Dec 30, 2022

অপাংশু দেবনাথ

ষট্‌পদী-তিন

চতুর বিকেল,শূন্য মাঠ, চারিদিকে কুয়াশা-কবচ,
বুক পেতে ডাকে সেই রাত্রি, আয় মরমি-প্রভাত।
সকল-সুখ সাজিয়ে রাখি,হয়তো তুমি গোপণে,
ভ্রমডানা মেলে উড়ে যাও, হারাও আদি অসুখে।

ভালোবাসা যদি নিঃস্ব করে,সব ভুল থাকে পড়ে,
ঈশ্বর জানে এই হৃদয়ে, ফুটেছে ফাল্গুনি-ফুল।

সন্তোষ রায়

শেকড়যাত্রা 

আমার আয়ুর সমান গাছ
আমি তার নিচে হাত-পা মেলা
সে আমার থেকে অনেক বড়
আমি ছোট হতে হতে শেকড়ে ফিরি।

সে যত আকাশ চায়
আমি চাই জল
নিজেকে চেনার তৃষ্ণা প্রবল।

কৃষ্ণকুসুম পাল

পাঁচ প্রেমে পাকা

প্রেম কি,না জেনে,প্রেম করে বোকা,
মরো না,মেরো না,পাঁচ প্রেমে পাকা।
প্রথম ধোকা খেয়ে,তোমার শুধু কান্না,
দ্বিতীয় ধোকা খেয়ে,ভাবো প্রেম আর না,
তৃতীয় ধোকা খেয়ে,নির্জনে একা,জীবন শেখা,
চতুর্থ ধোকা খেয়ে,বিয়ে করে এঁটে থাকা ,
পাঁচে আর প্যাঁচে নয়, পৃথিবী সাথী,
জীবন দিন যাপন আর সাঁঝে বাতি।
                 
প্রেম তো প্রেম নয়-অসীম আকাশ,
প্রেম যা'কে সে ষড়ঋতুর ঘূর্ণী বাতাস,
তোমার মেঘের মতো মিছে ছোটাছুটি,
তুমি কাঁদবে,বন্যা হবে, কাদায় লুটোপুটি।
প্রেম বিনিময় প্রথা নয়, প্রেমে নেই জয়,পরাজয়,
চার পালালেও,পঞ্চম তোমার জন্য পথ চেয়ে রয়।

সৌমত বসু

মায়া বৌ-২৪ 

আমি রাত্রির কথা লিখি , 
লিখি আত্মজনের আলো 
লিখি বেহুলা চলেছে ভেসে 
পাশে লখিন্দরের শব।

তুমি গাঙচিল হয়েছিলে 
কতো উঁচুতে মেলেছো ডানা
দেখি পাতার উপর আঁকা 
সেই আনন্দ ছায়াছবি।

লিখি জীবন তো একটাই
তাকে এভাবে পোড়াতে হয় ?
দেখি চোখেমুখে এসে লাগে 
শুধু বিশ্বাস পোড়া ছাই।

আব্দুল গফফার

গোল নিয়েই যত হিসাব

একটা গোল তার কোন মুল্য নেই, 
শূন্যের সংখ্যা বাড়িয়ে দাও,
শত হাজার লাখ কোটি কোটি-
কত হিসাবের খেলা সারাদিন,
যোগ বিয়োগ গুণ ভাগ লাভ লোকসান..।
খেলার মাঠে প্রতিযোগিতায় কত উল্লাস,
বারপোস্টের মধ্যে ঢুকলেই হল, গো ও ও ল!
ফুটবলের উন্মাদনা উচ্ছাস সেই গোল-কে ঘিরেই,
গোল না পেলেই ভুল নিয়ে কাটাছেঁড়া-
কার দোষ,ভুল কার ?
এই নিয়ে বাধে কত গন্ড'গোল'।
জয় হলেই মেরে দিয়েছো গোল,
পরাজয়ে চোখ ছানাবড়া, পাকায় গোল।
হেঁসেলেও 'গোল' এর খেলা-
রমণীর হাতের গুণে রুটি হয় গোল
বাঙালির সেরা আবিষ্কার রসের গোল-লা গোল।
তাইতো মিঠাই এত জনপ্রিয়,
চাঁদ সূর্য পৃথিবী, ভুবন জুড়ে গোল,
গোলের কত মহিমা-
গোল নিয়েই যত হিসাব।

