তাদের সাথে আমাদের শেষটাও তাড়া করছে, 
সময়ের অপেক্ষা মাত্র।। 

জয়িতা ভট্টাচার্য

ছায়াবৃত্ত 

জড়ির কিংখাব জড়ানো আলো ঘরে এসে ঈসৎ থমকালো।রাজকন্যা মৃত।তৎসহ জীর্ণ নদীটির মতো তিরতির করে বয়ে যাওয়া রক্তের নদীটি এখন শুকিয়ে এসেছে।চড়ায় বিচিত্র মাছি আর পিঁপড়ের চলাচল শুরু হয়েছে।জড়ির চিরখানি এইখানে এসে আনত দৃষ্টিতে দেখল রাজকন্যার পতন।নিচের দিকে চেয়ে আছে আলো।যেন কত গভীর অতল।রাজকন্যার মাথায় গভীর খত।বুকের ওপর থেকে সরে গেছে মাছ ধরার আরণ।গোলাপি ওড়না লাল।ছিন্ন বস্ত্র খণ্ড মানচিত্রের মতো ঢেকে আছে উদ্বাস্তু জমি।ছোট মালভূমির ওপর দুটি বালিয়াড়ি থেঁতলে গেছে।নিম্নাঙ্গের ললিত বসন উপড়ে বেরিয়ে পড়েছে ভষ্মিভূত সাভানা,ক্লিষ্ট খণ্ডিত উর্বর কৃষ্ণ গহ্বর।রাজকন্যার চোখ দুটি খোলা আকাশ ওখানে লেখা আছে সমগ্র বৃত্তান্ত।শুধু পড়ে নিতে হবে।শীতল সিমেন্ট মেঝেতে কাঁচের চুড়ি ভেঙে বিদ্ধ রক্তাক্ত দুটি হাতে কালচে দাগ।হাত দুটি দুপাশে ছড়ানো।আলোর ওই কিংখাব ছায়া ফেলল এখানে এসে।থমকে আছে ঘড়ির কাঁটা।অনেকদিন ব্যাটারি কেনা হয়নি।স্বাভাবিক মৃতের মতোই অনাবৃত বুকে গেঁথে আছে ইস্পাতের ফলা।

রাজকন্যা ধর্ষিত হইয়াছেন।খুন হইয়াছেন।প্রশ্ন উড়ছে নিঃশব্দে খুনের পরে ধর্ষণ নাকি আগে!

এই অবধি মনে মনে লিখে অন্যমনস্ক হয়ে গেলেন ইন্সপেক্টর বক্সী।মনে মনে সারাদিন লিখে রাখেন কাহিনী।এখন বিধানপল্লীর সুখসায়র বস্তির তেরো নম্বর ঘরে দাঁড়িয়ে  দাঁড়ি চিহ্ন দিলেন অমলেন্দু বক্সী।এই নিয়ে চারটি খুন।যেন সুজিত মুখার্জির থ্রিলার চলচিত্র।ওসি অমল বক্সী বসে নেই।পশ্চিমবঙ্গে মাসে আশি পঁচাশিটা খুন আর একডজন ছেলেধরার গল্প রেকর্ডেড ই হয়।বাকি আরো কত অন্ধকার খাঁজে খোঁজে ঘাপ্টি মেরে থাকে কে আর সন্ধান করে!

কে যেন বলেছিল আলো জীবনের মেটাফর।আর অন্ধকার মানেই মৃত্যু।মার্টিন হাইডেগার বোধহয়।বক্সী আর সৌম্যশেখর তর্ক চলে অহোরাত্রি এভাবে।বাঁ দিকের দুটো গলি ছেড়ে ডানদিক বেঁকে চতুর্থ বাড়ি। তবে রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে তফাত এইখানে।অন্ধকারেই আলোর উৎস।গর্ভের অন্ধকার থেকে প্রাণের সূচনা।লেখক সৌম্যশেখরকে চুপ করতে বলে বক্সী একরোখা কিংখাবে পা রাখলেন।দরজা খোলা।বক্সীর লম্বা ছায়া পতিত রাজকন্যার উন্মুক্ত প্রাঙ্গনে।

