Dec 30, 2023

শর্মি দে

পঁচিশ বছরের ঘুম

রাত পোহালো!

অনড় অসাড় শরীরটা নিয়ে মিতার আজ আর উঠতে ইচ্ছে করছে না। সারা রাত জ্বরে পুড়ে যাচ্ছিল শরীর।

      তা সত্ত্বেও পিয়ালের জৈবিক ক্ষুধা মেটানোর প্রতি তার কর্তব্যবোধে কোনো খামতি নেই।

      আবার ঘুমিয়ে পড়ে! হঠাৎ চিৎকারে ঘুম ভেঙে গেলো।

পিয়াল চিৎকার করছে!! "বাবাই স্কুল কামাই করবে নাকি?" নাকে তেল দিয়ে ঘুমোচ্ছেন মহারাণী! গজগজ করে মিতার মুণ্ডুপাত করতে শুরু করলো।

        কিন্তু দু দুবার দেখে গেছে পিয়াল। শরীর ছুঁয়ে দেখেছে টেম্পারেচার কমলো কিনা! মিতার একদিন অসুস্থতা মানে বিছানা না ছাড়া ওর জন্য বাজ পড়ার মতো অবস্থা। সামান্য টিফিন বানিয়ে ছেলেকে তৈরি করে স্কুলে পাঠাতে হিমশিম খেয়ে যায় পিয়াল।

        অগত্যা মিতা চোখের জল মুছে বাবাইকে তৈরি করে দেয়। এই একভাবেই পঁচিশ বছর কাটিয়ে দেয় মিতা। নীরবে!! বাবাই চাকরি করছে। পিয়ালও অফিস করছে তবে একটা নতুন আকর্ষণে অফিস থেকে বাড়ি ফিরতে ইচ্ছে হয় না ওর।

       বাড়িতে বসে কি পরকীয়া সম্ভব! ফেসবুক ম্যাসেঞ্জারের দৌলতে তাই প্রতিদিনের পর্ব শেষ করে বাড়ি ফেরে। মাঝে মাঝে ভিডিও কলে রসালাপ হয় তারপরেই প্রয়োজন পড়ে মিতার দেহের। একটা এমুইজমেন্টের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। মিতা সব বুঝে! ওর আত্মমর্যাদায় আঘাত লাগে তবুও চুপ করে সব সহ্য করে। সংসারটা বাঁচিয়ে রাখতে প্রাণপন চেষ্টা করতে হবে ওকে!

       আটবছরের প্রেমের বিবাহ, বিবাহিত জীবনের অটুট বন্ধনে ছিল বাঁধা। ছোট সংসারে সাহায্যের জন্য কেউ ছিল না। একা হাতে সামলেছে সব। শারীরিক কষ্ট হলেও উফ্ করতে পারেনি বা করে নি বাংলা সাহিত্যে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি নারী মিতা। ওদের ভালোর কথা ভেবে চাকরিটাও ছেড়ে দিয়েছিল। 

      আর আজ! এতো বছর ত্যাগের দেবী হয়ে বৈবাহিক জীবন কাটানোর পর মিতা নিজেকে নিঃসহায় অবলা নারী হিসেবে দেখতে পায় যখন পিয়ালের চোখে মুখে অন্য নারীর প্রতি প্রেম ফুটে ওঠে! এখন মাঝেমাঝেই বলে "একটা চাকরি করার চেষ্টা করো মিতা"! হয়তো মিতাকে ছেড়ে চলে গেলে মিতার পরবর্তী জীবন নিয়ে ভাবে। কারুর পরকীয়ার গল্প শুনলেই বলে উঠে, "ঠিক তো একজনকে নিয়ে কতদিন থাকা যায়!"  মিতার ভিতর হুঁ হুঁ করে কেঁদে ওঠে। পঁচিশ বছর ধরে এতো প্রেম এতো ভালোবাসা কোথায় হারিয়ে গেল! মিতা জানে ঘরে ঘরে পরকীয়া বেড়ে চলেছে...আর আজ তার সোনার সংসারটাও?