শান্তনু ভট্টাচার্য

সাপ 

মাঝে মাঝে বেশ  বুঝতে পারি
নিজেকে গোটাতে গোটাতে কুণ্ডলী পাকিয়ে ফেলছি 
তবে কি শরীরে জমেছে নিদারুণ বিষ?
না বেঁকেই চলেছে শিরদাঁড়া

অসহ‍্য গ্রীষ্মের দাবদাহ মাঝে
অসহায় শীতঘুম চারিদিকে।

এখন লাখ টাকার প্রশ্ন- 
আক্রমণ না হয় বাদই দিলাম 
আত্মরক্ষার সময়ে উঠে দাঁড়িয়ে শত্রুর চোখে চোখ রেখে মারতে পারবো ছোবল?

নাকি শীতঘুমে মজতে মজতে শুধু  
খোলস বদলে বদলে কাটিয়ে দেব চিরকাল...

কুশল ভৌমিক

অলজ্জ দুঃখগুলো

একটা ট্রেন চলে যাবার পর
মফস্বলের স্টেশনটা যেমন শুরু করে অস্থির পায়চারি  
হাঁটতে হাঁটতে চলে যায় যাত্রীদের বাড়ি
আমার মন খারাপগুলো ঠিক তার বিপরীত। 
কেমন যেন ঘরকুনো, শত গঞ্জনা সয়েও সংসারে পড়ে থাকা বাঙালি বউ
ভাঁজে ভাঁজে দাগ পড়ে যাওয়া পুরনো শাড়ি
মুখ গুজে শুয়ে থাকে আলমিরায়।

তারপর বহু বহুদিন পর তালা ভেঙে বের করে আনি
জানালা খুলে দিয়ে বলি-বিদেয় হ
নাছোরবান্দা দুঃখগুলো
দুলতে থাকে বারান্দায়, রেলিঙে, কার্নিশে
ইলেকট্রিক পাখায়, ফুলের টবে, এটোবাসনে 
ভাঙা কাঁচের টুকরোর মতো ঘরময় ছড়িয়ে পড়ে 
নিজস্ব ভঙিমায়। 

উপায়ান্তর না দেখে দুঃখের টুকরোগুলো 
পুটলিতে বেঁধে তুলে রাখি আলমিরায়
যেভাবে সতর্ক রমণী লকারে ভরে রাখে
স্বর্ণালঙ্কার।

নন্দিতা দাশ চৌধুরী

অবগুন্ঠনে ডুবে যাই 

মাঝ রাতের যে ভাবনা তোমায় রাত ভর জাগিয়ে রাখে আমি হন হন করে ছুটে যাই সেই আচ্ছন্ন  করা ভাবনার কাছে,

নক্ষত্র  মাখা রাতের গন্ধে যেখানে তোমার সাগর চোখের ক্যানভাসে মেঘ ভাঙা শব্দ ভাঙার উল্লাসী নৃত্যের জলছবি আঁকা, আমি ছুটে যাই, 

ঝুমুরের সাথে মাদলের সুরে উপসুরে নিরবধি ছুঁয়ে থাকার কৌশল নিই, ভালোবাসলে নিজের তো আর কিছুই  থাকেনা পায়ে পায়ে হোঁচট খেয়ে মরতে হয়

অপরাজিতার নীল রঙ  বারবার  আমায় কাঙাল করে যেমন করে গজলের সরগম,

পাশানের মাঝে শিল্পের সৃষ্টি তাই বলে পাশানই শিল্প নয়, 

একটা শব্দহীন কাতরতা আমার দোরগোড়ায় পাথর  ভাঙে পাহাড় ভাঙে আকাশ  ভাঙে,ক্রমান্বয়ে আমি কালের চিতার অবগুন্ঠনে  ডুবে যাই।