 কলকাতার অন্ধ গলি ঘুঁজির কাহিনী তাঁর জানা।লেখা।এইসব রাজকন্যার কথাও তিনি ভালো করে জানেন।মন উদাস হলে যাতায়াত করেন।রোদ্দুর এখন নরম নেই মরা মাছের মতো শক্ত। রাজকন্যা নিখোঁজ ছিলেন কিছুদিন যাবত।এইসব রাজকন্যারা সকলেই যে বাংলার মাটি ও জল তা নয়।অনেকেই রুখা সুখা পৃথক রাজ্যের অধিবাসিনী।ঠিক বিন্ধ্যবাসিনীর মতো।বিন্ধ্যবাসিনী তাঁর বউ।জড়ির ফিতে গড়িয়ে এসেছে বিডন স্ট্রীট ঠাকুরদাস লেনে।এটা একটা অন্ধগলি।তারপর বড়ো করে আলো এসে পড়ল একটা ভাঙা বাড়িতে।একেবারে ভেতর অবধি ছড়িয়ে গেল।আর জড়ির কিংখাব নেই।অসহ্য আলো।এই বাড়িতে সাহস করে একমাত্র মরণ এসে পুড়িয়ে দিতে পারে অন্তঃপুর।ওরা এসেছিলো অনেক দূরের গ্রাম থেকে।কাঁটা তারের ওপার থেকে।মোট পনেরটি রাজকন্যার দিনযাপনে আলো পড়ে।দুজন সেচ্ছায় পালিয়ে এসেছিল।দুজনের বর তাড়িয়ে দিয়েছে।তিনজন ধর্ষিত হয়ে ছিল মোহিনী সেন কায়দা করে তুলে এনেছেন এই অট্টালিকার অন্ধকারে।আরও আছে হারিয়ে যাওয়া,নিখোঁজ,

হারিয়ে যাওয়া,বর তাড়ানো কিংবা মুক্তবাজারের অবিচ্ছেদ্য দারিদ্র্য পিড়িত বস্তি থেকে আসা রাজকন্যারা।কাঞ্চনা এবং আরও সাতজন এসেছিল পদ্মানদীর দেশ থেকে।কর্কশ আলোর ছদ্মবেশে আলো।নিকষ অন্ধকার থেকে উৎসারিত আলো।সৌম্যশেখর বলবে কিছু। সকলেই নিরাবরণ হতে কি আর পারে?

এসেছিল এখানে আলোর খোঁজে।আলো।আর এখন অন্ধকার।অন্ধকার আর মৃত্যুর কথা বলেছে দার্শনিক জ্যাক দেরিদা। বলেছিলো চৈনিক দর্শনে।রাত জেগে জেগে ভাবতো সৌম্যশেখর।"যে পথে যেতে হবে সেপথে তুমি একা...।"

 আলো যেখানে নেই সেখানে মৃত্যু।সৌম্যশেখর ওরফে অমলেন্দু বকাসী একদিন মৃত্যুর উপাসক হয়ে গেল।অন্ধকার গলি আর গলির ভেতর রাজকন্যার অন্ধকার শীৎকার থামিয়ে দেবার একটা তীব্র তাড়না।ইন্সপেক্টর বক্সী আলোর দিকে তাকিয়ে অন্যমনস্ক বিড় বিড় করছেন, "we are all going to die" মার্টিন হাইডেগার লোকটার সঙ্গে দেখা হওয়া প্রয়োজন ছিল।