    "মা ...মা" ডাক শুনতেই মিতার ঘুম ভাঙে! এই মুহূর্তে মিতার মনে হয় আর ঘুমালে চলবে না, ওকে জেগে থাকতেই হবে বাবাইর জন্য 

রিপন সিংহ

ক্লান্ত পথ

ক্লান্ত দেহ নিয়ে পৃথিবীর এই দোয়ারে,
কার্তিকের শেষ সন্ধ্যায়
গভীর অন্ধকারে ডাকে।
তারপর, অনেক দিন পর
এই পথে কোন একদিন দু'জনের মধ্যে অনেক স্বপ্ন ছিল;
তবুও কোনো স্বপ্ন দেখিনি বারেবারে;
আমি এক ঘুমন্ত প্রাণ,
মেখে আছে তার ঘ্রাণ,
তবুও এই পৃথিবী ম্লান!
শ্মশান, কিংবা কবর থেকে এসেছে কতবার
মিলনের চিঠি
আমি ডেকেছি তারে বারবার;
রূপকে নয় -- তারে ভালোবেসে;
যে পথে হয়েছিল দেখা
আজও সেই ক্লান্ত পথে বেচেঁ আছি।
----  আর নয় !
যেদিন কুয়াশার ভেতর বুনো হাঁস,
হংস হংসীর ডাকে,
একুশ বছর পর তোমার আহ্বানে;
তখন বলবে --- "একটিবার সুযোগ দাও"
তোমার হৃদয়ে,
তখন এই ক্লান্ত পথ থেকে মুছে যাবো চিরদিনে,
তারপর শিশির মাখা বাতাসে
হারিয়ে যাবো নতুন এক যাত্রীর ভিড়ে।

সোনালী মণ্ডল

গীতু পাগলী

গীতু পাগলীর পাঁচটি মেয়ে
ভীষণ অভাবে তারা রয়,
জীবন টাকে বাজি রেখে
তাদের স্বপ্নকে করে জয়।
একটি ছিলো বিদ্যান ভারী
দেশে ডাক্তারিতে সুযোগ পায়,
দশের মঙ্গল করে সে
বংশের নাম বাড়ায়।
একটি ছিলো ভাবুক মনের
লিখতো বসে কবিতা,
দেশ বিদেশে চিনলো তাকে
স্মারকে পেল কবির আখ্যা।
একটি ছিলো তর্কে পটু
হারানো তাকে দায়,
যুক্তির জোরে উকিল সে
সর্বদা সত্যের পাশে দাড়ায়।
একটি ছিলো পারদর্শী
হস্ত শিল্পের গুণে,
বাড়ি হলো তার স্কুল
পাড়ার গৃহবধূ দের নিয়ে।
একটি ছিলো কোকিল কণ্ঠের
গাইতো অনেক গান,
শিল্পী হয়ে বলে আজ
আমি গীতু পাগলীর সন্তান।।

নৃপেশ আনন্দ দাস

শূন্যের ভেতর

সব তো আর ভালো লাগার নয়
তবু সব ভালো লাগার চাবি গুরু-মগজ থেকে নিয়ে
আকাশের দরজা খুলে দিই ----
পাখি এসে বসে কাছের ডালটায়
ঠিক তখন লেখা শুরু হয় ভালবাসা আর সত্যের উপাখ্যান ।
আবার,
শূন্যের পরিধি মেপে মেপে, 
যখন একরাশ শূন্যতার মুখোমুখি হই,
তখন, স্বর্গ নরক হয় ।
শূন্যের ভেতর বিশ্বভ্রহ্মাণ্ড আঁকতে পারলে,
তুমি আমি একসুরে মানবতার গান গাই
জড়-জীব যেখানে মেশে শিশুর অট্টহাসিতে
সেখানে ঈশ্বর খুঁজে পাই ।।

প্রিয়াঙ্কা দেবনাথ

সুখপাখি

ক্লান্ত দেহ ঘুমের ঘোরে
এলিয়ে দেবো যখন,
ঠিক তখনই মনের ঘরে
সুখের নির্বাসন।

যতোই ভাবি গুছিয়ে নিলাম
সাধের বালির চর,
ভাঙলো আবার শক্তহাতে
সে কি দারুণ ঝড়!