রুদ্র মোস্তফা

প্রেমিক ও পুরুষের পার্থক্য 

মানুষের ভিড়ে মানুষের শোভা
আমাকে মনে করিয়ে দেয়
শীতের সকালের কুয়াশা কুড়ানো রোদের মুখে 
পুরে দেওয়া পরিত্যক্ত প্রেমিকার 
আশ্চর্য রঙিন প্রণয়ের কথা। 
অপরাহ্নে উড়ে যায় যেন অনেক কথার ধুলো।
বিরান মাঠ এগিয়ে আসে চুমোর ঠোঁট বাড়িয়ে। 
শহরের ব্যস্ত গাড়িগুলো 
ব্রেক কষে, একে একে থেমে যায় যেন কার সামনে.... 
স্মৃতির সামনে বসে চক্কর খাই লাটিমের মতো।
এ এক দারুণ খেলা! 
তুমি নেই যে শহরে সেই শহরে তোমার ভিড় 
বাড়িয়ে দেয় প্রেমিক ও পুরুষের পার্থক্য।

গোপেশ চক্রবর্তী

সঙ্গী 

বোধের ভেতর মায়া-স্টেশন 
তুমিও হও প্রকট-

একদম একা না-হলে...

নিবারণ নাথ

প্রেম

প্রতি রাতই যে বৃষ্টি ধূঁয়ে দেয় শরীর
এক উন্মাদনা আমাকে
বিব্রত করে
রক্তচাপ বাড়ে।

ভোরের কুয়াশায়
আহ্লাদে নাচে হাত পা
বাড়ির রাস্তায় দেখি সেই বৃষ্টি। 

অন্তমিলে 
আমি এক নষ্ট পুরুষ।

তৈমুর খান

বকশিক (অনুগল্প)

 হন্তদন্ত হয়ে রোজকার মতো আজও ট্রেনে উঠেছি। সকাল সাড়ে আটটায় ট্রেন। এক মিনিট দেরি হলেই মিস হয়ে যাবে। আজও ভিড়ে ঠাসা ট্রেন সিট ফাঁকা নেই বললেই চলে। সিটের এক ধারে একটি ব্যাগ রাখা আছে। কার ব্যাগ? কার ব্যাগ? বারকয়েক চিৎকার করে কারও সাড়া না পেয়ে ব্যাগটাকে কোলের ওপর নিয়েই বসে পড়ি। ট্রেন চলতে শুরু করে। প্যাসেঞ্জার ওঠানামা করতে-করতেই তিন-চার স্টেশন পেরিয়ে যায়। কিন্তু ব্যাগের মালিক কই? এখনো কেউ খোঁজ করল না! আর দুই স্টেশন পেরিয়েই আমাকে নামতে হবে। সেখান থেকে টোটো ধরে পনেরো মিনিট এগিয়ে গেলে তারপর আমার অফিস।

    আমি একটা বিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী। সর্বসাকুল্যে বাইশ হাজার টাকা বেতন পাই। এখনও ঘর করে উঠতে পারিনি। দীর্ঘদিন থেকেই ছেলে বাইক কেনার বায়না করলেও ওকে থামিয়ে রেখেছি। আর কয়েক মাস যাক তারপর কিনে দেবো। এমনি করেই তিন বছর পেরিয়ে গেছে। একমাত্র মেয়ের জন্য বিয়ের ঋণ নেওয়া ব্যাংকের টাকা এখনও পরিশোধ করা যায়নি। বছরে একবার ভেলোর যেতে হয় স্বাস্থ্য চেকআপের জন্য। তার জন্য আগে থেকেই ছুটি জমিয়ে রাখতে হয়। প্রতি মাসের ঘর ভাড়া দিয়ে, ওষুধের জন্য আলাদা করে কিছু খরচ রেখে এবং প্রতিমাসে ছেলের জন্য কোচিং সেন্টারের ফি বাবদ খরচ যোগ করে বাদবাকি যা থাকে তাতে কোনওরকম বেঁচে থাকা যায়। এরপর শখ-তামাশা-আহ্লাদ বলে আর কিছু থাকে না।            গিন্নি মাঝেমাঝেই খোঁচা মেরে বলে: 