লালবাতির পাড়ার উঠোন জুরে আলোময় ছেলে মেয়ে কুমির ডাঙা খেলছে।কতদিন খেলেননি।কাটা গোল্লার খেলা।সব শেষে কাটাকুটি।অন্ধকারের উৎস হতে উৎসারিল আলো...যৌনপল্লীর বেশ্যার ছেলে একথাটা তার গায়ের লেবেল হয়ে এঁটে ছিল অর্ধেক জীবন।তারপর এই পুলিশের উর্দি।একদিন সৌম্যশেখর এলো।লেখা চলতেই থাকে।অন্ধকার শেষ করতেই তো এই উর্দির বেশ। এই বিশ্ব একটা বেশ্যাপল্লী ছাড়া আর কি! সমস্ত বেশ্যা ডিলিটেড করে দেবার পবিত্র এক শপথ নিয়েছিল অমল।মার খেতে খেতে আর পাল্টা মারতে মারতে যেদিন গরপারের বটুক সামন্তকে খুন করে ফেলেছিল ভুল করে তারপর...।মাতৃনিন্দা মহাপাপ। পাপের সমাধান আরও পাপ। মন ফেরাতে 

ইন্সপেক্টর বক্সী ওরফে সৌম্যশেখর চৌকাঠে পা রাখলেন মোহিনীদেবীর আলোহীন কুটুরিতে।

রাজকন্যা এখন লাশকাটা ঘরে আবার একবার ছিন্ন হইবেন।ওখানে জড়ির কিংখাব থমকে আছে,মৃত্যুর ইনবক্সে।

ছন্দা দাম

আগুনডানার ঘোড়াটি

আগুন রঙা ঘোড়াটা আসছে সেই হিমাচল থেকে...
সেই ছোট্ট যখন চোখে তার ভোকাট্টা ঘুড়ির স্বপ্ন,
পায়ে পায়ে কিছু কাশফুল,ঘাসবন,বুনো ফুলের গন্ধ মেখে নিল,যেন আতরের সৌরভ,
সামনের দুটো পা যেন তার পাখা...
আগামীর পথে তার সীমাহীন দিগন্তে লুটোপুটি খায় নীলাকাশ ,
গায়ে জড়ায় সে পশমি মেঘ, ইলশেগুঁড়ি বৃষ্টি,
মধ্যাহ্নের বুকে পদচিহ্ন এঁকে দিতে সে বদ্ধপরিকর
চোখ দুটোতে বাজপাখির খিদে।

বেলা পড়ে আসে গোধূলির কমলারঙা রাক্ষস তখন গোগ্রাসে গিলছে সময়,
ঘোড়াটির ঝড়ো শ্বাস পড়ে বুকে...থামতে চায়...
মুখ গুঁজতে চেয়ে পায়না নিবিড় বুক,
শুধু ধু ধু মরুভূমির শূন্যতা নিয়ে আগুন ডানার ঘোড়া
শেষ ঝাপ দেয়...
অনিশ্চয়তার প্রশান্ত মহাসাগরের তুফানী বুকটায়।।

লিজা বৈদ্য

সন্দেহ এক নিরব ঘাতক

রমেশ আর মায়াবতীর এক ছেলে আর এক মেয়ে নিয়ে সুন্দর সংসার। প্রাচুর্য না থাকলেও ভালোবাসার কোনো কমতি ছিল না। রমেশ একটা বড়ো সরকারি স্কুলের গ্রুপ-ডির চাকরি করে। পাশাপাশি একটা ছোট দোকানও আছে।

কয়েক দিন ধরেই স্বামী স্ত্রীর মধ্যে বনিবনা হচ্ছে না। দয়ানন্দ বুঝতেই পারছে না ওর দোষটা কোথায়। মায়াবতীর সাথে কথা বলে সমাধান করতে চাইলেও কেমন যেন এড়িয়ে যাচ্ছে। ছেলে মেয়ে বড়ো হচ্ছে তাদের সামনেও কিছু বলা যায় না। যদি ও হঠাৎ কোনো কটূ আচরণ করে বসে।ওর এই অন্যমনস্কতা চোখ এড়ায় না বন্ধু বিমলের। জিজ্ঞেস করে ,"কি হয়েছে ? কিছুদিন থেকেই দেখছি তুই কেমন মনমরা হয়ে আছিস।"