হাতড়ে বেড়াই আঁধার ঘরে
কোথায় আপনজন?
সুখের পাখি সুখ ফুরালেই
খুঁজে নির্বাসন।

অভিষেক অধিকারী

প্রেম এবং

অভিব‍্যক্তির নীরবতা আজ প্রশ্ন তুলেছে,
স্তব্ধ হয়ে এসেছে সভ‍্যতার কোলাহল।
তোমার প্রতিটি সরলতায় ভরা কথপোকথন
ভাগ বসিয়েছে সেই কোলাহলে।

আমি আজ যাযাবর,
সভ‍্যতার রং মুছে দিয়ে হেঁটে চলেছি,
প্রেমের খোঁজে। 

তোমার নকশা আঁকা মানবিক সম্পদগুলো 
খেলতে চাইছে,
মানুষের কুটিল স্থাপত‍্যের সঙ্গে। 

আমি আজ এঁকে চলেছি
প্রেমের একএকটি স্থাপত‍্যবোধ।
যাতে কোন কুটিলতা নেই।

চাওয়া পাওয়ার দ্বন্দ্ব নিয়ে একটা সভ‍্যতা চালানো যায়।
কিন্তু প্রেম এসবের অতীত। 

তাই তো একটা প্রেমের খোঁজে আমি বেরিয়েছি,
সভ‍্যতার চোরাপথ থেকে সরে গিয়ে। 

রামমোহন বাগচী

হবে অবসান ? 

এ পাড়ে তে  বি-দেশী
ও পাড়ে তে বি-ধর্মী
কিসের দোষে হলাম দোষী
হারিয়ে আপন ভূমি, 
মন্ডামিটাই পেলো তারা
ভাগবাটোয়ারা করলো যারা। 
স্বদেশ হলো বিদেশ ভূমি
নদী হলো লাল, 
আমার গালে পড়লো থাপ্পর
এখানে সেখানে, হারিয়ে আপন ভূমি, 
আর কথ কাল বইতে হবে এমন অপবাদ
কার কাছে আছে জাদুর লাঠি  
ঘোচায় এই অসন্মান।।

মিঠুন রায়

স্তব্দতা

কোলাহলের মাঝেও একটা স্তব্দতা নেমে আসে পাতার ওপর।
অগোছালো ঘরের ছাঁদে বেড়ে উঠেছে একটি অপরাজিতা,
সন্তর্পণে আঁকা  অভ্যাসের মাটি আমি।
তোমার স্মৃতিকথা এখনও জেগে রয়েছে মনন ভূমিতে।
নীরবতা প্রতীক হিসেবে একটি শুকনো নদী চেয়েছিলে তুমি
একটা স্তব্দতার জন্য কেবল তোমাকে চেয়েছি।

দীপু দেবনাথ

বিসর্জন 

আঁচলটাকে বেঁধে দিলাম সংসারের উদ্দেশ্যে 
জানি বোঝ নেই বাদ্য আমি সমাজের হাতে!
আপন পরের ফারাক ভুলে, 
মেয়ে আমার নতুন ঘরে।
হাজারো তারার মাঝে আমার একটি সুখ তারা 
সূর্য ন্যায় আলো দেবে আমার গ্রহ ছাড়া।
বাঁধবে সুখের আলোর ঘর জ্বলবে নিরন্তর।
শিষ্টাচারের মঞ্চে ছেড়ে আজি করিবে পদার্পণ 
আমি হলাম উপেক্ষা,     উপেক্ষা হল আপন! 
তিল তিল ঘরে মানুষ করা আমার সেই রতন,
শূন্য হাঁড়ির ন্যায় আমার একাকিত্ব জীবন!
অশ্রু জলে জন্ম নিল আমার বুকে নদী!
মেয়ে আমার অবুঝ পাখি 
দিয়েছি বিসর্জন ঐ নদীতে,যে নদীর সূত্র আমি।

নুরুল শিপার খান

ফুলবানু

মা,ওমা খিদে লাগছে! কান্না জড়িত কন্ঠে বলে মেয়ে ফুলবানু..

রহিম মিয়ার একমাত্র মেয়ে ফুলবানু৷

গতবছর চাঁদপুরের নদীভাঙনে বাড়ি ঘর সব তলিয়ে যায় সেই থেকে ওরা ঢাকার করাইল বস্তিতে থাকে৷

রহিম মিয়ার বয়স পঞ্চান্ন ছুঁই ছুঁই কিন্তু সারাদিনের খাটুনি যেন তাকে আশি বছরের বুড়া করে দিয়েছে৷ 

মেয়ের বয়স সবে সাত বছর ,অভাবের দাগ কাটিয়ে উঠতে দেরিতে বিয়ে করেন তিনি৷ সেই কাক ডাকা ভোরে রিকসা নিয়ে বের হয় আর ফিরে আসে রাতে.. 