    তোমার আর অভাব ঘুচবে না! কখনও একটা দামি শাড়ি দিতে পারলে না। হাতখরচের জন্য মাসে এক হাজার টাকাও দিতে পারোনি। নিজেদের একটা ঘরও হল না আজ পর্যন্ত!

     এসব কথার উত্তর দিতে গিয়ে আমার কন্ঠস্বরে কম্পন অনুভব করেছি। গলা নামিয়েই বলতে হয়েছে:

 দেখে নিও একদিন সবই হবে। ছেলেটাকে বড় হতে দাও আর ব্যাংকের ঋণ শোধ করে ফেলি। তারপর থেকেই আমাদের আর কোনও খরচ থাকবে না। তখন তোমাকে হাতখরচও দিতে পারব।

 কতকী ভাবতে-ভাবতেই ট্রেন আমার গন্তব্যে পৌঁছে গেছে। সিট থেকে উঠতেই সামনে দাঁড়ানো একজন প্রায় জোর করেই বসে পড়লেন। হাতের ব্যাগখানা ওর হাতে দিয়ে বললাম: 

    কার ব্যাগ জানি না, এই সিটেই রাখা ছিল, চাইলেই দিয়ে দেবেন। বলেই দ্রুত ব্যাগখানা তাকে দিয়ে নেমে পড়লাম।

 ততক্ষণে মাইকে ঘোষণা হচ্ছে:

   একটি বিশেষ ঘোষণা, এই ট্রেনের তিন নং কম্পার্টমেন্টে পঞ্চাশ লক্ষ টাকার একটি ব্যাগ রাখা ছিল। ব্যাগটি যিনি নিজের কাছে রেখেছেন দয়া করে স্টেশন মাস্টারের কাছে জমা দিয়ে যান।কালো রঙের লাল বর্ডার দেওয়া ব্যাগ। কর্তৃপক্ষ তাকে পঞ্চাশ হাজার টাকা বকশিশ দেবেন।

   ঘোষণাটি শুনতে-শুনতেই আমার একটি দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে গেল। ওই ব্যাগটি কালো রঙের লাল বর্ডার দেওয়াই ছিল! 

    বার কয়েক নেমে আসা কম্পার্টমেন্টের দিকে এগিয়ে যাবার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হলাম।ততক্ষণে পুলিশ এসে ঘিরে ফেলেছে চারিপাশ।

সন্দীপ সাহু

শেষের কবিতা

ঘনতম অতল নীল, প্রেমিকার মতো
চোখ চেয়ে ইশারা করে। ইশারায়
তারায় তারায় নৌকা ভেসে আসে!
নৌকাটা নীল গোলাপে একেবারে ভর্তি!

ভেসে এসে গোলাপের পাপড়ি ছড়িয়ে
বাসর শয্যায় নোঙ্গর ফেলে! প্রেমিকার মতো হেসে!
কখনো কেউ ভালোবাসেনি! যোগ্যতাও ছিল না!
সমস্ত ব্যর্থতাগুলো একে একে জরো হয়!

বিরোধী দলের মতো চিৎকার করে 
অনাস্থা এনে সমস্ত শাদাকে কালোতে মোছে!
বৈধ সম্পর্কগুলো চাবিকাঠি খুঁজতে
দেহে ময়নাতদন্ত চালায় দক্ষ ব্যোমকেশের মতো!

সাতপাকে ঘুরলেই সাত জন্ম, পাঁকে ডোবে!
পাঁকে পাঁকে সম্পর্কগুলো চাবিকাঠির ওপর
অধিকার নিয়ে পচা গন্ধ ছোটায়! ওই গন্ধে
মানুষ মরে। মানুষ মরলে সম্পর্ক থাকে কি!