রমেশ কিছু না বলে এড়িয়ে যায়। কি করে বলবে ঘরের কথা। রমেশ আর পারছে না এই সমস্ত প্রেসার নিতে। কত শত দুর্ঘটনা  ঘটে প্রতিনিয়ত এই সমস্ত সাংসারিক অশান্তির জন্য। এইতো বরুণ ওদের প্রতিবেশী কত ভালো ছেলে বিশ দিন হবে বউয়ের সাথে ঝগড়া করে আত্মহত্যা করে।ও ভাবে  ওদের স্বামী- স্ত্রীর মধ্যে একজনেরও যদি কিছু হয় সংসারটা ভেসে যাবে। 

বাড়ি গিয়ে দেখে ছেলে মেয়ে বাড়ি নেই তাই ঠিক করে এই সুযোগে সমস্ত কিছু ঠিক করে নেওয়া যাবে। ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে  স্ত্রীকে কাছে টানতে চেষ্টা করে কিন্তু উল্টো ওকে ধাক্কা দেয় আর পড়ে গিয়ে কপালে ব্যাথা পায় ।ওর স্ত্রী অন্য ঘরে গিয়ে দরজার খিল দিয়ে দেয়। ওর ভয় হতে লাগে যদি উল্টো পাল্টা কিছু করে বসে। ও দরজায় করাঘাত করতে করতে বলে, " দরজা খোলো মায়া নয়তো আমি বাড়ি ছেড়ে চলে যাবো।" মনে ভাবে যদি এই কথায় যদি পাহাড় টলে।

মায়াবতী দরজা খোলে, যাও সব জিনিস নিয়ে বেরিয়ে যাও। রমেশ বউকে এবার জপটে ধরে বলে ,"চলে যাবো, আগে বল কি হয়েছে।"

মায়াবতী কাঁদতে কাঁদতে বলে, "যাও আমায় ছোঁবে না ঐ নোংরা হাতে। স্কুলের সবাই এমনকি তোমার হেড মাস্টারও চলে যায় তাও তোমার বেরুতে এতো দেরি হয় কেন? কিছু বুঝিনা ভাবো ? কি করো রনিতার সাথে ?"

রমেশ বলে,"এতো বড়ো স্কুল ছুটির পর দরজা জানালা বন্ধ করে সমস্ত রুমের লাইট পাখা বন্ধ করে বেরুতে দেরি হয়।"

মায়া বলে ,"দরজা জানালা বন্ধ করার ফাঁকে কি চলে রনিতার সাথে।"

রমেশ কানে হাত চাপা দিয়ে বলে," ছি! ছি! আর বলো না ও আমার ছোট বোনের মতো। ওর সংসার আছে। বেচারির স্বামী নেই তাও কত কষ্ট করে সংসার চলায়।

ওর স্বামী মারা যাওয়ার পরও শ্বশুর বাড়ি ছেড়ে যায়নি। শ্বশুর শাশুড়ি আর ছেলেটাকে নিয়ে বেঁচে আছে। ও কিন্তু চাইলেই শ্বশুর বাড়ি ছেড়ে বাপের বাড়ি গিয়ে থাকতে পারতো। রনিতার বাপের বাড়ির অবস্থা খারাপ নয়। তাও শ্বশুর শাশুড়ির কথা ভেবে যায় নি।তোমাকে এইসব কথা কে বলল? "

মায়া বলে," তোমার স্কুলের অবিনদা ।"

রমেশ ছলছল চোখে বলে,"ওর কথায় আমাকে অবিশ্বাস করলে মায়া। তুমি জান না ওর চরিত্র কেমন? গত বছর ও রনিতাকে কুপ্রস্তাব দেয় ভেবেছল ওর স্বামী না থাকার সুযোগ নেবে। রনিতা আমাকে আর হেড সারকে জানিয়েছিল। এর জন্য ওকে কম অপদস্থ হতে হয়নি । তাও ওর পরিবারের কথা ভেবে ওকে ক্ষমা করা 