অবশ্য যেদিন সুযোগ পায় সেদিন দুপুরেই বাসায় চলে আসে৷

সারা দিনের খাটুনি শেষে ঘরে ফিরে রহিমমিয়া যেন স্বর্গের সুখ অনুভব করে৷ চাঁদমুখ(মেয়ে ফুলবানু)কে দেখলে যেন সমস্ত ক্লান্তি এক নিমিষেই গায়েব৷আর যখনি ঘরে ফিরে তখনি মজা(একটা মিষ্টির পুটলা)নিয়ে আসে,মেয়ের অনেক পছন্দ মিষ্টি৷

রান্না ঘর থেকে জরিনা বেগম(ফুলবানুর মা) ভাতের হাড়ি নিয়ে ঘরে ফিরলো,দেখে রহিমমিয়ার মুখ ভার৷

-কি হলো ফুলের বাপ আপনার কি হয়েছে,আপনি এমন মুখ গোমড়া করে বসে আছেন কেন?

-কথাটা কেমনে যে বলি ফুলের মা সর্বনাস হয়ে গেছে৷

-কি হইছে ফুলের বাপ?

-কাল থেকে রিকসা চালানো বন্ধ"করুনা না কি যেন একটা অসুক আইছে দেশে৷

-হ করোনা,কিন্তু তার জন্যি রিক্সা বন্ধ রাখবে ক্যান..এই অসুখ তো চীনদেশে?

-নারে ফুলের মা,শুধু চীনদেশে না ব্যাবাক (১৯৯টি)দেশে ছড়ায় গেছে,সবাই বলাবলি করছে৷

-বলেন কি ফুলের বাপ?

-হ,বাংলাদেশে নাকি পাচজন মারা গেছে,দুইজন ডাক্তারের ও নাকি এই রোগ ধরা পড়েছে৷এ রোগ নাকি ছোয়াচে,বাতাসের সাথে চলে আর মানুষের শরীরে ঢুকে৷

-কন কি ফুলের বাপ,তাহলে আমাগো কি হইবো৷

-আমি ও তাই ভাবছি-রে ফুলের মা..আমরা না হয় আধপ্যাটে দিন পার করতে পারবো কিন্তু ফুল ?

-আপনি চিন্তা কইরেন না,ওই তিনতলার খালাম্মা কইছে ওনাগো কাজের বুয়া একমাসের জন্য গ্যারামে যাইবো ওই এক মাস আমি খালাম্মাগো বাসায় কাজ করবো,আপনে শুধু ফুলেরে দেইখেন৷

-কস কি ফুলের মা,জানিস না আগামীকাল থেকে ঘরের বাইরে যাওয়া বারন,সরকারি ভাবে ঘোষনা দিছে ,মাইকে বলছে,আবার টিভিতে ও দেখাচ্ছে "লকডান না কি জানি কয় ৷

-লকডান কি ফুলের বাপ৷?

-মানে আমি ও জানিনা,তয় ঘরের ভেতর থাকতে হবে দশ দিন,বাইরে বের হলেই মিলিটারি মাইরধোর করবে৷

-কিন্তু আমরা গরীব মানুষ লকডান করলে আমাগো প্যাটে ভাত দিবো ক্যাডা?


এরি মধ্যে রমিজ মিয়া হাজির..রমিজ মিয়া সম্পর্কে রহিমমিয়ার চাচা,পাশাপাশি থাকে ওরা

-চাচা,কাল থেকে তো ঘর থেকে বাহির হওয়া নিষেধ,আপনি শুনেছেন?

-হ শুনছি তো,আর তাই ছুটে এলাম তোর কাছে,এই শোন কাল সকালে সমতা মডেল ইসকুলে যাবি আমার সাথে৷

-সরকার না ঘর থেকে বেরুতে বারন করলো?

-করেছে ঠিক আছে,কিন্তু সরকারই আমাদের কথা ভেবে চাল ডালের ব্যাবস্থা করেছে৷

-কন কি চাচা?

-হ,এই দশ দিনে দেশের সব গরীব,খেটে খাওয়া দিনমজুরদের সরকার খাওয়াবে,তয় শর্ত একটা?

-কি শর্ত চাচা?