ঘন অতল নীল আবার চোখ তুলে চায়!
চাবিকাঠি বৈধ সম্পর্কের মৃত মানুষগুলো কাছে রেখে,
ওই চোখের ইশারা-পথে এগিয়ে যাই।সেই চোখ 
সেই হাসি নায়িকার মতো ছুটে এসে জড়িয়ে ধরে!

শিল্পীর কাছে একান্ত অনুরোধ, ওর একটা
ছবি এঁকো! মুখটা কোরো ঠিক আমার মতো!
মুখে যেন কাপুরুষের জামা পরিও না!
লড়াই করে পরাজয়ের যে রঙ হয়, তা-ই এঁকো!

জানি তুমি অম্লান বদনে আঁকতে পারবে!
তুমি এমন একটা নদী, জোয়ার ভাটা সমানে খেলে!

নিয়তি রায় বর্মন

মায়ের অশ্রু

আমার মায়ের অনেক কষ্ট
পিতৃহীন সংসারে মায়ের উৎকন্ঠার শেষ নেই--
কোটি কোটি ভাই বোনের গ্রাসাচ্ছাদন, হায়! 
কাগজে স্বাধীনতা এলেও সন্তানের জীবনে বসন্ত আসে নি। 
মায়ের সন্তানরা অনেক কেজো, দুই হাত দুই পায়ে অনেক বল--
সোনার ফসল ফলায়, গগন চুম্বী অট্টালিকা সাজায়--
জগৎজোড়া নাম তাদের। 
চারু শিল্পে, কারু শিল্পে, সাহিত্য সংস্কৃতিতেও 
বিশ্ব জয় করেছে অনেক সম্মানে ও পদকে। 
মায়ের রবি, সত্যজিৎ, জগদীশ, অমর্ত্য, 
অভিজিৎ প্রত্যেকে মায়ের অলঙ্কার। 
বীর নেতাজী, সূর্য সেন, ক্ষুদিরাম, ভগৎ সিং, 
সোমেন চন্দ, প্রীতিলতা, কল্পনা, কল্পনা চাওলা স্বনামেই জ্যোতিষ্ক। 
দেশের অন্নদাতা নিরন্ন, শ্রমিকরা কাজ হারায়--
কোভিড ঊনিশ জালে সবাই দিশেহারা। 
মায়ের সাম্রাজ্যের ভার যারা নিয়েছেন--তারা দিক ভ্রান্ত--
মায়ের চোখের অশ্রু আর শুকোয় না। 

খোকন সাহা

বাঁধ ও বাধা

' কি করে কাছে টানি
দুই পাঁজরের ঝাপটানি '।
ঘুরে ফিরে অসংখ্যবার
এইখানে  থামি ;
যেখানে আবিস্কারের চেয়ে
অনাবিস্কারের রক্তগুলি 
জ্বল জ্বল বাণী ।

হয়তো ঝোঁপঝাড়ের মুখে
অথবা প্রণতি সিন্ধু তীরের চোখে
চাপা হাসি চরিয়ে যায়
মিতালি বঁধুয়ার জলমাটিতে ----- ;
কত রকমের ফুল ফোটা,
কত খোলা চোখের জ্বলন্ত শাসানি ----
পৃষ্ঠার পর পৃষ্ঠা খুলে যায় ;
আর তার রঙ রেখায় ফুটে ওঠে
ভূমিকাসুন্দর পৃথিবীর জানালা ।

তবুও সময়ের বাকমেরু
অন্ধকার থেকে ছুটে চলে ---
রোদ্দুরের দিকে।
আমাদের রক্তের নদীতীর হাটবাট পালাগান জুড়ে,
তখন তোমার অধৈর্য মুখ থেকেও
ফুটে ওঠে -----ফুল আর স্বপ্ন পংক্তিমালা  । 
ভেঙ্গে যায় সব বাঁধ ও বাধা ।

নমিতা সরকার

আবেগের রঙ নেই 

নিজেকেই ভুলে গেছি প্রকৃত সুখ  পাখির পৃথিবীতে ঘুরে ঘুরে, না না এভাবে আর নিজেকে দূরে সরানো ঠিক হবে না...