হয়েছিল । সেই থেকে সবসময় আমার পেছনে পরে থাকে কিভাবে ক্ষতি করতে পারবে। আর একটা কথা ঘরের চেয়ে যদি বাইরের লোকের   ওপর ভরসা বেশি হয় তবে সংসারে ফাটল ধরবেই। এত বছর সংসার করার পর তুমি   অবিনের কথায়  এতকিছু করলে।সন্দেহ এক নিরব ঘাতক কখন কাকে ঘায়েল করে ফেলবে টেরও পাবে না। তুমি যা বোঝ তা কর ?  আমি আর কিছু বলবো না।তুমি শুধু আমাকে নয় নিজেকেও ছোট করলে।"

অলকা গোস্বামী

সে

সর্বজ্ঞ পৃথবীর কাছে বশীভূত সে,
প্রতিদ্বন্দ্বী সময়ের নিষ্ঠুর আবহে।
হতাশার ধূলো ঝেড়ে শান্ত ঘর সুনিবিড় ছায়া,
গাছ সব ঊর্ধবাহু নিনাদে স্বস্তির প্রার্থনা।
আত্মজের ঘরে ফেরা মনে আজ 
শবরী উচ্ছ্বাস,
সুখেবোধ ডুবে যায় ভাষাহীন শুষ্ক মনস্তাপ।
আবর্তে নিজেকে দেখে কখনও বা জেগে উঠে 
হৃদয়ের আলো,
বদ্ধ মনে চঞ্চলতা
জানেনা সে 
কীসে হবে ভালো।

ঝিমলি আচার্য্য

তুমি ছেড়ো না মোদের সঙ্গ 

বছর শেষে স্মরণ করি যা ঘটেছে তা ছুড়ে ফেলি ।
অপূর্ণতার শিক্ষা নিয়ে পূর্ণ শিকরে জল ঢালি ।
নতুন রূপে দেখবো বলে ভাবি বসে নিরালায় ।
রামধনুর সাতটি রঙে উঠবে ফুটে এ ধরায় ।
ছয় ঋতুকে সঙ্গে নিয়ে করছো খেলা আপন মনে
ভালো মন্দের হিসেব কষা নেইকো তোমার সংবিধানে ।
তুমি মহান তোমার নেইকো কোন মান অভিমান 
মমতার আঁচল পেতে ঠাঁই দিয়েছ কোটি কোটি প্রাণ ।
কত বিনুনি বেঁধেছ কত অভিশাপ মেখেছ গায়,
আপন কলঙ্ক গেঁথে দিই তোমার শিরা উপশিরায় ।
সহিষ্ণুতার  আবরণ তোমার অলংকার তোমার অহংকার।
তারই হাত ধরে কঠিন সহজ রুপে ঘটাও কত আবিষ্কার ।
ঢেলেছো অসীম সফলতা বুক পেতে গ্রহন করেছ জন্ম মৃত্যুর সকাশ ।
তোমার নেইকো ছুটি নেইকো আরাম আয়েশের অবকাশ।
সব মিলে যেন এক বাহিত নদীর ঘূর্ণিপাক ।
চঞ্চল তরঙ্গ অনুভবে আমরা করি হাঁকডাক ।
বরণ করি তোমার সঙ্গ বছর বছর পান করে 
যাই তোমার অলৌকিক রঙ্গ , তুমি ছেড়ো না 
                                               মোদের সঙ্গ ।

রিপন সিংহ

তরঙ্গের মতো তুমি 

এই শহর ধুলোর সাথে সন্ধ্যা নামে,
আবার প্রথম দিনের মতো সকাল হয়,
তোমার নরম কেশের মতো সন্ধ্যার তরঙ্গ বহে;
এগিয়ে চলে, এগিয়ে চলে
শুধুই এগিয়ে চলে।
আমি সেই দিগন্তের প্রথম আলোর মতো ---
তবুও আমার অপেক্ষার আয়ু বেড়ে চলে, 
 তুমি প্রথম ফাল্গুনের --- , শ্রাবণের ধারার মতো সুখের খোঁজে 
বহে গেছো, 
তোমার আনন্দের ধারা।
শুধুই ছুটে জীবন,
আমার এই আজীবন অপেক্ষা
দিন চলে যায়, রাত চলে যায়