ওই যে লকডাউন থাকতে হবে,রমিজ মিয়া চলে গেলো৷

যাক তবুও একটা উপায় হলো,ইয়া আল্লাহ তোমার দুনিয়ায় আজ ও গরীবের অন্ন জুটে৷

-----------------------------------------------

পরদিন সকালে চাচা রমিজউদ্দিনের সাথে একটা বস্তা নিয়ে বের হলো রহিমমিয়া৷

সমতা মডেল স্কুলের সামনে বিরাট বড় গাড়ি চালডাল ভর্তি৷ শত শত দিনমজুর খেটে খাওয়া মানুষের ঢল নেমেছে৷সবাইকে লাইনে দাড় করানো হলো..একে একে নাম ডেকে সবাইকে চালডাল দেওয়া হলো...দুপুর গড়িয়ে বিকাল হয়ে গেলো৷চাচা রমিজউদ্দিন ও পেলো চালডাল কিন্তু রহিমমিয়ার  নাম আর ডাকেনা৷

এবার চাচা রমিজউদ্দন রহিমমিয়াকে সাথে নিয়ে অফিসারের সাথে কথা বলল..তিনি বললেন ওনার নাম এখানে নেই...সরি আমরা কিছু করতে পারবোনা৷অন্যজন বললো আচ্ছা তোমার নাম ঠিকানা বলো আর এখানে একটা সাক্ষর দাও আমি দেখি কথা বলে কাল ব্যাবস্থা করতে পারি কিনা৷

ভারাক্রান্ত মন নিয়ে ঘরে ফিরলো রহিম মিয়া,খালি হাত দেখে জরিনা বেগম জিজ্ঞেস করলো

-কি হইছে আপনার ফুলের বাপ,চাল,ডাল কই৷

-পাইনি৷

-পাননি মানে?

-ওসব আমাদের জন্য নারে ফুলের মা,ওসব হলো বড়লোকদের জন্য,,যাদের অনেক আছে তাদের জন্য৷


নিমিষেই মনটা বিষন্নতায় ঢেকে গেলো জরিনা বেগমের স্বামী রহিমমিয়ার কথা শুনে৷

পরে রমিজউদ্দিনের কাছে সব জানতে পারলো৷কিন্তু হাড়িতে যে ভাত আছে তা আজ রাতে কোনমতে চলে যাবে কিন্তু কাল ?

সকালে ফুল ঘুম থেকে উঠেই পান্তা খেতে চাইবে তখন কি করবে জরিনা বেগম৷ভাবনার দরজায় টোকা দিয়ে বলল রহিমমিয়া-চিন্তা কইরোনা ফুলের মা,সকাল হোক একটা ব্যাবস্থা হবেই৷

পরদিন সকালে জরিনা বেগম ঘুম থেকে উঠে দেখে রহিমমিয়া পাশে নেই.কখন যে ঘুম থেকে উঠে বেরিয়ে গেছে টেরই পাইনি৷রিক্সা ও নেই৷তবে কি রিকসা নিয়ে বের হলো?কিন্তু সরকার তো বলেছে "লকডন" মানে ঘর থেকে বের হওয়া যাবেনা,বের হলেই করুনা রোগে ধরবে৷

একবার ঘরে একবার বাইরে করছে..ওদিকে ফুল ও খিদের জ্বালায় কান্নাকাটি করছে৷যত বলছে তোর বাবা মজা আনতে গেছে কিন্তু কিছুতেই কান্না থামছেনা, কিযে করবে বুঝে উঠতে পারছেনা জরিনা বেগম৷

এদিকে বেলা বারোটা বেজে গেছে..সকালে দুইটাকা দিয়ে এক পিচ পাউরুটি কিনে দিয়েছিল ফুলকে সে ওটা খেয়েই খেলছে ঘরের মাঝে৷

অবুঝ শিশু সে তো আর বুঝেনা অভাব কি জিনিস,ক্ষুধা লাগলেই তাকে খাবার দিতে হবে৷


বেলা দুইটা বেজে যায় রহিমমিয়া আর ফিরে না..

মা আমার খিদা লাগছে,বুঝোনা,আমারে খাইতে দাও এই বলে কান্না শুরু করে দিয়েছে ফুল৷

হঠাৎ রমিজউদ্দিন দৌড়ে এলো-বৌ মা সিগগির চলো রহিমমিয়ারে মিলিটারিতে ধরেছে৷

-ও আল্লা গো বলে চিৎকার দিয়ে ফুলকে নিয়ে রমিজ চাচার পিছে পিছে দৌড়ে গেলো  জরিনা বেগম৷

দেখে মোটা রশি দিয়ে রহিমমিয়াকে বেধে রেখেছে মিলিটারি তাদের গাড়ির সাথে৷

কেউ সামনে যাচ্ছেনা..কিছু লোক দুরে দাড়িয়ে দেখছে৷এবার জরিনা বেগম দৌড়ে  স্বামীর কাছে গেলো

-আপনি কি করিছেন ফুলের বাপ,ওনারা আপনারে ক্যান বাইন্দা রাখছে কন?