অনেক তো হলো নিজেকে ভুলে ফুলে ফুলে উড়ে বেড়ানো ভ্রমরের গান শোনা, 

চোখের ঘুম সরতে না সরতে যে সুকণ্ঠ পাখির স্বর শুনতে ইচ্ছে জাগে অধির আগ্রহে... 

সে পাখি, আমার কাছে আসতে ভুলে গেছে, ভুলে গেছে আমার ভুবন গায়ে ঘুরে ঘুরে গান শোনাতে অথচ তাকে শুনতে আমি নিজেকে ভুলে গেছি-

অনেক তো হলো নিজের আত্মাকে অনুভূতির ব্যস্ত শহরে আবেগের অদ্ভূদ রঙে রাঙিয়ে দেওয়া... 

আবেগে নাকি প্রেম নেই... 

তাহলে নিশ্চয়ই চিতার দহন জ্বালা আছে, তারজন্যই হয়তো নিজস্বতাকে ভুলে আবেগের আগুনে আহুতি দিতে হয়...

আর পাখি আমার আপন মনে আপন প্রেমে উড়ে উড়ে ঘুরে বেড়ায় সুখের নেশায়... 

থাকসে পাখির ইচ্ছে ডানায় আপন বাসায়, আমি নাহয় নিজেকে নিয়ে ব্যস্ত থাকি অগ্নি চিতায়।

পৃথ্বীরাজ দেবনাথ

অকিঞ্চিৎকরগুচ্ছ
১
ডুব দাও, ডুব দাও
পিছলে যাচ্ছে সময়।
হে হিরণ্যগর্ভ! আমার জন্যে অবশিষ্ট রয়েছে কি আর কোন সূর্য উদয়?
২
একখানি স্বপ্ন ক্রমশ সর্পিল গতিতে 
অন্তর্হিত হচ্ছে, হারিয়ে যাচ্ছে,
রেশ তার রয়ে যাচ্ছে, 
অথচ বিষয়বস্তুর গভীরে আদি আর অকৃত্রিম পরমশূন্য।
তাহলে স্বপ্নটি কার? 
৩
দিনান্তে বা নিশান্তে জাগে আমার অহং, জাগে আমার প্রাণ। বিস্ময়ে ক্লান্ত আমি, তবুও দিগন্তে অশ্বমেধের ঘোড়া, তবুও যুদ্ধের প্রান্তরে উন্মুক্ত সাম্রাজ্যের তলোয়ার। হে ঋতবান, আর কত রক্তের বিনিময়ে তুমি প্রেমিক হবে?