--- তারপর আবার সন্ধ্যা নামে

পরিমল কর্মকার

ফাগুন ভালোবাসা

কোকিলের কুহু ডাকে মনে জেগে উঠেছে --
বসন্ত তুমি এসে গেছো আমার হ্নদয় দুয়ারে।
ফাগুন ভালোবাসা বুকে নিয়ে বসন্ত তোমাকে ভালোবেসেছি। 
তুমি অবজ্ঞা করনি --
সঞ্চিত  ভালোবাসার পরিপূর্ণ হ্নদয় থেকে একটু একটু করে আমার ভালোবাসাকে পূর্নাঙ্গ মর্যাদা দিয়েছ তুমি।
বসন্তের আনন্দের আবহে 
তোমার ভালোবাসায় শোভিত প্রতিটি ঋতুর সৌন্দর্য আস্বাদন করেছি।
বসন্তের স্নিগ্ধতায় যখন ভালোবাসার গভীরতা খুঁজে বেড়াচ্ছি---
অজানা এক মুহূর্তে গভীর সম্পর্কের আঘ্রাণ কেমন যেন ফ্যাকাশে হয়ে গেল।
তুমি আমাকে কিছু না জানিয়ে  না ফেরার পথে বহু দূরে চলে গেলে।
আহত বিহঙ্গের মত দুমড়ে মুচড়ে নিথর হয়ে পড়ে রইল আমার স্বপ্ন, আমার ভালোবাসা।
সেই ভালোবাসার তৃষ্ণার্ততা বুকে জমাট বেঁধে আছে -- 
মিলিয়ে যাচ্ছে আশার  বুননে বাঁধা সাফল্যের স্বপ্নগুলো।

পিয়াল দেবনাথ

 কালেকশন

ফেসবুক ঘাটতে ঘাটতে হঠাৎ অর্কর চোখ পড়ল একটি নামের উপর। সেই একটি নাম। মেয়েটির একাউন্টের নিচে উল্লেখ করা 'friends' । সে কিছক্ষণ ভেবে দেখল আসলে কি এখন সে আর মৃন্ময়ী ফ্রেন্ডস? আজ আট বছর হল মৃন্ময়ীর সাথে তার কথা হয়না। একসময় ফ্রেন্ডস ছিল বটে। এর থেকে বেশী কিছুও ছিল হয়ত। এই অল্প সময়ের মধ্যে তার চোখের সামনে সমস্ত দৃশ্য সিনেমার মত ভেসে উঠল। অনেক দৃশ্য। তাকে শেষবার যখন অর্ক দেখেছিল তখন সে একটি ছেলের বাইকের পেছনে বসে কোথাও যাচ্ছিল। কয়েক মুহূর্তের জন্য চোখাচোখি হয়েছিল কিন্তু সেই চাহনির মধ্যে যে শূন্যতা অর্ক দেখল তা সে আর কখনো দেখেনি। মৃন্ময়ী কি তাকে চিনতে পেরেছিল? যদি পেরেও থাকে বলা যায় সে অর্কর প্রতি inert হয়ে গিয়েছে। সুতরাং অর্ককে দেখে তার মধ্যে কোনো reaction হবে না। তাও কি সম্ভব?সেই মৃন্ময়ীকেই ত সে কতবার বিয়ের পিঁড়িতে নিজের সঙ্গে কল্পনা করেছিল তার বন্ধুদের বিয়ে চলাকালীন। ছোটবেলার জমানো কোনো কালেকশন, কোনো এককালের বিরাট পাওনা, ড্রয়ার বন্দী জিনিস গুলোর মত ঐ স্মৃতিগুলো সে কোথাও বন্দী করে রেখে দিল। কখনো কাজে লাগেনা তা ঠিক কিন্তু মাঝে মধ্যে একটু নেড়েচেড়ে দেখে মুচকি হাসে ও দীর্ঘশ্বাস ফেলে। পুরানো দিন গুলো আজ রূপকথার মত মনে হয়। 