-আমি কিছুই করিনাই ফুলের মা..আমি রিক্সা নিয়ে বাইর হইছি এটাই আমার দোষ৷

এবার মিলিটারি অফিসার জরিনা বেগমের সামনে এসে দাড়ালো-তোমার স্বামী ঘর থেকে কেন বের হয়েছে,তোমরা কি জানোনা সারাদেশ লকডাউন চলছে?সরকার যেখানে চালডালের ব্যাবস্থা করেছে সেখানে তোমরা জীবনের ঝুকি নিয়ে কেন বের হচ্ছে?

-প্যাটের জ্বালা বড় জ্বালা হুজুর,আমরা সরকারী কোন চাল ডাল পাইনা..এই যে মাইয়াডা ক্ষুধার জ্বালায় কানতেছে হুজুর,ওর কান্নার কাছে করোনা ভাইরাস কিছুইনা..

তাই ওর বাপে রিক্সা নিয়ে বের হইছে৷কোন সময় বের হইছে আমি জানিনা হুজুর৷দয়া করে ফুলের বাপেরে ছাইড়া দেন৷


এবার ফুল ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে লাগলো--ও বাবা তোমার মুখে রক্ত কেন,কি হয়েছে তোমার৷

-তোর বাবা সরকারী আদেশ অমান্য করে ঘর থেকে বের হয়েছে,তাই তোর বাপেরে রশি দিয়ে বেধে রেখেছি বললেন মিলিটারী লোক৷

-ও কাকু আমার বাবারে ছাইড়া দেন,আমার বাবার কোন দোষ নাই,সব দোষ আমার৷

আমি যদি বাবার কাছে মজা (মিষটি)খাইতে না চাইতাম তাহলে আমার বাবা রিক্সা নিয়ে বের হতো না..আমি আর কোনদিন বাবার কাছে মজা খাইতে চাইবোনা কাকু৷

-তোর বাবাকে ছাড়বো তার আগে কান ধরে উঠবস কর..আর বল কোন দিন সরকারী আদেশ অমান্য করবি না?

এবার রহিমমিয়া সবার সামনে কানধরে উঠবস করলো তারপর তাকে ছেড়ে দিয়ে চলে গেলো মিলিটারি...

এবার ফুলবানু বাবাকে জড়িয়ে ধরে বললো বাবা আমি আর কোন দিন মজা খেতে চাইবোনা তোমার কাছে৷

-মারে আমি তোর হতভাগ্য পিতা যে এইটুকু মাসুম বাচ্চার মুখে খাবার দিতে পারেনা..সরকার ঠিকই আমাগো সাহায্য করে কিন্তু সে সাহায্য হাত বদল হতে হতে আর আমাদের হাতে পৌছায় না৷

প্রিয়পাঠক বর্তমান প্রেক্ষাপটকে গল্পের মাধ্যমে তুলে ধরার চেষ্টা করেছি মাত্র৷

একবার ভাবুন তো আমাদের দেশে পথে প্রান্তরে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে এরকম হাজারো রহিমমিয়া পরিবার৷

যারা করোনার মতো মরনঘাতি ছোয়াচে রোগকে উপেক্ষা করে জীবনের ঝুকি নিয়ে নদীতে মাছ ধরছে ,আবার কেউ রিকসা চালাচ্ছে ,আবার কেউ দিনমজুরের কাজ করছে..কিন্তু কেন?

আমরা কি পারিনা ওদের পাশে একমুঠো অন্ন দেবার প্রতিশ্রুতি নিয়ে দাড়াতে?

আমরা কি পারিনা ওদের একবেলার খাবার জোটাতে?

আসুন আমরা যার যার সাধ্যমত ওদের পাশে দাড়ায়..........