অদিতি তুলি

বয়স বাড়লেই ঘর ছাড়ে মানুষ

মাঝরাতে ঘুম ভেঙে গেলে হঠাৎ আমার কথাই তোমার মনে পড়ে আমি জানি। 
একটা চাপা দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলেই হয়ত ভাবো মেয়েটা কি করছে ঠিক মত খাচ্ছে কি না মাথায় তেল দিচ্ছে কি না....।
গত শীতে দুটো কাঁথা দিয়েছিলাম একটা কম্বল আগেই ছিল। 
এবার না হয় আরো একটা কম্বল পাঠিয়ে দেব।  যা চাপা স্বভাব কখনো মুখ ফুটে কিছু বলে না। 
অনিয়ম করে করে আবার কোন অসুখ না বাধায়। 
মেয়েটার আর কত হল বয়স..! 
এসব ভাবতে ভাবতে রাতের প্রহর বাড়ে,  জাগতিক নিয়মে বাড়ে চিন্তাগুলিও। 
হয়ত দু এক ফোটা জল ও গড়িয়ে পড়ে গাল বেয়ে তোমার অজান্তেই। 
তখন হয়ত আমাদের ঘরের পেছনের হিজল গাছটা থেকে টুপটুপ করে ঝরে পড়ে ফুলগুলো মাটিতে। ঝোপের ধারে কুয়ো থেকে ঝিঁঝি পোকার ডাক ভেসে আছে। নাম না জানা দু একটা পাখির ক্ষীণ শব্দ মিলিয়ে যায় উত্তরে।  
তোমার এই চাপা সংলাপের দীর্ঘশ্বাস কেউ হয়ত শোনে না দেখে না বোঝে না কিন্তু আমি অনুভব করতে পারি নয়ত আমার বুকের মধ্যে এত চাপা কষ্ট কেন হয়? 
নিজেকে বড্ড ভারী লাগে।  
চিৎকার করে ডাকতে ইচ্ছে করে তোমায় মা -
মা  মা  মা....
আমি ভালো নেই….।
অথচ মাধ্যমিকের পর আমি সেমন্তীকে কত করে উপহাস করেছিলেম -
 "তুই কি সারাজীবন বাচ্চাই থাকবি? বড় হবি কবে? মায়ের আঁচল ধরে সারাজীবন বসে থাকলে গেঁয়ো ভূত হবি ..."
বয়স বাড়লেই ঘর ছাড়ে মানুষ 
আমিও ছেড়েছিলাম
এখন বড্ড ঘরে ফিরতে ইচ্ছে করছে..! 
মনে হচ্ছে দেয়াল ঘড়ির কাটা তিনটি উপহাস করে বলছে আমায় তুমি তো জড়িয়ে গেছো এক
আস্তাকুঁড়ে সভ্যতায়, শিল্পায়নের ঘূর্নিপাকে।। 
ঘড়ির কাটায় ঠিক রাত দুটো চল্লিশ 

সাগর শাহ্

এক নিমেষেই শেষ

চলছে দেখো দমের গাড়ি 
দম ফুরাইলেই শেষ, 
মিছে মায়ার দুনিয়া-দারী 
কাটছে নাতো রেষ।

তুমি আমি সেই গাড়িরচাকা, 
চলেছি দেখো আঁকাবাকা
পায়না তো চালকের দেখা। 
কি সমান্তরাল ভাগ্যরেখা.! 

জমাট বাঁধা গোলক-ধাঁধা 
গাড়ি চলছে সাদামাটা, 
নিত্য দিনই চলে গাড়ি 
চলছে চলুক বেশ।

কালো কেশটা সাদা হলেই 
গাড়ির গতি শেষ। 
তাও ভয় করে গাড়ির মনে 
সবইতো জানে মহাজনে।

কতদিন আর চলবে গাড়ি 
হয়ে কেবল দেশান্তরি, 
এভাবে তে কেমনে দিবে
হিসাবনিকাশ আপন বাড়ি। 

এভাবে তেই চলছে গাড়ি 
চলছে চলুক বেশ, 
দমের গাড়ি দম ফুরাতে 
এক নিমেষেই শেষ।

দুলাল চক্রবর্তী

শান্তি রক্ষার্থে

গিন্নি যেন নয়ন মনি
খাটে বসে রয়,
সব দেখভাল করে
বিশ্রাম পেতে হয়।

হালকা একটু ফল-মূল
বারে বারে চায়,
খাবার জিনিস নজরে পড়লে
হাতে নিয়ে খায়।

গিন্নির মনে খুশি আনতে
কর্তা করেন কাজ,
রাঁধুনী সেজে কর্তা করে
নেই যে মনে লাজ।

ভালো- মন্দ খাবার করে
রোজ খাওয়াতে হয়,
গিন্নি তুষ্ট থাকলে পরেই
জগৎ শান্তি রয়।

সংসারাতে শান্তি রাখার জন্য
সদা তৎপর স্বামী,
গিন্নির হুকুম তালিম করা
সেবার চেয়েও দামি!