                  তখনই হঠাৎ একটি আওয়াজ অর্কর কানে গিয়ে তার অন্যমনস্ক ভাব কাটিয়ে দিল। "এই যে....এই যে শুনছো, খোকার ঘুম ভেঙেছে। ওকে একটু ঘুরিয়ে নিয়ে আসো।"


সুমা গোস্বামী

১. রুটিন

আমার আমিটার সাথে 
তোর আমিটার বড্ডো মিল।
আমার হাসিতে আজও
তোর ঠোঁটের হাসি চলকে ওঠে,
তোর মনের কান্নাভেজা বৃষ্টিতে
আমি কাঁদি হাজারো বার।
এটাই এখন রুটিন
হয় না কখনোই নড়চড়।

২. ভালোবাসি বলেই 

ভালোবাসি বলেই আজও
 বুকে দ্রিমিদ্রিমি স্বরে মাদল বাজে,
ভালোবাসি বলেই আজও
গ্রীলের ফাঁকে উঁকি দিতে ইচ্ছে করে।

ভালোবাসি বলেই আজও
পুরুষালী গন্ধটা ঠোঁট-গাল-কপাল চুঁইয়ে পড়ে, 
ভালোবাসি বলেই আজও
তোমার চোখে চোখ রাখা হয়নি আমার।

রমা চন্দ্র

সিন্ধু সারস

স্বাধিকারের প্রশ্নে আমি 
ভীষণ রকম ক্লান্ত...
স্মৃতিতে রেখেছি সুপ্ত বাসনা 
অন্তরে না পাওয়ার বেদনা
হৃদয়ে আবদ্ধ চুপকথার সংলাপ...
অবিরত রক্তক্ষরণে ছয়লাপ!
তবুও সম্পর্কের চিরস্থায়ী বন্দোবস্তে
আজ আমি 'গান্ধারী'!
ভীষণ জেদি এই আমিটা 
প্রতিনিয়ত নিজের সাথে লড়ি,
লড়াইয়ে হার মানলেও
লড়াইটা রাখি জারি...
কখনও সিন্ধু সারস হ'য়ে
সিন্ধু বুকে উড়ি...
আবার ঈশান কোণের মেঘ হ'য়ে
তুমুল বেগে ঝরি...!

শশাঙ্কশেখর পাল

হাইকু

১
ফুল ফুটছে
ছাদে বাহারি টব
ডাকে কোকিল 

২
লেপ শুকোচ্ছে
মুছে যাচ্ছে শিশির
সবুজ গন্ধ

৩
ফাগের রঙ
পাখির কলতান 
আজ বসন্ত

৪
একটি ছাতা
মেঘেরা কলো পাখি
জলের শব্দ

৫
কী বৃষ্টি আহা
নদী‌র ভাঁজে ঢেউ
ষোড়শী কন্যা

৬
শীতের হিম
গর্ভে দোল বসন্ত
বর্ষার নদী

মীনাক্ষী চক্রবর্তী সোম

নির্মোহ সমর্পণ

পেলেই তো ফুরিয়ে যাবে 
তার চাইতে এই ভালো 
অপ্রাপ্তির আমেজটুকু থাকুক ভরে  
চাওয়া পাওয়ার অলীক প্রেমে।
এখনো গোলাপি আশারা ডানা মেলে
দিগন্তের রূপোলি রেখার টানে
সেই চলাতেই মখমলি রূপকথারা
পাপড়ি ছড়ায় আনন্দে।
পথিক হেঁটে যায় প্রলম্বিত এক পথ
শেষবিন্দুর অমোঘ আকর্ষণে
কুড়িয়ে নিয়ে যত পরিচয় পার্বণ
ফুরিয়ে যাবার আগে নির্মোহ সমর্পণ ।।