প্রগতি দে চৌধুরী

যুদ্ধ-খেলা 

সাইরেনের শব্দ, গুলির আওয়াজ 
লাশ লাশের পাহাড় 
মর্টার, বোমা, রক্তের ধারা 
বুকফাটা আর্তনাদ, হাহাকার 
বারুদে বাতাস ভারী, পোড়া গন্ধ 
মৃত মায়ের বুকে শিশুর কান্না 
জন্মের আগেই ভ্রুনে মৃত্যুর ঠিকানা। 
পাণ্ডুর আকাশে চিলের উড়াউড়ি 
পঁচা শবের স্তূপ, প্রেতপুরী --

ওরা মোবাইলে যুদ্ধ যুদ্ধ খেলছে 
আর সোল্লাসে চিৎকার করে বলছে 
জিতে গেছি - - জিতে গেছি।

দীপান্বিতা পান্ডে দীক্ষিৎ

প্রার্থনা

শান্তির প্রকম্পন ছড়িয়ে চারিদিকে শুধু দোষের কারখানা,
দিনরাত সব এক করে শেষে একরাশ দুঃখের হয় পাওনা৷
ক্ষণে ক্ষণে শুধু তোষামদ আর ত্যাগের আদর্শ,
শান্তি আসেনা কোনো দরজায় সবখানে শুধু অশান্ত।
এই বড়দিনে এই শুভ ক্ষণে প্রার্থনা তোমার কাছে প্রভু,
নূতন দিনে নূতনের আগমনে চারিদিকে রঙিন মনের আলো হয়ে ভরে উঠুক সবই।

রমা চন্দ্র

পার্বণ

বৈশাখেতে বর্ষবরণ-
নতুন পোশাক
নতুনের আবাহন...
জ্যোষ্ঠ মাসে জামাই ষষ্ঠী
মাছ পোলাও আম মিষ্টি,
আষাঢ় মাসে ঠাকুর পথে
রথযাত্রায় সকলে মাতে...
শ্রাবণী পূর্ণিমায় 
রাধে কৃষ্ণ ঝুলন দোলায়...
আনন্দ প্লাবনে সকলের মন ভরায়,
ভাদ্র মাসে জন্মাষ্টমী
তাল ফুলুরি লুচি পায়েস
শ্রী গোপালের চরণ চুমি...
আশ্বিন মাসে শুভ্র কাশফুল হাসে
ঝরা শিউলিতে পা ফেলে
ঘরের মেয়ে উমা আসে...,
কার্তিক মাসে দেব দীপাবলি
শ্যামা মায়ের পূজা
শেষ দিনটিতে দেব সেনাপতি
কার্তিক ঠাকুর খোঁজা,
অগ্রহায়ণে হৈমন্তীরাণী
সোনালী ধান সম্ভারে-
ভ'রে দেয় কৃষাণের উঠোন খানি 
নবান্ন উৎসব ভোরে
খেজুর রসের হাঁড়ি নিয়ে
রসকারিয়ে ঘোরে
পল্লীগ্রামের প্রতি ঘরে
পঞ্চব্যঞ্জন মাছের পদ
মণ্ডা মিঠায়ে হয় নবান্ন উৎসব,
পৌষে পোষপার্বণ
পিঠে পুলি সাজিয়ে থালা
আমরা মাতি সারাবেলা...
মাঘের শীতে জমে ওঠে
মেলা খেলা যাত্রা পালা
চড়ুইভাতি রোদের বেলা,
বাগদেবী বিদ্যালয়ে-
শ্রী পঞ্চমীতে জ্ঞানদীপ জ্বালে...
ফাগুনে পলাশ শিমুল বনে- 
দোলের রঙিন রঙে 
লাগে  প্রেমের আগুন...
চৈত্রের গাজন উৎসব গান
আনন্দধারায় পূর্ণ করে ভক্তপ্রাণ।

পান্থ দাস

স্বপ্ন

রাত নামে
আঁধারে 
একাকী স্বপ্নে,

আগন্তুক হয়েই
আসল তৃপ্তি
দিগন্ত ভ্রমণে।

মনের বাধ
ভাঙে
একা গগনে,

আস্তানাহীন হয়েই
গভীর আশার
শব্দ জাগে মনে।

সুপ্রতিম ভৌমিক

মরুভূমির মরুদ্যানে
                                       
শুষ্ক মরুভূমি
ধুধু বালুচর,
শনশন সমীরণ,
ঊষ্ণ বাতাবরণ।
বসিয়া বাতায়নে
একাকী কবি মনে,
গেঁথে যাই 
কথা মালিকা,
মরুভূমির মরুদ্যানে,
বহে উতলা পবন,
উন্মনা মন,
চঞ্চল বিহগ সম
নিমেষে যায় উড়ে
দূর অজানা ঠিকানায় ।
খুঁজে ফিরে শুধু
শান্ত শীতল হাওয়া,
সবুজ বনানী,
গগন, নীলিমায় নীল,
একটুখানি আশা,
অকৃত্রিম ভালোবাসা,
কবি মানসে কাঙ্খিত,
ঈপ্সিত ভালো বাসায় ।

সাগরিকা মজুমদার

শালিক পাখি
      
শালিক পাখি শালিক পাখি, 
কিচিরমিচির  ডাকাডাকি । 
ঝগড়া কেন করছ ভাই .. 
উঠোন ভরা ধান ছিটাই
কুটুস কাটুস খাও। 
প্রভাত এ চেচামেচি
 গোধূলি তে চেচামেচি
লাগে না  তো ভালো ভাই.. 
তাই তো বলি চুপটি  করে থাকো , 
মানুষ এর উপর ভরসা রাখো । 

উঠোন ভরা ধান আছে, 
পুকুর পানে জল। 
খেয়ে দেয়ে বসে বসে
করছো কোলাহল । 

বলি ,ও ভাই ... যাওনা  বাসায়,
সন্ধ্যা হল যে, 
পথ চেয়ে আছে, ফুটফুটে কচিকাচার দল।

গোপালচন্দ্র দাস

আঘাত 

ক্ষুধার্ত নিস্ব-জনদের সামনে খাদ্য ঝুলিয়ে রাখা এক মানসিক আঘাত।
সব আঘাতের শব্দ হয় না।
ভারী বুটের নিচে ফুল থেঁতলে গেলে
শব্দ কমে যায় পিচঢালা পথে
নির্মান বিনির্মাণে পথের পাশে গাছের কান্না
চর দখলে নদীর কান্না--কিংবা
যে শিশুটিকে বিক্রি করে যায়, মা!
সেই আঘাতে শুকনো রুটি ঢেউ খেলে তাঁর বুকে।
প্রতিদিন নিঃশব্দে শরীর থেকে রস চুষে নেয় প্রভূ
নিজেরা নরকে সংযম হারায় নিঃশব্দে---
ঘরে পর্দার আড়ালে ঘায়েল শব্দ
চারদেয়ালে আঘাত পেয়ে নিঃশব্দে কাঁদে।
যেমনটা---সব আঘাতের শব্দ হয়না।

চন্দ্রা বিশ্বাস

দিবাস্বপ্ন

আবারও ভালবাসা জাগে বিষাদের দুনিয়ায়,
অবকাশ গা ঝাড়া দেয়। 
বারান্দায়  বসে মোহমুগ্ধ নয়নে ,
শালিখ দম্পতির
মান-অভিমানের পালা উপভোগ 
করতে করতেই,
স্মৃতির দরজা হাট হয়ে খুলে যায়।
বুকের বাঁ দিকটা চিনচিন্ করে ওঠে,
অবসাদের চিতা দাউদাউ করে জ্বলে উঠে, নিভে যায়। 
নিভন্ত সেই ধোঁয়ায় চোখ জ্বালা করে, 
তবু, রজনীগন্ধার সুবাসে তখন মনে দখিণা ।

প্রদীপ কুমার মাইতি

শীত আসলে

শীত আসলে কষ্টে মরে
গরীব আর অসহায়, 
হাড় কাঁপুনি শীতে তারা
কাবু হয়ে যায়। 

শীত আসলে গরীবের ঘরে
নেই কোন সংস্থান,
হাত বাড়িয়ে ধনীরা তাদের
দেয়না কোন ত্রাণ।

সজ্জা যাদের ধূলো বালি 
কুয়াশা ভেজা রাতে,
শীত আসলে শীতার্ত মানুষ 
কাঁপে শীতের ঘাতে।

ধনী দের জীবন বিলাসবহুল 
গরম পোশাক গায়,
শীত আসলে গরীব মানুষ 
শুধুই কষ্ট পায়।

ধনীরা যখন রুম হিটারে
ঘুমায় পরম সুখে, 
ছিন্ন বস্ত্রে শীতার্ত মানুষের 
ঘুম আসেনা চোখে। 

চলো সবে শীতের পোশাক 
করবো তাদের দান,
শীতের রাতে শীতার্ত মানুষ 
পাবে তারা পরিত্রাণ।

সৃশর্মিষ্ঠা

অতঃপর

চলে গেছে 
মেঘ রোদ আলো অন্ধকার জল স্থল
সবাই

ভগাঙ্কুরে ক'টি আঁচড় 
আর আমি 

বিলাপের কাছাকাছি