নৃপেশ আনন্দ দাস

মৃত্যুহীন

এই নদীর তীরে তীরে অনেক মানুষ ছিল,

অনেক রাজা ছিল ; সেখানে এখনো খেলা করে অনেক স্বরলিপি, কত না গানের সুর । এখনো সমস্ত অনাহুত কোলাহলকে ঢেকে দেয় বসন্তের কোকিল । একই আকাশের একই মেঘেরা আজো শুদ্ধতার জল ছিটায় ।

 যে নক্ষত্র মরে গেছে তার ছড়ানো কবেকার আলো জোনাকির মতো ফিরে আসে ; এসে গৌরব গাথা লেখে আঁধার পৃথিবীর ।

রুচির দুর্ভিক্ষে বেঁচে যাওয়া সুন্দরগুলোর একদিন ঠিক এভাবেই বিজ্ঞাপন হয় ।



সুধীর দাস

রাস্তা

রোজ  রাস্তা দিয়ে হেটে যায় কতশত মানুষ ,
কেউ যায় দুপায়ে কেউবা চার পায়ে ।
কেউ কুলো মাথায় বাজনার তালে তাল মেলায়,
আর কেউ হরি বোলা বোল হরি বলে সুর মেলায়।
এই পথেই রোজ হাটি আমি ,
পাশ কেটে যায় চেনা অচেনা মুখ,
এই পথেই হেটে যেতো আমার পূর্বসূরীরা,
এই পথ বয়ে নিয়ে চলে তোমার আমার 
ফেলে আসা স্মৃতি, নাম দিয়ে রাখে ইতিহাস।
এই পথে জমে থাকা কান্না ভাসিয়েছে
জমে থাকা ধুলো ভরা স্বপ্ন।
এই পথেই রোজ চলে শ্বাসরুদ্ধকর কালো ধোঁয়া
ঢেকে যায় বাতাস।
তোমার মুখ ঢাকে অন্ধকারে ।
শেষে তোমার আমার চার পায়ে একদিন বিদায়।


সুপ্রতিম ভৌমিক

 হাইকু 
 
২. চরণে রেখে 

তোমার সনে,
হে পরম দেবতা,
হয় নি দেখা ।

তথাপি কেন
মনে হয় গো তুমি,
কত যে চেনা !

হে দয়াময়,
সতত পাশে থেকো,
চরণে রেখো ।

২. ঊষষী লগনে

ঊষার হাসি,
রাঙা ঊষষী লগ্নে,
পূর্ব গগনে ।

সোনালী হাসি,
রক্তিম আভা ঝরে,
প্রভাত নভেঃ ।

মধুর গীতে,
বিহগ কাকলিতে,
হল সুঊষা ।

চন্দ্রা বিশ্বাস

অন্তর্দর্শন 
            
সকাল তো মুছে গেছে 
স্মৃতির দুয়ারে এঁটে দুরাশা-আগল,
দুপুরের রোদ্দুরে অসহায় মন বলে 
ভোল ওরে মন, তুই অতীতকে ভোল। 
কাটাছেঁড়া অবিরাম তবু অফুরান 
বিজলী চমকে মনে নব উত্তরণ। 
জীবন তো চলমান, তাই পথচলা 
ছন্দের তুলি আঁকে পালা কথামালা। 
মেধার অনল মনে ধিকিধিকি জ্বলে 
হতাশার ছাই মুছে হাসি সব ভুলে। 
পেটে যে আগুন, ঘরে মা-বাবা-ভাই 
সব ভুলে জঠরেতে অন্ন ছড়াই। 
অচেনা অজানা সেই দুপুর সকালে
ঘৃতাহুতি দিয়ে যাব মনন-অনলে। 
নতজানু জীবনের মনে শুভ মতি 
জীবনের হোক আজ পূর্ণ আত্মাহুতি।